Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

রণজিৎ হালদারের কবিতাগুচ্ছ

কবিতার খসড়ায় তোমার জন্মদিন

আজ আট এপ্রিল,
আমার কবিতার খসড়ায় কাটাকুটি অবিন্যস্ত তোমার জন্মদিন।
যেখানে আমি ভাঙা হরফে লিখি— অর্ধস্বর পাখির কূজন,
লিখি— এক আকাশ পায়েস, লিখি— সুখী দম্পতি
শালিক জুটির প্রাতঃভ্রমণ, লিখি— রঙিন প্রকৃতির বাহন
চড়ে আসা বাসন্তীদেবীর শুভ আগমন।

আজ আট এপ্রিল। আকাশটা স্বচ্ছ সুনীল।
হাজির বাগানে ধ্বনিত হচ্ছে বসন্ত কুহু,
ডানায় তান ধরে উড়ছে— ভোরের ক্ষুধার্ত গাঙচিল।
বাটি–বাটি পায়েসের ধোঁয়ায় গন্ধ ছড়াচ্ছে শুভ জন্মদিন।

সারস জলাশয়ের কিলবিল-কিলবিল মাছের মত
সরগম আজ তোমার বাড়ি। দরজার আদিম অন্ধকার
খিল ভেঙে এসেছি আমি তোমার দুয়ারে।

পালক, এক চামচ পায়েস দেবে না তুমি অনন্ত খিদের জিভে?

*

ফণা

যখন আমি একলা থাকি, একলা থাকি, ভীষণ একলা,
তখন আমার ‘কষ্টগুলো’ ঝরতে থাকে যেন কচার আঠার— লালা।

নিরিখ মাথায় তীর দেখি না, গাছগুলো সব ধোঁয়া-ধোঁয়া
ঢেউয়ের উপর ঢেউ গড়িয়ে পাচ্ছে না তো তীরের ছোঁয়া।

এমন সময় আমি কেমন ছিপ হাতে বালক মত
গাছ হেলানে বসে আছি আঘাত ব্যাঘাত জর্জরিত।

হঠাৎ দেখি স্রোতের টানে ক্যালেন্ডারে রবীন্দ্রনাথ,
তখনই আমি স্রোতবুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাঁতার—
কাটছি দাঁড় বানিয়ে দুটি হাত।

স্রোতের টানে ভাসিয়ে দিয়ে মান-অভিমান,
সকল ‘কালা’ ধুয়ে ফেলে তোমায় ছোঁব— ও, ভগবান;

Advertisement

খুলে দাওগো, খুলে দাও, বন্ধ হাঁড়ির বিষ-মুলুক,
ফোঁস-ফুঁসিয়ে বিষধরটি, কাব্যগাথায় ফণা তুলুক।

*

শুধু তোমার জন্যে

শুধু তোমার জন্যে আকাশ থেকে ‘সূর্য’ ছিঁড়ে আনতে
‘মধ্যরাতকে’ আমি ‘ভোর’ বানাই। শুধু তোমার জন্যে
একটি ছবি আঁকতে আঁকতে চোখের জলে আমি
‘প্রকৃতি’ গুলে বিচিত্র রং বানাই। তোমার জন্যে, শুধু
তোমার জন্যে একটি কবিতা লিখতে লিখতে আমার
জীবনটা কালি হয়ে যায়; কলঙ্কে ডোবে জীবন।
শুধু তোমার জন্যে আগুন আর জল ছেনে-ছেনে গড়ি
নিষ্পাপ প্রেমের ভুবন; সাপের বিষথলি ফুটো করে
যথেচ্ছ বিষ পান করে পাতাল খুঁড়ে তুলি অমৃতসুধা
শুধু তোমার জন্যে যুদ্ধগামী ঘোড়ার পায়ের তলায়
এই বুক পেতে দেই সাগর পৃষ্ঠায়।

বিষ, আগুন, জল মন্থন করে অনন্ত ভালবাসা শুধু
এই অনাথ ভাণ্ডে পুরেছি তোমার জন্যে; তবু তো আজও
অধরা তোমার ‘প্রেম’। যেমন—
কপালের চাঁদ মহাশূন্যে ঝুলছে জোছনা ছড়িয়ে
‘মারকানাকার’ অরণ্যে।

*

জ্বালা

স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ আমার মায়ের কাছে ছিল— অঙ্গার;
মা প্রায়ই বলতেন— ‘রনু’
আমার ‘ব্যথাগুলো’ অন্তরের স্রোতে ঝিল–নুড়ির মত
অনবরত কোথায় যেন ভেসেই যায়! আমি চাই—
তোর ভিতর আমার ‘জ্বালাগুলো’ জ্বলে উঠুক আর
তুই হয়ে ওঠ আংড়া আগুন। রনু, আমি তো আতুরঘর—
থেকেই আঁচলের গিঁট খুলে ‘সূর্য’ ছেড়ে দিয়েছিলাম—
পুবের আকাশে; তাই তো আজও আমি ‘দিনের’
স্বপ্ন দেখি— এই অন্ধ দুই চোখে।
সমগ্র দেবকুল একদিন স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণেই তোর
কবিতা পড়বে আমার চিতার আগুনের প্রতিটি লোমকূপে।

মাগো, তোমার আশীর্বাদ এখন একটা বন্ধ তালার মধ্যে ঘুরছে।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

17 + eleven =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর চারটি কবিতা

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »