Search
Generic filters
Search
Generic filters

রণজিৎ হালদারের কবিতাগুচ্ছ

কবিতার খসড়ায় তোমার জন্মদিন

আজ আট এপ্রিল,
আমার কবিতার খসড়ায় কাটাকুটি অবিন্যস্ত তোমার জন্মদিন।
যেখানে আমি ভাঙা হরফে লিখি— অর্ধস্বর পাখির কূজন,
লিখি— এক আকাশ পায়েস, লিখি— সুখী দম্পতি
শালিক জুটির প্রাতঃভ্রমণ, লিখি— রঙিন প্রকৃতির বাহন
চড়ে আসা বাসন্তীদেবীর শুভ আগমন।

আজ আট এপ্রিল। আকাশটা স্বচ্ছ সুনীল।
হাজির বাগানে ধ্বনিত হচ্ছে বসন্ত কুহু,
ডানায় তান ধরে উড়ছে— ভোরের ক্ষুধার্ত গাঙচিল।
বাটি–বাটি পায়েসের ধোঁয়ায় গন্ধ ছড়াচ্ছে শুভ জন্মদিন।

সারস জলাশয়ের কিলবিল-কিলবিল মাছের মত
সরগম আজ তোমার বাড়ি। দরজার আদিম অন্ধকার
খিল ভেঙে এসেছি আমি তোমার দুয়ারে।

পালক, এক চামচ পায়েস দেবে না তুমি অনন্ত খিদের জিভে?

*

ফণা

যখন আমি একলা থাকি, একলা থাকি, ভীষণ একলা,
তখন আমার ‘কষ্টগুলো’ ঝরতে থাকে যেন কচার আঠার— লালা।

নিরিখ মাথায় তীর দেখি না, গাছগুলো সব ধোঁয়া-ধোঁয়া
ঢেউয়ের উপর ঢেউ গড়িয়ে পাচ্ছে না তো তীরের ছোঁয়া।

এমন সময় আমি কেমন ছিপ হাতে বালক মত
গাছ হেলানে বসে আছি আঘাত ব্যাঘাত জর্জরিত।

হঠাৎ দেখি স্রোতের টানে ক্যালেন্ডারে রবীন্দ্রনাথ,
তখনই আমি স্রোতবুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাঁতার—
কাটছি দাঁড় বানিয়ে দুটি হাত।

স্রোতের টানে ভাসিয়ে দিয়ে মান-অভিমান,
সকল ‘কালা’ ধুয়ে ফেলে তোমায় ছোঁব— ও, ভগবান;

খুলে দাওগো, খুলে দাও, বন্ধ হাঁড়ির বিষ-মুলুক,
ফোঁস-ফুঁসিয়ে বিষধরটি, কাব্যগাথায় ফণা তুলুক।

*

শুধু তোমার জন্যে

শুধু তোমার জন্যে আকাশ থেকে ‘সূর্য’ ছিঁড়ে আনতে
‘মধ্যরাতকে’ আমি ‘ভোর’ বানাই। শুধু তোমার জন্যে
একটি ছবি আঁকতে আঁকতে চোখের জলে আমি
‘প্রকৃতি’ গুলে বিচিত্র রং বানাই। তোমার জন্যে, শুধু
তোমার জন্যে একটি কবিতা লিখতে লিখতে আমার
জীবনটা কালি হয়ে যায়; কলঙ্কে ডোবে জীবন।
শুধু তোমার জন্যে আগুন আর জল ছেনে-ছেনে গড়ি
নিষ্পাপ প্রেমের ভুবন; সাপের বিষথলি ফুটো করে
যথেচ্ছ বিষ পান করে পাতাল খুঁড়ে তুলি অমৃতসুধা
শুধু তোমার জন্যে যুদ্ধগামী ঘোড়ার পায়ের তলায়
এই বুক পেতে দেই সাগর পৃষ্ঠায়।

বিষ, আগুন, জল মন্থন করে অনন্ত ভালবাসা শুধু
এই অনাথ ভাণ্ডে পুরেছি তোমার জন্যে; তবু তো আজও
অধরা তোমার ‘প্রেম’। যেমন—
কপালের চাঁদ মহাশূন্যে ঝুলছে জোছনা ছড়িয়ে
‘মারকানাকার’ অরণ্যে।

*

জ্বালা

স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ আমার মায়ের কাছে ছিল— অঙ্গার;
মা প্রায়ই বলতেন— ‘রনু’
আমার ‘ব্যথাগুলো’ অন্তরের স্রোতে ঝিল–নুড়ির মত
অনবরত কোথায় যেন ভেসেই যায়! আমি চাই—
তোর ভিতর আমার ‘জ্বালাগুলো’ জ্বলে উঠুক আর
তুই হয়ে ওঠ আংড়া আগুন। রনু, আমি তো আতুরঘর—
থেকেই আঁচলের গিঁট খুলে ‘সূর্য’ ছেড়ে দিয়েছিলাম—
পুবের আকাশে; তাই তো আজও আমি ‘দিনের’
স্বপ্ন দেখি— এই অন্ধ দুই চোখে।
সমগ্র দেবকুল একদিন স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণেই তোর
কবিতা পড়বে আমার চিতার আগুনের প্রতিটি লোমকূপে।

মাগো, তোমার আশীর্বাদ এখন একটা বন্ধ তালার মধ্যে ঘুরছে।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × five =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
পবিত্র সরকার

পবিত্র সরকারের বিশেষ রচনা

বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষদের রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে একটু বেশি দুর্বলতা আছে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে যত কিছু, তাঁদের কাছেও তত কিছু তো বটেই, কিন্তু তারও চেয়ে অনেকটা বেশি। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেনাপতি। বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় থেকে, আয়ুব শাহি ফরমানে রেডিয়োতে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষেধ আর রবীন্দ্র-শতবার্ষিকীর ওপর ফতোয়া জারি থেকে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক মহাশক্তিধর যোদ্ধা, তাঁর সম্বন্ধে এঁরা তাই এত স্পর্শকাতর।

Read More »
মীরাতুন নাহার

মীরাতুন নাহারের প্রবন্ধ

হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতা এবং মুসলমান-সাম্প্রদায়িকতা উভয়কেই তিনি যুক্তি ও তথ্যদ্বারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ধ্বংসাত্মক বলে বোঝাতে চেয়েছেন দেশবাসীকে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত দেশবাসীকে তিনি হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যদিও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ‘সাম্প্রদায়িকতার বিষ’ দেশবাসীর মন থেকে নিষ্কাশন করে দেশকে বিপন্মুক্ত করা।

Read More »
গৌতম ঘোষ

গৌতম ঘোষের প্রবন্ধ

চলচ্চিত্রের ধর্ম হল সময়কে ধরে রাখা, সময়ের স্মৃতিমালাকে ধরে রাখা। সেই পদ্ধতি, সেই প্রক্রিয়া কিন্তু চলতেই থাকবে। এখন আমাদের আরও মানবিক হতে হবে। চলচ্চিত্র যারা তৈরি করবেন তারা শুধুমাত্র সস্তার বিনোদন সরিয়ে রেখে একটু মানবিক ছবি করবেন। যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক, মানুষ ও সমাজের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক থাকবে। যা আমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক সব সিনেমায় দেখেছি, সেই ভাবনায় ভাবতে হবে।

Read More »
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ নিবন্ধ

বস্তুত সুকান্ত কবিতার চাইতে বড়। তিনি এক প্রতীকচিহ্ন। সারা ভারতে যখন কবিকে ভাবা হয়েছে জনতার একজন প্রতিনিধি হিসেবে, তখন সুকান্তকেই ভাবা হয়েছে। তামিল বা হিন্দি সিনেমাতেও হয়েছে। যেমন রাজেশ খান্নার ‘অনুরোধ’ নামের ছবিটিতে যে কবিটি রাজেশের বন্ধু ছিলেন তার নাম সুকান্ত। অথবা অতদূরে কেন যাই, বাংলায় উত্তম-তনুজার ‘দেনা পাওনা’ ছবিতে উত্তম যে বন্ধুর চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন, তার নামও তো সুকান্ত। তিনিও তো ফুসফুসের রোগী।

Read More »