Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

রবীন্দ্রনাথ: তাঁর ধর্মীয় সম্প্রসার

রবীন্দ্রনাথ পারিবারিক সূত্রে ব্রাহ্ম ছিলেন। রাজা রামমোহন রায় প্রবর্তিত ব্রাহ্মধর্মের প্রভাব ও প্রচার সমগ্র উনিশ শতক জুড়ে একটি জোরালো ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে এবং তার সুদূরপ্রসারী ফল দেখা দেয়। উনিশ শতকে বাংলায় যে নবজাগরণ ঘটেছিল, সেখানে ব্রাহ্মধর্মের ব্যাপ্ত ও নিবিড় অনুকূলতা ছিল। নারীশিক্ষা ও নারী-স্বাধীনতা, হিন্দুধর্মের বহুতর কুসংস্কারকে নাড়িয়ে দেওয়া, ঔপনিবেশিক আমলে খ্রিস্টান মিশনারিদের তৎপরতায় ব্যাপকভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে তো বটেই, এমনকি কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, গুডিভ চক্রবর্তীদের মত সমাজের গণ্যমান্যদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার প্রতিরোধে ব্রাহ্মধর্ম ভূমিকা রেখেছিল। রামমোহনের অনুগামী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর যে ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকা বের করলেন, প্রাথমিকভাবে তা ব্রাহ্মধর্মের মুখপত্ররূপে প্রকাশিত হতে থাকলেও পত্রিকাটি বাংলা সাহিত্যের প্রসারেও দীর্ঘকাল ভূমিকা রেখেছিল। যার গতিজাড্যে ঠাকুরবাড়ি থেকেই ‘বালক’ এবং ‘ভারতী’ পত্রিকাদুটি বেরোতে শুরু করে, যে পত্রিকায় স্থান পায় ঠাকুরবাড়ির দ্বিজেন্দ্রনাথ-সত্যেন্দ্রনাথ-রবীন্দ্রনাথ তো বটেই, এমনকি শরৎচন্দ্র থেকে শুরু করে সমসাময়িক প্রায় সব প্রতিনিধিস্থানীয় লেখকের রচনা।

ব্রাহ্মধর্ম দ্বিধাবিভক্ত হয় কেশবচন্দ্র সেনের সঙ্গে দেবেন্দ্রনাথের মতদ্বৈততার কারণে। কেশবচন্দ্র গঠন করেন ‘নববিধান’ ব্রাহ্মসমাজ, আর দেবেন্দ্র-অনুসারী সমাজের নাম দাঁড়াল ‘আদি’ ব্রাহ্ম সমাজ। পরবর্তীতে ব্রাহ্মসমাজের ত্রিধাবিভক্তিও আমরা লক্ষ্য করি, মতাদর্শগত কারণে পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী সহ বেশ কয়েকজন ‘নববিধান’ থেকে বেরিয়ে গিয়ে গঠন করেন ‘সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ’।

সমাজ ভাগ হলেও সমাজকর্তাদের মধ্যে সম্পর্ক বজায় ছিল। আবার মজার বিষয় হল, ব্রাহ্মনেতারা পৌত্তলিকতা-বিরোধী হলেও পৌত্তলিক সনাতন হিন্দুধর্মের নেতৃস্থানীয়দের সঙ্গে ব্রাহ্মদের মেলামেশা কিন্তু প্রায়শই ঘটত। দেবেন্দ্রনাথের গৃহে শ্রীরামকৃষ্ণ গেলে যেমন অভ্যর্থিত হতেন, তেমনই কেশবচন্দ্র সেনের প্রায়শই গমনাগমন চলত দক্ষিণেশ্বরে। সনাতন হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রতিভূ বঙ্কিমচন্দ্র তাঁকে পরানো মালা পরিয়ে দিচ্ছেন ‘সন্ধ্যাসঙ্গীত’-কার তরুণ রবীন্দ্রনাথকে, এ-ও দেখেছি আমরা, যদিও বঙ্কিমের ‘কৃষ্ণচরিত্র’ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ কঠোর সমালোচনা করতে ছাড়েননি। সবচেয়ে যা বিস্ময়ের, ব্রাহ্ম দেবেন্দ্রনাথ প্রবর্তিত ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকার সম্পাদনা সামলেছেন দীর্ঘকাল ধরে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং অক্ষয়কুমার দত্ত, যাঁরা ছিলেন একান্তই নাস্তিক, ঈশ্বর-অবিশ্বাসী।

আমাদের আলোচ্য প্রবন্ধের বিষয়, একদিকে ব্রাহ্ম পরিবারের ঘন আবহে বাস, অন্যদিকে, সনাতন দেবদেবী আশ্রিত হিন্দুধর্ম তো বটেই, বৌদ্ধ, খ্রিস্ট, ইসলাম, শিখ ও অন্যান্য ধর্মের অভিঘাত রবীন্দ্রনাথের চিন্তাধারায়, তাঁর সাহিত্যে এবং তাঁর বিভিন্ন ধর্মীয় মানুষের সঙ্গে মেলামেশা ও মতবিনিময়ে কীরকম ভূমিকা রেখেছে তা বিচার করে দেখা।

রবীন্দ্রনাথ : ঔপনিষদিক ব্রহ্ম

তাঁর সমগ্র জীবনের সাহিত্যকীর্তির এক বিরাট অংশ দখল করে আছে উপনিষদ-ভাবনা, যেখানে বারবার পরম ব্রহ্মের কথা বলা হয়েছে, বলা হয়েছে ‘ঈশাবাস্যমিদং সর্বম্’, অর্থাৎ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ঈশ, কি না পরম ব্রহ্মের দ্বারা আচ্ছাদিত। রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম ছিলেন বলেই যে এ-মতে আস্থিত ছিলেন তা নয়, এমনকি হিন্দু পৌত্তলিকতাবাদী তথা মূর্তিপূজায় বিশ্বাসীরাও উপনিষদ বর্ণিত পরম অদ্বৈত ঈশ্বরে যে নিবিড় আস্থাস্থাপন করেছিলেন, তার প্রমাণ স্বয়ং কালীসাধক রামকৃষ্ণ পরমহংস, যাঁর একটি বিখ্যাত উক্তি, ‘অদ্বৈতের চাবি আঁচলে বেঁধে যথায় ইচ্ছা তথায় যা।’ স্বামী বিবেকানন্দ থেকে ঋষি অরবিন্দ ব্রাহ্ম না হয়েও ছিলেন ধর্ম ও দর্শনচিন্তায় মূলত বেদান্ত তথা উপনিষদে নিবিড় আস্থাশীল।

অন্যদিকে ইসলামধর্মের অনুসারীরাও একমাত্র আল্লাহ-ই উপাস্য, অর্থাৎ একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী। খ্রিস্টধর্মও তাই।

আবার এর পাশাপাশি এই উপমহাদেশে সুপ্রাচীনকাল থেকে বহুদেববাদের ধারাও চলে আসছে, এবং তার সঙ্গে মূর্তিপূজাও। বেদ থেকেই এর উৎপত্তি, উপনিষদ থেকেই। কেনোপনিষদেই বিশ্বের সমগ্র শক্তির আধাররূপে নারীদেবীকে কল্পনা করা হয়েছে, যার নাম উমা। উপনিষদে এও বলা হয়েছে, ‘একঃ স বহূনৈচ্ছৎ’, সেই এক বহু হতে ইচ্ছা করলেন। সেই থেকে বহুদেববাদের সূচনা, যার অনুক্রম আজকের সময়কাল পর্যন্ত প্রসারিত।

এই যে ঔপনিষদিক ব্রহ্ম, এবং তারই পাশাপাশি বহুদেবতাবাদ, পৌত্তলিকতা, এসব কিছুকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমগ্র জীবনের সাহিত্যকর্মে মেলালেন কী করে? গানের পর গানে, ‘শান্তিনিকেতন’-সহ অসংখ্য প্রবন্ধে তাঁর ব্রহ্মজিজ্ঞাসা, ‘একমেবাদ্বিতীয়ম্’-ভাবনা ব্যাপ্ত হয়ে আছে। পাশাপাশি তিনি যে যুগে, যে সমাজে, যে ধর্মীয় আবহে বাস করতেন, সেখানে সনাতন হিন্দুধর্মের দেবদেবী নিয়েও তাঁর অবহিতি, শ্রদ্ধাবোধ এবং দেবদেবী নিয়ে তাঁর নিজস্ব ভাবনাচিন্তার ব্যাপক প্রতিফলন দেখি তাঁর রচনায়। উপনিষদ একদিকে, অন্যদিকে ব্যাস-বাল্মীকি-কালিদাস, মধ্যযুগের সন্ত কবি কবীর সূরদাস নানক মীরাবাঈ তাঁর অন্তরে গভীর স্থান পেয়েছে কেবল নয়, তুকারাম-এর ‘অভঙ্গ’ তিনি বাংলায় অনুবাদ করেন, ‘Hundred Poems of Kabir’ নামে কবীরের একশোটি দোঁহার ইংরেজি অনুবাদ রয়েছে তাঁর। রয়েছে শিখধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতার নিদর্শনস্বরূপ ‘কথা ও কাহিনী’-র বেশ কিছু কবিতা।

তাছাড়া বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও ইসলাম নিয়ে তাঁর অনুসন্ধিৎসা, পঠনপাঠন এবং লেখালেখিও কম নয়। বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের বহু বিষয় নিয়ে কবিতা ও গান রয়েছে তাঁর, রয়েছে ‘চণ্ডালিকা’ আর ‘শ্যামা’ গীতিনাট্য। ১৯২৬-এ জার্মানিতে Passion Play দেখে তিনি ইংরেজিতে যিশুকে নিয়ে যে সুদীর্ঘ কবিতা লেখেন (এটি পরে বাংলায় অনুবাদ করেন ‘শিশুতীর্থ’ নাম দিয়ে), তার ওপর ভিত্তি করে একটি চিত্রনাট্যও লিখেছিলেন তিনি, এক জার্মান পরিচালকের কথায়। যদিও শেষপর্যন্ত তা চিত্রায়িত হয়নি। শান্তিনিকেতনে তিনি খ্রিস্টোৎসবের প্রচলন করেন। তাছাড়া নানা সময়ে তিনি বুদ্ধ ও যিশুখ্রিস্টের ওপর যা লিখেছিলেন, তার পরিমাণও যে নিতান্ত কম নয়, তার প্রমাণ তাঁর মৃত্যুর পর সেইসব লেখা একত্রিত করে বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ থেকে প্রকাশিত দুটি বই ‘বুদ্ধ’ ও ‘খৃস্ট’। বুদ্ধদেবের জীবনী অবলম্বন করে সংস্কৃত ভাষায় অশ্বঘোষের যে ‘বুদ্ধচরিতম্’ কাব্য রচিত হয়, সেই সৃবৃহৎ কাব্যটি রবীন্দ্রনাথের আদেশে বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

তেমনই হজরত মহম্মদের (সা.) জীবনী লিখিয়েছিলেন কবির বন্ধু শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের পুত্র সন্তোষচন্দ্র মজুমদারকে দিয়ে। হজরত মহম্মদ (সা.)-কে নিয়ে তাঁর বহু শ্রদ্ধেয় উক্তি আছে। আর তাঁর রচনায়, পোশাকে তো বাউল ও সুফি প্রভাব যেকোনও রবীন্দ্র কৌতূহলীর লক্ষ্যগোচর না হয়ে পারে না।

রবীন্দ্র-সাহিত্যে হিন্দু দেবদেবী ও পুরাণের ব্যবহার

ঠাকুরবাড়িতে দেবেন্দ্রনাথ ব্রাহ্মধর্মের প্রতিষ্ঠাতা। তবে দেবেন্দ্রনাথের পূর্বে সে-বাড়িতে দোল-দুর্গোৎসব সহ প্রায় সব রকম সনাতন হিন্দু আচার অনুষ্ঠান প্রচলিত ছিল। আবার ৬ নম্বর জোড়াসাঁকোর পাশেই যে ৫ নম্বর, যেখানে দেবেন্দ্রনাথের ভাই নগেন্দ্রনাথরা থাকতেন, পরবর্তীকালে অবনীন্দ্র-গগনেন্দ্ররা, সে বাড়িতে কিন্তু ঘটা করে হিন্দু দেবদেবীর পূজানুষ্ঠান হত, কেননা তাঁরা ব্রাহ্ম ছিলেন না। তাছাড়া বাংলাদেশের যেখানেই তিনি থাকুন না কেন, কলকাতা শিলাইদহ পতিসর সাহজাদপুর আর বোলপুর, বারো মাসে তেরো পার্বণ তাঁকে দেখতে হয়েছে আজীবন। শ্রীরামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ এবং বিবেকানন্দশিষ্যা ও সনাতন হিন্দুধর্মে আস্থাশীলা, স্বামীজির সঙ্গে অমরনাথ তীর্থে ঘুরে আসা ও কলকাতার টাউন হলে ‘Kali the Mother’ নিয়ে বক্তৃতা দেওয়া ভগিনী নিবেদিতার সঙ্গে কবির অন্তরঙ্গতা সুবিদিত। ভারতীয় প্রধান দেবদেবী,— দুর্গা শিব সরস্বতী লক্ষ্মী কৃষ্ণ নিয়ে তাঁর রচনা বিচিত্রপথে আবর্তিত হয়েছে বারবার। অন্যদিকে তিনি সনাতন হিন্দুধর্মের অযুত কুসংস্কারকেও কুঠারাঘাত করতে ছাড়েননি। দেবতা, বিশেষ করে কালীর সামনে ছাগবলিরও তিনি বিরোধিতা করেছেন ‘বিসর্জন’ নাটক এবং ‘রাজর্ষি’ উপন্যাসে। নিরীহ জীবের আসন্ন করুণ অবসানের কথা রয়েছে তাঁর ‘পূজার ছুটি’ কবিতায়।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখায় হিন্দু দেবদেবী এনেছেন প্রতীকিতার মাধ্যমে। আমরা এবার তাঁর সেই প্রতীকী দেবদেবী-ভাবনার তত্ত্বটি বোঝার চেষ্টা করব। এবং এক আশ্চর্য রবীন্দ্রনাথের সন্ধান পাব, যিনি হিন্দু দেবদেবীর স্বতন্ত্র ব্যাখ্যাতা।

শিব : শান্তম্ শিবমদ্বৈতম্

প্রথমেই তাঁর শিবভাবনার কথা বলা যাক। মহাকবি কালিদাস ছিলেন রবীন্দ্রনাথের কবি-আদর্শ। কালিদাসের রচনায় তাঁর আকৈশোর অবগাহন, অল্পস্বল্প অনুবাদও করেছেন তিনি কালিদাসের, এবং ব্যাখ্যা করেছেন কালিদাসের ‘শকুন্তলা’ ও ‘মেঘদূত’-এর। ‘মেঘদূত’ নামে কবিতাও আছে তাঁর, আছে ‘কালিদাসের প্রতি’ কবিতায় এহেন উক্তি, কালিদাসের প্রতিভাকে স্বীকৃতি জানাতে ‘কর্ণ হতে বর্হ খুলি স্নেহহাস্যভরে/ পরায়ে দিতেন গৌরী তব চূড়া-পরে।’ একেবারে দেবী দুর্গার হাত থেকে বর্হ, কিনা ময়ূরের পালক কালিদাসের মাথায় উঠবে! ব্রাহ্ম রবীন্দ্রনাথ গৌরীকে না এনে পারেননি কালিদাসকে অভিনন্দিত করতে, কেননা এ দায় কবিত্বের দায়, নান্দনিকতার দায়। কালিদাস তাঁর ‘কুমারসম্ভব’ কাব্যে দুর্গা অর্থাৎ পার্বতীকে যেভাবে চিত্রিত করেছেন, তাতে গিরিজা দুর্গার হাত থেকেই তাঁর সম্মানপ্রাপ্তি যথাযথ। কবি মধূসূদন, প্রসঙ্গত তাঁর ‘কালিদাস’ নামীয় সনেটে লেখেন, ‘আপনি ভারতী/ আপনার স্বর্ণবীণা অরপিলা করে।’ সরস্বতী বীণা দিচ্ছেন, তার চেয়ে দুর্গার ময়ূরের পালক দেওয়া আরও বেশি কবিত্বময় ও তাৎপর্যবাহী। বর্হ তো দেবীর পুত্র কার্তিকের বাহন ময়ূরের পুচ্ছ থেকেই সংগৃহীত! তাই এই দানের মধ্য দিয়ে কালিদাসের প্রতি দুর্গার বাৎসল্যভাবও একই সঙ্গে প্রতিফলিত। ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক রবীন্দ্রনাথ এইভাবে অনাদি সাহিত্যসমাজের প্রতিভূ হয়ে দাঁড়ান।

কালিদাস শিব-পার্বতী ধারণার মধ্যে যে ‘অর্ধনারীশ্বর’ সত্তা এনেছেন, অর্থাৎ এঁরা দুজনে আলাদা কোনও অস্তিত্ব নন, দুইয়ে মিলে এক ও অবিভাজ্য, যেমন বাক্যের মধ্যেই তার অর্থ ওতপ্রোত হয়ে থাকে। ‘কুমারসম্ভব’ কাব্য শুরুই হয়েছে এই ধারণাটি দিয়ে, ‘বাগর্থাবিব সম্পৃক্তৌ বাগর্থপ্রতিপত্তয়ে/ জগতঃপিতরৌবন্দে পার্বতীপরমেশ্বরৌ।’ রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজস্বতায় অন্যভাবে নিয়ে এলেন এই একাত্মতাকে তাঁর কবিতায়, ‘আলোকছায়া শিবশিবানী’। কী অপূর্ব বিনির্মাণ!

কালিদাসের মতই রবীন্দ্রনাথও বারবার নানা দ্যোতনায় তাঁর লেখায় নিয়ে এসেছেন শিবকে। সে শিব অমরনাথ বা শিপ্রা নদীপারের মহাকাল নন, নন চন্দ্রনাথ দেওঘর তারকেশ্বর কাশীর বিশ্বনাথ, বা বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগে ‘শিবায়ন’ কাব্যে যে শিবকে আঁকা হয়েছে তা-ও না। মূর্ত নয়, বিমূর্ত শিবের রূপকার রবীন্দ্রনাথ। এইখানে কবি কালিদাসের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মিল ও অমিল। মিল এই অর্থে যে কালিদাস ভারতীয় পুরাণের সম্ভ্রান্ত মঞ্জুষা থেকে মূর্তি নির্মাণ করেছেন দেবাদিদেবের। কালিদাসের শিব একদিকে সনাতন হিন্দু ভক্তের শিব এবং পুরাণকে চূড়ান্ত নান্দনিকভাবে কাজে লাগানোর শিব। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের শিব বিমূর্ত, এবং প্রকৃতপ্রস্তাবে পুরাণকে ছাড়িয়ে অপরূপ প্রতীকিতায় তিনি স্থাপন করেছেন শিবকে বিশ্বনটরাজরূপে। এই যে শিবের তাণ্ডবলীলার মিথকে তিনি আবর্তনশীল ঋতুপর্যায়ের সঙ্গে অন্বিত করলেন, নাম দিলেন ‘ঋতুরঙ্গশালা’, এখানে তিনি অনন্য, তুলনারহিত, হ্লাদসঞ্চারী এবং অভিনব।

রবীন্দ্রনাথ ‘নটরাজ ঋতুরঙ্গশালা’-র কবিতা ও গানের সন্নিবেশে দেখিয়েছেন, একের পর এক ঋতুর আবির্ভাব শিবের নৃত্যকলাজনিত প্রকৃতির পটপরিবর্তন। নটরাজের নৃত্য বন্ধন, স্থাবরত্ব ঘুচিয়ে ‘ধুলায় মিলাক যা কিছু ধুলার,/ জয়ী হোক যাহা নিত্য।’ কেন না তা ‘অমিত বিত্ত’। নৃত্যের এই অমিত বিত্ত-বান নটরাজকে কবি বলেন, ‘পিনাকে তোমার দাও টঙ্কার,/ ভীষণে মধুরে দিক ঝঙ্কার।’ বৈশাখে তিনি তাঁকে বলছেন, ‘আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ’, আর বর্ষায় ‘গুরু গুরু গুরু নাচের ডমরু/ বাজিল ক্ষণে ক্ষণে।/ …মল্লার রাগে গর্জিয়া ওঠো গাহি/ বক্ষে তোমার অক্ষের মালা কাঁপে।’

পিনাক, ডমরু, শাঁখ কিংবা অক্ষের মালা কবি গ্রহণ করছেন পুরাণ থেকেই, কিন্তু তা ব্যবহৃত হচ্ছে বিমূর্ততা নির্মাণে, প্রকৃতির পটপরিবর্তনের, এক ঋতু থেকে অন্য ঋতুতে বলয়িত হওয়ার তাৎপর্যে। আর তাই ‘শরৎ ডাকে ঘর-ছাড়ানো ডাকা/ কাজ-খোওয়ানো সুরে’, এবং শীত ‘নৃত্যলীলা জড়ের শিলা করুক খান খান/ মৃত্যু হতে অবাধ স্রোতে বহিয়া যাক প্রাণ।/ নৃত্য তব ছন্দে তারি/ নিত্য ঢালে অমৃতবারি/ শঙ্খ কহে হুহুংকারি বাঁধন সে তো মায়া/ যা কিছু ভয়, যা কিছু ক্ষয়/ সে তো ছায়ার ছায়া।’

সতীর মৃতদেহ নিয়ে মহাদেবের প্রলয়নাচের চেয়ে এ নাচের প্রকৃতি কত ভিন্ন। এবং সেজন্যই শিব ‘নটরাজ’ যাঁর নাচের ছন্দে আবর্তিত হয় দিন ও রাত, ষড় ঋতু।

কালিদাস ‘কুমারসম্ভব’ আর ‘মেঘদূত’-এ পুরাণের অনুষঙ্গ ব্যবহার করে অনবদ্য নান্দনিকতা এনেছেন। শিব-পার্বতীর বিবাহরাত্রে শিব একে একে পার্বতীর বস্ত্র নিজহাতে খুলে ফেলছেন। একেবারে অন্তিম মুহূর্তে পার্বতী যখন বিবসনার পর্যায়ে, তখন লজ্জায় তিনি নিজহাতে শিবের চোখদুটি ঢেকে দেন। কালিদাস জানাচ্ছেন, শিবের যে তিনটে চোখ, সে মুহূর্তে পার্বতীর তা মনে ছিল না। এইভাবে চমৎকৃতি এনেছেন কালিদাস পুরাণের সহায়তায়।

আবার ‘মেঘদূত’-এ পাই, স্বর্গের বাগানে শায়িত শিব, আর বাগানের কাছে যে সব দেবপ্রাসাদ, তা চাঁদের আলোয় প্লাবিত হয়ে যাচ্ছে। তা হবেই তো! পৃথিবী থেকে চাঁদ গড়ে আড়াই লাখ মাইল দূরে। আর তাইতেই পূর্ণিমা রাতে চাঁদের পরিপূর্ণ আলোয় পৃথিবী জ্যোৎস্নাময় হয়। আর শায়িত শিবের মাথায় তো চাঁদ, সে জন্য শিবের অন্যনাম চন্দ্রচূড়, তার আলোর বৈভবে প্লাবিত হবে না অমরাবতী, নন্দনকাননের এত কাছে বলে?

অনুরূপভাবে শিবকে রবীন্দ্রনাথও নানাভাবে এনেছেন। ‘মুক্তধারা’-র শঙ্কর স্তবে, ‘মদনভস্মের আগে’ ও ‘মদনভস্মের পরে’ কবিতায়, ‘শিবাজী-উৎসব’ কবিতাতেও। ‘হে ভবেশ, হে শঙ্কর/ সবারে দিয়েছো ঘর/ আমারে দিয়াছো শুধু পথ।/ অন্নপূর্ণা মা আমার লয়েছে বিশ্বের ভার/ সুখে আছে সর্ব চরাচর,/ মোরে তুমি হে ভিখারি/ মা’র কাছ হতে কাড়ি/ করেছো আপন অনুচর।’

শিবকে বিমূর্ততায় এনেছেন কিন্তু কালিদাসও, যখন হিমালয় পর্বত তাঁর কাছে প্রতিভাত হয়েছিল মহাদেবের হাসি। হিমালয়ও শিবের মত কালিদাসের কাছে অতীব প্রিয়। হিমালয়ের উচ্চতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি লেখেন, সূর্য নিচে থেকে হিমালয়ের ওপরে আলো পাঠায়। Poetic licence, নিঃসন্দেহে।

রবীন্দ্রনাথের শিবভাবনা নিয়ে সবশেষে বলতে হয়, সেখানেও ঔপনিষদিক ভাবনা কাজ করেছে তাঁর, ‘শান্তম্ শিবমদ্বৈতম্’-এর মধ্যে। বেদ-উপনিষদের চেয়েও শিব প্রাচীন, সিন্ধুসভ্যতার আমল থেকেই।

দেবাদিদেব মহাদেব বা শিবের ভোলানাথ নামে যে খ্যাতি আছে, তারই প্রতীকিতায় রবীন্দ্রনাথের একটি কাব্যগ্রন্থের নাম ‘শিশু ভোলানাথ’। মহাদেবের শিশসুলভতার মিথ আর কবির শিশুপুত্রের দেয়ালা, এই দুই এখানে সমরেখ হয়ে দেখা দিয়েছে।

দুর্গা : আনন্দময়ী

হিন্দু বাঙালিজীবনে সবচেয়ে উৎসবমুখরতা দেখা যায় দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে। দেবী দুর্গার বিবর্তন ঘটেছে যুগে যুগে। পুরাণের দেবী দুর্গা একদিকে মহিষাসুর সহ চণ্ডমুণ্ড-মধুকৈটভ-শুম্ভনিশুম্ভ হন্তা, অন্যদিকে ভক্তের দুর্গতিনাশিনী। সর্বভারতীয় এই দেবী বাংলায় এসে হয়ে গেলেন শাশ্বত বাঙালি পরিবারের বিবাহিতা কন্যা উমা। বছরে একবার ছেলেমেয়ে নিয়ে মর্ত্যে পিতৃগৃহে আসেন তিনি। বাঙালি দুর্গার পিতৃগৃহ নির্ণয় করেছে বাংলায়, অতএব বাঙালির কাছে হিমালয়কন্যা পার্বতী নন তিনি, তবে কৈলাশে শিবগৃহ তাঁর শ্বশুরালয় বটে (শিবের পিতামাতা নেই, শিব স্বয়ম্ভু। তাই পতিগৃহ বলা উচিত)। উপনিষদ থেকে কালিদাস পর্যন্ত পরিবাহিত পার্বতীর মিথ, আর সহসা বাংলায় এসে অন্য মাত্রা নিয়ে এল দুর্গাভাবনা। কবি কৃত্তিবাস রাবণবধের আগে দুর্গাপুজো করালেন রামকে দিয়ে, যা বাল্মীকি রামায়ণে নেই। সেইসূত্রে এল পদ্মপলাশলোচন রামের নিজ চোখ দিয়ে দেবীপূজার উদ্যোগের মিথ। পরবর্তীকালে বাংলার কবিরা তাঁদের আগমনী ও বিজয়গাথায় দুর্গার মর্ত্যে আগমন ও কৈলাশে ফিরে যাওয়া নিয়ে যে গান লিখলেন, তা চিরকালীন বাৎসল্যের স্থায়ী আধার হয়ে রইল। ‘শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও জননী এসেছে দ্বারে’ দিয়ে শুরু, আর শেষ ‘নবমী নিশি রে, দয়া নাই রে তোর, এত করে সাধিলাম, তবু হইলি ভোর।’ এমনকি মধূসূদনও পারেননি বাঙালি দুর্গাকে বাদ দিতে। তাই তাঁর সনেটে মেনকা প্রার্থনা জানান, ‘যেও না রজনী আজি, লয়ে তারাদলে’, কেননা রাত পোহালেই যে দুর্গার কৈলাশে যাত্রা করার পালা!

দুর্গাকে নানা চিত্রকল্পে প্রকাশ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। আনন্দময়ী, শারদলক্ষ্মী এরকম। কখনও শরৎ ঋতুর সঙ্গে অচ্ছেদ্য করে ‘এসো শরতের অমল মহিমা’, আবার ‘শারদোৎসব’ নাটকে উপনিষদীয় তত্ত্ব ‘জীবেম শরদঃ শতম্’-এর অনুকারিতা। আনন্দময়ীর আগমনে আনন্দে দেশ ছেয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ধনীর দুয়ারে কাঙালিনী মেয়ে দাঁড়িয়ে থাকার বিধুরতা-অসংলগ্নতা-বৈপরীত্যকেও তিনি দেখিয়ে দেন। অন্যদিকে ‘পূজার ছুটি’ কবিতায় শহুরে মানুষ ছুটিতে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে, আর সেই সোচ্চার হওয়ার পাশাপাশি শহরের রাস্তা দিয়ে কবি নির্বিকার হেঁটে যেতে দেখছেন আসন্ন বলির জন্য নির্ধারিত ছাগপশুকে। তাদের কাছে ছুটির অর্থ ভিন্নতর, কবিতাটিতে মরমীভাবে ব্যঞ্জিত হয়েছে এই সত্য।

তাঁর ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্পে মিনির বিয়ের বিধুরতাকে বলবত্তর করতে শরতে দেবীদুর্গার পিতৃগৃহে আসার মাধুর্যের সম্পূর্ণ বিপরীতে দাঁড় করান তিনি। গল্পটিতে দেবী দুর্গার সর্জন বা আগমনকে ধরেননি তিনি, ধরেছেন বিসর্জনকে। তাই ‘পূজার ছুটির মধ্যেই তাহার বিবাহ হইবে। কৈলাসবাসিনীর সঙ্গে সঙ্গে আমার ঘরের আনন্দময়ী পিতৃভবন অন্ধকার করিয়া পতিগৃহে যাত্রা করিবে।’ এখানে উল্লেখ্য, হিন্দু বাঙালির ঘরে ভাদ্র-আশ্বিন-কার্তিক মাসে (দুর্গাপুজো আশ্বিন ও কার্তিক, অর্থাৎ শরৎ ও হেমন্ত, এই অনুক্রমে হয়) বিয়ে অনুষ্ঠিত হয় না। রবীন্দ্রনাথের মত ব্রাহ্ম পরিবারে হয় কিনা, হত কিনা জানা নেই আমাদের। তবে মিনিরা ব্রাহ্ম নয়। মিনির বিয়ে ‘শরতের নূতনধৌত রৌদ্র যেন সোহাগায় গলানো নির্মল সোনার মতো রঙ’-এর শরতে ঘটানোর একমাত্র কারণ ওই সময়ে বাংলার দুর্গোৎসবকে মিনির বিয়ের সঙ্গে সংলগ্ন করে দেওয়া।

‘ব্রাহ্ম পরিবারে যদিও আমার জন্ম তবু ঈশ্বর উপাসনা সম্বন্ধে আমার মন কোনো সংস্কারে আবদ্ধ হয়নি, … যা কিছু আমাদের দেশের, তাকে ভালভাবে গ্রহণ করতে আমি সর্বদাই প্রস্তুত ছিলাম’, কাদম্বিনী দেবীকে তারিখহীন এক চিঠিতে জানিয়েছেন তিনি। আবার ২৭-এ বৈশাখ ১৩২৯ তারিখে ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে চিঠিতে যা লেখেন, তাতে আরও স্পষ্ট হয় তাঁর ঈশ্বরীয় ভাবনার ঔদার্য, ‘দেবতার সঙ্গে অন্তরের বন্ধন আর তার সঙ্গে সম্প্রদায়ের বন্ধনে যে তফাৎ’ তা মানেন তিনি। তাই ভারতীয় দেবদেবী বর্জ্য, অপাঙ্‌ক্তেয়, অবহেলার নয় তাঁর কাছে। ঋতু, ফুল, সঙ্গীতবাদ্যের সঙ্গে চমৎকারভাবে অন্বিত করে দেন তিনি দেবদেবীকে, এবং এইভাবেই দেবতাকে প্রিয় করেন, প্রিয়কে করেন দেবতা। শরৎ তাঁর গানে দেবী দুর্গার আবাহনী সঙ্গীতে দেখা দেয় এইভাবে, ‘আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা এনেছি শেফালিমালা/ নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে সাজিয়ে এনেছি ডালা।’ নিরাকারের উপাসক নিতান্ত ব্রাহ্ম থাকেন না তিনি, যখন লেখেন, ‘তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফেরে’, অথবা ‘তনু মন ধন করি নিবেদন আজি/ ভক্তিপাবন তোমার পূজার ধূপে।’

লক্ষ্মী

সাকার হিন্দু উপাসনায় লক্ষ্মীর স্থান বাঙালি হিন্দু সমাজে ব্যাপক। ভক্তিমানদের ঘরে দেবতার জন্য ছোটবড়মাঝারি যে ধরনের সিংহাসনই থাক না, সেখানে লক্ষ্মী প্রতিমার উপস্থিতি অবধারিত। প্রতি বৃহস্পতিবার এয়ো স্ত্রীরা লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠ করেন। কোজাগরী পূর্ণিমা তো বটেই, তাছাড়াও আষাঢ় আর পৌষ মাসেও বহু গৃহস্থের বাড়িতেই লক্ষ্মীপুজো হয়। সিংহাসনে থাকে লক্ষ্মীর ঘট, যেখানে পয়সা জমানো হয়, অসময়ে কাজে লাগে। আছে প্রতিদিন ছোট একটি পাত্রে একমুঠো করে চাল রেখে দেওয়া, যাকে বলে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’। লক্ষ্মীর পাঁচালি এমনই এক বিখ্যাত গ্রন্থ, যে গ্রন্থের উদ্ধৃতিতে ছেয়ে গিয়েছিল কলকাতার সাইনবোর্ড, ভারতের বিখ্যাত ব্যাঙ্ক ‘ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (ইউবিআই)-র পোস্টারে,— ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার স্থাপি সব ঘরে ঘরে/ রাখিবে তণ্ডুল তাহে এক মুষ্টি করে/ সঞ্চয়ের পন্থা ইহা জানিবে সকলে/ অসময়ে উপকার পাবে এর ফলে।’ বাঙাল ভাষায় একে ‘মুইঠের চাউল’ বলে।

দেবী দুর্গার সঙ্গে লক্ষ্মী (এবং সরস্বতীও) আরাধিতা হন। সরস্বতীর পূজাও ব্যাপক, ঘরে ঘরে। সরস্বতীর মন্ত্রে কোন সুরসিক এমন কথা জুড়ে দিয়েছেন জানা নেই, ‘কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে’, তবে কেবল শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাই না, সমাজের সব শ্রেণি ও পেশার মানুষ সরস্বতীকে অঞ্জলি না দিয়ে কিছু আহার করে না পুজোর দিন।

ব্রাহ্মদের কাছে এই দুই দেবী গুরুত্বহীন। কলকাতায় ব্রাহ্মদের প্রতিষ্ঠিত স্কুল-কলেজে পর্যন্ত সরস্বতী পুজো নিষেধ।

কিন্তু এই দুই দেবী রবীন্দ্রনাথে আছেন, বারবার, নানাভাবে। শান্তিনিকেতনে পড়ুয়া ছাত্রদের জন্য তিনি যেমন লেখেন স্ত্রী ভূমিকা বর্জিত নাটক ‘শারদোৎসব’, তেমনই প্রতিমা দেবীর অনুরোধে লেখেন পুরুষ ভূমিকা বর্জিত কাব্যনাট্য ‘লক্ষ্মীর পরীক্ষা’। এ নাটকে দেবী লক্ষ্মী এক চরিত্র হিসেবে উপস্থিত। নাটকের লক্ষ্মীকে বুঝবার জন্য রবীন্দ্রনাথের একটি মন্তব্য জেনে নেওয়া জরুরি। তিনি তাঁর একটি লেখায় কুবের ও লক্ষ্মীর তুলনা করতে গিয়ে লিখেছেন, কুবেরের ভাণ্ডারে ধন কেবল সঞ্চিতই হতে থাকে, কিন্তু লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে তা বিতরিত হয়। ‘লক্ষ্মীর পরীক্ষা’-য় রানি কল্যাণী ও তাঁর দাসী ক্ষীরোর মধ্যে এই লক্ষ্মী ও কুবেরের দ্বন্দ্ব। ক্ষীরোর মধ্যে তাছাড়াও রয়েছে মুকুন্দরাম অঙ্কিত ভাঁড়ু দত্তের লক্ষণ, তাই সে বলে, ‘বুদ্ধিমানেরা পেটের দায়/ লক্ষ্মীমানেরে ঠকিয়ে খায়।’ কিন্তু লক্ষ্মীর মাহাত্ম্য দানে, বিতরণে, ‘ধনসুখ আছে যার ভাণ্ডারে/ দান সুখে তার সুখ আরো বাড়ে।’ এ তত্ত্বেরই অন্য রূপ দেখি কবির একটি কবিতায়, ‘তোমায় কেন দিইনি আমার সকল উজাড় করে।’

তাঁর গানে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘লক্ষ্মী যখন আসবে, তখন কোথায় তারে দিবি রে ঠাঁই।’ দেবতাকে আবাহন করলেই তো হল না, তাঁকে হৃদ্গত করার প্রস্তুতি চাই যে! যে কমলাসনে লক্ষ্মী বসবেন, সেই হৃৎপদ্মটি কি আমরা প্রস্তুত করে রাখি আগে থেকে? তাঁর অন্য এক গানেও পাই, ‘আমার এ ঘর বহু যতন করে/ ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে।/ আমাকে যে জাগতে হবে/ কী জানি সে আসবে কবে…’। এখানে ‘কোজাগরী’ লক্ষ্মীর ইঙ্গিত থাকলেও থাকতে পারে। ভক্তের বিশ্বাস, শারদীয় পূর্ণিমায় লক্ষ্মী বিশ্ব পরিভ্রমণে বেরোন, আর খোঁজ নেন, ‘কো জাগরী?’ অর্থাৎ আমার উপাসনায় সারা রাত জেগে আছ কে? তাকেই লক্ষ্মী বর দেবেন। এইভাবে পুরাণ নবতর ব্যাখ্যা লাভ করে রবীন্দ্রনাথের গানে, নাটকে।

কালী, শিব

রবীন্দ্রনাথ শ্যামাসঙ্গীতও লিখেছিলেন! ‘বাল্মীকি প্রতিভা’-য় যে দুটি গান আছে, তা বিশুদ্ধ শ্যামাসঙ্গীত। তার একটি হল, ‘রাঙাপদপদ্মযুগে প্রণমি গো ভবদারা’, আর অন্যটি ‘এবার তোরে ছেড়েছি মা’। দ্বিতীয়টিকে বলা যেতে পারে শ্যামা-বিরোধী সঙ্গীত। মজার কথা, ব্রাহ্ম পরিবারের সত্যজিৎ রায়ও কিন্তু তাঁর ‘দেবী’ চলচ্চিত্রের জন্য একটি শ্যামাসঙ্গীত লিখেছিলেন। এরই নাম সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠা, যার চূড়ান্ত ও উত্তুঙ্গ উদাহরণ কাজী নজরুল।

‘রাজর্ষি’ আর ‘বিসর্জন’-এ তো দেবীর সামনে বলির তীব্র বিরোধিতা রবীন্দ্রনাথের। মনে রাখতে হবে, হিন্দু রক্ষণশীল সমাজ সে সময় আরও অনেক বেশি কঠোর ছিল। সে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বলি-বিরোধিতা দুঃসাহসিকই ছিল বলতে হবে। এখানে কবি ধর্মকে নয়, ধর্মীয় সংস্কারকে আঘাত করেছেন, যা তিনি বারবার করেছেন তাঁর গানে, কবিতায় ‘ভজনপূজন-সাধন-আরাধনা সমস্ত থাক পড়ে/ রুদ্ধদ্বারে দেবালয়ের কোণে কেন আছিস ওরে/… নয়ন মেলে দেখ দেখি তুই চেয়ে/ দেবতা নাই ঘরে।’ অনুরূপ একটি ধারণা তিনি ব্যক্ত করেছিলেন ইন্দিরা দেবীকে লেখা এক চিঠিতে। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের অন্ধকারের মধ্যে ভ্যাপসা গরম ও আবছা আলোয় দেবমূর্তি দেখে যখন বাইরে উদার আলোকের মধ্যে এসে দাঁড়ালেন তিনি, দেবতা সত্যি কোথায় আছেন, তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারলেন।

পুরী প্রসঙ্গে তাঁর ‘কালের যাত্রা’-র কথা মনে না পড়ে পারে না। ‘রথের রশি’, ‘কবির দীক্ষা’ আর ‘রথযাত্রা’ মিলে এই ‘কালের যাত্রা’, একের ভিতর তিন। জগন্নাথের রথযাত্রাকে যথারীতি প্রতীকী ব্যঞ্জনায় এনেছেন কবি। রথ এখানে শাশ্বত সভ্যতার প্রতীক, যার চলমানতা যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়। এখানে বর্ণবাদ আর চিরায়ত শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার কবি। এতকাল সভ্যতার রথ নিজ দম্ভে চালিয়ে এসেছে উচ্চবর্ণের মানুষ, নিম্নবর্ণের ঠাঁই হয়নি। এবার তারা ভার নেবে রথচালনার। কেননা ‘নীচের তলাটা হঠাৎ উপরের তলা হয়ে ওঠাকেই বলে প্রলয়। বরাবর যা প্রচ্ছন্ন তাই প্রকাশ হবার সময়টাই যুগান্তর’ (মন্ত্রী: রথের রশি)। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা যে তিনটি শক্তির সাহায্যে চলে, তাও নির্মোহভাবে দেখিয়ে দেন তিনি ‘রথের রশি’-তে। ধর্মান্ধতা, কর্পোরেট সংস্থা আর সামরিক বাহিনী। নাটকটিতে এসব সংলাপ তাই প্রণিধানযোগ্য।

১. কলিযুগে না চলে শাস্ত্র, না চলে শস্ত্র।/ চলে কেবল স্বর্ণচক্র।
২. এ কালের রাজত্বে রাজা থাকেন সামনে,/ পিছনে থাকে বেনে। যাকে বলে অর্ধ-বেনে রাজেশ্বর মূর্তি।
৩. আজকাল চলছে যা কিছু, সব ধনপতির হাতেই চলছে।
৪. তলোয়ার চলে আমাদেরই হাতে (সৈনিক)। তোমাদের হাত চালাচ্ছে কে? (তৃতীয় বণিক)

দেবদ্বিজে হাস্যকর ভক্তি নিবেদনকেও একস্থলে ব্যঙ্গ করা হয়েছে ‘কালের যাত্রা’-য় ‘তৃতীয়া’ মেয়েটির মুখ দিয়ে, ‘তোমাকে দেব পরিয়ে পঁয়তাল্লিশ ভরির সোনার আঙটি।’ আংটি পঁয়তাল্লিশ ভরির, কী শ্লেষ!

রবীন্দ্রনাথের ‘রাজর্ষি’, ‘বিসর্জন’, ‘অচলায়তন’ ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার আর কূপমণ্ডুকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ। ব্যঙ্গনাটিকা ‘আর্য ও অনার্য’ তো তথাকথিত আর্যামির নামে যে বাড়াবাড়ি, তাকে তীক্ষ্ম ছুরিকাবিদ্ধ করা হয়েছে এভাবে। ‘‘হাই তোলার সময় তুড়ি দেয় কেন লোকে?’’ এ প্রশ্নটি তুলে ‘আর্য’ নফর কুণ্ডু নিজেই ব্যাখ্যা দেন এর, ‘‘…ম্যাগনেটিজম। উত্তানবায়ুর সঙ্গে আধানশক্তির যোগ হয়ে যখন ভৌতিক বলে পরিচালিত নিধানশক্তি স্বশক্তির প্রভাবে প্রাণ কারণ এবং ধারণ এই তিনটেকে অতিক্রম করতে থাকে তখন সত্ত্ব রজঃ এবং তম এই তিনেরই ব্যতিক্রমদশা ঘটে। এমন সময় মধ্যমা এবং বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের ঘর্ষণজনিত বায়ব তাপের কারণভূত স্নায়ব তাপ সৌর তাপের সঙ্গে মিলিত হয়ে জীবদেহের ভৌতিক তাপের আত্যন্তিক প্রলয়দশা ঘটতে দেয় না। একে বিজ্ঞান বলে না তো কাকে বিজ্ঞান বলে?’’ মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। সে সময়ে শশধর তর্কচূড়ামণি প্রমুখ পণ্ডিত তথাকথিত আর্যামি নিয়ে যে-সব উদ্ভট তত্ত্ব প্রচার করছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তার প্রতিবাদ করতে গিয়েই লিখেছিলেন ‘আর্য ও অনার্য’। চিন্তামণির আরও উক্তি, ‘‘আমি চিন্তাশক্তির (!) প্রভাবে আমাদের আর্য জাতির হাঁচি কাশি তুড়ি আঙুল-মটকানো প্রভৃতি আচার ব্যবহারের নানাবিধ সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক তত্ত্বসকল আয়ত্ত করেছি। … আমি আর্যশাস্ত্র কিংবা বিজ্ঞান কিছুই পড়িনি। আমার সমস্ত বিদ্যা স্বাধীন চিন্তাপ্রসূত।’’ আবারও মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

‘গুরুবাক্য’ নাটিকাটিও অন্ধ গুরুবাদের বিরুদ্ধে কবির কড়া চাবুক।

ব্রাহ্ম রবীন্দ্রনাথ হিন্দু দেবদেবীকে উপেক্ষার দৃষ্টিতে তো দেখেনইনি, রূপকে প্রতীকে তিনি দেবতাদের বিনির্মাণ ঘটিয়েছেন। মধ্যযুগের সন্ত-সুফিদের প্রতি ছিল তাঁর যেমন নিষ্ঠা, শ্রীরামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের প্রতি তেমনই শ্রদ্ধা। ভারতবর্ষকে জানতে হলে বিবেকানন্দকে জানতে হবে, বলেছেন তিনি। ‘‘বহু মানুষের বহু সাধনার ধারা/ ধেয়ানে তোমার মিলিত হয়েছে তারা’’, শ্রীরামকৃষ্ণ সম্পর্কে তাঁর উক্তি, যে সময় বহু ব্রাহ্ম (শিবনাথ শাস্ত্রী, প্রতাপচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ) তাঁকে অবজ্ঞার চোখে দেখতেন। বৌদ্ধ, খ্রিস্ট, ইসলাম সমস্ত ধর্মের প্রতিই ছিল তাঁর আত্যন্তিক শ্রদ্ধাবোধ ও অভিনিবেশ। ‘‘ইসলাম পৃথিবীর মহত্তম ধর্মের মধ্যে একটি’’, লিখেছেন তিনি।

সরস্বতীর বরপুত্র সারদা-তনয় দেবী সরস্বতীকে সম্বোধন করছেন ‘স্থিরচপলা’ বলে। ‘বাল্মীকি প্রতিভা’-য় বাল্মীকির সরস্বতী-বন্দনা তো রবীন্দ্রনাথেরও, ‘কী প্রতিমা দেখি এ, জোছনা মাখিয়ে/ কে রেখেছে আঁকিয়ে/ আমরি অমলপুতলা।… তব কমল পরিমলে রাখো হৃদি ভরিয়ে/ চিরদিবস করিব তব চরণসুধা পান।

বীণা আর পদ্ম দেবী সরস্বতীর অঙ্গাঙ্গী। রবীন্দ্ররচনায় হাজারো বার এই দুয়ের উপস্থিতি।

চিত্র: গুগল
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »