Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

‘ভবিষ্যৎ শিষ্য’ হতে চেয়ে মালদার কিশোর চিঠি দেয় রবীন্দ্রনাথকে

না, রবীন্দ্রনাথ কখনও মালদায় আসেননি।

এমনকি দার্জিলিং হয়ে শিলং পাহাড়ে যাওয়ার সময়ও ফরাক্কা পেরোননি তিনি— বিকল্প পথ ধরেছিলেন। কিন্তু হরিশ্চন্দ্রপুরের বিধুশেখর শাস্ত্রী বা চাঁচলের শিবরাম চক্রবর্তীর মত ব্যক্তিত্বদের মাধ্যমে মালদার সঙ্গে একটা পরোক্ষ যোগাযোগ ছিল বিশ্বকবির।

বিশ্বভারতীর একেবারে প্রথম দিন থেকে রবীন্দ্রনাথের কাছের মানুষ ‘শাস্ত্রীমশাই’। সংস্কৃত ও পালির বিরাট পণ্ডিত, অথচ যেকোনও গোঁড়ামি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত— এটাই ছিল বিধুশেখরের ঘরানা। আচার্যের বেদিতে বসে আরবি কবি ইমাম গজ্জালির কবিতা উদাত্তকণ্ঠে আবৃত্তি করছেন, আবার আশ্রমের মৌলানা শওকত আলিকে জড়িয়ে ধরে তাঁকে নিয়ে যাচ্ছেন আশ্রমের খাবার ঘরে— এ ছিল শান্তিনিকেতনের এক পরিচিত দৃশ্য।

আর চাঁচলের শিবরামকে রবীন্দ্রনাথ চিনতেন তরুণ কবি হিসাবে, তখনও তিনি রসসাহিত্যিক হয়ে ওঠেননি। ১৯২৯ সালে বেরোচ্ছে শিবরামের দুটি কাব্যগ্রন্থ— ‘চুম্বন’ আর ‘মানুষ’। কবিতার সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েও ওই বছরের ১০ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘ চিঠি লিখছেন তরুণ শিবরামকে— ‘‘…তোমার কাব্যদুটি পড়েছি। ভাষা ও ছন্দের উপর তোমার অধিকার আছে সে আমি পূর্বেই দেখেছি।’’

শিবরামের মতই মালদার কালিয়াচকের এক কিশোর শিষ্য হতে চেয়ে চিঠি দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। তারও উত্তর দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এই অনালোচিত পত্রালাপকে কেন্দ্র করে আলোড়ন পড়েছে গবেষকমহলে।

‘‘… আমার কবিতা মালদার পত্রিকায় উঠে, তাই চিনে আমার কবিতাকে সকলেই কিন্তু সন্দেহ আছে আমায় চিনে কি না?
আপনার শিষ্য হ’লে আমার কি কি নিয়ম অবলম্বন করতে হ’বে জানাবেন?

পড়াশোনা ভাল লাগে না। কবিতা আজ আমায় মাতোয়ারা করেছে।’’

২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৮-এ মালদা ডাকঘর থেকে শান্তিনিকেতনে প্রেরিত এই চিঠির নিচে স্বাক্ষর ছিল— ‘‘ইতি/ ভবিষ্যৎ শিষ্য/ এ, কে, এস, নূর মোহাম্মদ/ মালদহ জিলা স্কুল/ নবম শ্রেণী; (মালদহ)’’

নোবেল পাওয়া বিশ্বকবির কাছে প্রতিদিনের ডাকে এরকম অসংখ্য চিঠি আসত, কিন্তু কবি উত্তর দিতেন বেছে বেছে। আর এইখানেই চমক। মালদা জিলা স্কুলের ক্লাস নাইনের এই ছাত্রটির আকুল চিঠির প্রাপ্তিস্বীকার করে ও আশীর্বাদ জানিয়ে ঠিক দু’দিনের মধ্যে অর্থাৎ ২৪ ফেব্রুয়ারি শান্তিনিকেতন থেকে উত্তর দেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ— ‘‘কল্যাণীয়েষু, তোমার পত্র পেয়ে খুশি হলাম। তুমি আমার আশীর্বাদ গ্রহণ করো। শুভার্থী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শান্তিনিকেতন, ২৪/২/৩৮।’’

মালদা জেলার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগের এই নতুন সূত্রটি তোলপাড় তৈরি করেছে রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ ও গবেষকমহলে। রবীন্দ্র গবেষকদের একাংশের মতে, ১৮ খণ্ডের চিঠিপত্র ছাড়াও বিশ্বভারতী মহাফেজখানায় প্রচুর ফাইলে এরকম নানা চিঠিপত্র রাখা আছে, যার একটা বড় অংশই অগ্রন্থিত। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে নূর মোহাম্মদের চিঠিটি ও রবীন্দ্রনাথের উত্তরের কপি। সেক্রেটারির নোট থেকে প্রমাণিত, কবি নিজে পড়ে এই চিঠির উত্তর দিয়েছেন।

কে এই এ. কে. এস. নূর মোহাম্মদ? তার উত্তর রয়েছে চিঠিটির মধ্যেই। নূর মোহাম্মদের জন্ম ১৯২৩ সালের ১ জানুয়ারি বর্তমান কালিয়াচকের অন্তর্গত গয়েশবাড়িতে। পরবর্তীকালে উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনে মালদা সদরে এসে জিলা স্কুলে ভর্তি হন এই প্রতিভাবান লেখক। প্রথম দিকেই সাহিত্যচর্চায় উৎসাহী। তাঁর কবিতা মালদহ সমাচার সহ নানা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হত। তথ্য বলছে, ওই স্কুল থেকে তিনি ১৯৪০ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। আই এ পর্যন্ত পড়েছিলেন তিনি। দেশভাগের সময় পূর্ববঙ্গের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের পদস্থ কর্মী হিসেবে সিলেট ও ঢাকায় কর্মরত ছিলেন। আ কা শ নূর মোহাম্মদ নামে তাঁর চারটি কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও ‘আসছে বছর’ নামে একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে। একমাত্র গল্পগ্রন্থ ‘এই স্বাধীনতা’। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তাঁর কবিতা-গল্প জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশের দিনাজপুরে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় তার ‘বস্তুবাদী রবীন্দ্রনাথ’ নামের একটি উচ্চমানের প্রবন্ধের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা।

তাঁদের একাংশের মত: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র এবং বিশ্বভারতীর প্রথম উপাচার্য রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিতর্কিত আত্মজীবনী ‘অন দ্য এজেস অফ টাইম’-এ তরুণ কবিযশোপ্রার্থীদের চিঠির উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের নির্বাচনের বিষয়টি সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন— সব চিঠির উত্তর কখনওই তিনি দিতেন না, কারও মধ্যে সম্ভাবনা থাকলে তবেই দুকলম লিখতেন। তাহলে কি নূর মোহাম্মদের কবিতা পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ?

এর উত্তর— হ্যাঁ। কেননা রবীন্দ্রনাথকে লেখা চিঠির প্রথমে তার প্রাণের কবিগুরুর উদ্দেশে কিশোর কবি একটি ছয় লাইনের কবিতা লিখেছিলেন। কাঁচা হাতে লেখা হলেও ১৫ বছরের কিশোরের মধ্যে কবিত্বের ছাপ আবিষ্কার করেছিলেন স্বয়ং বিশ্বকবি। এছাড়াও চিঠিতে ছিল জিলা স্কুলে প্রচলিত শিক্ষা সম্পর্কে কিশোর নূরের অনীহা আর কবিগুরুর শিষ্য হওয়ার এক সরল গ্রামীণ আকুলতা।

চিরকালের স্কুলপালানো ছেলে রবীন্দ্রনাথ সতেরো বছর বয়সেই লিখে ফেলেছিলেন তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কবি-কাহিনী’। তাই হয়তো মালদার এই পনেরো বছরের অনামী কিশোর সেদিন বঞ্চিত হয়নি তাঁর স্নেহ আশীর্বাদ থেকে।

এ. কে. এস. নূর মোহাম্মদের মূল চিঠির অবয়বটি দেখাতে না পারলেও চিঠির সম্পূর্ণ বয়ানটি পাঠকের গোচরে আনা যেতে পারে বলে আমাদের বিবেচনা।

Malda

22.2.38

পত্র : তিন

সাকীদের আঁখি তুমি সরাব খানায়,
মাতোয়ারা করে দিলে কবিতা নেশায়;
এই সোনার বঙ্গে হে বিশ্বের কবি,
এঁকেছ কি মনোরম কল্পনার ছবি—
লহ হে পূজারী তুমি লহ আরবার।
লহ এ ক্ষুদ্র কবির শত নমস্কার।।

হে বিশ্ব বরেণ্য কবি—

Advertisement

আজ চিঠি লিখছি আপনাকে; ক্ষুদ্রজনের লেখা বলে নিক্ষেপ করবেন না আশা করি।

আমি আপনার শিষ্য হ’ব আর আপনি হবেন গুরু আমার—

আমি কয়েকখানা কবিতার বই লিখেছি কিন্তু অর্থাভাবে একটীও প্রকাশ করতে পারি নাই।

আমার কবিতা মালদার পত্রিকায় উঠে, তাই চিনে আমার কবিতাকে সকলেই কিন্তু সন্দেহ আছে আমায় চিনে কি না?

আপনার শিষ্য হ’লে আমার কি কি নিয়ম অবলম্বন করতে হ’বে জানাবেন?

আমি অতি গরীব পিতৃহীন বালক আমার জন্ম ১৯২৩ সালের ১লা জানুয়ারী।

পড়াশোনা ভাল লাগে না। কবিতা আজ আমায় মাতোয়ারা করেছে।

আমি আমার একখানা কবিতা পাঠাইলাম। আশা করি আমার পক্ষ হ’তে সুপারিস করিয়া সেটী কেন এক পত্রিকায় তুলাইয়া দিবেন। একখানা টিকিট পাঠাইলাম। আগামীতে আবশ্যক মত উত্তর দিবেন।

কোন পত্রিকায় আমার কবিতাটী উঠাইলেন অথবা উঠাইলেন কিনা তাহাও জানাবেন।

আবার বলি

‘‘শিষ্য হলে আমায় কি কি করতে হ’বে? আজকার মত শেষ হে গুরুদেব!

ইতি

ভবিষ্যৎ শিষ্য

এ, কে, এস, নূর মোহাম্মদ

মালদহ জিলা স্কুল

নবম শ্রেণী; (মালদহ)।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 − 1 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও দুই বিখ্যাত বাঙালি

কী অসাধারণ শিক্ষাই না আমরা পেতে পারি, উৎসাহিত হয়ে পারি খেলোয়াড়দের থেকে! একটি উদাহরণ: প্রথম বিশ্বকাপে সোনাজয়ী উরুগুয়ে দলে ছিলেন হেক্টর কাস্ত্রো। তেরো বছর বয়সে মেশিনে তাঁর ডানহাত কাটা পড়েছিল। অদম্য উৎসাহে তিনি ফুটবল খেলেছেন, জাতীয় দলে স্থান করে নিয়েছেন, আর ফাইনালে জয়সূচক গোলটিও তাঁর-ই করা! তাঁর স্বদেশবাসী তাঁকে ডাকতেন— ‘এল ডিভিনো মানকো’, অর্থাৎ একহাত-বিশিষ্ট ঈশ্বর।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আমেরিকার স্বাধীনতা: আড়াইশো বছর

১৬০৭ থেকে ১৭৮৩ পর্যন্ত সময়কাল আমেরিকায় ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক রাজত্ব। আজকের দিনে যে আমেরিকা, তা কিন্তু পুরোটা ব্রিটিশদের দখলে ছিল না। ছিল ভার্জিনিয়া, ম্যাসাচুসেটস, নিউ ইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া-সহ ১৩টি রাজ্য। আর কানাডার বেশ কিছু অঞ্চল। আমেরিকার অন্যান্য স্থানে ফরাসি, ডাচ, নরওয়েজিয়, সুইডিস উপনিবেশ-ও ছিল। তাছাড়া রাশিয়া আমেরিকার আলাস্কা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত দখল করে। পরে সে আলাস্কা আমেরিকার কাছে বিক্রিও করে দেয়।

Read More »
অপরাজিতা মৈত্র

গোদাবরীর গোমুখে

গঙ্গার মর্ত্যে আগমন নিয়ে যেমন ভগীরথের গল্প, তেমনই গোদাবরীর উৎসস্থলে না এলে জানা যেত না, দক্ষিণের গঙ্গা নিয়েও আছে হাজার গল্প। যে গল্প জানাবে আজও এই অঞ্চলের মানুষ অনেক সময়েই কাছাকাছি আর কোনও পানীয়জল না পেয়ে কষ্ট করে হলেও এই উৎসস্থলে এসেই শীতল এই পানীয়জল নিয়ে যান নিজেদের কাজের জন্য। গঙ্গা বা অন্য নদী সে শুধু ধার্মিক আবেগের কারণে পবিত্র না, হাজার প্রাণীর ‘তৃষ্ণা’ মেটাবার জন্য সে হয়ে ওঠে ‘দেবী’ বা ‘পবিত্র’। সে পথে মিশে যায় হাজার গল্প-কষ্ট কিংবা দিনযাপনের চরম বাস্তবতা।

Read More »
রুহ

রুহের কবিতাগুচ্ছ

একই আলোকমালায় কাটিয়েছি/ বহুকাল দু’জনে…/ বলিনি কখনও।/ তারা খসা দেখেছি একসাথে, যদিও/ গোপন থেকেছে চাওয়া-পাওয়া।/ মাঝে বহুদিন, বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো/ একা… নীরবে বয়েছি যাতনা।/ আজ মিথ্যের নেই অবকাশ/ তোমাকে কি পড়েনি মনে/ কোনও মুহূর্ত বা ক্ষণে/ ভাবিনি কি একান্ত বন্ধু আমার—/ এতদিন পরে, পুনর্মিলনে বলেছ/ পাখি হতে চেয়েছিলে এ জীবনে

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

যুদ্ধ: বৈশ্বিক কসাইখানা, পুঁজির সংকট ও শ্রমের মুক্তি

অবিক্রীত পণ্যের পাহাড় যখন পুঁজির পুনরুৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করে, তখন পুঁজিপতিরা তীব্র আতঙ্কে ভোগে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তারা প্রতিযোগী পুঁজিপতির বাজার ও পণ্য ধ্বংস করতে চায়। আর এই ধ্বংসের বৈধ হাতিয়ার হিসেবে তারা রাষ্ট্র ও সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করে যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়। অর্থাৎ, উদ্বৃত্ত পণ্য এবং অতিরিক্ত শ্রমকে ধ্বংস করে পুঁজির ভারসাম্য ফিরিয়ে আনাই বুর্জোয়া যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য। এই শোষণের প্রক্রিয়াকে আড়াল করতে রাষ্ট্র একদল বুদ্ধিজীবী ও নীতিবিদ লালন করে, যারা কৃত্রিম ‘দেশপ্রেম’ ও ‘জাতীয়তাবাদ’-এর আফিম খাইয়ে শ্রমিককে বিভ্রান্ত রাখে, যাতে তারা শোষক ও শোষিতের মধ্যকার মৌলিক শ্রেণি-পার্থক্য ভুলে যায়।

Read More »
প্রসেনজিৎ চৌধুরী

বিশ্বকাপ জৌলুসে আর্জেন্টিনা গণহত্যার বধ্যভূমি

বুয়েনস আইরেসের রিভার প্লেটের যে স্টেডিয়ামে তখন খেলা হত, তার মাত্র এক মাইল দূরে ছিল সামরিক সরকারের বন্দিশিবির নেভি স্কুল অব ম্যাকনিকস। সাংবাদিক ডেভিড কক্স ফুটবল বিশ্বকাপের খবর সংগ্রহ করতে গেছিলেন। তিনি ‘ডার্টি ওয়ার’ বইতে লিখেছিলেন, যখন স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার ম্যাচ চলত তখন ওই টর্চার সেল থেকে কান্নার শব্দ শোনা যেত। আর্জেন্টিনার ভুবনমোহিনী ফুটবলে লেগে আছে রক্ত।

Read More »