চেনা অচেনা
সু দী প জো য়া র দা র
রথতলা মোড়ে এই এক সমস্যা। তোপখানার দিকে যাওয়ার খালি টোটো পাওয়াই যায় না। এর কিছুটা আগে বাসস্ট্যান্ড। টোটোগুলো সেখান থেকেই ভর্তি হয়ে আসে। কদাচিৎ এখানে কেউ নামে। আর রথতলা মোড়ে যে দু’একটা টোটো দাঁড়িয়ে থাকে, তারা একা সওয়ারি নিয়ে যেতে চায় না। রিজার্ভ করতে হয়। কিন্তু তা করলে পাঁচটা সিটের কুড়িটাকা করে মোট একশোটাকা গুনতে হয় কুড়িটাকার জায়গায়।
রাগিনী দাঁড়িয়ে আছে প্রায় পনেরো মিনিট। এমন কিছু বেশি সময় নয়। কিন্তু যে সমস্যার মধ্যে দিয়ে ও যাচ্ছে, তাতে পনেরো মিনিট অনেকটা। বাড়ি গিয়ে রান্নাবান্না সেরে এক্ষুনি ছুটতে হবে নার্সিংহোমে। পিকুর বাবা ওখানে ভর্তি। সাধারণ কিছু জ্বরের সিম্পটম নিয়ে ওখানে গিয়েছিল। পরীক্ষানিরীক্ষার পরে দেখা গেল জন্ডিস, সঙ্গে আরও বেশকিছু উপসর্গ, যা বাড়িতে থেকে চিকিৎসা করানো মুশকিল।
পিকুর পড়াশোনায় তবু ঢিল পড়ুক রাগিনী চায় না। তাই ওর প্রাইভেট থেকে স্কুল সব রুটিনটা যেমন চলছিল তেমনই চলছে। রথতলা মোড়ে এসেছিল, পিকুকে ইংরেজি টিউশন স্যরের কাছে পৌঁছে দিতে। ওর ফেরার ব্যাপারটা এক বন্ধুর মার ওপর দিয়ে এসেছে। আজ স্কুল নেই পিকুর। কাজেই রান্নাবান্না সেরে নিশ্চিন্তেই যেতে পারবে নার্সিংহোমে। কিন্তু এখনও খালি টোটো তো আসছে না!
আরও পাঁচমিনিট অপেক্ষা করার পর একটা টোটো এল একজন সওয়ারি নিয়ে। স্লো করে টোটোওলা মুখ বাড়াল, ‘যাবেন নাকি?’
‘যাব, তোপখানা যাবে?’
‘উঠুন!’
‘সোজাই যাবে, না ঘুরে? আমার তাড়া আছে, সোজা না গেলে যাব না!’
টোটোওলা কিছু বলার আগে টোটোয় বসে থাকা মহিলা সওয়ারি জবাব দিলেন, ‘উঠুন। আমিও তোপখানাতেই যাব!’
পাশাপাশিই বসে আছে দুই যাত্রী। মিনিট দশেকের রাস্তা। রাগিনী ঘড়ি দেখছে বার বার। এখন গিয়ে ডাল আর ডিমের একটা ঝোল তৈরি করে নিতে হবে চটপট। বেশ বড় একটা কেক আছে ফ্রিজের মাথায়। পিকুকে আগেই বলা আছে, টিউশন থেকে ফিরে যতটা পারে ওটা খেয়ে নিতে। ভাতটা কি এসে করবে, না করেই যাবে? আবার ঘড়ি দেখল রাগিনী। না, এইটুকু সময়ে অতকিছু হবে না। ভাতটা এসেই করতে হবে।
‘পার্সে ফোন বাজছে!’ সহযাত্রীর কথায় রাগিনীর চিন্তাজাল ছিন্ন হল।
মোবাইলটা বের করে কানে ধরতেই মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ‘এই থামুন। আমি এখানেই নেমে যাব!’
‘কেউ অসুস্থ?’ সহযাত্রী ভদ্রমহিলা শুধোলেন।
‘হ্যাঁ। এই দাঁড়ান, আমি নামব!’ নেমে রাগিনী পার্স খুলতে যায়।
টোটোর ভদ্রমহিলা বলে ওঠেন, ‘এখান থেকে ফিরে যাওয়ার টোটো সহজে পাবেন না। এই টোটোতেই উঠে আসুন। আমার তাড়া নেই। কোথায় যেতে হবে বলুন। আপনাকে পৌঁছে আমি ফিরে আসব!’
রাগিনী অবাক চোখে ভদ্রমহিলার দিকে তাকায়। তারপর যন্ত্রচালিতের মতো টোটোয় উঠে বসে। ‘আমি হেলথ কেয়ার নার্সিংহোম যাব!’
‘ও, খুব দূর নয়! চলুন ভাই!’ টোটোওলাকে নির্দেশ দেন ভদ্রমহিলা।
টোটোয় রাস্তাঘাটে চলাচল করতে গিয়ে দেখেছে একজনের জন্য অন্যজনের একটু ঘুরপথ হয়ে গেলেই টোটোওলার সঙ্গে তার বচসা বাধে। কিন্তু এই মহিলাটি আশ্চর্য ধরনের। এরকম মানুষের দেখা রাগিনী এই প্রথম পেল। কী বলে যে ভদ্রমহিলাকে কৃতজ্ঞতা জানাবে বুঝে পেল না! ‘স্বামী অসুস্থ। জন্ডিস হয়েছিল, সঙ্গে আরও নানা উপসর্গ। এখন শুনছি হিমোগ্লোবিন খুব কম। রক্ত দিতে হবে আজকেই!’
‘তাহলে তো ডোনার লাগবে। কী গ্রুপ?’
‘এ পজিটিভ। আমার বি নেগেটিভ, না হলে তো আমিই—।’
‘আমার সঙ্গেও মিলবে না। চেনা কেউ আছে?’
রাগিনী ঘাড় নাড়ে।
‘আচ্ছা দাঁড়ান, দেখছি—।’
ভদ্রমহিলা ফোন বের করে নম্বর টেপেন। ‘হ্যালো সুখেন, আমি তিথিদি বলছি। মানে তিথি সেন। বুঝতে পারছ এবার? যা বলছিলাম… এ পজিটিভ ডোনার পাওয়া যাবে? হেলথ কেয়ার নার্সিংহোমে ভর্তি আছে পেশেন্ট। ক’ বোতল?’ ভদ্রমহিলা মানে তিথি সেন রাগিনীর দিকে তাকান।
‘দু’বোতলের কথা বলেছে।’
এবার ফোনে উল্টোদিকের ব্যক্তিকে উনি পরিমাণটা বলেন। ‘ও হয়ে যাবে? বেশ পাঠিয়ে দাও তা হলে ব্লাডব্যাঙ্কে। হ্যাঁ, হ্যাঁ আমি থাকছি!’
রাগিনী তিথির শেষ কথায় অস্বস্তি বোধ করে। ‘আপনি আবার…!’
‘না না ঠিক আছে। আমার স্কুল ছিল। স্কুলের প্রাক্তন সেক্রেটারি মারা গেছেন। তাই ক্লাস হয়নি। একটু বসে চলে এসেছি। বাড়ি গিয়ে আপাতত কাজ নেই। ছেলের স্কুল আটটা থেকে দুটো। কর্তা বাইরে থাকে, তার ঝামেলাও নেই। কাজেই আমি দুটো অব্দি ফ্রি!’
একথার উত্তর হয় না। তবু অস্বস্তি কিছু থেকেই যায়। রাগিনীর অবশ্য কিছু করারও নেই। উপযাচক হয়ে এই ধরনের সাহায্য অন্য সময় হলে প্রত্যাখ্যান করত। কিন্তু এখানে ও অসহায়। ওর চেনা কেউ নেই। ওকে ব্লাডব্যাঙ্কের ভরসায় যেতে হত। কিন্তু ওখানে রক্ত মিলবে সে নিশ্চয়তা কম। রাগিনী শুনেছে, ডোনার না নিয়ে গেলে রক্ত পাওয়া কঠিন।
তিথি সেনের সৌজন্যে রক্তের ডোনার পাওয়া গেছে। কিন্তু কে তাঁদের চিনবে? একা একা রক্তের ঝামেলাটা ওর পক্ষে মেটানোও মুশকিল। কোনওদিন তো এসব করেনি। উনি সঙ্গে থাকলে বরং সুবিধেই হবে। রাগিনী তিথিকে আর নিরস্ত করতে চায় না।
হেলথ কেয়ার নার্সিংহোম রাস্তার ওপরেই পড়ে। রাগিনী ওখানে নেমে গেল। রক্তের রিক্যুইজেশনটা নেওয়ার জন্য।
তিথি বললেন, ‘আমি হাসপাতালে ব্লাডব্যাঙ্কের কাছে আছি। ডোনারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কাজটা কিছুটা এগিয়ে রাখি। আপনি আসুন!’
নামার পড়ে রাগিনীর খেয়াল হল টোটোর ভাড়া দেওয়া হয়নি। এতটা করছেন রাগিনীর জন্য অথচ ভাড়াটা দিতেই ভুলে গেল! হয়তো এই অবস্থায় এটা অস্বাভাবিক নয়, পরে দিয়েও দেওয়া যাবে, তবু একটা অস্বস্তি মনে খোঁচাতে লাগল।
রিক্যুইজেশন পেতে বেলা সাড়ে এগারোটা পেরিয়ে গেল। কাজের দিদিকে ফোন করে বলল, না ফেরা পর্যন্ত পিকুর কাছে একটু থেকে যেতে। গিয়ে খাওয়ার যা হোক কিছু ব্যবস্থা করবে।
ব্লাডব্যাঙ্কে রাগিনী পৌঁছল বারোটা নাগাদ। দেখল, তিথি দাঁড়িয়ে আছেন দু’জনকে নিয়ে।
‘রিক্যুইজিশন পেতে দেরি হয়ে গেল। আপনারা বোধহয় অনেকক্ষণ…।’
‘এসব কাজে দেরি খুব নর্মাল ব্যাপার। ও নিয়ে ভাববেন না! আপনার রিক্যুইজিশন স্লিপ জমা করুন কাউন্টারে।’
রক্তের ঝামেলা মিটতে আরও দু’ঘণ্টা গেল। রাগিনী অফিসে জিজ্ঞেস করল, ‘কখন রক্তটা পাওয়া যাবে?’
‘বিকেল পাঁচটার পরে।’ জবাব এল।
হেলথ কেয়ার থেকে বলেও দেওয়া হয়েছিল ব্যাপারটা। রক্ত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে তার মানে রাত্রিতে। এর মধ্যে যদি কিছু…! তেমন সম্ভাবনা থাকলে ডাক্তার নিশ্চিত বলতেন।
‘ফিরবেন তো?’ তিথি জিজ্ঞেস করলেন।
‘হ্যাঁ চলুন, টোটো ধরে নিই!’
টোটোয় চেপে রাগিনী বলল, ‘আপনি এতটা করলেন, নামটাই জিজ্ঞেস করা হল না!’
তিথি নিজের নামটা বললেন। অন্যের নাম জিজ্ঞেস করলে নিজেরটাও বলতে হয়। রাগিনী নিজের নামটাও জানাল। বলল, ‘আমি তখন টোটোর ভাড়াটা দিতে ভুলে গিয়েছিলাম—।’
‘আরে, ওটা থাক না! কীই বা এমন ভাড়া!’
‘না না, তা বললে হয়!’ রাগিনী পার্স খুলে জোর করেই টাকাটা গুঁজে দিল তিথির হাতে।
‘বেশি দিলেন তো!’ দশ টাকা রাগিনীকে তিথি ফেরত দিলেন সঙ্গে সঙ্গে।
একটু চুপ করে থাকে রাগিনী বলে, ‘টোটোর ভাড়া না হয় দিয়ে দিলাম, আপনার এই উপকারের ঋণ তো শোধ করতে পারব না!’
‘শোধ করার কি খুব দরকার? প্রতিবেশীর জন্য প্রতিবেশী এটুকু তো করেই!’
‘ঠিকই বলেছেন, আপনিও তোপখানাতেই তো নামবেন, সেই হিসেবে আমরা প্রতিবেশীই হচ্ছি!’
‘শুধু তোপখানা কেন বলছেন? আমরা তো একই আবাসনে থাকি। আপনাদের পরের উইং-এ। দেখুন মাত্র চল্লিশ-পঞ্চাশ ফুটের মধ্যেই বাস, কিন্তু আমরা কেমন অচেনা পরস্পরের কাছে! আমি অবশ্য আপনাকে দেখেছি আবাসনে ঢুকতে-বেরোতে। তাই মুখ চিনি। কিন্তু আপনি বোধহয় আমাকে…।’
‘না, মানে আমি ঠিক—।’ রাগিনী কেমন থতিয়ে যায়। চেনে না তো বটেই, এতদিন প্রতিবেশীদের কাউকে চেনার চেষ্টাও করেনি! আবাসনের সংস্কৃতিই যে এমন! অথচ এই সংস্কৃতির বেড়া টপকে এক প্রতিবেশীই তো আজ…
‘দাদা কেমন থাকে, জানাবেন।’ তিথি টোটো থেকে নামতে নামতে নিজের ফোন নম্বরটা রাগিনীকে দেন।
‘জানাব, অবশ্যই জানাব!’ কৃতজ্ঞ চোখে রাগিনী তাকায় তিথির দিকে।
চারতলা আবাসন। লিফট নেই। রক্ত দিলে মানুষটা ঠিক হবে তো! একটা দুশ্চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এরই মধ্যে রাগিনী দেখল চারতলার ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিটি একটা ঢাউস ব্যাগ নিয়ে খুব কষ্ট করে সিঁড়ি ভাঙছেন। রাগিনী বৃদ্ধের সঙ্গে কোনওদিন কথাও বলেনি। কিন্তু আজ তাড়াতাড়ি ঘরে ঢোকার তাড়া নিয়েও বৃদ্ধের পাশে গিয়ে বলল, ‘মেসোমশাই, কষ্ট হচ্ছে ব্যাগ নিয়ে উঠতে। ব্যাগটা আমাকে দিন, আমি পৌঁছে দিচ্ছি!’
°°°
চিত্রণ: দেবাশিস সাহা






