Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

নুশান জান্নাত চৌধুরীর কবিতাগুচ্ছ

ঘুম হয়ে আধেক বছর

কিছুকাল ঘুমিয়ে, কিছুকাল লুকিয়ে,
কিছু শহর, কিছু মানুষের ভিড়ে হারিয়ে
আমি দেখি—

কোনও এক
পথহারা দেবদূতের বিষণ্ণ ডানার পাশে
আমি বুক পেতে দিয়েছি

চুলের ভেতর জন্ম নিয়েছে
ঘাসফুল থোকা থোকা,
বুকের মাঝখানে একটা প্রাচীন পেরেক,

ঝরাপাতার রাজ্যপাটে
আমার বাম হাঁটুতে গেঁথে আছে—
আগামী বছরের প্রথম সন্ধ্যা;

কিছুকাল পর
ঘুম হয়ে আধেক বছর,
আমার শরীর থেকে ঝরে পড়ে মৃত শীতকাল

***

বৃষ্টির ছায়াপথে নেচে ওঠা এক অবিকল চাঁদ

দেহাতি নদী ঘুম ঘুম,
বৃষ্টির ছায়াপথে নেচে ওঠা
এক অবিকল চাঁদ—
জেগে আছে খড়কুটো ভর্তি মাঠে

আর আছে পুড়ে যাওয়া গ্রীষ্মের
শেষ কবিতাটুকু—
দেহাতি নদী ঘুম ঘুম…

জেগে আছ কি তুমি?

বহুবার বাঁক নিয়ে,
চর ফেলার ছুঁতোয়
মাঝেমধ্যে শুকিয়ে নদীর মতো—

বুকে পুষে দাগ, মলিন ক্ষত
যে তুমি জ্বলছ ঠিক তারাদের মতো

সেই তুমি— জেগে আছ কি?

মৌন গ্রন্থাগারে
বইগুলো জানে
এ শহর জানে
এ সাগর জানে

তুমি ঘুমন্ত জল,
বিস্মৃত কবিতার মতো
‘মধুকূপি ঘাসে অবিরল’

***

কাচের বোতল-রোদ-শুকানো-দুপুরবেলা

বৃষ্টি হোক
আজ নুয়ে-পড়া শহরের গায়ে
আজ হোক হঠাৎ, অকারণ,
ঠিক এখনি
খুব বৃষ্টি

আমার ছিল
একা হয়ে যাবার আগে
তোমাকে ছুঁয়ে দেখার অভ্যেস

খুঁজে নিয়ো
রাতজাগা পথের বাঁকে
পথ চিনে ফেরার এক্সপ্রেস

আমার এক চোখেতে অশ্রু থাকে,
অন্যচোখে রৌদ্রতাপ,
পথের মাঝে রোদ-ছায়া আর
দু’হাত ভরা শূন্যতা

একটা শুকনো গাছে
পাতা এল, জানলা খোলা,
একটা কাচের-বোতল-রোদ-শুকানো-দুপুরবেলা

হাওয়ায় যখন মিলিয়ে যায়
চিঠির ধুলো, এ ডানায় তখন
ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এল…

অনেক স্বপ্ন ধার করেছি,
দেহ ও ডানা,
এ বৃষ্টি জানে
আমরা কে-কার কত্ত চেনা

একটা শুকনো দুপুর
হঠাৎ করেই বৃষ্টি নামায়,
একটা শূন্য উঠোন
ঠিক যতটা হাতের মুঠোয়

হাওয়ায় যখন মিলিয়ে যায়
চিঠির ধুলো,
এ ডানায় তখন
ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এল…

বৃষ্টি বলে—
‘‘সবকিছু ঠিকঠাক
না হলেও চলে।’’

***

অপূর্ণ কবিতা

কোনও এক সন্ধ্যায়,
যখন মহাবিশ্ব প্রসারিত হয়
তোমার আমার সম্পর্কের মতো—

বেলজিয়ামের আয়নায়
সাজে না পৃথিবীর কোনও প্রেমিকা,
দোকানীরা সংগ্রহে রাখে না লাল টিপ,

দরজার পাশে মৃত প্রজাপতি—
আলতো হাওয়ায় তিরতির

কোনও এক সন্ধ্যা
শুধু চুপচাপ তাকিয়ে থাকার
কখনও নিজেকে খোঁজার,
কখনও তোমাকে বোঝার

কোনও এক সন্ধ্যায়
দরজার পাশে অপেক্ষারত—
একজোড়া জুতো পায়ে, অকস্মাৎ
তুমি ধূমকেতুর মতো রেখে যাও দীর্ঘ রেখা

আমাদের ভালবাসা,
আমাদের বিদায়,
আমাদের চুপচাপ তাকিয়ে থাকার
এমনই কোনও এক সন্ধ্যায়—

তোমায় দিলাম—
মুখ গুঁজে থাকা এই
অপূর্ণ কবিতা

***

শখ

যদি শখ করে মানুষের থেকে দু-কদম দূরে গিয়ে
মানুষেরে কাছে পাও,
তাহারেই বড় সহজবোধ্য হয়,
তবে শখ করে মানুষের দিকে দু-কদম ছুটে গিয়ে দেখো—
তুমি অত কাছে নও;
সে মানুষ কেন পাখির মতন হয়!

চলে যাও দূরে,
দশদিক ঘুরেঘুরে
খবর এনেছি তোমার তরে—
যে বক্ষ কুরেকুরে গড়েছ অতল,
ওইখানে ওত পাতিয়াছে
বীরের মৃত্যুকামনায় প্রার্থনারত পুষ্পের দল।

উড়ে যাও পাখির মতন,
সাহসের পালক কিছু তুলে নিয়ে হাতে।

শখ করে একদিন
দেখা দিয়ো তবু
নিশীথের বিন্দুঝরা মোতির মতন
নক্ষত্র-চাদর রাতে।

যেইখানে চাপিয়াছে হিমের বস্ত্র,
অগণিত মুখেদের ভাঙাচোরা প্রাচীরের পাশে,
টপ করে সেইখানে নেমে এসো—
নিঝুম ঝিঁঝির কটাক্ষ ইশারাতে।

অন্ধকারের মুখে ওই যে
যুবতীর ভরা যৌবনরসের মতো জমে আছে
তোমারই কি ছায়া! ঈশ্বর!
প্রস্তরযুগের বটশালিকের সাথে বড় বেশি মিল তার,
মানুষের সাথে তার মিল বড় কম।

চিত্রণ: অরুণাভ মজুমদার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × 5 =

Recent Posts

মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধদেব বসু: কালে কালান্তরে

বুদ্ধদেব বসুর অন্যতম অবদান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য (Comparative Literature) বিষয়টির প্রবর্তন। সারা ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়-মানে এ বিষয়ে পড়ানোর সূচনা তাঁর মাধ্যমেই হয়েছিল। এর ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। এর ফলে তিনি যে বেশ কয়েকজন সার্থক আন্তর্জাতিক সাহিত্যবোধসম্পন্ন সাহিত্যিক তৈরি করেছিলেন তা-ই নয়, বিশ্বসাহিত্যের বহু ধ্রুপদী রচনা বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে তাঁরা বাংলা অনুবাদসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। অনুবাদকদের মধ্যে কয়েকজন হলেন নবনীতা দেবসেন, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবীর রায়চৌধুরী প্রমুখ। এবং স্বয়ং বুদ্ধদেব।

Read More »
দেবময় ঘোষ

দেবময় ঘোষের ছোটগল্প

দরজায় আটকানো কাগজটার থেকে চোখ সরিয়ে নিল বিজয়া। ওসব আইনের বুলি তার মুখস্থ। নতুন করে আর শেখার কিছু নেই। এরপর, লিফটের দিকে না গিয়ে সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে উঠে বসল গাড়িতে। চোখের সামনে পরপর ভেসে উঠছে স্মৃতির জলছবি। নিজের সুখের ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ‘ডিফল্ট ইএমআই’-এর নোটিস পড়তে মনের জোর চাই। অনেক কষ্ট করে সে দৃশ্য দেখে নিচে নেমে আসতে হল বিজয়াকে।

Read More »
সব্যসাচী সরকার

তালিবানি কবিতাগুচ্ছ

তালিবান। জঙ্গিগোষ্ঠী বলেই দুনিয়াজোড়া ডাক। আফগানিস্তানের ঊষর মরুভূমি, সশস্ত্র যোদ্ধা চলেছে হননের উদ্দেশ্যে। মানে, স্বাধীন হতে… দিনান্তে তাঁদের কেউ কেউ কবিতা লিখতেন। ২০১২ সালে লন্ডনের প্রকাশনা C. Hurst & Co Publishers Ltd প্রথম সংকলন প্রকাশ করে ‘Poetry of the Taliban’। সেই সম্ভার থেকে নির্বাচিত তিনটি কবিতার অনুবাদ।

Read More »
নিখিল চিত্রকর

নিখিল চিত্রকরের কবিতাগুচ্ছ

দূর পাহাড়ের গায়ে ডানা মেলে/ বসে আছে একটুকরো মেঘ। বৈরাগী প্রজাপতি।/ সন্ন্যাস-মৌনতা ভেঙে যে পাহাড় একদিন/ অশ্রাব্য-মুখর হবে, ছল-কোলাহলে ভেসে যাবে তার/ ভার্জিন-ফুলগোছা, হয়তো বা কোনও খরস্রোতা/ শুকিয়ে শুকিয়ে হবে কাঠ,/ অনভিপ্রেত প্রত্যয়-অসদ্গতি!

Read More »
শুভ্র মুখোপাধ্যায়

নগর জীবন ছবির মতন হয়তো

আরও উপযুক্ত, আরও আরও সাশ্রয়ী, এসবের টানে প্রযুক্তি গবেষণা এগিয়ে চলে। সময়ের উদ্বর্তনে পুরনো সে-সব আলোর অনেকেই আজ আর নেই। নিয়ন আলো কিন্তু যাই যাই করে আজও পুরোপুরি যেতে পারেনি। এই এলইডি আলোর দাপটের সময়কালেও।

Read More »