Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ভাষাশিক্ষা ও রবীন্দ্রনাথ

ভূমিকা

গ্রিক দর্শনে যেমন অ্যারিস্টটল, ভারতীয় দর্শনে তেমনি রবীন্দ্রনাথ। সুতরাং তাঁকে বাদ দিয়ে আমাদের সাহিত্য-দর্শন কিংবা ভাষাশিক্ষা কোনও মতেই ভাবা যায় না। মাতৃভাষার প্রতি কবিগুরুর অবিচল-অকৃত্রিম আনুগত্য ও অন্তরের আকর্ষণ আমাদের অবিদিত নয়। ভাষাচিন্তায়— দীর্ঘকালীন এবং অকপট ও একনিষ্ঠ শ্রম, সর্বোপরি এর সঙ্গে স্বকীয় স্বাধীনচিন্তা ও কল্পনার সমন্বয় রবীন্দ্রনাথকে এই নিরেট ও আনন্দঘন শ্রম গ্রহণে অনুপ্রাণিত করে বলে অনুমান করা যায়। মরমী কবিচিত্তের আধিভৌতিক অনুরাগ— যা ভাষাবিজ্ঞানের মত নিরেট-নীরস বিষয়ও যাকে নিছক বালুর মত শুকনো বলে বর্ণনা করা হয়, তাকে যথার্থ আনন্দের বিষয়ে পরিণত করে তোলে। এতে করে সাহিত্যচর্চায় নিমগ্ন থেকেও রবীন্দ্রনাথ মানুষের ভাষার মত মহৎ বিষয়ের পঠনপাঠনে এগিয়ে আসেন। ‘শিক্ষা’ (১৯০৮), ‘ইংরেজি সহজ শিক্ষা’ (১৯০৮), ‘শব্দতত্ত্ব’ (১৯০৯), ‘জীবনস্মৃতি’ (১৯১২), ‘কালান্তর’ (১৯৩৭), ‘বাংলা ভাষার পরিচয়’ (১৯৩৮), ‘ছেলেবেলা’ (১৯৪০) ইত্যাদি গ্রন্থ ছাড়াও বিভিন্ন কবিতা-গান, গল্প, চিঠিপত্র ও অভিভাষণে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তাঁর ভাষাশিক্ষা চিন্তা ও পর্যবেক্ষণ।
প্রথম নিখিল ভারতীয় ভাষাতাত্ত্বিক সম্মেলনে (পুনা, ১৯৭০) ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় সভাপতির ভাষণের শেষাংশে বলেন:
‘উতত্বঃ পশ্যন্ ন দদর্শ বাচম্ / উতত্ব শৃন্বন্ ন শৃণোত্যেনম্ /
উতো ত্বস্মৈ তন্বং বি সস্রে/ জায়ে পত্য উশতী সুবাসাঃ।।’
(বাক্-কে কেউ দেখেও দেখে না; কেউ শুনেও শোনে না। পক্ষান্তরে ইনিই তাঁর কাছে আপন তনুকে প্রকাশ করেন, যেমন করে কামোদ্দীপ্তা সুবেশিনী তার দয়িতের কাছে তনু উন্মোচিত করে।)
সকল তরুণ কর্মীর কাছে আমি এই প্রত্যাশাই রেখে যেতে চাই যেন তাঁরা এই রোমান্টিক অনুরাগের অনুভূতিটুকু কর্ষণ করে তার আনন্দ নির্যাসটুকু গ্রহণ করতে পারেন।’ (সুনীতিকুমার, ১৯৭৩: ১৬)। রোমান্টিক কবি রবীন্দ্রনাথ যথার্থভাবেই তা যে পেরেছিলেন অনেক পূর্বেই— একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। কেননা সুনীতিকুমারও অনেক আগেই স্বীকার করে নিয়েছেন: ‘But the first Bengali with the scientific insight to attack the problems of the language was the poet Rabindranath Tagore ; and it is flattering for the votaries of Philology to find in one who is the greatest writer in the language, and a great poet and seer for all time, a keen philologist as well, distinguished alike by an assiduous enquiry into the facts of the language and by a scholarly appreciation of the methods and findings of the modern western philologist.’ (Suniti kumar, 2002: p.xvi).
তাই বলে ভাষাতাত্ত্বিক রবীন্দ্রনাথের স্বরূপ বিশ্লেষণ আমাদের বর্তমান লক্ষ্য নয়। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না রবীন্দ্রনাথের ভাষা ও ব্যাকরণ বিষয়ক চিন্তা বা ভাষাচিন্তার সূত্রপাত বিদেশি বন্ধুকে বাংলা ভাষা শিক্ষা দিতে গিয়ে। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের ভাষাচিন্তা ও ভাষাশিক্ষা-চিন্তা একই সুতোয় বাঁধা।

বাংলা ভাষাশিক্ষা

ভাষাশিক্ষা দান, বিশেষ করে ভাষার প্রায়োগিক দিক নিয়ে রবীন্দ্রনাথ সচকিত হয়ে ওঠেন লন্ডনে ড. স্কটের কন্যাকে বাংলা শেখাতে গিয়ে মাত্র সতেরো-আঠারো বছর বয়সে। বাংলা ভাষা সম্বন্ধে তাঁর প্রথম প্রবন্ধ ‘বাংলা উচ্চারণ’ (১৮৮৫) ‘বালক’ পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও তাঁর এ ব্যাপারে চিন্তাভাবনা ১৮৭৮-৭৯ থেকেই সঞ্চিত হতে থাকে (মনসুর, ২০১১: ৩১২)। রবীন্দ্রনাথের অজানা থাকার কথা নয় প্রাচীন ভারতবর্ষে অর্থাৎ বৈদিক কালে বেদাঙ্গ হিসেবে ব্যাকরণে ধ্বনিতত্ত্বের আলোচনা অন্তর্ভুক্ত হত ‘শিক্ষা’ শাস্ত্রে। একারণেই যেন বাংলা ভাষার শিক্ষক রবীন্দ্রনাথের ধ্বনিতাত্ত্বিক এই রচনার ভূমিকায় বাংলা ভাষা শিক্ষার সমস্যা আলোচনার পাশাপাশি তুলনামূলক আলোচনায় ইংরেজি ভাষা শিক্ষার প্রসঙ্গও এসে যায়: ‘ইংরেজি শিখিতে আরম্ভ করিয়া ইংরেজি শব্দের উচ্চারণ মুখস্থ করিতে গিয়াই বাঙালির ছেলের প্রাণ বাহির হইয়া যায়। প্রথমত ইংরেজি শব্দের নাম এক রকম, তাহার কাজ আর-এক রকম। অক্ষর দুইটি যখন আলাদা হইয়া থাকে তখন তাহারা এ বি, কিন্তু একত্র হইলেই তাহারা অ্যাব্ হইয়া যাইবে, ইহা কিছুতেই নিবারণ করা যায় না। … আমাদের কখগঘ-র কোনো বালাই নাই। তাহাদের কথার নড়চড় হয় না। … তার পরে আবার এক অক্ষরের পাঁচ রকম উচ্চারণ। অনেক কষ্টে যখন বি এ=বে, সি এ=কে মুখস্থ হইয়াছে, তখন শুনা গেল বি এ বি=ব্যাব্, সি এ বি=ক্যাব্ । তাও যখন মুখস্থ হইল তখন শুনি বি এ আর=বার্, সি এ আর=কার্। তাও যদি বা আয়ত্ত হইল তখন শুনি বি এ ডবল-এল্=বল্, সি এ ডবল-এল্=কল্। এই অকূল বানান-পাথারের মধ্যে গুরুমহাশয় যে আমাদের কর্ণ ধরিয়া চালনা করেন, তাঁহার কম্পাসই বা কোথায়, তাহার ধ্রুবতারাই বা কোথায়।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৩৫: ১৫)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তৎকালীন বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা তথা ভাষাশিক্ষা দেখে তাঁর ব্যাকরণ-জিজ্ঞাসার সূচনা-পর্বেই উপলব্ধি করতে পারেন: ‘আমরা যেমন বিদ্যালয়ে ভারতবর্ষের ইতিহাস নাম দিয়া মহম্মদ ঘোরী বাবর হুমায়নের ইতিহাস পড়ি, তাহাতে অতি অল্প পরিমাণে ভারতবর্ষ মিশ্রিত থাকে; তেমনই আমরা বাংলা ব্যাকরণ নাম দিয়া সংস্কৃত ব্যাকরণ পড়িয়া থাকি, তাহাতে অল্প পরিমাণ বাংলার গন্ধ মাত্র থাকে। এরূপ বেনামিতে বিদ্যালাভ ভালো কি মন্দ তাহা প্রচলিত মতের বিরুদ্ধে বলিতে সাহস করি না, কিন্তু ইহা যে বেনামি তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৩৫: ১২২)। এই ‘বেনামিতে’ ব্যাকরণ শিক্ষার বেদনা তাঁকে তাড়িত করেছে প্রবলভাবে, তাই তিনি বৈয়াকরণের অকারণ অহঙ্কারে নয়, প্রাণ-প্রকাশের অনিবার্য তাগিদে অনুভব করতে চেয়েছেন সেই মাতৃভাষাকে, যে ভাষা কেবল বস্তুকে রূপ দেয় না কল্পনাকেও মূর্ত করতে সমান দক্ষ। (নরেন, ২০১১: ৫৪)। রবীন্দ্রনাথের ভাষাশিক্ষা ভাবনার ভিত্তিমূলে ক্রিয়াশীল অন্যতম সুর এটি। ‘চিত্রা’ (১৮৯৬) কাব্যগ্রন্থের ‘এবার ফিরাও মোরে’ কবিতাতেও ধ্বনিত হয়েছে সে সুর— ‘এই সব মূঢ় ম্লান মূক মুখে/ দিতে হবে ভাষা।’ অথচ, সে-সময়ে মাতৃভূমিতে মাতৃভাষা শিক্ষা দিচ্ছেন যে সব ভাষা-শিক্ষক বা বৈয়াকরণ তাঁদের অবস্থা এবং ছাত্রসমাজে তাঁর প্রভাব কেমন কবিগুরুর তা অজানা নয়। সেই অবস্থার নিখুঁত বাণীচিত্রই তো কবি এঁকেছেন তাঁর ‘সোনার তরী’ (১৮৯৪) কাব্যগ্রন্থের ‘পুরস্কার’ কবিতার কয়েকটি পঙ্‌ক্তিতে—
‘আসে গুটি গুটি বৈয়াকরণ/… প্রখরমূর্তি অগ্নিশর্ম,/ ছাত্র মরে আতঙ্কে।/ কোনো দিকে কোনো লক্ষ না করে/ পড়ি গেল শ্লোক বিকট হাঁ করে,/ মটর কড়াই মিশায়ে কাঁকরে/ চিবাইল যেন দাঁতে।/ কেহ তার নাহি বুঝে আগুপিছু,/ বসে বসি থাকে মাথা করি নিচু/ রাজা বলে, ‘এরে দক্ষিণা কিছু/ দাও দক্ষিণ হাতে।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৮৯৪: ১২৭)।
সুতরাং সে-সময়ে ভাষাশিক্ষার ছাত্র মাত্রেই আতঙ্কে মৃতপ্রায় বা ব্যাকরণভীরু। রবীন্দ্র-আলোচক যথার্থই বলেন, ‘শৈশব-কৈশোরকালীন “ব্যাকরণভীরু” কবি পরে “ব্যাকরণভাবুক”-এ পরিণত হন।’ (মনিরুজ্জামান, ২০১২: ৭৯)। কিন্তু তাঁর ব্যাকরণভাবনার মূলে যে বাঙালিকে বাংলা ভাষা শিক্ষা দেওয়া তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ আমরা জানি, তাঁর আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা: ‘বাংলাদেশে প্রচলিত প্রাকৃত ভাষাগুলির একটি তুলনামূলক ব্যাকরণ যদি লিখিত হয়, তবে বাংলা ভাষা বাঙালির কাছে ভালো করিয়া পরিচিত হইতে পারে।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৩৫: ১২৩)। বাংলা ভাষাকে ভাল করে পরিচিত করা বা বাঙালিকে সহজ করে শেখানোর জন্যই তিনি বাংলা ব্যাকরণ রচনার কথা ভেবেছেন।
‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধেও দেখা যায় আমাদের ভাষাশিক্ষা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের স্পষ্ট অবলোকন আর আক্ষেপ: ‘ছেলেদের এমন করিয়া বাংলা শেখানো হয় না যাহাতে তাহারা আপন ইচ্ছায় ঘরে বসিয়া কোনো বাংলা কাব্যের যথার্থ স্বাদ গ্রহণ করিতে পারে। আবার দুর্ভাগারা ইংরেজিও এতটা জানে না যাহাতে ইংরেজি বাল্যগ্রন্থের মধ্যে প্রবেশ লাভ করে। বিশেষত, শিশুপাঠ্য ইংরেজি গ্রন্থে এরূপ খাস ইংরেজি, তাহাতে এতো ঘরের গল্প, ঘরের কথা যে, বড়ো বড়ো বি.এ. এম.এ.-দের পক্ষেও তাহা সকল সময় সম্পূর্ণরূপে আয়ত্তগম্য হয় না।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৫৩৭)। স্বদেশের ইংরেজি ভাষাশিক্ষার শিক্ষক সম্পর্কেও তাঁর অব্যর্থ অবলোকন: ‘ইংরাজি ভাষা ভাব আচার ব্যবহার এবং সাহিত্য তাদের নিকট কখনোই সুপরিচিত নহে। তাহারাই ইংরাজির সহিত আমাদের প্রথম পরিচয় সংঘটন করাইয়া থাকে। তাহারা না জানে ভালো বাংলা, না জানে ভালো ইংরাজি: কেবল তাহাদের একটা সুবিধা এই যে, শিশুদিগকে শিখানো অপেক্ষা ভুলানো ঢের সহজ কাজ এবং তাহাতে তাহারা সম্পূর্ণ কৃতকার্যতা লাভ করে।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৫৩৮)।
যে দেশে মাতৃভাষা এবং ইংরেজি ভাষার শিক্ষকের এই অবস্থা, সে দেশের শিক্ষার্থীর অবস্থাও সহজেই অনুমেয়। রবীন্দ্রনাথ সে বাণীচিত্র আঁকতেও ভোলেননি: ‘বাঙালির ছেলের মতো এমন হতভাগ্য আর কেহ নাই। অন্য দেশের ছেলেরা যে বয়সে নবোদ্গত দন্তে আনন্দমনে ইক্ষু চর্বণ করিতেছে, বাঙালির ছেলে তখন ইস্কুলের বেঞ্চির উপর কোঁচা-সমেত দুইখানি শীর্ণ খর্ব চরণ দোদুল্যমান করিয়া শুদ্ধমাত্র বেত হজম করিতেছে, মাস্টারের কটু গালি ছাড়া তাহাতে আর কোনোরূপ মশলা মিশানো নাই।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৫৩৭)। এই দুর্ভাগা ছেলেদের জন্য রবীন্দ্রনাথের অন্তহীন আক্ষেপও অব্যক্ত থাকে না : ‘যদি কেবল বাংলা শিখিত তবে রামায়ণ মহাভারত পড়িতে পাইত; যদি কিছুই না শিখিত তবে খেলা করিবার অবসর থাকিত— গাছে চড়িয়া, জলে ঝাঁপাইয়া, ফুল ছিড়িয়া, প্রকৃতি জননীর উপর সহস্র দৌরাত্ম্য করিয়া শরীরের পুষ্টি, মনের উল্লাস এবং বাল্যপ্রকৃতির পরিতৃপ্তি লাভ করিতে পারিত। আর ইংরাজি শিখিতে গিয়া না হইল শেখা, না হইল খেলা, প্রকৃতির সত্যরাজ্যে প্রবেশ করিবারও অবকাশ থাকিল না, সাহিত্যের কল্পনারাজ্যে প্রবেশ করিবারও দ্বার রুদ্ধ রহিল।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৫৩৯)। এভাবে বিদেশি ভাষাশিক্ষার দৌড়ে মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির সংস্কৃতি ভুলে আমাদের নবীন প্রজন্ম কতটা সংকীর্ণচিত্ত আর বেপরোয়া হয়ে উঠছে সে সম্পর্কে সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে আমরা সকলেই অবগত। অথচ তার চমৎকার সমাধান রবীন্দ্রনাথে— রবীন্দ্রনাথ যেন আজও আমাদের প্রশ্ন করে চলছেন প্রতিনিয়ত: ‘…বিদেশী ভাষার ব্যাকরণ এবং অভিধানের মধ্যে। যাহার মধ্যে জীবন নাই, আনন্দ নাই, অবকাশ নাই, নবীনতা নাই, নড়িয়া বসিবার একতিল স্থান নাই, তাহারই অতি শুষ্ক কঠিন সংকীর্ণতার মধ্যে। ইহাতে কি সে ছেলের কখনো মানসিক পুষ্টি, চিত্তের প্রসার, চরিত্রের বলিষ্ঠতা লাভ করিতে পারে? … সে কি কেবল মুখস্থ করিতে, নকল করিতে এবং গোলামি করিতে শেখে না?’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৫৩৮)। আফসোস, আজও আমাদের অগোচরে আছে যেন রবীন্দ্রনাথের অলঙ্ঘনীয় সিদ্ধান্ত: ‘বাল্যকাল হইতে যদি ভাষাশিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ভাবশিক্ষা হয় এবং ভাবের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত জীবনযাত্রা নিয়মিত হইতে থাকে তবেই আমাদের সমস্ত জীবনের মধ্যে একটা যথার্থ সামঞ্জস্য স্থাপিত হইতে পারে, আমরা বেশ সহজ মানুষের মতো হইতে পারি।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৫৪২)।
আনন্দহীন ইংরেজি ভাষাশিক্ষা যে মানুষকে সভ্যতার প্রতিও কী পরিমাণ বীতশ্রদ্ধ করে তুলতে পারে, তার প্রমাণ দিতে রবীন্দ্রনাথ নিজের জীবন থেকে বাস্তব উদাহরণ উপস্থাপন করেন: ‘তখন আমরা ইংরেজি শিখিতে আরম্ভ করিয়াছি। … সন্ধ্যার সময় তিনি আমাদিগকে পড়াইতে আসিতেন। কাঠ হইতে অগ্নি উদ্ভাবনটাই মানুষের পক্ষে সকলের চেয়ে বড় উদ্ভাবন, … কিন্তু সন্ধ্যাবেলায় পাখিরা আলো জ্বালিতে পারে না, এটা যে পাখির বাচ্চাদের পরম সৌভাগ্য, এ কথা আমি মনে না করিয়া থাকিতে পারি না। তাহারা যে ভাষা শেখে সেটা প্রাতঃকালেই শেখে এবং মনের আনন্দে শেখে, সেটা লক্ষ্য করিয়া থাকিবেন। অবশ্য, সেটা ইংরেজিভাষা নয়, একথাও স্মরণ করা উচিত। … বাঙালি ছেলেকে ইংরেজি পড়াইবার ভার যদি স্বয়ং বিষ্ণুদূতের উপরেও দেওয়া যায়, তবু তাহাকে যমদূত বলিয়া মনে হইবেই, তাহাতে সন্দেহ নাই।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯১২: ৩০-৩১)। বাঙালির ছেলের ইংরেজি ভাষাশিক্ষাকে তিনি তাই তো আঠেরো শতকের বাংলায় মারাঠি দস্যুসৈন্য বা বর্গির উপদ্রবের সঙ্গে তুলনা করে ঘুমপাড়ানী গান বদল করা সংগত মনে করেছেন; লিখেছেন:
‘ছেলে ঘুমোল পাড়া জুড়োল/ ফাস্টবুক এল দেশে—/ বানান-ভুলে মাথা খেয়েছে/একজামিন দেবো কিসে।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৩৫: ১৬)।
ভাষাশিক্ষাকে আনন্দদায়ক করতে ও মুখস্থ নির্ভরতাকে পরিহার করতে রবীন্দ্রনাথ প্রয়োজনীয় শিক্ষার সঙ্গে সাহিত্যের সম্মিলনের কথা বলেছেন: ‘অত্যাবশ্যক শিক্ষার সহিত স্বাধীন পাঠ না মিশাইলে ছেলে ভালো করিয়া মানুষ হইতে পারে না— বয়ঃপ্রাপ্ত হইলেও বুদ্ধিবৃত্তি সম্বন্ধে সে অনেকটা পরিমাণ বালক থাকিয়াই যায়।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৫৩৭)। তিনি নিজেও শৈশবে বর্ণপরিচয় পড়তে গিয়ে ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’-র মধ্যে সাহিত্য পাঠের স্বাদ পাওয়ার কথা স্মরণ করেছেন। কিন্তু পাঠ্যপুস্তকের সাহিত্য শিক্ষার্থীর উপযোগী না হলে কী বিড়ম্বনার সৃষ্টি হয়, তার উপমা দিতেও ভুলে যাননি: ‘ভাষা শিখাইবার জন্য ভালো কাব্য পড়াইলে তরবারি দিয়া ক্ষৌরি করাইবার মতো হয়— তরবারির তো অমর্যাদা হয়ই, গণ্ডদেশেরও বড় দুর্গতি ঘটে। কাব্য-জিনিসটাকে রসের দিক হইতে পুরাপুরি কাব্য হিসাবেই পড়ানো উচিত, তাহার দ্বারা ফাঁকি দিয়া অভিধান-ব্যাকরণের কাজ চালাইয়া লওয়া কখনোই সরস্বতীর তুষ্টিকর নহে।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯১২: ৪০)। বলা বাহুল্য, একথা বিদেশি ভাষার সাহিত্য প্রসঙ্গেও প্রযোজ্য। একই সঙ্গে বিদেশি ভাষা শেখার প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি কথোপকথনের ভেতর দিয়ে ভাষা শেখানোর পক্ষে। ফলে বিদেশি সাহিত্যচর্চার প্রয়োজনীয়তাও স্মরণ করেছেন। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে এক পত্রে তাই রবীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘মাঝে মাঝে ইংরেজি নাটক অভিনয় ভাষাশিক্ষার পক্ষে উপযোগী একথা যেন মনে থাকে— অবশ্য এই সুযোগে উচ্চারণ এবং একসেন্টের ওপর দৃষ্টি রাখা উচিত।’ (উদ্ধৃত, সুব্রত, ২০০৫: ২৫)। অর্থাৎ ভাষাশিক্ষাকে রবীন্দ্রনাথ পাঠ্যপুস্তক আর ব্যাকরণ-অভিধান থেকে মুক্তি দিয়ে সাহিত্যের অভিসারে অগ্রসর হতে প্রেরণা যুগিয়েছেন।

ইংরেজি ভাষাশিক্ষা

বিশ্বকবি বিশ্বের খোলা আকাশের পানে চেয়ে বিদেশি ভাষা শেখার কথা বলেছেন, তবে মাতৃভূমিতে দাঁড়িয়ে মায়ের ভাষাকে ভুলে নয়। ‘জীবনস্মৃতি’-তে তাই তিনি স্মরণ করেছেন, ‘তখনো ইংরেজি শব্দের বানান আর মানে-মুখস্থর বুক-ধড়াস্ সন্ধেবেলার ঘাড়ে চেপে বসেনি। সেজদাদা বলতেন, আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, তার পরে ইংরেজি শেখার পত্তন।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৪০: ১৭)। তার কারণ সম্পর্কেও রবীন্দ্রনাথ সচেতন। স্বকীয় কবিত্বশক্তি দিয়ে উপমাসহ তাই তাঁর অভিমত দিয়েছেন: ‘শিক্ষা জিনিসটা যথাসম্ভব আহার-ব্যাপারের মতো হওয়া উচিত। খাদ্যদ্রব্যে প্রথম কামড়টা দিবামাত্রেই তাহার স্বাদের সুখ আরম্ভ হয়, পেট ভরিবার পূর্ব হইতেই পেটটি খুশি হইয়া জাগিয়া উঠে— তাহাতে তাহার জারক রসগুলির আলস্য দূর হইয়া যায়। বাঙালির পক্ষে ইংরেজি শিক্ষায় এটি হইবার জো নাই। তাহার প্রথম কামড়েই দুইপাটি দাঁত আগাগোড়া নড়িয়া উঠে— মুখবিবরের মধ্যে একটা ছোটোখাটো ভূমিকম্পের অবতারণা হয়। … অবশেষে বহুকষ্টে অনেক দেরিতে খাবারের সংগে যখন পরিচয় ঘটে তখন ক্ষুধাটাই যায় মরিয়া। প্রথম হইতেই মনটাকে চালনা করিবার সুযোগ না পাইলে মনের চলৎশক্তিতেই মন্দা পড়িয়া যায়।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯১২: ৪১)। এর সমাধানও পাই তাঁর লেখায়। যাতে করে আমাদের ভাষাশিক্ষার্থীর অবস্থা গল্পের তোতাপাখির মত না হয়ে রবীন্দ্রনাথের মত হয়। নিজ জীবনের উদাহরণ দিয়ে তিনি স্মরণ করেন: ‘তখন যিনি সাহস করিয়া আমাদিগকে দীর্ঘকাল বাংলা শিখাইবার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন, সেই আমার স্বর্গগত সেজদাদার (হেমেন্দ্রনাথের) উদ্দেশে সকৃতজ্ঞ প্রণাম নিবেদন করিতেছি।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯১২: ৪১)। আমাদের আক্ষেপ হয় আজও অতটুকু সাহস সঞ্চয় করতে আমরা কুণ্ঠিত, স্বভাষার প্রতি সকৃতজ্ঞ শ্রদ্ধা-সম্মান প্রদর্শনে লজ্জিত-আড়ষ্ট।
ইংরেজি শিক্ষার সমস্যা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ স্মরণ করেছেন: ‘ছেলেবেলা যখন ইংরেজি মাস্টারের কাছে ইংরেজি শব্দের ইংরেজি মুখস্থ করিতে হইত তখন I শব্দের একটা প্রতিশব্দ বহু কষ্টে কণ্ঠস্থ করিয়াছিলাম, সে হইতেছে : Myself— I, by Myself I । ইংরেজি এই I শব্দের প্রতিশব্দটি আয়ত্ত করিতে কিছুদিন সময় লাগিয়াছে ; … কিন্তু ওটাকে কণ্ঠস্থ করিতে যদি আমাদের দুইশো বছর লাগিয়া থাকে ওটাকে সম্পূর্ণ বহিষ্কৃত করিতে তার ডবল সময়েও কুলায় কি না সন্দেহ করি।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৬৫২)। ইংরেজি শিক্ষা সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য: ‘এক তো ইংরাজি ভাষাটা অতিমাত্রায় বিজাতীয় ভাষা। … আগাগোড়া কিছুই পরিচিত নহে, সুতরাং ধারণা জন্মিবার পূর্বেই মুখস্থ আরম্ভ করিতে হয়। তাহাতে না চিবিয়া গিলিয়া খাইবার ফল হয়।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৫৩৮)। একথা শুধু ইংরেজি নয়, ইংরেজি-আরবি সকল বিদেশি ভাষাশিক্ষার বেলাতেই একই দশা। এভাবে না বুঝে মুখস্থ করে আত্মার অকালমৃত্যুর চিত্রই যেন ধরা পড়েছে তোতাকাহিনী গল্পে: ‘রাজা মন্ত্রীকে ডাকিয়া বলিলেন, “পাখিটাকে শিক্ষা দাও।” রাজার ভাগিনাদের উপর ভার পড়িল পাখিটাকে শিক্ষা দিবার। … ভাগিনা বলিল, “মহারাজ, পাখিটার শিক্ষা পুরা হইয়াছে।” … পাখি আসিল। … রাজা পাখিটাকে টিপিলেন, সে হাঁ করিল না, হুঁ করিল না। কেবল তাহার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো পাতা খসখস্ গজগজ্ করিতে লাগিল।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৫৩: ১৩২-১৩৫)। আমাদের পুঁথিগত শিক্ষার খসখসানি-গজগজানি এখানে স্পষ্ট হলেও ভাষাশিক্ষার বর্ণনা আরও স্পষ্ট মনে হয় দুই পাখির কথোপকথনে:
‘বনের পাখি গাহে বাহিরে বসি বসি/ বনের গান যত,/ খাঁচার পাখি পড়ে শিখানো বুলি তার—/ দোঁহার ভাষা দুইমত।/ … এমনি দুই পাখি দোঁহারে ভালোবাসে/ তবুও কাছে নাহি পায়।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৮৯৪: ৪৯-৫০)।
মনে হয় যেন বিদ্যের ভাষাশিক্ষায় শিক্ষিত পাখিটি প্রকৃতির ভাষা এবং দেশের প্রাকৃত জনের ভাষাটাই ভুলে যায়; তাই তো কোনও মতে বেঁচে থাকলেও তাকে হাহাকার করতে হয়: ‘হায়,/ মোর শকতি নাহি উড়িবার।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৮৯৪: ৫০)। রবীন্দ্রনাথের ভাষাশিক্ষার মূলে সেই মুক্ত আকাশে উড়বার শক্তির অন্বেষণ অবিরাম। কেননা, ‘রবীন্দ্রনাথ তোতাপাখি না হয়ে বনের পাখির মতো সুর সেধেছেন।’ (মনিরুজ্জামান, ২০১২: ৮৬)। রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন: ‘আমাদের নীরস শিক্ষায় জীবনের সেই মাহেন্দ্র ক্ষণ অতীত হইয়া যায়। … যখন ইংরাজি ভাবরাজ্যের মধ্যে প্রবেশ করি তখন আর সেখানে তেমন যথার্থ অন্তরঙ্গের মতো বিহার করিতে পারি না; বক্তৃতায় এবং লেখায় ব্যবহার করি, কিন্তু জীবনের কার্যে পরিণত করিতে পারি না।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৫৪১)। একই কথাই পুনর্ব্যক্ত হয়েছে বিদায় অভিশাপ কাব্যনাট্যে। আমাদের মাতৃভাষা-সংস্কৃতিরূপ দেবযানী যেন বাঙালি-সংস্কৃতিবিমুখ বিদেশিভাষা শিক্ষার্থী কচকে অভিশাপ দেয়—
‘তোমা পরে/ এই মোর অভিশাপ— যে বিদ্যার তরে/ মোরে করো অবহেলা, সে বিদ্যা তোমার/ সম্পূর্ণ হবে না বশ; তুমি শুধু তার/ ভারবাহী হয়ে রবে, করিবে না ভোগ;/ শিখাইবে, পারিবে না করিতে প্রয়োগ।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৮৪: ৩৩৭)।
আজও আমাদের বাংলাদেশে না আছে ভাষানীতি, না আছে ভাষাপরিকল্পনা কিংবা ভাষাশিক্ষার প্রয়োগ। আমাদের বর্তমান শিক্ষানীতিতে (২০১০) আঠাশটি অধ্যায়ের মধ্যে: বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, প্রকৌশলশিক্ষা, চিকিৎসা-সেবা ও স্বাস্থ্য শিক্ষা, বিজ্ঞান শিক্ষা, তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষা, ব্যবসায় শিক্ষা, কৃষি শিক্ষা, আইন শিক্ষা, চারুকলা ও সুকুমার বৃত্তি শিক্ষা, ক্রীড়াশিক্ষা ইত্যাদি পৃথক অধ্যায় থাকলেও ভাষাশিক্ষা কিংবা সাহিত্য-শিক্ষা বিষয়ে কোনও অধ্যায় দূরের কথা কোনও দিকনির্দেশনাও নেই। এমনকি, আমাদের শিক্ষার্থীদের ইংরেজি শিক্ষা— দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে নাকি বিদেশি ভাষা হিসেবে তাও আজও নির্ধারিত হয়নি। ফলত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ভাষাশিক্ষায় গলদের কারণে বা শিক্ষার মাধ্যম ভাষার সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গঠনের অভাবে— এই একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসেও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি বা বিজ্ঞানমনস্কতায় নিদারুণ খরা দেখছি। অনেক বিজ্ঞানের শিক্ষক স্বয়ং বস্তুবিশ্বের গতিময়তার ধর্ম তথা বিবর্তনবাদ মন থেকে মানতে পারেন না। তার কারণ ‘সে শিক্ষা কেবল যে আমাদিগকে কেরানিগিরি অথবা কোনো একটা ব্যবসায়ের উপযোগী করে মাত্র।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৫৪২)। শুধু তাই নয়, আজও আমাদের শিক্ষার্থীর দিকে নজর দিলে দেখা যাবে রবীন্দ্রনাথের পর্যবেক্ষণ কতটা আধুনিক: ‘তাহাদের গ্রন্থজগৎ এক প্রান্তে আর তাহাদের বসতি অন্য প্রান্তে, মাজখানে কেবল ব্যাকরণ অভিধানের সেতু। এজন্যই দেখা যায় একই লোক একদিকে য়ুরোপীয় দর্শন বিজ্ঞান এবং ন্যায়শাস্ত্রে সুপণ্ডিত, অন্যদিকে চির কুসংস্কারগুলিকে সযত্নে পোষণ করিতেছেন।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৫৪২)। অথচ, ‘বাল্যকাল হইতে যদি ভাষাশিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ভাব শিক্ষা হয়’, তবে এমনটা হবার কথা নয়। চিন্তাশক্তি এবং কল্পনাশক্তি মানুষের মতো মানুষ হবার জন্য অত্যাবশ্যক। আর বাল্যকাল থেকে চিন্তা ও কল্পনার চর্চা না করলে কাজের সময় তা মেলে না এবং অনভ্যস্থ মানুষরূপীগণ তা মেনে নিতেও পারে না। ‘কিন্তু আমাদের বর্তমান শিক্ষায় সে পথ একপ্রকার রুদ্ধ। আমাদিগকে বহুকাল পর্যন্ত শুধুমাত্র ভাষাশিক্ষায় ব্যাপৃত থাকিতে হয়।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৫৪০)। ভাষাশিক্ষার গোড়ায় গলদ থাকার কারণেই আমাদের জীবনের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক গড়ে ওঠে না; এতে করে ‘সেই বিদ্যাটার প্রতিই আগাগোড়া অবিশ্বাস ও অশ্রদ্ধা জন্মিতে থাকে। মনে হয়, ও জিনিসটা কেবল ভুয়া এবং সমস্ত য়ুরোপীয় সভ্যতা ঐ ভুয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৫৪৩)।
আমাদের এই মারাত্মক ভুল দেখিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি, তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন: ‘সংগ্রহ করিতে শিখিলেই যে নির্মাণ করিতে শেখা হইল ধরিয়া লওয়া সেইটেই একটা মস্ত ভুল। … সংগ্রহযোগ্য জিনিসটা যখনই হাতে আসে তাহার ব্যবহারটি জানা, তাহার প্রকৃত পরিচয়টি পাওয়া, জীবনের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের আশ্রয়স্থলটি গড়িয়া তোলাই রীতিমত শিক্ষা।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৫৪০)। শিক্ষাকে জীবনে প্রয়োগ করতে সক্ষম হবার সম্ভাবনা-সূত্রও রবীন্দ্রনাথ বাতলেছেন: ‘বালক অল্পমাত্রও যেটুকু শিখিবে তখনই তাহা প্রয়োগ করিতে শিখিবে, তাহা হইলে শিক্ষা তাহার উপর চাপিয়া বসিবে না; শিক্ষার উপরে সেই চাপিয়া বসিবে।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৫৮৮)। সুতরাং শিক্ষার্থীকে ব্যক্তিত্ববান মানুষ করতে চাইলে ছেলেবেলা থেকেই তাকে মানুষ করতে শুরু করতে হবে। স্মরণশক্তির উপর সমস্ত ভর দিয়ে চিন্তাশক্তি ও কল্পনাশক্তির ব্যবহার না করলে ছেলেমানুষ কখনও ব্যক্তিত্ববান মানুষ হতে পারবে না। ‘পরশপাথর’ কবিতায় যেন সে-চিত্রই এঁকেছেন কবি—
‘খ্যাপা খুঁজে খুঁজে ফিরে পরশপাথর।/ … দশা দেখে হাসি পায়/ আর কিছু নাহি চায়,/ একেবারে পেতে চায় পরশপাথর!/ … কাম্য ধন আছে কোথা/ জানে যেন সব কথা,/ সে-ভাষা যে বোঝে সেই খুঁজে নিতে পারে।/ … কেবল অভ্যাসমত/ নুড়ি কুড়াইত কত,/ ঠন করে ঠেকাইত শিকলের পর,/ চেয়ে দেখিত না, নুড়ি/ দূরে ফেলে দিত ছুঁড়ি,/ কখন ফেলেছে ছুঁড়ে পরশপাথর।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৮৯৪: ৪২-৪৩)।
আমাদের ভাষাশিক্ষা আর পরীক্ষা পাস করাও যেন একই সূত্রে গাঁথা। সন্ন্যাসীর কোমরের লোহার শেকল সোনা হওয়ার মত আমাদের পরীক্ষা পাস হয়— সোনার মেডেল মেলে কিন্ত ভাষা আয়ত্তকরণের জ্ঞানরূপ পরশপাথর অধরাই থেকে যায়। কেননা, পরশপাথর— যার পরশে এজীবনে ফলত সোনা তা ‘সেই খুঁজে নিতে পারে’, ‘সে-ভাষা যে বোঝে’। অর্থাৎ ভাষা বুঝিনি বলে জীবনে ভাষাশিক্ষার সার্থক প্রয়োগ বা ব্যবহার করতে পারি না।
আমাদের দেশে অতীতের ইংরেজি শিক্ষার প্রশংসাও করেছেন রবীন্দ্রনাথ: ‘আমাদের দেশেও ইংরেজি শিক্ষার আরম্ভদিনের কথা স্মরণ করিয়া দেখো। ডিরোজিও, কাপ্তেন রিচার্ডসন, ডেভিড হেয়ার, ইঁহারা শিক্ষক ছিলেন; শিক্ষার ছাঁচ ছিলেন না, নোটের বোঝাই বাহন ছিলেন না। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যূহ এমন ভয়ংকর পাকা ছিল না, তখন তাহার মধ্যে আলো এবং হাওয়া প্রবেশের উপায় ছিল; তখন নিয়মের ফাঁকে শিক্ষক আপন আসন পাতিবার স্থান করিয়া লইতে পারিতেন।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৬২৫)। আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না— রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি ভাষাশিক্ষার বিপক্ষে নন। কিন্তু তিনি বাংলাভাষাকে শিক্ষার বাহন করতে চেয়েছেন বাংলাদেশে। তাঁর আক্ষেপ যেন আজও ধ্বনিত হয়: ‘আমরা ভাষাতত্ত্ব মুখস্থ করিয়া পরীক্ষায় উচ্চ স্থান অধিকার করি; কিন্তু আমাদের নিজের মাতৃভাষা কালে কালে প্রদেশে প্রদেশে তেমন করিয়া যে নানা রূপান্তরের মধ্যে নিজের ইতিহাস প্রত্যক্ষ নিবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছে তাহা তেমন করিয়া দেখি না বলিয়াই ভাষারহস্য আমাদের কাছে সুস্পষ্ট হইয়া উঠে না।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৫৪৭)। আসলেই আমাদের ভাষারহস্য অস্পষ্ট বলেই যেন আমাদের দেশ, দেশপ্রেম, স্বকীয় সংস্কৃতি এমনকি জাতীয়তাবোধও অতটা অস্পষ্ট-অবহেলিত।

পাঠ্যবই রচয়িতা

শান্তিনিকেতন ব্রহ্মাচর্যাশ্রম বিদ্যালয়ের আচার্য ও অধ্যাপকরূপে রবীন্দ্রনাথ পাঠ-উপকরণের অভাব অনুভব করে ভাষাশিক্ষা বিষয়ক পাঠ্যবই রচনা করেন। প্রকাশকালের ক্রমধারায় তাঁর প্রথম ছাত্রপাঠ্য বই ‘সংস্কৃত শিক্ষা’ (১৮৯৬)। মাতৃভাষা-প্রেমিক বাঙালি কবির এই পুরাতন ও মৃতভাষা সংস্কৃত শেখানোর প্রয়াস দেখে আধুনিক রবীন্দ্রগবেষকগণ মনে করেন: ‘এ-সময়ে তিনি প্রবলভাবে হিন্দু এবং এমত তাঁর পরবর্তী কালের শিক্ষাচিন্তাকে প্রভাবিত করেছে। বিলেতি নয় ভারতীয় আদর্শেই তিনি শিক্ষাকে গড়ে তুলতে চেয়েছেন।’ (হুমায়ুন, ১৯৭৩: ১৩০)। আক্ষেপ হয় একুশ শতকেও আমরা ভারতীয় আর হিন্দুত্বকে একাকার করে দেখি বলে। রবীন্দ্রনাথ বিলেতি শিক্ষার অন্ধ-অনুকরণ মেনে নিতে চাননি, তিনি ভারতীয় সংস্কৃতির সম্মিলন চেয়েছেন। তার মানে এই নয় যে, তিনি হিন্দুধর্ম শিক্ষা দিতে চান; তাঁর প্রমাণ তিনি নিজেই বলেছেন: ‘ধর্মশিক্ষা ও বিদ্যাশিক্ষাকে জোর করিয়া মিলাইয়া রাখিতে গেলে হয় মূঢ়তাকে নয় কপটতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। … সাম্প্রদায়িক অতিনির্দিষ্টতায় সাংঘাতিক অকল্যাণ।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৬০৯)। সংস্কৃত ভাষাশিক্ষার কারণ সম্পর্কে বলতে হয়— বাংলাভাষার ইতিহাস সচেতন রবীন্দ্রনাথ জানতেন: ‘এ কথা স্বীকার করতেই হবে, সংস্কৃতের আশ্রয় না নিলে বাংলাভাষা অচল। কী জ্ঞানের কী ভাবের বিষয়ে বাংলা সাহিত্যের যতই বিস্তার হচ্ছে ততই সংস্কৃতের ভাণ্ডার থেকে শব্দ এবং শব্দ বানাবার উপায় সংগ্রহ করতে হচ্ছে। পাশ্চাত্ত্য ভাষাগুলিকেও এমনি করেই গ্রিক-ল্যাটিনের বশ মানতে হয়।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৫৩: ৩৯৪)। তাই বলে তিনি বাংলাকে সংস্কৃতের দুহিতা বলে মেনে নেননি। তিনি চেয়েছেন সংস্কৃতের শব্দভাণ্ডারে সমৃদ্ধ হয়ে বাংলাভাষাও তার সমকক্ষ সখী হয়ে উঠুক। অন্যদিকে, ইংরেজি ভাষাশিক্ষার বই রচনার কারণে অনেকে রবীন্দ্রনাথকে পাশ্চাত্য সাস্রাজ্যবাদী শক্তির দোসর কিংবা রাজ-শক্তির অনুগ্রহপ্রার্থী মনে করতে পারেন। এবিষয়েও তাঁর স্পষ্ট জবাব: ‘ইংরেজি আমাদের শেখা চাইই, শুধু পেটের জন্য নয়। কেবল ইংরেজি কেন, ফরাসি জর্মন শিখিলে আরও ভালো। সেই সঙ্গে এ কথাও বলাও বাহুল্য, অধিকাংশ বাঙালি ইংরেজি শিখিবে না।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৬৪২)। কেননা তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিতে ভুলে যাননি: ‘দূরদেশী ভাষার থেকে আমরা বাতির আলো সংগ্রহ করতে পারি মাত্র, কিন্তু আত্মপ্রকাশের জন্য প্রভাত-আলো বিকীর্ণ হয় আপন ভাষায়।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৭১৭)। এখানেই রবীন্দ্রনাথের ভাষাশিক্ষা চিন্তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। আমরা অনুধাবন করতে পারি তিনি চেয়েছেন, সংস্কৃত ভাষাশিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী যেন নিজের অতীত ঐতিহ্য-অহংকার সম্পর্কে অবগত হয়, তার মনোলোক যেন শিকড়বিহীন বৃক্ষ না হয়ে আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে গড়ে ওঠে। বিদেশি ভাষাশিক্ষার মাধ্যমে আধুনিক সভ্যতা আর বাস্তব জ্ঞান-বিজ্ঞানের সংস্পর্শে আসবে; তবে মাতৃভাষা আয়ত্তকরণের মাধ্যমেই যে এগুলোর সার্থক প্রয়োগ সম্ভব সে কথা কখনও ভুলে যাননি।
রবীন্দ্রনাথ প্রায় সত্তর বছর বয়সে প্রাথমিক শিক্ষার উপযোগী বাংলা পাঠ্যবই ‘সহজ পাঠ’ (১৯৩০) রচনা করেন। আধুনিক রবীন্দ্র-গবেষক যথার্থই বলেন, ‘সহজ পাঠ কবির হাতে লেখা বাংলা ভাষার পাঠ্যপুস্তক। কোনো ধর্মীয় বা নৈতিক তাগিদে তিনি এ পুস্তক লেখেননি। সাহিত্যগুণ এ পুস্তকের বিশেষত্ব এবং এতে কাজ করেছে কল্পনা, সৌন্দর্যবোধ, সুরুচি ও সংস্কৃতি।’ (আহমদ, ২০১১: ৫২১)। ‘ইংরেজি সহজ শিক্ষা’ গ্রন্থের ভূমিকাতেই লেখক স্পষ্ট করেন: ‘মুখস্থ করাইয়া শিক্ষা দেওয়া এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য নহে। শব্দ ও বাক্যগুলি নানা প্রকারে বার বার ব্যবহারের দ্বারা ছাত্রদের শিক্ষা অগ্রসর হইতে থাকিবে, ইহাই লেখকের অভিপ্রায়।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯০৯: ০৩)। রবীন্দ্রনাথ ভাষাশিক্ষাকে মুখস্থবিদ্যার হাত থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছেন। পরীক্ষা পাসকে শিক্ষা থেকে পৃথক করতে চেয়েছেন: ‘কেননা মুখস্থ করিয়া পাস করাইতো চৌর্যবৃত্তি।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৬৪৩)। রবীন্দ্র-সমালোচক যথার্থই বলেন, ‘মুখস্থ নয়, বরং চর্চা এবং অধিক চর্চার ভেতর দিয়ে আয়ত্ত করার বিষয়টিকে রবীন্দ্রনাথ গুরুত্ব দিয়েছিলেন সবচেয়ে বেশি।’ (সুব্রত, ২০১১: ৪৬)।

ভাষাশিক্ষা ও আয়ত্তকরণ

আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানীগণ মনে করেন, ‘শিশুদেরকে গণিত শিখতে হয়, কিন্তু ভাষার ব্যাপারটা শিশু নিজ থেকেই “রপ্ত” করে ফেলে। এই রপ্ত করার ব্যাপারটি যে শুধুমাত্র শিশুরাই স্বাভাবিকভাবে করে তাই নয় প্রাপ্ত-বয়স্করাও করে থাকে। এই প্রপঞ্চটিকে ভাষাবিজ্ঞানে বলা হয়েছে ভাষা আয়ত্তকরণ: language acquisition । (দানীউল, ২০০৭: ১২)। লক্ষণীয় যে রবীন্দ্রনাথের লক্ষ্য ছিল এই ভাষা আয়ত্তকরণ, ভাষাশিক্ষা: language learning নয়। তাই তো ব্রহ্মচর্যাশ্রমের ছাত্র অচ্যুতচন্দ্রের পিতা অক্ষয়চন্দ্র সরকারকে ১৯০৩ সালে রবীন্দ্রনাথ এক পত্রে লেখেন : ‘অচ্যুত ইংরাজি বাক্য রচনায় যে অক্ষম তাহা ত বোধ হয় না। তবে আপনাকে ভাবিয়া দেখিতে হইবে অনেক কথা যাহা বাংলায় সহজ তাহা ইংরাজিতে সহজ নহে। … দেখিতে হইবে তাহারা বাক্যবিন্যাসের সাধারণ নিয়মগুলি আয়ত্ত করিতে পারিতেছে কি না, বিশেষ প্রয়োগগুলি একে একে ক্রমে ক্রমে অভ্যাস হইতে থাকে।’ (উদ্ধৃত, সুব্রত, ২০০৫: ২৫)। আধুনিক বিদ্যায়তনে ভাষা আয়ত্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রথম ভাষা বা মাতৃভাষা (mother tongue), দ্বিতীয় ভাষা (second language) এবং বিদেশি ভাষা (foreign language) প্রসঙ্গ। এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রাগ্রসরতায় আমরা যেন ‘অবাক হয়ে রই’, যখন দেখি তাঁর স্থির সিদ্ধান্ত: ‘ইংরাজি ভাষাটা অতিমাত্রায় বিজাতীয় ভাষা। … তাহার ’পরে আবার ভাববিন্যাস এবং বিষয়প্রসঙ্গও বিদেশী।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৫৩৮)। রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি শিক্ষার বই আর তাঁর শিক্ষকতার কৌশল পাঠে আমাদের অনুমান করতে অসুবিধা হয় না, তিনি সুভর (L. Sauveur, ১৮২৬-১৯০৭) এবং তাঁর সমচিন্তার গবেষকগণের natural method & direct method সম্পর্কে অবগত ছিলেন। হাজার বছরের পুরাতন grammar-translation method-এর পরিবর্তে নতুন এই পদ্ধতিতে ব্যাকরণের নিয়মকে সচেতনভাবে শেখানো থেকে বিরত থাকা হয়। এবং একই সঙ্গে শিক্ষার্থীর বিদেশি ভাষাটি বলা এবং শোনার দক্ষতা তৈরি হলে পর পড়া ও লেখার কাজটি শুরু হয়। (সুব্রত, ২০১১: ৭৭)। অথচ আজ একুশ শতকে বসে আমাদের ভাষাগবেষক অধ্যাপককে কেন জানিনে সংশয় রেখে লিখতে দেখি: ‘দ্বিতীয় ভাষা ও বিদেশি ভাষা এই দুই বিষয় ও ধারণা বেশ নিকটবর্তী। … বাংলাদেশের মত এক-ভাষিক দেশে ইংরেজিকে একই সঙ্গে দ্বিতীয় ভাষা এবং বিদেশি ভাষা বলা যায়।’ (দানীউল, ২০০৭: ৪২)। অর্থাৎ আমরা আজও সিদ্ধান্তহীন আমাদের ইংরেজি ভাষাশিক্ষা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে নাকি বিদেশি ভাষা হিসেবে চলবে। অন্যদিকে, ‘বাংলাদেশের ভিন্ন ভিন্ন অংশে যতগুলি উপভাষা প্রচলিত আছে তাহারই তুলনাগত ব্যাকরণই যথার্থ বাংলার বৈজ্ঞানিক ব্যাকরণ।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৫৪৯)। এই রবীন্দ্র-বাক্যকে অস্বীকার করে বাংলাদেশকে ‘এক-ভাষিক’ বলে— আমরা তো আসলে মার্কিন ভাষাবিজ্ঞানী চমস্কীয় মতে মাতৃভাষার ‘অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ’-কেই অবজ্ঞা করছি। আজও তাই অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হককে আক্ষেপ করতে হয় : ‘চলমান শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি, বাংলা কোনোটিই ভালোভাবে শেখার উপায় নেই।’ (আবুল কাসেম, ২০১৬: ১৩)।

উপসংহার

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না ‘সৃষ্টিকে চিন্তা থেকে আলাদা করা যায় না। চিন্তাকে ভাষা থেকে আলাদা করা যায় না। চিন্তা, ভাষা, সৃষ্টি অবিচ্ছেদ্য।’ (আবুল কাসেম, ২০১৬: ১৩)। আমরা যদি ‘সর্বাঙ্গীণ মনুষ্যত্বের ভিত্তিস্থাপনকেই শিক্ষার লক্ষ্য বলিয়া স্থির করি’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৫৬৯); সাধারণ লোকের সৃষ্টিশীল সত্তার উদ্বোধনের মাধ্যমে ব্যক্তিত্বের বিকাশের প্রত্যাশা করি; তবে রবীন্দ্রনাথের ভাষাশিক্ষা চিন্তার অনুশীলন আমাদের অত্যাবশ্যক। আমরা জানব ‘সুশিক্ষার লক্ষণ এই যে … তাহা মানুষকে মুক্তি দান করে।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬১: ৫৭৭)। পরিপূর্ণ মানুষ হবার আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে রাখবার জন্যই শিক্ষা। সুতরাং, আমাদের ভাষাশিক্ষার সঙ্গে আমাদের দেশীয় সাহিত্য-সংস্কৃতি, ধর্ম ও জীবন-যাপনে সামঞ্জস্য সাধনই প্রধান মনোযোগের বিষয় হওয়া প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখতে হবে বিদেশি ভাষা আমাদের পক্ষে কাজের ভাষা, ভাবের ভাষা নয়। সঙ্গত কারণেই ভাষার সঙ্গে ভাবের এবং জীবনের সঙ্গে ভাষাশিক্ষার সমন্বয় সাধন আবশ্যক। মাতৃভাষার স্বাভাবিক বিকাশের ব্যবস্থা রেখে সমাজে যুক্তি ও বুদ্ধির চর্চাকে মুক্তধারার মত প্রবহমান রাখতে হবে। ভাষাশিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্য-সুধা পানে পারঙ্গমতা অর্জন করতে হবে। সেই লক্ষ্যে আমরা রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর ভাষাশিক্ষা ভাবনাকে ‘আবাহন ও অভিবাদন’ করব। আশা করব এই ‘অদ্ভুত আঁধারে’ আক্রান্ত পৃথিবী এতেকরে ‘অবিশ্বাস ও অশ্রদ্ধা’ ভুলে, অহিংস আলোয় আলোকিত হবে আর প্রকৃত মুক্তির আনন্দ-সলিলে অবগাহন করবে অচিরেই।

তথ্য-সংকেত:
আবুল কাসেম ফজলুল হক। (২০১৬)। ‘বাংলাদেশে চলমান ভাষাপরিস্থিতি ও বাংলা ভাষা’। ভোরের কাগজ ঈদ সাময়িকী। ঢাকা।
আহমদ কবির। (২০১১)। ‘পাঠ্যপুস্তক রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (মোবারক হোসেন সম্পা.)। ঢাকা: বাংলা একাডেমি।
দানীউল হক, মহাম্মদ। (২০০৭)। ভাষা আয়ত্তকরণ ও শিখন: প্রাথমিক ধারণা। ঢাকা: বাংলা একাডেমি।
নরেন বিশ্বাস। (২০১১)। ‘রবীন্দ্রনাথের ব্যাকরণ-ভাবনা’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (মোবারক হোসেন সম্পা.)। ঢাকা: বাংলা একাডেমি।
মনসুর মুসা। (২০১১)। ‘রবীন্দ্রনাথের ভাষা-চিন্তা’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (মোবারক হোসেন সম্পা.)। ঢাকা: বাংলা একাডেমি।
মনিরুজ্জামান। (২০১২)। ‘ব্যতিক্রমী ভাষাচিন্তক রবীন্দ্রনাথ’। সার্ধশতবর্ষে রবীন্দ্রনাথ (আনিসুজ্জামান সম্পা.)। কলকাতা: বিশ্বভারতী।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। (১৮৯৪)। সোনার তরী। কলকাতা: বিশ্বভারতী।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। (১৯০৯)। ‘ভূমিকা’। ইংরেজি সহজ শিক্ষা (প্রথম ভাগ)। কলকাতা: বিশ্বভারতী।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। (১৯১২)। জীবনস্মৃতি। কলকাতা: বিশ্বভারতী।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। (১৯৩৫)। বাংলা শব্দতত্ত্ব। কলকাতা: বিশ্বভারতী।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। (১৯৪০) ছেলেবেলা। কলকাতা: বিশ্বভারতী ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। (১৯৫৩)। রবীন্দ্র-রচনাবলী (ষড়বিংশ খণ্ড)। কলকাতা: বিশ্বভারতী।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। (১৯৬১)। রবীন্দ্র-রচনাবলী (একাদশ খণ্ড)। কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। (১৯৮৪)। রবীন্দ্র-রচনাবলী (পঞ্চম খণ্ড)। কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ সরকার ।
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। (১৯৭৩)। ‘ভাষাতত্ত¡ ও আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান’। নিসর্গ (মনিরুজ্জামান সম্পাদিত) ২য় সংকলন।
সুব্রত কুমার দাস। (২০০৫)। প্রসঙ্গ: শিক্ষা ও সাহিত্য। ঢাকা: সূচীপত্র।
সুব্রত কুমার দাস। (২০১১)। রবীন্দ্রনাথ : ইংরেজি শেখানো। ঢাকা: মূর্ধন্য।
হুমায়ুন আজাদ। (১৯৭৩)। ‘শিক্ষাচিন্তা’। রবীন্দ্রপ্রবন্ধ: সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তা। ঢাকা: আগামী প্রকাশনী।
Suniti kumar Chatterji. (2002) The Origin and Development of the Bengali Language, Delhi: Rupa & co, p. xvi.

চিত্র : গুগল

প্রমিত বাংলা উচ্চারণ চর্চায় নরেন বিশ্বাস

সিলেটি ভাষার বাগর্থতত্ত্ব

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »