
বিশেষ নিবন্ধ: ড. শ্যামল কান্তি দত্ত
উমা ও মা দুর্গা ‘উমা যারায়গি নি গো তিন দিন থাকিয়া, শিবর লাগি কিতা নেরায় কটরা ভরিয়া?’ অর্থাৎ, তিন দিন থেকেই চলে যাচ্ছ নাকি গো

উমা ও মা দুর্গা ‘উমা যারায়গি নি গো তিন দিন থাকিয়া, শিবর লাগি কিতা নেরায় কটরা ভরিয়া?’ অর্থাৎ, তিন দিন থেকেই চলে যাচ্ছ নাকি গো

India’s First Bengali Daily Magazine. কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) প্রায় শত বছর আগে (১৯২২ খ্রি.) তাঁর নিজের সম্পাদিত অর্ধসাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার দুর্গাপূজা সংখ্যায় লেখেন ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি। এই কবিতা প্রকাশের অভিযোগে ব্রিটিশ শাসকগণ পত্রিকাটি বাজেয়াপ্ত করে এবং রাজদ্রোহের অভিযোগে কবিকে এক বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়। কী কথা ছিল সে কবিতায়? কেন একজন ইসলামি শব্দের আড়ম্বরে আলোড়িত কবি দুর্গার স্তুতি গান গাইলেন? কেন বার বার দুর্গা-শিবের নাম নিলেন? দুর্গাপুজোর গান লিখলেন? কী তার স্বরূপ?

সাধারণ লেখাপড়া-জানা লোক অভিধান এবং শব্দ, এ দুয়ের সম্পর্ক দেখে ধারণা করে: শব্দই অর্থের আশ্রয় এবং তার ফলে শব্দের অর্থ জুড়ে জুড়েই বাক্যের অর্থ তৈরি হয়। অবশ্য ভাষাবিজ্ঞান শৃঙ্খলায় ‘অর্থের’ পরিসীমা এখানেই শেষ নয়। কারণ কোনও শব্দের অর্থ তার অঙ্গে নিহিত নয় বা নিত্যসম্পর্কিত নয়, তা আরোপিত এবং কোনও এক ভাষাগোষ্ঠীতে দীর্ঘ ব্যবহারের দ্বারা গৃহীত।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ভাষাশিক্ষায় গলদের কারণে বা শিক্ষার মাধ্যম ভাষার সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গঠনের অভাবে— এই একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসেও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি বা বিজ্ঞানমনস্কতায় নিদারুণ খরা দেখছি। অনেক বিজ্ঞানের শিক্ষক স্বয়ং বস্তুবিশ্বের গতিময়তার ধর্ম তথা বিবর্তনবাদ মন থেকে মানতে পারেন না। তার কারণ ‘সে শিক্ষা কেবল যে আমাদিগকে কেরানিগিরি অথবা কোনো একটা ব্যবসায়ের উপযোগী করে মাত্র।’

উচ্চারণের মত প্রাত্যহিক অথচ অদৃশ্য-জটিল বিষয় নিয়ে গবেষণা করে, উচ্চারণের নিয়ম আবিষ্কার করে, নিয়ম প্রমাণ করে উদাহরণ উল্লেখসহ প্রবন্ধ লিখে আর উচ্চারণ-অভিধানে প্রয়োগ করেই থেমে থাকেননি নরেন বিশ্বাস। অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি প্রশিক্ষণে-কর্মশালায় প্রতিনিয়ত বক্তৃতা-ভাষণে প্রমিত উচ্চারণ বাকশিল্পীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে, শিক্ষিত-সাধারণ জনগণকে সচেতন করতে সদা সক্রিয় ছিলেন। তাঁর উচ্চারণ বিষয়ক ভাষণগুলোও আকর্ষণীয়, ছন্দময় ও সহজ-সরল ভাষায় উপস্থাপিত।

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

বেলুচিস্তানের সংকটকে কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদ কিংবা কেবল নিরাপত্তা সমস্যার দৃষ্টিতে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি বোঝা যায় না। এখানে ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, প্রাকৃতিক সম্পদ, উন্নয়ন বৈষম্য, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা— সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্বাধীন বেলুচিস্তান গঠিত হলে বহু মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে পারে। একই সঙ্গে একটি নতুন রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াবে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা। অন্যদিকে, পাকিস্তান, চীন, ভারত এবং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।