ইউক্রেনে প্রথম দু’টি রাত
র থী ন চ ক্র ব র্তী
যাক, শেষপর্যন্ত ইউক্রেনের মাটিতে পা রাখা সম্ভব হল!
ভিসা পাওয়ার জন্য কলকাতায় নিজের অফিস সামলিয়ে এক সপ্তাহে তিনবার দিল্লিতে ইউক্রেন দূতাবাসে হাজির হতে হয়েছে। উড়ানে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি আর কী। তিনবারের বেলায় হাল ছেড়ে দিয়ে কলকাতায় ফিরেছিলাম। শেষমেশ ওই দূতাবাসের ডাকেই চতুর্থবারের জন্য দিল্লি যাওয়া এবং পাসপোর্টের ওপর ভিসার স্ট্যাম্প আদায় করে নিয়ে কলকাতা ফেরা।
নির্দিষ্ট দিয়ে এরোফ্লোট বিমানে নিজের আসনে বসার পর নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম— তা হলে ইউক্রেন যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু কিইভ বিমানবন্দরে নেমে বেরুবার মুখে আবার হতাশ হবার পালা। আগে কোনও ইউরোপের দেশ ভ্রমণের ছাপ নেই আমাদের দু’জনের পাসপোর্টে, অতএব এদেশে ঢোকা যাবে না। যতই বোঝাই যে, কোনও না কোনও একটা দেশকে তো প্রথম আমাদের সুযোগ দিতে হবে, সেটা ইউক্রেন নয় কেন? ওদের সেই এক উত্তর— ‘আমরা মু্র্গি হতে রাজি নই।’ মলয়দা স্মার্টফোনের মাধ্যমে অ্যালেক্সের সাথে যোগাযোগ করল। পাক্কা একঘণ্টা অপেক্ষার পর ওরাই আমাদের জামাই-আদরে বাইরে বের হবার সুযোগ করে দিল।
বাইরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল কার্ল ও সেরগেই। ওদের সাথে জড়াজড়ি পর্ব শেষ হওয়ার পর সবার হাতেপায়ে ধরে পাঁচটা মিনিট সময় চাইলাম একটা সিগ্রেট খাওয়ার জন্য। তিরিশ ঘণ্টা পর, আহহ!

সব শহরের মতোই কিইভ শহরটা বিমানবন্দর থেকে অনেক দূরে। পৌনে একঘণ্টা আসার পর গাড়ি এসে দাঁড়াল কিইভের প্রধান বাসস্ট্যান্ডে। কিইভে এখন আমরা থাকব না, বাস ধরে চলে যাব তিনশো তিরিশ কিলোমিটার দূরে রিভনেতে, অ্যালেক্সের বাড়িতে। অদূরেই দেখা যাচ্ছে রেলস্টেশন। বাসস্ট্যান্ডে ভালই ভিড়, কিন্তু সবকিছুই বেশ পরিচ্ছন্ন। কয়েকজন চিৎকার করে যাত্রীদের ডাকছে, আমাদের এখানকার মতোই। তবে তাদের প্রায় সকলেই মেয়ে। কার্ল ও সেরগেই আমাদের একটা বাসে তুলে দিল। ষোলো আসনের ধোপদুরস্ত বাস। মহিলা কন্ডাক্টরের নির্দেশমতো পিছনের সারিতে মালপত্র রেখে দু’জন দু’দিকের জানালার পাশের আসন দখল করে বসলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাস ভর্তি হয়ে গেল। সবাই পিছনের সারিতে মাল রেখে অন্য আসনগুলিতে ভাগাভাগি করে বসেছে। আর এখানেই বিপত্তি বেধে গেল। আমরা দু’জন বাদে বাকি দশজন যাত্রীর মধ্যে দু’জন মাত্র সঙ্গিনীবাহিত পুরুষ। বাকি আটজন মেয়ের সকলেই হটপ্যান্ট পরিহিত, এমনকী একমাত্র বয়স্কা স্থূলাঙ্গী মহিলাটিও। বাসস্ট্যান্ডে নামা ইস্তক দেখছি থাইয়ের মেলা। চোখ ফেরানো মুশকিল, তবু চেষ্টা করলে অন্য সবকিছু লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এখন আমার ও মলয়দার পাশেই কাঞ্চনজঙ্ঘা-১ ও কাঞ্চনজঙ্ঘা-২। মলয়দার পাশের জন তো আবার হাঁটু দুটো তুলে সামনের সিটের পিছনে ঠেকিয়ে হেলান দিয়ে বসেছে। কেলোর কীর্তি! ভেবেছিলাম জানালার বাইরে দৃষ্টিকে প্রসারিত করে সুযোগের পরিপূর্ণ ব্যবহার করব, মনকে সক্রিয় রেখে যতটা সম্ভব চুষে নেব এই দেশের প্রকৃতি ও যাপনচিত্রের নির্যাস। তা নয়, এখন শরীরের শিরা-উপশিরায় শক্তি কাপুর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। কিছুক্ষণের ভিতরেই সমস্যার কিছুটা সমাধান করে ফেলল মলয়দা, মানে করতে বাধ্য হল। পাশের মেয়েটিকে কথায় ও ইশারায় বলল, যদি মেয়েটি স্থান পরিবর্তন করে আমার সিটে গিয়ে বসে তা হলে আমরা দুই বন্ধু পাশাপাশি বসে একসাথে যেতে পারি। মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়ে মলয়দার দিকে তাকিয়ে হাসল, সে হাসির মানে খুবই স্পষ্ট— কুকুরের পেটে ঘি সয় না।

জানালার ধারটা আমায় ছেড়ে দিয়ে সিটে হেলান দিয়ে বসে চোখ বুজল মলয়দা। প্রায় আড়াই দিন ঠিকমতো ঘুম বা খাওয়া হয়নি। একটু ঘুমিয়ে নিক। আমি আর ঘাড় ঘোরানোয় নেই, এমনকী মলয়দার দিকেও নয়। আর তার দরকারই বা কী। বাইরে ধু-ধু মাঠ জুড়ে সবুজ ফসলের স্নিগ্ধ আলপনা। এদেশেও দেখি হরিৎক্ষেত্র আক্ষরিক অর্থেই আকাশতলে মিশে গেছে। মাঝে মাঝে বেড়া দেওয়া দু’একটা কাঠের গ্রামীণ ঘরবাড়ি। আমাদের দেশের গ্রামগুলিতে যেমন দেখা যায়। তবে এগুলি বেশ অবস্থাপন্ন। রাস্তার ধারে কখনও কখনও কিছু মানুষজন দেখা যাচ্ছে, বেশিরভাগই মহিলা। পরনে ইউক্রেনের জাতীয় পোশাক ভিসিভাঙ্কা, মাথায় রঙিন ওড়না অথবা ফুল। চোখে মুখে সারল্যের হাসি। আর নজরে পড়ছে গরু ও ভেড়া, অপুষ্টির সামান্যতম বেদনা শরীরে নেই। নিজেকে পাচার করে দিয়েছি জানালার বাইরে।
গাড়ি ছুটছে ঘণ্টায় প্রায় আশি কিলোমিটার বেগে। দু’ঘণ্টা পর এক জায়গায় চা-পানের সামান্য বিরতি। আমাদের অবশ্য ওসবের বালাই নেই। কত ঘণ্টা চা খাইনি। মস্কো এয়ারপোর্টে আট ঘণ্টা অপেক্ষা করার সময় অন্য কিছু তো দূরের কথা, খরচের ভয়ে এককাপ চা খাওয়ার কথাও ভাবিনি। যদিও ইউক্রেন যাওয়া-আসা ও থাকা-খাওয়ার জন্য আমাদের পকেট থেকে এক পয়সাও খরচ হচ্ছে না, আমন্ত্রিত হিসাবে যাচ্ছি। এখানে এক কাপ চা কিনে খেতেই পারতাম। কিন্তু দেড়শো টাকা দিয়ে এক কাপ চা খেলে সারাজীবন নিজেকে অভিশাপ দেওয়া ছাড়া উপায় থাকত না। তাছাড়া আমাদের কাছে ইউক্রেনীয় মুদ্রা রিভনিয়া নেই। অতএব তৃষিত মনের অভিমুখ বদল করার চেষ্টায় এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকলাম। চারঘণ্টা পর সন্ধ্যার মুখে এসে নামলাম রিভনেতে। অ্যালেক্স অপেক্ষা করছিল। ওর গাড়িতে করে মিনিট পনেরোর ভিতর পৌঁছে গেলাম আমাদের আশ্রয়ে।

অ্যালেক্সের বৌ ভিক্টোরিয়া খুবই সুন্দরী। প্রসন্ন হাসিতে বেশ একটা বৌদি বৌদি ভাব। দু’কাপ করে চা আর বিস্কুট খেয়ে বাইরে এসে সিগ্রেট ধরালাম।
দোতলায় আমাদের জন্য বরাদ্দ ঘর দেখিয়ে অ্যালেক্স বলল, ‘তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নিয়ে নীচে এসো। ডিনার রেডি।’ শালা বলে কী? এখন মোটে রাত আটটা বাজে। আমরা দু’জনই রাত একটায় খাওয়া ও দুটোয় শোয়ার পার্টি। তবে যাই হোক, এখন আমরা ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত। আড়াই দিন পর দুটোই আজ তাড়াতাড়ি হলেই মঙ্গল। আধঘণ্টার ভিতর স্নান করে পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে নীচে নামলাম। টেবিলে কিছু ব্রাউন ব্রেড, স্যুপ, মধু আর ফল। বোঝাই যাচ্ছে এগুলি স্টার্টার। খিদে পেটে একটা ব্রাউন ব্রেড শেষ করে দ্বিতীয়টা তোলার সময় মলয়দা আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল— ‘এগুলি বেশি খেয়ো না। তা হলে পেটে ভাতরুটি খাবার জায়গা থাকবে না।’ দুটো ব্রাউন ব্রেডের মাঝে মধু মাখিয়ে একবাটি স্যুপসুদ্ধু খেয়ে নিল অ্যালেক্স। তারপর আপেল চিবোতে চিবোতে আমাদের কালকের পরিকল্পনার কথা জানাল। বলা হয়ে গেলে উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের শুভরাত্রি জানিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেল। ভিক্টোরিয়া টেবিল পরিষ্কার করতে ব্যস্ত হয়ে গেল। তার মানে ডিনার শেষ! উঠে গিয়ে বেসিনে হাতমুখ ধুয়ে হাসিমুখে ভিক্টোরিয়াকে শুভরাত্রি জানালাম। ঘরে এসে মলয়দা ও আমি দু’জন দু’জনের দিকে বিষণ্ণ মুখে ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে মিনিট দুয়েক দাঁড়িয়ে থাকলাম। হঠাৎ আমার খিস্তিটা মলয়দার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল— এই … দেশে তিন সপ্তাহ কাটাব কী করে? দাঁত ব্রাশ করে পেট চেপে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। ক্লান্ত শরীরে ঘুম আসতে দেরি হল না।
সকাল সাড়ে ছ’টায় দরজায় টোকা আর অ্যালেক্সের ‘মালাই’, ‘র্যাটিন’ ডাক শুনে আমাদের ঘুম গেল। অ্যালেক্সকে আমরা হাড়ে হাড়ে চিনি, বেশ মাথামোটা। আটটায় বেরোনো মানে আটটা বেজে তিন সেকেন্ডও নয়। ও একাই বেরিয়ে যাবে। মলয়দার গড়িমসি পর্ব চলবে কিছুক্ষণ, অতএব আমাকেই উঠে দরজা খুলতে হল। ‘কেমন দিলাম’ মার্কা হাসি হেসে অ্যালেক্স বলল, ‘এখনও ঘুমাচ্ছ! নীচে চলো, চা রেডি।’ নীচে এসে ভিক্টোরিয়াকে ‘গুড মর্নিং’ জানিয়ে বললাম, ‘মলয়দা তো এখনও ঘুমাচ্ছে। ওকে তুলতে হবে। দু’কাপ চা নিয়ে গিয়ে যদি ঘরে বসে খাই কোনও অসুবিধে হবে?’ ভিক্টোরিয়া হেসে বলল, ‘তোমাদের যেমন ইচ্ছে তেমন করো। ওই পাগলের কথায় কান দিয়ো না। আর একটা কথা। তোমাদের সব অসুবিধের কথা আমাকে সরাসরি বলবে। যেমন কাল রাতে তোমাদের ঠিকমতো খাওয়া হয়নি।’ মুখে বিরক্তির ভাব দেখিয়ে ঠোঁট উল্টে অ্যালেক্স কাঁধ স্রাগ করল। সাধে কী আর কার্ল মার্ক্স বলেছেন— ‘পৃথিবীতে তিনটেই জাত— বড়লোক, গরিবলোক আর নারী।’ হা হা হা… এরপর তিনসপ্তাহ না খেয়ে থাকলেও কোনও অসুবিধে হবে না। অ্যালেক্সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দু’কাপ চা নিয়ে ওপরে এলাম।
প্রাতঃকৃত্য স্নান ইত্যাদি সেরে সুসজ্জিত হয়ে নীচে নামলাম সাড়ে সাতটায়। আজ খাবার টেবিলে এলাহি ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা। ব্রাউন ব্রেড, স্যুপ, মধু, ফল তো আছেই— সাথে প্যানকেক ও ডাবল ডিমের অমলেট। কোনও লোকলজ্জার তোয়াক্কা না করে সাফসুতরো করে সব খেলাম। যেমন খুশি চলার লাইসেন্স তো পেয়েই গেছি। আটটার সময় বেরিয়ে পড়লাম। অ্যালেক্স গাড়ি ড্রাইভ করছে, পাশে ভিক্টোরিয়া। আমরা দু’জন পিছনে। শহরের কেন্দ্রস্থলে ভিক্টোরিয়ার অফিস। সেখানে ওকে নামিয়ে দিয়ে মিনিট কুড়ির মধ্যে গাড়ি এসে দাঁড়াল একটা বহুতল বিল্ডিংয়ের সামনে। এখানেই অ্যালেক্সের অফিস। লিফট বেয়ে ছ’তলায় উঠে একটা আধো-অন্ধকার করিডর ধরে কিছুটা হেঁটে এসে অ্যালেক্সের অফিস ঘরে ঢুকলাম।

আনুমানিক কুড়ি ফুট বাই কুড়ি ফুটের একটি ঘর, মাঝখানে একটি আধা পার্টিশন দিয়ে ঘরটিকে দুটো অংশে ভাগ করা হয়েছে। সব দেওয়াল জুড়ে কাঠের তাক— প্রাচীন থেকে অত্যাধুনিক সব ক্যামেরা-সহ বিভিন্ন রকমের ক্যামেরা সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি, প্রচুর বই ও পুরস্কারে টইটুম্বুর হয়ে আছে। চার ফুট বাই চার ফুটের একটি অংশ রাখা হয়েছে কিচেন হিসেবে ব্যবহারের জন্য। ঘরের শেষপ্রান্তে একটি টেবিলে বসে কম্পিউটারে কাজ করছিল একটি তরুণী। অন্য টেবিলটির দখল নিয়ে সামনে রাখা দুটো চেয়ারে আমাদের বসার ইঙ্গিত করে অ্যালেক্স ওর কম্পিউটর চালু করল। তারপর মেয়েটির সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিল। নাম মারিনা, খুবই সুন্দরী ও ব্যক্তিত্বময়ী। অ্যালেক্সের ব্যক্তিগত সহকারী ও অফিসের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক। আমাদের এক চিলতে স্মিত হাসি উপহার দিয়ে মারিনা কাজের ভিতর ডুবে গেল।
অ্যালেক্সের শরীরে যে বাঁদরের হাড় বসানো সে তো আমরা আগেই জানি। একমাত্র কাজই ওকে সুস্থির রাখতে পারে। যেমন এখন। আমরা যে এদেশে অতিথি হিসাবে এসেছি, যাতে বোর না হই সেজন্য যে ওর কোনও দায়বদ্ধতা আছে, সে বিষয়ে ওর কোনও খেয়াল নেই। ও কম্পিউটারে কাজ করে যাচ্ছে আর মারিনার সাথে অফিসের বিষয়ে গম্ভীর আলোচনা করে চলেছে। কতক্ষণ এমন চুপচাপ বসে থাকা যায়? এই একটা ঘণ্টা বাইরে চরে বেড়ালে একটা নতুন দেশের কত কী দেখতে পেতাম।
খুব জলতেষ্টা পেয়েছে। কিন্তু চারদিকে তাকিয়ে একটাও জলের বোতল বা জলের পাত্র চোখে পড়ল না। অ্যালেক্সের বাড়িতেও দেখেছি একই ব্যবস্থা। কাল থেকে জল খাওয়া বলতে গেলে হয়ইনি। নজরে পড়ল কিচেনে বেসিনের ওপরে একটা কল আছে। দেশে আমি কিনে জল খাই না, যেখানে যে জল পাই খেয়ে নিই, কোনও অসুবিধে হয় না। ইউরোপের প্রাকৃতিক জলভাণ্ডার এমনিতেই বেশ শুদ্ধ, সবচেয়ে বড় কথা পশ্চিমি দেশগুলিতে নাগরিক পরিষেবায় একচুল খামতি মানে অমার্জনীয় অপরাধ। জল সরবরাহ পদ্ধতি স্বাস্থ্যসম্মত হতে বাধ্য। প্রতিভা বসু ‘স্মৃতি সততই সুখের’ স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন যে, প্রবাসে থাকাকালীন বুদ্ধদেব বসুর পেটের রোগ একেবারে সেরে গিয়েছিল। অতএব একটা চায়ের কাপে গোনাগুনতি ন’কাপ জল ভরে তৃষ্ণা মেটালাম। তারপর কাছে এসে মলয়দাকে বললাম, ‘ওরা কাজ করুক, চলেন আমরা একটু ঘুরে আসি।’ উত্তর পেলাম, ‘খিদেয় পেট জ্বলছে, ঘোরাঘুরি করে সেটা আর বাড়িয়ে লাভ নেই।’ অগত্যা আমিই অ্যালেক্সকে বললাম, ‘এখন এগারোটা বাজে। ক’টা নাগাদ অফিস থেকে বের হবে যদি জানাও, তা হলে ততক্ষণ আমি একটু এদিক-ওদিক ঘুরে আসতে পারি।’
—আমরা বেরুব আড়াইটায়, কিন্তু কোথায় যাবে তুমি?
—এখানে সব কিছু করার ফাঁকে সুযোগমতো তোমার দেশটা নিজের মতো করে দেখে নিতে চাই। আমি আড়াইটার আগেই চলে আসব।
—তুমি হারিয়ে যাবে। তোমার কাছে স্মার্টফোনও নেই, যোগাযোগ করতে পারবে না।
—তুমি নিশ্চিন্ত থেকো অ্যালেক্স। আমি আড়াইটার আগেই চলে আসছি।
—লাঞ্চ?
—পেট ভর্তি হয়ে আছে। আজ এবেলা কিছুই খাব না।

সবাইকে সাময়িক বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে এলাম। রাস্তায় পা রেখে বেশ শিহরন হতে থাকল, ইউক্রেনের মাটিতে একা ঘুরছি বলে। বড় রাস্তায় এসে মনে হল কোনদিকে যাব? কী মনে করে বাঁদিকে হাঁটা লাগালাম। দু’দিকে আসা-যাওয়ার তিন লেনের চওড়া রাস্তা, মাঝে পাঁচ ফুট চওড়া টানা বিভাজন উদ্যানে রং-বেরঙের ফুলগাছ। মূল রাস্তার দু’পাশে অন্তত কুড়ি ফুট করে চওড়া ফুটপাথ, কিছুটা পরপরই বসার জায়গা— কাঠের সুদৃশ্য বেঞ্চ। তার পাশেই কিছুটা জায়গা ঘিরে ফুলের গাছ। সবই যতটা সম্ভব ততটা পরিচ্ছন্ন। কিন্তু এত আয়োজন কীসের জন্য? লোক কই? ফুটপাথে হঠাৎ হঠাৎ এক-দু’জনকে দেখা যাচ্ছে। এখানে কি বাংলা বনধ চলছে? রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা অবশ্য সে তুলনায় ভালই। এদেশে চালকের আসন বাঁদিকে। চলতে চলতে রাস্তার অন্য পারে একটা ব্যাঙ্ক দেখতে পেলাম। বাইরে একটা ব্ল্যাক বোর্ডে আজকে ডলারের বিনিময়মূল্য চক দিয়ে লেখা আছে। এটাই তো খুঁজছিলাম।
ডলার ভাঙিয়ে প্রথমেই ভাত-রুটি জাতীয় কিছু খেতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী কোনও মোড়ের মাথায় গিয়ে জেব্রা ক্রসিং ধরে রাস্তা পার হওয়া উচিত। কিন্তু আমার তর সইছে না। রাস্তা পার হব বলে দাঁড়িয়ে অভ্যাসমতো ডানদিকে তাকিয়েছি, দেখি বাঁদিকে কয়েকটি গাড়ি দাঁড়িয়ে গেছে। আমাকে রাস্তা পার হতে ইশারা করছে। আমাদের দেশে একটা লেন দিয়ে যে অভিমুখে গাড়ি চলার নিয়ম এদেশে তার বিপরীত। সাবধান না হলে বিপদ। রাস্তা পার হয়ে লাফিয়ে ডিভাইডার পেরিয়ে ওদিকের রাস্তায় দাঁড়ালাম, এবার ঠিকমতো ডানদিকে তাকালাম। এবারও দেখি গাড়ি দাঁড়িয়ে গেছে এবং আমাকে পার হবার ইশারা করছে। পথচারীদের জন্য গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাস্তা পার হতে দেওয়ার এই প্রয়াস পরেও এদেশের এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশে দেখেছি। অভিব্যক্তিতে ধন্যবাদ জানিয়ে রাস্তা পার হয়ে ব্যাঙ্কে ঢুকলাম। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হল না। সকালে বেরোনোর সময় পাসপোর্ট নেবার কথা ভুলে গিয়েছি। পাসপোর্ট ছাড়া ব্যাঙ্কে ডলার ভাঙানো সম্ভব নয়। অতএব দিনভর হরিমটর।

মিনিট পনেরো হেঁটে এসে বিশাল এলাকা জুড়ে একটা বাঁধানো চত্বর পেলাম, যেন ছোটখাটো একটা ফুটবল খেলার মাঠ। পিছনে বড় একটা বিল্ডিং, অনেকটা ভিক্টোরিয়ান স্টাইলের। একবারে চূড়ায় চারজন মানুষের চলমান স্ট্যাচু। চত্বরের বাঁদিকে বেঞ্চের ওপর হাত ছড়িয়ে বসে থাকা এক ভদ্রলোকের স্ট্যাচু, পুরোটাই কালো পাথরের। চত্বর ঘিরে অনেক বাড়ি ও দোকান। এখানে লোকজনের সমাগম বেশ ভালই। মনে হয় এটা রিভনের একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। কিছুক্ষণ চত্বরে ঘোরাঘুরি করে পিছন দিকের একটা রাস্তা ধরলাম। আরিব্বাস! এই এলাকাটা তো বেশ জমজমাট। রাস্তা জুড়ে হাজার জিনিসের প্রাণবন্ত বাজার, অনেক লোকজন। হঠাৎ দেখি এক দিদি হাতে রিভনিয়া নিয়ে পায়চারী করছে আর বলছে, ‘ডলার রিভনিয়া… ডলার রিভনিয়া…’। কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম ডলারপ্রতি কত রিভনিয়া পাওয়া যাবে। ও ক্যালকুলেটরে লিখে জানাল, ‘ছাব্বিশ রিভনিয়া’। কিছুক্ষণ আগেই ব্যাঙ্কের রেট দেখলাম পঁচিশ রিভনিয়া। এখানে পাসপোর্ট-ফাসপোর্ট কিছুই লাগবে না। ডলারপ্রতি এক রিভনিয়া বেশি। রিভনিয়া দেখেই খিদে চাগাড় দিয়ে উঠেছে। কিছু ডলার এখনই ভাঙিয়ে আগে খেতে হবে, আর একটা জলের বোতল কিনতে হবে। তবু একটু দরাদরি করলাম, আমি ইংরেজিতে, দিদি ইউক্রেনের ভাষায়। বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না। কিন্তু ভদ্রমহিলা দর কমাতে রাজি নয়। লিপস্টিক রাঙানো ঠোঁট আর প্রায় উন্মুক্ত বুকে বিগত যৌবনের ফসল–এর দাম আছে না? একশো ডলার ভাঙিয়ে নিলাম, আমার ও মলয়দার পঞ্চাশ পঞ্চাশ করে।
বাজারে ঘোরাঘুরি করে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি একটা বাজে। খাবার দোকান খুঁজতে থাকলাম। রেস্তরাঁ ও খাবার দোকান আছে অনেক, কিন্তু ভাত বা রুটির রেস্তরাঁ পাওয়া যাচ্ছে না। দুর ছাই, আর পারছি না। যা পাই তাই খাই ভেবে একটা দোকানে ঢুকে বার্গারের অর্ডার দিলাম এবং সাথে সাথেই অর্ডার ক্যান্সেল করে দিলাম— মলয়দার মুখটা ভেসে উঠল। শালা, কুঁড়ের হেড কোয়ার্টার। বসে থেকে নিজেও খেল না, আমাকেও খেতে দিল না। একটা জলের বোতল দিতে বললাম। ভারতীয় মুদ্রায় দাম মাত্র একশো কুড়ি টাকা। জল যে গায়ে আগুনের ছ্যাঁকা লাগাতে পারে, এই প্রত্যক্ষ করলাম। দোকানের ছেলেটি বুঝে গেছে আমি গাঁইয়া টু দি পাওয়ার ইনফিনিটি। সাজিয়ে রাখা বিয়ারের বোতল দেখিয়ে বলল, ‘এটা খাও, সামান্য বেশি দাম।’ বিয়ার! ভাল করে সেদিকে তাকিয়ে দেখি গারদের ওপারে আসামির মতো হাত প্রসারিত করে তারা আমার গলায় আশ্রয় নেবার জন্য কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু সম্ভব নয়, অ্যালেক্স কী ভাববে।
একসময় ফেরার পথ ধরি। মনে মনে আমার অবস্থান ও গন্তব্যের একটা মানচিত্র এঁকে নিলাম। এবার অন্য পথ ধরে হাঁটতে থাকলাম। সামান্য ইধার-উধার করে তিনঘণ্টা পর পৌঁছে গেলাম অ্যালেক্সের অফিসে, বেলা তখন দুটো দশ।

আমাকে দেখে অ্যালেক্স ও মলয়দা বেশ খুশি হল, নিশ্চিন্ত হওয়ার খুশি। অ্যালেক্স জিজ্ঞাসা করল আমি কোথায় গিয়েছিলাম। আমি সব বললাম। মারিনা কেমন সুন্দর হাসি হেসে মৃদু স্বরে বলল, ‘শিবশেঙ্ক’। আসলে, হয়তো বলতে চেয়েছে শিবশঙ্কর, উচ্চারণগত তফাত আর কী। পরে অবশ্য জেনেছিলাম জায়গাটির নাম সেভসেঙ্ক পার্ক, রিভনের প্রাণকেন্দ্র। ইউক্রেনের বিখ্যাত কবি, লেখক তথা জাতীয় নায়ক তারাস সেভসেঙ্কের নামে এই পার্ক। স্ট্যাচুটি যে তাঁরই হবে, সে তো জানা কথা। পিছনের সুদৃশ্য বিশাল বিল্ডিংটি হোলি রেজারেকশন ক্যাথিড্রাল।
মলয়দা একটা কাগজের প্যাকেট আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘খেয়ে নাও, তোমার জন্য রেখে দিয়েছি’। প্যাকেট খুলে দেখি বার্গার। কিছুক্ষণ আগে বার্গার খেতে না পারার জন্যই মলয়দাকে গাল দিয়েছি, রাখে হরি মারে কে। খাওয়া শেষে বেসিনের কল থেকে জল খেলাম। একটা সিদ্ধান্ত এখানেই নিয়ে নিলাম। কাল থেকে আমার জলের বোতল বেসিনের জল দিয়ে ভরে নিয়ে বেরব। এবার রিভনিয়া বের করে মলয়দাকে দিলাম। কী করে রিভনিয়া জোগাড় করলাম, এই নিয়ে একটা ছোটখাটো ইন্টারভিউ দিতে হল অ্যালেক্স, মারিনা ও মলয়দাকে। সব শুনে হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়াল অ্যালেক্স ও মারিনা, ওদের দেখাদেখি আমরাও।

গাড়িতে করে মিনিট পাঁচেকের মধ্যে এসে উপস্থিত হলাম একটি বড় বিল্ডিংয়ের সামনে। সাদা দোতলা বিল্ডিংয়ের সামনে উঁচু বারান্দায় ছ’টি পেল্লায় গম্বুজ। এটি এখানকার ঐতিহ্যশালী মিউজিয়ম, নাম— রিভনে মিউজিয়ম অফ রিজিওনাল স্টাডিস। অ্যালেক্স-মারিনার পিছু পিছু এসে ঢুকলাম মিউজিয়মের ছবি প্রদর্শশালায়। বিভিন্ন শিল্পীর করা ছবি প্রদর্শনের ব্যবস্থা এখানে, অনেকটা আমাদের অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এর মতো। ভিতরে দু’টি যুবতী ও একটি যুবক বড় টেবিলে রাখা ছবিগুলি ফ্রেমাশ্রিত করা ও দেওয়ালে ঝোলানোর কাজে ব্যস্ত ছিল। ওদের সাথে আমাদের পরিচয় করানো হল। মেয়ে দু’জনের নাম ইউগন্ড ও গ্যালেরিনা— অ্যালেক্সের ফটোগ্রাফি স্কুলের ছাত্রী। ছেলেটির নাম আন্দ্রেই, পেশা সাংবাদিকতা। অ্যালেক্স ও মারিনাও ওদের সাথে কাজে লেগে গেল। বেশ কিছুক্ষণ ওদের কাজ কারবার দেখতে থাকলাম। এভাবে কেউকেটা হয়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকায় আমি অভ্যস্ত নই। একসময় মলয়দাকে বললাম, ‘চলুন, কাজে হাত লাগাই।’ মলয়দা উত্তর দিল, ‘সে তো করাই যায়। কিন্তু কাল থেকে আমাদের ছবি দেখানো হবে, আমরা অতিথি— হাত লাগালে এরা আবার কিছু মনে করবে না তো?’ বললাম, ‘তাতে আমাদের — ছেঁড়া যাবে। ওসব সম্মান-ফম্মানের ব্যাপার গুলি মারুন তো। আমাদের দরকার আনন্দ পাওয়া, ব্যস। তাছাড়া এসব সামন্ততান্ত্রিক ভাবনাচিন্তার অধ্যায় আড়াইশো বছর আগেই এরা পেরিয়ে এসেছে। বরং দাঁড়িয়ে থাকলেই ওরা বুঝে যাবে যে, আমরা পরজীবী। চলুন।’ এরপর আমাদের কাজের ব্যস্ততা দেখে অ্যালেক্সের দাঁত এবং চোখের হা হা হি হি কিছুতেই চাপা থাকছে না। এখন আমরাই অরগানাইজার কাম লেবার কাম আর্টিস্ট। বাইরের গম্বুজে ঠিকমতো ফ্লেক্স টাঙিয়ে দিয়ে মই থেকে নেমে কলকাতা থেকে আনা বিড়ি একটা ধরালাম। কতকালের বন্ধুর মতো আন্দ্রেই হাত বাড়িয়ে দিল। মাথার ভিতরে ডিজে-তে তখন বেজে চলেছে ‘বিড়ি জ্বালাইলে…’।

ঘণ্টা দেড়েক পর বিকাল চারটে নাগাদ গাড়িতে করে এলাম রিভনের সবচেয়ে বড় এক মল-এ। মল! অ্যালেক্স কি বাঙালকে হাইকোর্ট দেখাতে নিয়ে এসেছে? ওদের পিছন পিছন মলের তিনতলায় উঠে এলাম। মানতেই হবে যে, মলটা খুবই ভাল, কিন্তু আমরা কি মল দেখতে এসেছি? এবার অ্যালেক্স যেখানে নিয়ে এল, সেখানে এসে মাথা গরম হয়ে গেল। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর লেখায় পড়েছিলাম, ইউরোপে নাকি ছবির প্রদর্শনী শুধুমাত্র মিউজিয়ম বা প্রদর্শশালায় হয় না, তাকে ছড়িয়ে দেওয়া হয় পথে, বাজারে। এখানে এসে দেখলাম একটা জায়গায় রেডিমেড স্ট্রাকচারে অনেক ছবি টাঙানো। কিছু ছবি বেশ চেনা চেনা লাগছে। লাগবেই তো। কত বড় আলোকচিত্রশিল্পী সেই পরিচিতি-সহ মলয়দার দাঁত বের করা ছবি একেবারে সামনেই জ্বলজ্বল করছে, সাথে তাঁর তোলা ৪৯টি ছবি। অন্য পাশে একইভাবে প্রদর্শিত ইতালির শিল্পী ভার্জিলো বারদসির তোলা ছবি। আমার কোনও ছবি নেই।

দেখভাল সব হয়ে গেলে অ্যালেক্সের পিছন পিছন বেরিয়ে এসে গাড়িতে বসলাম। মিনিট দশেকের মধ্যে গাড়ি এসে দাঁড়াল একটা স্টেডিয়ামের মূল দরজার সামনে। ভিতরে ঢুকে টাটকা সবুজ ঘাসে ভর্তি ময়দানটা দেখে মনটা ভরে গেল। স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শক, বেশ একটা উৎসবের মেজাজ। আমাদের কৌতূহল নিরসন করে মারিনা জানাল, ‘আজ কিইভের সাথে রিভনের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ।’ তার মানে ইউক্রেনের রাজধানীর সাথে লড়বে এই ছোট্ট শহর? ব্যাপারটা পরিষ্কার করল আন্দ্রেই। নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ইউক্রেনের বেশিরভাগ অঞ্চল বরফে ঢাকা থাকে। এই সময়টাতে দৈনন্দিন কাজকর্ম করা বাদ দিয়ে আর কিছু করার উপায় থাকে না। কিন্তু বরফ বিদায় নেবার পর মে থেকে সেপ্টেম্বর বিভিন্ন ধরনের উৎসবে মেতে ওঠে ইউক্রেন। অনন্ত অপেক্ষার পর সবাই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে। খেতেখামারে-গির্জায়-হাটেবাজারে-পথেঘাটে-সমুদ্রতটে-পার্কে-রেস্তরাঁয়-মলে— সর্বত্রই শুধুই আনন্দের গান। এসময় একটি দিনকে ‘কিইভ ডে’ ও একটি দিনকে ‘ইউক্রেন ডে’, ২৪ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস হিসাবে পালন করা ছাড়াও প্রতিটি শহর একটি দিন বেছে নেয় ‘সিটি ডে’ পালন করার জন্য।

স্টেডিয়ামের একটা বেশ ভাল জায়গায় নিয়ে এসে আমাদের বসানো হল। খেলোয়াড়রা যদিও মাঠে নামেনি, কিন্তু স্টেডিয়াম ভর্তি দু’দলের দর্শকদের পতাকা আন্দোলন আর চিৎকারে কলকাতার ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান যুদ্ধের মেজাজ। মিনিট পাঁচেক পর হঠাৎ দু’জন উদ্যোক্তা এসে আমাদের ধরে নিয়ে মাঠের মাঝখানে নিয়ে এল। তারপর আমাকে রিভনের জার্সি পরিয়ে ছবি তোলা এবং কর্মকর্তাদের সাথে পরিচয় করানো হল। বুঝতে পারছি ব্যাপারটা অ্যালেক্সের উদ্যোগেই হয়েছে।
দু’দলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখতে দেখতে হুস করে দু’ঘণ্টা পার হয়ে গেল। অতিরিক্ত সময়ে এক গোলে কিয়েভ জিতে গেল। রিভনে হেরে গেল ঠিকই, কিন্তু অসাধারণ খেলেছে। একটা উপভোগ্য ম্যাচ দেখার অভিজ্ঞতা হল।
খেলা শেষে অ্যালেক্সের পিছন পিছন সবাই স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে এলাম। তিনটি গাড়িতে ভাগাভাগি করে সবাই উঠে বসলাম, মিনিট দশেকের ভিতর এসে উপস্থিত হলাম একটি বারে।

বাইরে থেকে বোঝা যায়নি ভিতরের পরিসর এত বিস্তৃত। কিন্তু হলে হবে কী? অনেকটা জায়গাই অন্দরসজ্জা ও রিলিফের জন্য নষ্ট করা হয়েছে। নষ্ট তো বটেই, বিশেষত ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে। সবে সন্ধ্যা নেমেছে, এখনই প্রায় সব টেবিল ভর্তি। একটা বড় টেবিলের দু’পাশে আমরা এগারোজন বসলাম। তাকিয়ে চারদিকটা দেখে মন তৃপ্ত হলেও মনে মনে হিসাব করে দেখলাম কম করে আরও পাঁচটি বড় টেবিল বসানোর জায়গা আছে। সেই জায়গাগুলিতে কাঠের বড় বড় ওয়াইন ব্যারেল সাজিয়ে রাখা হয়েছে মেজাজ আনার জন্য। আর আছে কিছু শিল্পকর্ম, মায় একটা অ্যান্টিক সাইকেল। ইউরোপে এই একটি ব্যাপার। ব্যবসায়িক লাভের থেকেও বেশি প্রাধান্য পায় উন্নত রুচির উপস্থাপনা। পরবর্তী সময়ে এটা বিভিন্ন জায়গায় দেখেছি। যেমন, মস্কোর প্রাণকেন্দ্র এবং বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র রেড স্কোয়ারে। এখানের GUM মল পৃথিবীর সেরা কয়েকটি মলের একটি। এই মলের তিনভাগ জায়গার প্রায় একভাগ জায়গা একেবারে ফাঁকা অথবা বিভিন্ন মোটিফকে দৃষ্টিনন্দনভাবে সাজিয়ে রাখতে দেখে একই সাথে অবাক হয়েছি এবং অদ্ভুত ভাল লাগা বোধে আচ্ছন্ন হয়েছি। পণ্য এখানে হৈ-হল্লা করে ক্রেতার মাথায় ঝড় তোলে না।
—র্যাটিন, হোয়াট উড ইউ প্রেফার? ভদকা ওর স্কচ?
দিমিত্রর ডাকে মনঃসংযোগে ছেদ পড়ল। আমার ইচ্ছে ছিল স্কচ। কিন্তু আমার উত্তর দেবার আগেই আন্দ্রেই আমার হয়ে বলে দিল— ‘ভদকা’। অগত্যা…। জল মেশানোর কোনও গল্প নেই, নির্ভেজাল আত্মীকরণ। আমরা নদীমাতৃক দেশের মানুষ, জল ছাড়া দু’পা চলতে পারি না। সর্বত্র শুধু জল আর জল। দুধ-মদ-মাংসের কথা বাদই রাখলাম, স্বাস্থ্য-শিক্ষা-চিকিৎসা-রাজনীতি-সমাজনীতি মায় টাকার মূল্য— সবই জলে জলে জলাক্কার। কিন্তু একটা ব্যাপার পছন্দ হচ্ছে না। আড্ডা ফাটাফাটি জমেছে ঠিক আছে, তাই বলে একটা পেগ শেষ করতে আধঘণ্টা লেগে যাবে! ছবি নিয়ে আড্ডা, সবাই ফটোগ্রাফির জগতে খ্যাতনামা। বিষয়ে মজে আছে, আর মাঝে মাঝে প্রিয়তমার কপালে চুমু খাওয়ার মতো গ্লাসে হালকা চুমুক দিচ্ছে। এর ভিতর আমাদের দু’পেগ শেষ হয়ে গিয়ে তৃতীয় পেগের তুরীয়ানন্দে থাকার কথা। পা টলমল, জিভ খলখল, দৃষ্টি ছলছল। মুখ দিয়ে হয় ভালবাসার কথা, নয়তো খিস্তিখাস্তা। তবে একটা জিনিস বেশ বুঝতে পারছি— আমরা ড্রিংক করা হচ্ছে ভোগ করা, এদেরটা উপভোগ করা। যাকগে যস্মিন দেশে যদাচার।

পান পর্ব শেষ হলে রাতের খাবার। দু’মুঠো ভাতের জন্য অস্তিত্বের শিরা-উপশিরায় মরাকান্না হয়েই চলেছে। কিন্তু এদেশে ভাত হল পটাশিয়াম সায়ানাইডের সমতুল। তবে ভাতের অতৃপ্তি অনেকটাই পুষিয়ে দিয়েছে অন্য সব খাবার, বিশেষত মাংসের সাথে কিছু তরকারি মিশিয়ে একটা জাম্বো স্যুপ। সেটা আরও ভাল বুঝলাম মলয়দার কথায়। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মলয়দা বলল, ‘একটা জিনিস খেয়াল করেছ? চারদিন ভাত খাইনি। তাতে মনের একটা অতৃপ্তি আছে ঠিকই, কিন্তু শরীরটা দারুণ হালকা লাগছে। লাগছে না তোমার?’
সবাই সবাইকে শুভরাত্রি জানিয়ে গাড়িতে এসে বসলাম। ড্রাইভ করতে করতে আলেক্স একবার জানতে চাইল সব ঠিক আছে কি না। কোনও নেশাই হয়নি, কিন্তু মেজাজের কোন অতলস্য অতলে খুব হালকা এক তিরতিরানি অনুভব করছি। হয়তো মলয়দাও। অ্যালেক্সের কাঁধে হাত রেখে মলয়দা হেসে উত্তর দিল— ‘ইয়োর কোয়েরি ডিমান্ডস নো আনসার।’
°°°
চিত্র: লেখক





