Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

অনিন্দিতা মণ্ডলের প্রবন্ধ

জীবনের অসীম বিস্ময়: অপু ও বিভূতিভূষণ

অ নি ন্দি তা  ম ণ্ড ল

জীবন সম্পর্কে আমাদের মনের মাঝে একটা লক্ষ্য অনুসারে নির্দিষ্ট ছক কাটা থাকে। সেই ছক অনুসরণ করে দিনগত পাপক্ষয়ের মতন আমরাও পৃথিবীর মতন ঘুরে চলি। আমাদেরও আহ্নিক গতি বছরে গড়ায়, এক এক করে বছরগুলো পার করে দেয় জীবনসীমা। শেষে এসে পেছনে তাকিয়ে দেখতে যাই, কী ছিল আমাদের যাপিত সময়। একেই কী জীবন বলে? একে বাঁচার সার্থকতা কোথায়? এই নিরাশা থেকে আমরা বীতস্পৃহ হয়ে পড়ি। নাঃ, এভাবে একঘেয়ে চাকায় ঘুরে সময় কাটানোই যদি জীবন হয়, তবে সেটা না হলেও ক্ষতি নেই।

এইখানে এসেই আমরা পাই বিভূতিভূষণকে। তিনি আমাদের দেখিয়ে দেন, জীবন আসলে মাটিতে পুঁতে রাখা অজস্র মোহরভরা কলস। কোথায় লুকিয়ে আছে জানতে পারা যায় না। হঠাৎ প্রকৃতি তার আপন খেয়ালে রহস্যের অবগুণ্ঠন সরায় আর সোনার কলসের কানা চকচক করে ওঠে। আর তখনই মনের দু’কূল অপার আনন্দে ভেসে যায়। এ আনন্দ অদ্ভুত শান্ত স্থির অথচ দু’কূলপ্লাবী। নিজের যে দৈনন্দিন ক্ষুদ্র চাওয়াপাওয়া, সেইটি যেন মিলিয়ে যায় মিশে যায় এক অপূর্ব বোধে। অনটন যত গ্রাস করুক মন তাতে একটুও মচকায় না। এই অনন্তের সঙ্গে যোগ তখনই সম্ভব যখন অনন্ত তার আপন রূপটি কোনও প্রকৃত অমৃতপিয়াসীর সামনে খুলে ধরে। এই প্রকৃতিই সেই অনন্ত আনন্দরসের ভাণ্ডার। ব্যক্ত এবং অব্যক্ত দুইই।

জীবন জুড়ে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এই অপার রহস্যের সম্মুখে বিস্ময়ে অভিভূত এক মানব। চরম দারিদ্র, গ্রামবাংলার লাঞ্ছনাময় জীবন, অনাহার অর্ধাহার, এ-সমস্তই তাঁর কাছে তুচ্ছ হয়ে ওঠে যখন ভেসে ওঠে প্রকৃতির কোনও না কোনও রহস্য। ‘পথের পাঁচালী’র অপু যেন বালক বিভূতিভূষণ। ছেলেবেলার নিশ্চিন্দিপুরের চৌহদ্দিই তার গোটা জগৎ। অথচ সেই জগতের অন্তরালে এমন কী আছে যে, এক মুহূর্তের জন্যও তা পুরনো হয় না। যেন নিত্যনতুন। প্রতিটি দিন অজানার পার থেকে যেন নতুন কোনও বার্তা আনবে। সেই আশায় সে সর্বদা উন্মুখ হয়ে থাকে।

ভাগলপুরে থাকাকালীন তাঁর ডায়েরি ‘স্মৃতির রেখা’তে লিখছেন— সাহিত্যে এই ভাবজীবন ফুটানোর প্রচেষ্টাই আসল। সাধারণ মানুষের ভাবজীবন খুব গভীর নয়— অনেকের মন এমনভাবে তৈরি যা কি না কোনও বিষয়েই গভীরত্বের দিকে যাবার উপযোগী নয়। অথচ এই গভীরত্বের অভাবে জীবন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

তাঁর সাহিত্যরচনার উদ্দেশ্যটি জানা যায়। গ্রামজীবনে তিনি যে নীচতা ও ক্ষুদ্রতা দেখেছেন, তা থেকে মুক্তি পেতে গেলে তাদের আরও বৃহত্তর জীবনরসের সন্ধান দেওয়া চাই। এইই তাঁর মত।

ভাগলপুরে থাকার সময়েই তাঁর ‘পথের পাঁচালী’ লেখা চলছে। ছোট্ট অপু পাঠশালায় গিয়েছে। গুরুমশায়ের পাঠ তার ভাল লাগে না। পাঠশালা যেন ভীতির জায়গা। গুরুমশায় যেন মূর্তিমান বিভীষিকা। তবু যেতে হয়। সেখানে এসেছেন ‘সান্ন্যাল মশাই’। লেখক লিখছেন, সান্ন্যাল মশাই এসেছেন পাঠশালায়। গুরুমশাই এখন গল্পে মাতবেন। অপুও উৎসুক। সান্ন্যাল মশাই নতুন কী বলবেন। ‘সান্ন্যাল মশাই যেখানে তালপাতার চাটাই টানিয়া বসিয়াছেন সেদিকে হাতখানেক জমি আগাইয়া বসিল।’ সান্ন্যাল মশাই বলছেন, ‘…কুঠির মাঠের পথে সে জায়গাটাকে এখন নালতাকুড়ির জোল বলে, ঐখানে আগে— অনেক কাল আগে— গ্রামের মতি হাজরার ভাই চন্দর হাজরা দেখিল এক জায়গায় যেন একটা পিতলের হাঁড়ির কানা মত মাটির মধ্য হইতে একটু খানি বাহির হইয়া আছে। তখনই সে খুঁড়িয়া বাহির করিল। বাড়ী আনিয়া দেখে— এক হাঁড়ি সেকেলে আমলের টাকা। তাই পাইয়া চন্দর হাজরা দিনকতক খুব বাবুগিরি করিয়া বেড়াইল— এসব সান্ন্যাল মহাশয়ের নিজের চোখে দেখা।’ বলা বাহুল্য যে, অপু এসবই বিশ্বাস করেছে। কারণ, সব রহস্য তো জানা যায় না। যা চোখের সামনে দেখতে পাওয়া যায়, সেই দেখার অতীতও তো জগৎ আছে! সান্যাল মশাই সেই জগতের কথা বলছেন। ছোট্ট অপুর কাছে এ এক মহাসত্য। চন্দন হাজরা নিকষ্যি দরিদ্র, তবু সে এই গুপ্তধন থেকে বঞ্চিত হয় না। তবে সেই বা কেন হবে?

দিনে দিনে প্রকৃতির এই অজানা অরূপ তাকে আরও বেশি আকর্ষণ করে। যেন কখন সে পা দু’খানি নিশ্চিন্দিপুরে রেখে উঠে গেছে অনন্তে। কেমন সেই বালক অপু?

লেখক লিখছেন, ‘সে গ্রামের ছায়াভরা মাটির পথে একটি মুগ্ধ গ্রাম্য বালকের ছবি আছে। সে তাহার দিদির পিছন পিছনে সাজিমাটি দিয়া কাচা, সেলাই করা কাপড় পরিয়া পাঠশালা হইতে ফিরিতেছে, তাহার ছোট্ট মাথাটির অমন রেশমের মত নরম চিক্কণ সুখ-স্পর্শ চুলগুলি তাহার মা যত্ন করিয়া আঁচড়াইয়া দিয়াছে— তাহার ডাগর ডাগর সুন্দর চোখ দুটিতে কেমন যেন অবাক ধরণের চাহনি— যেন তাহারা এ কোন অদ্ভুত জগতে নতুন চোখ মেলিয়া চাহিয়া চাহিয়া দিশাহারা হইয়া উঠিয়াছে।’

শিশুর বিস্ময় আমরা বুঝি, কিন্তু তেত্রিশ-চৌত্রিশ বছর বয়সে, ছেলেবেলার সেই অদ্ভুত বিস্মিত ভাব পূর্ণমাত্রায় বজায় না থাকলে লেখক নিজেকে কী করেই বা এইভাবে প্রকাশ করতেন! তিনি ডায়েরিতে লিখছেন,— ‘সাহিত্য শিল্পীদের জীবনের প্রতিবিম্ব। যে যুগে তারা জন্মেছে, তাদের চেষ্টা হয় সকল দিক থেকে সে যুগের একটা স্থায়ী ইতিহাস লিখে রেখে যাওয়া। …প্রত্যেক লোকই তার নিজের অনুভূতি লেখবার অধিকারী। …জীবনটাকে আমি কি রকম পেলাম, সেইটাই সকলে জানতে চায়।’ (১৬-০৯-১৯২৭)

২২ সেপ্টেম্বর ডায়েরিতে লিখছেন— শৈশব তো সকলেরই হয়— ওতে ভাববার কি আছে! এ আর নতুন কথা কি? তা নয়। এই ভেবে দেখাটাই আসল। না ভাবলে ভগবানের সৃষ্টি মিথ্যা হয়ে পড়ে। …মনের সার্থকতা এই যে বিপুল সৃষ্টির আনন্দকে সে ভোগ করে নিজেও বড় হয়ে উঠল, আত্মাকে আর এক ধাপ উঠিয়ে দিলে— এদের (জগতের অপার সৌন্দর্য ও নানা স্পন্দনধ্বনি) সার্থকতা এই যে এরা সে উন্নতির আনন্দের কারণ হোল।

এই উপলব্ধিকে উপন্যাসে ধরতে বিভূতিভূষণকে ফিরে যেতে হয়েছে নিজের শৈশবে। একটি অবাক শিশুর অন্তরকে তিনি বড় যত্নে মন ছেনে গড়েছেন।

পাঠশালায় আরেক দিনের কথা। গুরুমশাই শ্রুতিলিখন দিচ্ছেন, সেটি লিখতে লিখতে শব্দের মধুর ঝংকারে অপুর কেমন অদ্ভুত লেগেছিল। সেদিনের শোনা সেই ঝংকৃত শব্দগুলি সে বড় হয়ে খুঁজে পায়। অচেনা শব্দের মায়া কতকাল বুকে রেখেছিলেন বিভূতিভূষণ? কী ছিল সেই গদ্যাংশটি?

‘এই সেই জনস্থান-মধ্যবর্তী প্রস্রবণ গিরি। ইহার শিখরদেশ আকাশপথে সতত-সমীর-সঞ্চরমান-জলধর-পাল সংযোগে নিরন্তর নিবিড় নীলিমায় অলঙ্কৃত-অধিত্যকাপ্রদেশ ঘনসন্নিবিষ্ট বন-পাদপসমূহে সমাচ্ছন্ন থাকাতে স্নিগ্ধ শীতল ও রমণীয়-পাদদেশে প্রসন্ন-সলিলা গোদাবরী তরঙ্গ বিস্তার করিয়া… ইত্যাদি।’

আমরা জানি যে, উপরোক্ত অংশটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত ‘সীতার বনবাস’ রচনা থেকে নেওয়া। বলা বাহুল্য যে, অপু এ ভাষার অর্থ বোঝেনি কিন্তু অজানা শব্দের ছন্দিত দুর্মর আকর্ষণ তাকে ভাবিয়েছে, বড় হয়ে খুঁজে নিতে হবে কোথায় আছে এই লেখাটি।

ভাষার যে মাধুর্য তার সমস্ত ছন্দরস নিয়ে অতটুকু শিশুমনকে স্পর্শ করেছিল, তা জেনে নিজেও অভিভূত হই।

ভবিষ্যতে এই বালক যে আরণ্যক মায়ায় মুগ্ধতার শিখর স্পর্শ করবে এ যেন তারই অতীতছবি। শুধু বাস্তবছবি নয়। বাস্তবের পিছনে যে অসম্ভব মায়ায় তৈরি প্রায় ইন্দ্রজালসমর্থ প্রকৃতি ঠাকুরানী তাঁর সম্মোহনের ক্ষমতাকে অসীম শক্তি দিয়ে প্রয়োগ করেছেন তা নীচের লাইন দু’টিতে আরও স্পষ্ট।

‘তাহার বাবা বলিয়াছিল— ও সোনাডাঙা মাঠের রাস্তা, মাধবপুর দশঘরা হয়ে সেই ধলচিতের খেয়াঘাটে গিয়ে মিশেচে। ধলচিতের খেয়াঘাটে নয়, সে জানিত ও পথটা আরও অনেক দূর গিয়াছে, রামায়ণ-মহাভারতের দেশে।’

কথকঠাকুর মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় বা হরিহরের সন্তান মহাকাব্যের গল্প অনেক শুনেছেন। সেই সব প্রাচীন রাজাদের কথা, তাদের শৌর্যবীর্যের কথা, সব ছাপিয়ে সে দেখতে চেয়েছে অতীতের সেই দেশ, সেই নদী, সেই কুহকিনী বনানী। যুদ্ধের গল্প নয়, দেশবিদেশের গল্প। সেই যেখানে একটি প্রস্রবণ গিরি আছে, লক্ষ্মণ যার বর্ণনা দিচ্ছেন রামকে, এমন সুললিত গদ্যছন্দে সেই স্থানের রূপটি তার মনে অক্ষয় হয়ে গিয়েছিল। তাই, মাত্র ধলচিতের খেয়াঘাট নয়, কিছুতেই নয়, এ সোজা যাবে সেই মায়াবী অরণ্যে, যেখানে লক্ষ্মণ তাঁর অগ্রজকে সেই রম্য বনানীর বর্ণনা দিচ্ছেন।

কিন্তু জীবন তো শুধুই আশার প্রবাহ নয়! কত হতাশাও তো এর বাঁকে বাঁকে রয়ে গিয়েছে। বিভূতিভূষণ অপুর কাছে তুলে ধরেছেন সেই অন্ধকারের ছবিও।

ছোট্ট অপু এরপর মৃত্যু দেখেছে। প্রথমে পিসি ইন্দির ঠাকরুন, তারপর দিদি দুর্গা এবং শেষে কাশীতে বাবা হরিহরের প্রয়াণ। পিসির মৃত্যুতে সে প্রথম পারিবারিক নির্লিপ্ততা কী হতে পারে তাই প্রত্যক্ষ করেছে। দুর্গার যাওয়ায় সে দেখল গ্রামের নির্লিপ্ততা। বাবার মৃত্যু তাকে দেখিয়ে দিল, মৃত্যু অনিবার্য। তার যত ক্ষতিই হোক না কেন জগতের তাতে কিছুই এসে যায় না। জগৎ নির্লিপ্ত, উদাসীন। এই নিষ্ঠুর উদাসীনতা যেদিন জগৎ হয়ে ধরা দিল সেদিন অপু ক্লাস এইটে পড়ে মাত্র। সংসারের একটা কদর্য রূপ সে দেখতে পেয়ে হঠাৎ বড় হয়ে গেছে যেন। তবু অন্তরের গভীরে সেই যে অপার বিস্ময়, সে তো একটুও সরেনি! এই নির্লিপ্ত ও নিষ্ঠুর জগতের অন্তরালে আরেকটি স্নেহময়ী শান্তস্নিগ্ধ সত্ত্বা তাকে জীবনে লগ্ন রাখে। সে কোনওদিন সিনিক হয় না। হাজার অপমানেও সে দুঃখিত হয়ে জীবন থেকে সরে না। এ জীবন তো বিভূতিভূষণের!

এরপর সেই কিশোর মাতৃহারা হয়েছে এবং আরও দরিদ্র হয়েছে। তবু সে কলেজে পড়ে। একদিন তার সঙ্গে দেখা হল নিশ্চিন্দিপুরের সুরেশ ও তার ভাই সুনীলের সঙ্গে। সেই সুনীল, যার মা অপুর গ্রামসম্পর্কে জেঠিমা, যিনি নিমন্ত্রণে ‘ছাঁদা বাঁধবার দরুন’ তাকে ফলারে বামুনের ছেলে বলে অপমান করেছিলেন, সেই তাদের এতদিন পর হঠাৎ সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে এ যেন কল্পনার অতীত। সুনীলকে দেখে অপু যারপরনাই বিস্মিত ও আনন্দিত হল। আসলে, ওই বিস্ময়ই আনন্দের উৎস। তাই পূর্বের অপমান অগ্রাহ্য করেও সে সুনীলের কাছে যায়। নিশ্চিন্দিপুরের সেই সুনীল! এ কি সোজা কথা?

আর কেউ না বুঝলেও সে জানে যে, কোনও ক্ষুদ্র স্বার্থসিদ্ধির জন্য সে এখানে আসেনি। এসেছে সেই ‘বিস্ময়বোধ’ থেকে, যা তার সহজাত। নিশ্চিন্দিপুরের মানুষজনকে যে এই কলকাতা শহরে কখনও দেখতে পাবে, তাই যেন বিশ্বাস হয় না। এই বিস্ময়। বড়লোকের সঙ্গকামনা নয়। এই আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস অত্যন্ত প্রখর ছিল বলেই এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অপু তথা বিভূতিভূষণ মহত্ত্বের সাধনা করতে সমর্থ হয়েছিলেন।

কেন এই অদ্ভুত বিস্ময়? লেখক লিখছেন,

—বিস্ময় মনের অতি উচ্চ ভাব এবং উচ্চ বলিয়াই সহজলভ্য নয়। সত্যকার বিস্ময়ের স্থান অনেক উপরে— বুদ্ধি যার খুব প্রশ্বস্ত ও উদার, মন সবসময় সতর্ক— নূতন ছবি নূতন ভাব গ্রহণ করিবার ক্ষমতা রাখে— সেই প্রকৃত বিস্ময় রসকে ভোগ করিতে পারে। …বিস্ময়কে যাঁহারা বলিয়াছেন Mother of Philosophy তাঁহারা একটু কম বলেন। বিস্ময়ই আসল Philosophy বাকিটা তাহার অর্থসঙ্গতি মাত্র।

এই তাঁর প্রকৃত মনের কথা। যার বিস্ময় রস শুকায় না, সে আজীবন বালক। আজীবন জীবন তাঁকে দু হাত ভরে অমৃত দান করে। দু বিঘার পরিবর্তে লিখে দেয় বিশ্বনিখিল। কত খরচ করতে পারো, করো। সেই প্রাচীন ঋষিদের কথা। পূর্ণ থেকে কিছু নিলে পূর্ণই থাকে। পূর্ণকে কেউ নিঃশেষ করতে পারে না।

একবার ফিরে যাই অপুর শৈশবে। হাঁ-করা ছেলে অপু। বাবার সঙ্গে সে চলেছে গ্রাম ছাড়িয়ে যজমান বাড়ি। একটু দুধটা-ঘিটা খেলে শরীর সারবে। সমস্ত পথ তার অন্তহীন প্রশ্ন। এটা কী, ওটা কী, এ কীসের তার, কেমন করে খবর যায়, হরিহর বিরক্ত। তিনি বছরের বেশির ভাগ সময় বাইরে কাটান। ছেলেপিলের ঝক্কি তাঁর বড় ভাল লাগে না। ওই এক নির্লিপ্ততা। পরিবার আছে বন্ধন নেই। এবার দেখি বিভূতিভূষণের নিজের প্রায় এক অভিজ্ঞতা। স্মৃতির রেখায় তিনি লিখছেন,

—জীবনটা কি অপূর্ব, শুধু তাই আমার মনে পড়ে। সেই কতদিন আগে— মনে পড়ল, এমন দিনটিতে বাবার সঙ্গে গিয়েছিলাম আড়ংঘাটার ঠাকুরবাড়িতে। সেই ছোট ঘরটাতে থাকতাম, মোহন্ত ভোরবেলা উঠে কি স্তোত্র পাঠ করত, আর পিতলের লোটায় ঝোল রেঁধে আমাদের খেতে দিত। সেই তেঁতুলতলার দিকে বেড়াতে যাওয়া— সেই ওপরের ছাদে বসে সংস্কৃত ব্যাকরণ ও ভিক্টর হিউগোর লা মিজারেবল পড়া স্বপ্নের মতো মনে আসে। এই আজকার পূর্ণিমায় আড়ংঘাটার ছাদটা কি রকম দেখাচ্ছে? বাবার করুণ স্মৃতিমাখা আড়ংঘাটার ছাদ কি কখনও ভুলব?

তাই কি ভোলা যায়? কৈশোরে বাবাকে হারিয়েছেন, পিতৃস্নেহ যে ভাগে কম পড়েছিল! তবে অপুর মতন কৈশোরে মা তাঁকে ছেড়ে চলে যাননি।

অপু এখন তরুণ। সে এখন ছড়িয়ে পড়েছে শহরে। কাশীতে বাবার মৃত্যুর পর মা সর্বজয়া অপুর সর্বস্ব ছিলেন। সেই সর্বজয়ার মৃত্যুতে কী লিখলেন লেখক, দেখি একবার,

—সর্বজয়ার মৃত্যুর পর কিছুকাল অপু এক অদ্ভুত মনোভাবের সহিত পরিচিত হইল। প্রথম অংশটা আনন্দ-মিশ্রিত— এমন কি মায়ের মৃত্যু-সংবাদ প্রথম যখন সে তেলি-বাড়ির তারের খবরে জানিল, তখন প্রথমটা তাহার মনে একটা আনন্দ, একটা যেন মুক্তির নিঃশ্বাস… একটা বাঁধন-ছেঁড়ার উল্লাস… অতি অল্পক্ষণের জন্য— নিজের অজ্ঞাতসারে।

এরপরেই নিজেকে বড় হীন মনে হল তার। মা যে তার জন্য সম্পূর্ণ আত্মবিলোপ ঘটিয়েছিলেন! তবু, তবু…

—মাকে এত ভালোবাসিত তো, কিন্তু মায়ের মৃত্যু-সংবাদটা প্রথমে যে একটা উল্লাসের স্পর্শ মনে আনিয়াছিল— ইহা সত্য— সত্য— তাহাকে উড়াইয়া দিবার উপায় নাই।

এই মৃত্যু অপুকে মায়ার বন্ধন থেকে মুক্তি দিয়েছিল। আত্মিক নির্লিপ্ততা। পূর্ণ সন্ন্যাস। বৈরাগ্যের চরম স্তর। একে অস্বীকার করা যায় না। কারণ এ পরমসত্য। জন্মের সময় যেমন বত্রিশ নাড়ির বাঁধন ছিঁড়ে মানুষ ভূমিষ্ঠ হয়, কাঁদে তার সুরক্ষিত ছোট্ট গর্ভকক্ষ থেকে বিচ্যুত হয়ে, পর মুহূর্তে অবাক চোখ মেলে দেখে নতুন পৃথিবীটাকে, তেমনই এই ধরিত্রীর গর্ভ থেকে অসংখ্য মায়ার বাঁধন কেটে মানুষ আরও অনন্তে মুক্তি পায়। মায়ের চেয়ে বড় বন্ধন কই? মা যে এই দেহ ধারণ করেন! যতক্ষণ মা থাকেন ততক্ষণ এই মায়া আমাদের বেড়ি পরিয়ে রাখে। আপাতদৃষ্টিতে এই নিষ্ঠুর উচ্চারণ আমাদের কষ্ট দিলে আমরা যেন ফিরে দেখি, যারা আনুষ্ঠানিক সন্ন্যাস নেন তাঁরা জীবিত পিতামাতার শ্রাদ্ধ ও নিজের আদ্যশ্রাদ্ধ সেরে সন্ন্যাস গ্রহণের অধিকার পান। সেই আনুষ্ঠানিক সন্ন্যাসের চেয়ে বিভূতিভূষণ আরও আন্তরিক সন্ন্যাসের ছবি এঁকেছেন। গ্রহণ তো করতেই হয়।

এই মহাবিশ্ব সম্পর্কে বিভূতিভূষণের অসীম আগ্রহের কথা আমরা জানি। সাধ্যাতীত ভাবে তিনি জ্ঞানবিজ্ঞান সম্পর্কিত বিদেশি পত্রপত্রিকা জোগাড় করতেন। তাঁর ক্ষুধা মেটাতেই হবে। ভাগলপুরে একা থাকার সময় এই পত্রিকা তাঁর সঙ্গী ছিল। অমন দুর্গম প্রবাসে খোলা আকাশের নীচে কাশবনের মাঝে তিনি যেন আরও কাছ থেকে দেখতে পেতেন আকাশকে। মহাকাশকে।

লেখক অপুর সম্পর্কে লিখছেন,— তার একখানা ছেঁড়া ভূগোল বই ছিল ছোটবেলায়, সেই থেকেই সে জানে বইতে জগতের বহু অজানার খবর আছে। …রমাপতিদার কাছ থেকে সে ছেলেদের একখানা মাসিক পত্র নিয়ে পড়েছে। জেনেছে ছায়াপথ কি।

এই যে ধীরে ধীরে অপুর মানসজগৎ পুষ্ট হয়ে উঠছে তার অন্তরালে লেখকের নিবিড় জ্ঞানতৃষ্ণাই তো প্রধান অবলম্বন!

একটি ঘটনার উল্লেখ করলে জানা যাবে, অপুর সঙ্গে লেখক কতটা মিশে আছেন। অপরাজিতর নবম পরিচ্ছেদ। অপু কলেজে গিয়ে দেখল— নোটিশ বোর্ডে লিখিয়া দিয়াছে, যাহাদের মাহিনা বাকী আছে, এক সপ্তাহের মধ্যে শোধ না করিলে কাহাকেও বার্ষিক পরীক্ষা দিতে দেওয়া হইবে না। অপু চক্ষে অন্ধকার দেখিল।

তবে কি সে মনসাপোতা ফিরে যাবে? কিন্তু ‘সে নিজে বেশ বুঝিতে পারে, এই এক বৎসরে তাহার মনের প্রসারতা এত বাড়িয়া গিয়াছে, এমন একটা নতুনভাবে সে জগৎটাকে, জীবনটাকে দেখিতে আরম্ভ করিয়াছে যা কিনা দশ বৎসর মনসাপোতা কি দেওয়ানপুরে পড়িয়া হাবুডুবু খাইলেও সম্ভব হইত না।’

তার মনের প্রসারতা যত বেড়েছে অভাবও বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। এ ঘটনা লেখকের জীবনে ঘটেছে। তিনি পরীক্ষা দিতে পেরেছিলেন কারণ তাঁর অজ্ঞাতে ফি জমা করেছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। লেখক তাঁর বিশেষ স্নেহধন্য ছিলেন। আচার্য যে ছাত্র চিনতে ভুল করেননি, তা আমরা ভালমতন জেনেছি।

উপন্যাসে তখন বন্ধু অনিল তার নিজের ভবিষ্যতের একটি স্বপ্নময় ছবি আঁকছিল। অনিল অত্যন্ত ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র। পরীক্ষায় দারুণ ফল করেছে। সে বলছিল, সে যাবে বিদেশে লেখাপড়া করতে। জনৈক অভ্রখনির অংশীদার তার পরীক্ষার ফল জেনে খুশি হয়ে তাকে বিদেশে পাঠাতে চান। আই এস সি পাশ দিলেই সোজা বিলাত বা ফ্রান্স। সে বলছে,— ‘কেমব্রিজে কি ইম্পিরিয়াল কলেজ অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজিতে পড়বো, রাদারফোর্ড আছেন, টমসন আছেন— এঁদের সব দুবেলা দেখতে পাওয়া একটা পুণ্য— যুদ্ধ থামলে জার্মানিতে যাব।’

বিভূতিভূষণ যখন কলেজে পড়েন তখন প্রথম মহাযুদ্ধ পৃথিবী তোলপাড় করছে। সেই যুদ্ধের অস্থিরতা যে কী ভীষণ ভয়ানক, ভাষায় তা প্রকাশ করার নয়। অথচ প্রকৃত দার্শনিকের মতোই বিভূতিভূষণ তাঁর মনের মাঝে ছবি আঁকছেন বিশ্ববিশ্রুত বিজ্ঞানীদের, যাঁরা পরমাণু থেকে ব্রহ্মাণ্ড নিয়ে গবেষণা করে চলেছেন, যাঁরা প্রতীচ্যের ঋষি। যুদ্ধ, মহামারি, দুর্ভিক্ষ বা শাসকের অপশাসন কিছুই তাঁকে সেইভাবে প্রভাবিত করতে পারছে না। এই নির্লিপ্তি যদি তিনি না পেতেন, তবে একশো বছর পরে বসে আমরা ‘পথের পাঁচালী’ পড়তাম না। কাল জয় করতে হলে সমসাময়িক চিত্রের ঊর্ধ্বে যা চিরকালীন সত্য, মনকে সেইদিকে নিয়ে যেতে হয়।

অনিল অপুকেও সঙ্গে নিতে চায়। যদিও এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি অনিলের স্বপ্নকে চুরমার করে দেয়, তবু সেইদিনের কথাটি ভারি সুন্দর, ভারি মধুর। দুই বন্ধুতে নানা ছেলেমানুষি কথার পর অপু বলল— যখন দেশে ছিলাম, তখন আমার একখানা ‘প্রাকৃতিক ভূগোল’ বলে ছেঁড়া, পুরনো বই ছিল— তাতে লেখা ছিল, এমন সব নক্ষত্র আছে, যাদের আলো আজও পৃথিবীতে এসে পৌঁছয়নি, সেসব এত দূরে— মনে আছে, সন্ধ্যের সময় একটা নদীতে নৌকা ছেড়ে দিয়ে নৌকার উপর বসে সেকথা ভাবতাম, ওপারে একটা কদমগাছ ছিল, তার মাথাতে একটা তারা উঠত সকলের আগে, তারাটার দিকে অবাক হয়ে চেয়ে দেখতাম— কি যে একটা ভাব হত মনে। একটা mystery, একটা upliftএর ভাব— ছেলেমানুষ তখন, সে সব বুঝতাম না, কিন্তু সেই থেকে যখনই দুঃখ হয়েছে, কি কোনো কাজে মন গিয়েছে, তখনই আকাশের নক্ষত্রের দিকে চাইলেই আবার ছেলেবেলার সেই uplift-এর ভাবটা, একটা joy, বুঝলে? একটা অদ্ভুত transcedental joy…

মাত্র তিনদিন পর অনিল মারা গেল। বিভূতিভূষণের প্রতীচ্যের ঋষি মনীষী দর্শনের স্বপ্নও মরে গেল। অসুখ অনিলকে মৃত্যুর তীরে পৌঁছে দিল। অপুর ভয়ানক শোক। মৃতদেহ সৎকার হতে রাত প্রায় শেষ। সকলে গঙ্গায় ডুব দেবে, অপু দেবে না। সে চুপ করে চেয়ে আছে অন্ধকার আকাশের দিকে। আর তখনই ‘পূর্ব-আকাশে চিত্রা প্রত্যাসন্ন দিবালোকের মুখে মিলাইয়া যাইতেছে। অপু মনের মধ্যে কোনো শোক কি দুঃখের ভাব খুঁজিয়া পাইল না।’ বরং তার মনে পড়ল মাত্র তিনদিন আগে সে অনিলকে এই বিস্ময়কর রহস্যের কথা বলেছে, ছেলেবেলায় এই নক্ষত্রটি দেখেই তার সন্ধেবেলাটি কী এক অদ্ভুত আনন্দে পূর্ণ হয়ে যেত। আজও তেমনই ‘এক অপূর্ব, অবর্ণনীয় রহস্যের ভাবে, তাহার মন পরিপূর্ণ হইয়া গেল— কেমন মনে হইতে লাগিল, কি একটা অসীম রহস্য ও বিপুলতার আবেগে নির্বাক নক্ষত্রজগতটা যেন মুহূর্তে মুহূর্তে স্পন্দিত হইতেছে।’

আকাশের বুকে স্পন্দিত নক্ষত্রলোক মৃত্যুকে অতিক্রম করে গেল। অপু তার অপার বিস্ময় নিয়ে নব নব আবিষ্কারের মাঝে অনুভব করল, জীবন অনন্ত। মৃত্যুর পর আবার ফিরবেন বলে বিভূতিভূষণ বিশ্বাস করতেন। কেমন মনে হয়, তাঁর বিস্ময় রসের নিবৃত্তি হয়নি। পূর্ণের প্রতি এক অমোঘ আকর্ষণে তাঁর মনে হয়েছে, তিনি শুধু নয়, প্রতিটি মানুষ এক অনন্ত জীবনধারায় বয়ে যায়। এক মৃত্যু থেকে অন্য জীবনে, আবার সেই জীবন থেকে মৃত্যুতে। এমন অনন্ত জীবনধারা বিনা বিস্ময়ের অনিঃশেষ গতিকে কি করে জীবনরসে সিক্ত করা যাবে!

যুক্তি দিয়ে হয়তো উত্তর মিলবে না, কিন্তু তাঁর মাদার অফ ফিলজফি নয়, দ্য ফিলজফি, এই বিস্ময়রস, সেই দর্শনের পরিপূর্ণতার জন্যই অনন্তের এমন আকাঙ্ক্ষা। তাই অপু, তাই বিভূতিভূষণের অসীম পথরেখা। পথের দেবতা যাকে কখনও থামতে দেয় না। যত বিচ্ছেদ যত মৃত্যু সব যেন মিশে যায় একটি বিন্দুতে। তিনি দেখতে পান— তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যতদূরে আমি ধাই, কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই।

তথ্যসূত্র: পথের পাঁচালী, অপরাজিত ও স্মৃতির রেখা দিনলিপি। (উদ্ধৃতির বানান অপরিবর্তিত)

°°°

চিত্রণ: সৌজন্য চক্রবর্তী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen + 18 =

Recent Posts

অনিন্দিতা মণ্ডল

অনিন্দিতা মণ্ডলের প্রবন্ধ

জীবনের অসীম বিস্ময়: অপু ও বিভূতিভূষণ অ নি ন্দি তা  ম ণ্ড ল জীবন সম্পর্কে আমাদের মনের মাঝে একটা লক্ষ্য অনুসারে নির্দিষ্ট ছক কাটা থাকে।

Read More »
অরণি বসু

অরণি বসুর কবিতা

অ র ণি  ব সু আহূতি অ্যাম্বুল্যান্স থেকে নেমে আগুনের ভিতর দিয়ে সকল আধার কার্ড পেরিয়ে তুমি চলে গেলে। শূন্যতা পাহারা দিচ্ছি আমি। একা একা

Read More »
প্রচেত গুপ্ত

প্রচেত গুপ্তের স্মৃতিকথা

রেলগাড়িতে রোমাঞ্চ প্র চে ত  গু প্ত বুক ধক্ ধক্ করছে। উল্টোদিকের সিটে বসা পুষ্করকে জিজ্ঞেস করলাম— সে আমার যমজ ভাই হলে কী হবে, আমার

Read More »
গৌতম চৌধুরী

গৌতম চৌধুরীর কবিতা

গৌ ত ম  চৌ ধু রী হাতচিঠি বজ্রের মতো লিকলিকে রেখাগুলি হেঁটে যাচ্ছিল অকুতোভয়, অন্ধকার ঝোপঝাড় মাঠ দিগন্ত পার হয়ে। যেন সত্যিই আগুন থেকে উঠে-আসা

Read More »
মন্দাক্রান্তা সেন

মন্দাক্রান্তা সেনের কবিতা

ম ন্দা ক্রা ন্তা  সে ন সাইট সিইং লামাহাটায় গিয়ে তোমাকে ফোন করেছিলাম। তুমি বললে, সাইট সিইং কেমন হচ্ছে? এদিকে আমি তো বসে আছি অরণ্যের

Read More »
ঝুমুর পাণ্ডে

ঝুমুর পাণ্ডের ছোটগল্প

যাত্রা ঝু মু র  পা ণ্ডে আকাশে শব্দ করে একঝাঁক পাখি উড়ে গেল। চমকে তাকালেন সুমন। হ্যাঁ সুমন দত্তরায়। শহরে ছাদের ওপর এই ছোট্ট একটুকরো

Read More »