Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়ের রম্য নাটক

বিপত্নীকসঙ্ঘ

ম ল য় চ ন্দ ন  মু খো পা ধ্যা য়

 

।। প্রথম দৃশ্য।।

 

(সুখারামবাবুর বসার ঘর। সোফা, সেন্টার টেবিল, বইয়ের আলমারি, দেয়ালে ছবি। একপাশে তার প্রয়াতা স্ত্রীর ছবি, গলায় বাসি মালা-সহ। সোফায় মুখোমুখি বসে সুখারাম এবং বাণপ্রস্থবাবু)।

সুখারাম: তা হলে কাজের কাজ কিছু একটা করতে যাচ্ছি, কী বলো ভায়া?

বাণপ্রস্থ: দেখা যাক শেষপর্যন্ত কী দাঁড়ায়। আইডিয়াটা যে গ্র্যান্ড, সে বিষয়ে আমার সন্দেহ নেই। সেজন্যই তো এই বৃদ্ধ বয়সে এসেও এমন একটা ভেঞ্চার নেবার সাহস হচ্ছে। আফটার অল, এ গ্র্যান্ড স্টেপ টুওয়ার্ডস দি ডেভেলপমেন্ট অফ দ্য উইডোয়ার্স, আই বিলিভ।

সুখারাম: ডেভেলপমেন্ট? এদ্দূর কি বলা চলবে? এনডিভার। ওই এনডিভার পর্যন্ত বলা চলে, সেইফলি বলতে পারো। আপাতত তাতেই হবে। কী দৈবী চমৎকার বলো তো! তুমি আর আমি এক ট্রেনে, পাশাপাশি বার্থ, ভাবা যায়?

বাণপ্রস্থ: আশ্চর্যের ওপর আশ্চর্য, আমাদের পরিচয় হতেই জানা গেল, তুমিও বিপত্নীক, আর আমি-ও। আর দু’জনের-ই বিয়ের তারিখটিও এক, কি না চোদ্দোই জুলাই! ট্রেনে ওঠার আগে স্বপ্নেও কি ভেবেছিলে, এরকম একটা অনাশ্চর্য ঘটনা ঘটতে পারে?

সুখারাম: অনাশ্চর্য নয়, বলো আশ্চর্য ঘটনা। আমি কিন্তু মনে মনে টের পেতাম, এরকম একটা কিছু ঘটবেই। আজ হোক কাল হোক, ঘটবেই। নইলে প্রতিবছর নিয়ম করে বেনারস যাই? মরুছায়া থাকতে যেতাম, কারণ বাবা বিশ্বনাথদর্শন ওর বছরে একবার চাই, সেজন্য। (বলে উঠে ছবির দিকে যায়, তাকিয়ে থাকে খানিক, ফের সোফায় এসে বসে)। ও চলে যেতে নিয়মটা বজায় রেখে দিলাম। তা তুমি কেন গেছিলে? প্রতিবার-ই যাও এই আমার মতো?

বাণপ্রস্থ: আরে বলেছিলাম তো, ভুলে গেছ? আমার ভায়রাভাই সত্যাম্বর ওরফে সতু—

সুখারাম: ও হ্যাঁ, এইবার মনে পড়েছে। বুঝেছ ভায়া, বৃদ্ধ বয়সে এই এক জ্বালা, ভুলে যাই অনেক কিছুই। মাঝেমাঝে আবার উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়েও চাপাই। তোমার ভায়রা, ইয়েস। বিয়ের চারদিন আগে বাড়ি থেকে উধাও, তাই না? পাড়ার গোবিন্দবাবু নিদান দিলেন—

বাণপ্রস্থ: গোবিন্দবাবু না, গোবর্ধনবাবু। বলেছিলেন, এরকম কেস হরদম হয়, জানা আছে তার। একদম সো-জা কাশী চলে যান, জঙ্গমবাড়িতে অমুক ঠিকানায় খোঁজ নিন। ওদের কাছে সারা ভারত তো ভারত, এমনকী মায়ানমার, ত্রিনিদাদ, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মায় বুদাপেস্ট-ইথিওপিয়ার পলাতক লোক এসেও নাম এনলিস্ট করে। কোন আশ্রমে উঠেছে, তার নামঠিকানা দিয়ে রাখে।

সুখারাম: আর পলাতকের আত্মীয়রা সেখানে গিয়ে তাদের কাছ থেকে নামঠিকানা জোগাড় করে তাদের ফের বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসে, তাই না? এটা কি ভলান্টারি সার্ভিস ওদের, না এজন্য চার্জ করে ওরা?

বাণপ্রস্থ: রীতিমতো জাঁকালো ব্যবসা, দানছত্তর খুলবে কোন দুঃখে? তা আত্মীয়দের অনেকে খোঁজটোজ নিতে আসেই না। ভাবে, ও আপদ বিদায় হয়েছে, যাক, বাঁচা গেছে। শান্তি। পলাতকরা কিন্তু বারবার এসে খোঁজ নেয়, জানতে চায়, বাড়ি থেকে কেউ এল? করুণ অবস্থা! এদিকে বাড়ি থেকে কেউ নিতে না এলে, এমনি একা একা বাড়ি ফিরলে প্রেস্টিজ থাকে?

সুখারাম: তা বাড়ির লোকেরা কি সবাই তোমার জঙ্গমবাড়ির হদিশ জানে?

বাণপ্রস্থ: সেটাও তো একটা কথা। সেজন্য বারবার এসে ঘ্যানঘ্যান করেও যখন শোনে কেউ আসেনি, নিদেন ফোনটোন-ও করেনি, তখন হতাশ হয়ে বলে ‘দূর শালার সংসার!’ বলে সত্যি সত্যি-ই সন্যিসি হয়ে যায়।

সুখারাম: তবে আমার মতে কিন্তু এগুলো হচ্ছে সাধু হওয়ার নেগেটিভ অ্যাপ্রোচ। বাধ্যতামূলক সাধুত্বে অবগাহন। তবে সেখানেও অবিশ্যি কারও কারও চূড়ান্ত সাফল্য এসে যেতে পারে। যায়। তা আপনার সেই শ্যালককে খুঁজে পেয়েছিলেন অবশেষে?

বাণপ্রস্থ: শ্যালক নয়, ভায়রাভাই। পেলাম মানে? অনুসন্ধান আপিসে যেতেই তারা বললে, কোন বন্দীরাম? ডাকাতটোলা আশ্রমে যে কুমড়ো কোটার পেশায় আছে, না কেদারঘাটে খোল বাজায়? তা আমি কী করে জানব কোন পেশায় রয়েছে? আগে কেদারঘাটেই গেলাম। গিয়ে দেখি, আরে! চোখ মুদে একমনে খোল বাজাচ্ছে! মুদিত চোখদু’টি বেয়ে জলের ধারা! কানের কাছে মুখ এনে যেই না বলা, অতসীর বিয়ে হয়ে গেছে, অমনি কি করল জানো?

সুখারাম: কী করে জানব? ততদিনে বৈরাগ্য এসে গিয়ে থাকবে হয়তো। তোমায় চিনতে চাইল না। এটাই স্বাভাবিক।

বাণপ্রস্থ: কচু। বলা নেই কওয়া নেই, খোলটাকে মাটিতে ছুড়ে দিয়ে বললে, তা হলে চলো। আজকের ট্রেনেই কলকাতা যাব। পাঞ্জাব মেলে।

সুখারাম: হাঃহাঃহাঃ! মেয়েবিয়ের খরচ বাঁচানোর অভিনব ফিকির! ক’মেয়ে ভদ্রলোকের?

বাণপ্রস্থ: ওই একটি-ই। যাচ্ছেতাই ব্যাপার। ফিরে আসার পর তো মেয়ের শ্বশুর বেয়াইয়ের ওপর ডাবল রেভিনিউ চাপালেন।

সুখারাম: ডাবল? কীরকম শুনি।

বাণপ্রস্থ: বললেন, টিভি ফ্রিজ মোটরসাইকেল কবুল করে কিচ্ছু না দিয়ে সটকেছেন। এসব তো চাই-ই, সঙ্গে গাড়ি একটি। তার ওই সবেধন নীলমণি একটিমাত্র ছেলে নীলজেন্দু। গাড়ি নিয়ে এখনও অনেক মেয়ের বাপ রেডি। দিতে হল গাড়ি।

সুখারাম: উচিত শিক্ষা! তা জেনুইন সাধুটাধুর সাক্ষাৎলাভ ঘটেনি ওখানে?

বাণপ্রস্থ: ঘটেনি আবার! কেউ কেউ সাধু হতে গিয়ে ওই কুমড়া কোটার বেশি যেতে পারে না যেমন, তেমনি কেউ কেউ ভুলু মহারাজের মতো পরাসিদ্ধিও পায়।

সুখারাম: ভুলু মহারাজ! নামটা শোনা শোনা লাগছে। পরা সিদ্ধি? কীরকম?

বাণপ্রস্থ: পূর্বাশ্রমে ছিল ভ্যাবলা না কোন এক জায়গার বখাটে ছোকড়া। গুণের মধ্যে মেয়ে ফুঁসলাতে ওস্তাদ। একবার এরকম কাণ্ডে কোনওমতে বেঁচে পালাল সেই কনখল। সেখান থেকে আজ ভেট দ্বারকা, কাল পুষ্কর, ফের উজ্জয়িনী হয়ে আজ সাতবছর ধরে বেনারসে থিতু। দেখেছি তাকে। বেশুমার শিষ্যশিষ্যা। শিষ্যার সংখ্যাই বেশি।

সুখারাম: বলো কী হে! রেপিস্ট ছিল একদা, তার এমন—

বাণপ্রস্থ: ইয়েস! কয়েনের ওপিঠ মুছে গেছে কবে! শিষ্যদের সংখ্যা তবু গোনা যায়, শিষ্যাদের সংখ্যা গোনার চেষ্টাও করে না কেউ। বিদেশি শিষ্যাই বেশি। আরও শুনবে? অষ্টপ্রহর চারজন শিষ্যা বাবাজির নিত্যসঙ্গী, যাদের সবাইকে তিনি ‘প্রেরণা’ বলে ডাকেন। তাদের মধ্যে সেরার সেরা আবার জাপানবাসিনী তুসিমোরা। তিনি-ই রোজ নির্ণয় করে দেন, কোন বিশজন কুমারী ভুলু মহারাজের নৈশযজ্ঞে আহুতি দিতে পারবে। মাসের মধ্যে তাদের মধ্যে পাঁচজনকে নিয়ে কোনও মাসে রিভিয়েরা, কখনও বা লাস ভেগাস করেন।

সুখারাম: লাস ভেগাস, বাবা রে! চা বলি আরেকবার? নাকি ভাদুড়ীদা এলেই হবে?

(মোবাইল বেজে ওঠে) আরে! ভাদুড়ীদা! লম্বা আয়ু আপনার, এইমাত্র আপনার কথাই হচ্ছিল। জোড়া ইলিশ? এসব কেন কিনতে গেলেন আবার? না না, স্যরি, আপনার ইচ্ছে হয়েছে যখন, হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক আছে। না না, কোনও অসুবিধে হবে না পার্কিংয়ে। দশ মিনিট? ও কে। হ্যাঁ, এসেছেন আধাঘণ্টা হয়। আসুন। (মোবাইল রেখে) বুঝলে ভায়া, এই হলেন আমাদের ভাদুড়ীদা। আজ বিশ বছরের ওপর বিপত্নীক, তা দেখলে কে বলবে? দারুণ রসেবশে আছেন। সকালবিকেল নিয়ম করে পর্নো দেখেন। দু’বার বিয়ে করলেন, দু’বার-ই বৌ মরল। সৌভাগ্য আর কাকে বলে? কথায় আছে, ভাগ্যবানের বৌ মরে। সে বিচারে উনি ডাবল ভাগ্যবান।

বাণপ্রস্থ: আহা! তা উনি হ্যাট্রিকের সুবর্ণসুযোগটা কেন ছাড়লেন? একেবারে দোরগোড়ায় এসে হাত গুটিয়ে নেওয়া—

সুখারাম: তার গ্যারান্টি ছিল কিছু? উল্টে তৃতীয়জন তার ঘাড়ে হয়তো এমন জাঁকিয়ে বসত, অন্য দু’জনের জন্য শেষকালে আফসোস। তার চেয়ে বাড়ি গাড়ি, বছরে একবার-দু’বার করে বিদেশ ঘোরা, এই তো গতমাসেই মেক্সিকো না বেনগাজি কোথায় বেড়িয়ে এলেন বলছিলেন।

বাণপ্রস্থ: কানাডা।

সুখারাম: হ্যাঁ, কানাডা। বলেছিলাম তোমায়? ভ্যাঙ্কুভার। দিনে রাতে স্পা, রিসর্ট, আবার কোন এক বন্ধুর সোয়াপিং ক্লাবের অনারারি মেম্বার!

বাণপ্রস্থ: কী ক্লাব? সোয়া— মাহাত্ম্য কী এর?

সুখারাম: ক্লাবে সবাই যার যার বৌ নিয়ে যায়, বুঝলে ভায়া? তারপর বৌ পাল্টাপাল্টি করে, এর বৌ তার, তার বৌ এর। বাড়ি ফেরার সময় কিন্তু যার যার বৌ নিয়েই বাড়ি আসে।

বাণপ্রস্থ: তা ভাদুড়ীদার তো বৌ-ই নেই!

সুখারাম: এই জন্যই তো তিনি এক্সেপশন! অন্যেরা তাঁকে স্যাক্রিফাইস করে। যেন Stag গেছে তারা। এসব, আর থ্রি ফোর ফাইভ এক্সমার্কা ছবি দেখা, কী বুঝলে? এরপর বৌ লাগে আর? হ্যাটট্রিকের ঠাকুদ্দা!

বাণপ্রস্থ: অথচ আমরা? দশটা না পাঁচটা না পঁয়তিরিশটা না, সবেধন একটি বৌ চলে গেছে বলে অমনি ধরাশায়ী! ছোটবেলায় এই আমি-ই কিনা গাইতাম, ‘বলো বীর, চির উন্নত মম শির—’

সুখারাম: গাইতে না, আবৃত্তি করতে। ওই এসে গেছেন ভাদুড়ীদা, গাড়ির হর্ন বাজালেন। বাটুল, দরজাটা খুলে রাখ। (বলতে না বলতে কলিং বেল। বাটুল দরজা খুলে দেয়। ভাদুড়ীর প্রবেশ। এক হাতে সুন্দর করে কারুকাজ করা লাঠি, অন্য হাতে হাতির দাঁতের ছোট্ট একটা কৌটো। পেছনে ড্রাইভার সদাশিব। তার হাতে ব্যাগ। ইলিশ আছে তাতে। সেটা বাটুলের হাতে দিয়ে সে বিদায় নেয়।)

ভাদুড়ী: ইনিই বাণপ্রস্থ? (সোফায় বসেন) চেহারায় কেমন যেন সেইন্টলি ইমেজ, আদি শঙ্করাচর্যের মতো। (হাতের কৌটো খুলে) কেউ একজন এখান থেকে দু’টুকরো লবঙ্গ আমার মুখে পুরে দেবে? (বাণপ্রস্থ এগিয়ে যান। কৌটোটা হাতে নেন)।

বাণপ্রস্থ: হাতির দাঁতের! আইভরি!

ভাদুড়ী: ইয়েস, আইভরি। ভারতীয় নয়, আফ্রিকান হাতির। জানেন তো, ওখানকার হাতির দাঁত আমাদের দেশের হাতির মতো ফাঁপা নয়, সলিড। সুখারাম, কফি বলো। (সুখারাম বাটুলকে ডেকে ইঙ্গিতে নির্দেশ দেয়) বুঝলে সুখা, পদ্মার টাটকা ইলিশ চোরাপথে আসে মাঝে মাঝে। এলেই ফোনে খবর দেয় সুদাম। লোক দিয়ে পাঠিয়ে দেয় তারপর। হালকা করে আমার জন্য ভাজতে বলে দাও। বাকি দিয়ে সর্ষে, দৈ ইলিশ, তোমাদের যা খুশি। আমি ওই দু’টুকরো ভাজা, ব্যস।

বাণপ্রস্থ: ইলিশ! ও মাছের তো প্রোটিনশিয়ালিটি খুব, তাই না?

ভাদুড়ী: প্রোটিনশিয়ালিটি! হাঃ হাঃ হাঃ… আপনি শুধু সেইন্টলি নন, ভেরি মাচ ফানি!

বাণপ্রস্থ: আপনি রিসেন্টলি মন্ট্রিয়ল ঘুরে এলেন, তাই না?

ভাদুড়ী: ভ্যাঙ্কুভার। সবাই বলে কানাডা। বেরসিকের দল। এর যে কী সুন্দর একটা নাম আছে, আমি দেশটাকে সে নামেই ডাকি। Our Lady of Snow! আহা! ভাবো তো সুখা, লেডি, স্নো! (বাটুল কফি এনে সকলের হাতে দেয়)। যেমন লেক, তেমনি নায়াগ্রা, আর তেমনি ফরাসিতে ব্রিটিশে স্প্যানিশে মেশানো সুন্দরীরা। ওরা পারে। ওরাই পারে এসব নাম রাখতে। ভ্যাঙ্কুভার, হলিউড নর্থ। দ্য লোটাস পার্ক! গ্রেট! আর আমরা? পারি একটা ভেনাস গড়তে? ওই বেলি বটম— না, খাজুরাহো কোনারক ভার্সেস ভেনাসের বেয়ার দুই বাহু, স্যরি, আমি বোধ হয় একটু বেশি লাইসেন্স নিয়ে ফেলছি। তা বলো, আজকের আলোচনাটা এগজাক্ট কী নিয়ে? বিপত্নীক না কী যেন বলছিলে ফোনে?

সুখারাম: হ্যাঁ। বাণপ্রস্থবাবুর সঙ্গে বেনারস যেতে ট্রেনে আলাপ। দু’জনেই বিপত্নীক। অবাক কাণ্ডখানা কী জানেন? দু’জনের বিয়ে এক তারিখে, বৌ মরেছে একদিনে, আর বাণপ্রস্থবাবু কায়েত বিধায় কেবল শ্রাদ্ধটা হয়েছে তিন দিন আগে-পরে।

ভাদুড়ী: Strange! Amazing! Marvellous! আর বলছ ট্রেনে সবেমাত্র আলাপ!

সুখারাম: ট্রেনে বসেই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, বিপত্নীকদের জন্য কিছু একটা করা যাক। বাড়ি ফিরে এ নিয়ে দু’জনে ফোনে কথাবার্তা। তারপর ভাবলাম, কিছু যদি করতেই হয়, তা হলে তো মাথার ওপরে ফ্রেন্ড, ফিলজফার অ্যান্ড গাইড হিসেবে আপনাকে রাখতেই হয়। এটা ভেবেই আজ আপনাকে তলব।

ভাদুড়ী: বিপত্নীকদের জন্য ভাবা! বাঃ! A grand idea! তা বিপত্নীকদের কোনও পদকটদক, এই ধরো বিপত্নীক অফ দ্য ইয়ার গোছের, ভেবেছ?

সুখারাম: এই জন্যই তো আপনি ভাদুড়ীদা! হ্যাঁ, এমন তো হতেই পারে। And why not রবীন্দ্র পদক? তিনি নিজেই তো বিপত্নীকের আদর্শ।

বাণপ্রস্থ: কবির নামে বিপত্নীক পদক, ইয়ে, একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে না কি?

ভাদুড়ী: বাড়াবাড়ি কেন হবে? কবি বেঁচে থাকলে সানন্দে মত দিতেন, আমার বিশ্বাস। চাইলে এমনকী বাণীও লিখে দিতেন। সুখা, তুমি বিশ্বভারতীর পি.আর.ও.-কে এক্ষুনি ফোনে ধরো তো। কনসেন্ট-টেন্টের ব্যাপার থাকতে পারে অবিশ্যি। নইলে অন্নদাশঙ্কর রায়—, এক কাজ করো সুখা। সেলিব্রিটিদের মধ্যে বিপত্নীকদের একটা লিস্ট করে ফেলো এক হপ্তার মধ্যে। খাতাকলম নিয়ে বসা যাক এবার। এইমস অ্যান্ড অ্যাজেন্ডা ঠিক করতে হবে না?

সুধারাম: হ্যাঁ, খাতা রেডি। আমি মোটামুটি একটা খসড়া রেডি করেই রেখেছি। শোনাই?

ভাদুড়ী: হ্যাঁ, পড়ো। বাঃ! ইলিশের গন্ধটা মোক্ষমভাবে বেশ ভালই আসছে তো! সুদাস আমায় কখনও ঠকায় না। পড়ো।

সুধারাম: এক নম্বরে হল, কেউ একবারের বেশি বিপত্নীক হলে সে কিন্তু ডিসকোয়ালিফাই করছে। ঠিক আছে? একবার বৌ মরতে ফের বিয়ে করে যে, তার লয়ালটিতে আস্থা রাখা যায়? তাকে কি আদর্শ বিপত্নীক—

ভাদুড়ী: আদর্শ বিপত্নীক বলতে পারো না, তাই না? এই যেমন আমি, দু’বার বউ মারা গেছে,—

সুধারাম: আরে, আমি কি আপনাকে মিন করেছি নাকি? আপনি তো স্ত্রী জীবিত থাকতেও—

ভাদুড়ী: জীবিত থাকতেও বিপত্নীক, তাই না, হাঃহাঃহাঃ! তা অবিশ্যি ঠিক নয়। I was ever loyal to both of my better halves. নিয়মিত বেড়াতে নিয়ে গেছি, বার্থ ডে-তে দামি দামি সব গয়না। একজনের পছন্দমতো নাহুম অ্যান্ড সন্স থেকে কেক আসত, অন্যজনের ভাল লাগত রাধারমণ মল্লিক। তাছাড়া দু’জনের জন্মদিনেই আমার পছন্দের ফ্রানজিসকা থেকেও আনাতাম। তবে নারীর প্রতি দুর্বলতাই বলো বা সবলতাই বলো, বিয়ের আগে, বিয়ের পরে, inter regnam-এ, স্ত্রী বিয়োগে, বরাবর ছিল। আছে। থাকবে। না থাকলে আমাকে জিয়ন্তে মৃত জানবে। আর তাছাড়া আমি তো হোস্ট আফটার অল, তবে? অতএব clause number one is granted.

বাণপ্রস্থ: দ্বিতীয়বার বিয়ে করলে সদস্যপদ পাবেই না?

সুধারাম: কেন, তোমার কি দ্বিতীয়বার বিয়ের মতলব আছে নাকি?

বাণপ্রস্থ: না না, তা নয়। এমন কি হতে পারে না, দু’বার বৌ মরে দু’গুণ শোকগ্রস্ত করে দিয়ে গেছে বেচারাকে? তাই বলছিলাম, ইয়ে, শিখরাও তো দাড়ি রাখার ব্যাপারে ডিফেন্স থেকে কনসেশন পায়। দুটো বিয়ে পর্যন্ত লিবারেল হতে পারি না আমরা? তাছাড়া এমন আর ক’টাই বা ঘটে?

ভাদুড়ী: পয়েন্ট, এমন আর ক’টা ঘটে! আর্টিকল ওয়ান অ্যামেন্ডেড। দু’বার অব্দি বৌ মরা চলবে। নেক্সট?

সুধারাম: হ্যাঁ, নেক্সট। একবার বিপত্নীক হলেও যদি কেউ বধূহত্যাটত্যা করে, বা অ্যাটেম্পট টু মার্ডার, অথবা বৌয়ের জীবিতকালে তার ওপর টর্চারের অভিযোগ থাকে, তাকে সদস্য করা হবে না। ঠিক আছে?

ভাদুড়ী: অফ কোর্স ঠিক আছে। এসবকে ইনডালজেন্স দিলে আমাদের এথিক্স থাকে কখনও?

বাণপ্রস্থ: ঠিক। থাকে না। আচ্ছা, স্ত্রী বিদ্যমান—

ভাদুড়ী: কী মান?

বাণপ্রস্থ: বিদ্যমান, অর্থাৎ বেঁচে আছে, অথচ নাম ভাঁড়িয়ে বিপত্নীক সেজে যদি কেউ মেম্বার হতে চায়, তা ঠেকাবার উপায় কী?

ভাদুড়ী: বৌ আছে, অথচ বিপত্নীক সাজবে? দেখো, সব কিছুতেই লাভালাভ বলে একটা কথা আছে জানবে। এখানে এভাবে মেম্বার হলে কী লাভ তার? একে তো বৌকে সামলাতে গলদঘর্ম, সবাই না, কেউ কেউ।

তার ওপর বৌকে লুকিয়ে সদস্য হওয়া? এমন পাগল দুনিয়ায় নেই। বরং আমি ভাবছি কি জানো? বিপত্নীক তো রইল। তার সঙ্গে বিধবাদের-ও একটা প্রভিশন যদি রাখি?

সুধারাম: এইজন্যই তো ভাদুড়ীদা! দি আইডিয়া! এনকোর! তা হলে আমাদের সংস্থার নাম হোক ‘বিপত্নীক ও বিধবাসঙ্ঘ’, ঠিক আছে? গেট টুগেদার, বছরে একবার করে কাছেদূরে পিকনিক, ট্যুর প্রোগ্রাম, এসবে একটু মহিলাদের থাকা, আরে বৌ মরেছে তো কী, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ-ই তো বলে গেছেন রসেবশে থাকতে, তা হলে?

ভাদুড়ী: তাতে অবিশ্যি রিস্ক-ও আছে। বিপত্নীকরা তো আর পঙ্গু নয়, বিধবামাত্রেই আবার নয় নিরামিষভোজী। বিশুদ্ধ বিপত্নীকপন্থীরা বেঁকে বসবার চান্স-ও আছে। সুধা, শ্রীরামকৃষ্ণকে মিস এপ্রোপ্রিয়েট করার রাইট নেই আমাদের। তাই বাদ দাও। এ বছরটা অন্তত ওই বিপত্নীক সঙ্ঘ-ই ভাল। গা সওয়া হয়ে গেলে ক’বছর বাদে না হয়— তা অ্যাজেন্ডায় আর কী আছে শুনি?

বাণপ্রস্থ: কোনও চোরটোরকে সদস্য করা যাবে না। বাটপার, বদমাশ, চোর, ছিনতাইবাজ, দুশ্চরিত্র, স্যরি ভাদুড়ীবাবু, তারপর, ইয়ে—

ভাদুড়ী: চোরদের বাদ দিতে চাও? তা হলে আর মেম্বার জুটবে? তাছাড়া এটা কি জানো, গোটা বিশ্বের সভ্যতাটা, বিশেষ করে আজকের পৃথিবীর এই অ্যামেইজিং প্রোগ্রেসের পেছনে চোরের-ই তো আসল ভূমিকা! সভ্যতার অগ্রদূত তো তারাই!

বাণপ্রস্থ: তারাই সভ্যতার অগ্রদূত!

ভাদুড়ী: ইয়েস। From time immemorial! পৃথিবীর অর্থনীতি তো ধরে রেখেছে ওরাই।

সুধারাম: একেবারে অগ্রদূত বলা, একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না ভাদুড়ীদা?

ভাদুড়ী: একটুও না। বরং কমিয়ে বললাম। আচ্ছা বলো তো, শিল্প বলো বাণিজ্য বলো, সে-সবের বিকাশে ওদের ভূমিকা অস্বীকার করতে পারো?

বাণপ্রস্থ: কীরকম?

ভাদুড়ী: সামান্য একটু প্রমাণ দিই? এই যে তোমার ঘরের জানালা, দরজা, আসবাব, এরকম এ পাড়ায়, কলকাতা শহরে, সারা বিশ্বে যত ঘরবাড়ি তাতে, কলকারখানায়, তৈরিতে কত লাখ টাকার ইনভেস্টমেন্ট লেগেছে? কারণ, চোর। অফিস আদালত, উকিল, পেশকার, দেশে দেশে। এমনকী সারা পৃথিবীর সৈনিক, অস্ত্রের এত এত ব্যয় তো এক দেশ চুরি করে অন্য দেশের যাতে সূচ্যগ্র মেদিনী গ্রাস করতে না পারে সেজন্য। রেলওয়েতে কন্ট্রাকটারি না করলে এই আমি-ই কি পারতাম দেশবিদেশ ঘুরতে, এমন লাগজারাস লাইফ লিড করতে? চোরকে বাদ দিচ্ছ দাও। তা হলে আমিও বাদ, erase me also.

সুধারাম: সে কী ভাদুড়ীদা! আপনি ছাড়া আমাদের গোটা স্কিমটাই তো মাটি!

ভাদুড়ী: কাগজে ইমিডিয়েটলি বিজ্ঞাপন দাও। বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি তো দেবেই, তাছাড়া চীনে ভাষার দৈনিকেও। জানো তো, কলকাতা থেকে চীনে ভাষাতেও দৈনিক কাগজ বেরয়?

বাণপ্রস্থ: চীনা বিপত্নীক সভ্য পেতে চলেছি আমরা! ভাবা যায় না। ভাদুড়ীমশাই এইবার আপনার পায়ের ধুলো নিতেই হচ্ছে। (পদধূলি নেয়)

সুধারাম: এই জন্যই তো ভাদুড়ীদা! ওদের কাগজে নাম? কোত্থেকে বেরয়? সম্পাদক? ফোন নম্বর?

ভাদুড়ী: সব আছে আমার কাছে। ইনফ্যাক্ট চ্যাং, পুরো নাম কুয়োসাই চ্যাং, ট্যাংরা থেকে যে দৈনিকটি বের করে, পত্রিকার নাম ‘সিওং পাও’ আমার বন্ধু। ওকে ফোন করে দিলে ও নিজেই চলে আসবে। সমস্যা নেই। তাছাড়া কন্নড়ভাষী ভেঙ্কটাচলম, অসমিয়া ভবেন গগৈ, পঞ্জাবি জগদীপ সিং, আর আমার মালয়ালি বন্ধু জনাথন ডেভিডকে বলতে পারি যদি চাও তোমরা।

সুধারাম: চাই তো অবশ্যই, তবে পাঞ্জাবি, অসমিয়া, এতগুলো ভাষা, তার সব তালগোল পাকিয়ে যাবে না ভাদুড়ীদা?

ভাদুড়ী: তা অবিশ্যি ঠিক। আয়োজনটা তা হলে অত বেশি হয়ে যায়। অনুষ্ঠান করা আছে, সুভ্যেনির বের করা আছে, ফান্ড রেইজ করা আছে, প্রাইস-ট্রাইস, এন্টারটেইনমেন্ট… না, বাদ দেও। (চাকর বাটুল এসে জানায়, লাঞ্চ রেডি)।

সুধারাম: আসুন তা হলে, ইলিশের সদ্ব্যবহারটা সেরে ফেলা যাক। ইলিশ আর বাঙালি, একেবারে হরিহর আত্মা, কী বলেন ভাদুড়ীদা? থ্রি চিয়ার্স আপনাকে।

 

।। দ্বিতীয় দৃশ্য।।

 

(এক-ই ঘর, তবে মাঝখানে বিশাল টেবিল, ল্যাপটপ। ভাদুড়ী, সুধারাম ও বাণপ্রস্থ চেয়ারে বসা)।

ভাদুড়ী: তা হলে ইনিশিয়াল রেসপন্সটা বেশ ভালই বলতে হবে, তাই না? মোট অ্যাপ্লিকেশন জমা পড়েছে কত বললে?

সুধারাম: একত্রিশ লাখ বাইশ হাজার তিনশো বারো, আজ দুপুর বারোটার ডাক আসা পর্যন্ত। বিকেলে আরও আসবে। সারা দেশ থেকে আবেদন, রাঁচি থেকে ভাইজাগ, জাস্ট ভাবুন! চিঠি পড়ব কী, খাম খুলতেই জেরবার। শিরদাঁড়া টনটন করছে।

বাণপ্রস্থ: আর আমার কী অবস্থা শুনবেন? নির্ভরে বলি?

সুধারাম: নির্ভরে না, নির্ভয়ে বলো।

বাণপ্রস্থ: এত সব দুঃখী বিপত্নীকের আর্ত চিঠি পড়তে পড়তে সত্যি সত্যি বাণপ্রস্থে যাওয়ার সাধ হচ্ছে। সারা দেশে যে এত বৌহারা, তা জানা ছিল না।

সুধারাম: বৌ হারায়নি, মারা গেছে। জানো তো, দেশে সরকারি চাকুরের চেয়ে পেনশনার বেশি? তেমনি মনে হয় জীবিত কাপলের চেয়ে বিপত্নীকের সংখ্যা বেশি। ভাগ্যিস তুমি বাণপ্রস্থে যাওনি। নইলে একা আমি সামলাতাম কী করে? আচ্ছা ভাদুড়ীদা, এই এত এত গন্ধমাদনের মধ্য থেকে আপনার সাজেশন অনুযায়ী একহাজার বাছি কী করে? প্রত্যেকেই তো সমান আগ্রহী আর জেনুইন!

ভাদুড়ী: ভেরি ইজি। লটারি। এছাড়া আর পথ নেই।

সুধারাম: এইজন্যই আপনি ভাদুড়ীদা! কী সহজ পথটাই না বাতলে দিলেন! আচ্ছা, কয়েকটা অ্যাপ্লিকেশান একটু আলাদা রকমের। খটোমটো-ও বলতে পারেন। আপনার বিবেচনার জন্য আলাদা করে রেখেছি। দেখবেন?

ভাদুড়ী: পড়ো, শুনি।

সুধারাম: এই যে একজনের চিঠি। নীলমণি মুখুজ্জে, ভরদ্বাজ গোত্র, সৌকালীন শাখা, তিনপুরুষের ভঙ্গ, দেবগণ, ধনুরাশি—

ভাদুড়ী: Stop. ইনি কি এটাকে ঘটকালির আখড়া ঠাউড়েছেন? রাবিশ!

সুধারাম: এরকম আরও অনেকেই আবোলতাবোল চিঠি দিয়েছেন। এই যেমন বারাসত হেলাবটতলা থেকে বিধানলাল পর্বত লিখেছেন, ‘আজ সাত বছর হয় বৌ মারা যাওয়ার পর থেকে মেলায় মেলায় ঘুরে বেড়াই, বিহারের হরিহরছত্রের মেলা থেকে বগুড়ার জামাই আদরের মেলা। আজ-ই পাথরচাপরির মেলায় তেলেভাজা খেতে খেতে ঠোঙায় আপনাদের বিজ্ঞাপন দেখে লিখছি।’

বাণপ্রস্থ: পাগলাগারদ থেকে যেটা এসেছে, সেটা হাতের কাছে নেই সুধারাম?

সুধারাম: পাগলাগারদ না হে, পাগলাচণ্ডী, নদে জেলার, থানা কালীগঞ্জ। ওখানকার জগাই সামন্ত লিখেছেন, বৌ মরোমরো, শিগগিরই মরবার আশা আছে, আগাম অ্যাপ্লাই করা চলবে?

ভাদুড়ী: বৌ মরবার আশা! মরবার আশঙ্কাকে আশা বলছে, রাবিশ!

সুধারাম: বেগুসরাই থেকে নীলমণি দুয়ারী লিখছেন, যদি সভ্য হন, শ্যালিকাকে নিয়ে সভায় আসতে পারবেন কি না।

ভাদুড়ী: এ তো দেখছি মহা জ্বালা! লিখে দাও, একটাকে ছাড়ুন, হয় শ্যালিকা, নয় সভা।

সুধারাম: এরপর খুলনার।

ভাদুড়ী: খুলনা! সেখানে বিজ্ঞাপন দিল কে?

সুধারাম: আরে গত একমাসে বিজ্ঞাপনের ঢেউ কোথা থেকে কোথায় যে গেছে আর যায়নি, আশ্চর্য! একজন কাগজ পড়ে আরেকজনকে মোবাইলে জানায়, বেড়াতে এসে কাগজে পড়ে, এইভাবে আর কী। শুনুন। রতিকান্ত সমাদ্দার, খুলনায় তার বারো বিঘে চাষের জমি, পিকচার প্যালেসের কাছে বসতবাড়ি, পেনশনের যাবতীয় টাকা তিনি তার প্রয়াত স্ত্রীর নামে দান করতে চান।

ভাদুড়ী: খুলনার জমি, বাড়ি, এসব নিয়ে আমরা কী করব? সুধা, তুমি বরং লিখে দাও, ‘Organise one pretty good Widowers’ Club in Khulna. Wish you every success.’

(কলিং বেল বাজে। চাকর এসে দরজা খুলে দেয়। তরুণ এক আগন্তুক, কেতাদুরস্ত পোশাক, ঘরে ঢোকেন)।

সুধারাম: কী চাই?

আগন্তুক: আজ্ঞে এটা কি চারশো উনিশের এ, ভূতনাথ পতিতুণ্ড লেন, কলকাতা সাত লক্ষ—

সুধারাম: হ্যাঁ। কিন্তু আমরা তো সরাসরি যোগাযোগ করতে না করে দিয়েছিলাম আমাদের বিজ্ঞাপনে?

আগন্তুক: আমি অ্যাপ্লিক্যান্ট নই। আমি একজন ঘটক। (পকেট থেকে ভিজিটিং কার্ড বের করে ভাদুড়ীর হাতে দেন)।

ভাদুড়ী: কতদিন ঘটক দেখি না, কতদিন! দাঁড়িয়ে কেন? বসুন। (আগন্তুক চেয়ারে বসেন। ভাদুড়ী ভিজিটিং কার্ড পড়তে থাকেন। Rebatiraman Roy. B.A. B.Com. All lndia Marriage Negotiating Centre, Ghughudanga. কার্ডের পেছনে ক্যাপিটাল হরফে লেখা, MANCHINILLU.

বাঃ! বাঃ! কিন্তু এটা তো আসলে বিপত্নীকসঙ্ঘ সদস্যগ্রহণ কেন্দ্র। বিয়েটিয়ে দেবার অ্যাজেন্ডা যে নেই আমাদের! আর এই যে কার্ডের উল্টোদিকে মাঞ্চিনিল্লু না কী লেখা, এর মানে?

রেবতী: তা জেনেই এসেছি। এলাম, যদি দু-চারটে আ্যড্রেসট্যাড্রেস দেন। সবাই তো আর বিপত্নীকে স্টিক করে থাকবেন না আজীবন। তাই—

বাণপ্রস্থ: কে স্টিক করে থাকবে বা না থাকবে, তা আগাম কী করে বুঝব? আমরা কি আ্যস্ট্রোনমার?

ভাদুড়ী: আঃ! ওটা হবে আ্যস্ট্রোলজার। শুনুন, এসব আমাদের আদর্শের বাইরে। তা কত বছর ধরে আছেন এ পেশায়? এখন তো সব সেল্ফ চয়েস, তার ওপরে লিভ ইন। তাছাড়া গে, গ্রুপ ইয়ে, সোয়াপিং ক্লাবটাব। লেসবিয়ানরাও তো আপনাদের ওপর ডিপেন্ডেন্ট নন। বিয়ের দু’মাসের মাথায় ডিভোর্স স্যুট ফাইল! এখন কি আর এ পেশায় পোষায় কারও? ঘটকালি পেশাটা কি অক্কা পাবার পথে চলে যায়নি? অহিনকুল আসছে না কেন?

রেবতী: বলেছেন ঠিক। তবে কথায় কথায় ডিভোর্স এসে কিন্তু আমাদের সুবিধেই করে দিয়েছে। তাছাড়া আমি সবসময় চ্যালেঞ্জে বিশ্বাসী। এমনিতে আকাট মুখ্যু নই, কার্ড দেখেই ঠাহর পাচ্ছেন। এ ছাড়া আরও কোয়ালিফিকেশন শুনবেন আমার? লাইব্রেরিয়ানশিপ পাশ করেছি। আরও শুনুন। যদ্দুর জানি, সারা দক্ষিণ এশিয়ায় আমি-ই একমাত্র ঘটক, যে আপনাকে তেলুগু ভাষায় ডিপ্লোমা সার্টিফিকেট দেখাতে পারবে।

বাণপ্রস্থ: তেলেগু! বাপ রে!

রেবতী: তেলেগু নয়, তে, লু, গু, বুঝলেন? মানে মধু, Honey.

সুধারাম: তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু ঘটকালির সঙ্গে লাইব্রেরিয়ানশিপ, তেলুগু ভাষা শেখার সম্বন্ধটা কী? কোথায়?

রেবতী: আছে, আছে (মৃদু হাসি)। এসবের সম্পর্কটা ক্রমশ প্রকাশ্য। মাঞ্চিনিল্লু! (সবাই অবাক হয়ে রেবতীর দিকে তাকান)। স্যরি, এক গ্লাস জল পেতে পারি? (সুধারাম বাটুলকে ডেকে ইঙ্গিত করেন। বাটুল জল নিয়ে আসে, রেবতীর হাতে দেয়। রেবতী একচুমুকে জলটা খেয়ে নেন।) ক্রমশ প্রকাশ্য। কই, ঠিকানা দিন।

ভাদুড়ী: তা আপনি কি বিপত্নীকদের-ও বিয়ে দেন? দিয়েছেন কখনও?

রেবতী: দিই মানে? আমি রেবতীরমণ রায়, আর.আর.আর., মানে আর কিউব। জেনে রাখুন, I simply expertise in widower’s remarriage. এই তো সেদিন, বেথুয়াডহরির ভোজরাজবাবুর ভায়রা অম্বিকানাথ এসে ধরলেন, ভোজরাজ নাকি সদ্যপ্রয়াত স্ত্রীর শোকে দিনে তিনবার হয় বাথরুম থেকে পড়ে আছাড় খেয়ে মুচ্ছো যাচ্ছে, আর নয়তো ভুল করে পাজামায় দুহাত গলাচ্ছে। ইন ফ্যাক্ট বিপত্নীকদের শোকটা একটু বেশি-ই হয়। সহসা ভারশূন্যতা টের পান তো, ঠিক যেমন চাঁদে গেলে হয়।

বাণপ্রস্থ: তা করে দিলেন ব্যবস্থা? ভোজরাজবাবুর বয়স? বেথুয়াডহরিতেও কি পুবদিকে সূর্যোদয় হয়?

রেবতী: সূর্য কোনওদিন-ই উদিত হয় না, কোটি কোটি বছর ধরে উঠেই আছে। দেব না? বলি ভোজরাজ তো ভোজরাজ, আমার পর্যন্ত এ শোক সহ্য হচ্ছিল না! বয়স? (বাণপ্রস্থের দিকে তাকিয়ে) হ্যাঁ, তা ঠিক আপনার-ই বয়সি, চৌষট্টি প্লাস।

বাণপ্রস্থ: এ বাবা! আপনি কি দেবাদিদেব? একেবারে ঠিকঠাক বলে দিলেন আমার বয়স! বাবা মহাদেব মাঈ কী, জয়… (রেবতীকে প্রণাম করতে যান)।

রেবতী: আহা হা, করেন কী? মহাদেব কি মাঈ হয়? বাবা হবে না?

ভাদুড়ী: এত বাগড়া না দিয়ে শুনুন বাণপ্রস্থবাবু। একটু ধৈর্য ধরে বসুন দিকি। তার পর? অহিনকুলের যে কী হল! ও তো মোবাইল-ও ইউজ করে না! (কলিং বেল বাজে)। এই এলেন। (বাটুল দরজা খুলে দেয়। দীর্ঘদেহী এক ভদ্রলোক প্রবেশ করেন)। আসুন, আসুন। এত দেরি— আগে আলাপ করিয়ে দিই। ইনি অহিনকুলবাবু, দেশের নানা কোর্টে জজিয়তি করতেন। দীর্ঘদিন বিপত্নীক। আপনাকে যেজন্য ডাকা—

অহিনকুল: প্রথমেই দেরি হওয়ার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। ড্রাইভারের হঠাৎ বুকে পেইন। তাকে ডাক্তার দেখিয়ে, ওষুধ কিনতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল। বলো, কীসের সাসপেন্স রঙ্গনাথ?

ভাদুড়ী: অহি, আমরা একটা অর্গানাইজেশন গড়ছি, বিপত্নীকসঙ্ঘ। তোমাকে অনারারি জাস্টিস হতে হবে। এসবের আইনগত দিকগুলো—

অহি: মাফ করো আমায়। এসবের মধ্যে থাকতে পারব না।

ভাদুড়ী: কেন? আমি তো এদের অ্যাসিওর করেছি!

অহি: মনে হয় কি জানো? জীবন এক নিমন্ত্রণবাড়ি। খেতে বসেছি। চাটনি পরিবেশন হয়ে গেছে। এখন বাকি কেবল দৈ-মিষ্টি। ইদানীং তো আবার গোলাপজামুন আর আইসক্রীম। ঘাড়ের ওপর নিশ্বাস ফেলছে পরবর্তী নিমন্ত্রিতের দল। তাদের জন্য জায়গা ছেড়ে দেবার সময় এখন। আমাকে মাফ করো।

ভাদুড়ী: এমন করে যখন বলছ— হ্যাঁ, বলুন, বেথুয়াডহরি।

রেবতী: দাঁড়ান, আমি আগে ওনাকে একটু ছুঁয়ে দেখি। না, স্পর্শ করা লাগবে না। মাঝে মাঝে মানুষ, হ্যাঁ, এই কলিযুগেও দেখা দেন বটে। বেথুয়ার ক্লায়েন্ট অলমোস্ট রেডি-ই ছিল। কুলপির ভবেশ আঢ্যির বড়মেয়ে মায়া, মায়াতরু।

অহি: একটু ডিসটার্ব করছি। আমাকে উঠতে হবে, দুপুরে আমার ওখানে জনা তিরিশ মানুষ লাঞ্চ করে, থাকতে হয় আমাকে।

সুধারাম: সে কী! এখনি উঠবেন? একটু মিষ্টিমুখ—

অহি: আজ না। তোলা রইল। সকলকে নমস্কার। (অহিনকুল বিদায় নেন)।

রেবতী: মায়ার পালিয়ে বিয়ে, দেগঙ্গার সদাশিবের সঙ্গে। কাণ্ডখানা ভাবুন। সদাশিব আটান্ন।

সুধারাম: আর কুলপির? স্যরি, মায়ার?

রেবতী: সতেরো। সবে মাধ্যমিকে ফেল করেছে। আইনে আটকাচ্ছে। তাই ছ’মাস পরে সদাশিব-ই স্টেশনে এনে ফিরিয়ে দিয়ে গেল। মায়ার কথা শুনে তো লাফ দেয় ভোজরাজ, আর বলে, আজ-ই বিয়ে চাই। কিন্তু একে তো আঠারো বছর হতে চারমাস বাকি, আইনে আটকাচ্ছে, তায় অনুশোচনার জন্যও তো কিছুটা সময় দেওয়া উচিত, তাই না? আমার তো আরও একটা বিবেচনা মাথায় রাখতে হয়, রিস্ক ফ্যাক্টর। মেয়ে বলে কথা। ছ’মাস ওরা একসঙ্গে ছিল সেটা তো তুচ্ছ করার মতো সময় নয়।

ভাদুড়ী: হয়ে গেল বিয়ে? আঠারোতে-চৌষট্টিতে? মেয়ের বাবা কি পাষাণ, না ভবঘুরে?

রেবতী: এ দুটোর কোনওটাই না। কথায় বলে না, আটুরে নিয়মো নাস্তি? মেয়ে পালিয়ে গেছে বলে একেই তো পাড়ায় টিকতে পারছিলেন না, তার ওপর মেয়ে ফিরে আসতে আরেক গেরো। দিনরাত তাকে নিয়ে প্রশ্ন, কোথায় ছিল, কীভাবে ফিরে এল, স্বেচ্ছায়, নাকি— এসব থেকে তো মুক্তি। পাবলিকের কৌতূহল জানেন না? তার ওপর ভোজরাজের জুয়েলারির কারবার শুনে মায়া নিজের আর ভোজের, দু’জনের বয়স-ই বেমালুম ভুলে গেছিল বলে একটা বড় সুবিধে হয়েছিল অবিশ্যি। সদাশিব তো মায়ার স্কুলের সামনে ঝালমুড়ি বেচত।

বাণপ্রস্থ: আঠারো দুনি ছত্রিশ, যোগ আঠাশ, এই পেলাম চৌষট্টি। এর থেকে কম ফারাক পাননি?

রেবতী: পেতুম, কিন্তু সময়াভাব। ওতে তো ক্ষতি হয়নি। দিব্যি মেয়ে হয়েছে বছর না গড়াতেই। প্রত্যেক ম্যারেজ অ্যানিভার্সারিতে গিফ্ট নিয়ে যাই। আফটার অল, আমার ফার্স্ট ক্লায়েন্ট। ওর মা বলে রেখেছে আমাকে, আঠারোর পর একদিন-ও ঘরে রাখবে না মেয়েকে, যা দিনকাল!

রেবতী: ইস, আপনাদের দেরি করিয়ে দিচ্ছি। কই দিন। লাখ লাখ চাই না, বিশ-পঁচিশটা অ্যাড্রেস যদি পাই…

সুধারাম: বললাম না, এটা আমাদের কাছে unethical? আর কিছু বলার আছে আপনার?

রেবতী: আছে। আচ্ছা, আপনাদের, এই বিপত্নীকদের আর কী, গেট টুগেদার হচ্ছে, তাই না? আমি কি আমন্ত্রিত হতে পারি, অ্যাজম আ রিপোর্টার?

ভাদুড়ী: ও, আপনি তা হলে সাংবাদিকতাও করেন? আপনি কি বিপত্নীক?

রেবতী: ছি ছি ছি, বিয়েই করিনি মশাই। এই সবে আঠাশ চলছে। সাংবাদিকদের ডাকছেন?

ভাদুড়ী: ডাকছি। তবে প্রেসকে বলে দেওয়া থাকবে, তারা যেন প্রেফারেবলি বিপত্নীক সাংবাদিক আর ফটোগ্রাফার পাঠান।

রেবতী: তবে তো সেখানে যোগ দেবার যোগ্যতায় কুলোচ্ছে না আমাকে। যদিও আমি অফ দি বিপত্নীক, বাই দি বিপত্নীক, ফর দি বিপত্নীক। আজীবন। আপনি, আপনারা, যার যার মতো করে যান। আমি আপনাদের ডিমোরালাইজড হতে বলছি না। আর আমিও, ওই আর.আর.আর. let me go ahead. সামনে জরুরি সমস্যা, বাণীকণ্ঠবাবুর তিন মেয়েকে নিয়ে, তবে তাতে সেল্ফ কনফিডেন্স নষ্ট হতে দিচ্ছি না। তাই এখানে আসা।

ভাদুড়ী: দাঁড়ান। বাণীকণ্ঠবাবুর কেস, মানে? জানতে পারি?

রেবতী: পারেন। পেনশনের টাকায় সংসার চলে। লেট ম্যারেজ, তারই বাড়িতে তিন অবিবাহিতা মেয়ে। ডাইনে আনতে বাঁয়ে কুলোয় না।

বাণপ্রস্থ: তাদের জন্য পাত্রের খোঁজে এসেছেন এখানে? মরুভূমিতে ধানচাষ করতে? হাঃহাঃহাঃ।

রেবতী: পাত্র পাত্র করবেন না, প্লিজ। ভয়ানক ক্লিশে শোনায়। ক্লায়েন্ট।

ভাদুড়ী: আচ্ছা ক্লায়েন্ট। পাত্র, স্যরি ক্লায়েন্ট জোগাড় করার কোনও সময় নির্ধারিত আছে?

রেবতী: তা নেই। তবে শুভস্য শীঘ্রম্। যেমন নিমতিতের ঘটনা। এলাম, দেখলাম, জয় করলাম।

ভাদুড়ী: আপনি তো দেখছি দিগ্বিজয়ী আলেক— না, জুলিয়াস সিজার মশাই। বলুন দেখি নিমতিতে। সুধা, কফি বলো।

রেবতী: বলব কী, আমি যে আমি, নিজেই তাজ্জব বনে গেছি। নিমতিতায় তিন ভাই, তাদের মধ্যে আবার দু’জন যমজ। বয়স ৫৬, ৫৬, ৫৮। জ্যোতিষের কতায় বিয়ে না করে বসে আছে। জ্যোতিষের গণনা, এক-ই বাড়ির তিন বোনের সঙ্গে বিয়ে না হলে শনি, রাহু, কেতু তিন ভাইকেই কুপোকাত করবে। আমাকে খবরটা এনে দেন আমার তেলুগু শিক্ষক, উনি ওদের একমাত্র বোনকে বিয়ে করেছিলেন। ওড়িবি বাপিরাজু।

বাণপ্রস্থ: বাঙালি মেয়ের তেলুগু বর? বিশ্বরেকর্ড!

রেবতী: ওই জ্যোতিষীর-ই গণনায় তা লেখা ছিল যে!

সুধারাম: মেয়েদের বয়স?

রেবতী: তা ডাগর বয়সি, সতেরো, উনিশ আর বিশ।

বাণপ্রস্থ: ওরে বাআ? এ যে দেখছি আরেক অসবর্ণ বিয়ে!

রেবতী: জাস্ট জ্যোতিষীর বচনকে অনার করা। তিন ভাইয়ের মধ্যে অন্তত একজনকে যদি বিপত্নীক পেতাম— খুব ভাল হত তা হলে, জানেন?

ভাদুড়ী: আপনার বিপত্নীকদের প্রতি অনুরাগের হেতু? বাল্যবয়স থেকেই কি এই প্রবণতা?

রেবতী: আমি রেবতীরমণ রায়, আর.আর.আর. ট্রিপল আর, ঠিক আছে? কারণ ছাড়া কাজ করি না। বিপত্নীকদের শোকটা আমাদের কাছে একটা প্লাস পয়েন্ট। মাতালের মতো উদার মন তাদের, আর মহাপুরুষের মতো দরাজ দিল তাদের। তাই তাদের বিয়ে দেওয়ালে ট্রানজাকশনটা ভাল হয়। আমি তো ডাবল নিই, ফ্রেশ ক্লায়েন্টদের চেয়ে। And even more.

ভাদুড়ী: আমাদের কিন্তু এখন সত্যি সত্যি-ই দেরি হয়ে যাচ্ছে।

রেবতী: তবে অনুমতি দিন, উঠি। দু-একটা অ্যাড্রেস পেলে খুশি হতাম। তবে আমি আপনাদের ডিমোরালাইজড হতে বলছি না। আচ্ছা, you go on your own way, and let me dig my own. আর কেউ বিয়ে করতে চাইলে তো আর আপনাদের মরালিটি দিয়ে তাদের বাধা দিতেও পারছেন না, তাই না? চলি। আশা করি আবার দেখা হবে। নমস্কার। (উঠে বিদায় নেন)।

ভাদুড়ী: কী বুঝলে? এ তো রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে গেল হে! বিপত্নীক ভাঙাবে! না, আর দেরি নয়। আমাদের-ও উঠে পড়ে লাগতে হবে। একমাসের মধ্যেই বিপত্নীকদের প্রথম সভা হবে, l announce! (বাণপ্রস্থ এবং সুধারাম দু’হাতে ভাদুড়ীর দু’হাত মাথার ওপরে তুলে ধরেন। পরে তিনজন-ই বলে ওঠেন, We announce! বাণপ্রস্থ ভাদুড়ীর পদধূলি নেন। পর্দা নামে)।

 

।। তৃতীয় দৃশ্য।।

 

(হলঘরের স্টেজ। পেছনে ব্যানার, ‘বিপত্নীক সঙ্ঘের প্রথম বার্ষিক সাধারণ অধিবেশন। ২২শে মে, ২০২২ রবিবার।’ মঞ্চে ভাদুড়ীকে নিয়ে সুধারাম এবং বাণপ্রস্থ ঢোকেন। একে একে দর্শকের প্রবেশ)।

সুধারাম: দেখলেন তো ভাদুড়ীদা, বিপত্নীকদের গেট টুগেদারটা সাকসেসফুল তো করেই ছাড়লাম? আজ বড় খুশির দিন।

ভাদুড়ী: এখনি সাকসেস সাকসেস বোলো না। অনুষ্ঠানটা শেষ হতে দাও। দেখলে না, এগজিবিশান নিয়ে কী কাণ্ডটাই না ঘটল? রাবিশ! তা দেবপ্রিয়বাবুর খবর কী? কদ্দূর এসে পৌঁছলেন?

বাণপ্রস্থ: মাঝপথে। হ্যাঁ, তা অবিশ্যি দুঃখনাশক।

সুধারাম: নাশক, না দুঃখদায়ক? ছ্যা ছ্যা, সদ্য বিপত্নীক যারা, এই এক বছরের মধ্যে বৌ মরেছে, সেই বৌদের ছবি দেয়ালে টাঙানো। গলায় মালা, দেবপ্রিয়বাবু নিজে পছন্দ করে হাওড়ার ফ্লাওয়ার মার্কেট থেকে কিনে এনেছেন। ফিতে কাটতে দেওয়া হল ত্রিভুবনবাবুকে, সদ্য বউয়ের ঘাটকাজ সেরে এসেছেন, সেই অনারে। তা তিনি এমন আদিখ্যেতা করবেন, তা কে জানত?

বাণপ্রস্থ: আদিখ্যেতা কি একটুআধটু? ফিতে কেটে একের পর এক বিপত্নীকের ছবি দেখেন আর বলেন—

সুধারাম: বিপত্নীক নয় হে, তাদের বৌদের ছবি। তাদের সবার ছবি দেখেন আর বলেন, এরা সবাই নাকি তার-ই বৌ ছিল। বুঝুন! পরে অবিশ্যি জানা গেল, লোকটা জাতিস্মর। দুত্তোর, বাদ দিন ওসব মাইনর ফ্যাচাং।

ভাদুড়ী: মাইনর বলছ কী হে? ব্রহ্মাণুবাবুর কথাটা ভাবো দিকিন। নিজের স্ত্রীর ছবির দিকে একবারটি তাকানো নেই, কিন্তু নির্নিমেষে ভবসিন্ধুবাবুর স্ত্রীর ছবির দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে। যেন জীবনে মরা মেয়েলোক দেখেনি!

বাণপ্রস্থ: কারা সব বলাবলি করছিল, কুজ্ঝটিকা, ওই ভববাবুর স্ত্রী, নাকি ব্রহ্মাণুর প্রেমিকা ছিলেন।

ভাদুড়ী: ছিল তো ছিল, কবেই সেসব চুকেবুকে গেছে। যার সঙ্গে চিরকাল ঘর করলি, তার দিকে একবার চেয়ে দ্যাখ! সুধা! দেবব্রতবাবু ছাড়া তো অনুষ্ঠান শুরুই করা যাচ্ছে না! আফটার অল, তিনিই তো আজ আমাদের বিপত্নীক অফ দি ইয়ার!

সুধারাম: এই তো এসে গেছেন। প্রচুর পরমায়ু আপনার। আসুন, বসুন এখানে। ভলান্টিয়ার, চা এনে দাও। (দেবপ্রিয় চেয়ারে বসেন। মাইক নিয়ে সুধারাম) বন্ধুগণ! সমবেত সুধী বিপত্নীকবৃন্দ! আমরা এই মুহূর্তে এক ঐতিহাসিক ঘটনার দোরগোড়ায়। পৃথিবীতে সর্বপ্রথম কেবল বিপত্নীকদের জন্য সম্মেলন। সমবেত মান্য বিপত্নীকবৃন্দ! প্রথমেই মঞ্চে উপবিষ্ট, আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, এবছরের শ্রেষ্ঠ বিপত্নীক, বিপত্নীক অফ দি ইয়ার আর কী, ঈশ্বর, না না, শ্রীযুক্ত দেবপ্রিয় মহলানবিশ। আপনারা জানলে খুশি হবেন, আজ সাড়ে আটান্ন বছর ধরে তিনি নিখোঁজ, স্যরি, বিপত্নীক। স্ত্রীর স্মৃতি বুকে নিয়ে এতকাল বেঁচে আছেন, আসুন এজন্য তাঁর জন্য জোরে আমরা  সবাই একবার হাততালি দিই (চারদিক থেকে হাততালির আওয়াজ আসে)। ধন্যবাদ। এখন প্রথমেই আমাদের সবার প্রিয় স্ত্রীদের আত্মার সদ্গতির জন্য একমিনিট নীরবতা পালন করা হবে। তারপর হবে নবীন বিপত্নীক বরণ। এবছর যারা নিজ নিজ অর্ধাঙ্গিনী হারিয়েছেন, কেবল তাদের-ই আমরা একটি শুকনো ঘেঁটুফুল দিয়ে বরণ করে নেব। দেবপ্রিয়বাবুর হাত দিয়ে সবাই ফুল নেবেন। তারপর উদ্বোধনী সঙ্গীত, পরিবেশনায় গীতিকার-সুরকার আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় জটাধারী মালাকার মহাশয় (পুনরায় হাততালি। এরপর দর্শক একমিনিট নীরবতা পালন করেন। পরে একে একে লাইন দিয়ে মঞ্চে উঠে দেবপ্রিয়বাবুর হাত থেকে ফুল নেন। হারমোনিয়াম নিয়ে সঙ্গীত পরিবেশনের  উদ্যোগ জটাধারীর)।

জটাধারী: নমস্কার। এখানে আজ গান গাইবার আমন্ত্রণ পেয়ে আমি আনন্দিত ও আপ্লুত। আমার প্রয়াত স্ত্রী ভ্রমরাননাকে নিয়ে আমি মোট সতেরোটা গান লিখেছি। সবগুলোই একে একে গেয়ে শোনাব। ধৈর্য ধরে শুনুন। (হারমোনিয়ামে স্কেল দেখে নিতে থাকেন)।

ভাদুড়ী: কী বললে? সতেরোটা গান গাইবে? ব্যাটাকে মঞ্চে ওঠার পারমিশান দিলে কে সুধা?

সুধারাম: তা তো জানি না। তবে মাইকভাড়া, রিফ্রেশমেন্টের জন্য যাবতীয় টাকা উনি স্বেচ্ছায় ডোনেট করেছেন।

ভাদুড়ী: তাই বলে সতেরোটা গান! মামদোবাজি পেয়েছে? বৌ মরলে এভাবে কাণ্ডজ্ঞান লোপ পায়? একটা গান শেষ হতেই— এই যে, ভলান্টিয়ার, চ্যাংদোলা করে নামিয়ে আনবে ওকে, ঠিক আছে?

ভলান্টিয়ার: ঠিক আছে স্যার। আর যদি হেঁটে হেঁটে নামতে চায়? তা হলেও কি চ্যাংদোলা?

ভাদুড়ী: এ যা চিজ একখানা, মনে করেছ চ্যাংদোলা করে না নামালে মঞ্চ ছাড়বে? দেখাচ্ছি ওর রিফ্রেশমেন্ট।

(জটাধারী হারমোনিয়ামে স্কেল ঠিক করে গাইতে শুরু করেন)।

জটাধারী: প্রথমেই আমি যে গানটি দিয়ে শুরু করব, সেটা ভ্রমরাননা মলিম্লুচ রাগে। ‘আমরা করব জয়/ এই পত্নীবিয়োগব্যথা যন্ত্রণা সমুচ্চয়, আমরা… (We shall overcome-এর সুরে)।

ভাদুড়ী: বেটাচ্ছেলে আর সুর পেলে না? এমন লোকের তো বৌ মারা যাওয়াই উচিত নয়। বরের চুরি ঠেকাতে বেঁচে থাকা দরকার ছিল। পরের বার থেকে, বুঝলে সুধা, কাউকে মঞ্চে ওঠানোর আগে আমাদের পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভাল করে স্ক্রুটিনি করে নিতে হবে।

ভলান্টিয়ার: তা হলে কি গান শেষ করার আগেই আস্তে  চ্যাংদোলা করে নামিয়ে আনব স্যার?

ভাদুড়ী: না না, গানটা শেষ হতে দাও, তারপর। দেখছ না, পাবলিক তো আবার দাঁড়িয়ে উঠে নাচছে, শিস দিচ্ছে, এনকোর জানাচ্ছে। এরা বিপত্নীক! ছিঃ!

(মঞ্চের পাশে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান। সেখানে সাত-আটজন বসে চা-পানরত, আর পরস্পরের সঙ্গে আলাপে মগ্ন)।

রতিকান্ত: আমি যত দেখতিছি, ততই অবা-আক হইয়ে যাইতিছি। এরেই কয় কইলকেতা। কইলকেতা নামেও কইলকেতা, কামেও কইলকেতা। বৌ থাকলিও এহেনে মজা, না থাকলি তো মজার বারোবচ্ছর! এক্কেরে টরেট্টর মজাহান! (ঘটক রেবতী ঢুকে চেয়ারে বসেন)।

রেবতী: আপনি কোত্থেকে? কী নাম আপনার, জানতে পারি?

রতিকান্ত: আজ্ঞে আমার নাম রতিকান্ত কারফর্মা। বাড়ি খুলনে টাউনি। এহেনে এইসে আশ মিটোয়ে লেডিস টয়লেট দেখলাম। আইজ তো মহিলা নাই হলে।

রেবতী: নিছক লেডিস টয়লেট দেখতেই কি কলকাতায় আসা? তাজ্জব!

রতিকান্ত: তা কেন? আমি তো এসেছি এহানের মতন কইরে খুলনেয় সঙ্ঘ গড়বার জন্যি দেহেবুঝে যেতি। উল্লাসিনী হলে কতবার চেষ্টা করিছি, সাধ পূর্ণ হয় নেই। কাইল গেলাম পগেয়াপট্টি আর প্রেমচাঁদ বড়ালি। আশ মিটোয়ে এলাম।

রেবতী: থামেন। বিয়ে করার ইচ্ছে হয়? সত্যি বলবেন।

রতিকান্ত: বিয়ে— ইয়ে, ইচ্ছে না হয় এমন না। এহেনে এইসে মনডা ফাঁকা ফাঁকা লাগতিসে, বেবাক সইত্য। কইলকেতার মেয়ে ওই প্রেমচান্দে আর নিউ মার্কেটে— য্যান এক একহান ম্যানকা, শূর্পনখা, আমাগো পরীমণি। কইলকেতা নামেও কইলকেতা—

রেবতী: আরে বিয়ে করবেন কি না বলুন। নামেও কইলকেতা, ফালতু বাত ছাড়ুন।

রতিকান্ত: তা করলি মোন্দো হয় না। রাখহরির মায়ের আত্মাডা তয় একটু শান্তি পায়। আইজ দুই বচ্ছর ধইরে ঘুমের মধ্যি দেহা দেয় আর মারে শাদি করতি কয়। মন তার ঝটপটাতিছে, সহ্যি হয় না। সবে তো কলির সইন্ধে! আরও কত কী যে দ্যাখবানে!

রেবতী: (জনান্তিকে) আরে, এ লোক তো কেবল ট্র্যাক থেকে ছিটকে যায়, খালি লাইন চেঞ্জ করে। বিয়ে দিয়ে নতুন কোনও ফ্যাসাদে পড়ব না তো! (প্রকাশ্যে) বাইরে আসুন। কথা বলব, ছবি আছে ডজন বিশেক, দেখাব। পছন্দ হলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব—

রতিকান্ত: চলেন। সবে তো কলির সইন্ধে— আইচ্ছা, অযোধ্যায় গেলি আইজ রাত্তিরির মধ্যি ফিরে আসা যাবে?

রেবতী: হোপলেস! তবু চেষ্টা তো করতেই হবে। হোপ এগেইনসট হোপ। আসুন (দু’জনে বাইরে বেরিয়ে যায়)।

জনৈক: বলুন, আপনার কথা শোনা যাক। আমি শঙ্কু সরখেল, এই মাস সাতেক আগে। আপনি? বড্ড দুঃখী দুঃখী লাগছে আপনাকে। বাড়ি কোথায়? কদ্দিন?

মধুদাস: আর বলবেন না মশাই। আমার নাম মধুদাস কাহালি। একেবারে সন্যেসি-ই হয়ে গেছি আমার বুলা, আমার আটুবুলার মৃত্যুতে।

জনৈক: আটু— কী বললেন?

মধুদাস: আটুবুলা। আমি ওকে ওই নামেই ডাকতাম। আমার  আদরে গলে গলে গলে গলে ও আটখানা হয়ে যেত কিনা, তাই। তা এখন সে আটুবুলাও নেই, আর তাই এই সেই সাবেক মধুদাস-ও নেই। এখন আছে খালি একটা কঙ্কাল, দীর্ঘনিশ্বাস, বুকের হাহাকার, আর আছে দিনরাত্তির অমানিশা।

জনৈক: অমানিশা তো আমাদের-ও। তবু দিন কাটে কী করে? মন্ত্রতন্ত্র, জুয়াখেলা, আশ্রম, খেলাধুলা—

মধুদাস: না, ওসব কিচ্ছু না। বললাম না, জীবনটাই মরুভূমি এখন? অমানিশা নিজের হাতে খাইয়ে দিলে আহার জোটে, সকালে আমার বিছানা ছেড়ে চটপট উঠে চা করে আনলে খাই, বললাম তো, ডেজার্ট, ডেজার্ট! তার ওপর ও যদি রাতে আমার হাতের ওপর মাথাটি না রেখে শুত, কী যে হত ভাবতে পারেন?

জনৈক: এতক্ষণে বুঝলাম। হিপোক্রিট দ্য গ্রেট! তা অমানিশাটি কে? ওই বুলার বোনটোন—

মধুদাস: আটু আর অমা টুইন, টুইন।

জনৈক: বুঝেছি, টু ইন ওয়ান।

মধুদাস: অমানিশা তো বলে, সাউথ সিটি মল থেকে পারফিউম কিনতে কিনতে বলে, ঘুমোবার সময় ক্যামোমাইল স্প্রে করতে করতে বলে, মনে করো না টুলুদা, আমিই তোমার সেই বুলাদি?

জনৈক: তা টুলুদাটা আবার কে? সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে আমার!

মধুদাস: অমা আমাকে বরাবর টুলুদা ডাকে। নাম নিতে লজ্জা পায় কি না, তাই। এত্ত লজ্জা, আটুবুলা থাকতেও আমাদের বাড়ি এলে একা শুতে পারত না। আমার একপাশে আটু, আর অন্যপাশে অমা, ওর লজ্জা ভাঙানোর জন্য।

জনৈক: সার্থক টুইন ওগো, জন্মেছে এই দেশে! ভয় আর লজ্জার সমীকরণ! এ-ও তো টু ইন ওয়ান! তা অমা যখন তাকেই বুলা মনে করতে বলে, মনে করলেই পারেন?

মধুদাস: তা কি হয় কখনও? স্বজন কি আর হয় দু’জন? ওর মুখে অমন শুনে ওর বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলি, তা হয় না তপুসোনা, তা হয় না! স্যরি, একটু পার্সোনাল হয়ে গেল। অমাকে ওর লজ্জিত সময়গুলোতে আমি তপু ডাকি। ত্রপা থেকে তপু, বুঝলেন?

জনৈক: গ্রেট! গ্র্যান্ড! আইডিয়াল! অ্যান্ড সর্বোপরি ক্লাসিক।

(রেবতী ফিরে আসে। জনৈককে) আপনার পরিচয়টা জানতে পারি? কবে হলেন?

জনৈক: আজ্ঞে আমার নাম ভবভূতি, আমরা বংশানুক্রমে বিপত্নীক। আমার বাবা বিপত্নীক, আমি বিপত্নীক, আমার ছেলে, না, এখনও বিপত্নীক হয়নি যদিও, তবে হবে হবে করছে। At least we hope so.

রেবতী: হবে হবে করছে? কেন, কী হয়েছে আপনার বৌমার। বংশানুক্রমে মাতাল শুনেছি, বংশানুক্রমে ডাকাত, সুদখোর, কৃপণ, এমনকী বংশানুক্রমে ঘরজামাই পর্যন্ত শোনা আছে, দেখাও আছে আমার। কিন্তু তাই বলে বংশানুক্রমে—

ভবভূতি: বিপত্নীক শোনেননি, তাই তো? তবে শুনে রাখুন, এই যে আমি, ছকু খানসামা লেনের ভবভূতি চাটুজ্জে, বিপত্নীক। আমার বাবা চমক খানসামা লেনের ত্রিষ্টুভ চাটুজ্জেও তাই। আর আমার ছেলে ত্রিবিক্রম, আগে আমার কাছেই থাকত, বিয়ে হয়ে ইস্তক শ্বশুরের দেওয়া নিমু খানসামা লেনের ফ্ল্যাটে আছে, না যদিও এখনও বিপত্নীক হয়নি, তবে খুব শিগগিরই হবে।

রেবতী: শিগগির হবে, এতটা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন কীভাবে?

ভবভূতি: বলছি, কারণ বৌমার আত্মহত্যার ইচ্ছে প্রবল…

রেবতী: আপনার পুত্রবধূর আত্মহত্যার ইচ্ছে কেন?

ভবভূতি: বৌমার দুঃখ অনেক। বিয়েতে হিরের গয়না চেয়েছিলাম, দেয়নি বাপ। ফ্রিজ চেয়েছিলাম দুটো, দিয়েছে একটামাত্র, আর তা-ও সাইজে মাঝারি, তিনশোর জায়গায় একশো ষাট। সেই দুঃখে কেবল আত্মহত্যা করতে চায়।

রেবতী: মালুম হচ্ছে এবার। বলুন, বলে যান।

ভবভূতি: আপনি কেন, অনেকেই বংশানুক্রমে বিপত্নীক কথাটি শোনেনি। এজন্য হিংসেও কি কম করে আমাদের? প্রয়োজনে পাড়ায় খোঁজ নিন।

রেবতী: না না, আপনি কি মিথ্যে বলবেন? বউমার প্রেডিকশনটা— এদ্দুর শিওর? মশাই কি কোনও রাজজ্যোতিষীটোতিষীর সন্ধান জানেন নাকি?

ভবভূতি: বললাম না, বংশানুক্রমিক! এখেনে জ্যোতিষী আসছে কোত্থেকে? ছেলে প্রায়-ই বৌ জয়ন্তীকে নিয়ে এসে আমার কাছে থাকে। তখনি চেষ্টা করি আর কী। আই মিন চেষ্টা করে। আরে! সরি আমি কি ফার্স্ট পার্সনে বলে ফেললাম কথাটা?

রেবতী: ও কিছু না। তা আপনার স্ত্রী-হত্যা, স্যরি, পত্নীবিয়োগের কাহিনিটা জানাবেন? না, বরং আপনার মহান পিতৃদেবের কথা দিয়েই শুরু হোক। ধারাবাহিকতাটা বজায় থাকবে তাতে।

(হন্তদন্ত হয়ে এক ব্যক্তির প্রবেশ। চারদিকে তাকান)।

আগন্তুক: আজ্ঞে, এখানে বিপত্নীকদের ফাংশানটা কোথায় হচ্ছে বলতে পারেন?

রেবতী: সে কী মশাই! এখন এলেন? অনুষ্ঠান তো বহুক্ষণ শুরু হয়ে গেছে। কী নাম? নিবাস? (ভদ্রলোক কার্ড বের কটে দেখান)। ও, আদিত্য ঘড়াই। বসুন।

আদিত্য: আসলে লালগোলাটা লেট করেই সব্বোনাশটা করলে।

রেবতী: লালগোলা! কোত্থেকে এসেছেন? শুনেছি এবার কলকাতার বাইরের কাউকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি?

আদিত্য: এখন জঙ্গীপুরে থাকি। কিন্তু আমার আসল বাড়ি তো কালীঘাটে, মহিম হালদার স্ট্রিটে। ফাংশানের জায়গাটা যদি—

রেবতী: আরে বসুন এখানে। এখন তো ভাঙা হাট। গিয়ে কী লাভ? নাটক চলছে, তা-ও আবার স্ত্রী-ভূমিকা বর্জিত। বরং এখানে বসে আড্ডা দিন, চা খান, তোফা সময় কাটবে।

আদিত্য: সে কী, স্ত্রী ভূমিকাবর্জিত নাটক? পাবলিক, ইয়ে, বিপত্নীকরা নিচ্ছেন?

রেবতী: নিচ্ছেন কি আর? নিতে বাধ্য হচ্ছেন। হ্যাঁ, ভবভূতিবাবু, আপনার বাবা!

ভবভূতি: পূজনীয় পিতৃদেব। (করজোড়ে প্রণাম)। বাবা খুব pious ছিলেন, জানেন তো? Very pious and absolutely honest and kind.

রেবতী: তাই? বংশানুক্রমিক বিপত্নীকদের ওটা লক্ষণ বোধ হয়। তা উনি বিপত্নীক হলেন কী করে? বিষপ্রয়োগে না কি—

ভবভূতি: আরে ওসব কিছুই না। আমি, বাবা, মা আর পুশকিনের মা, এই নিয়ে আমাদের সোনার সংসার। সোনার সংসার।

রেবতী: পুশকিনের মা? কে তিনি?

ভবভূতি: পুশকিনের মা ইজ পুশকিনের মা। কাজের লোক হিসেবে এসেছিল, নিজের গুণে পরিবারের সর্বেসর্বা হয়ে গেল।

রেবতী: কেবল কি নিজগুণে তা হওয়া যায়? আপনার বাবার গুণ-ও এর পেছনে ছিল। আসলে প্রকৃত গুণটা তার, এরকম মনে হচ্ছে আমার।

ভবভূতি: জানেন, রোজ রান্নার মেনু পর্যন্ত ঠিক হত পুশকিনের মায়ের কথায়। একবার মা ইলিশের সরষেবাটার বদলে দই ইলিশ করতে বললে বাবা মাকে কষে এমন এক চড়—

আদিত্য: ওঃ, পায়াস, অনেস্ট। জঙ্গীপুরে গঙ্গার ইলিশ কিন্তু সবচেয়ে ভাল হয় ভাপে খেলে। তাছাড়া—

রেবতী: আপনার টার্ন এলে বলবেন, কেমন? ভবভূতিবাবুর মহাকাব্যটা শেষ হোক, তারপর, কেমন? মা মরলেন কীসে? গলায় দড়ি?

ভবভূতি: কী যে বলেন! মুসৌরি বেড়াতে গিয়ে, লালটিব্বার কাছে পাহাড় থেকে পড়ে। আমার চোখের সামনে। সে কী হুজ্জুতি! উত্তরাখণ্ডের পুলিশ সামলাতে কাড়িকাড়ি টাকা। বাবা আগে জানলে কালিম্পং বা পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের সুইসাইড হিলে অনেক সস্তায় হয়ে যেত। ওখানে কেবল টাকার শ্রাদ্ধ, যেজন্য মায়ের শ্রাদ্ধটা নমো নমো করে সারতে হয়েছিল।

রেবতী: মহান আখ্যান! তারপর? পুশকিনের মা একচ্ছত্র সম্রাজ্ঞী, তাই না?

ভবভূতি: বাবা বলতেন, তুইও যে সেদিন আত্মহত্যা করিসনি, সেজন্য পুশকিনের মার কাচে কৃতজ্ঞ থাকবি। And l am ever loyal to my father.

কী বললেন, পুশকিনের মা? মা মারা যেতে বাবার কাছে ঘেঁষতে ভয়। একদিন বাবাকে বলতে শুনলাম, এদ্দিন যা হয়েছে হয়েছে। এখন যদি তার প্রেতাত্মা— এদিকে বাবা কী জানি কেন আমাদের ড্রাইভারের সঙ্গে তড়িঘড়ি তার বিয়ে দিয়ে দিলেন। পুশকিন তো হল আমার মায়ের মৃত্যুর পরে।

আদিত্য: পুশকিনের মার বিয়ে হয়ে গেল? পুশকিন তখন? পুশকিন কি আগের তরফের? আমাদের জঙ্গীপুরেও এরকম একটা—

ভবভূতি: পুশকিন হয় বিয়ের চারমাসের মাথায়। বর, আমাদের ড্রাইভার বংশী, উড়িষ্যার লোক, তাইতে খুব ঘাবড়ে যায়, বুঝলেন।

রেবতী: তা আর বুঝব না? বিয়ের চার মাসের মাথায় বাবা হলেন, আমি হলে কেবল ঘাবড়াতাম না, চিরস্থায়ী মূর্ছা যেতাম।

ভবভূতি: বিয়ের পর ওরা থাকত কাগপট্টিতে। ড্রাইভার পুশকিন-সহ তার মাকে আমাদের বাড়িতেই ফেরত দিয়ে গেল।

রেবতী: আর তার ড্রাইভারি? তা কোথায় গেল?

ভবভূতি: গাড়ি-ই চালায় না সে এর পর থেকে।

রেবতী: সে কী! ড্রাইভারোফোবিয়া?

ভবভূতি: কী জানি। একবার পিরের মাজারে গিয়ে বসে থাকে, ফের বাঁক নিয়ে তারকেশ্বর যায়।

আদিত্য: চেষ্টা, চেষ্টা, বুঝেছি আমি।

রেবতী: আর আপনার পিতৃদেব? বেঁচে আছেন?

ভবভূতি: না। বলছিলাম না, তিনি খুব pious ছিলেন? ড্রাইভার বৌকে দিয়ে যেতে বললেন, ‘এখন আর সতুমার জন্য আমার কোনও চিন্তা নেই। ‘বাবা, যদিও পুশকিনের মার বাপের বয়সি, তবু, ওই যে pious বলছিলাম না, তাকে ‘সতুমা’ বলে ডাকতেন। কাগপট্টির দিনগুলোতে বাবা চিন্তায় চিন্তায় আধমরা, ঘুম বন্ধ।

রেবতী: ব্রাভো! সত্য সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!— (আদিত্যের দিকে তাকিয়ে) এবার বলুন আপনি। কী যেন নামটি আপনার?

আদিত্য: আমার নাম বর্তমানে আদিত্য। শাশুড়ির দেওয়া নাম। আসলে, তিনি আমার নাম রেখেছিলেন উদয়াদিত্য। আমি তার অনুমতি নিয়ে আদিত্য করে নিয়েছি। ঠিক করিনি?

রেবতী: শাশুড়ির দেওয়া নাম নিয়ে কারবার করছেন? শুনেছি বৌয়ের ন্যাওটা হয় লোকে, শাশুড়ির— হোরেশিও, তুমি কোথায়?

আদিত্য: পিতৃদত্ত নাম প্রয়াস, প্রয়াস সূত্রধর।

রেবতী: সন্দেহ হচ্ছে ঘরজামাই?

আদিত্য: অবশ্যই। আমরা মশাই ভর্তুকিপুরের জমিদার। ঘরজামাই থাকাটা আমাদের বার্থরাইট। তার জোরেই— তাছাড়া  শ্বশুর-শাশুড়ি ভালবেসে যদি নিজেদের কাছে রাখতে চান, তাদের কি অসম্মান করতে পারি, দুঃখ দিতে পারি?

রেবতী: না, নো, নেভার। ও, ভর্তুকিপুরের জমিদার? জানি তো! ইতিহাসে তাদের কথা কত্ত পড়েছি।

আদিত্য: কী, কী লিখেছে বইয়ে? আমার নাম, আমার বাবার নাম আছে সেখানে?

রেবতী: তা আর মনে নেই এখন। তবে এটা মনে আছে, সে বংশের সবাই খুব চেষ্টাশীল।

আদিত্য: এই, এটাই হলে সার কথা। চেষ্টাশীল। আমিও জানেন, জীবনভর কেবল চেষ্টা চালিয়ে গেছি। কুহেলি, আমার গিন্নি (ওপরে তাকিয়ে করজোড়ে নমস্কার করেন), তো বলত, মাসে চার আনা পয়সা আয় নেই তোমার, তবু তোমার চেষ্টা দেখে মানুষের শেখা উচিত।

ভবভূতি: বলত? তবে চেষ্টাটা কীরকম, যদি একটু বলেন! বৌ চলে গিয়ে এখন তো অখণ্ড অবসর। (রতিকান্তের প্রবেশ। তার এক হাতে এক প্যাকেট সিগারেট, রেবতীকে দেন। রেবতী সানন্দে তা গ্রহণ করেন। অন্য হাতে ছবি। তা-ও রেবতীকে প্রত্যর্পিত হয়। রেবতী ইঙ্গিতে ছবি পছন্দের ব্যাপার জানতে চাইলে রতিকান্ত একটা ছবি সহাস্যে দেখিয়ে দেন। রেবতী চেয়ার দেখিয়ে তাকে বসতে বলেন)। চেষ্টাটা আমিও না হয় শুরু করে দেব।

আদিত্য: প্রথমে বোতামের ব্যবসা দিলুম। পাইকারি। খেলুম লস। পার্টনার ঠকাল। ফের এক বন্ধুর পরামর্শে ধরলুম মাছের কারবার। এ-ও পাইকারি। তা লাভ ভালই থাকছিল। কিন্তু সমস্যা বাধল ডবল নিউমোনিয়া হয়ে।

ভবভূতি: ডবল— কেন? মাছের ব্যবসা তো শুনেছি হাইলি প্রফিটেবল।

আদিত্য: ব্যবসা খারাপ, তা তো বলিনি! কিন্তু রোজ ক্যানিং গিয়ে রাত জাগা, শীতে মাতলা নদীর ঠান্ডা হাওয়া, ফেরার সময় ভোরের ট্রেনে ঢুকে পড়ছে হু হু বাতাস, সহ্য হল না। রোগ সারল, কিন্তু বৌটা গেল মরে।

রেবতী: সে কী! নিওমোনিয়া হল আপনার, আর মরল কিনা বৌ? তাজ্জব। এ রোগ তো ছোঁয়াচেও নয়। তা হলে কী করে এমন অত্যাশ্চর্য ব্যাপার ঘটল?

আদিত্য: বলছি। জল। একটা ওষুধ খাওয়ার আছে (চায়ের দোকানের বয় জল এনে দেয় গ্লাসে করে) তদ্দিনে শ্বশুর-শাশুড়ি  গেছেন, অ্যাক্সিডেন্টে। গোয়ায় তীর্থ করতে গিয়ে।

রতিকান্ত: গোয়াতে তীর্থ? না কি গয়ায়? শুনেছি, ওহানে নাকি মেইয়ে মাইনষির হরিহরছত্তরির মেলা? তা তীর্থমাহাত্ম্য নেই আর কোথায়? গোয়া এহেন থে কদ্দুর? রাইতে গিয়ে পরদিন  ফিরে আসা যাবে?

রেবতী: যাবে। মনে মনে। বসুন। আপনাকে বিয়ে না করিয়ে  কোথাও যেতে দেব না। লাখ লাখ টাকা, জমি, বাড়ি, চালকল, আপনি কি চান, এ-সব নিয়ে কেউ গেণ্ডুয়া খেলুক?

রতিকান্ত: চাইতাম। এহনে যে সব ছবি দেহালেন, আর চাই নে গেণ্ডুয়া খেলা। বৌ চাই।

রেবতী: আস্তে, আস্তে। আচ্ছা, আপনার আগের বৌ মারা গেল কীভাবে? কী অসুখ হয়েছিল তার? (এক তরুণের প্রবেশ। বয়স ২৫/২৬, সুশ্রী চেহারা। রেবতী ভাল করে তাকে দেখেন)।

তরুণ: আচ্ছা, বিপত্নীক সঙ্ঘের গেট টুগেদারটা—

রেবতী: আহা! এই বয়সেই বৌ মারা গেছে! তা কী হয়েছিল?

তরুণ: না, মানে আমি না, আমার বাবা। অম্লশূল, বাত, হাঁপানি, হাই প্রেসার, শয্যাশায়ী। আমাকে বললেন, এরকম একটা ঐতিহাসিক অনুষ্ঠান, মিলন, তুই যা, অন্তত আমায় রিপ্রেজেন্ট করে আয়। সেজন্যই—

রেবতী: ধন্য আপনার পিতৃভক্তি! বগলে ওটা কী?

তরুণ: আজ্ঞে এটা মায়ের পায়ের ছবি। ওরা আনতে বলেছিল, তাই। মায়ের মুখের কোনও বাঁধানো ছবি নেই, তাই।

রেবতী: অনুষ্ঠান তো প্রায় শেষ। খালি ভোট অফ থ্যাঙ্কস আর মিষ্টিমুখ বাকি। তা যান, ওই বামদিকে। (তরুণ চলে যান)।

রেবতী: আজব এক নাট্যশালাতেই ঢুকে পড়া গেছে আজ। এ বলে আমি সিজার, ও বলে আমি নিমচাঁদ। তা ও রতিকান্তবাবু, স্ত্রীর মৃত্যুর কারণটা জানেন? আরে জানবেন তো বটেই, নিজ পরিবার বলে কথা। বলবেন দয়া করে? কঠিন কোনও ব্যাধি?

রতিকান্ত: সাপ।

রেবতী/ ভবভূতি: সে কী! সর্পাঘাতে মৃত্যু? বলেননি তো?

রেবতী: সাপের কামড়ে মারা গেছে আপনার বৌ, থুড়ি, অর্ধাঙ্গিনী?

রতিকান্ত: সর্পদংশনে না, সন্দ সর্পদর্শনে।

রেবতী: সাপ দেখে মৃত্যু? একটা, না অনেক সাপ? ফোঁস করতে এসেছিল বুঝি?

ভবভূতি: আপনার স্ত্রীর, স্যরি, আমাদের বৌদির কি হার্ট দুর্বল ছিল? প্রেসার কত বাই কত ছিল? হাই কোলেস্টেরল? রাতকানা ছিলেন?

রতিকান্ত: কই শোনেন। সাপের লগে পুরোপুরি যোগ ছেলে, আবার কী জানি, ছেলে কি না! সিদিন শনিবার। তেরস্পর্শ। আমার মার শুচিবাই, তাই বাথরুম পাইখানা উডোনের ওপার। রাত্তিরি উডি বৌ বাইরে গেছে। কারণ বুজিছেন আশা করি। তা হঠাৎ চিক্কৈর, ‘সাপ সাপ’ কইরে। জলদি চাইর ব্যাটারির টর্চখান লইয়ে গিয়ে দেহি, জ্ঞানহারা! উডোনের দড়িতি ঝুলতিছে তমিজির মার চুলের ফিতে। সারাদিন কামকাজ করে, রাইতে গোসল সাইরে ফিতেডা আর মনে কইরে নেয় নেই। ভাবলাম, রজ্জুতে সর্পভ্রম। যাই হউক, পাঁজাকোলা কইরে নেবার লাগলাম সদর হাসপাতালে।

ভবভূতি: হাসপাতালে কেন? সাপ তো নয়, দড়ি। তা হলে?

রেবতী: আরে বলতে দিন না! অজ্ঞান তো হয়েছে কম সে কম, হাসপাতাল লাগবে না?

রতিকান্ত: সাপ হলিও তো হতি পারত? তা হাসপাতালে নেবার আগেই জ্ঞান ফিরেলো। বলে, সন্দ, আমারে লতায় কাটিছে। রাইতে সাপ কইতে নাই, লতা। কলাম, কোথায়? কলে, গোপনাঙ্গে। বোজেন! ভ্যানওলারে কলাম, বশির, জলদি কর। জলদি করতে যাইয়ে বশির এক তেঁতুলির গাছে মারলে এক ধাক্কা। বৌ ফের জ্ঞানহারা। কপালে রক্তের ধারা।

ভবভূতি: সাপ, তেঁতুল গাছে ধাক্কা, রজ্জু! ত্র্যহস্পর্শই বটে।

রেবতী: এ তো গাঁজাখুরি গল্পকেও হার মানায়! তা বৌয়ের মৃত্যুটা আসলে কীসে? শেষমেষ মরেছিল তো?

রতিকান্ত: মরিছে শেষকালে, ওই ডাক্তারের হতবুদ্ধিতি। ইদিকি ভ্যানচালক বশির তো অজ্ঞান। আমিই ভ্যান চালোয়ে দুজনারি হাসপাতালে নিয়ে যাই। এদিকে বেড মাত্তর একখান খালি। ডাক্তার অগো দুজনারে তাই এক বেডেই রাইখলে। ব্যান্ডেজ, ওষুধ আনতি যাই, না অগোরে পাহারা দিই, কন? পরদিন সুস্থ করি বাড়ি আনি। পাহারা দিতে যাইয়ে ডাক্তারিরি সাপে কাডনের কথাহান কইতি গেছি, দংশাবার জায়গা জানতি চাইলি ডাক্তার

আমি কি খসম হইয়ে কতি পারি যে গোপনাঙ্গে দেহেন?

রেবতী: তা হলে আর মরলে কোথায়?

রতিকান্ত: মরিলো দুইদিন পর। ফের রাইতে বাহ্যি পাওয়া। হাসপাতালে যাওনের পথে মৌত। আসলে দুইবার-ই সর্পদংশন। একই স্থলে। পেরথমবার ডাক্তার বিশ্বেস কইরে ইঞ্জেকশন দিলি পর বাঁচতে নে। পরেরবার কামড়ালিও মরতি পারত না। পরের বার পুন্যিমে, বিষের মাত্রাডা বেশি ছেলে।

রেবতী: আপনার বাপু ইমিডিয়েটলি বিয়ে করা জরুরি। আমাকে পর্যন্ত হকচকিয়ে দিচ্ছেন!

আদিত্য: আমার কথা কিন্তু শেষ হয়নি। বলি এখন?

রেবতী: না। এখন খানিক বিশ্রাম। এই ফাঁকে একটা ভিডিও দেখব, মাত্র কয়েক মিনিটের। আপনারাও দেখুন। তারপর শুনব।

(মঞ্চের স্ক্রিনে ছবি ভেসে আসে। এটা অন্যভাবেও দেখানো যেতে পারে। এক কোণে আলো ফেলে। গুরু-শিষ্য। গুরু নিম্বপাদ বসা, আর তাঁর পাদু’টি সাষ্টাঙ্গে জড়িয়ে আছেন শীতল।)

নিম্বপাদ: আর কতক্ষণ পা ধরে বসে থাকবি শীতল, ওঠ বাবা, আমার ব্রেকফাস্ট নিয়ে আয়। খেয়েই শিলচরের প্লেন ধরতে ছুটতে হবে যে! দশটা তিরিশের ফ্লাইট। ওঠ।

শীতল: আর সাতমিনিট, গুরুজি। আবার কবে শ্রীপাদ দর্শন হবে তা তো জানি না, সাত, না, ছ’মিনিট আর। লোকে বলে ঈশ্বর নেই, গুরু নেই। কিন্তু আমি তো জানি। নইলে জনাইয়ের বেহুলার সঙ্গে বিয়ের পাকাদেখার ঠিক দু’দিন আগে আমার বন্ধু বাল্যবন্ধু নীলকমলের বাড়িতে আপনার সঙ্গে আলাপ হয়?

নিম্বপাদ: এ যে ভবিতব্য, শীতল। যখন পাকাদেখার কথাটা লজ্জা লজ্জা মুখ করে বললি, তখন কী বলেছিলুম? মনে আছে?

শীতল: মনে নেই আবার? আমার প্রাণটাই তো ফিরিয়ে আনলেন। বললেন, কোষ্ঠীবিচার না করে এ বিয়েতে আমি রায় দিতে পারি না।

নিম্বপাদ: পরদিন নিয়ে এলি কোষ্ঠী। দেখি, এ মেয়ের সঙ্গে তো বিয়ে হলে তোর মৃত্যুযোগ! আর তোর সঙ্গে বিয়ে হতে হবে একমাত্র শীতল নামে কোনও মেয়ের সাথে।

শীতল: কী যে কষ্ট পেয়েছিলাম! বললাম, শীতলা হলেও হবে না? বললেন, না, বিধির এমন-ই নির্বন্ধ, একমাত্র শীতল নাম চাই। পুরাণে জরৎকারু মুনি ছিল বললেন, তাঁর স্ত্রীর নাম-ও ছিল নাকি জরৎকারু, বলে আমায় আশ্বস্ত করলেন। আলাপের প্রথম দিনেই ‘পুত্র, অকুতোভয় হও’ বলেছিলেন! (পুনরায় পদধূলি গ্রহণ)। স-ব মনে আছে। তাইতেই তো জনাই ভুললাম, বেহুলা ভুললাম।

নিম্বপাদ: আর কী দেবতার লীলা দ্যাখ, শিলচরে আমার আশ্রমে ফিরে সাতদিনের মাথায় পেয়ে গেলাম ওই শীতল নামের এক মেয়েকে! এর পরেও কি বলবি, ঈশ্বর নেই?

শীতল: কখনও না গুরুদেব, কখনও না। নিজে সামনে দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দিয়েছিলেন আমার, এই কলকাতার বাড়িতে। পেলাম শীতলকে।

নিম্বপাদ: শীতলতাপ্রাপ্তি বল? বৌ রাখতে পারলি না, সে কি আমার দোষ? ক’জনের বৌ আর ঘর করার জন্য জন্মায় বল? নীলকমলকে ভাল লেগেছে, গেছে সটকে তার সংসারে। আহা! শেষে কোভিডে মরল!

শীতল: তবুও কি আপনার দয়া ভোলা যাবে? বিয়ের পর তো বলেওছে শীতল, যে ওর নাম নাকি আদৌ শীতল ছিল না, ছিল বিপৎসীমা। আপনি স্বপ্নাদেশ পেয়ে ওর নাম রাখেন শীতল, এত দয়া আপনার! এখনও কি কেউ বলবে, ঈশ্বর নেই, গুরু নেই? ঈশ্বর না থাকলে আমার বৌ পালায়?

নিম্বপাদ: তা হলে? আর শীতল ও নীলকমল কোভিডে মরে? (ভিডিও শেষ হয়।)

রেবতী: কী বুঝলেন?

ভবভূতি: আশ্চর্য! বিস্ময়কর! তা এই গুরুজির সঙ্গে একবার কথা বলা যায়? আমার কোষ্ঠীটাও একবার—

রেবতী: না, যায় না। কেননা, এই গুরুজি, অর্থাৎ নিম্বপাদস্বামীও আজ আর ধরাধামে নেই। কোভিড, কোভিড!

আদিত্য: আমার কথাটা কিন্তু শেষ হয়নি। বলি? শ্বশুর-শাশুড়ি মরতে আরেক ঝামেলা। এদ্দিন কেবল চেষ্টা-ই সম্বল ছিল। এখন ঘাড়ে এসে পড়ল শ্বশুরের সম্পত্তি সামলানোর দায়িত্ব। বৌ বেঁচে  থাকতেই ওদের ধানের জমি, নগদ টাকাপয়সা, সব আমাদের  নামে করে দিয়েছিলেন। তেজারতি কারবার ছিল শ্বশুরমশায়ের। তিপ্পান্ন লাখ টাকা জমিয়েছিলেন।

রতিকান্ত: আপনি বুজি কাড়াল দিতেন? মানে শ্বশুরির গার্জেন? মস্ত কাবলিওলা, তাই না?

আদিত্য: বলেন কী! আমি কাবলিওলা হতে যাব কেন?

রতিকান্ত: আরে সে কাবুলি নয়। আমরা খুলনের লোকেরা বাঘেরে কাবলিওলা কই।

আদিত্য: ও। তা ওদের শিকস্তি-পয়োস্তি জমি, হিসেব রাখা বড্ড ঝকমারি। হুজ্জতি কি কম? তার ওপর ধুলিয়ানের হাজিসাহেব মাদ্রাসা খুলেছেন। সঙ্গে আবার লিল্লাহ্ বোর্ডিং। আমার কাছে সাহায্য চাইলে আমিও কোনও মাসে পঁচিশ, কোনও মাসে তিরিশ, ওই যখন যা পারি আর কী, বৌয়ের মঙ্গলকামনায় দিয়ে যাব বলেছি। আত্মার শান্তি তো চাই তার, ঠিক কি না?

রেবতী: তিপ্পান্নো লাখ টাকার মালিক হয়ে মাসে পঁচিশ টাকা দান! বাঃ! স্ত্রী বেঁচে থাকলে নির্ঘাত বলতেন, আপনাকে দেখে লোকের শেখা উচিত।

আদিত্য: এখন সমস্যা হল, মানে খুলেই বলি, আমি চলে গেলে এসব সহায়সম্পদ দেখবেই বা কে, ভোগ-ই বা করবে কারা? এসব ভেবেচিন্তে পরিবার নেব ঠিক করেছি।

রেবতী: যথাযথ সিদ্ধান্ত। যথোপযোগী সিদ্ধান্ত। হয়ে যাবে (পকেট থেকে কার্ড বের করে আদিত্যকে দেন)। যোগাযোগ করবেন।

আদিত্য: বলছেন? পারবেন একটা হিল্লে করে দিতে? চিরঋণী থাকব তা হলে।

রেবতী: নস্যি এসব আমার কাছে। তবে পঁচিশ-পঞ্চাশে কিন্তু হবে না বলে দিলাম। এক লাখ চাই, আপনার লক্ষ্য পূরণের দক্ষিণা। শিকস্তি-পয়োস্তি, ও তো আছেই, পরোয়া কী?

আদিত্য: অঙ্কটা একটু বেশি হয়ে গেল না? আমি অন্যত্র চেষ্টা দেখি?

রেবতী: তা আপনার অভিরুচি। সাপে কাটবে না, ভ্যানরিকশায় চড়তে গিয়ে তেঁতুল বা পাকুড়গাছে ধাক্কা লেগে অক্কা পাবে না, তার জন্য তো যথার্থ মূল্য দিতেই হয়, তাই না? তাছাড়া এটা আপনার সেকেন্ড ম্যারেজ। গাড়ি একটু হলেও তো লজঝরে, বেতো ঘোড়া, মানেন? রাজি হলে এক্ষুনি বুকিং করে যান। নইলে পস্তাবেন। ছবি দেখতে চাইলে এখনি দেখাতে পারি।

রতিকান্ত: ছবি? মোরডা বাদ দিয়ে দেহাবেন। সবে তো কলির সইন্ধে! আরও কত কী যে হবানে!

আদিত্য: ছবি? এক— লাখ— তা দেখি একবার। (রেবতী ছবি  বের করে দেখতে দেন। আদিত্য একদৃষ্টে দেখতে থাকেন। একটা ছবি পছন্দ হয়।)। একে মনে ধরেছে। বয়স?

বয়স, ঠিকুজি, সব হবে। টুয়েন্টি পার্সেন্ট অ্যাডভান্স। এ মাসেই ব্যবস্থা করব। চাই কী সামনের সপ্তাহে। ষোলোই জষ্টি, খুব ভাল দিন আছে, বয়স ঠিক আঠারো। আজ-ই না হাতছাড়া হয়। আদিত্য: আ-ঠা-রো! সত্যি-ই আঠা— রো? কবুল। কালকেই মেয়ে দেখা আর অ্যাডভান্স। প্যারাডাইস হোটেল, সন্ধে সাড়ে সাত।

রেবতী: এক লাখ, প্লাস ছ’পার্সেন্ট জিএসটি, অল রাইট?

আদিত্য: বিয়েতেও জিএসটি? ঠিক আছে।

ভবভূতি: আঠারো শুনেই এক লপ্তে প্যারাডাইস? সাধে কি আর বলে, ভাগ্যবানের বৌ মরে? আঠারো শুনে আমার-ই তো লোভ ছিল নিজের, বা ছেলেটার জন্য অ্যাডভান্স করি।

রেবতী: তা চিন্তা কী? আমি আছি। দু’জনের-ই আঠারো তো, নো প্রব্লেম। কার্ডটা রইল। সময়মতো যোগাযোগ করবেন। তবে আপনার, আপনাদের যা বংশগত প্রতিভা, মনে হয় না আমার দরকার হবে।

(লোকজন ধরাধরি করে এক ভদ্রলোককে চায়ের দোকানে নিয়ে আসেন। টেবিলের কাপ প্লেট গেলাস সরিয়ে তাকে চিৎ করে শুইয়ে দেওয়া হয় তাকে বাতাসরত একজন।)।

রেবতী: কী ব্যাপার? অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বুঝি? হবেন না? যষ্টির যা ভ্যাপসা গরম আজ, কাঁঠাল-পাকানে গরম! এমন গরমে অনুষ্ঠান করাটাই ঠিক হয়নি। নাড়িটা দেখি তো। (নাড়ি দেখতে থাকেন। হঠাৎ তড়াক করে লাফিয়ে ওঠেন সেই ব্যক্তি। ফের শুয়ে পড়েন।

রেবতী: (সামনের লোকজনকে) আপনারা অযথা ভিড় করবেন না। এর তো শ্বাস বন্ধ হওয়ার জোগাড়! এখানে ডাক্তার আছেন কেউ?

ডা. পরিতোষ: এই তো, আমি আছি। তবে এখানে আসব, তাই স্টেথো আনিনি। দেখি, পালসটা দেখি। এর পরিচিত কেউ কি সঙ্গে এসেছেন?

বেচু: আজ্ঞে, আমি যদিও এর পরিচিত নই, তবে অনুষ্ঠানে এসে পঞ্চানন্দবাবুর সঙ্গে আলাপ হয়েছে। স্ত্রী সরমার মৃত্যুর পর, নিজেই বলেছেন আমাকে, মাথা বিগড়েছে নাকি। ক্ষণে ভাল, ক্ষণে মন্দ। বাড়িতে ইনি আর ওর বিধবা মেয়ে। এই দু’জন।

পঞ্চামৃত: সরমা নয়, কৈকেয়ীও নয়, অহল্যা, অহল্যা। (উঠে বসেন) অহল্যা অহল্যা! আমার ছুটি হয়েছে মা! এখন আমি বিয়ে করতে যাব। এ কী! এত রক্ত কেন? যোগু, এত রক্ত কেন?

ডাক্তার: Sense of logic-টা আছে বটে, তবে অনেকটাই misappropriated. Sense of proportion lacking. যোগুটা কে, জানেন?

বেচু: হ্যাঁ, ওর সেই বিধবা মেয়ে যোগাদ্যা। জীবনের সব ঘটনার-ই জিস্ট বলেছেন, এমনকী বৌ নিয়মিত গায়ে হাতটাত-ও দিতেন, বলেছেন তা-ও। বড্ড সাধাসিধে মানুষ। নইলে নিজের মাথার কথা, বৌয়ের মার, এসব কবুল করে কেউ? আর বলেছেন, ওর ডাক্তার নাকি বলেছেন ওকে, একটা বিয়ে করলে পাগলামিটা সেরে যাবে।

পঞ্চামৃত: ঠিক। একদম ঠিক। একবার তো বিয়ের সব ঠিকঠাক, জানেন? আমি চুলদাড়ি কাটিয়ে একেবারে রেডি। দুপুরে খেয়ে উঠে টোপরটা পর্যন্ত পরে মাপটা দেখে নিলাম। সময় আছে বেরোবার, তাই একটা ঘুম লাগালাম। ঘুম ভেঙে দেখি, কী যেন আছে, আর কী যেন নেই। সব্বোনাশ! চিৎকার করে মেয়েকে ডাকলাম, যোগু, যোগু, তোর মা নাকি বিধবা হয়েছে? এ কি সত্যি? আমাকে না লুকিয়ে বল, এ ঘটনা কি সত্যি? কবে ঘটল?

রতিকান্ত: আরে আরে কী কতিছেন? আপনি থাকতি—

পঞ্চামৃত: আপনিও ওদের দলে, না? খুব মাতবর, তাই না? তা হলে বলেন, আমি থাকতে যোগু বিধবা হয় কী করে? তাকে কি ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছি? তা আত্মীয়স্বজনের দল আমার কথা শুনে শ্বশুরবাড়িতে নয়, আমাকে নিয়ে গেল কিনা শম্ভুনাথ উকিলের নার্সিংহোমে!

রতিকান্ত: এদিকি উকিল, তায় ডাক্তার?

পঞ্চামৃত: চোপ! উকিল তো কী, অ্যাঁ? ওটা তো ওর পদবি। উনিই বলেছিলেন, পাগলামি না সারলে বিয়ে দেওয়া যায় না। আর বিয়ে না দিলে পাগলামি সারবে না আমার। উভয়সঙ্কট! অহল্যা, অহল্যা, আমার ছুটি হয়েছে মা, আমি কুরুক্ষেত্রে যাব।

ডাক্তার: লুনাটিক, সিম্পলি লুনাটিক। ভেরি স্যাড কেস।

রেবতী: লুনাটিক, তা ঠিক। কিন্তু একটা জিনিস খেয়াল করেছেন? এই ভাল তো এই মন্দ। চাঁদের মতো নয়, লুনাটিক হলেও। ওঁর তো বার্ষিক গতি-ই নয় কেবল, আহ্নিক গতিও দেখতে পাচ্ছি।

ডাক্তার: হাঃহাঃহা! দারুণ অবজারভেশন তো আপনার! কিন্তু এঁকে তো একা ছেড়ে দেওয়া অ্যাডভাইজেবল নয়। আপনি কি পৌঁছে দিতে পারবেন? থাকেন কোথায়? পেশার কথা বলেছেন কিছু?

বেচু: বলেছেন। গাড়ি নিয়ে এসেছেন। ড্রাইভার আছে সঙ্গে।

মস্ত সব ব্যবসা, সব-ই আবার বৌয়ের নামে। ইটভাটা আছে, ABCBA, অর্থাৎ Ahalya Brick, Chatra Block Area। আছে অহল্যা হার্ডঅয়্যার, অহল্যা হ্যাচারিজ, আরও, অহল্যা, অহল্যা—পঞ্চামৃত: হাঃহাঃহাঃ! ওটা কিন্তু অহল্যা নয়, মোটেই নয়। টি. বি. তার মানে তপোবন ব্রা।

রেবতী: ব্রা? তার নাম আবার তপোবন? (উঠে দাঁড়ান)। আমাকেও উন্মাদ বানাবে আজ!

বেচু: মনে পড়েছে। ফ্যাক্টরিটা যাদের জমি কিনে, তারা চার ভাই। তপন, পবন, বরুণ, আর নয়ন। ওদের নামে র আদ্যক্ষর দিয়ে তপোবন।

পঞ্চামৃত: ঠিক। ওরাই বলেছিল, ওদের একটা স্মৃতি— তাই।

(উঠে দাঁড়িয়ে) অহল্যা! অহল্যা! আমি কি যোগুর বৈধব্য ঠেকাতে পেরেছি? পাগলামি না সারলে বিয়ে হচ্ছে না, আর বিয়ে না সারলে পাগলামি হচ্ছে না! (প্রস্থান)।

রেবতী: আজকের রাতটাকে সোনা দিয়ে, না, হিরে দিয়ে বাঁধিয়ে রাখতে হয়। (দু’জন ভদ্রলোকের প্রবেশ)।

ভন্টুবাবু: আমি আগেই তোমাকে বলেছিলুম না পিন্টুদা, এসে কোনও ফায়দা নেই? এখানে সব ড্রাই ব্যাপার। সব পুরুষ নিয়ে কারবার।

মিন্টু: ড্রাই বলতে যে এতটা, তা বুঝব কী করে? কর্তাদের চিটি দিয়ে জানিয়েছিলাম, অন্তত কিছু ইয়াং বিধবাদের ইনভাইট করে তাদের নিয়ে একটা ফ্যাশান প্যারেড লাগিয়ে দিতে। তা আর চিঠির জবাব পজ্জন্তি দিলে না এরা! এসে ইস্তক দেখি প্যান্ডেমোনিয়াম, যে কেউ যা খুশি করে বেড়াচ্চে।

ভন্টুবাবু: তা এখন তো শখ মিটল? দোস্তের কথায় কান দিলে না, পস্তাও এখন! বারোন্ডায় ডাঁড়িয়ে এসো চা খেয়ে বাড়ি রওনা দিই চলো। ছি ছি ছি, নৈনেত্রকার কাণ্ড সব, জাতমান গেল!

মিন্টু: আসচে বার নিজে অর্গানাইজ করব। কম করে একশো নবীনবরণ না করিয়েচি তো জেনো আমার খাট আসচে। আমার নামে ভোজপুার ছাগল পুষো।

রেবতী: খুব আফসোস দেখছি আপনার? সমস্যাটা কোথায়? আহা! এমনিতেই বৌ নেই বলে আপনারা শোকাতাপা মানুষ, তার ওপর মাথা গরম করে—

ভন্টুবাবু: বৌ মরে ইস্তক আমরা তাই একটু রসেবশে থাকতে চাই। একটু বাঁয়া, একটু ডুগিতবলা, বাইজি তো প্রায় উটেই গ্যাচে, তাই বলে ক্ল্যারিওনেট পজ্জন্তি থাকবে না! হাজার লোকের সভা, একটা উইকার সেক্সের দ্যাকা নেই? রাতটাই বরবাদ! গোয়াবাগানের দত্ত আমরা, ডেকে এনে অপমান আমাদের?

মিন্টু: আর ওদের খাবারের মেনু তো না, বাঙ্গালদের মিষ্টির প্রসেশন! ফোনে জানিয়েছিলাম ওদের, আইটেমে কাঁকড়া আর লাউয়ের কষাটা একটু রেখো, ওটা আমার বৌ ভাল খেত। বললে রাখবে। ও মা! এসে দেখি কোথায় কী? বললে, নাকি বিপত্নীক নিয়ে কারবার, আমিষ চলবে না। কাঁকড়াটা হল আমিষ? তা হলে তো তবলাটাও ঢোল, আর বেড়াল হল গে পশুরাজ! শুনে রাখুন সব্বাই, সামনের বার কাঁকড়া হবে, মৌরলার স্পেশাল কাবাব হবে, চিংড়ি আর মাটনকষা পিঠে হবে, আর—

ভন্টুবাবু: আর আমার বৌ যেটা ভাল খেত?

মিন্টু: কে, ভন্টে বোঠান? তা তো হবেই, স্মোকি হুইস্কি, ঝিনুকের সঙ্গে। লাস্ট আইটেম। তবে তা for a limited few.

আদিত্য: এমন একটা ঝিনুক খুঁজে পেলাম না, যাতে মুক্তো আছে!

রেবতী: পাননি? এই এত এত মুক্তো দেখেও বলছেন পাননি? তবে তো হে চেষ্টাবীর, চেষ্টেশ্বর, চেষ্টাম্বুধি, চালিয়ে যান চেষ্টা, পাবেন। আর ভন্টুবাবু! এখানেও ঘটি-বাঙালের সিভিল ওয়ার? ইষ্টো-মোহন? এই না হলে বাঙালি? বিপত্নীকদের আচমন হুইস্কি দিয়ে? তোফা!

ভন্টুবাবু: বৌ নেই। আন্ডাবাচ্চাও না। দুঃখ ভুলতে যে বিষ খাব, তা-ও পারি না! মরতে ডরাই না, ডরাই ভেজাল বিষ খেয়ে আহাম্মক হতে। তাই তো মিন্টুদা আর আমি মিলে হুইস্কি ধরেছি। রোজ তো খাই না। কেবল বৃষ্টি পড়লে, আর যেদিন বৃষ্টি পড়ে না, সেদিন।

রেবতী: ওই ঘণ্টা বাজল। আসর বোধ হয় শেষ। (পাশে বসা ভদ্রলোককে) তা আপনার কথা তো জানা হল না! এলেন সভায় যোগ দিতে। তা না দিয়ে সারাক্ষণ ঠায় এখানে বসে থেকে আমার মুখের দিকেই তাকিয়ে আছেন। একনিষ্ঠতা আর কাকে বলে! ও কী! হাতে ব্যান্ডেজ কেন?

পীতাম্বর: খেলা দেখতে গিয়ে। আমার সাপোর্টিং দল একটা করে গোল দিচ্ছে, আর আমরা, সাপোর্টাররা অপোনেন্টদের দিকে শয়ে শয়ে পচা ডিম তাক করছি। শেষে ওদের দল যখন জিতল, দিল আমার হাত মচকে। এর শোধ আমি তুলবই। পীতাম্বরকে চেনে না ওরা।

আদিত্য: পচা ডিম? আপনি সিওর, সব ডিম-ই পচা ছিল? আচ্ছা, দেশে বিদেশে এই যে শুনি খেলার মাঠে পচা ডিম ছোড়া হয়, তা পচা ডিমের কি আলাদা কোনও বাজারহাট আছে? বিশেষ জাতের কোনও মুর্গি আছে, যারা রোজ খালি পচা ডিম-ই পাড়ে?

রেবতী: আপনি এখন উঠুন, কেমন? কাল সময়মতো দেখা হবে। (আদিত্য বিদায় নেন)।

পীতাম্বর: কেন নড়িনি জানেন? আপনাকে দেখেই মনে হচ্ছিল, আপনি দেবদূত। ঠিক সেইরকম দেখতে।

রেবতী: নিয়মিত দেবদূত দেখার অভ্যেস আছে বুঝি আপনার? না কি রামরহিম কাউকেই বাদ দেন না তোষামোদ করতে? মহাশয়ের পরিচয় ও ইতিহাস জানতে পারি?

পীতাম্বর: পারেন। পীতাম্বর। ছোটবেলা থেকে সঙ্কল্প ছিল, চিরকুমার থাকব, দেশ স্বাধীন করব। তা বলা নেই কওয়া নেই, দেশটা হঠাৎ করে স্বাধীন-ই হয়ে গেল।

রেবতী: দাঁড়ান দাঁড়ান। (পীতাম্বর দাঁড়িয়ে ওঠেন)। আরে সত্যি সত্যি দাঁড়াতে বলিনি। আচ্ছা, দেশ স্বাধীন করবেন ভেবেছিলেন। তার মানে তো পঁচাত্তর বছর আগেকার কথা। আপনার বয়স কত?

পীতাম্বর: আজ্ঞে পঁয়ষট্টি। সন্দেহ আছে?

রেবতী: সন্দেহটা আপনার বয়স নিয়ে নয়, আপনার দেশ স্বাধীন করা নিয়ে।

পীতাম্বর: আরে ভারতের কথা নয়, বাংলাদেশের। আমি তো জন্মসূত্রে বরিশালের। বুঝেছেন?

রেবতী: বুঝলাম। আর এখন?

পীতাম্বর: এখন থাকি নিঃস্ব কলোনিতে। ভাববেন না আবার, নামটা বানিয়ে বলছি। টালিগঞ্জে আছে ওটা।

রেবতী: জানি, আছে।

পীতাম্বর: ছাত্রবয়সে ব্যায়াম, ভিজে বাদাম, ফুটবল, দৌড়, এই নিয়ে থাকতাম। ডাম্বেল। ম্যাট্রিক অব্দি মেয়েদের মুখের দিকে তাকাতাম না, ওই আমার বন্ধু বিপিনের বোন অতসীর মুখের দিকে ছাড়া। কলেজে উঠে জগদীশ সিনেমা হলের পাশ দিয়ে যেতাম কেবল মেয়ে দেখতে। সিনেমা, নেভার, আদর্শচ্যুত হব না প্রতিজ্ঞা ছিল যে!

রেবতী: দিনরাত কেবল ব্যায়াম? তাতেও কী লিকলিকে চেহারা আপনার!

পীতাম্বর: বিকেলে যোগাসন। বইতে লেখা দেখলাম, ‘সর্বদা বীর্যধারণ করিবে।’ কিছুতেই মানে বুঝি না। শেষে স্কুলে বাংলার স্যার আশুতোষবাবুর কাছে জানতে চাইলে স্যার আমার গালে চুরানব্বই সিক্কার এক চড় কষিয়ে দিতেই মানে জলের মতো সোজা হয়ে গেল।

রেবতী: কিলচড়ের মধ্যেও তা হলে ডিকশনারি লুকিয়ে থাকে, কী বলেন? আপনার বাকি ইতিহাস? অতসী বৃত্তান্ত?

পীতাম্বর: তখন অতসী ক্লাস নাইন। সেবার সরস্বতীপুজোর দিন ওকে বললাম, একসঙ্গে আমরা অঞ্জলি দিলে কেমন হয়? ও বলল, তুমি লেট করে ফেলেছ পীতাম্বরদা। অশনিদাকে আগেই মন দিয়ে ফেলেছি। ঠিক আছে, পরজন্মে তুমি আমার।

রেবতী: ক্লাস নাইনের মধ্যেই মন দেওয়া সারা? পরজন্মও বুঝে গেছে? খেল খতম আপনার?

পীতাম্বর: খতম হলে আমি আজ বিপত্নীক কেন? বেলার জন্য মন আমার উদাস বাউলের হতাশার সুরধ্বনির পাতালের অন্তিমের গতির সঙ্গে হাত ধরাধরি করে কেন?

রেবতী: বাব্বা! ষষ্ঠীবিভক্তির মেইল একেবারে! কেন?

পীতাম্বর: দেশ সদ্য স্বাধীন। বাংলাদেশ! চলেছি স্টিমারে। বরিশাল থেকে খুলনা, সেজোমামার বিয়ে খেতে। তখনও পর্যন্ত প্রতিজ্ঞা, চিরকুমার থাকব।

রেবতী: দেশ স্বাধীন। দেশের প্রতি ভালবাসার জন্য-ও তো বিয়ের কথা বিবেচনা করা উচিত ছিল। জাতি চায় বলিষ্ঠ, ইয়ে, উত্তরাধিকার। জাতির দাবিকে অস্বীকার করা তো দেশবৈরিতা।

পীতাম্বর: ঠিক তাই। তখন পর্যন্ত তা বুঝিনি। স্টিমারে বেলাকে দেখে কিন্তু, কী জানি, কীরকম হয়ে গেল। তখনও নাম ধাম সাকিন কিছুই জানি না, তবুও হয়ে গেল।

রেবতী: হয়ে গেলে ওরকম করেই হয়। নাম জানলেন কবে?

পীতাম্বর: নামটাম জানলাম ওর বাবা-মা ডেকে ডেকে ওকে অস্থির করায়। ‘বেলা, পানের চুনটা দে’, ‘এই বেলা, ওদিকে তাকিয়ে কী দেখছিস? আয়, চুলটা বেঁধে দি’, ‘ও বেলা! বেজিটাকে খেতে দে’, এইভাবে।

আদিত্য: বেজি! স্টিমারে? এ আবার কেমন স্টিমার?

রেবতী: আপনি একটু থামবেন? বেলা বেজি পোষে। হল?

পীতাম্বর: স্টিমার স্টেশনের পর স্টেশন পেরোয়, আর ইচ্ছে করে কথা কই। এদিকে হাবে ভাবে চালে চলনে কথায় বার্তায় তখনও বাঙ্গাল, পুরোদস্তুর বরিশালিয়া। ওদিকে তোতলা আবার। এই করে আসলো হুলারহাট।সব্বোনাশ! দেখি বেলা, ওর বাবা মা আর বেজি নিয়ে স্টিমার থেকে নামছেন। আমি তো যাব মামার বাড়ি খুলনা, হুট করে তো হুলারহাটে নেমে যেতে পারি না! তাই, ইষ্টমন্ত্র জপ করে মশাই, আমার কুলগুরু ভুলুমহারাজকে স্মরণ করে, ফিসফিস করে, যেন গায়ত্রীমন্ত্র পড়ছি, এইভাবে ওর কানের কাছে আওড়ালাম, ‘বেলা, মন দিলে মন দিবা? বেলা, মন দিলে মন দিবা? বেলা—’

রেবতী: বেলার মা-বাবা তখন?

পীতাম্বর: ওরা এগিয়ে গেছিলেন। বেলার একটা পা একটু খোঁড়া, ওই লক্ষ্মীখোঁড়া আর কী, হাঁটতে দেরি হয়। ভাবুন, অবিরাম ঘণ্টাধ্বনির মতো আমার নিজের কানেই বাজতে লাগল আমার লেখা সেই আদি ও অকৃত্রিম কবিতা, ‘বেলা, মন দিলে, ও বেলা, মন দিলে মন—

রেবতী: আর বেলা তখন?

পীতাম্বর: বেলা তার উত্তরে খালি একটা কথাই বলল, ‘মায় জানে’। আমাকে যেন কে একটা ছোট্ট শূন্যের মধ্যে— কেমন শূন্য জানেন? আমার বাবার বড়পিসির সকালের জলখাবারের কাঁসার বাটির ফুটোর আকাশের চাঁদের—

রেবতী: ফের ষষ্ঠীর লাট্টু ঘোরানো হচ্ছে?

পীতাম্বর: না না, বড়পিসির মেজ ভাসুরের ছোটমেয়ের দোজবরের—

রেবতী: খামোশ!

পীতাম্বর: আশার বাণী ঠিক তার পরই। আমার হাতে একটা বই ধরিয়ে দিল, ‘উদ্ ভ্রান্ত প্রেম’, ভিতর দিয়ে চিরকুট উঁকি দিচ্ছে তার। খুলে দেখি, তাতে লেখা, ‘শ্রীমতী বেলারানি রায়, পিতা আকুলকান্তি রায়, কাউনিয়া খালপাড়, রজনী উকিলের বাসা, বরিশাল।’ তারপর ধীরে ধীরে নেমে গেল। পেছন ফিরে আমার দিকে একবার তাকিয়ে হাত নেড়ে সামান্য হাসল। খাঁচার বেজিটা খানিকটা তুলে ধরল আমার দিকে। দেখি, বেজিও হাসছে।

রেবতী: মানে তিনিও তৈরি মেয়ে?

আদিত্য: কী যে কন! বেজি কি হাসেকাঁদে কখনও? বেজি, সাপ, বাঘ—

পীতাম্বর: হাসে। সময়বিশেষে।

(সভাশেষে লোকজন বেরিয়ে আসছেন। ভাদুড়ী, বাণপ্রস্থ, সুধারাম ও দেবপ্রিয়বাবুরা এসে চায়ের দোকানে ঢোকেন। রেবতীকে দেখে আশ্চর্য হন।)

সু.+ বা. +ভা.: আপনি!

রেবতী: আপনাদের আইন অমান্য করিনি। এখানে, এই চায়ের দোকান হল গিয়ে মুক্তাঞ্চল, যে কেউ আসতে পারে, মানেন নিশ্চয়ই? আশা করি আপনাদের আশাতীত সাফল্যলাভ ঘটেছে? সব সুষ্ঠুভাবে মিটেছে?

সুধারাম: তা মোটামুটি, ইয়ে, আশাতীত না হলেও, হয়েছে।

রেবতী: বাঃ! আমিও, শুনলে খুশি হবেন কি না জানি না, আমার তিনজন ক্লায়েন্ট-ই এখান থেকে পেয়ে গেছি। Thanks to your Bipatnik Sabha!

 

।। চতুর্থ দৃশ্য।।

 

(সুধারামের ঘর। ঘরে সুধারাম, বাণপ্রস্থ, ভাদুড়ী বসা। স্টিল কিছুক্ষণ। তারপর শুরু হয় কথোপকথন)।

ভাদুড়ী: আপনি বলছেন বাণীকণ্ঠবাবুর তিন মেয়ের জন্যই পাত্রী, স্যরি, ক্লায়েন্ট পেয়ে গেছেন?

রেবতী: গেছি। তাদের মধ্যে একজন হলেন খুলনার রতিকান্তবাবু।

বাণপ্রস্থ: রতিকান্তবাবু! এসেছিলেন নাকি? কিন্তু তাকে তো আমরা খুলনাতেই—

রেবতী: বিপত্নীকসঙ্ঘের বাংলাদেশ চ্যাপ্টার করতে বলেছিলেন, কেমন? কিন্তু তিনি এখানে এসে সব দেখেশুনে শেষ পর্যন্ত মত পাল্টে বিয়ে করবেন বলে ঠিক করেছেন।

সুধারাম: বাঃ! ফাইন! মানুষের কী বিচিত্র মন! এই দাতাকর্ণ, আর এই—

রেবতী: এই দরবেশ, এই বরবেশ, তাই না? মানুষেই সুরাসুর, জানেন না?

ভাদুড়ী: আর দ্বিতীয়জন?

রেবতী: দাঁড়ান, লিস্টটা বের করি। (পকেট থেকে লিস্ট বের করে) তাছাড়া এবছর তো সব দিক বিচার করে দেখলে বিপত্নীক অফ দি ইয়ার করা উচিত ছিল— হ্যাঁ, পেয়েছি, আদিত্য, ওরফে প্রয়াস লস্কর, জঙ্গীপুর ওরফে কালীঘাটে বাড়ি, কোটিপতি লোক। Highly managable. গতকাল মেয়ে দেখে পছন্দ-ও করে গেছেন। আমাকে অ্যাডভান্স-ও করেছেন কোয়াইট স্যাটিসফ্যাকটরিলি।

ভাদুড়ী: আর The third one? Who is he?

রেবতী: বলছিলাম কি, যে অহিনকুলবাবুই তো এবার সেরা বিপত্নীকের শিরোপাটা পেতে পারতেন। A very perfect widower, আপনাদের অনুষ্ঠানে পর্যন্ত আসেননি। (কলিং বেল বাজে। বাটুল দরজা খুলে দেয়। দেবপ্রিয়বাবু প্রবেশ করেন)।

বাণপ্রস্থ: আসুন আসুন। কী মনে করে?

দেবপ্রিয়: বলছি। একটু জিরিয়ে নিতে দিন।

বাণপ্রস্থ: কী আর করা? এটা প্রথম বছর আমাদের। সেভাবে ফান্ড রেইজ করা গেল না। এই তো, দেবপ্রিয়বাবু সামনেই আছেন, বললেন, প্রোগ্রামের ফিনানশিয়াল দিকটা আমাকেই ভাবতে দিন, only one condition. তাই, যা টাকা লেগেছে, তার লায়নস শেয়ার তো উনিই— চার-চারটে টিভি চ্যানেলকে দিয়ে ভিডিও অব্দি করালেন।

রেবতী: মূর্খ! ইয়েস, মূর্খ!

রেবতী: এসব কী বলছেন মশাই? টাকা দিলেন উনি, আর আমরা হয়ে গেলাম মূর্খ!

রেবতী: তা মোটেই বলিনি। দেবপ্রিয় শব্দের মানে জানেন? মানে হল গিয়ে মূর্খ।

ভা.+ বা.+ সু.: মানে?

রেবতী: মানে আমার তৃতীয় ক্লায়েন্ট তো ইনি-ই। আপনাদের মূর্খ বানিয়ে ছাড়লেন আর কী!

ভা.+ বা.+ সু: সে কী! এ কি সত্যি?

দেবপ্রিয়: ষোলো আনা সত্যি। কেন জানেন? পুরস্কারটা হাতে নিয়ে এই প্রথম আমার মনে হল, and it was really a genuine feeling, যে আমি তো আমার পুরস্কার পাওয়ার চরম আনন্দ, ecstasy of joy-টা কিছুতেই শেয়ার করতে পারছি না একমাত্র আমার স্ত্রী ছাড়া! এতদিন বাদে এই প্রথম ফিল করলাম that l am alone absolutely! (উঠে গিয়ে সুধারামের স্ত্রীর ছবির দিকে তাকিয়ে। ছবিতে গত পরশু নতুন মালা পরানো হয়েছে, তাই কিছুটা টাটকা) জুঁইয়ের মালা! আমার স্ত্রীর প্রিয় ছিল স্বর্ণচাঁপা। (এসে চেয়ারে বসেন) তারপর যখন আপনাদের মাধ্যমে রেবতীবাবুর সঙ্গে আলাপ হল, তিনি সমব্যথী হলেন। মন তখন থেকে কেবলি বলতে লাগল, ‘হেথা হতে যাও পুরাতন, হেথায় নতুন খেলা আরম্ভ হয়েছে’! বলতে গেলে আমি রেবতীবাবুর কাছে নিজেকে সারেন্ডার করে দিলাম। আজ এসেছি স্রেফ আপনাদের কাছে আমার আটমোস্ট কৃতজ্ঞতা জানাতে। আপনাদের জন্যই তো এঁকে পাওয়া! আর এঁকে পেয়েছি বলেই তো বয়সে আমার পুত্রবৎ হলেও বাণীকণ্ঠবাবু আমার শ্বশুর হতে চলেছেন!

রেবতী: এখন তো বুঝলেন, একজন ঘটকের পক্ষে লাইব্রেরিয়ানশিপ পাশ করা কতখানি জরুরি?

ভাদুড়ী: না, বুঝলাম না।

রেবতী: দেখুন, কী বই আর কী ক্লায়েন্ট, তো থাকলেই হল না। চাই ক্যাটালগিং, অ্যাকসেশন, প্রপার প্লেসমেন্ট। বই, বধূ, বর, কমন ফ্যাক্টর এগুলো। ক্লিয়ার?

ভাদুড়ী: বলার আর বিশেষ কিছু নেই। Let us get ready for the next year. মনে হচ্ছে সুধা, আমাদের তিনজনের ইমিডিয়েটলি অ্যান্টি-ম্যারিটাল ভ্যাকসিনটা নিয়ে নেওয়া জরুরি।

রেবতী: তা কেন? বি বোল্ড। তাছাড়া আমি কি আপনাদের কখনওই ডিমোরালাইজড হতে বলতে পারি? (টেবিলে জল ছিল। হাতে নেন। মুখে নেবার আগে) মাঞ্চিনিল্লু। তেলুগু শব্দ। মানে, জল। সবকিছুই আমার কাছে মাঞ্চিনিল্লু, মানে জলের মতো সহজ। আসি। নমস্কার। (বিদায় নেন। পর্দা নেমে আসে)।

।। সমাপ্ত।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × 3 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
পবিত্র সরকার

পবিত্র সরকারের বিশেষ রচনা

বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষদের রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে একটু বেশি দুর্বলতা আছে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে যত কিছু, তাঁদের কাছেও তত কিছু তো বটেই, কিন্তু তারও চেয়ে অনেকটা বেশি। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেনাপতি। বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় থেকে, আয়ুব শাহি ফরমানে রেডিয়োতে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষেধ আর রবীন্দ্র-শতবার্ষিকীর ওপর ফতোয়া জারি থেকে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক মহাশক্তিধর যোদ্ধা, তাঁর সম্বন্ধে এঁরা তাই এত স্পর্শকাতর।

Read More »
মীরাতুন নাহার

মীরাতুন নাহারের প্রবন্ধ

হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতা এবং মুসলমান-সাম্প্রদায়িকতা উভয়কেই তিনি যুক্তি ও তথ্যদ্বারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ধ্বংসাত্মক বলে বোঝাতে চেয়েছেন দেশবাসীকে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত দেশবাসীকে তিনি হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যদিও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ‘সাম্প্রদায়িকতার বিষ’ দেশবাসীর মন থেকে নিষ্কাশন করে দেশকে বিপন্মুক্ত করা।

Read More »
গৌতম ঘোষ

গৌতম ঘোষের প্রবন্ধ

চলচ্চিত্রের ধর্ম হল সময়কে ধরে রাখা, সময়ের স্মৃতিমালাকে ধরে রাখা। সেই পদ্ধতি, সেই প্রক্রিয়া কিন্তু চলতেই থাকবে। এখন আমাদের আরও মানবিক হতে হবে। চলচ্চিত্র যারা তৈরি করবেন তারা শুধুমাত্র সস্তার বিনোদন সরিয়ে রেখে একটু মানবিক ছবি করবেন। যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক, মানুষ ও সমাজের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক থাকবে। যা আমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক সব সিনেমায় দেখেছি, সেই ভাবনায় ভাবতে হবে।

Read More »
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ নিবন্ধ

বস্তুত সুকান্ত কবিতার চাইতে বড়। তিনি এক প্রতীকচিহ্ন। সারা ভারতে যখন কবিকে ভাবা হয়েছে জনতার একজন প্রতিনিধি হিসেবে, তখন সুকান্তকেই ভাবা হয়েছে। তামিল বা হিন্দি সিনেমাতেও হয়েছে। যেমন রাজেশ খান্নার ‘অনুরোধ’ নামের ছবিটিতে যে কবিটি রাজেশের বন্ধু ছিলেন তার নাম সুকান্ত। অথবা অতদূরে কেন যাই, বাংলায় উত্তম-তনুজার ‘দেনা পাওনা’ ছবিতে উত্তম যে বন্ধুর চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন, তার নামও তো সুকান্ত। তিনিও তো ফুসফুসের রোগী।

Read More »