Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

কবিতার কাছে কোনও দাবিও ছিল না: বিষ্ণু বিশ্বাস

জায়গা ছিল না কোনো কথা বলবার, শুনবার।
সমুদ্রের ধারে যেতে পথের বাদাম গাছগুলি
মিহি কথার কৌতুকে পাথর ফুলের ধাক্কা দিল
আমি কী বলেছিলাম, তোমরা শুনেছো যারা বেশি
শোনাবে— একটুখানি। আমি ভুলে গেছি জন্ম আছে।
কিছু যন্ত্রণার কথা যেভাবে বলেছি মনে নেই
একটু আনন্দ কথা, রয়েছে গোলাপি স্তম্ভে স্থির
অন্ধ থেকে চোখে জেগে সমুদ্র বালির স্তূপে, দেখি।

কবি বিষ্ণু বিশ্বাসের ‘বলবার ছিল’ কবিতার উজ্জ্বল পঙ্‌ক্তিমালা। গত শতকের আটের দশকের কবির ‘বলবার ছিল’, অথচ ‘জায়গা ছিল না’! কী সেই ‘পাথর ফুলের ধাক্কা’, যা কাটিয়ে উঠতে না পেরে একদিন আচম্বিতে স্বদেশের ঠিকানা থেকে, কবিতার ভুবন থেকে এবং নিজের থেকেই নিজে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন! সব স্মৃতি ও সত্তা মুছে ফেলে অন্তরালবাসী হয়েছিলেন! কোন অভিমানে ভুলে গিয়েছিলেন ‘জন্ম’ ও ‘যন্ত্রণার কথা’? হারিয়ে যাওয়ার দীর্ঘ দু’দশক পর মিলেছিল তাঁর সন্ধান। তখন তিনি অন্য এক নিভৃত জগতের বাসিন্দা। এরপর কেটেছে আরও দশটি বছর। এখন তিনি সচেতন, মৃদুভাষ। সেই মৃদু অথচ স্পষ্টভাষণ শুনেছেন শুভঙ্কর সাহা। সঙ্গী শুভদীপ রায়।

প্রশ্ন : বিষ্ণুদা, কেমন আছেন?
উত্তর : ভাল।

প্রশ্ন : এই কোভিড অতিমারির কালে ধীরে ধীরে ছন্দে ফিরছে পৃথিবী। মাঝের সময়টায় ভয় লাগেনি?
উত্তর : তেমন না। আমি তো বাইরে কোথাও যাই না।

প্রশ্ন : কীভাবে সময় কাটছে? নতুন লেখা কিছু…
উত্তর : (একটু থেমে) এই কেটে যাচ্ছে। না, নতুন লেখা কিছু পারছি না।

প্রশ্ন : আপনার লেখা অনেকে পড়তে চাইছেন, আপনার কথা জানতে চাইছেন, তাদের জন্য কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে না?
উত্তর : আসলে আসছে না। তাগিদ অনুভব করছি না ভেতর থেকে।

প্রশ্ন : আপনার লেখালেখির শুরুর কথা যদি বলেন…
উত্তর : স্কুলে পড়ি তখন। নাইন-টেন হবে।

প্রশ্ন : কাদের লেখা পড়তে ভাল লাগত?
উত্তর : রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ। নজরুলও ভাল লাগত। অনেকের লেখা যেমন, শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, (একটু থেমে) মহাদেব সাহা, আরও অনেকের।

প্রশ্ন : আপনার তো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। কোন সময়টা?
উত্তর : ওটা ওই আশির মাঝামাঝি।

প্রশ্ন : আপনাদের তো একটা লিটল ম্যাগাজিন ছিল ‘পেঁচা’। বন্ধুদের কথা মনে আছে?
উত্তর : বেশ কয়েকজন বন্ধু মিলে করেছিলাম। পত্রিকার কোনও সম্পাদক ছিল না।

প্রশ্ন : বন্ধুরা যারা লিখতেন একসাথে…
উত্তর : হ্যাঁ, অসীম, সরকার মাসুদ, মো. কামাল।

প্রশ্ন : শুনেছি আপনি ভাল আবৃত্তি করতেন। আবৃত্তিচর্চার সঙ্গী ছিলেন নিশাত জাহান। তাঁর কথা যদি কিছু বলেন।
উত্তর : আমার বন্ধু। ভাল বন্ধু।

প্রশ্ন : আর দেখা হয়েছে?
উত্তর : অনেক পরে। কথা হয়েছে কয়েকবার।

প্রশ্ন : আপনার একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘ভোরের মন্দির’, নিশাতের প্রকাশনা থেকেই তো বেরিয়েছিল?
উত্তর : ওরাই বের করেছিল। ওটা ১৯৯২ সাল নাগাদ।

প্রশ্ন : আপনি তো সে সময়ে ঢাকায় নেই?
উত্তর : না। বন্ধুরাই কবিতা যোগাড় করে ছেপেছিল। আমি কিছু জানি না।

Advertisement

প্রশ্ন : তার মানে এর অধিকাংশ কবিতাই তো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন লেখা?
উত্তর : হ্যাঁ, হ্যাঁ। তারপর তো…

প্রশ্ন : কবে জানতে পারলেন বইয়ের কথাটা? বইটাই বা হাতে পেলেন কবে?
উত্তর : অনেক পরে। বছর কুড়ি পরে। ওরা আমাকে খুঁজে দিয়ে গিয়েছিল।

প্রশ্ন : আপনার এই কাব্যগ্রন্থের বেশ কিছু কবিতায় সমুদ্রের কথা এসেছে। সমুদ্র আপনার খুব পছন্দের বোধহয়!
উত্তর : ঠিকই। (চোখে উদাস চাহনি) সমুদ্রের বিস্তার আমাকে টানে।

প্রশ্ন : আপনার একটি কবিতায় পড়েছি— ‘একা আছি/ অনেকদিন অন্ধকারে/ অনেকদিন রক্তের ভিতরে স্তম্ভিত আকাশ/ সমুদ্র দ্যাখেনি’। কিছু বলুন না এই পঙ্‌ক্তিগুলো নিয়ে…
(কিছুই বললেন না। কিন্তু মুখের রেখায় যেন বিষন্নতা ফুটে উঠল।)
আপনি কি কিছুদিন সাংবাদিকতাও করেছিলেন?
উত্তর : হ্যাঁ, অল্প কিছুদিন। ঢাকার দৈনিক কাগজ ‘দিনকাল’। কাগজের সাব-এডিটর মত।

প্রশ্ন : কবি হিসেবে আশির দশকের বাংলাদেশে সাড়া জাগানো নাম বিষ্ণু বিশ্বাস। তারুণ্যের দাপটে, ঔদ্ধত্যে তখন জেগে উঠছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। সেই আশির দশকে বা নব্বইয়ের প্রথমে ‘একুশে’-র উদযাপন কেমন ছিল?
উত্তর : একটা কষ্ট ছিল… কোথাও একটা বেদনা জড়িয়ে থাকত।

প্রশ্ন : শুনেছি, অতিমারির বছর-খানেক আগে একবার ঢাকায় গিয়েছিলেন।
উত্তর : বন্ধুরা নিয়ে গিয়েছিল।

প্রশ্ন : তখন কি বন্ধুসঙ্গে কবিতা এসেছে?
উত্তর : বেশ কিছু লিখেছি। ওদের কাছে আছে।

প্রশ্ন : সেগুলো নিয়ে একটা বই হলে ভাল হয়।
উত্তর : আমি ঠিক জানি না। মনে হয় ওরা করবে।

প্রশ্ন : মাপ করবেন, আবার জিজ্ঞেস করছি, এখানে বসে কি কবিতা লিখতে ইচ্ছে করছে না?
উত্তর : ঠিক জানি না। তবে শুনতে ভাল লাগে। আপনার একটা কবিতা পড়ুন না!
(কবির অনুরোধে একটা নয়, দুটো কবিতা পড়তে হল। চুপ করে শুনলেন। তারপর ছোট্ট মন্তব্য করলেন, ‘বেশ’।)

প্রশ্ন : শুনেছি কবি বিভাস রায়চৌধুরী, মৃদুল দাশগুপ্ত এঁরা আপনার পরিচিত। এদের সঙ্গে কোথায় আলাপ?
উত্তর : বিভাস এসেছিলেন। দেখা হয়েছে। ঢাকাতে ওঁর বই পড়েছি।

প্রশ্ন : আর মৃদুলদা?
উত্তর : একবার মৃদুলদার বাড়ি গিয়েছিলাম। ঢাকাতেও দেখা হয়েছিল।

প্রশ্ন : এবার শেষ করব। একজন কবি হয়ে ওঠার ব্যাপারটা কী চোখে দেখেন?
উত্তর : দেখুন, কবি হয়ে ওঠা… দেশ, মানুষ এদের সবার প্রতি ভালবাসা থাকতে হবে। না হলে কবি হওয়া যায় না।

প্রশ্ন : দু’দেশেই আপনার কবিতার অনুরাগী রয়েছেন। আপনার নিজের কি মনে হয়, আপনার কবিতা বিস্মৃতির অথবা স্বীকৃতির যোগ্য?
উত্তর : সেরকম বেশি কবিতাও লেখা হয়নি… কবিতার কাছে কোনও দাবিও ছিল না।

চিত্র :  শুভঙ্কর সাহা

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

8 + ten =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »
সালমিন রহমান

বেলুচিস্তান সংকট মোকাবিলা কতটা সহজ

বেলুচিস্তানের সংকটকে কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদ কিংবা কেবল নিরাপত্তা সমস্যার দৃষ্টিতে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি বোঝা যায় না। এখানে ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, প্রাকৃতিক সম্পদ, উন্নয়ন বৈষম্য, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা— সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্বাধীন বেলুচিস্তান গঠিত হলে বহু মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে পারে। একই সঙ্গে একটি নতুন রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াবে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা। অন্যদিকে, পাকিস্তান, চীন, ভারত এবং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও দুই বিখ্যাত বাঙালি

কী অসাধারণ শিক্ষাই না আমরা পেতে পারি, উৎসাহিত হয়ে পারি খেলোয়াড়দের থেকে! একটি উদাহরণ: প্রথম বিশ্বকাপে সোনাজয়ী উরুগুয়ে দলে ছিলেন হেক্টর কাস্ত্রো। তেরো বছর বয়সে মেশিনে তাঁর ডানহাত কাটা পড়েছিল। অদম্য উৎসাহে তিনি ফুটবল খেলেছেন, জাতীয় দলে স্থান করে নিয়েছেন, আর ফাইনালে জয়সূচক গোলটিও তাঁর-ই করা! তাঁর স্বদেশবাসী তাঁকে ডাকতেন— ‘এল ডিভিনো মানকো’, অর্থাৎ একহাত-বিশিষ্ট ঈশ্বর।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আমেরিকার স্বাধীনতা: আড়াইশো বছর

১৬০৭ থেকে ১৭৮৩ পর্যন্ত সময়কাল আমেরিকায় ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক রাজত্ব। আজকের দিনে যে আমেরিকা, তা কিন্তু পুরোটা ব্রিটিশদের দখলে ছিল না। ছিল ভার্জিনিয়া, ম্যাসাচুসেটস, নিউ ইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া-সহ ১৩টি রাজ্য। আর কানাডার বেশ কিছু অঞ্চল। আমেরিকার অন্যান্য স্থানে ফরাসি, ডাচ, নরওয়েজিয়, সুইডিস উপনিবেশ-ও ছিল। তাছাড়া রাশিয়া আমেরিকার আলাস্কা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত দখল করে। পরে সে আলাস্কা আমেরিকার কাছে বিক্রিও করে দেয়।

Read More »
অপরাজিতা মৈত্র

গোদাবরীর গোমুখে

গঙ্গার মর্ত্যে আগমন নিয়ে যেমন ভগীরথের গল্প, তেমনই গোদাবরীর উৎসস্থলে না এলে জানা যেত না, দক্ষিণের গঙ্গা নিয়েও আছে হাজার গল্প। যে গল্প জানাবে আজও এই অঞ্চলের মানুষ অনেক সময়েই কাছাকাছি আর কোনও পানীয়জল না পেয়ে কষ্ট করে হলেও এই উৎসস্থলে এসেই শীতল এই পানীয়জল নিয়ে যান নিজেদের কাজের জন্য। গঙ্গা বা অন্য নদী সে শুধু ধার্মিক আবেগের কারণে পবিত্র না, হাজার প্রাণীর ‘তৃষ্ণা’ মেটাবার জন্য সে হয়ে ওঠে ‘দেবী’ বা ‘পবিত্র’। সে পথে মিশে যায় হাজার গল্প-কষ্ট কিংবা দিনযাপনের চরম বাস্তবতা।

Read More »
রুহ

রুহের কবিতাগুচ্ছ

একই আলোকমালায় কাটিয়েছি/ বহুকাল দু’জনে…/ বলিনি কখনও।/ তারা খসা দেখেছি একসাথে, যদিও/ গোপন থেকেছে চাওয়া-পাওয়া।/ মাঝে বহুদিন, বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো/ একা… নীরবে বয়েছি যাতনা।/ আজ মিথ্যের নেই অবকাশ/ তোমাকে কি পড়েনি মনে/ কোনও মুহূর্ত বা ক্ষণে/ ভাবিনি কি একান্ত বন্ধু আমার—/ এতদিন পরে, পুনর্মিলনে বলেছ/ পাখি হতে চেয়েছিলে এ জীবনে

Read More »