
প্রবন্ধ: শুভেন্দু সরকার
বঙ্কিমের সমাজ-ভাবনা সমাজের সব স্তরের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নতি যে দেশের সার্বিক বিকাশের পূর্বশর্ত— তা বুঝেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪)। এই ভাবনা তাঁর লেখালিখির পেছনেও কাজ করে।

বঙ্কিমের সমাজ-ভাবনা সমাজের সব স্তরের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নতি যে দেশের সার্বিক বিকাশের পূর্বশর্ত— তা বুঝেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪)। এই ভাবনা তাঁর লেখালিখির পেছনেও কাজ করে।

India’s First Bengali Daily Journal. ব্রিটিশ সংসদে সতীদাহ রদ অথবা তৎকালীন মোঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর-এর ভাতা বৃদ্ধির জন্যে দরবারের পাশাপাশি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সনদ পুনর্নবীকরণের (১৮৩৩) আগে সিলেক্ট কমিটির প্রশ্নাবলির উত্তর দিলেন তিনি। দেখার ব্যাপার, শেষ তিন বছরে রামমোহনের যাবতীয় ইংরেজি লেখাপত্তরে তাঁর আর্থ-রাজনৈতিক ধ্যানধারণার স্পষ্ট হদিশ পাওয়া গেল। সেসবের পেছনে ছিল তাঁর স্বাদেশিকতা। সেই স্বাদেশিকতার অর্থ অবশ্য পুরোপুরি ইংল্যান্ডের বিরোধিতা নয়।

India’s First Bengali Daily Magazine. রক্তকরবী-তে বাস্তববাদের আধারে কয়েকটি রূপক চরিত্র নিয়ে আসেন রবীন্দ্রনাথ। আগেই বলেছি, বাস্তববাদ কিছু শর্ত আরোপ করে, যা থেকে রবীন্দ্রনাথও রেহাই পান না। সুতরাং নাটক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে নন্দিনীকে আবার একটি ‘সাধারণ’ চরিত্র হিসেবেও দেখানোর দরকার পড়ে। পুরোপুরি রূপক চরিত্রর হলে অন্যদের সঙ্গে তাঁর কথা বলা সম্ভব ছিল না। তাই ফাগুলালকে বলতে হল, নন্দিনীকে আগে থেকে চিনতেন বিশু (“বিশুর বিপদ আজ ঘটে নি, এখানে আসবার অনেক আগে থাকতেই নন্দিনীকে জানে”)। রাজা ছাড়া অন্য চরিত্রর সঙ্গে কথা বলার সময় নন্দিনীকে রক্তমাংসর মানুষের মতো করে হাজির করতে হয়।

India’s First Bengali Story Portal. বিদ্যাসাগর আর সুরেন্দ্রনাথের মধ্যে ছিল একটি প্রজন্মর ব্যবধান। আধুনিক মনোভাবাপন্ন এক শিক্ষিত সম্প্রদায় গড়তে চেয়েছিলেন বিদ্যাসাগর; অন্যদিকে, সেসব প্রগতিশীল তরুণের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবি তোলেন সুরেন্দ্রনাথ। বিদ্যাসাগরের কাজের জগৎ ছিল দেশি সমাজ— তাই বহুক্ষেত্রে তিনি পেয়েছিলেন উদারমনস্ক ব্রিটিশ আধিকারিকদের সাহায্য। কিন্তু সুরেন্দ্রনাথের প্রজন্ম প্রশাসনের অংশ হতে চাইল— সাম্রাজ্যবাদী চেতনার সঙ্গে তাঁদের সরাসরি সংঘাত তো স্বাভাবিক! সাংবিধানিক পথ হলেও তা ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম ধাপ। প্রত্যক্ষ রাজনীতি বিদ্যাসাগর এড়িয়ে চললেও সুরেন্দ্রনাথ তা পারেননি।

তৎকালীন সমাজের আর্থ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বগুলি ফুটে উঠেছে শেক্স্পিয়র-এর কোরিওলেনাস-এ। কিন্তু সেসব দ্বন্দ্বর সংশ্লেষণ ঘটানোর চেষ্টা এখানে অনুপস্থিত। সেটা অবশ্য স্বাভাবিক। ইতিহাসের ওই পর্যায় সাধারণ মানুষকে নেতৃত্ব দিতে গড়ে ওঠেনি কোনও আলাদা শ্রেণি। খেটে-খাওয়া জনতার সামনে এককাট্টা হওয়ারও সুযোগ আসেনি। নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি আর ক্ষমতাদখলের প্রশ্ন তাই মূল্যহীন। সমাজের অর্থনৈতিক বুনিয়াদে আমূল পরিবর্তন না-ঘটলে তা অসম্ভব। সেইজন্যে কোরিওলেনাস-এর দ্বন্দ্বগুলির মধ্যে ঐক্যস্থাপন করা গেল বিশ শতকে বের্টল্ট ব্রেশ্ট্ (১৮৯৮-১৯৫৬)-এর রূপান্তরের মাধ্যমে।

স্ত্রীশিক্ষার প্রসারে বরাবর বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চেয়েছেন ইয়ং বেঙ্গলের সদস্যরা। তা প্রথম ঘটল ১৮৪৭-এ যখন নানা বাধা ঠেলে প্যারীচরণ সরকার আর কালীকৃষ্ণ মিত্রর উদ্যোগে বারাসতে প্রতিষ্ঠিত হল মেয়েদের স্কুল। তার পরে ১৮৪৯-এ, যখন একই ভাবনা নিয়ে নর্মান বেথুন এগিয়ে এলেন তখন রামগোপাল ঘোষ যোগালেন সাহায্যর হাত। ‘ক্যালকাটা ফিমেল স্কুল’-এ বাংলায় অ-ধর্মীয় লেখাপড়া শুরু হল দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের বাগানবাড়িতে।

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।