Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

প্রমিত বাংলা উচ্চারণ চর্চায় নরেন বিশ্বাস

ভাষার প্রকারভেদ বা রীতিভেদ প্রধানত দুটি: লৈখিক ও মৌখিক। সুতরাং ভাষার দুটো রীতির কথাই ভাবতে হয়। বাংলাদেশে বার বার বর্ণমালা সংস্কার, বানান সংস্কার বা বানানের নিয়ম প্রণয়নে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে; যা কেবল লৈখিক ভাষারীতির অংশ। বাংলা ভাষার অবস্থান পরিকল্পনায় বাঙালি উদাসীন। অবয়ব পরিকল্পনার অংশ মৌখিক ভাষারীতি সম্পর্কে উদাসীনতা দূর করতে এগিয়ে আসেন নরেন বিশ্বাস (১৯৪৫-১৯৯৮)। প্রমিত বাংলা ভাষা প্রচলনে যে-ক’জন ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, উচ্চারণশাস্ত্রী নরেন বিশ্বাস তাঁদের অন্যতম। অধ্যাপনা-গবেষণার পাশাপাশি এই পণ্ডিত ব্যক্তি আজীবন বাঙালির মুখের ভাষার প্রমিত উচ্চারণ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠান গড়েছেন, প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, প্রমিত বাংলা উচ্চারণের ক্যাসেট প্রকাশ করেছেন এবং প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা উচ্চারণ অভিধান প্রণয়ন করেছেন। মুখের ভাষার প্রতি অবহেলার কারণেই হয়তো নরেন বিশ্বাসও এদেশে অবহেলিত। অথচ, বাংলা ভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে চাই— একটি সুচিন্তিত ভাষানীতির আলোকে এর অবস্থান পরিকল্পনা এবং অবয়ব পরিকল্পনা। আর অবয়ব পরিকল্পনায় মৌখিক বা কথ্য ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। মৌখিক বাংলা ভাষার উচ্চারণ বিষয়ে নরেন বিশ্বাসের গভীর গবেষণা-প্রয়োগ ও মনন-ঋদ্ধ প্রবন্ধগুলো আমাদের জ্ঞানদৃষ্টি প্রসারিত করবে, বাংলা ভাষার প্রতি দরদ ও বিদ্যা-বুদ্ধির বিস্তার ঘটাবে। উচ্চারণশাস্ত্রী নরেন বিশ্বাসের আলোচনা-চর্চা তাই বাংলা ভাষার প্রমিতায়নে অপরিহার্য।

উচ্চারণশাস্ত্রী, অভিধানকার, লেখক, গবেষক, আবৃত্তি শিল্পী এবং মুক্তিযোদ্ধা নরেন বিশ্বাস রচিত গ্রন্থ : ‘প্রসঙ্গ: বাংলা ভাষা’ (১৯৮৪), ‘বাঙলা উচ্চারণ অভিধান’ (১৯৯০), ‘উচ্চারণ প্রসঙ্গ’ (২০০০), ‘প্রসঙ্গ : সাহিত্য সংস্কৃতি’, ‘ভারতীয় কাব্যতত্ত্ব’, ‘কাব্যতত্ত্ব অন্বেষা’, ‘বাংলা উচ্চারণ সূত্র’, ‘বাংলা উচ্চারণ তত্ত্ব ও প্রয়োগবিধি তত্ত্ব’ প্রভৃতি। বাংলা একাডেমি বাঙলা উচ্চারণ অভিধান-এ ‘অভিধানের অনুসৃত নীতিমালা’ শিরোনামে দীর্ঘ ত্রিশ পৃষ্ঠায় তিনি বাংলা উচ্চারণের নিয়ম ও তার প্রয়োগ উপস্থাপন করেছেন সহজ-প্রাণবন্ত ভাষায়। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান যথার্থই লিখেছেন, ‘নরেন বিশ্বাস দীর্ঘকাল ধরে প্রমিত বাংলা উচ্চারণ সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করেছেন। এ-বিষয়ে তাঁর একাধিক রচনাও বিভিন্ন গবেষণামূলক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ যেমন গভীর, এ-বিষয়ে তাঁর কাজও তেমনি একাগ্রতা ও নিষ্ঠার পরিচয় বাহী।’ (আনিসুজ্জামান, ১৯৯০: ১১)।

উচ্চারণশাস্ত্রের পাশাপাশি তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, অলঙ্কারশাস্ত্র, নন্দনতত্ত্ব এমনকি প্রায়োগিক ভাষাবিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ লিখেছেন। প্রতিটি প্রবন্ধেই লেখকের জ্ঞানের ব্যাপ্তির, মননের গভীরতার, যুক্তির তীক্ষ্ণতার এবং প্রমাণের সুস্পষ্টতার আর বিন্যাস-বিশ্লেষণের নৈপুণ্যের স্বাক্ষর রয়েছে। তবে বাংলা উচ্চারণ বিষয়ক গবেষণায়-প্রয়োগে তিনি অসাধারণ। আমাদের অনেকেরই হয়তো অজানা যে, জাতীয় গণমাধ্যম ইনসটিটিউট, ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘ব্যবহারিক বাংলা উচ্চারণ অভিধান’ (১৯৮৮)-এর সম্পাদনা পর্ষৎ রূপে: আনিসুজ্জামান, ওয়াহিদুল হক, জামিল চৌধুরী ও নরেন বিশ্বাস-এর নাম উল্লেখ থাকলেও, ‘সম্পাদনা পর্ষদের নীতিনির্দেশানুযায়ী নরেন বিশ্বাস প্রাথমিকভাবে উচ্চারণ নির্দেশ করেন’ (জামিল, ১৯৮৮: ১৫)। তাঁর স্বকণ্ঠে প্রিয় পঙক্তিমালা ও উচ্চারণশিক্ষা বিষয়ক বক্তৃতামালা ক্যাসেট দু’টি ছাড়াও বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক বিশটি ক্যাসেট প্রকাশিত। এছাড়া নাটক-কথিকা-নক্সা ইত্যাদি রচনা করলেও উচ্চারণবিদ হিসেবেই নরেন বিশ্বাস দুই বাংলায় খ্যাতি লাভ করেন।

বাংলা উচ্চারণশাস্ত্রে নরেন বিশ্বাসের অবদান-অবস্থান নিরূপণের লক্ষ্যে প্রথমে বাংলা উচ্চারণচর্চার দিকে আলোকপাত আবশ্যক। ক্যালকাটা রিভিউ পত্রিকায় ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘বেঙ্গলি স্পোকেন অ্যান্ড রিটেন’ প্রবন্ধে শ্যামাচরণ গাঙ্গুলি (১৮৩৮- ১৯২৮) প্রথম উল্লেখ করেন, ‘বাংলা লিপি ইংরেজি লিপির মতোই ত্রুটিপূর্ণ, ধ্বনি উচ্চারণের ক্ষেত্রে ধ্বনির যথার্থ উচ্চারণ থেকে বেশ দূরবর্তী’ (শ্যামাচরণ, ২০১৯: ১৮৯)। প্রায় সমকালে (১৮৭৮-১৮৮০) ইংলন্ডে বসে ‘একজন ইংরেজ বন্ধুকে বাংলা পড়াইবার সময়’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১- ১৮৪৪) ‘চৈতন্য হইল’ যে, আমাদের বর্ণমালা এবং উচ্চারণের মধ্যে গোলযোগ আছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আঞ্চলিক ভাষার বৈচিত্র্যের কারণে ‘নানা প্রকার উচ্চারণের ভঙ্গি’ স্বীকার করে নিয়েও তিনি তৎকালীন রাজধানী ‘কলিকাতা অঞ্চলের উচ্চারণকেই আদর্শ ধরিয়া লইতে হইবে’ স্থির করেন। সেই আদর্শে রবীন্দ্রনাথই প্রথম বাংলা উচ্চারণের নিয়ম প্রণয়নে আত্মনিয়োগ করেন। বাঙালির দুর্ভাগ্য বলতে হয়, প্রথম বাংলা উচ্চারণের নিয়ম সংবলিত হাতে লেখা কাগজগুলি দেশে ফেরার দু’বছর পর রবীন্দ্রনাথ আর খুঁজে পেলেন না। তবু তাঁর ‘কিছু কিছু মনে আছে’, তা থেকে লিখলেন ‘বাংলা উচ্চারণ’ শীর্ষক প্রবন্ধ। অক্টোবর ১৮৮৫-তে ‘বালক’ (আশ্বিন ১২৯২) পত্রিকায় প্রকাশিত এই প্রবন্ধে তিনি দেখান, ‘পবন শব্দের প অকারান্ত, ব ওকারান্ত, ন হসন্ত শব্দ। … ব্যয় লিখি পড়ি ব্যায়। অথচ অব্যয় শব্দে ব্য-এর উচ্চারণ ব্ব-এর মতো। আমরা লিখি গর্দভ, পড়ি— গর্ধোব।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৮৪: ১৭)। এই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ‘কেবল আদ্যক্ষরবর্তী অকার উচ্চারণের’ আটটি নিয়ম-উদাহরণ এবং আরও কিছু আলোচনা করে সাধারণের মনোযোগ আকর্ষণের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন। তাঁর প্রত্যাশা: ‘যদি কোনো অধ্যবসায়ী পাঠক রীতিমত অন্বেষণ করিয়া এই-সকল নিয়ম নির্ধারণ করিতে পারেন, তবে আমাদের বাংলা ব্যাকরণের একটি অভাব দূর হইয়া যায়।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৮৪: ২০)। এর বছর সাতেক পরে ‘সাধনা’ পত্রিকায় (আষাঢ় ১২৯৯ ও কার্তিক ১২৯৯) ‘স্বরবর্ণ অ’ এবং ‘স্বরবর্ণ এ’ নামে আরও দু’টি প্রবন্ধ লিখলেও অ ধ্বনির ‘মধ্যাক্ষর বা শেষাক্ষরের নিয়ম অবধারণের অবসর’ রবীন্দ্রনাথ আর পাননি। অবশ্য, তারও ছ’বছর পর ‘ভারতী’ (পৌষ ১৩০৫) পত্রিকায় প্রকাশিত ‘বীমসের বাংলা ব্যাকরণ’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ উচ্চারণ প্রসঙ্গে সংক্ষেপে কিছু কথা বলেন এবং স্মরণ করিয়ে দেন, ‘বাংলার উচ্চারণতত্ত্ব ও বর্ণবিকারের নিয়ম বাঙালির দ্বারা যথোচিত আলোচিত হয় নাই’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৮৪: ৬০)। রবীন্দ্রনাথও আর এ-বিষয়ে আলোচনায় অগ্রসর হননি। চব্বিশ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘ব্যঞ্জনবর্ণ উচ্চারণের নিয়মও সময়াভাবে বাহির করিতে পারি নাই’। পরের ঊনষাট বছরে রবীন্দ্রনাথ সাধু-চলিত ভাষারীতি, বাংলা লেখ্য ভাষার বানান সংস্কার, ব্যাকরণ ইত্যাদি নিয়ে ভাবলেও উচ্চারণ বিষয়ে ভাববার ফুরসত পেয়েছেন বলে জানা যায়নি।

ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (১৮৯০- ১৯৭৭) লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধ্বনিতত্ত্বে ডিপ্লোমা (১৯১৯) এবং ইন্দো-আরিয়ান ফিললোজি (১৯২১) শীর্ষক অভিসন্দর্ভ লিখে ডি.লিট উপাধি লাভ করেন। তাঁর ‘আ ব্রিফ স্কেচ অব বেঙ্গলি ফনেটিক্স’ (১৯২১), ‘দি ওরিজিন অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট অব দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ’ (১৯২৬) এবং ‘আ বেঙ্গলি ফনেটিক রিডার’ (১৯২৮) গ্রন্থে তিনি প্রথম বাঙালি হিসেবে মাতৃভাষার ধ্বনিতাত্ত্বিক পূর্ণাঙ্গ ও সুশৃঙ্খল আলোচনা-গবেষণা করেন। বলা যায়, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় আধুনিক বাংলায় ধ্বনিতত্ত্বের তথা উচ্চারণ বিশ্লেষণের প্রথম দিশারী (মহাম্মদ দানীউল, ১৯৯৪: ১১৫)। দেশ-বিভাগের (১৯৪৭) আগে-পরে বেশ কিছু বছর ভাষা-সমস্যা নিয়ে রাজনৈতিক ডামাঢোলে বাঙালির ভাষাবিজ্ঞান-ভাবনা বড় চোখে পড়ে না। এমনকি ভাষা-আন্দোলনের (১৯৫২) পরেও ভাষাকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদে উজ্জীবিত বাঙালি লৈখিক ভাষার বর্ণ ও বানান সংস্কারের মতো রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে-প্রতিবাদে সক্রিয় থেকেছেন বটে। তবে মৌখিক বা কথ্য ভাষার উচ্চারণের মত সূক্ষ্মতর ভাবনা তাঁদের মধ্যে বিরল। এই বিরল ব্যক্তিত্ব ধ্বনিবিজ্ঞানী মুহম্মদ আবদুল হাই (১৯১৯- ১৯৬৯)। তিনি ১৯৫২-তেই লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধ্বনিবিজ্ঞানে এমএ পাস করেন। তাঁর সন্দর্ভটি প্রকাশিত হয় ‘আ ফনেটিক অ্যান্ড ফনলোজিক্যাল স্টাডি অব ন্যাজাল অ্যান্ড ন্যাজালাইজেশন অব বেঙ্গলি’ (১৯৬০) নামে। পরের বছরেই (১৯৬১) তিনি প্রবন্ধ ও গবেষণায় বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান। এই সন্দর্ভে বাংলা ধ্বনিগুলো সম্পর্কে তিনি যে-সব সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন, সেগুলোই সাধারণভাবে প্রকাশ করেছেন ‘ধ্বনিবিজ্ঞান ও বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব’ (১৯৬৪) বইটিতে। তিনি বুঝেছিলেন বাংলায় ধ্বনিবিজ্ঞানের যে-অবস্থা, তাতে দুরূহ গবেষণাগ্রন্থের থেকে বেশি দরকার সহজপাঠ্য বিজ্ঞানসম্মত ধ্বনিবৈজ্ঞানিক বর্ণনা। আধুনিক উচ্চারণবিজ্ঞানের কৌশল অবলম্বন করে তিনি বাংলা ধ্বনিগুলোর উচ্চারণ স্থান নির্ণয় করেন (হুমায়ুন আজাদ, ১৯৯৪: আট)। মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে (৩ জুন ১৯৬৯) রেললাইনে কাটা পড়ে অনেকটা জীবনানন্দ দাশের মতো তাঁর জীবনাবসান ঘটে। তাঁর প্রথম গবেষণা-গ্রন্থ প্রকাশের বছরেই ভাষাবিজ্ঞানের বিখ্যাত মার্কিন জার্নাল ল্যাঙ্গুয়েজ-এ (জানুয়ারি-মার্চ ১৯৬০) প্রকাশিত হয় চার্লস এ ফার্গুসন (১৯২১- ১৯৯৮) ও মুনীর চৌধুরী (১৯২৫- ১৯৭১) রচিত ‘দ্য ফোনিমস অব বেঙ্গলি’ প্রবন্ধ। মুনীর চৌধুরীও ছেচল্লিশ বছর বয়সে বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের মাত্র দু’দিন আগে (১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১) শহিদ বুদ্ধিজীবীরূপে বিদায় নিলেন। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে মুনীর চৌধুরীর ‘বাঙলা ধ্বনিমূল’ প্রবন্ধগ্রন্থটি বাংলায় অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হলেও, বাংলা মূলধ্বনি নিয়ে ফোনিম তত্ত্ব অনুযায়ী আর কোনও অগ্রগামী কাজ এ পর্যন্ত হয়নি (মনসুর মুসা, ২০১০: ছয়)। অথচ, ভাষাশিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলেই স্বীকার করবেন যে, ভাষায় ব্যবহৃত স্বর-ব্যঞ্জন ধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে অর্ধস্বর ও যৌগিক স্বরধ্বনির মূলধ্বনিগুলো চিনিয়ে দিতে পারলে শিশুর ভাষাধ্বনির ধারণার সঙ্গে শুদ্ধ উচ্চারণের চেতনাও জাগিয়ে তোলা যায়। তবে, সর্বপ্রথম বয়স্কদের নিজেদের ভাষাশিক্ষাকে পূর্ণাঙ্গ করতে হবে (সন্‌জীদা, ২০১০: আট)। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মাতৃভাষা-শিক্ষাকে পূর্ণাঙ্গ করতে, তাদের মধ্যে শুদ্ধ উচ্চারণের চেতনা জাগিয়ে দিতে এবং উচ্চারণ বিষয়ক প্রশিক্ষণ দিতে এগিয়ে এলেন নরেন বিশ্বাস। ছোটদের উপযোগী করে লিখলেন ‘উচ্চারণ প্রসঙ্গ’। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত শিশু-কিশোর সাহিত্য পত্রিকা ‘ধানশালিকের দেশ’-এ ধারাবাহিকভাবে তা প্রকাশিত হয়। অগ্রজ ধ্বনিবিজ্ঞানীগণের শনাক্ত করা বাংলা প্রমিত উচ্চারণগুলোকে প্রথম পূর্ণাঙ্গরূপে প্রয়োগ করে উচ্চারণ অভিধান প্রণয়ন করলেন উচ্চারণশাস্ত্রী নরেন বিশ্বাস। বলা যায়, মুহম্মদ আবদুল হাই বাংলাদেশে ধ্বনিবিজ্ঞানকে সহজপাঠ্য করেন, আর নরেন বিশ্বাস সেই বিজ্ঞানকে প্রয়োগ করে বাঙালিকে প্রমিত উচ্চারণের ব্যাপারে সচেতন করতে উদ্যোগী হন।

নরেন বিশ্বাস প্রণীত বাংলা একাডেমী ‘বাঙলা উচ্চারণ অভিধান’ (১৯৯০) গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের ‘মুখবন্ধ’ (অক্টোবর ১৯৮৯) পাঠে জানা যায় যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় যোগদানের সময় (১৯৭৬) থেকেই তিনি ‘বিভিন্ন কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ-কেন্দ্রে বাঙলা উচ্চারণ সম্পর্কে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বাঙলা উচ্চারণ অভিধানের তীব্র অভাব অনুভব’ করেন। বাংলা ভাষার একাধিক প্রামাণ্য-অভিধান থাকলেও উচ্চারণ অভিধান ছিল না। একমাত্র জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’ (প্রথম প্রকাশ ১৯১৭, পবিবর্ধিত ২য় সংস্করণ ১৯৩৭) এর ব্যতিক্রম হলেও, ‘তাঁর সাংকেতিক চিহ্ন-প্রযুক্ত শব্দের সংখ্যা এতো সীমিত যে তাতে কোনোমতেই প্রয়োজন মেটে না’। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের ব্যবধানে অনেক শব্দের উচ্চারণও তখন বদলে গেছে। এছাড়া ধীরানন্দ ঠাকুর-সংকলিত ‘বাংলা উচ্চারণ কোষ’ (১৯৫৪) এবং ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের ‘বাংলা উচ্চারণ অভিধান’ (১৯৬৮)-এ প্রয়োজনের তুলনায় অতি অল্প শব্দের উচ্চারণ নির্দেশিত। অন্যদিকে, ‘বাংলা উচ্চারণ কোষ’ (১৯৫৪)-এ বেশকিছু শব্দের ৬/৮টি বিকল্প উচ্চারণও অভিধানের উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। এ-অবস্থায় বিভিন্ন কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীগণের নিরন্তর জিজ্ঞাসাই নরেন বিশ্বাসকে সর্বপ্রথম উচ্চারণ অভিধান সংকলনে প্রাণিত করে। স্বউদ্যোগে তিনি কয়েক বছরের (১৯৭৭-৮২) নিরলস শ্রমে দশ হাজার শব্দের একটি উচ্চারণ অভিধানের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করে (১৯৮২) বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশের প্রস্তাব পাঠান। একাডেমির তখনকার মহাপরিচালক অভিধানটির গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিকল্পে আন্তর্জাতিক ধ্বনিমূলক বর্ণমালা (আইপিএ)-তে উচ্চারণ নির্দেশের পরামর্শ দেন। প্রস্তাব অনুযায়ী আরও ‘বৎসরাধিক কালের প্রবল পরিশ্রমে প্রায় বিশ হাজার শব্দের উচ্চারণ অভিধান (আইপিএ-সহ)-এর পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করে’ তিনি বাংলা একাডেমিকে জানান। পাণ্ডুলিপি পরীক্ষার জন্যে বিশেষজ্ঞ-কমিটিও গঠিত হয় কিন্তু আন্তর্জাতিক ধ্বনিমূলক বর্ণমালায় অভিধান প্রকাশে নানাবিধ জটিলতা এবং অত্যধিক অর্থ-ব্যয়ের আশঙ্কায় হয়তো উচ্চারণ-অভিধান প্রকাশ-পরিকল্পনা তখনকার মত স্থগিত হয়ে যায় (নরেন, ১৯৯০: তের)। বাংলা ভাষার ধ্বনি-বৈশিষ্ট্য এবং এদের আইপিএ নিরূপণে বাঙালি ধ্বনিবিজ্ঞানীগণের মধ্যে মতপার্থক্য বিদ্যমান (শ্যামল, ২০১৮: ৪২৭)। এমনকি বাংলা একাডেমি-প্রকাশিত বাংলা বানান অভিধান (২০০৮) এবং প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ (২০১১)-এ ব্যবহৃত আইপিএ পুরোপুরি একরকম নয়। অনুমান করা যায় সামরিক শাসনামলে মতানৈক্য আরও অধিক ছিল। এমনকি, ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘বাংলা উচ্চারণ’ প্রবন্ধে পরিব্যক্ত নরেন বিশ্বাসের মত, মন্তব্য ও সিদ্ধান্ত তর্কাতীত নয়, বরং প্রতিবাদীর সংখ্যাই বেশি ছিল (হুমায়ুন আজাদ, ১৯৮৪: চৌদ্দ)। আর একারণেই হয়তো বাংলা একাডেমিতে উচ্চারণ অভিধান পরিত্যাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে বা প্রকাশ স্থগিত থাকে দীর্ঘ দিন। অথচ, শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা ভাষার উন্নয়নে সরকার গঠিত বাংলা ভাষা কমিটি (১৯৮২) যে আটদফা সুপারিশ (১৯৮৩) পেশ করে তার অন্যতম ছিল বাংলা উচ্চারণ অভিধান প্রণয়ন করা (সাখাওয়াৎ, ২০১১: ২৮৫)। ব্যক্তি-উদ্যোগে তা নরেন বিশ্বাস করেও তখন তা প্রকাশ করা যায়নি।

জাতীয় সম্প্রচার একাডেমী (বর্তমান নাম: জাতীয় গণমাধ্যম ইসটিটিউট) আয়োজিত প্রশিক্ষণে অতিথি বক্তা হিসেবে নরেন বিশ্বাসকে পেয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক তাঁকে ৮/৯ হাজার শব্দের একটি উচ্চারণ নির্দেশিকা সংকলনের প্রস্তাব দেন ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে। নরেন বিশ্বাস জামিল চৌধুরীর প্রস্তাবে সানন্দ-স্বীকৃতি জানিয়ে নয় মাসের মধ্যে ষোল হাজার শব্দের বাংলা-উচ্চারণ-নির্দেশিকার পাণ্ডুলিপি জমা দেন। এর কিছু শব্দের উচ্চারণ পরিবর্তন করে জাতীয় গণমাধ্যম ইনটিটিউট ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ (সম্পাদনা পর্ষৎ: আনিসুজ্জামান, ওয়াহিদুল হক, জামিল চৌধুরী ও নরেন বিশ্বাস) নাম দিয়ে প্রকাশ করেছে (১৯৮৮) (নরেন, ১৯৯০: চৌদ্দ)। নরেন বিশ্বাসের এ-বক্তব্যের সত্যতা মেলে মহাপরিচালকের লেখা বইটির ‘ভূমিকা’য় যা পূর্বে উল্লেখিত। জামিল চৌধুরীর ভাষায়: ‘আনিসুজ্জামান প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতির বিষয়ে যত্ন করেন। ওয়াহিদুল হক উচ্চারণ নির্দেশ এবং প্রতীক নির্ণয়ে বিশিষ্ট অবদান রেখেছেন। মফিদুল হক এই অভিধান প্রকাশে সর্বাত্মক সহায়তা দিয়েছেন।’ (জামিল, ১৯৮৮: পনের)। এতটুকু অবদানের জন্য ইউনেসকো-র আর্থিক সহায়তায় প্রকাশিত অভিধানে আনিসুজ্জামান, ওয়াহিদুল হক ও জামিল চৌধুরী বইটির সম্পাদক হতে পারেন কি না তা পাঠকের বিবেচনার বিষয়। এমন হলে বাংলাদেশের সৌভাগ্য বলতে হয় যে, মনীন্দ্রকুমার ঘোষ, পবিত্র সরকার প্রমুখ এ অভিধানের পাণ্ডুলিপি পাঠ করে মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছেন কিন্তু সম্পাদকত্ব দাবি করেননি। তবে সংকলক নরেন বিশ্বাসকেও চতুর্থ সম্পাদক রূপে উপস্থান যে তাঁকে অবহেলা সে-কথা নিশ্চয় কেউ অস্বীকার করবেন না। অভিধানটিতে উল্লেখিত ‘গ্রন্থপঞ্জি’-তেও দেখা যায় মহাপরিচালক জামিল চৌধুরীর সে-সময় সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থ ‘বানান ও উচ্চারণ’ (১৯৮৫) ঠাঁই পেয়েছে; অথচ চার্লস এ ফার্গুসন ও মুনীর চৌধুরী রচিত ‘দ্য ফোনিমস অব বেঙ্গলি’ প্রবন্ধের উল্লেখ নেই। আর নরেন বিশ্বাসের ‘বাংলা উচ্চারণ’ শীর্ষক কুড়ি পৃষ্ঠার প্রবন্ধ সংবলিত ‘প্রসঙ্গ: বাংলা ভাষা’ (১৯৮৪) গ্রন্থটিও অবহেলিত অথবা অনুল্লেখ্য বিবেচিত হয়েছে অজ্ঞাত কোনও কারণে।

বাংলা একাডেমি-র মহাপরিচালক ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল নরেন বিশ্বাসের প্রতি অবহেলা অপনোদনে অসামান্য অবদান রাখেন। দায়িত্বগ্রহণের অনতিকাল পরেই (১৯৮৬) তিনি উচ্চারণ অভিধান প্রকাশে নব-পর্যায়ের সূচনা করেন। তিনিই পরামর্শ দেন, বাংলা-ভাষী ব্যাপক জনগণের স্বার্থে আইপিএ বাদ দিয়ে সহজ পদ্ধতিতে কেবল বাংলা বর্ণমালায় উচ্চারণ-নির্দেশের। প্রস্তাব-অনুসারে ত্রিশ হাজারের বেশি শব্দসংখ্যার উচ্চারণ-অভিধানের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করে নরেন বিশ্বাস জমা দেন সেপ্টেম্বর ১৯৮৭-তে। পরের বছরের শেষ দিকে বাংলা একাডেমিতে প্রকাশের সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর মুদ্রণ-কাজ শুরু হয় ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে। আর ফেব্রুয়ারি ১৯৯০-এ আনিসুজ্জামানের ভূমিকা সংবলিত নরেন বিশ্বাস প্রণীত বাংলা একাডেমী ‘বাঙলা উচ্চারণ অভিধান’ পাঠকের হাতে পৌঁছোয়। প্রায় তের বছর ধরে (১৯৭৭- ১৯৯০) উচ্চারণ-অভিধান সংকলনের স্বীকৃতি পান নরেন বিশ্বাস। এর জন্য তিনি অবশ্য কোনও রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পাননি। তবে বইটির ভূমিকা লেখক যেমনটা লেখেন, ‘কাজে লাগাটাই হবে গ্রন্থাকারের যথার্থ পুরস্কার’ (আনিসুজ্জামান, ১৯৯০: এগারো)। সে-পুরস্কার তিনি যথার্থই পেয়েছেন; বইটি বাঙালির কাজে লেগেছে এবং এখনও লাগছে। বিশ শতকের শেষ দশকেই বইটির একাধিক পুনর্মুদ্রণ প্রকাশিত হয়েছে, পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এমনকি জানুয়ারি ১৯৯৯-এ প্রকাশিত গ্রন্থটির পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণের প্রাসঙ্গিক যাবতীয় কাজও তিনি সম্পন্ন করে যান। দুঃখ যে, সংস্করণটি তাঁর জীবিতাবস্থায় প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। নরেন বিশ্বাস ভাষার বহমান স্পন্দনকে আলিঙ্গন করেই বাংলাদেশের প্রমিত বাংলা কথ্যভাষার বাচনভঙ্গির অনুসরণে উচ্চারণ-সূত্র আবিষ্কারে অগ্রসর হয়েছেন। এ কাজে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও মুহম্মদ আবদুল হাই-এর নির্দেশিত পন্থাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে বাকশিল্পের অবাধ বিকাশকে অভিনন্দন জানাতে সবসময় সূত্রশাসন মানেননি এবং বেশকিছু শব্দের বিকল্প উচ্চারণকে ঠাঁই দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য যেহেতু বাংলাভাষী শিক্ষিত মানুষ এবং বাকশিল্পের অনুরাগী শিক্ষার্থীবৃন্দ, সেজন্যে বাঙলা বর্ণমালার সাহায্যে উচ্চারণ দেখিয়েছি। … তবে উচ্চারণে প্রস্বর, ধ্বনিতরঙ্গের প্রকৃতি অর্থাৎ স্বরের সূত্র-বিভাজন কোথাও নির্দেশিত হয়নি। যোগ্যতর কোনো ব্যক্তি ভবিষ্যতে সে-দায়িত্ব পালন করে বাঙলা বাক্শিল্পের উৎকর্ষবিধান করবেন বলে আশা করি।’ (নরেন, ১৯৯০: পনের)। তেমন ‘যোগ্যতর ব্যক্তি’ এদেশ আজও যে পায়নি, তা বলা বাহুল্য। তবে এটুকু বলা যায় যোগ্য ব্যক্তিত্বকে যথাযোগ্য সমান-সম্মাননা ব্যতীত যোগ্যতর ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে না। কেননা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কথায়, ‘যে-দেশে গুণীর কদর নেই সে-দেশে গুণীর জন্ম হয় না’। তাই বাঙালির মুখের ভাষার বিশ্লেষণ ও প্রমিত প্রয়োগের তাগিদেই নরেন বিশ্বাসকে ধারণ করে তাঁর প্রদর্শিত পথে অগ্রসর হওয়া আবশ্যক।

অধ্যাপনা থেকে অবসর গ্রহণের নির্ধারিত সময়ের একযুগ আগেই তিপ্পান্ন বছর বয়সে (১৯৯৮) প্রয়াত হন নরেন বিশ্বাস। তাঁর মৃত্যুর পর গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ‘উচ্চারণ প্রসঙ্গ’ (২০০০)। গ্রন্থটি ছোটদের জন্য লিখিত হলেও যাঁরা বাংলা ভাষা ও বাংলা শব্দ নিয়ে কাজ করেন তাঁদের জন্যও এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় গ্রন্থ। উচ্চারণের মত প্রাত্যহিক অথচ অদৃশ্য-জটিল বিষয় নিয়ে গবেষণা করে, উচ্চারণের নিয়ম আবিষ্কার করে, নিয়ম প্রমাণ করে উদাহরণ উল্লেখসহ প্রবন্ধ লিখে আর উচ্চারণ-অভিধানে প্রয়োগ করেই থেমে থাকেননি নরেন বিশ্বাস। অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি প্রশিক্ষণে-কর্মশালায় প্রতিনিয়ত বক্তৃতা-ভাষণে প্রমিত উচ্চারণ বাকশিল্পীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে, শিক্ষিত-সাধারণ জনগণকে সচেতন করতে সদা সক্রিয় ছিলেন। তাঁর উচ্চারণ বিষয়ক বক্তৃতাগুলোও আকর্ষণীয়, ছন্দময় ও সহজ-সরল ভাষায় উপস্থাপিত। বাংলা উচ্চারণের মূল সমস্যাকে তিনি চিহ্নিত করেন এভাবে: ‘বাংলা ভাষা উচ্চারণের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে প্রমিত উচ্চারণের ক্ষেত্রে সমস্যার জন্য আমি তোমাদের মূল পাঁচটি কারণের ব্যাখ্যা দিতে চাই। এই কারণগুলি হলো : ১) বাঙলা ভাষার লিখিতরূপের সঙ্গে বহুক্ষেত্রে তার উচ্চারিত রূপ একই হয় না। ২) বাঙলা ভাষার বর্ণ আছে একাধিক, কিন্তু তার ধ্বনি প্রতীক এক। আবার বর্ণ আছে একটি, কিন্তু তার ধ্বনি একাধিক। ৩) আমাদের উচ্চারণে প্রায়শ মহাপ্রাণ বর্ণগুলো অল্পপ্রাণ হয়ে যায়। ৪) আমাদের আঞ্চলিকতার সমস্যা। ৫) বাঙলা ভাষার প্রতি আমাদের দরদ ও আন্তরিকতার অভাব।’ এসব কারণে আমাদের শিক্ষিত লোকের মুখের ভাষাও ভুল উচ্চারণে কণ্টকাকীর্ণ। তাঁর মতে, এজন্য আমাদের অবহেলা ও অযত্ন দায়ী। আর এই সমস্যা-সংকট থেকে উত্তরণের উপায়ও তিনি সাবলীল ভাষায় বক্তৃতার মাধ্যমে উপস্থাপন করেন। তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট-নিরাবেগ ও যুক্তিনিষ্ঠ, আর বক্তব্যের অন্ত্যমিলযুক্ত চুম্বক অংশগুলো দর্শক-শ্রোতাকে বিমুগ্ধ-বিমোহিত করে রাখত। এদিক দিয়ে তিনি একজন বাগ্মী অধ্যাপক। তাঁর ভাষায়:

‘‘এক : বাঙলা ভাষার লিখিত রূপ এবং উচ্চারিত রূপ কোথায় এক নয়। কেন এক নয়, কীভাবে উচ্চারণ করতে হয়। এগুলো বুঝলে আর ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। এবং মূলের ভুল যদি দূর করা না যায় তাহলে কোনদিনই বিচিত্র বর্ণের ফুলও ফুটবে না।

দুই : বাঙলা বর্ণমালায় আমরা বিস্ময়কর ভাবে লক্ষ্য করি, একাধিক বর্ণের ধ্বনিগত উচ্চারণ এক।… বর্ণ আছে একটি, কিন্তু তাকে ঘিরে ধ্বনি একাধিক। … তাহলে আমরা একই বর্ণের একাধিক উচ্চারণ লক্ষ্য করতে পারছি কিনা বল তোমরা। আবার বললেন, তোমাদের মতি যদি ঠিক থাকে, তবে গতিও ঠিক থাকবে, আর তাতে তোমাদের ক্ষতির সম্ভাবনা থাকবে না বললেই চলে।

তিন : তোমাদের আমি দু’একটি ঘটনার কথা বলি তাতে তোমরা বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবে।… একদিন, রোকেয়া হলের সামনে দিয়ে আমি হেঁটে বাসার দিকে যাচ্ছিলাম। পরিচিত কয়েকজন ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে দেখা হতেই জিজ্ঞেস করলাম তোমরা কী করছ? চট্ করে একজন বললো, স্যার, আমরা ‘আমরা’ খাচ্ছি। আমি বললাম, ঠিক আছে, তোমরা তোমাদের খেতে থাক। আমার বরং এখান থেকে চলে যাওয়াই শ্রেয়। … অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে এর স্থলে যদি বলা হয় অন্দ হলে কি প্রলয় বন্দ থাকে তাহলে অবস্থা কোন পর্যায়ে যায় তোমরা নিশ্চয় বুঝতে পারছো? ডাক্তার যদি নাড়ী ধরার পরিবর্তে নিত্যনূতন নারী ধরা শুরু করেন, তাহলে ডাক্তারী পেশা না, তাঁর জীবন নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে না?

চার : আমি তোমাদের আঞ্চলিক ভাষাকে অবহেলা বা উপেক্ষা করতে বলছি না। যখন তুমি মায়ের কাছে বা গাঁয়ে যাবে বা আঞ্চলিক কোন চরিত্রে অভিনয় করবে তখন আঞ্চলিক ভাষাতে কথা বললে কোন আপত্তি নাই। কিন্তু যখন সবার জন্য বলবে বা সভাতে বলবে তখন আঞ্চলিক ভাষা পরিহার করবে। তবে একটি কথা তুমি যদি সারাক্ষণ পা টেনে হাঁটতে থাকো, তবে তোমার হাঁটার ঐ বৈশিষ্ট্য ত্যাগ করে হঠাৎ তোমার হাঁটাহাটি সুন্দর করতে পারবে না। সুন্দর হাঁটার জন্য তোমাকে সব সময়ই সুন্দরভাবে পা ফেলার অনুশীলন করে যেতে হবে। ঠিক সেরকমই, প্রমিত ভাষার উচ্চারণ দক্ষতা অর্জনের জন্য বা উত্তরণের জন্য তোমাকে আঞ্চলিক ভাষার বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য ত্যাগ করতে হবে। আঞ্চলিক ভাষাকে বর্জন করে প্রমিত ভাষার উচ্চারণে অভ্যস্ত হয়ে উঠার জন্য এর কোন বিকল্প নেই।

পাঁচ : এটি হলো আমাদের জাতীয় সমস্যা তোমাদের সুন্দর পোশাক পরিচ্ছদ ও মুখের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য যে সময় ব্যয় করে থাকো, মুখের ভাষার সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য সেই সময়টুকু ব্যয় করো কিনা, তা তোমরা হলফ করে বলতে পারবে? একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বক্তৃতা দেয়ার সময় অবলীলায় বলেছেন সন্মানিত সবাপতি। কিন্তু তিনি কি ইংরেজি বক্তৃতা দেবার সময় বলবেন, হনারেবল ফ্রেসিডেন্ট। কখনোই তিনি এমন ভুল করবেন না। কারণ তিনি ইংরেজি শেখেন। রপ্ত করেন, কিন্তু বাঙলা তাঁর মাতৃভাষা হলেও এটি শেখার জন্য কোন গরজ অনুভব করেন না।’’

নরেন বিশ্বাসের উচ্চারণ শেখানোর কৌশল তুলে ধরার স্বার্থে দীর্ঘ উদ্ধৃতি পরিহার করা গেল না। এ-উদ্ধৃতি পাঠে পাঠক অনুমান করতে পারবেন, এমন বক্তব্যের সঙ্গে একজন বাগ্মী অধ্যাপকের বাচনভঙ্গি, একজন অভিনেতার অভিনয় আর গবেষকের গাম্ভীর্য মিলে, কেমন আকর্ষণীয় হয়ে উঠত তাঁর উচ্চারণ-শিক্ষার ক্লাসরুম। ক্লাসে তিনি কেবল উচ্চারণের নিয়ম আর উচ্চারণই শেখাতেন না। প্রায় প্রতিটি ক্লাসের শেষে তিনি প্রশিক্ষণার্থী-শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষা-প্রেমে উদ্বুদ্ধ-অনুপ্রাণিত করতে বলতেন, ‘তিনটি জিনিসের ঋণ জীবনে শোধ দেওয়া যায় না। তিনটি ম। একটি হল মা, একটি হলো মাটি এবং একটি হলো মাতৃভাষা। মা আমাদের জন্ম দেয়, মাটি আমাদের লালন করে আর মাতৃভাষা আমাদের প্রকাশ করে। আসলে আত্মপ্রকাশের জন্য মাতৃভাষার কোন বিকল্প নেই। ভাষা ভাল বললে, ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটবে। কিন্তু সেটাতো এমনি এমনি ঘটবে না। তার জন্য বারংবার অনুশীলন করতে হবে। কিছু পেতে হলে তোমাকে কিছু দিতে হবে। প্রেম কখনো একতরফা হয় না।’

তবে তিনি মাতৃভাষা প্রেমে অন্ধ-আবেগপ্রবণ ছিলেন না মোটেই। মানুষের মুখের জীবন্ত ভাষার বহমানতা ও পরিবর্তনশীলতাকে তিনি সবসময় সমুচিত মূল্যায়নে প্রস্তুত ছিলেন। তাই তিনি বলতেন, ‘সূত্রমতে আমরা এখনো পর্যন্ত নিশ্চিত কে নিশ্চিতো-ই বলবো। কিন্তু এখন অনেকেই নিশ্চিত্ বলছেন দ্বিধাহীন চিত্তে। হয়তো এমন একদিন আসবে, যখন মুখের ভাষার গতিময়তা নিশ্চিতো কে নিশ্চিত্, স্থগিতো কে স্থগিত্ করে ফেলবে। তখন আমাদের মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর থাকবে না।’ ভাষার বদলে যাওয়াকে মেনে নিলেও মাতৃভাষাকে অবহেলা মেনে নিতে পরেননি বলেই কি বাঙলা উচ্চারণ অভিধান পরিমার্জন-পরিবর্ধন আর প্রমিত উচ্চারণের প্রশিক্ষণে এতটাই ব্যস্ত হয়ে ওঠেন যে শরীর সে-ধকল নিতে পারেনি। তাঁর ভাষায়, ‘শরীরের উপর বেশি ধকল গেলেতো তাড়াতাড়ি বিকল হবেই। এতো হলো একটি যন্ত্র। কেবল মন্ত্র দিয়েতো আর চালানো যায় না। আরাম যদি হারাম হয়, ব্যারামতো তখন ধরবেই।’ ব্যারাম ব্যক্তি নরেন বিশ্বাসকে নিয়ে গেলেও তাঁর মননশীল সৃষ্টিকর্ম আমাদের কাছে রয়েছে। তাঁর কর্মের মূল্যায়নেই তিনি মূল্যায়িত হবেন, কর্মের মধ্যেই বেঁচে থাকবেন।

এবার তিনি কতটুকু মূল্যয়িত আর কতটুকু অবহেলিত সে-প্রমাণ উপস্থাপন করা যাক। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির উদ্যোগে বিগত ৩০ এপ্রিল ১৯৯৩ তারিখে সোসাইটির অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘বাঙালীর ভাষাচিন্তা’ শীর্ষক সেমিনারের সমাপ্তি অধিবেশনে অধ্যাপক দানীউল হক বাঙালির উচ্চারণ চিন্তা বিষয়ক প্রবন্ধ পাঠ করেন পাঠ করেন। সে-প্রবন্ধে তিনি আধুনিক যুগের বাঙালির উচ্চারণ সংক্রান্ত অনুভাবনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেন এবং পরিশিষ্ট: খ-তে ‘‘আশির দশক থেকে বাংলাদেশে প্রকাশিত বাঙলা উচ্চারণ বা ধ্বনিতত্ত্ব সম্পর্কিত এগারোটি প্রবন্ধের উল্লেখ করলেও নরেন বিশ্বাসের নাম বা তাঁর ‘বাংলা উচ্চারণ’ (১৯৮৪) প্রবন্ধের প্রসঙ্গ কোথাও পাওয়া যায় না। হতে পারে এটি অধ্যাপকের অগোচরে রয়ে গেছে, অবহেলা নয়। তবে মূল প্রবন্ধের ‘উচ্চারণের প্রায়োগিক প্রসঙ্গ’ অংশে মহাম্মদ দানীউল হক ‘অপূর্ণাঙ্গ’ তিনটি বাংলা উচ্চারণ অভিধানের প্রসঙ্গে লিখেন, ‘অনুরূপ সর্বশেষ প্রকাশনার কৃতিত্ব বাংলা একাডেমীর। একাডেমী প্রকাশিত নরেন বিশ্বাস-এর বাঙলা উচ্চারণ অভিধান (১৯৯০) এবং গণমাধ্যম প্রকাশিত অভিধান প্রণয়ন কাজে যাঁরা সংশ্লিষ্ঠ ছিলেন তাঁরা প্রায় অভিন্ন ব্যক্তিবর্গ: (আনিসুজ্জামান, সনজিদা খাতুন, হায়াৎ মামুদ, জামিল চৌধুরী, নরেন বিশ্বাস এবং ওয়াহিদুল হক) উচ্চারণের নিয়ম সম্পর্কে মতৈক্য প্রকাশে সচেষ্ট হয়েছেন, কিন্তু ব্যতিক্রম সম্পর্কে মতান্তর/ মতপার্থক্য মেটাতে পারেননি।’’ (মহাম্মদ দানীউল, ১৯৯৪: ১২০)। প্রথম কথা, সর্বশেষ বাঙলা উচ্চারণ অভিধানটি বাংলা একাডেমি প্রকাশ করলেও এটি নরেন বিশ্বাসের একক কাজ। আর পরের বাক্য পাঠে যেকোনও পাঠকের মনে হতে পারে গণমাধ্যম ও একাডেমি প্রকাশিত দুটো অভিধান-ই বন্ধনীভুক্ত ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে প্রণীত। এভাবে নরেন বিশ্বাসের প্রতি বাংলা একাডেমির অবহেলা অপনোদনের চেষ্টাও অস্পষ্ট হয়ে ওঠে, অভিজ্ঞ অধ্যাপকের আন্তর্জাতিক সেমিনারে পঠিত ও পরে প্রকাশিত প্রবন্ধে। অবশ্য, অধ্যাপক মহাম্মদ দানীউল হকের মত বাংলাদেশের স্বীকৃত ভাষাবিজ্ঞানীর এমন ভুল হবার কথা নয়। অনুমান করি, ‘প্রায় অভিন্ন ব্যক্তিবর্গ’ পদবন্ধে বহুবচন প্রয়োগ করে তিনি ঈঙ্গিতে একবচন বা একব্যক্তির কাজকেই নির্দেশ করেছেন।

বাংলা একাডেমী ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’-এর পরিমার্জিত সংস্করণে (২০০০) সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংযোজন হল প্রায় প্রতিটি ভুক্তিতে তৃতীয় বন্ধনী ব্যবহার করে উচ্চারণ দেখানো। এটিই তখনকার সময়ে একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বাংলা অভিধান, যাতে শীর্ষশব্দের উচ্চারণটি পাওয়া যায়। তবে এখানে নরেন বিশ্বাস অবহেলিত নন। কেননা অভিধানের সহযোগী সম্পাদকের ভাষায়: ‘উচ্চারণ নির্দেশের কাজে বাংলা একাডেমী প্রকাশিত নরেন বিশ্বাস প্রণীত বাংলা একাডেমী বাংলা উচ্চারণ অভিধান ২য় সংস্করণ থেকে ব্যাপক সাহায্য গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলা উচ্চারণ বিষয়ক সূত্রসমূহের জন্য উক্ত গ্রন্থের ভূমিকা দ্রষ্টব্য।’ (স্বরোচিষ, ২০০০: ২৩)। এখানে নরেন বিশ্বাস স্বীকৃত এবং তাঁর সৃষ্টিকর্ম আদর্শ হিসেবে গ্রহীত। অন্যদিকে, জামিল চৌধুরী সংকলিত ও সম্পাদিত বাংলা একাডেমী ‘বাংলা বানান-অভিধান’ (১৯৯৪) গ্রন্থটিতে প্রথমে শুধু বানান এবং প্রথমবন্ধনীতে পদনাম উল্লেখ ছিল। পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত দ্বিতীয় সংস্করণে (২০০১) সংযোজিত হয় আন্তর্জাতিক ধ্বনিলিপি (আইপিএ)-তে বাংলা শব্দের প্রতিবর্ণীকরণ। আইপিএ (ধ্বনিলিপির) ব্যবহার বাংলাদেশের কোনও বাংলা অভিধানে এই প্রথম। অথচ ১৯৮৪-তে প্রকাশিত হলে নরেন বিশ্বাস প্রণীত ‘বাঙলা উচ্চারণ অভিধান’ সে-গৌরব পেতে পারত। বানান-অভিধানের পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত তৃতীয় সংস্করণে (২০০৮) পৃথকভাবে বাংলায় উচ্চারণ নির্দেশ সংযোজিত হয় আর বর্জিত হয় পদনাম। এই সংস্করণে আরও বর্জিত হয়: ‘গরু’, ‘শহীদ’ ইত্যাদি বহুল ব্যবহৃত বাংলা বানান; সংযোজিত হয় ‘ইদ’ ইত্যাদি বিকল্প বানান। বানান আমাদের বর্তমান প্রবন্ধের বিষয় নয় বলে সে-প্রসঙ্গে যাচ্ছিনে। বানান-অভিধানের ‘সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি’-তে গণমাধ্যম ইনসটিটিউট-এর ব্যবহারিক বাংলা অভিধান (১৯৮৫) এবং বাংলা একাডেমী ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ (২০০০)-এর উল্লেখসহ আরও নয়জন অভিধানকারের নামসহ অভিধানের নাম থাকলেও নরেন বিশ্বাসের নাম নেই। এমনকি কৃতজ্ঞতা স্বীকারপত্রেও নেই নরেন বিশ্বাস। একই অবস্থা জামিল চৌধুরী সম্পাদিত বাংলা একাডেমি ‘আধুনিক বাঙলা অভিধান’ (২০১৬) গ্রন্থেও। এ-অভিধানে আইপিএ-এর পরিবর্তে বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করে উচ্চারণ দেখানো হয়েছে। এ-গ্রন্থের সহায়ক গ্রন্থপঞ্জিতে ব্যবহারিক বাংলা অভিধানও বর্জিত হয়ে সংযুক্ত হয়েছে সম্পাদকের সংকলিত বাংলা একাডেমী বাংলা বানান-অভিধান। আবার বাংলা একাডেমী ‘প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ’ (২০১১) গ্রন্থের কোথাও এমনকি আলোচিত ‘অভিধান সংকলন’ অংশেও নেই নরেন বিশ্বাস বা ‘বাঙলা উচ্চারণ অভিধান’-এর নাম। এভাবে বাংলা একাডেমির বইয়ে একদিকে বর্জিত হন নরেন বিশ্বাস আরেক দিকে ২০১৭ খ্রিস্টাব্দেও বাংলা একাডেমি থেকে পুনর্মুদ্রিত হয় নরেন বিশ্বাস প্রণীত ‘বাঙলা উচ্চারণ অভিধান’। অনুধাবন করতে অসুবিধা হয় না যে, আমরা অনেকেই নরেন বিশ্বাসকে অবহেলা করতে চাই কিন্তু তাঁর অভিধানের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করতে পারিনে। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত আরও তিনটি অভিধানে বাংলা উচ্চারণ সংযোজিত হলেও নরেন বিশ্বাসের ‘বাঙলা উচ্চারণ অভিধান’ পাঠকপ্রিয়তা হারায়নি।

বাংলা ধ্বনিশাস্ত্রকে বাঙালির মুখের ভাষায় প্রয়োগের যে সফলতা নরেন বিশ্বাস দেখিয়েছেন সেই ধারা এগিয়ে নিয়ে যেতে তাঁকে স্বীকার করে তাঁর অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্ত করলেই বরং বাংলা ব্যাকরণের অনেকটা অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করবার পথে অগ্রসর সম্ভব। রবীন্দ্রনাথের দেবযানী কচকে অভিশাপ দিয়ে বলেছিল: যে বিদ্যার তরে/ মোরে করো অবহেলা সে বিদ্যা তোমার/ সম্পূর্ণ হবে না বশ; তুমি শুধু তার/ ভারবাহী হয়ে রবে, করিবে না ভোগ/ শিখাইবে, পারিবে না করিতে প্রয়োগ। আমরা সেই ভাষাতাত্ত্বিকের প্রতীক্ষায় ছিলাম, যিনি কোনও এক দেবযানীর অভিশাপকে অতিক্রম করে তাঁর বিদ্যাকে প্রয়োগ করতে সক্ষম হবেন বাংলা ভাষার কাঠামো নির্মাণে (রাজীব হুমায়ুন, ১৯৯৪: ১৩৭)। ধ্বনিশাস্ত্রী নরেন বিশ্বাসকে সেই প্রতীক্ষিত পণ্ডিত মনে হয়; তিনি বাংলা ধ্বনিশাস্ত্র শিখেছেন, শিখিয়েছেন এবং তা প্রয়োগ করে উচ্চারণ অভিধান প্রণয়ন করেছেন। কারও নিশ্চয় বলতে দ্বিধা নেই যে, কার্যত বাংলাদেশে বাংলা ভাষা আজও স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। সে লক্ষ্যে প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট ভাষানীতির আলোকে ভাষা-পরিকল্পনা। ভাষা-পরিকল্পনার দুটো দিক: অবস্থান পরিকল্পনা ও অবয়ব পরিকল্পনা। প্রথমটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বিষয় আর দ্বিতীয়টি ভাষাবিজ্ঞানের। ভাষার অবয়ব বা কাঠামোর দুটো দিক: লৈখিক ও মৌখিক। মৌখিক ভাষার কাঠামো পরিকল্পনায় প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ আজ সময়ের দাবি। নরেন বিশ্বাসের কাঠামোকে ভিত্তি করে, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলা ভাষার অভিধানের একটি ইলেকট্রনিক সংস্করণ বা ই-বুক প্রকাশ প্রয়োজন; যেখানে প্রতিটি শব্দের বানান-অর্থের পাশাপাশি উচ্চারণও শোনা যাবে। এতে করে নরেন বিশ্বাসের প্রতিও সম্মান জানানো যাবে, আর প্রমিত বাংলাভাষার কাঠোমোও প্রতিটি বাঙালির মুঠোফোনে পৌঁছে দেওয়া যাবে সহজেই। অবশ্য সেজন্যে ভাষা-পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয়-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবসায়ী মনোভাব বদলে মাতৃভাষাপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে হবে।

তথ্যসূত্র:
আনিসুজ্জামান, ‘ভূমিকা’, বাঙলা উচ্চারণ অভিধান, (নরেন বিশ্বাস), ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ১৯৯০।
জামিল চৌধুরী, ‘ভূমিকা’, ব্যবহারিক বাংলা উচ্চারণ অভিধান, (আনিসুজ্জামান প্রমুখ সম্পা.), ঢাকা: জাতীয় গণমাধ্যম ইন্সটিটিউট, ১৯৮৮। 
নরেন বিশ্বাস, ‘মুখবন্ধ’, বাঙলা উচ্চারণ অভিধান, ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ১৯৯০।
মনসুর মুসা, ‘সম্পাদকের ভূমিকা’, চার্লস ফার্গুসন ও মুনীর চৌধুরী, বাঙলা ধ্বনিমূল, (অনু. কাজী মাহবুব হোসেন), ঢাকা: নবযুগ প্রকাশনী, ২০১০।
মহাম্মদ দানীউল হক ‘বাঙালীর বাঙলা উচ্চারণ সংক্রান্ত চিন্তা: ঐতিহাসিক পর্যালোচনা’, বাঙালীর বাঙলাভাষা চিন্তা, মনসুর মুসা (সম্পা.), ঢাকা: এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ১৯৯৪। 
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাংলা শব্দতত্ত্ব, কলকাতা: বিশ্বভারতী, ১৯৮৪।
রাজীব হুমায়ুন ‘বাঙালীর বাঙলাভাষাতত্ত্ব সম্পর্কিত চিন্তা: ঐতিহাসিক পর্যালোচনা’, বাঙালীর বাঙলাভাষা চিন্তা, মনসুর মুসা (সম্পা.), ঢাকা: এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ১৯৯৪।
শ্যামল কান্তি দত্ত, সিলেটের উপভাষা: ব্যাকরণ ও অভিধান, ঢাকা: আগামী প্রকাশনী, ২০১৮। 
শ্যামাচরণ গাঙ্গুলি, ‘বেঙ্গলি স্পোকেন অ্যান্ড রিটেন’, অনু. মোহাম্মদ আজম, বাংলা ও প্রমিত বাংলা সমাচার, ঢাকা: প্রথমা প্রকাশন, ২০১৯।
সন্‌জীদা খাতুন, ‘অনুবাদের কথা’, চার্লস ফার্গুসন ও মুনীর চৌধুরী, বাঙলা ধ্বনিমূল, (অনু. কাজী মাহবুব হোসেন), ঢাকা: নবযুগ প্রকাশনী, ২০১০।
সাখাওয়াৎ আনসারী, ‘বাংলা ভাষা-পরিকল্পনা’, প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ (২য় খণ্ড), (রফিকুল ইসলাম প্রমুখ সম্পাদিত), ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০১১।
স্বরোচিষ সরকার, ‘পরিমার্জিত সংস্করণের মুখবন্ধ ও ব্যবহারবিধি’, ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০০০।
হুমায়ুন আজাদ, ‘ভূমিকা’, প্রসঙ্গ: বাংলা ভাষা, (নরেন বিশ্বাস), ঢাকা: অনন্যা, ১৯৮৪।
হুমায়ুন আজাদ, ‘মুখ্যবন্ধ’, মুহম্মদ আবদুল হাই রচনাবলী (খণ্ড ৩), ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ১৯৯৪।
চিত্র : গুগল

ভাষাশিক্ষা ও রবীন্দ্রনাথ

সিলেটি ভাষার বাগর্থতত্ত্ব

4.5 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Dr. Shamal kanty Datta
Dr. Shamal kanty Datta
2 years ago

thanka

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »