Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

রং, রস, রসায়ন এবং নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী অসওয়াল্ড

আজও সাধারণ মানুষ রং বলতে লাল, নীল, সবুজ, গেরুয়া কিংবা ফুল, উদ্ভিদ, প্রজাপতি বা ময়ূরের পেখমের রঙের কথাই বোঝেন। রং যে শুধু চিত্রশিল্পীদের রং-তুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, রঙেরও যে বিজ্ঞান আছে, অনেকেই তা জানি না।

প্রকৃতির অন্তর্গত উদ্ভিদ থেকে পাখি, পতঙ্গ— এসব কিছুর মধ্যে রয়েছে নানান রঙের সমাহার। রক্ত কিংবা এক এক জায়গার মানুষের গায়ের রং। রামধনু, সূর্যোদয় কিংবা সূর্যাস্ত আর রাতের আকাশের তারাদের রং। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষকে মুগ্ধ করেছে প্রকৃতির এইসব অপরূপ বর্ণময়তা। সৌন্দর্যবোধের সঞ্চার করছে মানুষের মনে। মানুষের শিল্পকলার ইতিহাসও বেশ পুরনো। বহু আগে থেকেই মানুষ ছবি আঁকা কিংবা ছবিতে রঙের ব্যবহার শিখেছে। প্রকৃতির নানান উপাদান থকে তখন সেই সময়ের মানুষ রং যোগাড় করত। মাটি, পাথর, কাঠ-কয়লা, ফুল, পাতা কিংবা নানান খনিজ পদার্থ গুঁড়ো করে। পরবর্তী সময়ে মানুষ বুঝতে চেষ্টা করেছে কোথা থেকে আসে এই রং? পাশাপাশি শিখে নিয়েছে সঠিক রঙের ব্যবহারও। আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে বিজ্ঞানীরা রং, রঞ্জক পদার্থ নিয়ে গবেষণা করে সেই আরোহিত জ্ঞান দিয়ে আমাদের সমৃদ্ধ করেছেন।

আজ এমন একজনের কথা বলব রঙের প্রতি ছিল যাঁর গভীর অনুরাগ ও আগ্রহ। শুধু রং নয়, রঙের থিয়োরি, ‘থিয়োরি অব কালার’ বিষয়ে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের অবতারণা করেছেন। এরকম রঙের কারবারি যে একজন ‘প্যাশনেট পেইন্টার’ হবেন, তা বলাই বাহুল্য। তাঁর আঁকা চিত্রশিল্পের একটি নমুনা এখানে দিলাম। আরও একটা কথা বলতে হয়, তা হল আঁকার জন্যে তিনি নিজেই রঙের রাসায়নিক (পিগমেন্ট) তৈরি করে নিতেন। তাঁর ‘কালার থিয়োরি’, কালার-টেবিল, স্কেল ও চার্ট বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ফাইন-আর্ট এবং শিল্পক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল।

ফ্রিডরিখ উইলহেম অসওয়াল্ডের অঙ্কন।

তবে যাঁর কথা বলছি, চিত্রশিল্পী হিসেবে তাঁর সেরকম কোনও পরিচিতি নেই। বস্তুত একজন স্বনামধন্য রসায়নবিদ হিসেবেই তিনি পরিচিত। তাঁর নাম অসওয়াল্ড। পুরো নাম ফ্রিডরিখ উইলহেম অসওয়াল্ড (Friedrich Wilhelm Ostwald, ১৮৫৩–১৯৩২)। বাল্টিক-জার্মান ভৌত রসায়নবিদ এবং দার্শনিক। ‘রিয়াকসন ভেলোসিটিজ এবং ক্যাটালিসিস’-এর দিগদর্শী কাজের জন্যে তিনি ১৯০৯ সালে রসায়নবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। অসওয়াল্ডকে আধুনিক ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মানা হয়। অনুঘটক ও অনুঘটন প্রক্রিয়া, রাসায়নিক ভারসাম্য ও বিক্রিয়ার গতি সংক্রান্ত গবেষণায় তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। অসওয়াল্ড জনপ্রিয় হয়ে আছেন তাঁর ‘অসওয়াল্ড প্রসেস’ আবিষ্কারের জন্যে, যা অ্যামোনিয়া গ্যাস থেকে নাইট্রিক অ্যাসিড তৈরি করায় ব্যবহৃত হয়। রাসায়নিক শিল্পে যা অত্যন্ত জরুরি।

পঁয়তাল্লিশটি বই, পাঁচশোর বেশি গবেষণাপত্র এবং পাঁচ হাজার রিভিউ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর। এছাড়াও ছ’টি স্কলারলি জার্নাল সম্পাদনা করেছেন তিনি। তিনি প্রসিদ্ধ পত্রিকা ‘জার্নাল অফ ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি’-র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। দুখণ্ডে ‘টেক্সট বুক অফ জেনারেল কেমিস্ট্রি’ এবং তিন খণ্ডে লিখেছেন আত্মজীবনী।

স্বনামধন্য রসায়নবিদ অসওয়াল্ড ১৯০৬ সালে কর্মক্ষেত্র থেকে অবসর নেওয়ার পরে দর্শন, শিল্পকলা এবং রাজনীতিতে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। শুধু জড়িয়ে পড়াই নয়, এর প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি প্রচুর সময় দিয়েছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গিয়েছেন শিল্পকলা ক্ষেত্রে। এছাড়া সাহিত্য ও মিউজিকেও ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। অবসর জীবনে তিনি ছবি আঁকা, কবিতা লেখা এবং ‘ভায়োলা’-য় সুর বাজাতেন আপনমনে। ‘ভায়োলা’ ছাড়াও ‘পিয়ানো’, ‘হারমোনিয়াম’ এবং ‘ব্যাসন’ বাজানোতেও দক্ষ ছিলেন। এছাড়াও তিনি মিউজিক কম্পোজও করতেন। এভাবেই তিনি উপভোগ করতেন। বস্তুত তাঁর শিল্পকলা এবং দর্শন-ভাবনা যেন কোনও সূত্রে তাঁর বৈজ্ঞানিক থিয়োরির সঙ্গে জড়িত ছিল। ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রির কাজের পাশাপাশি ‘কালার থিয়োরি’, ‘দ্য হিস্ট্রি অ্যান্ড ফিলোজফি অফ সায়েন্স’ নিয়ে রয়েছে তাঁর অজস্র গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

সারা জীবন ধরে বহুধাবিস্তৃত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন অসওয়াল্ড। তাঁর শিল্পকলা সংক্রান্ত কাজ এবং দর্শন বিষয়ক ধারণাগুলি প্রথমে সেভাবে আদৃত হয়নি। বলা ভাল, অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষা করা হয়েছিল। যদিও চিত্রশিল্পীরা মনে করেন, তিনিই প্রথম ‘কালার থিয়োরি’-র উদ্ভাবক। অসওয়াল্ড এক হাজারের বেশি পেইন্টিং এবং তিন হাজারের কাছাকাছি প্যাস্টেল ও রং নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা ও চর্চা করেছেন।

বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও উদ্ভাবনী প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে শৈল্পিক অভিজ্ঞতার যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে— একাধিক চিন্তকদের এরকমই ধারণা। অসওয়াল্ড নিজেও বিশ্বাস করতেন তা। বিজ্ঞান এবং শিল্পকলা এই দুইয়েরই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কাঙ্ক্ষিত বস্তু বা ধারণাকে বোঝার চেষ্টা করা। মেধা ও বুদ্ধি আশ্রয় করে বিজ্ঞান সমাধানের লক্ষ্যে এগোয়। অন্যদিকে কল্পনা ও মানসচক্ষের ছবি আশ্রয় করে শিল্পকলা এগোয় সমাধানের উদ্দেশে। অসওয়াল্ডের কাছে শিল্পকলাচর্চা নিছকই অনুরাগের বিষয় ছিল না। বিজ্ঞানের জটিল ভাবনার মধ্যে কিছুক্ষণ শিল্পচর্চা তাঁর কাছে ছিল বিশুদ্ধ আলো-হাওয়ার মত।

Advertisement

আজ ২ সেপ্টেম্বর। অসওয়াল্ডের জন্মদিন। তাঁকে স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানানোর জন্যে এই সামান্য নিবেদন।

তথ্যসূত্র

Philip Ball and Mario Ruben, Color Theory in Science and Art: Ostwald and the Bauhaus, Angew. Chem. Int. Ed. 2004, 43, 4842 –4846।

Philip Ball, Painting by numbers Chemist Wilhelm Ostwald added colour to the art world., NATURE, VOL 425, 30 OCTOBER 2003

Pallavi Bhattacharyya, Wilhelm Ostwald – The Scientist, RESONANCE, May 2012, 428-433

Robert Root-Bernstein, Wilhelm Ostwald and the Science of Art, LEONARDO, Vol. 39, No. 5, pp. 418–419, 2006

চিত্র: গুগল

2 Responses

  1. রসায়ন এর বিভিন্ন অধ্যায়ে উইলিয়াম অসটওয়াল্ড’এর কত theories, laws & Equations পড়েছি। ভৌত রসায়ন’এর এক অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবেই তাঁকে জেনেছি। কিন্তু অনন্য চিত্র শিল্পী, সুরসাধক, কবি ও দার্শনিক অসটওয়াল্ড এর এই অনন্য পরিচয় কখনো কোন রসায়নের পাঠ্য পুস্তক এ হাইলাইটেড হতে দেখিনি। এ একান্তই আমাদের শিক্ষার অপূর্ণতা।
    ভুবন রিখ্যাত একাধিক বিজ্ঞানীর বহুমুখী নানা অজানা প্রতিভার সন্ধান ও তার ওপর আলোকপাত করে লেখক সিদ্ধার্থ মজুমদার তাঁর পাঠকদের সমৃদ্ধ করে চলেছেন দীর্ঘদিন যাবৎ। মুগ্ধ বিস্ময়ে আরও একবার সমৃদ্ধ হলাম আজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 − four =

Recent Posts

সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

ছোটগল্প: ফাউ

গরমকালে ছুটির দিনে ছাদে পায়চারি করতে বেশ লাগে। ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়োয় শরীরটা। আকাশের একপাশে আবির। সন্ধে হবে হবে। অন্যদিকে কাঁচা হলুদ। চায়ের ট্রে নিয়ে জমিয়ে বসেছে রুমা। বিয়ের পর কি মানুষ প্রেম করতে ভুলে যায়? নিত্যদিন ভাত রুটি ডালের গল্পে প্রেম থাকে না কোথাও? অনেকদিন রুমার সঙ্গে শুধু শুধু ঘুরতে যায়নি ও।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার…

মনু-পরাশর-বৃহস্পতি-কৌটিল্যদের অনুশাসন এসে নারী প্রগতির রাশ টেনে ধরল। নারীর শিক্ষালাভের ইতি ঘটল, অন্তঃপুরে বাস নির্দিষ্ট হল তাঁর জন্য। তাঁকে বাঁধা হল একের পর এক অনুশাসনে। বলা হল, স্বাধীনতা বলে কোনও পদার্থ থাকবে না তাঁর, ‘ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি’! কুমারী অবস্থায় পিতা-মাতার অধীন থাকবে সে, বিয়ের পর স্বামীর, বার্ধক্যে সন্তানের। ধাপে ধাপে তাঁর ওপর চাপানো হতে লাগল কঠিন, কঠিনতর, কঠিনতম শাস্তি।

Read More »
স্বপনকুমার মণ্ডল

গরিব হওয়ার সহজ উপায়

এককালে পর্তুগিজ-মগরা আমাদের নিম্নবঙ্গ থেকে দাস সংগ্রহ করত মালয়-বার্মাতে শ্রমিকের কাজের জন্য, ইংরেজ সাহেবরাও কিনত গোলাম। আজ আবার মানুষ সস্তা হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসকের দরকার নেই। খোলাবাজারে নিজেরাই নিজেদের কিনছে দেশের মানুষ। মানুষ বিক্রির মেলা বসে এখন গ্রামগঞ্জের হাটে হাটে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহাশ্বেতা দেবী: স্বনামে চিহ্নিত অনশ্বর প্রতিভা

গ্রামশি-বর্ণিত ও পরবর্তীতে বহুলচর্চিত ‘সাব অলটার্ন’-এর আগেই মহাশ্বেতার লেখায় ব্রাত্যজনসংহিতা মূর্ত; ‘অরণ্যের অধিকার’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৭-এ। আর সাব অলটার্ন-তত্ত্ব প্রথম দানা বাঁধছে ১৯৮২-তে জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে, রণজিৎ গুহ, গৌতম ভদ্র, শাহেদ আমিন, পার্থ চট্টোপাধ্যায়দের সঙ্কলন প্রকাশের মাধ্যমে। অবশ্য তার বহু আগেই ইতিহাস রচনায় সাব অলটার্ন চেতনায় স্থিতধী দেখা গেছে রবীন্দ্রনাথকে। স্বামী বিবেকানন্দ মূর্খ, চণ্ডাল ও দরিদ্র ভারতবাসীর মাহাত্ম্য বুঝিয়ে গেছেন, আর বিভূতিভূষণকেও আমরা সামগ্রিক বিচারে প্রান্তিক মানুষের কথাকার রূপেই পাই। কিন্তু মহাশ্বেতা আরও ব্যাপক, গভীর, তন্ময়, নিবিড়, ও নিঃসন্দেহে দলিত জনতার কথাকার।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

সারদাদেবী: এক অনন্যা মাতৃরূপা

ব্রাহ্মণ ঘরের মেয়ে ও বধূ হয়ে তিনি কিনা মুসলমান ঘরামি আমজাদকে খেতে দিয়ে তার এঁটোকাটা নিজের হাতে পরিষ্কার করেন! বিধর্মী খ্রিস্টান নিবেদিতার সঙ্গে বসে আহার করেন! আর তাঁর চেয়েও বড় কথা, সে যুগের বিচারে বিপ্লবাত্মক ঘটনা, স্বামীর মৃত্যুর পর যে দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর বেঁচেছিলেন তিনি, বিধবাবিবাহের প্রবর্তক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর-ও যা কল্পনায় আনতে গেলে নির্ঘাত মূর্ছা যেতেন, লালপেড়ে শাড়ি আর সোনার বালায় ভূষিতা থাকতেন তিনি! আজকের উচ্চশিক্ষিত সমাজেও ক’জন পারবেন এ-কাজ করতে, বা নিদেন এ কাজকে সমর্থন করতে?

Read More »
মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »