ট্রমা-চিহ্নিত সেলফিগুলি
অ রি জি ৎ চ ক্র ব র্তী
অজ্ঞাত পাণ্ডুলিপি থেকে উদ্ধারকৃত দু’টি টীকা
(লেখকের নাম অনুপস্থিত। পাণ্ডুলিপির শেষ কয়েকটি পৃষ্ঠা বহু আগেই নষ্ট হয়ে গেছে।)
এক
পুরনো কোনও ঘরে অনেকদিন ধরে আলো না জ্বললেও, ঘরের কোণে রাখা কাঠের চেয়ারটা আলো আর ছায়াকে ঠিক চিনে ফেলে। মানুষ চলে যায়। কিন্তু তার দীর্ঘশ্বাসের অদৃশ্য স্যাঁতসেঁতে দাগ ইটের গাঁথুনিতে লেগে থাকে। বস্তু তখন ধীরে ধীরে স্মৃতি হয়ে উঠতে চায়। কিন্তু পুরোটা পেরে ওঠে না।
দুই
দুটো মানুষের সংলাপ আসলে মোমের আগুনে ভেসে থাকা দুটো আলাদা ফানুস। বাতাস তাদের কাছাকাছি আনে ঠিকই, কিন্তু শিখা দুটো কখনওই এক হতে পারে না। একজন যা বলতে চায়, তা তার নিজস্ব অন্ধকারের ভাষা। আর অন্যজন যা শোনে, তা কেবল নিজের আলোয় প্রতিবিম্বিত এক ভিন্ন সুর। পাশাপাশি বসে কথা বলা তাই দুটো নদীর কেবল একই সাগরের দিকে বয়ে যাওয়া! পরস্পরকে স্পর্শ না করেও এক সাথে হারিয়ে যাওয়ার এক করুণ চেষ্টা!
পূর্বিতা ও সম্মোহ: একটি অসমাপ্ত মুহূর্ত
(স্থান: কলকাতার এক অখ্যাত গলি। একটি নিয়ন সাইন জ্বলছে-নিভছে। বাইরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। জাজ বারটিতে ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে বিল ইভান্সের ‘উইথআউট আ সং’-এর মৃদু পিয়ানো লাইন। কাঠের টেবিলের ওপর দুটো অর্ধেক খালি কফির কাপ।)
পূর্বিতা চামচ দিয়ে কফির রেস ঘোরাতে ঘোরাতে বাইরের বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল। তার আঙুলের নখে নীল রঙের পলিশের সামান্য অংশ উঠে গেছে।
‘তুমি কি কখনও ভেবে দেখেছ, সম্মোহ’, সে কফির দিকে চোখ রেখেই বলল, ‘আমরা যখন একটা শব্দ উচ্চারণ করি, তখন শব্দটা বাতাসে খানিকটা তাপ তৈরি করে আর তারপর মরে যায়!’
সম্মোহ ঘড়ির স্ট্র্যাপটা একটু শক্ত করল। ঘড়িটা প্রতি সেকেন্ডে টিক-টিক করে নিখুঁত, কিন্তু অর্থহীন ছন্দ তৈরি করছে।
‘মরে যায় না। পূর্বিতা, শব্দগুলো আসলে আমাদের দু’জনের মাঝখানের এই শূন্যস্থানটায় জমা হয়। অদৃশ্য ধুলোর আস্তরণের মতো। আমরা যখন কথা বলি, আমরা আসলে একজন আরেকজনকে ছুঁতে পারি না। কেবল মাঝখানের সেই ধুলোর স্তরটাকে একটু নাড়িয়ে দিই।’
পূর্বিতার ঠোঁটের কোণে খুব সূক্ষ্ম, একঝিলিক হাসি ফুটে উঠে আবার মিলিয়ে গেল।
‘তা হলে আমাদের এই পাশাপাশি বসে থাকা? এই যে আমি বলছি আর তুমি শুনছ?’
‘এটা দুটো ভিন্ন ট্রেনের পাশাপাশি চলা’, সম্মোহ কাপে চুমুক দিল।
‘জানলার কাচ বন্ধ। আমি আমার জানলায় দাঁড়িয়ে তোমার অবয়ব দেখছি। তুমি তোমার জানলায় দাঁড়িয়ে আমার। আমরা মনে করছি, আমরা একই যাত্রায় আছি। কিন্তু আসলে, ট্রেনের লাইন দুটো সম্পূর্ণ আলাদা দিকে চলে গেছে বহু আগেই।’
পূর্বিতা একটু ঝুঁকে এল। টেবিলের কাঠটায় তার কনুইয়ের চাপ পড়তেই হালকা একটা মচমচ শব্দ হল। যেন কাঠটা তার নিজের স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করছে।
‘তা হলে এই পুরো ব্যাপারটা একটা অসফল চেষ্টা?’ পূর্বিতা জিজ্ঞেস করল।
‘সম্ভবত’, সম্মোহ বলল।
‘কিন্তু জানো তো, এই বৃষ্টিতে, এই ভাঙা পিয়ানোর সুরের ভেতর— দুটো দূরবর্তী মহাবিশ্ব যদি পরস্পরের দিকে তাকিয়ে একটু হাসতে পারে, তবে সেই অসফল চেষ্টাটুকুও খুব একটা খারাপ নয়।’
পূর্বিতা আবার বাইরে তাকাল।
একটা কালো বেড়াল গলির মুখ দিয়ে দৌড়ে পার হয়ে গেল। পূর্বিতার মনে হল, সম্মোহ যে কথাটা বলল, সেটা হয়তো শব্দ হিসেবে তার কাছে পৌঁছায়নি! পৌঁছেছে কফির বাষ্প আর বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মেশানো একটা সুর হয়ে।
গলির মুখে মিলিয়ে যাওয়া কালো বেড়ালের ছায়াটা যেন এখনও বৃষ্টির ভেজা অ্যাসফাল্টে আটকে আছে।
‘তুমি ওই বেড়ালটাকে দেখলে, সম্মোহ?’ পূর্বিতা মুখ না তুলে শান্ত গলায় বলল।
সম্মোহ সিগারেটের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে আবার রেখে দিল।
‘হুঁ। গলির মুখে কালচে অন্ধকারের মতো মিলিয়ে গেল।’
‘ওটা কিন্তু কেবল হেঁটে পার হল না’, পূর্বিতা এবার সোজা সম্মোহের চোখের দিকে তাকাল।
‘আমার মনে হল, বেড়ালটা আসলে গলির বস্তু-পরিবেশের একটা অংশকে সঙ্গে করে নিয়ে গেল। ও যেখানে যেখানে পা ফেলল, সেখানকার বৃষ্টি আর আলোর অনুপাতটা চিরতরে বদলে গেল। কিন্তু আমরা যদি কাল আবার এই সময়ে এই একই টেবিলে এসে বসি, আমরা কি বলতে পারব যে, ঠিক কোনখানটায় বেড়ালটার থাবা পড়েছিল?’
‘পারব না। কারণ আমরা কেবল স্থূল বস্তুগুলোকে মাপতে পারি— এই টেবিল, এই কাপ, কিংবা ঘরের দেয়াল। কিন্তু কোনও একটা সত্তা চলে যাওয়ার পর যে শূন্যতা বা স্মৃতিটুকু বাতাসে রেখে যায়, তা মাপার মতো কোনও স্কেল আমাদের কাছে নেই।’
‘ঠিক তাই’, পূর্বিতা টেবিলের ওপর থেকে হাতটা সরিয়ে নিল। যেন কাঠের স্পর্শ থেকেও সে নিজেকে গুটিয়ে নিতে চায়!
‘ভাষা যদি ভাঙা আয়না হয়, তবে ওই বেড়ালটা হল সেই অসংগঠিত অনুভূতি। যাকে আমরা কোনওদিন কোনও বাক্যে বাঁধতে পারি না। সে এল, আমাদের চেতনার পরিধিতে একটা ক্ষণস্থায়ী দাগ কাটল। তারপর পুরোপুরি অর্থহীনভাবে উবে গেল। তোমার আর আমার মাঝের এই শব্দগুলোও তো ঠিক ওই বেড়ালটার মতোই, তাই না? আমরা ছুঁতে পারি না। কেবল একপলকের জন্য চলে যেতে দেখি।’
বাইরে বৃষ্টির বেগ একটু বাড়ল। বিল ইভান্সের পিয়ানোর সুরটা এখন অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে ক্যাফের জানলায় আছড়ে পড়া জলের শব্দে।
সম্মোহ কোনও উত্তর দিল না। সে কফির শেষ চুমুকটুকু শেষ করে খালি কাপটার দিকে তাকিয়ে রইল। কাঠের টেবিলে এখন দু’জোড়া হাত আর দুটো কাপের অবয়ব ছাড়া আর কিছুই স্পষ্ট নয়। অথচ তাদের মাঝখানের অদৃশ্য ধুলোর স্তরটা যেন হঠাৎ আরও খানিকটা ভারী হয়ে উঠেছে।
দেখা না দেখা
…বাইরে বৃষ্টির বেগ একটু বাড়ল। পিয়ানোর সুর এখন অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে ক্যাফের জানলায় আছড়ে পড়া বৃষ্টির শব্দে।
ট্রে হাতে টেবিলের পাশে এসে দাঁড়াল ক্যাফের তরুণ ওয়েটারটি। পরনের অ্যাপ্রনটায় কফির সামান্য দাগ। চোখে সারাদিনের ক্লান্তির নিস্পৃহ ছাপ।
‘স্যার, আর কিছু লাগবে? ক্যাফে বন্ধ করার সময় হয়ে এসেছে।’
সম্মোহ পকেট থেকে পার্সটা বের করে দুটো পাঁচশো টাকার নোট টেবিলের ওপর রাখল।
ওয়েটার অভ্যস্ত হাতে খালি কাপ দুটো আর বিলের টাকা তুলে নিল। তারপর একটা সাদা সুতির কাপড় দিয়ে টেবিলের ওপর জমে থাকা কফির বাষ্পের আর্দ্রতাটুকু মুছে দিল নিমেষে।
ওয়েটার চলে যাওয়ার পর পূর্বিতা একবার মোছা টেবিলটার দিকে তাকাল। তারপর সম্মোহের দিকে।
তারা দু’জনেই বুঝল, গল্পটা শেষ হয়ে গেছে। কেবল বাইরের বৃষ্টি আর ভেজা অ্যাসফাল্টে জমে থাকা আলোর প্রতিবিম্বটুকুই তখনও সত্যি ছিল।
°°°
চিত্রণ: সৌজন্য চক্রবর্তী






