ঘুম হয়ে আধেক বছর
কিছুকাল ঘুমিয়ে, কিছুকাল লুকিয়ে,
কিছু শহর, কিছু মানুষের ভিড়ে হারিয়ে
আমি দেখি—
কোনও এক
পথহারা দেবদূতের বিষণ্ণ ডানার পাশে
আমি বুক পেতে দিয়েছি
চুলের ভেতর জন্ম নিয়েছে
ঘাসফুল থোকা থোকা,
বুকের মাঝখানে একটা প্রাচীন পেরেক,
ঝরাপাতার রাজ্যপাটে
আমার বাম হাঁটুতে গেঁথে আছে—
আগামী বছরের প্রথম সন্ধ্যা;
কিছুকাল পর
ঘুম হয়ে আধেক বছর,
আমার শরীর থেকে ঝরে পড়ে মৃত শীতকাল
***
বৃষ্টির ছায়াপথে নেচে ওঠা এক অবিকল চাঁদ
দেহাতি নদী ঘুম ঘুম,
বৃষ্টির ছায়াপথে নেচে ওঠা
এক অবিকল চাঁদ—
জেগে আছে খড়কুটো ভর্তি মাঠে
আর আছে পুড়ে যাওয়া গ্রীষ্মের
শেষ কবিতাটুকু—
দেহাতি নদী ঘুম ঘুম…
জেগে আছ কি তুমি?
বহুবার বাঁক নিয়ে,
চর ফেলার ছুঁতোয়
মাঝেমধ্যে শুকিয়ে নদীর মতো—
বুকে পুষে দাগ, মলিন ক্ষত
যে তুমি জ্বলছ ঠিক তারাদের মতো
সেই তুমি— জেগে আছ কি?
মৌন গ্রন্থাগারে
বইগুলো জানে
এ শহর জানে
এ সাগর জানে
তুমি ঘুমন্ত জল,
বিস্মৃত কবিতার মতো
‘মধুকূপি ঘাসে অবিরল’
***
কাচের বোতল-রোদ-শুকানো-দুপুরবেলা
বৃষ্টি হোক
আজ নুয়ে-পড়া শহরের গায়ে
আজ হোক হঠাৎ, অকারণ,
ঠিক এখনি
খুব বৃষ্টি
আমার ছিল
একা হয়ে যাবার আগে
তোমাকে ছুঁয়ে দেখার অভ্যেস
খুঁজে নিয়ো
রাতজাগা পথের বাঁকে
পথ চিনে ফেরার এক্সপ্রেস
আমার এক চোখেতে অশ্রু থাকে,
অন্যচোখে রৌদ্রতাপ,
পথের মাঝে রোদ-ছায়া আর
দু’হাত ভরা শূন্যতা
একটা শুকনো গাছে
পাতা এল, জানলা খোলা,
একটা কাচের-বোতল-রোদ-শুকানো-দুপুরবেলা
হাওয়ায় যখন মিলিয়ে যায়
চিঠির ধুলো, এ ডানায় তখন
ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এল…
অনেক স্বপ্ন ধার করেছি,
দেহ ও ডানা,
এ বৃষ্টি জানে
আমরা কে-কার কত্ত চেনা
একটা শুকনো দুপুর
হঠাৎ করেই বৃষ্টি নামায়,
একটা শূন্য উঠোন
ঠিক যতটা হাতের মুঠোয়
হাওয়ায় যখন মিলিয়ে যায়
চিঠির ধুলো,
এ ডানায় তখন
ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এল…
বৃষ্টি বলে—
‘‘সবকিছু ঠিকঠাক
না হলেও চলে।’’
***
অপূর্ণ কবিতা
কোনও এক সন্ধ্যায়,
যখন মহাবিশ্ব প্রসারিত হয়
তোমার আমার সম্পর্কের মতো—
বেলজিয়ামের আয়নায়
সাজে না পৃথিবীর কোনও প্রেমিকা,
দোকানীরা সংগ্রহে রাখে না লাল টিপ,
দরজার পাশে মৃত প্রজাপতি—
আলতো হাওয়ায় তিরতির
কোনও এক সন্ধ্যা
শুধু চুপচাপ তাকিয়ে থাকার
কখনও নিজেকে খোঁজার,
কখনও তোমাকে বোঝার
কোনও এক সন্ধ্যায়
দরজার পাশে অপেক্ষারত—
একজোড়া জুতো পায়ে, অকস্মাৎ
তুমি ধূমকেতুর মতো রেখে যাও দীর্ঘ রেখা
আমাদের ভালবাসা,
আমাদের বিদায়,
আমাদের চুপচাপ তাকিয়ে থাকার
এমনই কোনও এক সন্ধ্যায়—
তোমায় দিলাম—
মুখ গুঁজে থাকা এই
অপূর্ণ কবিতা
***
শখ
যদি শখ করে মানুষের থেকে দু-কদম দূরে গিয়ে
মানুষেরে কাছে পাও,
তাহারেই বড় সহজবোধ্য হয়,
তবে শখ করে মানুষের দিকে দু-কদম ছুটে গিয়ে দেখো—
তুমি অত কাছে নও;
সে মানুষ কেন পাখির মতন হয়!
চলে যাও দূরে,
দশদিক ঘুরেঘুরে
খবর এনেছি তোমার তরে—
যে বক্ষ কুরেকুরে গড়েছ অতল,
ওইখানে ওত পাতিয়াছে
বীরের মৃত্যুকামনায় প্রার্থনারত পুষ্পের দল।
উড়ে যাও পাখির মতন,
সাহসের পালক কিছু তুলে নিয়ে হাতে।
শখ করে একদিন
দেখা দিয়ো তবু
নিশীথের বিন্দুঝরা মোতির মতন
নক্ষত্র-চাদর রাতে।
যেইখানে চাপিয়াছে হিমের বস্ত্র,
অগণিত মুখেদের ভাঙাচোরা প্রাচীরের পাশে,
টপ করে সেইখানে নেমে এসো—
নিঝুম ঝিঁঝির কটাক্ষ ইশারাতে।
অন্ধকারের মুখে ওই যে
যুবতীর ভরা যৌবনরসের মতো জমে আছে
তোমারই কি ছায়া! ঈশ্বর!
প্রস্তরযুগের বটশালিকের সাথে বড় বেশি মিল তার,
মানুষের সাথে তার মিল বড় কম।







