Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ

জানালার পুবপাশ থেকে দেখা

পী যূ ষ  ব ন্দ্যো পা ধ্যা য়

অভিনেত্রী তৃপ্তি মিত্র এবং নাটককার বাদল সরকার বেঁচে থাকলে বয়স হত একশো বছর। একই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’রও শতবর্ষ পার হল। তৃপ্তি মিত্র, বাদল সরকার এবং ‘রক্তকরবী’ তিন শতবর্ষীকে নিয়ে দু’চার কথা লিখতে বসে ভাবছি ‘তোমারে করি নমস্কার’ জাতীয় বাক্য লিখলেই তো এক কথাতে শেষ। কিন্তু তা তো সম্ভব নয়। শোভনও নয়। বাংলাদেশের নবনাট্য আন্দোলনের একজন হিসেবে যা দেখেছি ও জেনেছি, অগ্রজদের কাছে যতটুকু শুনেছি এবং দু’চারখানা বই এবং পুরনো পত্রপত্রিকা পড়ার সুবাদে শতবর্ষীদের জন্য অল্প কথায় কিছু একটা লেখার চেষ্টাই বরং করা যাক। বলে নেওয়া ভাল যে, এই লেখার যা কিছু পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচনা, অভিমত একান্তই নিজস্ব।

একটা সত্য কথন দিয়েই লেখাটা শুরু করা যাক, আর সেই সত্যটি হচ্ছে বাংলাদেশের কোথাও তৃপ্তি মিত্র এবং বাদল সরকারের শতবর্ষ পালনে অনুষ্ঠান আয়োজন হওয়ার কোনও তথ্য আমার কাছে এই মুহূর্তে নেই। সম্ভবত কোনও স্মরণানুষ্ঠান হবেও না। সেটা অস্বাভাবিক নয়। বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক–সামাজিক পরিস্থিতিই যে তার একমাত্র কারণ, তা শুধু নয়। বাংলা নাটকের এই দুই গুণীজন সম্পর্কে ক’জনেরই বা তেমন ধারণা আছে বাংলাদেশে! তৃপ্তি মিত্র এবং বাদল সরকারের কর্মকৃতি প্রত্যক্ষ করেছেন, এমন দর্শক বা নাট্যকর্মীর সংখ্যা হাতের কর ধরে গুনতে হবে। জানালার পশ্চিমপাশের কলকাতাকেন্দ্রিক নাট্যচর্চার খবর কতটুকুই বা পুবে এসেছে?

শুরুতেই বরং পূর্ববঙ্গের নাট্যচর্চার ইতিহাস, নাট্যক্রিয়া, নাট্য-আঙ্গিক, আর্থ–সামাজিক–সাংস্কৃতিক ধারণা এবং ভূখণ্ডের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কিছু চিত্র সামান্য কথায় তুলে ধরা প্রাসঙ্গিক মনে করছি। কারও কাছে তা অবান্তর মনে হলেও।

প্রাচীন পূর্ববঙ্গে খাদ্যশস্যের অভাব ছিল না। অভাব ছিল না বললে কম বলা হবে, বলা যেতে পারে বাড়বাড়ন্ত ছিল। মাঠ ভর্তি ধান–পাট–শস্য আর জলাশয়ে ছিল নানা প্রজাতির প্রচুর সুস্বাদু রুপালি শস্য। গবেষকদের তথ্য থেকে জানা যায়, দানা ছড়ালেই ফসল আর জাল ফেললেই নানা জাতের মাছ। এমনই উর্বর ছিল পূর্ববঙ্গের খাদ্যের ভাণ্ডার। গ্রামীণ ললনারা বসতভিটার উন্মুক্ত জায়গায় নিজ উদ্যোগে যে শাকসবজির আবাদ করতেন, তা সংসারের প্রয়োজন মিটিয়ে পোষ্য প্রাণীকুলের খাদ্যের অভাবও মেটাত। কৃষির মতো আর একটি বিষয়ে পূর্ববঙ্গ যথেষ্ট সমৃদ্ধ ছিল। সেটি গ্রামগঞ্জে ঐতিহ্যিক সংস্কৃতি চর্চা। যাত্রা, কবির নাড়াই, হাস্তরগান, শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন, রামলীলা, রথযাত্রা, পুঁথিপাঠ, মনসামঙ্গলের কিচ্ছা, ঝুলন যাত্রা ইত্যাদি নানাবিধ আঙ্গিকে সমৃদ্ধ ছিল পূর্ব বাংলার ঐতিহ্যিক সংস্কৃতি। লোকসংস্কৃতির গবেষকরা বলেন, নাট্যক্রিয়া বা অভিনয়ের প্রতি পূর্ববঙ্গবাসীর দীর্ঘদিনের পুরনো মুগ্ধতার কথা। বারো মাসে তেরো পার্বণ উপলক্ষে সাংস্কৃতিক আয়োজন তথা নাট্যাভিনয়ে যেন নিত্যকার বিনোদন। মঞ্চ নেই, কার্টেন নেই, বাতির ব্যবস্থা নেই তাতে কী! বুড়ো বটতলার নীচে হাটখোলার উদোম জমিন, খেয়াঘাটের পাশে মুক্ত আকাশের তলে ফসল কাটা মাঠ অথবা গেরস্থ বাড়ির বড় উঠোন— এইসব জায়গাতেই বেজে উঠত ঢাক–ঢোল–কাঁসর ঘণ্টার কনসার্ট। কনসার্টের শব্দে জুটে যেত নারীপুরুষ নির্বিশেষে দর্শককুল। একসময় শুরু হত সঙ্গীত–নৃত্যের সম্মিলনে নানা চরিত্রের অভিনয়। কমেডি এবং ট্রাজেডি দুটোই থাকত সেই অভিনয়ে। সন্ধ্যা পেরোনো রাতে আকাশে তখন ভরা পূর্ণিমার চাঁদ। জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া চরাচর।

এইসব প্রাচীন আঙ্গিকেরই ইমপ্রোভাইসড রূপই বাদল সরকারের অঙ্গন থিয়েটার এবং থার্ড থিয়েটার এবং বাংলাদেশে নাটককার শিক্ষক সেলিম আল দীনের গ্রাম থিয়েটার। ‘গ্রাম থিয়েটার’ সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন বাদল সরকার নিজেও। জ্ঞাত আছেন জানালার পশ্চিমপাশের বিভাস চক্রবর্তী, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, শিল্পী যোগেন চৌধুরী, নাট্য–গবেষক নৃপেন সাহা, সাহিত্যিক দেবেশ রায়, প্রাবন্ধিক অরুণ সেন, শাঁওলী মিত্র, উষা গাঙ্গুলি, নাট্য নির্দেশক প্রবীর গুহ প্রমুখ। এঁদের ভেতর কেউ কেউ আজ আর নেই।

পুবে যখন ‘যাত্রা’ এবং অন্যান্য নাট্য-আঙ্গিক নিয়ে গ্রামীণ জনপদে বিনোদনের সরল আনন্দ, পশ্চিমের কলকাতায় তখন পেশাদার রঙ্গালয়ে বিদেশি অনুকরণে চমক লাগানো প্রসেনিয়াম থিয়েটার। থিয়েটার দেখতে যে টিকিট কাটতে হয়, সে–কথা পুবের মানুষের ভাবনাতেও তখন নেই। যদিও শহরাঞ্চলে ততদিনে প্রসেনিয়াম থিয়েটারের অভিনয় শুরু হয়ে গেছে। দু’চারটি শহরে ঘূর্ণায়মান মঞ্চও তৈরি হয়েছে। এসব থিয়েটার দেখতে টিকিট লাগত কি না তার উল্লেখ অবশ্য কোথাও পাওয়া যায় না। শহরাঞ্চলেও নিয়মিত যাত্রা অভিনয় চলত। স্কুল কিংবা কলেজের খোলা মাঠে টিনের বেড়া দিয়ে প্রায় পুরো শীতকাল জুড়েই চলত যাত্রাভিনয়, রাতের পর রাত। এই যাত্রাপালা দেখতে পয়সা লাগত। তখনকার যাত্রাপালার অধিকারীরা অর্থলগ্নি করে যে পেশাদারিত্বের ধারা সৃষ্টি করলেন, তা আজও চলমান। যদিও বর্তমান কালের নানাবিধ জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যমের মাতাল হাওয়া এবং ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িকতার চাপে যাত্রাদলের চেহারা আজ খুবই বিবর্ণ, মলিন। শিল্প-বিচ্যুত।

রুশ দেশীয় লেভেদেফ সাহেব যখন নিজ উদ্যোগে পেশাদারি নাটকের প্রযোজনা করে কলকাতায় ব্যবসায়িক সাফল্য পেলেন, তখন সেই খবর পূর্ব বাংলায় পৌঁছয়নি। কিন্তু গত শতকে গিরিশচন্দ্র ঘোষ, অহীন্দ্র চৌধুরী, বিনোদিনী দাসী, শিশির ভাদুড়ী, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়দের মতো জনপ্রিয় অভিনেতারা পেশাদার রঙ্গমঞ্চে উচ্চমূল্যের টিকিটের বিনিময়ে যে থিয়েটার নিয়মিত করতেন, সে খবর খুব দ্রুতই পূর্ববঙ্গের শহরগুলোতে পৌঁছে যেত। কারণ ততদিনে কলকাতার সঙ্গে নিয়মিত রেল যোগাযোগ চালু হয়ে গেছে। কলকাতায় প্রকাশিত দৈনিক খবরের কাগজ দিনে দিনে পৌঁছে যেত পূর্ব বাংলায়।

ইংরেজ সৃষ্ট বঙ্গভঙ্গের রাজনীতি, মুসলিম লীগের সৃষ্টিতে হিন্দু–মুসলমানের সম্পর্কে বৈরিতা, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব, স্বদেশি আন্দোলনের উন্মাদনা, কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম ও সাম্যবাদী দর্শন ইত্যাদি মিলিয়ে সামাজিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা তৈরি হলেও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আগের মতোই চলমান ছিল। হঠাৎ সৃষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতির আঁচ গ্রামীণ জনপদে তেমন লাগেনি। বরং সামাজিক সাংস্কৃতিক জীবনবোধ ও বিশ্বাসে হিন্দু-মুসলমানের ‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম’–এর শক্ত বন্ধন। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির আনন্দে পূর্ববঙ্গবাসীর মাথাটা একটু উঁচুতে তো উঠেছেই। জমিদার রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসরের কৃষক-প্রজাদের ভেতরে একটু আত্মঅহঙ্কার যদি সৃষ্টি হয়েও থাকে, তাতে কার ক্ষতি। সুর–তাল–লয় ঠিকঠাক না জেনেই গ্রামের কৃষক কিংবা নৌকার মাঝি গলা ছেড়ে গাইতে শুরু করেন— ‘গ্রাম ছাড়া ওই রাঙ্গামাটির পথ’ অথবা ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’। হালচাষি কিংবা বৈঠা হাতে মাঝির কণ্ঠে ঠাকুর রবীন্দ্রনাথের গান! অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি। শহুরে মধ্যবিত্তদের প্রতি বাড়িতেই তখন বিশ্বকবির ছবি। মুসলমান বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের পাশে নজরুল ইসলামের। হিন্দুদের পুজোর ঘরে অন্যান্য ঠাকুরের পাশে শ্মশ্রুমণ্ডিত রবি ঠাকুর। অথচ কবির দু’চারটে গান এবং কবিতা ছাড়া অন্যান্য রচনা তাঁদের ঘরে খুব একটা পঠিত হত কি! মনে হয় না। ‘রক্তকরবী’র মতো নাটক তো নয়ই।

রক্তকরবী।

নিজের কাছে রবীন্দ্রনাথের খুবই প্রিয় নাটক ছিল ‘রক্তকরবী’। শিলংয়ে লিখতে শুরু করা ‘যক্ষপুরী’ নামের নাটকটি শেষ হতে দশ–বারো বার খসড়া করা হয়। যক্ষপুরী নাম দিয়ে শুরু হওয়া এই নাটক ‘নন্দিনী’ নাম নিয়ে শেষমেশ ‘রক্তকরবী’। কবিকৃত অনুবাদে ‘রেড অলিয়্যান্ডার্স’ নাম নিয়ে ইংরেজি ভাষায় নাটকটি ম্যাক্সমিলেন থেকে প্রকাশিত হয় ১৯২৫ সালে। বাংলা প্রবাসী পত্রিকায় ১৯২৪ সালে এবং গ্রন্থাকারে ১৯২৬ সালে। শতবর্ষ পরে নাটকটি আজও সমকালীন। বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খেয়াল করলে নাটকটির সমকালীনতার বিষয়টি বুঝতে বিদগ্ধ পাঠকের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আর শতবর্ষ পরে যদি কেউ প্রযোজনায় আগ্রহী হতে চান, তবে তিনি নাটকটির চরিত্র বিশ্লেষণ এবং সংলাপের গভীরে মনঃসংযোগ করলেই ব্যাপারটি স্পষ্ট বুঝতে পারবেন। কিন্তু দুঃখজনক এই যে, রবীন্দ্রনাথের এই অসাধারণ নাটকটি গত ১০০ বছরে তেমন একটা অভিনীত হয়নি। অথচ পাশ্চাত্যের কত কম গুরুত্বপূর্ণ নাটক অহরহ অভিনীত হচ্ছে পেশাদার এবং অপেশাদার উভয় মঞ্চে। যাঁরা আশঙ্কা করেন ‘রক্তকরবী’র সংলাপ পুরনো অথবা সেকেলে, তাদের আশঙ্কাও মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে।

এক্ষেত্রে একটা উদাহরণ দেওয়া যায়। বহরমপুরে কারাবন্দি সাধারণ কয়েদিদের দিয়ে একবার ‘রক্তকরবী’ অভিনয় করিয়েছিলেন একজন পোড়খাওয়া নাট্যকর্মী প্রদীপ ভট্টাচার্য। কয়েদিদের কেউই প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না, উচ্চারণ-দোষে দুষ্ট ছিলেন। তবু জেলখানার সেই সাধারণ মঞ্চায়ন যাঁরা দেখেছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতায় প্রযোজনাটি সর্বার্থে সার্থক ছিল। আসলে, যাঁরা ‘রক্তকরবী’ নাটকটিকে ক্লাসিক বলে দুর্বোধ্য অভিধায় দূরে সরিয়ে রাখেন, তাঁরা যদি একটুখানি সাহস করেন তবেই বুঝতে পারবেন কত সহজ অথচ গভীর নাটকটির অন্তর্নিহিত বক্তব্য এবং কত প্রাঞ্জল ও অর্থবহ তার সংলাপ। জেলখানার কয়েদিদের কাছে ‘রক্তকরবী’ দুর্বোধ্য মনে হয়নি। কঠিনকে ভালবাসলে বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কা থাকে না। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি নিয়ে লিখতে রবীন্দ্রনাথের কাছেই হাত পাতলাম। নাট্যকারের মত অনুযায়ী নাটকটি সত্যমূলক। যাঁরা রূপক বা সাঙ্কেতিক বিবেচনা করে নাটকটির মর্মোদ্ধার করায় অহেতুক বেশি মনোযোগী হন, তাঁরাই ধাঁধায় পড়ে বিভ্রান্ত ও বিব্রত হন এবং ঠকেন। চরিত্রগুলোকে প্রতীক মনে না করে বাস্তব ও সমসাময়িক হিসেবে ধরে নিলেই ‘রক্তকরবী’র অভিনয় সহজ এবং যথার্থ হয়। যেটা অনেকটাই সার্থকভাবে করতে পেরেছিল নাট্যদল বহুরূপী ১৯৫৪ সালে, শম্ভু মিত্রের পরিচালনায়। তৃপ্তি মিত্র যেখানে নাট্যকার রবীন্দ্রনাথের মনের মাধুরী মিশিয়ে সৃষ্টি করা ‘নন্দিনী’।

বেঁচে থাকতে রবীন্দ্রনাথ বারবার ‘রক্তকরবী’ মঞ্চস্থ করবার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন ঘনিষ্ঠদের কাছে। উদ্যোগও নিয়েছিলেন। শুধুমাত্র মনের মতো কাউকে ‘নন্দিনী’ হিসেবে পাননি বলে বারবার তাঁর প্রচেষ্টা হোঁচট খেয়েছে। শোনা যায়, রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছিলেন, ‘যে নন্দিনী’ তাঁর ধ্যানোৎসারিত হয়ে লেখনীর মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করেছে সে ‘নন্দিনী’কে বাস্তবের মিছিলে কোথাও তিনি খুঁজে পাননি। তৃপ্তি মিত্রকে দেখলে রবীন্দ্রনাথের ধ্যনোৎসারিত নন্দিনীর খোঁজ মিলত কি না জানি না। তবে তাঁর জীবদ্দশায় একবারই যে ‘রক্তকরবী’র অভিনয় তিনি দেখেছিলেন, সেখানে নন্দিনী চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন জগমোহন মুখোপাধ্যায় নামের এক যুবক। আশ্চর্যের ব্যাপার, জগমোহন মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় দেখে তিনি এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, বুঝতেই পারেননি যে মঞ্চে ‘নন্দিনী’ চরিত্রে অভিনয় করছেন যিনি তিনি একজন পুরুষ। জগমোহনের অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়ে অভিনয় শেষে প্রশংসাও করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ৭৩। বিহার ভূমিকম্পে পীড়িতদের সাহায্যার্থে দ্য টেগোর ড্রামাটিক গ্রুপের উদ্যোগে সেদিনের ‘রক্তকরবী’ অভিনয় হয়েছিল অবনীন্দ্রনাথের নির্দেশনায়। সঙ্গীতের দায়িত্বে ছিলেন দিনেন্দ্রনাথ। স্থান— নাট্য নিকেতন রঙ্গমঞ্চ। তারিখ: ৬ এপ্রিল, ১৯৭৪। সন্ধ্যা ৭ ঘটিকা। নাটক রচয়িতা সশরীরে যে সারিতে বসে অভিনয় উপভোগ করেছেন সেই সারির টিকেট বিক্রি হয়েছিল আড়াইশো, তিনশো টাকাতে।
ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত বিহারের সাহায্যের জন্য আয়োজিত ‘রক্তকরবী’ নাটকটি দেখবার জন্য ‘দ্য স্টেটসম্যান‘ পত্রিকায় পরপর চার দিন পয়সা খরচ করে বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হলেও প্রদর্শনী শেষে নাটকটি সম্পর্কে দু’চারটি বাক্যও উল্লেখিত পত্রিকায় লেখা হয়নি বলে শোনা যায়। তবে সেই সময়কার ‘নাচঘর’ পত্রিকার প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল— ‘এমনতর অপূর্ব বিরাট রচনা বাংলাদেশে তো নয়ই, পৃথিবীর কোনও দেশের নাট্যসাহিত্যে সৃষ্টি হয়েছে কি না এ পর্যন্ত জানি না।’ এখানে উল্লেখ্য যে, অধ্যাপনার পেশা ছেড়ে পেশাদার রঙ্গমঞ্চে আসা তুমুল জনপ্রিয় শিশিরকুমার ভাদুড়ী ‘রক্তকরবী’ মঞ্চায়নে আগ্রহী হয়েছিলেন এবং কবির কাছ থেকে অনুমতিও নিয়েছিলেন ১৯৩১ সালে। পেশাদার রঙ্গালয়ে ‘রক্তকরবী’র অভিনয় দেখার আগ্রহ রবীন্দ্রনাথের ছিল কিন্তু পরবর্তীতে শিশিরকুমার সেটা আর করেননি। রবীন্দ্রনাথের প্রিয় শান্তিনিকেতনে একবারই শুধু ‘রক্তকরবী’ অভিনীত হয়েছিল ১৯৪৮ সালে করির মৃত্যুর বেশ ক’বছর পরে।

তারপর ১৯৫৪ সালে বহুরূপীর প্রযোজনায় মঞ্চস্থ হল ‘রক্তকরবী’, যা আজ পর্যন্ত সবচেয়ে সফল ও সার্থক হিসেবে স্বীকৃত। পেশাদার রঙ্গমঞ্চের বিপরীতে অপেশাদার বহুরূপীর নেতৃত্বে ‘রক্তকরবী’র যে নান্দনিক মঞ্চযাত্রা তা বর্তমান কালের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রছাত্রীদের কাছে গবেষণার বিষয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বহুরূপীর প্রযোজনাটির নির্দেশনা এবং রাজা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শম্ভু মিত্র স্বয়ং। মঞ্চ পরিকল্পনা করেছিলেন খালেদ চৌধুরী। আলোক পরিকল্পনায় তাপস সেন এবং নন্দিনী চরিত্রে শ্রীমতি তৃপ্তি মিত্র। ভারতবর্ষের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর ছাড়াও পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকাতেও ১৯৫৭ সালে মঞ্চস্থ হয়েছিল ‘রক্তকরবী’। পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার একটি সাংস্কৃতিক সংস্থার সাহায্যার্থে কলকাতার বহুরূপী দুটি নাটকের অভিনয় করে। একটি ‘ছেঁড়া তার’ অপরটি ‘রক্তকরবী’। দর্শকদের আগ্রহে নাটকটির একটি বাড়তি অভিনয়ও করতে হয়েছিল বহুরূপীকে।

বহুরূপীর ‘রক্তকরবী’ ১৯৫৪ সালে শুরু হয়ে চলে প্রায় কুড়ি বছরের বেশি সময় ধরে। ‘অনভিনেয়’ বলে উল্লেখ্য নাটকটির এত বছর ধরে দর্শকপ্রিয় হয়ে অভিনীত হওয়া বিস্ময়কর। ‘রক্তকরবী’ই সেই নাটক যা ১৯৫৪ সালে বাংলা থিয়েটারকে ভারতের জাতীয় স্তরে সম্মান এনে দিয়েছিল। ১৯৫৬ সালের নভেম্বরের গোড়ায় বোম্বাইতে তা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির স্তরে পৌঁছয়। প্রথম বিশ্বনাট্য সম্মেলনে দেশি–বিদেশি হাজার তিনেক দর্শকের সামনে উন্মুক্ত মঞ্চে ‘রক্তকরবী’ অভিনীত হয় দিল্লিতে।

বাংলাদেশে দুটি অপেশাদার নাট্যদল ‘রক্তকরবী’র বেশ ক’টি প্রদর্শনী করেছে। একটি ঢাকার নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, অপরটি চট্টগ্রামের তির্যক নাট্যগোষ্ঠী। তাছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশন একবার এই নাটকটি প্রযোজনা করে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছিল। এই প্রযোজনায় একজন অভিনেতা ছিলেন যিনি বহুরূপীর প্রথম দিনের অভিনয়ে ফাগুলালের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তাঁর নাম মোঃ জাকারিয়া। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য নির্মিত নাটকটি পরিচালনা করেছিলেন মোস্তফা মনোয়ার। বাংলাদেশের দর্শকদের কাছে টেলিভিশনের প্রযোজনাটি স্মৃতিজাগানিয়া হয়ে রয়েছে।

তৃপ্তি মিত্র

জানালার পুবপাশে থাকার কারণে স্বাভাবিকভাবেই যে গুণবতীর কর্মকৃতি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়নি, সেই শতবর্ষী তৃপ্তি মিত্র সম্পর্কে কিছু কথা বলা যাক। আজি হতে শতবর্ষ আগে ১৯২৫ সালে পূর্ব বাংলার দিনাজপুর জেলার ঠাকুরগাঁয়ে দশ ভাইবোনের সংসারে তৃপ্তি ভাদুড়ীর জন্ম। নয় বোনের পরে এক ভাই। বোনদের ভেতর ঠিক মাঝের সংখ্যার বোন ছিলেন তৃপ্তি ভাদুড়ী, যাঁর ডাকনাম মণি। পিতার অকালমৃত্যুতে কলকাতায় বড় মামা সাংবাদিক সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারের আশ্রয়ে ১৯৪৩ সালে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর পড়াশোনা আর এগোয়নি। বাংলা সাহিত্যের প্রথিতযশা কবি অরুণ মিত্র ছিলেন বড় জামাইবাবু এবং বাংলা নাটকের প্রবাদপ্রতিম বিজন ভট্টাচার্য ছিলেন মাসতুতো দাদা, যাঁর হাত ধরে অনেকটা নিজ ইচ্ছার বিরুদ্ধেই নাটকে অভিনয় করতে আসা এবং এখানেই শম্ভু মিত্রের সঙ্গে দেখা হওয়া। পরবর্তীতে ১৯৪৫ সালে উভয়ের বিয়ে কলকাতা থেকে দূরে বোম্বাই শহরে এবং তারপর আমৃত্যু নানা ঘাত-প্রতিঘাত প্রত্যাশা প্রাপ্তি ষড়যন্ত্র ইত্যাদির ভেতর দিয়ে তাঁদের যুগল অভিনয় যাত্রা। এরই ভেতর বেড়েছে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপকতা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে ইংরেজ শাসক সৃষ্ট মন্বন্তর ও দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা সমাজসচেতন একজন হয়ে এ সময় তো হাত গুটিয়ে বসে থাকা যায় না। তাই অনাহারি মানুষদের সাহায্যার্থে স্বেচ্ছাসেবী হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেছেন তৃপ্তি মিত্র রাস্তায় রাস্তায়। পাশাপাশি, গণনাট্য সংঘের নাটক আবৃত্তি-সহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশগ্রহণ বন্ধ থাকেনি। একই সঙ্গে শোষিত মানুষের মুক্তি সংগ্রামে শরিক হয়ে নিপীড়ক অত্যাচারীকে ‘স্বজন হারানো শ্মশানে’ তোলার দৃঢ় অঙ্গীকার। এসময় অর্থকষ্টে জর্জরিত সংসার চালানোর নিত্য দুর্ভাবনা তো ছিলই। ১৯৪৭–এর দেশভাগ এবং স্বাধীনতার উজ্জ্বলতা অল্প দিনে ফিকে হতে শুরু হল তৃপ্তি মিত্রের কাছে। কানে এল রাজপথের স্লোগান ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়’। তখন তো বয়স ২৫–ও হয়নি। এরই ভেতর কত কঠিন কিছু দেখতে হল। কিন্তু জীবন তো থেমে থাকে না। অভিনয়ের কঠিন চ্যালেঞ্জকে তাই ঝুঁকি নিয়েই চিরসঙ্গী করেছেন তিনি। হেঁটেছেন সাফল্য ব্যর্থতা মেশানো শিল্পের পথে। হয়েছেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী।

মঞ্চ ছাড়াও তৃপ্তি মিত্র বাংলা, হিন্দি, উর্দু, ইংরেজি ভাষার বেশ কিছু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। জনপ্রিয় নায়ক রাজ কাপুরের প্রথম সিনেমার নায়িকা তৃপ্তি মিত্র। সিনেমার নাম ‘গোপীনাথ’। তৃপ্তি মিত্রের এটি দ্বিতীয় হিন্দি সিনেমা। প্রথম ‘ধরতিকে লাল’। ইংরেজি সিনেমাটি ছিল ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে একটি তথ্যচিত্র। তথ্যচিত্রের নির্মাতা ছিলেন জার্মানির পলজিলস, যিনি পরে একটি দ্বিভাষিক পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমাও নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে তৃপ্তি মিত্র ও শম্ভু মিত্র উভয়েই অভিনয় করেছিলেন। তৃপ্তি মিত্র অভিনীত উর্দু সিনেমাটি নির্মিত হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় ১৯৫৭ সালে। শেষ হয়েছিল ১৯৫৯ সালে। পূর্ব পাকিস্তানে তখনও সিনেমা নির্মাণের উপযোগী পরিবেশ, কারিগরি সুযোগ–সুবিধা ছিল না। পশ্চিম পাকিস্তানের নির্মাতা এ. জে. কারদার সিদ্ধান্ত নিলেন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ নির্মাণ করবেন, যার সম্পূর্ণ শুটিং হবে নদীমাতৃক পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন লোকেশনে। এই সিনেমায় নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তৃপ্তি মিত্র। উপন্যাসের নাম পাল্টে সিনেমার উর্দু নাম রাখা হয়েছিল ‘জাগো হুয়া সাবেরা’। এই চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল কাহিনিকারের নাম। পাকিস্তানের প্রচলিত নীতিমালায় ভারতীয় হিন্দু লেখকের নাম ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল। তাই পাকিস্তানের উর্দু কবি ফয়েজ আহমেদের নাম ব্যবহৃত হয়েছিল। কাহিনিকার, চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচয়িতা হিসেবে তৃপ্তি মিত্র বহুরূপীর হয়ে নাটকের নির্দেশনাও দিয়েছেন। বিশেষ করে তাঁর নির্দেশনা এবং একক অভিনয়ে অত্যন্ত দর্শকপ্রিয় হয়েছিল যে নাটকটি তার নাম ‘অপরাজিতা’। এই নাটকটি নিয়ে তিনি এবং তাঁর দল ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশেও এসেছিলেন। অভিনেত্রী তৃপ্তি মিত্রের হয়ে ওঠার পথযাত্রায় পূর্ব বাংলার নাট্যপ্রেমীদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ তেমন একটা ছিলই না। ১৯৪৭–এর দেশভাগের আগে এবং পরে কলকাতার সিনেমা দেখার নিয়মিত অভ্যাস ছিল এখানে। সায়গল, কাননদেবী, প্রমথেশ বড়ুয়া এই নামগুলো দেশভাগের আগে থেকেই পুবে জনপ্রিয় ছিল। দেশভাগের পর সুচিত্রা–উত্তমের নাম মধ্যবিত্তের ঘরে ঘরে এমন ভাবে ঢুকে গেল যে, এত বছর পরেও তার ঘোর কাটেনি। বাংলার উত্তম–সুচিত্রা ছাড়াও পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালির প্রিয় ছিলেন অবাঙালি দিলীপ–মধুবালা দেবানন্দ–ওয়াহিদা রাজ কাপুর–নার্গিসদের মতন অভিনেতা, অভিনেত্রী। কলকাতার মঞ্চ কাঁপানো থিয়েটার অভিনেতা, অভিনেত্রীদের নাম কিন্তু উপরের তালিকায় নেই। কলকাতার শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, নির্মলকুমার প্রমুখের নাম শোনা যেত। সিনেমার তুলনায় আকাশবাণীর নাটকের শ্রোতা তুলনামূলকভাবে কম ছিল তবুও আকাশবাণী কলকাতা থেকে প্রচারিত নাটক ছিল বলেই উল্লিখিত শিল্পীদের কণ্ঠ অভিনয় শুনে মুগ্ধ হতেন এপাশের অভিনয়–প্রিয় মধ্যবিত্ত শ্রোতা।

আকাশবাণী কলকাতার শ্রুতি নাটকের কারণেই এই অঞ্চলে বাদল সরকারের প্রাথমিক পরিচিতি। বাদল সরকার লিখিত ‘অমল কমল বিমল’, ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটক দুটি প্রচারিত হওয়ার পর চেনা গেল একজন প্রথাবিরোধী নাট্যধারার রূপকারকে। তাঁর আবির্ভাবের মাধ্যমেই সৃষ্ট হল এক নাট্যদর্শনের, যা গতানুগতিক নাটকের প্রথাবিরুদ্ধ হয়ে খুলে দিল নানামুখী নাট্যচর্চার পথ। আর যার প্রভাব পড়ল বাংলার বাইরে ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলেও। এবং বাদল সরকার পরিচিত হলেন ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী নাট্য–বিশেষজ্ঞ হিসেবে। ভারতবর্ষের সুপরিচিত নাট্যজন গিরিশ কার্নাড, বিজয় তেন্দুলকার, নাসিরউদ্দিন শাহ, রত্না পাঠক, অমল পালেকার, অমরেশ পুরী, হাবিব তানভির, নানা পাটেকার, রায়না প্রমুখ বাদল সরকারের নাটক এবং নাট্য প্রযোজনাকে সমীহ করেছেন এবং নিজ নিজ ক্ষেত্রে চর্চা এবং ব্যবহার করেছেন।

বহুরূপীর অপেশাদার অভিনেত্রী হয়েও তৃপ্তি মিত্র পেশাদার নাট্যশালা বিশ্বরূপা মঞ্চে একনাগাড়ে চারবছর ধরে বিধায়ক ভট্টাচার্যের ‘সেতু’ নাটকে নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তাঁর বিপরীতে নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সেই সময়কার অত্যন্ত জনপ্রিয় অভিনেতা অসিতবরণ। পরবর্তীতে আর একজন প্রিয় নায়ক অসীমকুমার। নাটক হিসেবে ‘সেতু’ বাংলার নাট্য ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য নাম।

রাজনীতিমনস্ক এবং সাম্যবাদী দর্শনে বিশ্বাসী বাদল সরকার ব্যক্তি স্বার্থপরতা এবং আত্মকেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে সবসময় সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা বলেছেন। সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে সত্য উন্মোচনে ভাল থিয়েটার করার কথা লিখেছেন যুদ্ধবিরোধী ও ধ্বংসবিরোধী নাটক ও নাট্য সংলাপ এবং তিনি নিজে অভিনয় করেছেন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে। আঙ্গিক হিসেবে বেছে নিয়েছেন কম খরচের সহজ সুলভ এবং নিরাভরণ মুক্তমঞ্চ। প্রসেনিয়ামের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে দর্শকের কাছে এসে তৈরি করেছেন এক নিজস্ব আঙ্গিক। দর্শক এবং অভিনেতা সেখানে একে অন্যের চোখাচোখি দূরত্বে। কারণ, তিনি সেই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে ততদিনে বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে, আলো ঝলমলে অপেক্ষাকৃত উঁচু মঞ্চে অভিনেতা অভিনয় করবেন আর দর্শক নিচুতে অন্ধকারে বসে তা দেখবেন— যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় এটা শতভাগ শুদ্ধ নয়। সমাজের সবাইকে শুভবাদী চেতনা এবং বোধে সচেতন করতে হলে প্রসেনিয়াম থেকে বেরোতেই হবে। তাঁর এই ধারণা এবং বিশ্বাসের সঙ্গে সমকালীনরা যে একমত হয়েছিলেন তা কিন্তু নয়।

বাদল সরকার

প্রকৌশলী বাদল সরকার টাউনপ্ল্যানার হিসেবে চাকরি করেছেন ভারত ছাড়াও যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, নাইজেরিয়া এবং ঘানায়। দেখেছেন বিভিন্ন দেশের নাট্যচর্চা, অবসরে লিখেছেন নাটক ও কবিতা। গড়ে তুলেছেন নাট্যপাঠের আড্ডা। আমন্ত্রিত হয়ে গেছেন সোভিয়েত ইউনিয়ন, পোল্যান্ড, চেকোশ্লাভাকিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রে। পরিচিত হয়েছেন গুণী নাট্যব্যক্তিত্বদের সঙ্গে। দেখেছেন তাঁদের কর্মকৃতি, শিখেছেন ঢের। লাওস, থাইল্যান্ড, পাকিস্তানে গিয়েছেন কর্মশালার মাধ্যমে সেখানকার নাট্যচর্চাকে সহযোগিতা করতে। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার আমন্ত্রণে তেমনই একবার তিনি বাংলাদেশেও এসেছিলেন। তখন তাঁর পড়ন্ত বয়স, শরীরটাও আগের মতো সবল নেই। ততদিনে স্বাধীন বাংলাদেশে গ্রুপ থিয়েটার চর্চায় হঠাৎ বর্ষার বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো নবনাট্য আন্দোলনে জড়িয়েছেন অনেকেই। দেশ জুড়ে অনেক নাট্যকর্মী, অনেক নাট্যদল। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ভারত ও পাশ্চাত্যের কত যে নাট্যকারের নাট্যস্রোত। কেবল রাজধানী ঢাকায় নয়, চট্টগ্রাম খুলনা রাজশাহি বগুড়া দিনাজপুর–সহ প্রায় প্রতিটি জেলায় নিয়মিত নাট্য প্রযোজনা হচ্ছে। এনএসডি এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে এসেছেন যাঁরা, তাঁরাও হাত গুটিয়ে বসে নেই। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলার জন্য স্বতন্ত্র বিভাগও চালু হয়েছে। বাদল সরকার প্রবর্তিত ‘থার্ড থিয়েটার’ সম্পর্কেও জানার আগ্রহ বাড়ছে ধীরে ধীরে। অথচ মজার ব্যাপার হল, এই অঞ্চলে কেউই বাদল সরকারের কোনও প্রযোজনা ততদিন পর্যন্ত দেখেননি। চোখে দেখিনি বা শুনেছির মতো ব্যাপার। উল্লেখ্য যে, প্রসেনিয়াম থিয়েটারের পাশাপাশি বাংলাদেশে ততদিনে ‘মুক্ত নাটক’ এবং ‘গ্রাম থিয়েটার’–এর নাট্যক্রিয়াও বেশ বেগবান। থার্ড থিয়েটারের আঙ্গিকের সঙ্গে এই দুই ধারার নাট্যচর্চার ভিন্নতা খুব একটা ছিল না বলা যায়। বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ইস্যুভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গ্রামাঞ্চলের খোলা জায়গা এবং বাড়ির উঠোনে নিয়মিতভাবে ছোট ছোট নাটক অভিনয় শুরু করেছে। অনুকরণ করেও নাটকগুলোর অধিকাংশই ছিল স্লোগানধর্মী। শিল্পের পরশ ছিল না বললেই চলে।

১৯৭১ সালে ইসলামিস্ট পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সেক্যুলার বাঙালির জাতিগত পরিচয় প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে মাত্র নয় মাসের এক রক্তক্ষয় যুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গ করল ৩০ লক্ষ নিরীহ বাঙালি। নিষ্ঠুর বর্বরতায় ধর্ষিতা হল লক্ষ লক্ষ অসহায় নারী। ‘সাকিনা বিবির কপাল পুড়লো সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর’— প্রায় এক কোটি নিরীহ মানুষ ভিটেমাটি ছাড়া হয়ে পালিয়ে আশ্রয় নিল প্রতিবেশী ভারতে। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আত্মসমর্পণ করল পাকিস্তানের বর্বর সেনাবাহিনী ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরে। পূর্ব দিগন্তে উদিত হল রক্তলাল সূর্য। চিরপরাধীন বাঙালি অর্জন করল হাজার বছরের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানকে কণ্ঠে নিয়ে বিশ্বমাঝে উড়ল একটি ছোট্ট ভূখণ্ডের লাল সবুজ পতাকা। ভূখণ্ডের নাম বাংলাদেশ। বাঙালির আত্মপরিচয়ের আপন ঠিকানা। তারপর লাখো শহিদের রক্তের দাগ মুছে ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে শুরু হল দেশ গড়ার বিপুল কর্মযজ্ঞ। এই কর্মযজ্ঞের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারা বাংলাদেশের নবনাট্য আন্দোলন। যুদ্ধের ময়দান থেকে ফিরে অস্ত্র সমর্পণ করে কিছু তরুণের নেতৃত্বে শুরু হল গ্রুপ থিয়েটার–চর্চার নামে মঞ্চনাটকের পথচলা। সে এক নব উদ্দীপনা যেখানে মিলিত হল লক্ষ লক্ষ তরুণ প্রাণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত ছাত্র সংসদের উদ্যোগে সকল ছাত্রাবাসের ভেতর নাট্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হল। যেখানে নীতিমালা নির্দিষ্ট করা হল এইরকম যে, নাটক রচনা নির্দেশনা অভিনয়–সহ সব কিছুই করতে হবে নিজ নিজ ছাত্রাবাসের ছাত্রছাত্রীদের। দর্শনার্থী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ছাড়াও প্রতি সন্ধ্যায় উপস্থিত হতেন শহরের শিল্পপ্রেমিক গুণীজনেরা। অভূতপূর্ব, অকল্পনীয় সে আয়োজন। খুব অল্প সময়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেখাদেখি গঠিত হল আরও কিছু উৎসাহী নাট্যদল এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা বেছে নিলেন নিজ দলের কর্মীর লেখা নিজস্ব নাটক। বাংলা একাডেমি আয়োজিত স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ভাষাদিবসের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে এল কলকাতার নাট্যদল ‘থিয়েটার ওয়ার্কশপ’। নাট্যব্যক্তিত্ব অশোক মুখোপাধ্যায় এবং বিভাস চক্রবর্তীর নেতৃত্বে মঞ্চস্থ হল দুটি নাটক ‘চাক ভাঙ্গা মধু’ এবং ‘রাজরক্ত’। বছর ঘুরতেই স্থানীয় সংগঠন নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের একক আয়োজনে শুরু হল সর্বপ্রথম দর্শনীর বিনিময়ে নাট্য প্রদর্শনী। তাদের প্রথম নাটক বাদল সরকারের ‘বাকি ইতিহাস’। বাংলাদেশের নাট্যকর্মীদের সঙ্গে বাদল সরকারের সম্পর্ক সেই প্রথম। ঢাকার ব্রিটিশ কাউন্সিল মিলনায়তনে অভিনীত ‘বাকি ইতিহাস‘ দেখবার জন্য দু’টাকা, এক টাকা দামের প্রবেশপত্র জনে জনে পৌঁছে দেওয়া হত। বছর যেতে না যেতে খুব দ্রুতই শুরু হল আরও কয়েকটি নাট্যদলের দর্শনীর বিনিময়ে নাট্য প্রযোজনা। অভিনয় উপযোগী মিলনায়তন না থাকায় জীর্ণ এবং দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত থাকা রাজধানীর দুটি পুরনো সেমিনার হলকে নাট্যকর্মীরা নিজেরাই মেরামত করে শুরু করলেন নিজ নিজ দলের নাটকের মঞ্চায়ন। প্রায় সব ক’টি নাটকেই নিজস্ব দলের নাট্যকারের রচনায়। সে যে কী উদ্দীপনা বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো ‘রুধিয়া রাখিতে নারি’?

বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে ঢাকায় এলেন বরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়। স্থানীয় কাহিনি এবং কারিগরি সহযোগিতায় বাংলাদেশেই চলচ্চিত্র নির্মাণের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন তিনি। প্রায় একই সময়ে ঋত্বিক ঘটক এবং রাজেন তরফদার বাংলাদেশে নির্মাণ করলেন দুটি চলচ্চিত্র— ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ এবং ‘পালঙ্ক’। সবমিলিয়ে স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রথম কয়েকটা বছর সংস্কৃতি চর্চার যে উন্মাদনা ও উচ্ছ্বাস তাকে সৃষ্টিসুখের উল্লাস বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। কিন্তু সেই আনন্দমাখা সময় বেশি দিন স্থায়ী হল না। ১৯৭৫–এর আগস্টে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করা হলে আশাজাগানিয়া সকল প্রদীপ মুহূর্তই নিভে গিয়ে জাতীয় জীবনে নেমে এল নিকষ কালো আঁধার। আবার শুরু হল সদ্যস্বাধীন সম্ভাবনাময় বাঙালি জাতির সাবলীল সংস্কৃতিচর্চাকে গলাটিপে হত্যা করার পুরনো ষড়যন্ত্র। নবনাট্য আন্দোলনের সঙ্গে যাঁরা জড়িত ছিলেন তাঁরা কিন্তু হাল ছাড়লেন না। রাষ্ট্র সরকার প্রশাসনের বৈরিতার মুখেও তারা নাট্যমঞ্চে তুমুলভাবে সচেষ্ট থাকল। ধর্মান্ধ, মৌলবাদী এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিরোধী ছিল, তাদের বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া শক্ত রেখে সাহিত্য ও সামাজিক ক্ষেত্রে শুভবাদী মানুষকে সঙ্গে নিয়ে নাট্যকর্ম গতিশীল রাখা সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রাখলেন নাট্যকর্মীরা। কাজটা কঠিনই ছিল। ধর্মান্ধ মৌলবাদের কাছে সৃজনশীলতা এবং সুস্থ সংস্কৃতিচর্চা পছন্দের নয়। তাই একদিকে তাদের সৃষ্ট বর্বরতার বিরুদ্ধে রাস্তার লড়াই, অপরদিকে সংগঠনের কর্মতৎপরতা সচল রাখা এবং একই সঙ্গে শিল্পবৃক্ষে সাধ্যমতো নিজ নিজ পছন্দের ফুল ফুটানো। এজন্যই বলেছি যে, কাজটা কঠিনই বটে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রের পুনঃপুন ব্যর্থতার ফলে নষ্ট হতে শুরু হল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সাম্যবাদের চেতনা। যে চেতনার সঙ্গে মিশে ছিল বাঙালির ঐতিহ্যিক দেশপ্রেম এবং অসাম্প্রদায়িকতার দর্শন। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী স্থানীয় প্রশাসনে এবং সমাজের সকল ক্ষেত্রে বিষবৃক্ষের ডালপালা ছড়াতে শুরু করে এবং দিনে দিনে চোখের আড়ালে সেটা বেশ সবলও হয়ে ওঠে। ফলে বাধাগ্রস্ত হয় নিয়মিত নাট্যচর্চার স্বাভাবিকতা। শেখ মুজিবের হত্যা-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র ও সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনে ছন্দপতন দেখা দেয় এবং ক্রমশই সীমিত হওয়ায়। পুবপাশের নাট্যচর্চার খবরাখবর খুব একটা কলকাতায় পৌঁছত না। মাঝেসাঝে জাতীয় রাজনীতির পরিস্থিতি একটু সহনীয় থাকলে এবং সরকারের বিধিনিষেধ খানিক নমনীয় হলে জানালার দুই পাশে তথ্যের আদানপ্রদান কিছুটা হত।

কলকাতার নান্দীকার ঢাকায় আসে আটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত–স্বাতীলেখার নাট্যদলকে ঢাকায় আনতে সরকারি পর্যায়ের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং আইনগত বাধা দূর করতে হিমশিম খেতে হয়েছিল আয়োজক ঢাকা থিয়েটারকে। নান্দীকার আয়োজিত জাতীয় নাট্য উৎসবে বাংলাদেশের একটি নাট্যদল কলকাতায় অভিনয় করে ১৯৮৬ সালে একাডেমি মঞ্চে, সে নাটক দেখতে শম্ভু মিত্র–সহ ভারতের গুণী নাট্যব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন। ঢাকা থিয়েটার নিবেদিত ‘কীত্তনখোলা’ নাটকটির মাধ্যমে কলকাতার নাট্যকর্মীদের কাছে বাংলাদেশের নাট্য প্রযোজনার যে চিত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তার পথ ধরে পরবর্তীতে আরও কিছু নাট্যদল কলকাতা–সহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের নিজ নিজ প্রযোজনা উপস্থাপনা করে। ‘কীত্তনখোলা’ কলকাতার মঞ্চে অভিনীত পুবের প্রথম কোনও নাটক। পরবর্তীকালে ঢাকা থিয়েটার কলকাতা এবং আরও কয়েকটি স্থানে তাদের অন্যান্য নাটক উপস্থাপনা করেছে। ‘কেরামত মঙ্গল, ‘যৈবতী কন্যার মন, ‘হাত হদাই, ‘প্রাচ্য’ এবং আরও কিছু নাটকের নাম এক্ষেত্রে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পরিস্থিতি ঘন ঘন অস্থিতিশীল হওয়ায় পারস্পরিক দেওয়া–নেওয়ার ব্যাপারটা ক্রমশই হোঁচট খেয়েছে। তাছাড়া ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় মুক্ত সংস্কৃতি চর্চা দুঃখজনকভাবে সঙ্কুচিত হয়ে যায়। লোকশিক্ষার অন্যতম নাট্য আঙ্গিক ঐতিহ্যিক যাত্রাপালার সুস্থ ধারাকে সুপরিকল্পিতভাবে সরিয়ে দিয়ে সেখানে দিনে দিনে পাকাপোক্ত আসন গেড়ে বসল কুরুচিপূর্ণ অশ্লীলতা। ফলে সহজ সরল গ্রামীণ জীবনে বেড়ে গেল লুণ্ঠন, হত্যা, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন–সহ সামাজিক দুর্যোগ। এদিকে শহর অঞ্চলেও একসময়ের মোটামুটি সুস্থ চলচ্চিত্র ধারাতেও ঘটল সেক্স–ভায়োলেন্সের প্রাধান্য। কুরুচিপূর্ণ উদ্ভট কাহিনিসর্বস্ব চলচ্চিত্রকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হল সরকার এবং কালো টাকার মালিকদের পক্ষ থেকে। বন্ধ হল মধ্যবিত্ত শ্রেণির সিনেমা হলে যাওয়ার নিত্য প্রবণতা। বাংলা সিনেমার এই দুরবস্থার জন্য চলমান রাজনীতি কি আদৌ সম্পৃক্ত ছিল না? সমাজের এই পচন সুস্থ নাট্যচর্চাও রোগগ্রস্ত হল।

একই সময়ে শহরের বস্তি অঞ্চলে প্রশাসনের নাকের ডগায় ভিডিওর মাধ্যমে দেখানো শুরু হল পর্ন সিনেমা। সেই সঙ্গে জীবননাশী মাদকের রমরমা ব্যবসা। গণমাধ্যমকে সঙ্গী করে নাট্যকর্মীরা সমাজবিধ্বংসী অপসংস্কৃত রুখবার চেষ্টা করলেও তেমন একটা লাভ হয়নি। ব্যাপারটা দুঃখজনক হলেও সত্য। পরিণামে গত শতাব্দীর আটের দশকের থিয়েটারের যে উচ্ছলতা সৃষ্টি হয়েছিল দেশ জুড়ে তাতে দ্রুত ভাটা পড়তে শুরু করল। থিয়েটার প্রযোজনা কমে গিয়ে বেড়ে গেল থিয়েটার পলিটিক্স। জাতীয় আন্তর্জাতিক ফোরামের নেতৃত্ব নিয়ে ব্যস্ততা বেড়ে গেল এই সময়। থিয়েটারের গুণী অভিনেতাদের একটা বড় অংশ মোহ খ্যাতি আর অর্থের লোভে ঢুকে গেলেন টেলিভিশন সিরিয়ালে। আর একাংশ ঢুকলেন পাশ্চাত্যের অর্থায়নে চালিত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার চাকরিতে। এইরকমই একটি প্রভাবশালী স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার আমন্ত্রণে ঢাকায় এসেছিলেন বাদল সরকার তাঁর ওপেন স্পেসের নাটক নিয়ে। ঢাকঢোল কাঁসর ঘণ্টা বাজিয়ে। সেখানে অগাস্টো ব্যোল, রিচার্ড শেখনার, গ্রোটস্কি প্রমুখের পাশাপাশি বাদল সরকারের নাম নিয়েও কথার ফুলজুরি ফুটত এনজিও নেতা ও কর্মীদের মুখে। ইউরোপ, আমেরিকা, সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রভৃতি অঞ্চলে ভ্রমণ করে বাদল সরকার অল্টারনেটিভ থিয়েটার, ইনভিজিবল থিয়েটার, পুওর থিয়েটার ইত্যাদি নাট্য আঙ্গিক সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। প্রাচ্যের লোকনাট্য এবং পাশ্চাত্যের এইসব অর্জিত অভিজ্ঞতা তাঁর থার্ড থিয়েটার দর্শনে এবং নাট্য আঙ্গিক নির্মাণে কিছুমাত্র প্রভাব ফেলেছে কি? যদি ফেলেও থাকে তাতে কার ক্ষতি। দেবে আর নেবে মেলাবে মিলিবে তত্ত্বে বিশ্বাস থাকলে ভাল বই খারাপ ফল দেয় না। বাদল সরকার বাম রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন ব্যক্তি স্বার্থপরতা এবং আত্মকেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে। সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ভাল থিয়েটার করে সত্যকে তুলে ধরাকে তিনি যথার্থ মনে করেছিলেন। তাই তাঁর রচিত নাটকের স্লোগানধর্মী সংলাপের আধিক্য কম।

নাটক নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তিনি দুঃসাহসী ছিলেন। নইলে রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’র মতো নাটককে তিনি খোলা আকাশের নীচে দর্শকের মাঝে সুলভ সংস্করণে কীভাবে অভিনয় করিয়েছেন। একসময়ের মার্কসবাদী অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে তিনি বোধহয় বিশ্বাস করতেন যে, নাট্যকার রবীন্দ্রনাথ ‘রক্তকরবী’ নাটকে প্রকৃতই ধনতান্ত্রিক দুনিয়া তথা সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন রূপ তুলে ধরেছেন। এ ব্যাপারে দর্শকদের চেতনা, বোধ, রুচির প্রশংসাও করা দরকার। এবং যার অনেকটাই বাদল সরকারের সৃষ্ট। শহরে বা গ্রামের প্রতিটি অভিনয়ে তিনি যে সবসময়ই উচ্চশিক্ষিত বা অনেক জানাশোনা রয়েছে এমন দর্শক পেয়েছেন, তা তো বিশ্বাস করা যায় না। তবু দর্শক আর অভিনেতার মাঝে যোগাযোগ প্রক্রিয়ার সার্থক প্রয়োগ তিনি করতে পেরেছেন শিল্পের মৌলিক তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন বলেই। একই সঙ্গে ভাল থিয়েটার করে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার কঠিন কাজটিও তিনি সার্থকভাবে করতে পেরেছেন। এখানে বাদল সরকার সমসাময়িকদের থেকে আলাদা এবং ভারতবর্ষের অধিকাংশ নাট্যবিশারদদের মাঝে বরণীয় ও অনুকরণীয়। শতাব্দী, অঙ্গন এবং থার্ড থিয়েটারের জার্নিতে তিনি সাথি করতে পেরেছিলেন অজস্র নাট্যপ্রেমীকে, যাঁরা শিল্পের নতুনত্বে এবং সমাজ পরিবর্তনে বিশ্বাসী ছিলেন। কলকাতার নাট্যবাবুদের কাছে তাঁর জার্নিটা সবসময় খুব একটা প্রশংসনীয় ছিল বলে মনে হয় না। তিনি তাকে খুব একটা তোয়াক্কাও করতেন না। তবে পরবর্তীকালে তরুণদের কাছে সাহসী বাদল সরকারের আঙ্গিক তাঁর নাট্যদর্শন, সাহসী পথচলা যে অনুকরণীয় এবং পছন্দনীয় হয়েছিল সেটা শতবর্ষে পৌঁছে গেছে টের পাওয়া যায়। তবে বর্তমানকালে ভোগবাদী জীবনদর্শন যখন সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে তখন বাদল সরকারের ‘থার্ড থিয়েটার’, সেলিম আল দিনের ‘গ্রাম থিয়েটার’, অকালপ্রয়াত সফদর হাশমির ‘জননাট্য মঞ্চ’, অথবা প্রবীর গুহের ‘অল্টারনেটিভ লিভিং থিয়েটার’ অনেকটাই নিষ্প্রভ। একদা প্রবাহমান স্রোতস্বিনী জলধারায় তবে কি সৃষ্টি হয়েছে ধূ ধূ বালুচর?

বাদল সরকার তাঁর নাট্যাভিনয় শুধুমাত্র স্লোগানকে মুখ্য করে নাটকের শেষে দর্শকদের বাধ্য করেননি অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামতে তিনি এবং তাঁর দল দর্শকদের চেতনাকে শানিত করেছেন মাত্র।

ধনতন্ত্রের সর্বগ্রাসী আগ্রাসন, বিশ্ব জুড়ে সামরিক শক্তির দখলদারিত্ব, সমাজের সমাজে ধর্মান্ধ উগ্রবাদের উল্লম্ফন, আধুনিক প্রযুক্তি সৃষ্ট মগজধোলাইয়ের বহুমুখী ফাঁদ ইত্যাদি মিলিয়ে বর্তমান সময়টা হয়তো সুখের নয়। চারিদিকে তাকালে মনে হয় দুর্ভেদ্য দেয়াল ঘেরা ‘রক্তকরবী’র যক্ষপুরী যেন। ‘রক্তকরবী’ নাটকের অধ্যাপক নন্দিনীকে পাকা দেয়ালের ফাটল দিয়ে আসা আচমকা আলোর কথা বলেছিলেন স্তূপকৃত জঞ্জালের নীচে খুঁজে পাওয়া রক্তকরবীর ছোট্ট গাছটাই সেই ফাটল ভেঙে বেরিয়ে আসা আলো। শতবর্ষী তৃপ্তি মিত্র এবং শতবর্ষী বাদল সরকার এই আলোর খোঁজে জীবনভর কঠিন সুড়ঙ্গ খোদাই করে গেছেন। বিশ্বাস করেছেন রবীন্দ্রনাথের কথাতেই ‘হাজার বাঁধনে বেঁধেও শত চাপা দিয়েও প্রাণকে কবে মারতে পেরেছে?’ বিশ্বাস করেছেন, পাকা দেয়াল ভেদ করে কাঙ্ক্ষিত আলোর ঝলকানিতে একদিন চিত্ত ঝলমল করবে। আলোকিত হবে বাংলার নাট্যভুবন। একই সঙ্গে চারপাশটাও।

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

6 + 16 =

Recent Posts

প্রদীপ ঘোষ

প্রদীপ ঘোষের কবিতা

প্র দী প  ঘো ষ মেধার অপমৃত্যুর কারণ আঁধারের পরেও যদি ধূসরেরই দিশা .               বুঝতে হবে ফলিতার্থে আলো গিলে

Read More »
সত্যবান রায়

সত্যবান রায়ের বিশেষ নিবন্ধ

কবি ও রাজনীতি স ত্য বা ন  রা য় রাষ্ট্রবিজ্ঞানে রাজনীতির কেতাবি সংজ্ঞা আছে মন্দ্র উচ্চারণে, পরিভাষাগত আভরণে। হতে পারে তার সারাৎসার এইরকম— যে নীতি

Read More »
রণবীর দত্ত

রণবীর দত্তর কবিতা

র ণ বী র  দ ত্ত রাত্রির মধ্যে এক রাত্রি দুমকার পথে যেতে আমার কুঁড়েতে তোমাকে রাখতে চাই সারা দুপুর একা বসে থাকে রোগা রোগা

Read More »
সুনন্দ অধিকারী

সুনন্দ অধিকারীর ছোটগল্প

হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি, শ্রয়েডিংগারের বেড়াল ও একটি সম্পর্ক সু ন ন্দ  অ ধি কা রী একবার রাস্তার দিকে, পরক্ষণেই আবার ব্রিজটার দিকে ঘুরে দেখছি আমি।

Read More »
ড. শ্যামল কান্তি দত্ত

ড. শ্যামল কান্তি দত্তর প্রবন্ধ

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ যে প্রকৃত বাংলা ভাষার স্বপ্ন দেখেছেন, সে লোকায়ত বাংলা ভাষা প্রথম সফলভাবে সাহিত্য সভায় এসেছিল চৈতন্য প্রভাবেই। বর্তমানে বাংলা ভাষা যে অন্তর্জাল-আন্তর্জাতিকতার আলোয় অবহেলিত তা থেকে মুক্ত করার উপায়ও ঐ শ্রীচৈতন্যের চেতনাজাত মানবিক প্রেম-ভক্তি তথা ‘অচিন্ত্যভেদাভেদতত্ত্ব’ চর্চায়।

Read More »
গোবিন্দ কুণ্ডু

গোবিন্দ কুণ্ডুর কবিতা

গো বি ন্দ  কু ণ্ডু দিশাহীন নিদ্রাহীন প্রতিটি রাত্রি কাটাই গভীর হতাশা নিয়ে, আমি কারও স্বপ্নের রাজপুত্র হয়ে উঠিনি কোনও দিন। এই পৃথিবীর মায়াজালে জড়ানো

Read More »