শাস্ত্রীয় নৃত্যে যৌনতা ও যৌন অনুষঙ্গ
ড. সো মা দ ত্ত
ভরত নাট্যশাস্ত্রের সাথে সংযুক্তিকরণের শর্তসাপেক্ষে ভারতবর্ষের নানান আঞ্চলিক নৃত্যধারার পরিশীলন ও পরিমার্জনে গড়ে উঠেছে ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য। ভরত নাট্যশাস্ত্রকে আমরা প্রাচীন যুগে ভারতীয় উপমহাদেশের বা পুরাণ-বর্ণিত জম্বুদ্বীপে প্রচলিত নাট্যের বিস্তৃত ইতিহাস বলতে পারি। ভরতের আগেও নাট্যশাস্ত্র রচনা হয়েছে, তার খুব অল্প অংশ পরবর্তী লেখকদের কথায় জানা গেলেও সেগুলি সম্পূর্ণরূপে পাওয়া যায়নি। সুতরাং ভরত নাট্যশাস্ত্র, সাধারণাব্দের আগে থেকে সাধারণাব্দ ২য়-৩য় শতক অবধি যার রচনাকাল ধরা হয়, নাট্যকলার একমাত্র প্রাচীন প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে গ্রহণযোগ্য। রচনাকাল নিয়ে মতান্তর আছে, আবার একজন লেখকের রচনা এই বিপুল গ্রন্থ এমন দাবি যে পরিত্যাজ্য তাও স্বীকার করেন বিশেষজ্ঞরা। বিপুল একটি ভূখণ্ডকে অঞ্চলে ভাগ করে, আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য সহ অভিনয়ের সমস্ত খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণ এবং তাকে সুসংহত উপায়ে নথিবদ্ধ করা প্রশংসার দাবি রাখে। নাট্যশাস্ত্র ইতিহাস হিসেবেই নাট্যকলার চর্চাকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা ছিল কিন্তু আমাদের ছাত্রজীবনে আমরা রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃত্য-বিষয়ে পড়াশোনা করতে এসে পরিচিত হই নাট্যশাস্ত্রের সাথে। সেইসময় নাট্যবিভাগে নাট্যশাস্ত্র পড়ানো হত বলে মনে পড়ে না। বর্তমানে নাট্যশাস্ত্র নাট্যবিভাগে পাঠ্যবিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যা খুবই ইতিবাচক দিক।
নৃত্যক্ষেত্রে নাট্যশাস্ত্র এত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেল কখন এবং কেন?
১৯৩০ সালের কিছু আগে থেকে পরবর্তী সময়কালেই নাট্যশাস্ত্রকে কেন্দ্র করে দেশে শাস্ত্রীয় নৃত্যগঠনের কাজ শুরু হয়। শাস্ত্রীয় নৃত্য বা ক্লাসিকাল ডান্স এই ধারণা মূলত উপনিবেশিক ধারণা, যেমন ভারতীয় জাতীয়তাবাদ বা হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও পশ্চিমা দেশের প্রভাবেই গড়ে উঠতে থাকে ভারত ভূখণ্ডে তাও আমরা জানি। এত বড় ভূখণ্ডকে এক জাতীয়তাবাদী ধারণায় বাঁধতে সেই আদর্শের অনুকূল, বা সেই আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য শিল্পমাধ্যম লাগে। বহুযুগ ধরে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মূলত বিলাসকলা হিসেবে নৃত্যশিল্প গড়ে উঠেছে এবং বিস্তারলাভ করেছে। রাজতন্ত্র ও ব্রাহ্মণ্যবাদ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা সর্বতোভাবে করেছে সে-সব শিল্পমাধ্যম, যা রাজ অনুগ্রহে বিস্তারলাভ করেছে। মধ্যযুগে এই ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরোধিতায় ভক্তিবাদ মাথাচাড়া দেয় এবং অবশ্যই শিল্প, সাহিত্য ও নৃত্যেও তার অসম্ভব প্রভাব পড়ে। ভক্তিবাদী আন্দোলন একাধারে সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কার দুই ঘটিয়েছিল। কিন্তু এই ভক্তিকেও ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের খাঁচায় কীভাবে বন্দি করতে হয় এবং তারই অনুকূলে ভক্তিকে চালনা করতে হয় তা শাস্ত্রীয় নৃত্যগুলিকে পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যায়। আমার ধারণা, সে-সময় দেশের অগ্রগণ্য রাজনৈতিক, কবি সাহিত্যিকগণ খুব সচেতনভাবেই পিতৃতান্ত্রিক ব্রাহ্মণ্যবাদী কাঠামোয় গড়ে তুলেছিলেন শাস্ত্রীয় নৃত্যধারাগুলিকে এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী স্বার্থরক্ষার্থে বিত্তশালী ব্যক্তিবর্গ এই প্রকল্পের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। অতীতকে মহিমান্বিত করে বর্তমানে মানুষের মধ্যে জাতীয় গৌরব বোধ জাগ্রত করতে তাই নাট্যশাস্ত্রের সাথে যুক্ত করে গড়ে তোলা হল শাস্ত্রীয় নৃত্য ঐতিহ্য। ভরত নাট্যশাস্ত্র এই ভূখণ্ডকে চারটি অংশে বিভক্ত করে নাট্যাভিনয়ে স্থানীয় ব্যবহার (প্রবৃত্তি) সম্পর্কে বিস্তারিত পাঠ উল্লেখ করেছে— আবন্তী, দাক্ষিণাত্যা, পাঞ্চালী ও ঔড্রমাগধী। শাস্ত্রীয় নৃত্য ও এই প্রকারকে নৃত্যে অভিযোজিত করেছে। লোকধর্মী ও নাট্যধর্মী অভিনয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী শাস্ত্রীয় নৃত্যে নাট্যধর্মিতার প্রয়োগ হয়েছে।
জনসাধারণের স্বাভাবিক জীবনযাপন সংক্রান্ত কার্যকলাপ, অঙ্গলীলাবিহীন স্বাভাবিক অভিনয় লোকধর্মী রূপে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিপরীতে অতিবাক্য ও কার্যকলাপ, অতিমাত্রায় ক্ষমতাসম্পন্ন, লীলাপূর্ণ, অঙ্গহারপূর্ণ, অলংকারযুক্ত স্বর্গ এবং দিব্যপুরুষাশ্রিত যে অভিনয় তাকে নাট্যধর্মী বলা হয়েছে। শাস্ত্রীয় নৃত্য মূলত নাট্যধর্মী অভিনয় আশ্রিত হয়েই গড়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষের জীবন থেকে সে শুরু থেকেই দূরে দাঁড়িয়ে থেকেছে মূলত অভিজাত শ্রেণির হাতে গড়া তাদের নিজেদের জন্য এক বিনোদনের মাধ্যম। স্বাভাবিকভাবে নাট্যশাস্ত্র এই নৃত্যধারাগুলির আশ্রয় হয়েছে।
নাট্যশাস্ত্র ও ব্রাহ্মণ্যবাদী পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো
নাট্যশাস্ত্র অনুযায়ী, নাট্যের সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী শাস্ত্র ও পুরাণমতে ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা। ব্রহ্মা, ব্রাহ্মণ, ব্রহ্মান্ড প্রতিটি শব্দই সংস্কৃত ব্রুহ ধাতু থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া অথবা বিস্তার লাভ করা। ব্রহ্মা নাট্যবেদ সৃষ্টি করে দেবরাজ ইন্দ্রকে বললেন এই নাট্যবেদ দেবতাদের মধ্যে প্রবর্তন করতে। ইন্দ্র বললেন দেবগণ একে গ্রহণ ও রক্ষা করতে সক্ষম নন, এই পরিশ্রমসাধ্য কাজ করতে পারেন মুনিঋষিগণ, যাঁরা বেদসমূহের রহস্য জানেন এবং কষ্ট সহ্য করতে সক্ষম। অতএব ভরত এবং তাঁর শতপুত্রের ওপর দায়িত্ব এল নাট্যের প্রচলন করার। নাট্যশাস্ত্র অনুযায়ী প্রথম নাট্যরচনা হল, যা দেবতাদের দ্বারা দৈত্যদানব বধ বিষয়ক। এই নাট্য ইন্দ্রধ্বজ পূজায় অভিনয় হলে দৈত্য ও দানবগণ অসন্তুষ্ট হয় এবং নাট্যে বিঘ্ন সৃষ্টি করে নাট্যানুষ্ঠান ভন্ডুল করার চেষ্টা করে। ইন্দ্র তখন তাঁর জর্জর দিয়ে রঙ্গমঞ্চে উপস্থিত বিঘ্নসমূহ ও অসুরদের শরীর চূর্ণ করেন। এরপর উৎসব হয়ে গেলে, পরবর্তীতে গোলযোগ এড়াতে রঙ্গালয় তৈরির সিদ্ধান্ত হয় এবং নানান ক্ষেত্রে দেবতারা রক্ষার জন্য নিযুক্ত থাকেন। যে সকল দেবতা রঙ্গালয় রক্ষার জন্য নিয়োজত হলেন তাঁরাই হলেন এর অধিদেবতা। রঙ্গপূজা না করে যাঁরা নাট্যানুষ্ঠান করেন তারা নীচ শ্রেণির প্রাণী হয়ে জন্মলাভ করেন, এমন কথাও বলা হয়েছে অর্থাৎ ভয় উৎপাদন করার চেষ্টা হয়েছে। ভয়ে হোক বা ভক্তিতে নাট্যপূজা প্রচলন হল উদ্দেশ্য।
এরপর আসে বিঘ্নশান্তি পর্যায়, সাম দান ভেদ এবং দণ্ডের প্রসঙ্গ। ব্রহ্মা দৈত্য ও অসুরদের জিজ্ঞাসা করলেন, কেন তারা নাট্যানুষ্ঠানে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। ব্রহ্মার কথা শুনে দৈত্য ও বিঘ্নসমূহের সাথে বিরুপাক্ষ বললেন (সামবাক্য) সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা, তাই দৈত্য ও দানবদেরও পিতাও তিনিই। দেবতাদের জন্য সৃষ্টি নাট্যে ব্রহ্মা দৈত্য ও দানবদের লজ্জা দিয়েছেন, এ-কাজ পিতারূপে তার করণীয় নয়। এর উত্তরে ব্রহ্মা বলছেন যে, নিষ্পাপ দানবগণের এতে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই, কারণ নাট্য সমগ্র ত্রিভুবনের ভাবের অভিনয়। এখানে কখনও ধর্ম, কখনও খেলাধুলা, কখনও অর্থ, কখনও শান্তি, কখনও হাসি, কখনও যুদ্ধ, কখনও কাম এবং হত্যাও অভিনীত হবে।
‘ঈশ্বরাণাং বিলাসশ্চ স্থৈর্য্যং দুঃখাদিতস্য চ।
অর্থোপজীবিনামর্থো ধৃতিরুদ্বিগ্নচেতসাম।।’
এটি (নাট্য) সম্পন্ন ব্যক্তিদেরকে (ঈশ্বর) বিলাস, দুঃখার্তদেরকে স্থৈর্য, অর্থোপজীবীদেরকে অর্থ এবং উদ্বিগ্নচিত্ত ব্যক্তিগণকে ধৈর্য সম্বন্ধে উপদেশ দেয়।
আরও বলেন যে, এমন কোনও জ্ঞান, শিল্প ও কলা, বিদ্যা, যোগ বা কর্ম নেই— যা এই নাট্যে দৃষ্ট হয় না। অতএব, এই নাট্য আমি সৃষ্টি করেছি যাতে সকল শাস্ত্র, শির ও বিবিধ কর্মের মিলন হয়েছে। সুতরাং দেবগণের প্রতি তোমাদের ক্রোধ করা সঙ্গত নয়; সপ্তদীপা পৃথিবীর অনুকরণ এই নাট্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর প্রত্যুত্তরে দানবদের ভাষ্য আর নাট্যশাস্ত্রে নেই। তাই অনুমান করা হয় এতে বিরোধ মিটল, না মিটলে পরবর্তী দান, ভেদ ও দণ্ড প্রভৃতি প্রয়োগের প্রশ্ন আসত।
নাট্যের উৎপত্তি বিষয়ক অধ্যায়ে নাট্যশাস্ত্র অনুসরণকারী নাট্যের কাঠামো কেমন তার পরিচ্ছন্ন রূপ কিন্তু আমরা পেয়ে যাচ্ছি।
১) নাট্যের উদ্দেশ্য আনন্দদান ও উপদেশ প্রদান। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে এখানে, শূদ্রজাতির জন্য বেদ অধ্যয়ন নিষিদ্ধ তাই সকল জাতির উপযোগী দৃশ্য ও শ্রাব্য পঞ্চম বেদ হল নাট্যশাস্ত্র। প্রথম নাট্যে দেবতাদের আনন্দ দেওয়া হল আর উপদেশ দেওয়া হল দৈত্য দানব অসুরদের।
২) নাট্যানুষ্ঠান দেখে আনন্দিত দেবতারা প্রচুর অর্থ দান করলেন অভিনেতাদের, নাট্য প্রস্তুতকারকদের। দেবতারা নাট্য উপভোগ করবেন এবং তার জন্য অর্থ ব্যয় করবেন অর্থাৎ নাট্য প্রয়োগকারী ও পৃষ্ঠপোষক দুই দল পৃথক হয়ে গেল।
৩) এই নাট্যে সকল শিল্প কলা বিদ্যা ও শাস্ত্র ও কর্মের মিলন হয়েছে। অর্থাৎ নাট্য প্রয়োগকারী এবং অভিনেতাদের শ্রম বিপুল, সমস্ত কলাবিদ্যায় পারদর্শী না হলেও একাধিক বিষয়ে অবশ্যই পারদর্শী হতেই হবে।
পরবর্তী অধ্যায় তাণ্ডব লক্ষণ পর্যায়ে নাট্যশাস্ত্র অনুযায়ী প্রস্তুত ‘আমৃতমন্থন’ নাট্য মহাত্মা শিবকে দেখাবার প্রস্তুতি করা হয়। সেখানে শিব এবং তণ্ডুমুনি অঙ্গহারগুলি সম্বন্ধে ভরতকে জানাচ্ছেন। বিষয় হল, শিব নৃত্যপারদর্শী এবং সমস্ত রসাভিনয় জানেন। শিবকে তাণ্ডব ও পার্বতীকে লাস্য নৃত্যের জনক বলা হচ্ছে এবং এ সম্বন্ধে শিক্ষা শিব দিচ্ছেন। অথচ নাট্যের সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাকে কখনওই নাট্যে পারদর্শিতা দেখাচ্ছেন এমনটা নাট্যশাস্ত্রে কোথাও বলা নেই। নাট্যশাস্ত্রের পুরোভাগের এই কাহিনি তাই ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রতিষ্ঠার ছল বলেই মনে হয়। তাণ্ডব ও লাস্য যেমন পাশাপাশি বসে, শিব-পার্বতী তেমনি পাশাপাশি বসেন কিন্তু ব্রহ্মা একা, সৃষ্টিকর্তা, কর্ত্রীবিহীন, কাঠামো তাই পুরুষতান্ত্রিক তো বটেই।
নাট্যশাস্ত্র ও নারীর অবস্থান
নাট্যশাস্ত্র বলছে, শৃঙ্গাররসসম্ভূত কৈশিকী বৃত্তি নারী ব্যতিরেকে পুরুষ প্রকাশ করতে পারে না, তাই ব্রহ্মা নাট্যশোভানিপুণ অপ্সরাগণ সৃষ্টি করছেন। নাট্যে অপ্সরাগণ শৃঙ্গাররসের অভিনয় করবেন, যাতে দেবতারা আনন্দিত হবেন।
ধর্ম অর্থ ও কাম— এই তিনে ত্রিবর্গ। বাৎস্যায়ন কামসূত্রে বলছেন, ত্রিবর্গে কামই প্রধান, ধর্ম ও অর্থ কামনাপূরণের উপায়। কাম আহারের তুল্য দেহপোষণকারী। কামসুখের জন্যই ধর্ম ও অর্থের সেবা। সুখভোগ না হলে ধর্ম ও অর্থ হবে বন্ধ্যা। আবার বলছেন, নারীর ত্রিবর্গ সেবা হবে পুরুষের অধীন, তাদের ত্রিবর্গ সেবায় কোনও স্বাধীনতা বা প্রাধান্য নেই।
মনুসংহিতায় যেমন বলা হয়েছে, স্ত্রীলোকের শৃঙ্গার চেষ্টার দ্বারা পুরুষের দোষ জন্মায়, তাই পণ্ডিতেরা স্ত্রীলোক হইতে সাবধান থাকবেন। আবার মনু এও বলছেন যে, ইন্দ্রিয়ের আসক্তির জন্যই লোক দোষযুক্ত হন এবং ইন্দ্রিয়কে বশীভূত করতে পারলেই তিনি মোক্ষ লাভ করেন। আবার ইন্দ্রিয়কে বিষয়ের সহিত সংলগ্ন না করে বশ্যতাপন্ন করা যায় না। সেই বিষয়ের ইন্দ্রিয়কে জ্ঞানের দ্বারা বিষয়ের দোষ দেখিয়েই ইন্দ্রিয় নিবৃত্ত করা সম্ভব। তা হলে দোষ নারীতে, নাকি পুরুষের দৃষ্টিতে? দু’রকমের কথাই কিন্তু বলা আছে এখানে।
তা হলে চিত্রটা এইরকম যে, নারীকে শৃঙ্গারে পারদর্শী হতে হবে পুরুষের কাম চরিতার্থ করার জন্য। আবার এই কাজের জন্যই নারীকে অভিযুক্ত করা হবে, বলা হবে নারী নরকের দ্বার। মনুসংহিতা সমাজে প্রচলিত নিয়মনীতির সংকলন এবং কামসূত্র পুরুষের কাম চরিতার্থ করার কৌশল ও উপায় সূত্রাকারে লিপিবদ্ধ। কামসূত্র কাদের জন্য প্রয়োজনীয়? বাৎস্যায়ন বলছেন, যে সমাজে নারীর স্বাধীনতা প্রচুর তাদের কামশাস্ত্রের প্রয়োজন নেই। আবরণের বাধা যেখানে, সেখানে অবলম্বন প্রয়োজন। অর্থাৎ, সব সমাজে নারী তখনও গৃহবন্দি দাসীতে পরিণত নয়, সেখানে কামশাস্ত্রের প্রয়োজন নেই। আবার যেখানে নারীর স্বাধীনতা হরণ করে তাকে একগামী করেছে, গৃহকর্মে বন্দি করেছে তাদের সাথে কাম চরিতার্থ করার জন্য উপায় খুঁজতে হচ্ছে। পরস্ত্রীগমনের যে কারণ বলা হয়েছে কামসূত্রে যেগুলি এইরকম: ১) কোনও স্ত্রী যদি বিত্তশালী হয় বা তার স্বামী যদি বিত্তশালী হয় বা প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হয়, তা হলে রোজগারের ধান্দায় বা গোপন তথ্য জানার জন্য সেই স্ত্রীয়ের সাথে সঙ্গম করা কর্তব্য। ২) আবার এরকম কোনও কারণ ছাড়া শুধুমাত্র সুখ ও সন্তান উৎপাদনের জন্যেও পরস্ত্রীগমন কর্তব্য। আবার ধরা পড়লে শাস্তিবিধানও আছে, তাই কৌশল অবলম্বন করতে হচ্ছে যাতে ধরা না পড়তে হয়। অর্থাৎ বিধান ও নৈতিকতা এবং ব্যভিচার দুই হাত ধরাধরি করেই চলছে, এবং তা শাস্ত্রে লেখা হতেও বাধা থাকছে না।
নাট্যশাস্ত্রে নারীর শ্রেণি বিভাজনে এর আভাস পাওয়া যায়। বাহ্য, অভ্যন্তরা ও বাহ্যাভ্যন্তরা এই তিন প্রকার নারী, স্ত্রীলোককে সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে ভাগ করা হয়েছে, এমনটাই দাবি নাট্যশাস্ত্রে। নারী মর্যাদা কীসের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত দেখে নেব। অভ্যন্তরা নারী কুলীনা, সে হয় রাজার ভোগ্যা। বাহ্য নারী বেশ্যা, সাধারণের ভোগ্যা। বাহ্যাভ্যন্তরা নারীকে বলা হচ্ছে কৃতশৌচা, শুদ্ধিসম্পন্ন। কিন্তু এই প্রকার নারী কাদের দ্বারা ভোগ্য, তার উল্লেখ নেই নাট্যশাস্ত্রে। ব্যাকরণ বলছে, কৃতশৌচা হলেন সেই নারী, যার শরীর ও অন্তর শুদ্ধ হয়েছে। মহাভারত এবং পুরাণে, স্মৃতিশাস্ত্র অনুযায়ী তীর্থযাত্রায়, পূজা দেবকার্য ও ধর্মানুষ্ঠানে কৃতশৌচ হতে হয়। তা হলে বলা যায়, কৃতশৌচা নারী অর্থে দেবদাসীদের বোঝানো হয়েছে। নারী কাদের দ্বারা ভোগ্যা হবেন তাই দিয়ে তাদের মর্যাদা স্থির হল। নারীর দুটি শ্রেণি কার দ্বারা ভোগ্যা হবে তা নির্দিষ্টভাবে বলা হল কিন্তু কৃতশৌচার ক্ষেত্রে হল না। তবে এখন আমরা জানি, দেবদাসী নারীরা কাদের দ্বারা ভোগ্যা, এবং আইনিভাবে দেবদাসী প্রথা বিলুপ্ত হলেও এখনও কোনও কোনও স্থানে মন্দিরে সে প্রথা চলে। আবার দেবতার অনুগ্রহে সন্তানবতী হওয়ার টোপে সাধারণ মহিলাদেরও ভোগ করেন মন্দিরে পুরোহিতরা। রাতের অন্ধকারে মন্দিরে তারা মিলিত হন এইরকম বিশ্বাসী মহিলাদের সাথে। কর্ণাটকের তিরুপতি মন্দিরে এই প্রথা আছে বলে জানা যায়।
নারীর যৌনতা বাঁধা পড়বে, পুরুষের না। নারী একগামী হবে, পুরুষ হবে না। এই বারবনিতা, নগরনটী, দেবদাসী সবের ব্যবস্থা এই কারণেই করা হয়েছে। নাট্য যেমন ত্রিভুবনের সমস্ত কর্মের অনুকরণাত্মক অর্থাৎ সমাজদর্পণ, আবার যেমন সমাজ চাইছেন সমাজপতিগণ তার ধারণা বা চিত্রও দেখা যায় নাট্যে ও নাট্যশাস্ত্রে। নাট্যশাস্ত্রও এইরকম নিয়মতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করছে নাট্যের মাধ্যমে। নাট্যভাষার ক্ষেত্রেও আছে এই বিভাজন। অতিভাষা দেবগণের, আর্যভাষা রাজগণের আর জাতিভাষা সাধারণ মানুষের ভাষা। সংস্কৃত ভাষার প্রয়োগ হবে ধীরোদ্ধত, ধীরললিত, ধীরোদাত্ত এবং ধীরপ্রশান্ত নায়কের চরিত্রের ক্ষেত্রে। নায়িকার চরিত্র যদি রানি বেশ্যা ও শিল্পকারীর হয় তবে ক্ষেত্রবিশেষে সংস্কৃত বলতে পারে সবক্ষেত্রে নারীর অধিকার নেই সংস্কৃত ভাষায়। এখানে স্বাভাবিক তর্ক আসবে, তৎকালে নারীরা সংস্কৃত বলতেন না বা জানতেন না তাই এই নিয়ম। কিন্তু আমার যুক্তি হবে, বলতেন না কেন? জানতেন না কেন? জানানো তো না বলে। যে পরিবারে পুরুষ সদস্যরা সংস্কৃত বলেন, সে পরিবারের সকল শিশু স্বাভাবিকভাবে সে ভাষা শিখবে। তা হলে নাট্যে প্রয়োগের সময় সব ক্ষেত্রে নারীচরিত্রের মুখে সংস্কৃত ভাষা থাকবে না কেন? কারণ বৈষম্য, নারী পুরুষের পাশে থাকার যোগ্য নয়, শুধুমাত্র কামনা চরিতার্থ করার বস্তু।
শাস্ত্রীয় নৃত্য ও ক্ষমতা এবং পিতৃতন্ত্র
শাস্ত্রীয় নৃত্য গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে কাজ শুরু হয় মূলত দেবদাসী, মাহারী, রাজনর্তকী, ভ্রাম্যমাণ বিলাস নৃত্যশিল্পী, নগরনটী ও বাইজিদের নাচগুলিকে নিয়ে। কথাকলি এবং মণিপুরি নৃত্যের ক্ষেত্র খানিক আলাদা। বাকি প্রতিটি নৃত্যের মূল বিষয় ছিল যৌন আবেদন। তাই যৌন আবেদন বাদ দিলে নাচগুলিতে নিষ্প্রাণ শুষ্ক একটা কাঠামো পড়ে থাকে, যা আবার খুবই স্থূল। আবার চড়া দাগের যৌন আবেদনপূর্ণ নাচ আধুনিক মঞ্চে নিয়ে আসা যাবে না, তাতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলা সম্ভব না তাই বিশেষভাবে যুক্ত হল ভক্তিরস। যৌনতা ও শৃঙ্গার (আদিরস) ভক্তির আবরণে আবৃত হয়ে উপস্থাপিত হল।
শাস্ত্রীয় নৃত্য প্রকল্পের প্রথম নাচ ভরতনাট্যম, নামকরণ করেছেন ই. কৃষ্ণ আইয়ার এবং রুক্মিণী দেবী অরুন্ডেল। সাদীর নাচ, সাদীর কাচ্চেরী বা সাদীর নামের বদলে নাট্যশাস্ত্রের প্রভাবেই ভরতনাট্যম হল, একথা অত্যুক্তি হবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে যদিও ভাব, রস ও তাল এই তিনের নির্যাস নিয়ে গঠিত এই নৃত্য— তাই এর নাম ভরতনাট্যম। এর সাথে নাট্যশাস্ত্র রচয়িতা ভরতের বা দেশের নাম ভারতের সাথে কোনও সম্পর্ক নেই। এটা একটা বক্তব্য বটে কিন্তু কেন এরকম বলা হচ্ছে তার কিন্তু কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কারণ বলা হয়নি। সমস্ত নৃত্যশৈলীই ভাব রস ও তাল নিয়েই গঠিত, তাই না? উল্টোদিকে নাট্যশাস্ত্রের সাথে এর সংযুক্তীকরণ এবং নাট্যশাস্ত্র রচয়িতা ভরত নামের সাথে সাদৃশ্য, এই বক্তব্যকে সমর্থন করে না। আবার ভারতের জাতীয়তাবাদী (হিন্দু জাতীয়তা) আন্দোলনের প্রেক্ষিতে গড়ে ওঠা যে শিল্প হিন্দু সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, তার নামকরণে এই ভাবনা থাকবে না তাও মেনে নেওয়া বেশ কঠিন। যাই হোক না কেন, ভারতীয় অভিজাত সংস্কৃতি হিসেবে পরবর্তীতে ভরতনাট্যম নৃত্য দেশে-বিদেশে প্রসারিত হয়েছে। ভরতনাট্যম নৃত্যসংগ্রহের (repertoire) পরিকাঠামো তৈরি হয়েছিল তাঞ্জাভুরের মারাঠা রাজা দ্বিতীয় সারফোজির আমলে, চিন্নাইয়া, পুন্নাইয়া, ওয়াডিভেলু ও শিবানন্দ— এই চারজন সঙ্গীত ও নৃত্যবিশারদের প্রচেষ্টায়। আলারিপু, যতিস্বরম, শব্দম, পদম, যতিস্বরম, কীর্তনম, শ্লোকম, বর্ণম, তিল্লানা— এই যে ক্রম গঠিত হয় পরবর্তী পর্যায়ে দক্ষিণ ভারতীয় অন্যান্য শাস্ত্রীয় নৃত্যগুলিতে এই কাঠামোই প্রযুক্ত হয় খানিক অদলবদল করে। শব্দম, শ্লোকম ও কীর্তনমে ভগবানের গুণকীর্তন ও তার লীলা প্রকাশিত হয় কিন্তু পদম একান্তই শৃঙ্গার রস কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে। পদম, জাভেলী, অষ্টাপদী মূলত কাম বিষয়ক এবং শৃঙ্গার রসসমৃদ্ধ নৃত্যপদ।
মোহিনীয়াট্টম নৃত্যে ভরতনাট্যমের প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি এবং দুটি নৃত্যধারাকে পৃথক করতে ১৯৩০-এ কলামণ্ডলম প্রতিষ্ঠার পর অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে নৃত্যগুরু ও সঙ্গীতজ্ঞদের। রাজা কার্তিক থিরুনাল বলরামা বর্মা ‘বলরামাভারতম’ লিখছেন মূলত রাজসভার নর্তকীদের দেখে, আবার ভরত নাট্যশাস্ত্রের প্রভাবও আছে এই গ্রন্থে। যেমন প্রকম্পিত বক্ষের কুম্মিতে (তামিলনাডু ও কেরালার লোকনৃত্য) প্রয়োগের কথা লিখছেন। আবার নায়কের দেহে নায়িকার একদিকের স্তন চেপে ধরার ভঙ্গিমায়, নাচে যৌনতা, আনন্দ প্রকাশের ক্ষেত্রেও প্রকম্পিত বক্ষের প্রয়োগ হবে বলছেন। রাজা স্বাতী থিরুনালের রাজত্বের পরে মোহিনীয়াট্টম রাজ পৃষ্ঠপোষকতা হারায়, শিল্পীরা চলে আসেন নাগরিক মঞ্চে। সে-সময় চন্দনম, মুখুতি নামক নৃত্যপদগুলিতে সম্পূর্ণত যৌনতা ছিল। শিল্পীর নাকছাবি হারিয়ে গেছে এবার সেটি খুঁজে বেড়াচ্ছে সে দর্শকদের পকেটে পাগড়িতে, এর নাম মুকুতি। চন্দনমে নৃত্যের ভঙ্গিমায় নায়কের গায়ে চন্দন লাগানো হত। বোঝাই যাচ্ছে সম্পূর্ণত বিলাসকলা ছিল এর মূল বিষয়।
শাস্ত্রীয় মোহিনীয়াট্টমে এ সবই রইল খানিক পরিশীলিত আকারে এবং নায়ক হলেন এখানে দেবতা। শাস্ত্রীয় নৃত্য মূলত এককনৃত্য এবং একাহারী নাট্যধর্মী অভিনয়শৈলী হয়ে উঠল যাতে ভাব ও ভঙ্গি এক থাকলেও শারীরিকভাবে পুরুষ ও নারী দ্বৈত অভিনয় করছেন না তাই দৃশ্যত অশ্লীলতার অভিযোগ উঠল না। শাস্ত্রীয় নৃত্যে সম্ভোগ শৃঙ্গার প্রদর্শনও নিষিদ্ধ হল এবং বিপ্রলম্ভ শৃঙ্গার ভক্তিরসের মোড়কে পরিবেশিত হল। স্বাতী থিরুনাল রচিত ‘মুল্লাপুমালারাম্বান’ গানটি অভিনয়ের সময় ঘুমের মধ্যে চুম্বন অনুভব করে নায়িকা জেগে ওঠে, কাঁধে হাতের স্পর্শ পায়, তার হাত ধরে কাছে টেনে এনে হাতে চুম্বন করে, হাত ধরে উঠে দাঁড়িয়ে তাকে কাছে টেনে এনে আলিঙ্গন করে থাকে। তারপর হঠাৎ মনে হয় কেউ তো নেই কাছে। খুঁজে দেখে এদিক-ওদিক, না কেউ নেই, তা হলে কি স্বপ্ন দেখছিলাম? তারপর কামদেবের অভিনয় আসে, তার ছোড়া ফুল নায়িকা মাথায় গোঁজে এবং সে কামে জর্জরিত হয়। সুন্দর বাগানে হেঁটে যাচ্ছে নায়িকা গাছ থেকে ফুল ঝরে পড়ছে, এত সুন্দর পরিবেশ, এই তো মিলনের সময়, এসো তোমার কি একটুও মায়া হয় না!…
‘রতিসুখসারে গতমভিসারে’ যখন অভিনয় করছেন কোনও ওড়িশি নৃত্যশিল্পী, আসলে কী বলছেন? শারীরিক মিলনের কথাই বলছেন, পীনপয়োধর বোঝাতে বক্ষযুগলকেই দেখাচ্ছেন। কিন্তু রাধা এখানে কৃষ্ণের শ্রেষ্ঠ আরাধিকা। আরাধনার মাধ্যমে কৃষ্ণকে তৃপ্ত করাই তাঁর কাজ। বৈষ্ণবশাস্ত্রে আবার রাধাকে কৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি বলা হয়েছে, অর্থাৎ কৃষ্ণের আনন্দের উৎস রাধা, এছাড়া তার আর কোনও অস্তিত্ব নেই। রাধাকৃষ্ণের মিলন ও জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার মিলন হিসেবেই ব্যাখ্যায়িত। যদিও এই সবকিছুই মানুষের সমাজে ঘটে চলা ঘটনা, একই অভিব্যক্তি, একই ভাবনা। বাৎস্যায়নের কামসূত্রে মিলনের জন্য প্রস্তুতির বর্ণনা এইরকমভাবেই দেওয়া হয়েছে। শাস্ত্রীয় নৃত্যে শুধু বিধিবদ্ধ সতর্কবার্তার মতো বলা হয়েছে যে, এখানে নায়ক ঈশ্বর তাই এখানে শৃঙ্গার রসের অভিনয়ও আসলে আধ্যাত্মিক প্রেম, ভক্তিরস। জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার মিলনই আসলে এখানে লক্ষ্য। এখানে কামজর্জরিত হচ্ছে নায়িকা, নায়ক আসছে পরিত্রাতারূপে। যৌনতা আছে শাস্ত্রীয় নৃত্যের সমস্ত অস্তিত্ব জুড়েই কিন্তু স্বীকার করা হয় না, ভক্তির আড়াল দেওয়া দিয়ে একে দেবতার আরাধনা বলা হয়।
শাস্ত্রীয় মণিপুরি নৃত্য, কাংলেইপাক দখল করে বৈষ্ণব তথা ব্রাহ্মণ্যধর্ম প্রতিষ্ঠা প্রকল্পের অংশ। ‘সানামাহি’ ধর্মের সমস্ত পুয়া পুঁথি পুড়িয়ে দিয়ে বৈষ্ণবধর্ম রাজধর্ম হয়ে ওঠে, ধীরে গ্রাস করে সমস্ত রাজ্যকে, নাম হয় মণিপুর। মণিপুরি নৃত্যের আঙ্গিকে বিলাসকলা অনুপস্থিত। বৈষ্ণব শাস্ত্রানুযায়ী বাৎসল্য ও মধুর রস এর মূল উপজীব্য। নারী শরীরকে এখানে যথাসম্ভব গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছে। পলুই (নিম্নাংশের স্কার্ট) এত বড় ঢোলাকৃতি যা শরীর দৃষ্টিগোচর হতে দেয় না। ঊর্ধ্বাংশে ব্লাউজের ওপর আবার একখণ্ড কাপড় দিয়ে স্তন চেপে বাধা হয় পিছনে। মাথার ওপরে ওড়না দিয়ে মুখ থাকে ঢাকা। এখন অবশ্য মঞ্চে মুখ ঢাকা হয় না। রাস ছাড়া অন্য নৃত্যপদের ক্ষেত্রে পলুইও পরা হয় না। ফানেক টাইট করে পরা হয়, যাতে পা বেশি ফাঁক করা না যায়। ঊর্ধ্বাংশে ব্লাউজের ওপর ইনাফি দেওয়া হয়। তাণ্ডবনৃত্য পুরুষ চরিত্রের জন্য এবং লাস্য নারী চরিত্রের জন্য নির্ধারিত। তাণ্ডবে পা মাটি থেকে ওপরে উঠবে লাস্যে পা মাটি থেকে উঠবে না। চোলমনৃত্যের (পুংচোলম ঢোলচোলম) প্রকরণ শাস্ত্রীয় মণিপুরি নৃত্যের অঙ্গীভূত হয়েছে অনেক পরে। গুরু বিপিন সিং ব্যাপকভাবে চোলমনৃত্যের প্রকরণ শাস্ত্রীয় মণিপুরি নৃত্যে অন্তর্ভুক্ত করেন। নৃত্য যখন শুধু মন্দিরে না, মঞ্চে উপস্থাপিত হচ্ছে তখন তার গতি শিল্পগুণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, দর্শকের কথা এখানে মাথায় রাখতেই হয়। নাচ দেখতে যাঁরা আসছেন সবাই ভক্ত নাও হতে পারেন, ভক্তি নয় শিল্পই তাঁদের কাছে মূল আকর্ষণ। তাই বর্তমান মণিপুরি নৃত্য ভক্তিভাব বজায় রেখেও অনেক বেশি গতিসম্পন্ন ও মঞ্চোপযোগী। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, এই যে পরিবর্তন তা ভক্তি ব্যতিরেকে নতুন ভাবনা, সমসাময়িক বিষয় প্রকাশ করার ক্ষেত্রেও অনেক বেশি উপযোগী। মণিপুরি নৃত্যে দাক্ষিণাত্যের অনুকরণে নৃত্যসংগ্রহ বা রেপেটয়ার গঠিত হয়নি বরং মাইবী, লাইহারাওবার মতো লোক-আঙ্গিকগুলিও মঞ্চে উপস্থাপিত হয়। বৈষ্ণবশাস্ত্রের মধুররসতত্ত্বই এই নাচের মূল উপজীব্য।
তত্ত্ব রাধাকে কৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি যেমন বলেছে, তেমন আবার তাকে কৃষ্ণের অংশ বলেও ব্যাখ্যা করেছে। ব্যাখ্যা যাই থাক না কেন, চর্মচক্ষুতে মানুষ যা দেখতে পায়, তা হল একটি পুরুষ চরিত্রকে তুষ্ট করতে গোপিনীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা। গোপিনীদের জামাকাপড় নিয়ে কৃষ্ণের পলায়ন লীলা বলে সামাজিক স্বীকৃতি লাভ করে, এতে অন্যায় কিছু থাকে না। আবার রাতের অন্ধকারে মরিয়া হয়ে রাধার অভিসার প্রেমের জন্য না, ঈশ্বর ভক্তির, বললেও সকলের মন কি তাই বোঝে? তা হলে কী উপদেশ, কেমন সামাজিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে এর মাধ্যমে? বাল্যকালে কৃষ্ণ রাখাল অর্থাৎ গোসম্পদের রক্ষাকর্তা। পরবর্তীতেও কৃষ্ণ চরিত্রকে সেভাবেই গড়ে তোলা হয়েছে, তিনি সম্পদশালীদের দেবতা। সম্পদ রক্ষা করতে, বাড়াতে যা কিছু করার প্রয়োজন তাঁকে দিয়ে তাই করানো হয়েছে। প্রেমের সাথে এর সম্পর্ক নেই, আছে কামের সাথে। প্রেমিক হলেন শিব, পত্নীর অপমানে যিনি দক্ষযজ্ঞ ধ্বংস করতে পারেন। উন্মাদ হয়ে সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে ঘুরতে পারেন, প্রেমেই হন অর্ধনারীশ্বর। প্রেমে, মানব প্রেমে মানুষ বৈরাগী হয় ফকির হয়, যেমন লালন-কবীর-বুল্লে শাহ-দুদ্দু শাহ-মীরা বাই। কদাচিৎ মীরার ভজন শাস্ত্রীয় নৃত্যের আঙ্গিকে উপস্থাপিত হলেও তা শাস্ত্রীয় নৃত্যের রেপেটরির মধ্যে আসে না। সম্পদশালীরা তাদের স্বার্থরক্ষায় দেবতা বানায় এবং তার প্রতি নিবেদিত হতে শেখায় সম্পদহীনদের। এ হল নির্বিঘ্নে সম্পদ রক্ষা করার কৌশল।
রামনাট্যম কৃষ্ণনাট্যম থেকে কথাকলি হয়ে ওঠার যাত্রাও একপ্রকার ব্রাহ্মণ্য বৈষ্ণবধর্মের আধিপত্য বিস্তার। একই অঞ্চলে বিলাসকলা হিসেবে নাচের ধারা যেমন বিস্তার লাভ করেছে আবার ধর্মপ্রচারের কাজেও লেগেছে নৃত্য। জন্ম থেকে শুরু করে স্বর্গারোহণ পর্যন্ত ভগবান কৃষ্ণের জীবনগাথা আট রাত্রিব্যাপী প্রচারিত হত কৃষ্ণনাট্যম নৃত্যনাট্যের মাধ্যমে। একইভাবে রামনাট্যমে রামের জীবনকথা ছিল মূল বিষয়বস্তু। পরবর্তীকালে রামায়ণ মহাভারতের এবং অন্যান্য পৌরাণিক কাহিনি সম্বলিত নৃত্যনাট্য কথাকলি নামে প্রচলিত হয়। সতেরো শতকে কোঝিকোডের জামোরিন রাজা মানবেদের উদ্যোগে শুরু কৃষ্ণনাট্যম। কিছুকালের মধ্যেই কোটারাকারার রাজা তাম্পুরান শুরু করেন রামনাট্যম। কৃষ্ণ এবং রাম বিষ্ণুর দুই অবতার, এই দুই কাহিনি প্রচারের উদ্দেশ্যেই জন্ম হল এই নৃত্যনাট্য আঙ্গিকের। সতেরো শতকের আগে থেকেই চাকিয়ার কুত্থু, নাঙ্গিয়ার কুত্থু, পাঠাকম, কুডিয়াট্টম প্রচলিত ছিল বর্তমান কেরালা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায়। কুত্থু শিল্পের জন্ম হয়েছিল দ্বিতীয় চেরা রাজত্বে কুলশেখর আলওয়ারের সময় (৯ম শতক)। বড় মন্দির তৈরি এবং মন্দিরের সাথে সংযুক্ত শিল্পের জন্মও এই সময়কালেই। দেবদাসী প্রথাও এই সময়েরই সৃষ্টি বলে মনে করা হয়। কুলশেখর আলোয়ার তাঁর নিজের মেয়েকে ভগবান শ্রীরঙ্গমের সেবাদাসী হিসেবে দান করেছিলেন। সমাজে দেবদাসীদের উচ্চ সম্মান ছিল, এই ধারণা প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সম্ভবত এটাই কারণ। মন্দিরে কুত্থম্বলম তৈরি হওয়া এবং ধর্মীয় শিল্পের যাত্রা শুরু এখানেই। কুথম্বলমে এখনও ব্রাহ্মণ ছাড়া কোনও শিল্পী অনুষ্ঠান করতে পারেন না। সুতরাং এই সময়কালকে দক্ষিণ ভারতে শিল্পে ব্রাহ্মণ্যবাদ ও পিতৃতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শুরুয়াত বলাই যায়, যদিও ইতিহাসে কুলশেখর আলোয়ারের রাজত্বকাল স্বর্ণযুগ হিসেবে ব্যাখ্যায়িত। কাদের জন্য স্বর্ণযুগ, আশা করি পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। শৈব এবং বৈষ্ণব এই দুই সম্প্রদায়ের প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে জয়ী হয় বৈষ্ণবরা, একথা বলাই যায়। গুরুবায়ুর মন্দির যার প্রতিষ্ঠিত প্রমাণ। বিষ্ণুর অবতারত্ব এবং ক্রমে বুদ্ধকেও তার অন্তর্ভুক্ত করাও তাই বোঝায়, তবুও বৌদ্ধদের সাথে হিন্দুধর্মের সংঘাত এখনও কিছু কম নয়।
কথাকলি, কুডিয়াট্টম নৃত্য ও নাট্যধারাকে অভিজাত, ব্রাহ্মণ্যবাদী, সংস্কৃত শ্রেণির শিল্প হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়। তবু প্রতিটি শিল্পের আঙ্গিকেই প্রাচীন এনিমিস্টিক কাল্ট এবং দ্রাবিড় সংস্কৃতির লক্ষণ স্পষ্ট। সে-কারণেই হয়তো আর্য ও দ্রাবিড় সভ্যতার মিশেলে উদ্ভূত বলে একে ব্যাখ্যা করা হয়। কেরালা অঞ্চলের যুদ্ধনৃত্যের প্রভাব যেমন আছে, তেমনই বিভিন্ন প্রকার কুত্থু শিল্পের প্রভাবও আছে কথাকলিতে। সাজসজ্জা, পোশাক, মুকুট, মেকআপ সমস্ত নিয়ে কথাকলি এমন এক অতিরঞ্জিত, বিশাল ব্যাপক চেহারা নিয়ে হাজির হয়, যা বাস্তবের থেকে দৃশ্যত পৃথক ও সহজে সম্ভ্রম আদায় করে নেয়। সূক্ষ্ম এবং বিমূর্ত নৃত্যভাষায় ক্ষমতার চেহারা একে আরও রহস্যময় করে তোলে। বাস্তবের মানুষ আসলে খুব ক্ষুদ্র ওই ব্যাপকতার সামনে, ঠিক যেমন প্রাচীন যুগে মানুষ অসহায় ছিল প্রাকৃতিক বিশালতা ও রহস্যের সামনে। মণিপুরিতে পোশাক, সাজসজ্জায় দেবত্ব আরোপিত হয়েছে, কথাকলিতে ক্ষমতার বিশালত্ব।
পিতৃতন্ত্র আসলে নারীপুরুষ নিরপেক্ষ গঠনতন্ত্র। দেবতা বা দেবী যেই হোন, ক্ষমতার কেন্দ্রে নারী বা পুরুষ যে কেউ থাকুক না কেন, তার প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্যই এর মূল বিষয়। গুরুশিষ্য পরম্পরাও আসলে এই গঠনতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্যই নির্মিত। যৌনতা এক্ষেত্রে ভোগের বিষয়, ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্যবহৃত। শাস্ত্রীয় নৃত্য সুচারু উপায়ে এই অভিপ্রায় পূর্ণ করে চলেছে দীর্ঘকাল ধরে। প্রেমের উদযাপন না, কামের পরিতৃপ্তি এর লক্ষ্য।
শেষের কথা
মানুষ যতদিন অন্যান্য পশুর মতোই আর একটি পশু, ততদিন তার লড়াই খাদ্য সংগ্রহ ও অন্যান্য পশুদের সাথে যুদ্ধে জেতার লড়াই। পরবর্তী পর্যায়ে যখন সে উৎপাদন করতে সক্ষম হল তখন উৎপাদক হিসেবে নারী বা নারী শরীর (যোনি), তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ সিম্বল হয়ে উঠল। প্রাথমিক কৃষিজীবী সভ্যতার জন্মদাত্রী নারী তখন জ্ঞানী হিসেবে সম্মানিত। ‘ডাকিনী’, ডাক দেন যিনি, ডাক বা সংবাদ তিনিই দিতে পারেন যিনি জ্ঞানী (পরবর্তীতে অর্থ পরিবর্তন হয় পিতৃতন্ত্রের কল্যাণে)। যৌনতা ও প্রজনন তখনও উদযাপনের বিষয়। ঋতুমতী নারীর সাথে বর্ষার শুরুতে তাই জমিকে ঋতুমতী কল্পনা অম্বুবাচী আচারের জন্ম দেয়। কামাক্ষ্যা মন্দিরে যোনিপূজা তাই এখনও চলে আসে। কৃষিজমিতে সন্তানসম্ভবা নারীকে বলি দেওয়া, ঋতুমতী নারীদের কৃষিজমিতে নাচগান— এ-সমস্তই সেই লোকাচার নানা দেশে নানা সভ্যতায় প্রত্যক্ষ করা যায়, তাতে একমাত্র জন্ম দিতে সক্ষম নারী ও ভূমিকে ওতপ্রোতভাবে জুড়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এ খুবই স্বাভাবিক দৃষ্টিতে প্রজননক্ষম অস্তিত্বের উদযাপন। নারী জন্মদাত্রী প্রকৃতি হয়ে ওঠে। প্রকৃতিকে তুষ্ট করতে নানান পূজা আচার আচরণ করেছে মানুষ কিন্তু সে জিতে নিতে চায়নি, জোর করে দখল করতে চায়নি যতদিন ততদিন সভ্যতার রূপ উদযাপনের আনন্দিত রূপ।
নারী জন্ম দেয় কিন্তু কীভাবে সে গর্ভবতী হয়— সেখানে পুরুষের কি ভূমিকা— যতদিনে সে সমস্যার সমাধান করেছে মানুষ ততদিনে সভ্যতার অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। প্রকৃতির কাছ থেকে স্বাভাবিকভাবে পাওয়া ফসলে আর মানুষের চলছে না, লোহার লাঙলের ফলায় জমির বুক চিরে বেশি ফসল তুলতে শিখে গেছে সে। বেশি ফসল মানে উদবৃত্ত সম্পদ, এবার তার দখলের প্রশ্ন তো আসবেই। সে দখল স্বাভাবিকভাবে মায়ের ছিল কারণ সেই জন্মদাত্রী। পিতা কে তা মা ছাড়া অন্য কারও পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ খুব উন্নত ছিল এমন ধারণা করার খুব কিছু যুক্তি আছে কি না জানা নেই। তবে দখল কোনও একপক্ষের থাকলে অন্যপক্ষের ক্ষোভ স্বাভাবিক, তা আমরা আমাদের বাস্তব বোধ থেকেই বুঝি। মাতৃতন্ত্র থেকে পিতৃতন্ত্রিক কাঠামোয় সমাজকে বেঁধে ফেলার প্রয়াস আসলে ক্ষমতাতন্ত্রের পরিবর্তন। এই পরিবর্তনে প্রথম বলি হয় নারীর স্বাধীনতা। প্রয়োজন হয় সন্তানের পিতা কে নির্দিষ্ট করা, অর্থাৎ নারীর যৌনতায় হস্তক্ষেপ। নারীকে হতে হবে একগামী, তবে নিশ্চিত হবে পিতার পরিচয়, তবেই রক্ষিত হবে পিতৃতান্ত্রিক পারিবারিক চলন। নারী গর্ভবতী হয় কীভাবে, তা জানার সাথে সাথে লিঙ্গের গুরুত্বও জানা যায়, লিঙ্গপূজাও তাই আদি থেকে মধ্য হয়ে বর্তমান সমাজেও প্রচলিত। বর্তমান সমাজে এগুলিকে আমরা যৌন অনুষঙ্গ বলতে পারি, খুব একটা যৌনতার উদযাপনের পর্যায়ে নেই আর। উদযাপনে কে বড় কে ছোট কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কে কম, সে সবের প্রশ্ন আসে না, আসে সমভাবাপন্ন মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।
এবার প্রশ্ন, এ-সবের সাথে নাট্যশাস্ত্রের কী সম্পর্ক? নাট্যশাস্ত্র সম্পূর্ণত একটি পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোকে ধারণ করে এবং তাকে সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করে মুনিঋষিরা, যাঁদের নাট্যশাস্ত্র প্রয়োগের দায়িত্ব দেওয়া হয়। নাট্যশাস্ত্রকে পঞ্চম বেদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যার সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা, যেমন জগতের সৃষ্টিকর্তাও ব্রহ্মা। সৃষ্টিতে লিঙ্গের ভূমিকার একাধিপত্য প্রতিষ্ঠাই এর একমাত্র উদ্দেশ্য হতে পারে আর কিছু না, কারণ নারীকে অস্বীকার করলে সৃষ্টি সম্ভবই না। নারী ও পুরুষ যখন অর্ধনারীশ্বর, তখনই তা সার্থক সহাবস্থান। এ কথা অবশ্য নাট্যশাস্ত্রও উপেক্ষা করতে পারেনি, শিবপার্বতী তাই এখানেও তাণ্ডব ও লাস্যের জনক, অর্ধনারীশ্বর বলতে তাঁদেরই বোঝায়। নাট্যশাস্ত্র অনুযায়ী নাট্যনির্মাণের পর তাই ‘অমৃতমন্থন’ নাট্য শিবকে দেখানো প্রয়োজন পড়ে এবং দেবাদিদেব শিবের কাছ থেকেই অঙ্গহারসমূহ শেখার প্রয়োজন পড়ে। গুহাবাসী, ভাংখোর ভূত পিশাচের সহচর শিব কোনও আর্য দেবতা নন। কিন্তু তাঁকেও নাট্যশাস্ত্রে স্বীকৃতি দিতে হচ্ছে, এবং ভরতকে বলতে হচ্ছে, ‘ভগবান শিবের নৃত্য থেকে তাঁর শৃঙ্গাররসসম্ভূত কৈশিকীবৃত্তি আমি দেখেছি; এতে থাকে মনোরমবেশ কোমল অঙ্গহার এবং আত্মা রস ভাব ও ক্রিয়া।’ [৪৩(খ)-৪৫ নাট্যের উৎপত্তি অধ্যায়]
আদিবাসী গুহাচারী মানব সৃষ্টির আদি পর্যায়ে কোনও মাতৃতান্ত্রিক বা পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার কুক্ষিগত ছিল না, যৌনতা ও প্রজননের উদযাপনের যুগ যা আদিম অধিবাসীরা বহুকাল বহন করেছে যা এখনো কোনও না কোনও আচারের আকারে রয়ে গেছে তাদের সমাজে। আদিবাসী সমাজে ‘আড্ডাঘর’ এক প্রচলিত ব্যবস্থা, যেখানে অবিবাহিত যুবক-যুবতীরা নিজেদের মধ্যে মেলামেশা, নাচ গান আনন্দফুর্তি এমনকী স্বাধীন যৌন সংসর্গও করতে পারে বলে জানা যায়। স্থান ও গোষ্ঠীভেদে এই আড্ডাঘরের নাম আলাদা হয়, গ্রামের শেষপ্রান্তে মুরুব্বিদের দৃষ্টির বাইরে এ আড্ডাঘর কিন্তু তাদের সমাজে স্বীকৃত ব্যবস্থা। সাঁওতাল জনজাতিদের ‘সাংগরেম’ নৃত্যে যুবক-যুবতীরা দলবদ্ধ হয়ে নাচে এবং নাচের ফাঁকে কিছুক্ষণের বিশ্রামে তারা নিজেদের পছন্দের সঙ্গীর সাথে চলে যায় গভীর অরণ্যে তাদের যৌনতার পরিতৃপ্তির খোঁজে। এরকম বহু উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে কিন্তু এখানে তা অবান্তর। আসল বলবার কথা এই যে, এই স্বাধীনতা পিতৃতান্ত্রিক দখলের মানসিকতায় গ্রহণযোগ্য হয় না, একে তারা যত পারেন আঘাত করেন, পাল্টে নিতে চান নিজেদের আদর্শ অনুযায়ী। একেবারে পাল্টাতে না পারলে ঢোঁক গেলার মতো করে স্বীকার করেন আবার সঙ্গে তাচ্ছিল্যও করেন।
এই যে তাচ্ছিল্য তা একেবারে নির্দিষ্ট করে করা হচ্ছে নারীকে। এর ঠিক পরের অংশেই আছে কৈশিকী বৃত্তির জন্য অপ্সরা সৃষ্টির কাহিনি। বলা হচ্ছে, ‘এই বৃত্তি নারী ব্যতিরেকে পুরুষ যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে পারে না। তাই মহা তেজস্বী প্রভু (ব্রহ্মা) তাঁর মন থেকে নাট্যশোভা নিপুণ অপ্সরাগণকে সৃষ্টি করে নাট্যানুষ্ঠানে (সাহায্যের জন্য) আমাকে দিলেন।’ [৪৬-৪৭(ক)] হ্যাঁ, অবশ্যই একে আমি কাহিনি বলব। সত্য হল, বহু পরিশ্রমে নাট্যশোভা নিপুণ শিল্পী তৈরি হয় তা আমরা সাধারণ ও বাস্তব জ্ঞান থেকেই জানতে পারি। আর নারী ব্যতীত পুরুষ (বায়লোজিক্যাল) এ-কাজ পারেন না তা আমাদের মেনে নেওয়ার কোনও যুক্তি নেই। বহু বহু পুরুষ নৃত্য ও নাট্যশিল্পী আমরা আমাদের অভিজ্ঞতায় জানি আবার ঐতিহাসিকভাবেও তার অজস্র প্রমাণ আছে এবং এর আগের শ্লোকে ভরত নিজেই বলছেন শৃঙ্গাররস সমৃদ্ধ কৈশিকী বৃত্তি শিবের নাচে দেখেছেন, তা হলে পরের শ্লোকেই এর বিরোধিতা কেন?
অন্ধ্রপ্রদেশে কুচিপুড়ি নৃত্যশিল্পীরা বেশিরভাগই পুরুষ, যাঁরা নারী সেজে নাচেন। আমি নিজেই রীতিমতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েছিলাম ওঁদের দক্ষতা দেখে। পোশাক ছাড়ার পর বুঝতে পারি ওঁরা পুরুষ, এতক্ষণ যাঁদের নারী ভেবে কথা বলছিলাম, তাঁদের পারফর্মেন্সের তারিফ করেছি। বাংলায় আলকাপ শিল্পীদের কথাও আমরা জানি, তাঁরাও পুরুষ, নারী সেজে অভিনয় করেন এবং পুরুষদের তাঁদের প্রেমে পাগল করে তুলতে পারেন। আসলে, এও আর-এক রকম নিয়ন্ত্রণ, নারী পুরুষ ব্যতিরেকে মানুষের যে তৃতীয় যৌন অস্তিত্ব তাকে অস্বীকার করা এবং নারী একমাত্র ছলাকলায় পারদর্শী হয়ে পুরুষের ভোগের তৃপ্তি ঘটাবে, এমন এক পরিসর তৈরি করে দেওয়া হল এর উদ্দেশ্য।
১৯৩০-এ নাট্যশাস্ত্রকে আধার করে শাস্ত্রীয় নৃত্য গড়ে তোলার উদ্দেশ্যও খানিক এইরকম। দেবদাসী প্রথা, পোত্তু প্রথা, বাইজি প্রথা সমস্তই ব্রিটিশ সরকারের ভিক্টোরিয়ান মরালিটির শিকার হয়ে নিষিদ্ধের তালিকায় যেতে বসেছিল। তখন একমাত্র উপায় ছিল এই নাচগুলিকে নাট্যশাস্ত্রের আদর্শে নতুনভাবে সাজিয়ে তৎকালীন বিত্তশালী দর্শকের সামনে মঞ্চে উপস্থিত করা। এতে দুটো কাজ হল একইসাথে। এক, মেয়েদের পিতৃতন্ত্রের কাঠামো অনুযায়ী আরও দৃঢ়ভাবে গড়ে তোলা ও সুচারুভাবে নিবেদনের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত করে তোলা এবং বিদেশের দরবারে ভারতীয় সংস্কৃতি হিসেবে একে তুলে ধরা হল। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম যখন মেয়েদেরকেও ঘরে আটকে রাখতে পারেনি, বেরিয়ে এসে যখন তাঁরা গুলিবন্দুকের পরোয়া না করে মিছিলে সামিল হচ্ছে, সমাজের নানান কাজে হাত লাগাচ্ছে, তখন জোর করে আর তাঁদের ঘরে আটকে রাখা সম্ভব না। আবার এতটা স্বাধীন মানসিকতাকে বাড়তে দেওয়াও পিতৃতন্ত্রের জন্য শুভ হওয়ার কথা নয়। তবে শুধু এমন মানসিকতাই এ-কাজের পিছনে কাজ করেছিল তা নয়, কিছু মানুষ এমনও ছিলেন যাঁরা সত্যি সমাজের সংস্কার চেয়েছেন, নারীদের ন্যূনতম অধিকার যে প্রাপ্য তা বুঝেছেন এবং তার জন্য কাজও করেছেন। ফলে মৃণালিনী সারাভাই কথাকলি নৃত্যে পারদর্শী হয়ে ওঠেন, তার আগে কথাকলি একমাত্র পুরুষদের দ্বারা পরিবেশিত হত। তিনি কথাকলির পোশাক ও সাজসজ্জা ব্যতীত তার আঙ্গিক নিয়ে কাজ শুরু করেন। রতন থিয়ামের মতো বিপিন সিং গুরুজিও সম্ভবত মনে করতেন যে, মণিপুরিরা শুধুমাত্র বৈষ্ণব মধুর রসে সিক্ত নমনীয় স্বভাব নয়, কাংলেইপাকের যোদ্ধা জাতির রক্তও আছে তাঁদের শরীরে। তাই চোলমের নির্যাস খানিক জুড়ে দেন শাস্ত্রীয় মণিপুরি নৃত্যে। কত্থক নৃত্য তার লাস্যভাব কমিয়ে গতির সাথে সমঝোতা করে চলে, সমসাময়িক বিষয় উঠে আসে নৃত্যপ্রযোজনায়। একক লাস্যনৃত্য কত্থককে যৌথতায় এনে দিলেন কুমুদিনী লাখিয়া। ভরতনাট্যম শিল্পীরাও নৃত্যের জ্যামিতিক কাঠামোকে কাজে লাগাচ্ছেন পৌরাণিক কাহিনি ব্যতিরেকে সমসাময়িক বিষয়কে তুলে ধরতে। ওড়িশিতে শর্মিলা বিশ্বাস বহুদিন ধরে লোক-আঙ্গিকের ধারা জুড়ে কাজ করছেন। যদিও কেউই সম্পূর্ণত পিতৃতান্ত্রিক ভক্তি কাঠামোর বাইরে যেতে পারেননি। বলা ভাল, যেতে পারবেন না কারণ মনুস্মৃতির আদর্শ পিতৃতন্ত্রের আদর্শে এর কাঠামো তৈরি। ভাঙতে হলে ভিতরে-বাইরে সবখানে ভাঙতে হবে। তবু নৃত্যের বন্দিদশা একটু একটু করে হলেও কাটাতে চেষ্টা করেছেন। সমাজ যখন তৈরি হবে এ কাঠামোও ভেঙে যাবে, গড়ে উঠবে নতুন আঙ্গিক নতুন সময়ের দাবিতে।
নাট্যশাস্ত্র পৃথকভাবে চর্চার দাবি রাখে প্রাচীন ভারতীয় নাট্যের ইতিহাস হিসেবে, শুধুমাত্র ক্ষমতাতন্ত্র ও ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রতিষ্ঠা অস্ত্র হিসেবে না। অলৌকিকতার মোড়ক ছাড়িয়ে তৎকালীন বাস্তবতার খোঁজ পাওয়া সম্ভব নাট্যশাস্ত্র থেকেই। তাতে ভারতের নাট্য তথা নৃত্যকলা সমৃদ্ধ হবে নিশ্চিত।
প্রশ্ন ছিল বলেই তার উত্তর খুঁজতে বেরিয়েছে মানুষ। বাধা ছিল বলেই তাকে অতিক্রম করতে করতে এগিয়েছে সভ্যতা। প্রশ্নহীন আনুগত্য স্থিতাবস্থা বজায় রাখে, এগোয় না সমাজ। বর্তমানে সভ্যতার যে পর্যায়ে আমরা পৌঁছে গেছি, সেখানে যৌনতা এক বিকৃত রূপ ধারণ করেছে শুধুমাত্র ভোগ ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার কারণে। ক্ষমতাতন্ত্র ও পিতৃতন্ত্রের বিকৃত আস্ফালন বৈষম্য করেছে তীব্রতর। এ সময়ে যে শিল্প শুধুমাত্র ক্ষমতাতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে চাইবে, তার দ্বারা ব্যবহৃত হতে থাকবে তা সময়ের সাথে সাথেই মানুষের জীবন থেকে সরে যাবে, মৃত শিল্প হিসেবে মিউজিয়ামে সংরক্ষিত হওয়ার জায়গায় পৌঁছে যাবে। শাস্ত্রীয় নৃত্য তেমনই হয়ে উঠছে, তা নিশ্চিতভাবে জানি। বর্তমান সময়কে শিল্পে না ধরতে পারলে, বিষয় অনুযায়ী আঙ্গিকে বদল না ঘটলে শিল্পের বহমানতা বজায় থাকে না, তার প্রাণ অবশিষ্ট থাকে না। নৃত্য শরীরের মুক্তির ভাষা হতে পারে। যৌনতা-সহ, যৌনতা ব্যতিরেকে সমস্ত অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম হতে পারে। শুধু আমাদের ফিরে দেখতে হবে গোড়ার দিকে, তারপর এগোতে হবে বর্তমানকে সঙ্গে নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে। যৌনতা যেমন পরিত্যাজ্য বিষয় নয়, তেমন দখলের বিষয়ও নয়। প্রেমের সাথে যেমন যৌনতার সম্পর্ক আছে, যৌনতার সাথেও দখল নয়, প্রেমের সম্পর্ক থাকুক তবেই তা সুন্দর হয়ে ওঠে। বহুবছর নৃত্য শিল্পের সাথে জুড়ে থাকা একজন শিল্পী হিসেবে আন্তরিকভাবে চাই নৃত্যশিল্পের বন্দিদশা ঘুচুক। মুক্ত প্রকৃতিতে পৃথিবীতে ডানা মেলুক নৃত্য, নৃত্যশিল্পীরা। কোনও কাঠামো রক্ষার জোয়াল কাঁধে বয়ে বেড়াবার দায় মুক্ত হয়ে নিজের জন্য পথ চলুক নাচ, রাস্তা নিজেই খুঁজে নিতে পারবে।
চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়







