দ্বিতীয় মস্তিষ্ক
বা মা প্র সা দ মু খো পা ধ্যা য়
প্লেন ল্যান্ড করতেই শ্রীরাজ মোবাইলের সুইচটা অন করে। সম্পূর্ণ অচেনা আরবসাগরের তীরে এই মহানগরীতে তার কয়েক ঘণ্টার বাস, তারপর এখন থেকেই আজ রাতের ফ্লাইট ধরে দীর্ঘ উড়ান। ব্রাজিলের ফোর্টালেজা শহর। সঙ্গে থাকবেন তিন অচেনা সঙ্গী। সকলেই ভারতীয় অবশ্য এবং আনন্দের কথা এই যে, তিনজনের একজন রমণী, যার নাম পদ্মিনী নটরাজন। এদের সকলের ফোন নাম্বার খুব যত্ন করে তার মোবাইল ফোনে সেভ করে দিয়েছে তার মেয়ে।
শ্রীরাজ একজন শখের ফটোগ্রাফার। একটি বিদেশি পত্রিকা ছবি তোলার প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল এবং এই চারজন ভারতীয়ের কপালে শিকে ছিঁড়েছে। এদের প্রত্যেকের নাম, ই-ঠিকানা এবং মোবাইল নাম্বার সকলকে জানিয়ে দিয়েছে কোম্পানি। দিয়েছে মুম্বই শহরে তাদের প্রতিনিধির যোগাযোগ নাম্বারও। ভদ্রলোকের নাম সঞ্জীব প্রিয়দর্শী।
এয়ারপোর্টের বাইরে সঞ্জীবের পাঠানো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভারের নাম এবং নাম্বারটাও সেভ করা আছে ফোনে। সে শ্রীরাজকে হোটেলে নিয়ে তুলবে তারপর আবার রাতে নামিয়ে দিয়ে যাবে ছত্রপতি শিবাজি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। সঞ্জীব সব জানাল কিন্তু হোটেলের নামটা জানাতে পারেনি। বলেছিল ড্রাইভারকে সব ইন্সট্রাকশন দেওয়া থাকবে।
প্লেন থেকে নেমেই সে তার বিশ্বস্ত মোবাইলে ‘ড্রাইভার’ শব্দটা লিখতে চাইল কিন্তু কোনও অক্ষর ফুটল না। শ্রীরাজ একটু অবাক হল বটে, তবে ভাবল বাইরে প্রখর রোদে হয়তো সে ঠিক ভাবে দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু মালপত্র নিয়ে এয়ারপোর্টের বেল্টের সামনে দাঁড়িয়ে ফের সে চেষ্টা করল। কিন্তু সেই ঘোলাটে আলো ছাড়া আর কিছুই ছিল না স্ক্রিনে। যেন যন্ত্রটা খুব অসুস্থ। যেন তাকে দেখে এখুনি বড় ডাক্তার বলবেন, এখুনি আইসিইউতে অ্যাডমিট করতে হবে। শ্রীরাজের ব্র্যাডিকার্ডিয়া আছে। বুকের ঠিক মাঝখানে কে যেন বন্ধ দরজার ওপর লাথি কষিয়ে চলেছে একটার পর একটা। এখন কী করবে সে? সে তো বাড়ির কারও মোবাইল নাম্বারই জানে না। তার স্মরণশক্তি এমনিতেই দুর্বল। বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটা বিপজ্জনকভাবে কমছে। বাইরে এসে সে দেখল দূরের পার্কিং লটে অনেক গাড়ি। কত ড্রাইভার হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিজের নামটা সে এমনভাবে কোনওদিনও খোঁজেনি।
এখন কি সে তবে নিজেই কোনও হোটেল খুঁজে নেবে? টাকা খরচ হবে বটে। ভাগ্যিস এটিএম কার্ড মেয়ে পার্সে ঢুকিয়ে দিয়েছে। বিদেশযাত্রার সব খরচ ম্যাগাজিন কোম্পানি দিলেও সে দুই হাজার ডলার কিনেছে। বিদেশযাত্রার সময় সঙ্গে বেশি ভারতীয় মুদ্রা রাখা যায় না বলে, পার্সে খুব বেশি হলে এক হাজার টাকা আছে। এই টাকা দিয়ে সে মুম্বই শহরে কী করবে? ফোনটা সরিয়ে নেবে, নাকি ট্যাক্সি নেবে? কথায় কথায় সঞ্জীব জানিয়েছিল, তাদের অফিস বালার্ড এস্টেটে। কিন্তু সেখানে পৌঁছালেই কি তাকে খুঁজে বার করা যাবে?
হাতের মুঠোয় ধরা আছে দামি সেলফোনের শব। মেয়ের ফোন নাম্বারটা মনে থাকলেও কিছু একটা ব্যবস্থা হত। কিন্তু এই মোবাইলটা যেদিন থেকে তার দ্বিতীয় মস্তিস্ক হয়ে উঠেছে, সেদিন থেকেই তার আসল মস্তিস্ক অভিমানে তার কাজ কমিয়ে দিচ্ছে। তার সারা দিনের কাজের ফিরিস্তি নানা সময় ঘণ্টি বাজিয়ে মনে করিয়ে দেয় সে। তার সকল আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের কাছে নিমেষের মধ্যে পৌঁছানোর ম্যাজিক ওই যন্ত্রটার মধ্যে। এত সহজে দশটা নাম্বার নাগালে চলে আসে যে, সে কোনও নাম্বারই কোনওদিন মনে রাখার চেষ্টা করেনি। আর তা করেনি বলেই তার এই বিদেশবিভুঁইয়ে এসে মনে হল, সে তার পরিচিত মহল থেকে চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে এবং সারা জীবন আর কারও সঙ্গে দেখা হবে না।
বাইরে আসতেই একটা এটিএম কাউন্টার চোখে পড়ে। হাজার পাঁচেক টাকা তুলতে সে ঢুকে পড়ে কাচের পাল্লা ঠেলে। দরজা বন্ধ হতেই সে মেশিনে কার্ড ঢোকায় এবং তার দ্বিতীয়বার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। মেশিন তার পিন নাম্বার চাইছে এবং জীবনের যাবতীয় প্রয়োজনীয় সংখ্যাগুলি ভরা রয়েছে তার ওই মৃত মোবাইলে।
বুকের কষ্টটা বেড়ে যাচ্ছে। সে কি মারা যাবে? সে ছাপোষা মানুষ। মুম্বই শহরে তার চেনাশোনা লোক কেউ নেই। আজ যদি তার ব্রাজিল যাত্রাটা না হয়, তাকে বাড়ি ফিরে যেতে হবে। কে তাকে কলকাতার টিকিট করে দেবে? শ্রীরাজের মনে হল, খুব জোরে সে চেঁচিয়ে বলে, আমি হারিয়ে গেছি, আমাকে বাঁচান। আচ্ছা, পুলিশের কাছে গেলে কেমন হয়? তাদের সব নানা রকম ব্যবস্থা থাকে। মোবাইল হাতে আসার পর থেকে মনে হত হারিয়ে যাবার আনন্দটা হারিয়ে ফেলল মানুষ। কিংবা প্রিয়জনের জন্য কোথাও দাঁড়িয়ে প্রতীক্ষা এবং অনেক দুশ্চিন্তার পরে তাকে হঠাৎ দেখার পর যে আনন্দ লাভ, সেই সব পৃথিবী থেকে চিরকালের জন্য ভ্যানিশ। আজ সত্যি সত্যি হারিয়ে গিয়ে তার মনে হল, মোবাইল ফোন যদি না থাকত তাকে এই অবস্থায় পড়তে হত না। সপরিবারে কত জায়গা সে ঘুরেছে যখন মোবাইল ছিল না। পথ হারিয়ে গেছে কত কিন্তু সে নিজে তো কখনও হারায়নি।
হাতের ব্যাগটা ক্ৰমশ ভারী হয়ে উঠছে। একটা অটোওয়ালাকে পেতেই সে তার সওয়ার হয়। অটোতে উঠেই সে সব কিছু খুলে বলতেই লোকটা দশ মিনিটের মধ্যে একটা একটা ঘিঞ্জিমতো জায়গায় এনে ফেলে। রাস্তার ওপর একটা মোবাইল সারানোর দোকান। ছেলেটা বলল, সাব ইঁহা জরা ফোন চেক কর লেনা। সামান গাড়ি মে ছোড় সকতে হ্যায়। দোকানের মধ্যে ঠিক তার মেয়ের বয়েসি একটি মেয়ে। শ্রীরাজ তাকেও সব বলল অকপটে। মেয়েদের মনে তো একটু দয়ামায়া বেশিবেশি হয়। সব শোনার পরে সে হাত তুলে বলল, ফিকর মত কিজিয়ে। মুঝে চেকআপ করনে তো দিজিয়ে পহেলে। পিন দিয়ে যন্ত্রটার পিছনের ঢাকাটা খুলে ফেলল সে। তারপর সিম কার্ডটা বার করে দ্রুত সে মোবাইলের শরীরের নানা জায়গায় তার হাতের সন্নাটা দিয়ে টেপাটেপি করতে লাগল। সব শেষে মোটা কাপড় দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ মোছামুছি করে যন্ত্রটা জোড়া লাগিয়ে সুইচ টিপতেই ফের সুরের মূর্ছনা ছড়িয়ে মোবাইল বলে উঠল, আমি ভাল আছি, ঠিক আগের মতো। মেয়েটা হাসিমুখে বলে, একদম ঠিক আছে সবকিছু। একটু লুজ কানেকশন হয়েছিল আর ময়েশ্চার ঢুকেছিল।
শ্রীরাজ অটোতে উঠে দেখল বাইরের পৃথিবী ঠিক আবার আগেকার মতো। প্রিয়দর্শী সব শুনে বলল, খুব চিন্তা করছি, ড্রাইভার আপনাকে খুঁজে না পেয়ে ফিরে এসেছে। এক কাজ করুন। আপনি অটোওয়ালাকে দিন আমি সব বলে দিচ্ছি। হোটেলে আমাদের লোক আছে। ওখানে পৌঁছান আগে, তারপরে বাকি কথা হচ্ছে।
হোটেলের পথে সে একটা খাতা আর কাগজ-কলমের দোকান থেকে একটা ছোট হাতখাতা কিনল। আজ অনেক সময় পাবে। এতদিন হয়নি। আজ তাকে করতেই হবে। ফোনে থাকা সব কত নাম আর ফোন নাম্বার এই খাটাতে লিখে রাখবে সে। আজ থেকে এই দ্বিতীয় মস্তিষ্কটাকে সে আর বিশেষ পাত্তা দেবে না।
°°°
চিত্রণ: সৌজন্য চক্রবর্তী






