যখন অন্য মন, অন্য আশা
তৃ ষ্ণা ব সা ক
কলকাতায় শীত বলে কোনও ঋতু নেই, শুনেছিল দেবী। এবার দেখল তা পুরো সত্যি নয়। ডিসেম্বরের শেষে জমিয়ে শীত পড়ল কলকাতায়। কলকাতার শীতের একটা আলাদা মজা আছে। এর আগে এইসময় আগের বছর ও মায়ের কাছে চলে গেছিল। সংক্রান্তি নাকি কাটাতে নেই নিজের বাড়ির বাইরে। তাই রাজারামপুর থেকে এক রাতের জন্যে চলে যেতে হয়েছিল একতারায়, শ্বশুরবাড়ির গ্রামে। কোনওরকমে কাটিয়েছিল একটা রাত চোখকান বুজে। শ্বশুর চলে গিয়ে সে বাড়ি একদম কানা হয়ে গেছে। একদম মন টেঁকে না। অন্তু দিয়ে গেছিল, পরদিন আবার ওই গিয়ে নিয়ে এল রাজারামপুর। সেখানে পৌষ পার্বণের পিঠেপুলি খেল পেটভরে দেবী। তারপর একদিন সুনীল এসে ওকে নিয়ে এল কলকাতা।
এবার এখানেই আছে দেবী। তার মুখে কিছুরই স্বাদ নেই, পিঠেপুলির কথা ভাবতেও বমি পাচ্ছে। গরম ভাত আলু সেদ্ধ মাখন দিয়ে, তার সঙ্গে একটু উচ্ছে ভাজা— এটুকুই খেতে পারছে সে। ওদের জন্যে রাঁধতে হচ্ছে, কিন্তু সে বহু কষ্টে। মাছের গন্ধে তার এমন বমি পাচ্ছে, যে মাছ আনলেই তার ভয় হচ্ছে। তাই মাছ আনাই কমে গেছে, কিংবা আনলেও অরুণাংশু রাঁধে। অরুণাংশু যে এত বছর কলকাতায় রেঁধে খাবার গল্প করত, তা হাতেকলমে পরীক্ষার একটা সুযোগ এসেছে এবার। বেশিরভাগ দিন ওরা রাতে রুটি-তরকা বা রুটি-মাংস নিয়ে আসে, দেবী সেদ্ধভাত করে নেয় নিজের জন্যে।
এখানে অসুবিধে অনেক, সব কাজ নিজেকে করতে হয়, বাথরুম একতলায়, সিঁড়িতে কেউ জল ফেলল কি না দেখে দেখে সাবধানে নামতে হয়, আর সবচেয়ে বড় কথা সারাদিন বলতে গেলে ও একাই থাকে।
কার্ড করানো হয়েছে লেডি ডাফরিনে, সেখানে ডক্টর শোভনা বাসু, অনেক বয়স, ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছেন, ‘খুব হাসিখুশি থাকবে মা এই সময়টা। বাড়িতে কেউ নেই তো কী হয়েছে, একা একাই বেশি ভাল থাকা যায়। রেডিও আছে তো বাড়িতে? গান শুনবে। বই পড়ার অভ্যেস থাকলে তো কথাই নেই। বুকস আর আওয়ার বেস্ট ফ্রেন্ড। আর কোনও হবি নেই তোমার? এই যেমন নিটিং স্টিচিং?’
বাড়িতে বই অনেক আছে, পড়ার বইয়ের বাইরে গল্পের বই পড়ার অভ্যেস নেই দেবীর। তার অন্য বোনরা সেলাই, উল বোনায় ওস্তাদ, কিন্তু তার ওসব দেখলেও গায়ে জ্বর আসে। সে একটাই জিনিস করতে চায়, ভয়ে ভয়ে বলে— ‘দিদি, আমি গান জানি, এসময় গান করতে পারব?’
‘গান জানো? তা হলে তো ভগবানের আশীর্বাদ তোমার সঙ্গে সবসময় আছে। তোমার তো মনখারাপ হবার কথাই নয়। যখন ভর্তি হবে, তখন গান শুনব তোমার। হ্যাঁ, কেন পারবে না? তবে হালকা রেওয়াজ করবে। যখনি মনে হবে শরীর নিতে পারছে না, তখনি বন্ধ করবে। শরীরের কথা শুনতে হয়।’
তবু কেন খুশি থাকতে পারছে না দেবী, কেন ভাল থাকতে পারছে না? তার তো কোনও অভাব রাখেনি অরুণাংশু। দুধ মাছ ডিম মাংস, ফল মিষ্টি— যা যা ভালবাসে দেবী। সে-ই কিছু খেতে পারছে না। অতুলের টিউশনির সামান্য টাকা থেকে কিছু না কিছু প্রায়ই আনে ফেরার পথে। একদিন দেবীর জন্যে লতা মঙ্গেশকরের হিন্দি আর বাংলা গানের দুটো চটি বই নিয়ে এল একটা কলেজ স্ট্রিটের দোকান থেকে। অনেক দিন আগে দেবী এই বই দুটো চেয়েছিল। সুনীল নাক সিঁটকে বলেছিল, ‘ওসব তো বটতলায় ছাপা বই, ট্রেনে হকাররা বিক্রি করে। আবছা ছাপা, বানানের মা বাপ নেই, তথ্যেও অনেক ভুল থাকে।’ দেবী বলেছিল, ‘তা হোক, তবু তুমি এনে দিয়ো। গান গাইতে সুবিধে হয়। প্রোগ্রামেও নিয়ে যেতে পারব। হালকা, ব্যাগেও ঢুকে যাবে।’
সেই দেবী, অন্য দেবী ছিল। সেদিন যখন লতার গানের বই আনল সুনীল, দেবী ফিরেও তাকাল না। ও জানলার ধারে বসে রইল শুকনো চোখে। ওর মনে পড়ছিল সেই কথাগুলো, শোনো হে, দেবীপনা নিয়ে থাকলে থাকো, এ লাইনে এসো না। গায়কের নারী-পুরুষ হয় না, দিন-রাত হয় না, অত সংসারটি, স্বামীটি নিয়ে থাকতে চাইলে ঘরের বৌ সেজে থাকো, গায়িকা হবার স্বপ্ন দেখো না। আমাদের কাজ রাতেই হয়। এটাই দস্তুর।’
সুনীল, তার দেওর নিয়ে গেছিল লোকটার কাছে। সিনেমায় প্লেব্যাক সিঙ্গার হতে গেলে নাকি জীবনলালের কাছে যেতেই হবে।
পরে লোকটা সুনীলকে বলেছিল, ‘তোর বৌদি ভয় পেয়ে গেল তো? জগবন্ধু লেন থেকে দুর্গা পিথুরি লেন, রাত এগারোটায় যে আসতে পারল না, সে বোম্বাই যাওয়ার স্বপ্ন দেখে কী করে? শোনো, গান ভাল গাইলেই হয় না, সেই স্বপ্নটাকে তাড়া করার মতো সাহস আর রোখ থাকতে হয়। এই লাইনে অমন অনেক ট্যালেন্ট দেখেছি হারিয়ে যেতে। তোকে ডেকে আলাদা করে বলছি, কারণ ওর আওয়াজে কিছু একটা ছিল।’
জীবনলালের গলায় বিষাদ খেলে গেছিল। সুনীল মাথা নিচু করে বলেছিল ‘বৌদির শরীরটা এখন ভাল নেই জীবনদা, পরে বাচ্চা হবার পর একটু সামলে আবার যোগাযোগ করবে।’
‘বাচ্চা হবে! তা হলেই হয়েছে। ততদিনে আরও কত দেবী এসে হামলে পড়বে আমার দরজায়। সময় চলে যায় সুনীল। ঠিক মুহূর্তটা না বুঝলেই তুমি খতম। খেল খতম পয়সা হজম।’
জীবনলালের কথাগুলো দেবীকে বলেনি সুনীল, দেবী আজকাল সারাক্ষণ বিষণ্ণ হয়ে থাকে। সুনীলের চিন্তা হয়। একটা প্রাণ বড় হয়ে উঠছে, মাকে তো হাসিখুশি থাকতে হবে। দেবী গান গায় না একদম। মাঝে মাঝে হারমোনিয়ামের রিডের ওপর আঙুল বোলায়, কখনও লতার সেই চটি গানের বইটা খুলে বসে থাকে। মেজদা আর সে অনেক চেষ্টা করে, তবু দেবী দিনদিন বিষাদে ডুবে যাচ্ছে।
শীত শেষ হয়ে এল। ফুটপাথের কোণে শিমুল গাছটায় লাল টকটকে ফুল ফুটেছে। অরুণাংশু অফিস থেকে একটু আগে ফিরল আজ। সঙ্গে একটা নতুন লোক। লোক না বলে ছেলে বলাই ভাল। অরুণাংশুর উজ্জ্বল গৌর রঙের পাশে তার শ্যামল রং যেন নতুন দুর্বাঘাসের মতো। সে পরে আছে হলুদ একটা পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামা, কাঁধে ঝোলা। তার পাঞ্জাবির হলুদ রঙে নিমেষে ঘর উজ্জ্বল হয়ে গেল।
অরুণাংশু ঝলমলে মুখে বলল, ‘দেবী দেখো একে। এ হচ্ছে বসন্ত প্রামাণিক। আজ আলাপ হল। এক ফিল্ম আর্টিস্ট আছেন, মালা মিত্র, সাইড রোল করেন, ওঁর একটা পলিসির সমস্যার ব্যাপারে এসেছিলেন, ও সঙ্গে ছিল। কথায় কথায় বেরিয়ে পড়ল ও থাকে মদনপুরে, বিশ্বনাথদের চেনে।’
বিশ্বনাথ অরুণাংশুদের একমাত্র বোন সুরমার স্বামী। মদনপুরে থাকে। যদিও সুরমার হাতপাতা স্বভাবের জন্যে বোনের সঙ্গে সম্পর্ক খুব ভাল না অরুণাংশুর, তবে শান্ত, সুভদ্র বিশ্বনাথকে ও পছন্দ করে। বিশ্বনাথ একবার বলেছিল মোহনপুরে সস্তায় জমি কেনার ব্যবস্থা করে দেবে। ট্রেনে কলকাতা থেকে মাত্র তো ২০ কিলোমিটার। আর খুব শান্ত সুন্দর জায়গা।
‘আসল কথাটাই বলা হয়নি। ও দারুণ পল্লীগীতি করে। রেডিওতেও গায়। এই তো সুনু এসে গিয়েছে। সুনু, আমি চা চাপাচ্ছি। তুই চট করে গরম তেলেভাজা নিয়ে আয় কালিকা থেকে, আর মিষ্টিও আনিস পুটিরামের। বসন্ত ওই যে হারমোনিয়াম। আজ গান হোক। দেবী খুব মনমরা হয়ে আছে। লতাজির বাড়ি দেখে আসতে পারিনি আমি।’
বাইরের লোক এসেছে, দেবীকে বাধ্য হয়ে উঠতে হয়, শাড়ি বদলানোর ঘর নেই, সে বাইরে রান্নার জায়গায় গিয়ে চুল আঁচড়ে মুখে একটু পাউডার বুলিয়ে আসে। বসন্তকে জল দেয়।
মুড়ি-চপ চা খাবার পর গান শুরু হয়। দেবী অবাক হয়ে যায় বসন্তের গলার রেঞ্জ দেখে। আর কত ধরনের গান ওর ঝুলিতে।
‘বাদাম উড়াইয়া যাও’, ‘ভাঙ্গা নাও বাইয়া যাই’, ‘দয়াল হে’ গাওয়ার পর সে একটা মন্থর লয়ের গান ধরল—
‘কে তুমি গো বাজাও বাঁশি নদীর ও কূলে
আমি গো অবলা নারী সাঁতার নাহি জানি,
বাজাও বাঁশি নদীর ও কূলে
নারীর যৈবনকালে মুখে মুচকি হাসি
আর পুরুষের যৈবনকালে গো হাতে মোহন বাঁশি
বাজাও বাঁশি নদীর ও কূলে।’
দেবীর ভেতরটা উথালপাথাল করে উঠল। নীল মেঘের মতো রং আর কোঁকড়ানো চুলের নয়নলোভন বসন্তের দিকে চেয়ে সে ভাবল— সে কি সাঁতার না জানা অবলা নারীর মতো জীবন কাটাবে— না নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়বে নিজের স্বপ্নের কাছে পৌঁছবার জন্যে? সে কি সত্যিই চেনে নিজেকে? জানে সে কী চায়? তার আশু কর্তব্য, তার সন্তানকে অবহেলা করছে না কি? গান সে সত্যি কতটা শিখেছে? কতটা বুঝেছে? অনেক শেখা, অনেক বোঝা যে বাকি।
সে দেয়ালে ঠেস দিয়ে ছিল, উঠে বসল সোজা হয়ে। সুনীল বলল, ‘বৌদি ওই গানটা করো না, ওই যে— কালার সনে পীরিত কইরা, মেজদার কথা, আমার সুর।’
অরুণাংশু বলল, ‘করো দেবী। তোমাকে তো লতাজির গানে নয়, নিজস্ব গানে শ্রোতার মন জয় করতে হবে।’
দেবী কতদিন গান করেনি। ওর মন অবসন্ন, শরীর দুর্বল না খেয়ে খেয়ে। তবু ওর চোখ অনেক দিন পর জ্বলজ্বল করে উঠল। ও গান ধরল।
যখন গাইছে ‘আমি যে অভাগী রাধা, আমার ঘরে বাধা বাইরে বাধা’— তখন ওই ঘরে থাকা বাকি তিনজনের মনে হল সরস্বতী গাইছেন স্বয়ং।
গান থেমে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ কথা বলল না কেউ।
বসন্তই প্রথম বলে উঠল, ‘আপনারা মদনপুর চলুন বৌদি। আপনার সব মিটে যাক আগে ভালয় ভালয়। ওখানে টাটকা হাওয়া, এত গাড়ির আওয়াজ নেই, দাদার অফিস যাতায়াতেও কোনও অসুবিধে হবে না। ওখানে গিয়ে দেখুন কলকাতার বাইরেও কেমন গানের চর্চা হয়। বিশ্বাস করুন, আপনাদের ভাল লাগবে। আর বৌদি, আপনাকে আমরা মাথায় করে রাখব।’
সেদিনই সব ঠিক হয়ে গেল। সামনের রবিবার জমি দেখতে যাবে অরুণাংশু আর সুনীল। যদিও সুনীল কলকাতা ছাড়বে না। কাকাতুয়া বাড়িতে অনেকদিন থাকতে বলছে ওকে। ও থেকে যাবে। দেবীকে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করল না। নীরবতাই ওর সম্মতি ধরে নিল সবাই। বসন্ত যাওয়ার সময় উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে বলল, ‘দেখা হবে বৌদি। অনেক গান হবে।’
গান হবে! বুঝতে পারল না দেবী। সামনে সন্তান আসছে, তাকে সময় দিতে হবে, কলকাতা ছেড়ে মফস্বলে চলে যাওয়া, এর মধ্যে গান থাকবে বেঁচে? সুনীল একবার বলেছিল ভি বালসারা পার্সি। ওদের কারও মৃত্যু হলে একটা উঁচু জায়গায় ফেলে রাখে, শকুনরা এসে খায়। দেবী কতবার ভেবেছে সুনীলকে বলবে সে মারা গেলেও যেন ওইরকম করে, জীবনে তো কিছু কাজে লাগল না কারও। নাহ, আজ এসব ভাববে না সে। তার শরীরে আর একটা প্রাণ বড় হচ্ছে। বসন্তের উজ্জ্বল চোখকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছিল তার। আজ একটাও লতাজির গান গায়নি সে, হয়তো তার মনের মধ্যে গুনগুন করছিল তখনও জন্ম না নেওয়া একটা গান—
…তখন অন্য মন, অন্য আশা, অন্য ভাষা,
জানি না কী রূপ নেবে ভালবাসা…
°°°
চিত্রণ: সৌজন্য চক্রবর্তী







2 Responses
Chestar jonmo,narir swopner jonno prostut na thaka ek prithibite, jekhane megher rong beshi,alor cheye
বেশ লাগল।