বঙ্কিমের সমাজ-ভাবনা
সমাজের সব স্তরের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নতি যে দেশের সার্বিক বিকাশের পূর্বশর্ত— তা বুঝেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪)। এই ভাবনা তাঁর লেখালিখির পেছনেও কাজ করে। তাই ইংরিজি জানা হাতে-গোনা কিছু লোক নয়, সাধারণ বাঙালির কাছে পৌঁছতে চেয়েছিলেন তিনি। এদিক দিয়ে দেখলে, বাঙলা ভাষা বঙ্কিমের কাছে ছিল সামাজিক আন্দোলনের হাতিয়ার; উঁচু আর নিচু শ্রেণির মধ্যে বৈষম্য ঘোচানোর মাধ্যম। আধুনিক পাশ্চাত্য ধ্যানধারণা বাঙলা ভাষায় ছড়িয়ে পড়ুক বিস্তৃত এলাকায়— এমনই চেয়েছিলেন তিনি। সেই উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু হয় বঙ্গদর্শন (১৮৭২)। ‘পত্র সূচনা’-য় বঙ্কিম সাফ জানান,
প্রধান কথা এই যে, এক্ষণে আমাদিগের ভিতরে উচ্চ শ্রেণী এবং নিম্ন শ্রেণীর লোকের মধ্যে পরস্পর সহৃদয়তা কিছুমাত্র নাই। উচ্চশ্রেণীর কৃতবিদ্য লোকেরা, মূর্খ দরিদ্র লোকদিগের কোন দুঃখে দুঃখী নহেন। মূর্খ দরিদ্রেরা, ধনবান্ এবং কৃতবিদ্যদিগের কোন সুখে সুখী নহে। এই সহৃদয়তার অভাবই দেশোন্নতির পক্ষে সম্প্রতি প্রধান প্রতিবন্ধক। ইহার অভাবে, উভয় শ্রেণীর মধ্যে দিন দিন অধিক পার্থক্য জন্মিতেছে। উচ্চ শ্রেণীর সহিত যদি পার্থক্য জন্মিল, তবে সংসর্গ-ফল জন্মিবে কি প্রকারে? যে পৃথক্, তাহার সহিত সংসর্গ কোথায়? এরূপ কোন দেশে হয় নাই যে, ইতর লোক চিরকাল এক অবস্থায় রহিল, ভদ্র লোকদিগের অবিরত শ্রীবৃদ্ধি হইতে লাগিল। বরং যে যে সমাজের বিশেষ উন্নতি হইয়াছে, সেই সেই সমাজে উভয় সম্প্রদায় সমকক্ষ, বিমিশ্রিত এবং সহৃদয়-সম্পন্ন। যতদিন এই ভাব ঘটে নাই— যতদিন উভয়ে পার্থক্য ছিল, ততদিন উন্নতি ঘটে নাই। যখন উভয় সম্প্রদায়ের সামঞ্জস্য হইল, সেই দিন হইতে শ্রীবৃদ্ধি আরম্ভ।১
ঘটনা হলো, উনিশ শতকের অন্যান্য আগুয়ান মনীষীর মতো পাশ্চাত্য জগৎ সম্পর্কে বঙ্কিমের ধারণা ছিল দ্বান্দ্বিক। ইংরিজির মাধ্যমে তাঁদের সামনে খুলে গিয়েছিল ইওরোপ-আমেরিকার যাবতীয় প্রগতিশীল ধ্যানধারণার জগৎ। তাঁরা বুঝেছিলেন, রেনেসাঁস-পরবর্তীকালে ইওরোপে যেমন যুক্তির যুগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, প্রায় স্থবির ভারতীয় সমাজেও তেমনি গুণগত পরিবর্তন প্রয়োজন। মনে রাখা চাই, সামন্ততন্ত্রর বিরুদ্ধে বুর্জোয়া শ্রেণির লড়াইয়ের জন্যে এই আর্থ-সামাজিক বিপ্লব সম্ভব হয়েছিল পাশ্চাত্যে। স্বাভাবিক যে, অর্থনৈতিক বনিয়াদ আর যুগান্তকারী চিন্তাভাবনার মধ্যে সেখানে জৈবিক সম্পর্ক থাকবে। তার প্রভাব আর বিস্তার— দুইই ঘটবে ব্যাপকভাবে। ভারতের বাস্তবতা ছিল অবশ্য আলাদা। ঔপনিবেশিক পরিবেশে আধুনিক পাশ্চাত্য বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তাভাবনার আমদানি হয় এখানে। এর পেছনে ছিল গুটি কয়েক ব্যক্তি আর বিদেশি বইপত্তরের প্রভাব। বলা বাহুল্য, অর্থনৈতিক বনিয়াদের সঙ্গে এসবের সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে, ইওরোপে বুর্জোয়াদের যে মুক্তিদাতার ভূমিকায় দেখা যায়, তার সঙ্গে ভারতে ব্রিটিশ শাসকের বাস্তব চেহারারও বিস্তর ফারাক। নানা কিসিমের শোষণের শিকার হওয়া ছিল ভারতীয়দের রোজকার অভিজ্ঞতা। রামমোহন থেকে বঙ্কিম— সকলকেই এই জটিল পরিস্থিতির নিরিখে বিচার করা উচিত। এঁদের আর্থ-সামাজিক চিন্তাভাবনায় বুর্জোয়া ধ্যানধারণা ব্যাপক ছাপ ফেলে। কিন্তু সেসব কীভাবে কার্যকর করা যায়— তা নিয়ে তাঁদের মত ছিল পরস্পর-বিরোধী। ব্রিটিশ শাসকদের কেউ পরিত্রাতা মনে করেন, কেউ আবার দেশি সম্প্রদায়ের ওপর ভরসা রাখেন। উনিশ শতকে আগুয়ান বাঙালির আন্দোলন সমাজ-সংস্কার থেকে ক্রমশ হয়ে উঠল রাজনৈতিক। পরবর্তীকালে নিঃসন্দেহে সেখানে দেশি উপাদান ক্রমশ বাড়ল, কিন্তু পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব একেবারে উধাও হয়ে গেল— এমন বলা যাবে না। বরং এ কথা ঠিক যে, প্রাচ্য-পাশ্চাত্যর দ্বান্দ্বিক সংশ্লেষের মধ্যে দিয়ে ভারতে তৈরি হলো সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামের ধারা।
উনিশ শতকে সমাজ-সংস্কারের একটি মডেল তৈরি করেছিলেন রামমোহন। দেখার ব্যাপার, যেসব বিষয় নিয়ে তিনি নিজে সরব হন, সেগুলিই মূলত এল পরবর্তীকালের প্রগতিবাদী আন্দোলনের আওতায়। বাঙলায় আর্থ-সামাজিক আন্দোলন ধীরে ধীরে আরও ব্যাপক এলাকায় ছড়াল ঠিকই, তাতে নতুন নতুন উপাদানও যোগ হলো, কিন্তু ভুললে চলবে না, অমীমাংসিত প্রকল্পগুলি (যেমন জাত-পাত, কৃষক, আইন, রাজস্ব আর নারী) নিয়ে চর্চা কখনও থামল না।
আগেই বলেছি, বঙ্কিম চেয়েছিলেন, আর্থ-সামাজিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিক বঙ্গদর্শন। তাই অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি তিনি সেখানে নিয়মিত তুলে ধরেন বাঙলার নানা সমস্যা; সেইসঙ্গে হাজির করেন সেসবের সমাধানের সূত্র। এও মনে থাকা দরকার যে, এই প্রবন্ধগুলোয় বঙ্কিমের রাজনৈতিক ভাবনার ছাপ পড়েছে।
বঙ্গদর্শন-এর পঞ্চম থেকে দশম সংখ্যার মধ্যে মোট চার কিস্তিতে বেরয় ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ (১২৭৯ ব./ ১৮৭২)। নিজের বিশ্বাস কখনও গোপন রাখেননি বঙ্কিম। অল্প কিছু লোকের নয়, বরং তিনি যে সর্বদা বেশিরভাগের (বাঙলা তথা ভারতের কৃষক সম্প্রদায়) সমৃদ্ধির পক্ষে, তা ‘প্রথম পরিচ্ছেদ— দেশের শ্রীবৃদ্ধি’-তেই পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়।
দেশের মঙ্গল? দেশের মঙ্গল, কাহার মঙ্গল? তোমার আমার মঙ্গল দেখিতেছি, কিন্তু তুমি আমি কি দেশ? তুমি আমি দেশের কয় জন? আর এই কৃষিজীবী কয় জন? তাহাদের ত্যাগ করিলে দেশে কয় জন থাকে? হিসাব করিলে তাহারাই দেশ— দেশের অধিকাংশ লোকই কৃষিজীবী। তোমা হইতে আমা হইতে কোন্ কার্য্য হইতে পারে? কিন্তু সকল কৃষিজীবী ক্ষেপিলে কে কোথায় থাকিবে? কি না হইবে? যেখানে তাহাদের মঙ্গল নাই, সেখানে দেশের কোন মঙ্গল নাই।২
চাষিদের দুর্দশার সামগ্রিক হাল-হকিকত পাঠকের সামনে তুলে ধরেন বঙ্কিম। তাই এক-একটি পরিচ্ছেদে এক-একটি দিক নিয়ে তিনি বিস্তারে লিখলেন। ‘দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ— জমীদার’-এ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩) পরবর্তী সময় থেকে লাগাতার নানাভাবে কৃষকদের নাকাল হওয়ার প্রসঙ্গ এল। সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব দেওয়ার পাশাপাশি খাজনা বাড়িয়ে জমিদার গোষ্ঠী যে বিপুল মুনাফা তোলে, তার খেসারত কৃষদেরই দিতে হয়। এ ছাড়া, বজায় থাকে নায়েব-গোমস্তা, পাইক-পেয়াদা, পুলিশ আর আদালতের বাড়তি ঝামেলা। কল্পিত ও প্রতিনিধিমূলক কৃষক চরিত্র পরাণ মণ্ডলকে সামনে রেখে আর্থ-সামাজিক শোষণের যে সার্বিক চেহারা বঙ্কিম পেশ করলেন, তাতে একইসঙ্গে দেশি-বিদেশি শাসকের নেতিবাচক দিক ফুটে উঠল। এর পাশাপাশি অবশ্য সতর্কবাণীও শোনা গেল তাঁর মুখে:
সকল জমীদার অত্যাচারী নহেন। দিন দিন অত্যাচারপরায়ণ জমীদারের সংখ্যা কমিতেছে। কলিকাতাস্থ সুশিক্ষিত ভূস্বামীদিগের কোন অত্যাচার নাই— যাহা আছে তাহা তাঁহাদিগের অজ্ঞাতে এবং অভিমতবিরুদ্ধে, নায়েব গোমস্তাগণের দ্বারায় হয়। মফঃস্বলেও অনেক সুশিক্ষিত জমীদার আছেন, তাঁহাদিগেরও প্রায় এইরূপ। বড় বড় জমীদারদিগের অত্যাচার অধিক নহে;— অনেক বড় বড় ঘরে অত্যাচার একেবারে নাই। সামান্য সামান্য ঘরেই অত্যাচার অধিক।৩
তাই জমিদারদের সংগঠন ‘ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এসশিয়েশন’ (১৮৫১)-কে বঙ্কিমের পরামর্শ:
এই সম্প্রদায়ভুক্ত কোন কোন লোকের দ্বারা যে প্রজাপীড়ন হয়, ইহাই তাঁহাদের লজ্জাজনক কলঙ্ক। এই কলঙ্ক অপনীত করা জমীদারদিগেরই হাত। যদি কোন পরিবারে পাঁচ ভাই থাকে, তাহার মধ্যে দুই ভাই দুশ্চরিত্র হয়, তবে আর তিন জনে দুশ্চরিত্র ভাতৃদ্বয়ের চরিত্রসংশোধনজন্য যত্ন করেন। জমীদারসম্প্রদায়ের প্রতি আমাদের বক্তব্য এই যে, তাঁহারাও সেইরূপ করুন। সেই কথা বলিবার জন্যই আমাদের এ প্রবন্ধ লেখা। . . . অপর জমীদারদিগের নিকট ঘৃণিত, অপমানিত, সমাজচ্যুত হইবার ভয় থাকিলে, অনেক দুর্ব্বৃত্ত জমীদার দুর্ব্বৃত্তি ত্যাগ করিবে। এ কথার প্রতি মনোযোগ করিবার জন্য আমরা ব্রিটিশ্ ইন্ডিয়ান্ এসোসিয়েশন্কে অনুরোধ করি। যদি তাঁহারা কুচরিত্র জমীদারগকে শাসিত করিতে পারেন, তবে দেশের যে মঙ্গল সিদ্ধ হইবে, তজ্জন্য তাঁহাদিগের মাহাত্ম্য অনন্ত কাল পর্য্যন্ত ইতিহাসে কীর্ত্তিত হইবে।৪
‘তৃতীয় পরিচ্ছেদ— প্রাকৃতিক নিয়ম’-এ আবহাওয়া, জমি, খাদ্য ইত্যাদি নানা প্রাকৃতিক উপাদানের নিরিখে বিলিতি ও ভারতীয় সভ্যতার মধ্যে ফারাক করলেন বঙ্কিম। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক হেনরি টমাস বাক্ল্ (১৮২১-৬২)-এর হিস্ট্রি অফ সিভিলাইজেশন ইন ইংল্যান্ড (১৮৫৭) বইটি ছিল এ ক্ষেত্রে তাঁর সহায়। সেইসঙ্গে আইরিশ ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক উইলিয়াম এডওয়ার্ড হার্টপোল লেকি (১৮৩৮-১৯০৩)-র হিস্ট্রি অফ দ্য রাইজ অ্যান্ড ইনফ্লুএন্স্ অফ দ্য স্পিরিট অফ র্যাশানালিজ্ম্ ইন ইওরোপ (১৮৬৫)— বঙ্কিম উল্লেখ করেন এটির সংক্ষেপিত নাম (হিস্ট্রি অফ র্যাশানালিজ্ম্ ইন ইওরোপ)— বইটির সাহায্য নিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া, নাম না-করে ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ টমাস রবার্ট ম্যালথাস (১৭৬৬-১৮৩৪)-এর অ্যান এসে অন দ্য প্রিন্সিপ্ল্ অফ পপুলেশন (১৭৯৮)-এর জনসংখ্যা ও খাদ্য জোগানের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে তাত্ত্বিক প্রতিপাদ্যটি বঙ্কিম হাজির করলেন। স্পষ্ট বোঝা যায়, বিশেষ করে দীপায়ন যুগ থেকে যুক্তির সাহায্যে পাশ্চাত্য সমাজের অগ্রগতি ঘটানোর যে চেষ্টা হয়েছিল, তার ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে বঙ্কিমের বিশ্ববীক্ষা। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস জাগে যে, যেভাবে মধ্যযুগের ধর্মযাজকদের কবল থেকে রেনেসাঁসের সময়ে ইওরোপ মুক্ত হয়েছিল, সেভাবেই ঘুচবে ভারতীয় সমাজের সার্বিক দারিদ্র, মূর্খতা আর দাসত্ব। তাই এখানেও ঐহিক সুখের কদর বাড়া উচিত; অবাধ ব্যবসা-বাণিজ্যও চালু হওয়া জরুরি। ইংল্যান্ডের মতো ভারতেও সামন্ততন্ত্র পেরিয়ে বুর্জোয়া যুগের সূচনা হোক— এমনই চেয়েছিলেন বঙ্কিম।
লক্ষ করার ব্যাপার, জমিদারদের শোষণ থেকে রায়তকে বাঁচানোর জন্যে আলোকপ্রাপ্ত ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন জমিদারদের কাছে বঙ্কিম আবেদন করেন। কিন্তু তাঁর বুঝতে দেরি হয়নি, এই অমানবিক ব্যবস্থার পেছনে আদতে আছে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তর মতো ভুল নীতি। তিনি অবশ্য এর জন্যে ব্রিটিশ রাজত্বকে দোষারোপ করতে চাননি। ‘চতুর্থ পরিচ্ছেদ— আইন’-এ ইংরেজদের সমর্থনে বরং শোনা গেল বঙ্কিমের নিজস্ব যুক্তি:
ইচ্ছাপূর্বক ব্রিটিশ রাজপুরুষেরা প্রজার অনিষ্ট করেন নাই। তাঁহারা প্রজার পরম মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী। দেওয়ানী পাইয়া অবধি এ পর্য্যন্ত কিসে সাধারণ প্রজার হিত হয়, ইহাই তাঁহাদিগের অভিপ্রায়, এবং ইহাই তাঁহাদিগের চেষ্টা। দুর্ভাগ্যবশতঃ তাঁহারা বিদেশী; এ দেশের অবস্থা সবিশেষ অবগত নহেন, সুতরাং পদে পদে ভ্রমে পতিত হইয়াছেন। ভ্রমে পতিত হইয়া এই মহৎ অনিষ্টকর বিধি সকল প্রচারিত করিয়াছেন। কিন্তু ভ্রমবশতঃই হউক, আর যে কারণেই হউক, প্রজাপীড়ন হইলেই রাজার দোষ দিতে হয়।৫
দেখার বিষয়, বঙ্কিম এবারও মৌলিক পরিবর্তনের বদলে ভরসা রাখলেন শাসকের সদিচ্ছার ওপর। তাঁর আশা, রায়তদের সমস্যাগুলি ব্রিটিশরা নিশ্চয় দূর করবেন।
যে আইনে কেবল দুর্ব্বলই দণ্ডিত হইল, যাহা বলবানের পক্ষে খাটিল না— সে আইন কিসে? যে আদালতের বল কেবল দুর্ব্বলের উপর, বলবানের উপর নহে, সে আদালত আদালত কিসে? শাসনদক্ষ ইংরেজেরা কি ইহার কিছু সুবিধি করিতে পারেন না? যদি না পারেন, তবে কেন শাসনদক্ষতার গর্ব্ব করেন? যদি পারেন, তবে মুখ্য কর্ত্তব্য সাধনে অবহেলা করেন কেন? আমরা এই দীন হীন ছয় কোটি বাঙ্গালী কৃষকের জন্য তাঁহাদের নিকট যুক্তকরে রোদন করিতেছি— তাঁহাদের মঙ্গল হউক!— ইংরাজরাজ্য অক্ষয় হউক!— তাঁহারা নিরুপায় কৃষকের প্রতি দৃষ্টিপাত করুন।৬
সামাজিক বিপ্লবকে বঙ্কিম সমর্থন করেননি। এমনকি, যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে ব্রিটিশরা “সত্য প্রতিজ্ঞা করিয়া চিরস্থায়ী’ করেছিলেন, তার জন্যে তাঁদের বিরূপ সমালোচনাতেও তাঁর সায় ছিল না। বঙ্কিম সাফ বলেন, ইংরেজদের অমঙ্গলকারী হওয়ার অর্থ হলো সমাজের অমঙ্গলকারী হওয়া। কিন্তু ভুললে চলবে না, এসব সত্ত্বেও ব্রিটিশদের পরামর্শ দিতে বঙ্কিম ভোলেননি। তাঁর মনে হয়েছিল, “এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত জমীদারদের সহিত না হইয়া প্রজাদের সঙ্গে হইয়াই উচিত ছিল। তাহা হইলেই নির্দ্দোষ হইত। তাহা না হওয়াতেই ভ্রমাত্মক, অন্যায় এবং অনিষ্টজনক হইয়াছে।’’৭
আগেই বলেছি, বঙ্কিম ছিলেন সর্বদা সামাজিক বৈষম্যর বিরুদ্ধে। অল্প কিছু লোক যাবতীয় সুখ-সাচ্ছন্দ্য ভোগ করবে; অন্যদিকে, অত্যন্ত কষ্টে কাটবে বেশিরভাগ গরিব মানুষের জীবন— এমন সমজব্যবস্থায় ছিল তাঁর ঘোরতর আপত্তি।
দেশশুদ্ধ অন্নের কাঙ্গাল, আর পাঁচ সাত জন টাকা খরচ করিয়া ফুরাইতে পারে না, সে ভাল, না— সকলেই সুখ সচ্ছন্দে আছে, কাহারও নিষ্প্রয়োজন ধন নাই, সে ভাল? দ্বিতীয় অবস্থা যে প্রথমোক্ত অবস্থা হইতে শতগুণে ভাল, তাহা বুদ্ধিমানে অস্বীকার করিবেন না। প্রথমোক্ত অবস্থায় কাহারও মঙ্গল নাই। যিনি টাকার গাদায় গড়াগড়ি দেন, এ দেশে প্রায় তাঁহার গর্দভজন্ম ঘটিয়া উঠে। আর যাহারা নিতান্ত অন্নবস্ত্রের কাঙ্গাল, তাহাদের কোন শক্তি হয় না। কেহ অধিক বড় মানুষ না হইয়া, জনসাধারণের স্বচ্ছন্দাবস্থা হইলে সকলেই মনুষ্যপ্রকৃত হইত। দেশের উন্নতির সীমা থাকিত না।৮
বোঝা যায়, সামন্ততন্ত্রর চেয়ে বুর্জোয়া আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাকে এগিয়ে রাখলেও সেটির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সজাগ ছিলেন বঙ্কিম। তিনি জানতেন, উনিশ শতকে শিল্প বিপ্লবের পর থেকেই ইওরোপে পুঁজিবাদের অন্ধকার দিক নিয়ে অনেকেই সরব হন। ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯) যে সাম্যর (সেইসঙ্গে স্বাধীনতা আর মৈত্রী) আশা জাগিয়েছিল, তা যে স্রেফ বুর্জোয়াগোষ্ঠীর মধ্যে আটকে থাকবে; উলটোদিকে, গরিব খেটে-খাওয়া জনগণ যে মুক্তি পাবে না— গোড়ায় তা বোঝা যায়নি। তাই ধীরে ধীরে সেখানে নৈরাজ্যবাদ আর ইউটোপীয় সমাজবাদের উদ্ভব ঘটল। ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে একে-একে বেশ কয়েকজন চিন্তাবিদ্ পুঁজিবাদের বিকল্প হিসেবে আর-এক সমাজব্যবস্থার সুপারিশ করলেন। তা আবার শুধু তত্ত্বকথায় থেমে থাকেনি, সমাজতন্ত্রকে বাস্তব রূপ দেওয়ারও চেষ্টা চলেছে নানাভবে। সেসব বঙ্কিমের অজানা ছিল না। তিনি স্বপ্ন দেখতেন, ভারতীয় সমাজে আমূল অদলবদল ঘটবে— এখানেও ইওরোপের অনুরূপ সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।
উপযোগিতাবাদের পাশাপাশি সমাজবাদ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই ভাবনাচিন্তা করছিলেন বঙ্কিম। ১৮৭৩ (১২৮০ ব.) থেকে ১৮৭৫ (১২৮১ ব.)-এর মধ্যে কমলাকান্তর কলমে হালকাভাবে হলেও ‘ইউটিলিটি বা উদর-দর্শন’ আর ‘বিড়াল’-এ যথাক্রমে সেসব প্রসঙ্গ এসেছিল। জন স্টুয়ার্ট মিল (১৮০৬-১৮৭৩)-এর মৃত্যুর অব্যবহিত পর বঙ্কিমের যে স্মরণলেখটি বেরয়, সেখানে তর্কশাস্ত্র, অর্থনীতি, সমাজনীতি আর নারীকল্যাণ বিষয়ে মিল-এর অবদানের পাশাপাশি অগুস্ত কোঁত (১৭৯৮-১৮৫৭)-এর ধ্রুববাদের উল্লেখ পাওয়া গেল। দুজনের মতপার্থক্য বঙ্কিম তুলে ধরলেন, যদিও নিজে নিরপেক্ষ রইলেন। মিল-এর কথা ‘বাহুবল আর বাক্যবল’ (১৮৭৭ / ১২৮৪ ব.) আর ‘মনুষ্যত্ব কি’ (১৮৭৭ / ১২৮৪ ব.)-তেও আছে। ‘বাহুবল আর বাক্যবল’-এ আবার ‘সোশিয়ালিষ্ট্’-এর সঙ্গে সঙ্গে ‘কম্যুনিষ্ট্’ শব্দ ব্যবহার করা হলো (কমিউনিজম-এর ব্যবহার প্রথম আসে ‘সাম্য’-এ)। লক্ষ করার বিষয়, প্রথমদিকে বুর্জোয়া ব্যক্তি স্বাধীনতার পক্ষে থাকলেও পরে সমাজবাদের দিকে ঝুঁকেছিলেন মিল।৯ ইউটোপীয় সমাজবাদীদের লেখা পড়ে তাঁর চিন্তার অভিমুখ পালটেছিল। সে যা-ই হোক, এ কথা সহজে বোঝা যায় যে, বঙ্কিমের মনোজগৎ জুড়ে ছিল তৎকালীন পাশ্চাত্য দুনিয়ার যাবতীয় প্রগতিশীল ধ্যানধারণা। তিনি বিশ্বাস করতেন, অ-প্রাকৃতিক সামাজিক বৈষম্য দূর করলে সমাজের অগ্রগতি হবে।
বঙ্কিমের আর্থ-সামাজিক ভাবনার সামগ্রিক রূপ সবচেয়ে বেশি ধরা পড়েছে সাম্য-তে। কয়েক বছর ধরে যেসব বিষয় নিয়ে তিনি চিন্তাভাবনা করছিলেন, সেগুলি সবই জায়গা পেল এখানে। বঙ্গদর্শন-এ তিন কিস্তিতে ছাপা হলো ‘সাম্য’। প্রথম দুটি বেরল ১৮৭৩/১২৮০ ব.-এ আর শেষটি ১৮৭৫-এ। কিছু পরিমার্জনের পর সাম্য নামে বইটি ছাপা হলো ১৮৭৯-তে।১০ তখন ‘বঙ্গদেশের কৃষক’-এর দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ (‘জমীদার’) ও তৃতীয় পরিচ্ছেদ (‘প্রাকৃতিক নিয়ম’) বইয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ পরিচ্ছেদ হিসেবে জায়গা পেল। সেগুলির বেশ খানিকটা অংশ অবশ্য সাম্য-এ বাদ পড়ল। অন্যদিকে, পাঠককে আলোচনার খেই ধরানোর জন্যে সামান্য কয়েকটি কথা বঙ্কিম যোগ করলেন।১১ সাম্য-র পঞ্চম পরিচ্ছেদটি হলো বঙ্গদর্শন-এর ‘সাম্য’ প্রবন্ধর তৃতীয় পরিচ্ছেদ। শেষের ‘উপসংহার’ নতুন করে লেখা। এও মনে রাখার যে, বঙ্গদর্শন-এর ‘পত্র সূচনা’-য় বঙ্কিম যে উদ্দেশ্যর কথা লিখেছিলেন (অর্থাৎ, ইংরিজি না-জানা জনগণকে বাঙলা ভাষায় আধুনিক চিন্তাভাবনা পৌঁছে দেওয়া), তা আবার দেখা গেল সাম্য বইটির ভূমিকায় (‘বিজ্ঞাপন’):
স্বদেশীয় সাধারণ জনগণকে এই তত্ত্বটি বুঝাইবার জন্য লিখিয়াছি। সুশিক্ষিত যদি ইহাতে কিছু পঠিতব্য না পান, আমি দুঃখিত হইব না। অশিক্ষিত পাঠকদিগের হৃদয়ে এই নীতি অঙ্কুরিত হইলে আমি চরিতার্থ হইব।১২
বলা বাহুল্য, বঙ্কিমের কাছে ‘সুশিক্ষিত’ হলো ইংরিজি-জানা পাঠক আর ‘অশিক্ষিত’ ইংরিজি না-জানা পাঠক।
সাম্য-র প্রথম পরিচ্ছেদে দুই ‘সাম্যাবতার’ বুদ্ধ আর জিশু-র কথা বলেছেন বঙ্কিম। ব্রাহ্মণ্যধর্মর প্রভাবে ভারতে চরম বর্ণভেদ চালু হয়। অযৌক্তিক নিয়ম আর আচারের জাঁতাকলে গোটা সমাজই ক্রমশ পেছিয়ে পড়ে। বৌদ্ধধর্ম এই অচলাবস্থা কাটায়। তাতে সামগ্রিকভাবে ভারতের উন্নতি হয়। বঙ্কিম লিখেছেন,
তখন বিশুদ্ধাত্মা শাক্যসিংহ অনন্তকালস্থায়ী মহিমা বিস্তার পূর্ব্বক, ভারতাকাশে উদিত হইয়া, দিগন্তপ্রধাবিত রবে বলিলেন, “আমি উদ্ধার করিব। আমি তোমাদিগের উদ্ধারের বীজমন্ত্র দিতেছি, তোমরা সেই মন্ত্র সাধন কর। তোমরা সবই সমান। ব্রাহ্মণ শূদ্র সমান। মনুষ্যে মনুষ্যে সকলেই সমান। সকলেই পাপী, সকলেরই উদ্ধার সদাচরণে। বর্ণবৈষম্য মিথ্যা। যাগ যজ্ঞ মিথ্যা। বেদ মিথ্যা, সূত্র মিথ্যা, কে রাজা, কে প্রজা, সব মিথ্যা। ধর্ম্মই সত্য। মিথ্যা ত্যাগ করিয়া সকলেই সত্যধর্ম্ম পালন কর।’’১৩
একইভাবে, রোমান সাম্রাজ্যবাদ যে বিভেদমূলক ও স্বেচ্ছাচারী সমাজব্যবস্থা চালু করে, তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন ‘দ্বিতীয় সাম্যাবতার যীশুখ্রীষ্ট’। বঙ্কিমের মন্তব্য:
তিনি বলিয়াছিলেন, মনুষ্যে মনুষ্যে ভাতৃসম্বন্ধ। সকল মনুষ্যই ঈশ্বরসমক্ষে তুল্য। বরং যে পীড়িত, দুঃখী, কাতর, সেই ঈশ্বরের অধিক প্রিয়। এই মহাবাক্যে বড় মানুষের গর্ব্ব খর্ব্ব হইল— প্রভুর গর্ব্ব খর্ব্ব হইল— অঙ্গহীন ভিক্ষুকও সম্রাটের অপেক্ষা বড় হইল। তিনি বলিয়াছিলেন, ইহলোকে আমার রাজত্ব নহে— ঐহিক সুখ সুখ নহে— ঐহিক প্রাধান্য, প্রাধান্য নহে।১৪
মনে রাখা দরকার, লেকি-র মত অনুসারে সাম্য-র চতুর্থ পরিচ্ছেদে (যা আদতে ‘বঙ্গদেশের কৃষক’-এর তৃতীয় পরিচ্ছেদের পরিমার্জিত রূপ) বঙ্কিম লেখেন, ‘ধনলিপ্সা’ হলো সভ্যতার অগ্রগতির ‘আদিম কারণ’। এর পেছনে রয়েছে ঐহিক সুখ। ইওরোপে মধ্যযুগে রোমান ক্যাথলিক পুরোহিতরাও ঐহিক সুখকে খাটো করে দেখেছিলেন। কিন্তু রেনেসাঁসের সময় “যখন ইতালিতে প্রাচীন গ্রীক্ সাহিত্য, গ্রীক্ দর্শনের পুনরুদয় হইল তখন তৎপ্রদত্ত শিক্ষানিবন্ধন ঐহিকে বিরক্তি ইউরোপে ক্রমে মন্দীভূত হইল। সঙ্গে সঙ্গে সভ্যতারও বৃদ্ধি হইল’’১৫ উলটোদিকে, হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মর প্রভাবে ভারতবাসী ঐহিক সুখের কদর করতে শিখল না। তাই এখানে “প্রজাগণ নিদ্রিত রহিল; সামাজিক বৈষম্য ধারাবাহিক হইয়া চলিল। ইহার ফল অবনতি।’’ পাশাপাশি বঙ্কিম এ ব্যাপারেও সচেতন ছিলেন যে, জিশুর বাণী প্রগতিশীল হলেও খ্রিস্টধর্ম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করার পর “ধর্ম্মযাজকদিগের অত্যন্ত প্রভুত্ব বৃদ্ধি হইয়াছিল”।১৬
বঙ্কিমের মতে, ‘তৃতীয় সাম্যাবতার’ জাঁ-জাক রুশো (১৭১২-৭৮)। ১৭৫৪-য় রুশো লিখেছিলেন মানুষের মধ্যে অসাম্যর উৎপত্তি ও ভিত্তি বিষয়ক সন্দর্ভ (Discours sur l’origine et les fondements de l’inégalité parmi les hommes)। সেখানে তিনি হাজির করেন আদিম মানুষের মধ্যে সাম্যর ধারণা। রুশো আরও বলেন, সভ্যতাই বরং তৈরি করেছে মানুষে-মানুষে প্রাকৃতিক (শারীরিক) ও সামাজিক-রাজনৈতিক বৈষম্য। নাম না-করে রুশো-র এই বইটির বক্তব্য তুলে ধরেন বঙ্কিম।
যেই মনুষ্যজন্ম গ্রহণ করে, সেই মনুষ্যমাত্রের সমান— নৈসর্গিক প্রকৃতিতে সমান, এবং সম্পত্তির অধিকারিত্বেও সমান। এই পৃথিবীর ভূমিতে রাজার যে প্রাকৃতিক অধিকার, ভিক্ষুকেরও সেই অধিকার। ভূমি সকলেরই— কাহারও নিজস্ব নহে। যখন বলবানে দুর্ব্বলকে অধিকারচ্যুত করিতে লাগিল, তখনই সমাজ সংস্থাপনের আরম্ভ হইল। সেই অপহরণের স্থায়িত্ববিধানের নাম আইন।
যে ব্যক্তি সর্ব্বাদৌ, কোন ভূখণ্ড চিহ্নিত করিয়া বলিয়াছিল, “ইহা আমার,” সেই সমাজকর্ত্তা। যদি কেহ তাহাকে উঠাইয়া দিয়া বলিত, “এ ব্যক্তি বঞ্চক, তোমরা উহার কথা শুনিও না, বসুন্ধরা কাহারও নহেন; তৎপ্রসূত শস্য সকলেরই।“ সে মানবজাতির অশেষ উপকার করিত।১৭
এই শেষ অংশটি আসলে রুশো-র বইয়ের দ্বিতীয় ভাগের প্রথম অনুচ্ছেদের ভাবানুবাদ।১৮ শুধু তা-ই নয়, রুশো-র সামাজিক চুক্তি (Du contrat social, ১৭৬২) যে ফরাসি বিপ্লব-এর প্রেরণা জুগিয়েছে, পরবর্তীকালে কমিউনিজম আর প্রথম আন্তর্জাতিক (১৮৬৪)-এরও জন্ম দিয়েছে— এমনও ছিল বঙ্কিমের ভাবনা।
খেয়াল রাখা দরকার যে, বঙ্কিম লিখেছেন,
তিনি [রুশো] মহিমাময় লোকহিতকর নৈতিক সত্যের সহিত অনিষ্টকারক মিথ্যা মিশাইয়া, সেই মিশ্র পদার্থকে আপনার অদ্ভুত বাগিন্দ্রজালের গুণে লোকবিমোহিনী শক্তি দিয়া, ফরাসীদিগের হৃদয়াধিকারে প্রেরণ করিয়াছেন।১৯
কমিউনিজমের মতো পরিণাম দেখা দিলেও বঙ্কিম কিন্তু বারবার রুশো-র মতবাদকে ভ্রান্ত বলতে ছাড়েননি।
রূসোর ভ্রান্ত বাক্যে অনন্তকালস্থায়িনী কীর্ত্তি সংস্থাপিতা হইল। কেন না, সেই ভ্রান্ত বাক্য সাম্যাত্মক— সেই ভ্রান্তির কায়া অর্দ্ধেক সত্যে নির্ম্মিত।২০
প্রশ্ন হল: রুশো-র বক্তব্যর কোন্ অংশটি মিথ্যে/ ভ্রান্ত? জমিতে ব্যক্তি মালিকানা নয়, বরং তাতে সকলের সমান অধিকার দাবি করেছিলেন রুশো। তিনি সর্বদা ফিরতে চেয়েছিলেন প্রাক্-সভ্যতার যুগে। এই মতাবাদকে বঙ্কিম মেনে নিতে পারেননি। তাই তিনি বলেন,
রূসোর এই সকল কথা অতি ভয়ানক। বল্টের শুনিয়া বলিয়াছিলেন, এ সকল বদমায়েসের দর্শনশাস্ত্র। এই সকল কথার অনুবর্তী হইয়া রূসোর মানস শিষ্য প্রুধোঁ বলিয়াছেন যে, অপহরণেরই নাম সম্পত্তি।২১
বোঝা দরকার, নিজের বই সম্পত্তি কী? (১৮৪০)-তে সবরকমের ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিরুদ্ধে আপত্তি তোলেন নৈরাজ্যবাদী দার্শনিক পিএর-জুসেফ প্রুধঁ (১৮০৯-৬৫)। সম্পত্তি আর সমাজ— তাঁর মতে এই দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে মৌলিক দ্বন্দ্ব। তিনি ছিলেন পারস্পরিকবাদ ও সংস্কারবাদের পক্ষে। প্রুধঁ-র বই দারিদ্রর দর্শন (১৮৪৬)-এর বিরুদ্ধে কার্ল মার্কস (১৮১৮-৮৩) লেখেন দর্শনের দারিদ্র (১৮৪৭)। ততদিনে ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকশ্রেণির বৈপ্লবিক ভূমিকা নিয়েও মার্কস-এর তত্ত্ব পরিণত রূপ পেয়েছে। দর্শনের দারিদ্র-এ তিনি দেখালেন, সম্পত্তি কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়, সেটি বরং সমাজের অর্থনৈতিক বনিয়াদের সঙ্গে যুক্ত— ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত অনুসারে তার বিচার করা উচিত। মার্কস-এর মতে, পুঁজিবাদী সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তি আদতে শ্রমিকদের শ্রমের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। সেটি হয়ে ওঠে শোষণের উৎস। বঙ্কিমের লেখায় পুঁজিবাদী শোষণ ব্যবস্থার প্রসঙ্গ একেবারেই আসেনি। তাঁর ভাবনার ভিত্তি মূলত জমি আর রায়ত। ভুললে চলবে না, ভারতের তৎকালীন পরিস্থিতির নিরিখে তা ছিল স্বাভাবিক।
এও খেয়াল করার যে, সাম্য-তে ইউটোপীয় সমাজবাদের উল্লেখ করেছেন বঙ্কিম। ইওরোপে পুঁজিবাদের গোড়ার দিকে কিছু ব্যক্তি চেয়েছিলেন সমাজের শান্তিপূর্ণ পুনর্গঠন— যেখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলুপ্তি ঘটার পাশাপাশি কায়েম হবে সমানাধিকার আর সম্পদের সমবন্টন। এঁদের মধ্যে রবার্ট আওয়েন (১৭৭১-১৮৫৮) আর এতিএন কাবে (১৭৮৮-১৮৫৬) উল্লেখযোগ্য। বঙ্কিম লেখেন,
ভূমি এবং মূলধন, যাহার দ্বারা অন্য ধনের উৎপত্তি হইবে, তাহা সামজিক সর্ব্বলোকের সাধারণ সম্পত্তি হউক। যাহা উৎপন্ন হইবে, তাহা সর্ব্বলোকে সমভাগে বন্টন করিয়া লউক। ইহাতে বড় লোক ছোট লোক কোন প্রভেদ রহিল না; সকলেই সমান ভাবে পরিশ্রম করিবে। সকলেই সমান ভাগের ধনের অধিকারী। ইহাই প্রকৃত কম্যুনিজম্।২২
ঘটনা হলো, এমন কথা আবার অন্য অনেক ইউটোপীয় সমাজবাদীই ভাবেননি। বঙ্কিম নিজেই জানিয়েছেন,
কিন্তু সাধারণ কম্যুনিষ্ট, বহুশ্রমী এবং অল্পশ্রমী কর্ম্মিষ্ঠ এবং অকর্ম্মিষ্ঠ, সকলকেই যেরূপ ধনের সমানভাগী করিতে চাহেন, লুই ব্লাং সে মতাবলম্বী নহেন। তিনি বলেন, শ্রমানুসারে ধনের ভাগ হওয়া কর্ত্তব্য। যে মত সেন্টসাইমনিজম্ বলিয়া বিখ্যাত, তাহারও অভিপ্রায় এই যে, সকলেই যে সমভাবে ধনভোগী হইবে বা সকলেই এক প্রকার পরিশ্রম করিবে বা সকলেই সমান পরিশ্রম করিবে এমত নহে। যে যেমন পরিশ্রমের উপযুক্ত ও যে যে কার্য্যের উপযুক্ত, সে তেমনি পরিশ্রম করিবে ও সেইরূপ কার্য্যে নিযুক্ত হইবে। কার্য্যের গুরুত্ব, এবং কর্ম্মকারকের গুণানুসারে বেতন প্রদত্ত হইবে। যে যাহার যোগ্য, তাহাতে তাহাকে নিযুক্ত করিবার জন্য, যে প্রকারে পুরস্কৃত হইবে তাহা নিরূপণ এবং সর্ব্বপ্রকার তত্ত্বাবধারণ জন্য কতকগুলিন কর্ত্তৃপক্ষ থাকিবেন।২৩
দেখার বিষয়, লুই ব্লাঁ (১৮১১-৮২) সম্পদ-বণ্টনের ব্যাপারে দুটি পর্যায়ের সুপারিশ করেন: প্রথমে সমবন্টন, পরে ন্যায়ের উন্নত স্তরে, ব্যক্তির ক্ষমতা অনুযায়ী শ্রমদান আর প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পদ প্রাপ্তি। এই অনুচ্ছেদটি লেখার জন্যে মিল-এর রাজনৈতিক অর্থনীতির নীতিসমূহ-র সাহায্য নিয়েছেন বঙ্কিম।২৪ একইভাবে, গোঠা কর্মসূচির সমালোচনা (১৮৭৫)-য় মার্কস সমবন্টন অথবা যোগ্যতার পরিবর্তে জোর দিয়েছেন প্রয়োজনীয়তার ও ক্ষমতার ওপর। সেটিই তাঁর মতে কমিউনিজমের লক্ষ্য।২৫ মার্কস-এর লেখা পড়েননি বঙ্কিম। কিন্তু একথা সত্যি যে, ইউটোপীয় সমাজবাদীদের ধ্যানধারণা সম্বন্ধে তাঁর কিছুটা ধারণা ছিল।২৬ ‘ফুরীরিজম্’ নিয়ে সাম্য-র অনুচ্ছেদটিও মিল-এর বই থেকে পেয়েছেন তিনি।২৭ সেসব যাচাই করে বঙ্কিম গড়ে তোলেন তাঁর নিজস্ব মত। স্যাঁ-সিমঁ (১৭৬০-১৮২৫), ফুরিএ (১৭৭২-১৮৩৭) আর লুই ব্লাঁ-র বেশ কিছু বক্তব্য তাঁর মন ছুঁয়ে গিয়েছিল। সাধারণ পাঠকের কাছে সেগুলি তুলেও ধরেন তিনি। নিঃসন্দেহে সে-যুগে এসব ছিল কল্পনাতীত।
সামাজিক বৈষম্য নিয়ে সরব হলেও ব্যক্তিগত সম্পত্তি সম্বন্ধে বঙ্কিমের মত ছিল সুনির্দিষ্ট। ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলুপ্তি ঘটুক— এমন কখনোই চাননি তিনি। সেইজন্যে রুশো, প্রুধঁ অথবা কাবে-র সঙ্গে তাঁর চিন্তাভাবনা পুরোপুরি মেলেনি। লেকি-র মতো বঙ্কিমও বিশ্বাস করতেন, মানবসভ্যতার প্রগতির সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বৃদ্ধির সরাসরি যোগ রয়েছে। এ ব্যাপারেও মিল-এর বক্তব্য তাঁর পছন্দসই হয়। সেই অনুসঙ্গে আসে সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে বঙ্কিমের ভাবনা।
ভূসম্পত্তির উত্তরাধিকারিত্ব সম্বন্ধে মৃত মহাত্মা জন স্টুয়ার্ট মিল্ যাহা বলিয়াছেন, তাহারও উল্লেখ করা আবশ্যক, কেন না, তাহাও সাম্যতত্ত্বের অন্তর্গত। যিনি উপার্জ্জনকর্ত্তা, উপার্জ্জিতসম্পত্তিতে তাঁহার যে সম্পর্ণ অধিকার, ইহা মিল্ স্বীকার করেন। যে যাহা আপন পরিশ্রমে বা গুণে উপার্জ্জন করিয়াছে, তাহা অপর্য্যাপ্ত হইলেও তাহার যাবজ্জীবন ভোগ্য এবং তাহার জীবনান্তেও যাহাকে ইচ্ছা, তাহাকে দিয়া যাইবার তাহার অধিকার আছে। কিন্তু যদি আপন জীবনান্তে সে কাহাকেও না দিয়া যায়, তবে তাহার ত্যক্ত সম্পত্তি একা একা ভোগ করিবার অধিকার কাহারও নাই। রাম যে সম্পত্তি উপার্জ্জন করিয়াছে, তাহাতে দশ সহস্র লোক প্রতিপালিত হইতে পারে; কিন্তু রাম উপার্জ্জন করিয়াছে বলিয়া সে নয় শত নিরানব্বই জনকে বঞ্চিত করিয়া, একা ভোগের অধিকারী বটে। জীবনান্তে স্বেচ্ছাক্রমে আপনার পুত্রকে বা অপরকে তাহাতে স্বত্ববান্ করিবারও তাহার অধিকার আছে।২৮
বঙ্কিমের ‘সাম্যবাদ’ নিয়ে ধারণা ছিল খুবই ছড়ানো। এর পেছনে কাজ করে মিল-এর লেখা— সমাজবাদের মধ্যে নানা বৈচিত্র নজরে আসে তাঁর। কমিউনিজম (সম্পদের সমবন্টন) হলো মিল-এর মতে সমাজবাদের চূড়ান্ত রূপ। উলটোদিকে, স্যাঁ-সিমঁ ও ফুরিএ-কে অ-কমিনিউনিস্ট সমাজবাদী হিসেবে দেখেন তিনি।২৯ মিল-এর নিজস্ব ধারণাও অনুরূপ। বুর্জোয়া উদারবাদী অর্থনীতিতে আস্থাশীল হয়ে ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলুপ্তি মেনে নেওয়া তাঁর পক্ষে ছিল অসম্ভব। অন্যদিকে, সামন্তদের মতো সম্পত্তির উত্তরাধিকারে বিশ্বাস রাখতে পারেননি তিনি। বরং বলা যায়, বুর্জোয়া ব্যবস্থার নানা খামতি মিল-কে ভাবিয়ে তোলে। সেসবের প্রতিকার নিয়ে তাঁর মনে স্পষ্ট ধারণা ছিল না। ব্যক্তি স্বাধীনতা (যার আওতায় পড়ে ব্যক্তিগত সম্পত্তি) আর কমিউনিজম (সমাজের একচেটিয়া অধিকার) নিয়ে তাঁর মনে দ্বন্দ্ব ছিল যথেষ্ট। সেই ছাপও পড়ে মিল-এর লেখায়। এককথায়, যা মনে রাখা দরকার, তা হলো: মিল নিজের মধ্যবিত্ত শ্রেণি-সত্তা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তখন শ্রমিক শ্রেণির উত্থান পুরোপুরি না-ঘটায় অন্যদের মতো মিল-এর সমাজ-ভাবনা মস্তিষ্ক প্রসূত প্রকল্প হিসেবে রয়ে যায়। সমগ্র ব্যাপারটি নৈর্ব্যক্তিকভাবে দেখা ও বিশ্লেষণ করার সুযোগ হয় না। এই সীমাবদ্ধতা অবশ্য ঐতিহাসিক, নিছক ব্যক্তির নয়। পরিবর্তিত আর্থ-সামাজিক প্রেখিতে সে-কাজ করতে পারলেন মার্কস ও এঙ্গেলস।
মিল-এর তুলনায় বঙ্কিম ছিলেন আরও অনগ্রসর সমাজের মানুষ। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা দেখার তিনি সুযোগই পাননি। তাঁর সমকালে অর্থনীতির ভিত্তি ছিল প্রধানত জমি। তাই স্বাভাবিক যে, তিনি সামন্ততন্ত্রর বিরুদ্ধে লড়বেন। পাশাপাশি এও মনে রাখা দরকার, বঙ্কিম ছিলেন নতুন এক উঠতি অর্থনৈতিক শ্রেণির প্রতিনিধি। নিজের যোগ্যতায় তিনি পরীক্ষায় পাশ করেন, ঔপনিবেশিক পরিস্থিতিতে সম্মানীয় পদে চাকরিও পান। সেইজন্যে মানসিকভাবে বুর্জোয়া ব্যবস্থার দিকে অনায়াসে ঝোঁকেন বঙ্কিম। অবাধ বাণিজ্য আর নিজের অর্জিত ব্যক্তিগত সম্পত্তি তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পাশাপাশি, বঙ্কিম ভেবেছেন, শাসকের সদিচ্ছা আর ব্যাপক শিক্ষা সমাজের নানা খামতি মেটাবে। এই সীমাবদ্ধতাও ঐতিহাসিক।
বঙ্কিমের সমাজ-ভাবনার ভিত্তি হলো বুর্জোয়া উদারনীতিবাদ। তাই তিনি লিখেছেন,
তাই বলিয়া কেহ না মনে করেন যে, আমি জন্মগুণে বড় লোক হইয়াছি, অন্যে জন্মগুণে ছোট লোক হইয়াছে। তুমি যে উচ্চ কুলে জন্মিয়াছ, সে তোমার গুণ নহে; অন্য যে নীচ কুলে জন্মিয়াছে, সে তাহার দোষ নহে। অতএব পৃথিবীর সুখে তোমার যে অধিকার, নীচকুলোৎপন্নেরও সেই অধিকার। তাহার সুখের বিঘ্নকারী হইও না; মনে থাকে যেন যে, সেও তোমার ভাই— তোমার সমকক্ষ।৩০
শুধু বর্ণ নয়, বঙ্কিমের মতে লিঙ্গ (সাম্য-র পঞ্চম পরিচ্ছেদের বিষয়) ও জাতিগত বৈষম্যর বেলায়ও একই কথা খাটে। মোট কথা, বঙ্কিম-এর মত হলো, যেমন ‘উপসংহার’-এ তিনি বলেন,
আমরা সাম্যনীতির এরূপ ব্যাখ্যা করি না যে, সকল মনুষ্য সমানাবস্থাপন্ন হওয়া আবশ্যক বলিয়া স্থির করিতে হইবে। তাহা কখন হইতে পারে না। যেখানে বুদ্ধি, মানসিক শক্তি, শিক্ষা, বল প্রভৃতির স্বাভাবিক তারতম্য আছে, সেখানে অবশ্য অবস্থার তারতম্য ঘটিবে— কেহ রক্ষা করিতে পারিবে না। তবে অধিকারের সাম্য আবশ্যক— কাহারও শক্তি থাকিলে অধিকার নাই, বলিয়া বিমুখ না হয়। সকলের উন্নতির পথ মুক্ত চাহি।৩১
সন্দেহ নেই, বুর্জোয়া উদারবাদী মতবাদ বঙ্কিমকে প্রেরণা জুগিয়েছিল। কিন্তু এও মনে রাখা চাই, পাশ্চাত্য ধ্যানধারণার স্রেফ পুনরুক্তি করেননি তিনি। বরং স্থান-কাল-পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে সেগুলির বিচার করেছেন। সেইজন্যে সাম্য-র ভূমিকা-য় বঙ্কিম-এর ঘোষণা,
সাম্যনীতি নূতন তত্ত্ব নহে, কিন্তু ইউরোপীয়েরা যেভাবে ইহার বিচার করেন, আমি তাহা করি নাই। আমি সাম্যনীতি যেমন মোটামুটি বুঝিয়াছি— সেইরূপ লিখিয়াছি। অতএব ইউরোপীয় নীতিশাস্ত্রের সহিত প্রভেদ দেখিলে, কেহ রাগ করিবেন না। আরও, স্বদেশীয় সাধারণ জনগণকে এই তত্ত্বটি বুঝাইবার জন্য লিখিয়াছি।৩২
১৮৮২ থেকে বঙ্কিমের বিশ্ববীক্ষায় ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দিল— আর্থ-সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে বড় হয়ে উঠল ধর্মচিন্তা। ভালো বিক্রি হওয়া সত্ত্বেও সাম্য বইটি তিনি দ্বিতীয়বার ছাপেননি।৩৩ ১৮৮৪-তে বঙ্কিমের মনে হয়েছিল, সাম্য-র সবই ভুল।৩৪ বলা বাহুল্য, মিল-এর প্রভাবও ততদিনে চলে যায়। তবু স্বীকার না-করে উপায় নেই, সাম্য ছেপে বেরনো ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ইংরিজি না-জানা পাঠকের সামনে বঙ্কিম তুলে ধরেছিলেন পাশ্চাত্য দুনিয়ার প্রগতিশীল সব ধারণা। সেই সূত্রেই পরবর্তীকালে বাঙলা তথা ভারতে শুরু হয় সমাজবাদ-চর্চার ধারা।৩৫ তাই সাম্য-র ঐতিহাসিক মূল্য অসীম।
সূত্র
১. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিম রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, পাত্র’জ পাবলিকেশন, ১৯৮৩, ২৬০।
২. ঐ, ২৬৬।
৩. ঐ, ২৭৪।
৪. ঐ, ২৭৫।
৫. ঐ, ২৮৩।
৬. ঐ, ২৮৩।
৭. ঐ, ২৮৬।
৮. ঐ, ২৮৯।
৯. John Stuart Mill, Autobiography, London: Green, Reader & Dyer, 1874, 231 দ্র.।
১০. অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য, বঙ্কিমচন্দ্র জীবনী, আনন্দ: ২০১৫, ৫১৫ দ্র.।
১১. রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, বঙ্কিমের সাম্য-ভাবনা: বাঙলায় সমাজবাদ-চর্চা। সম্পা., শোভনলাল দত্তগুপ্ত। কাউন্সিল ফর পোলিটিকাল স্টাডিজ, ২০১৮, ৮-৯ দ্র.।
১২. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিম রচনাসংগ্রহ, প্রবন্ধ খণ্ড, শেষ অংশ, সম্পা., গোপাল হালদার, সাক্ষরতা প্রকাশন, ১৯৭৩, ৫৩৩; অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য, সূত্র ১০, ৫১৫।
১৩. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সূত্র ১, ৩৫৩।
১৪. ঐ, ৩৫৪।
১৫. ঐ, ৩৬৬।
১৬. ঐ, ৩৫৪।
১৭. ঐ, ৩৫৬।
১৮. Jean-Jacques Rousseau, Discourse on the Origin of Inequality, New York: Dover Publications, 2016, 27 দ্র.।
১৯. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সূত্র ১, ৩৫৫।
২০. ঐ, ৩৫৬।
২১. ঐ, ৩৫৬।
২২. ঐ, ৩৫৭।
২৩. ঐ, ৩৫৭।
২৪. John Stuart Mill, Principles of Political Economy, Vol. I, London: John W. Parker & Son, 1857, 248 দ্র.।
২৫. রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, সূত্র ১১, ১৮-১৯ দ্র.।
২৬. ঐ, ১৪ দ্র.।
২৭. John Stuart Mill, সূত্র ২৪, 260 দ্র.।
২৮. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সূত্র ১, ৩৫৭।
২৯. John Stuart Mill, সূত্র ২৪, 257-58 দ্র.।
৩০. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সূত্র ১, ৩৫৮।
৩১. ঐ, ৩৭৪।
৩২. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিম রচনাসংগ্রহ, সূত্র ১২, ৫৩৩; অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য, সূত্র ১০, ৫১৫।
৩৩. রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, সূত্র ১১, ৬ দ্র.।
৩৪. গোপাল হালদার, ভূমিকা, বঙ্কিম রচনাসংগ্রহ, সূত্র ১২, সাতাশ দ্র.।
৩৫. রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, সূত্র ১১, ২১-২৩ দ্র.।






