সেই চক্রান্ত-ঘর
স ব্য সা চী স র কা র
শ্রীপেরামবুদুরে গেলে, আপনি একটু থামবেন। হত্যার ইতিহাস যদি জানেন। দেশবাসী জানে। আপনিও জানেন। আপনি দুঃখ হয়তো পান। নাও পেতে পারেন। সে অনেক দিন চলে গেল দেশের। অনেক দিন চলছে। আসছে অনেকদিন। এই তো ইতিহাস। এত ভনিতা করছি, এই ঘরটা ভাল করে দেখুন। আপনি ভারতীয়। জানা দরকার। রাজনীতি জানলে খুব বেশি কিছু জানা হয় না। রাজনীতির নেপথ্যে দুই অসম শক্তির লড়াই, একজন হারে। অন্যজন জেতে। যেমন সেদিন ওরা জিতেছিল। তারপর কিন্তু হেরেছিল।

১৯৯১, ২১ মে। তামিলনাড়ুর শ্রীপেরামবুদুরে লিবারেশন টাইগার্স অফ তামিল ইলমের বোমায় ঝাঁঝরা দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী। এক বিকেলে। বোমা শুধু নয়। আত্মঘাতী জঙ্গি শরীরে বোমা বেঁধে খুন করল দেশের প্রধানমন্ত্রীকে। কত বছর কেটে গেল। ৩৫ বছর। ধানু, শিবরাসন, নলিনী, মুরুগান… মনে পড়ছে? সারা বিশ্বে এলটিটিই সেই জঙ্গিগোষ্ঠী, যারা প্রথম আত্মঘাতী মানববোমা নিয়ে আসে। তারপর বাকিরা। কিলিনোচ্চি, ত্রিঙ্কোমালি, বাত্তিকালোয়া, জানা সব জায়গা থেকে গরিব ধীবর পরিবারের কিশোরদের বিপ্লবের মন্ত্র দিয়েছিল ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণ। ডাকনাম থাম্বি। গলায় পটাসিয়াম সায়ানাইডের ক্যাপসুল, হাতে একে ফর্টি সেভেন। ধরা পড়লে বিষ খাও, কাউকে ধরিয়ে দিয়ো না। ইলম চাই। স্বাধীনতা চাই। সিংহলিদের স্বাধীনতা। থাক সে দীর্ঘ ইতিহাস। ষাটের দশক থেকে গোপনে গোপনে সংকল্প। ধীরে সশস্ত্র। তারপর হত্যার পথ। সিংহলিরা সেই মাটিকে ঘরে রাখেন। দেখেছি।

২০১৩। নিজের খেয়ালে পাতা উল্টে ভাবি, গিয়ে দেখাই ভাল। এখন অনেকেই বেড়াতে যান। নর্দার্ন প্রভিন্সে। কলম্বো থেকে বহুদূরে। এখন হয়তো ভাভুনিয়া পর্যন্ত ট্রেন যায়। তারপর জাফনা। আমি ১৭ ঘণ্টা ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে রাতভর গিয়েছিলাম। কিলিনোচ্চি পৌঁছে আরও ছয় ঘণ্টা বাসে। এবং সেখান থেকে দুঘণ্টা গিয়ে শ্রীলঙ্কার সেনাগাড়িতে জাফনার গর্ভগৃহে। হ্যাঁ, কলকাতার সাংবাদিককে সাহায্য করেছিল ভারতীয় দূতাবাস। কৃতজ্ঞ। হ্যাঁ, জার্নালিস্ট ভিসা পেতে সময় লেগেছিল আড়াই মাস। অজস্র প্রশ্ন। হয়তো বিশ্বাস তখন করেনি শ্রীলঙ্কা সরকার। নেপথ্যে ছিলেন এক মহিলা দূতাবাস কর্মী। আমার বন্ধু। আয়েষা গুণরত্নে। থাক সেকথা!
পৌঁছে, আমার সর্বাঙ্গ তল্লাশি করে মাটির নীচে নিয়ে গেল সিংহলি সেনা। কারণ গোটা এলাকা জুড়ে প্রভাকরণের মৃত্যুর পরেও ভয়। দ্বিতীয় ভয় আলুচাষের খেতের মতো মাইন পোঁতা যত্রতত্র। আর বুবিট্র্যাপ। লালমাটির রাস্তা দেখে যদি কেউ আপন মনে, ‘তোমার খোলা হাওয়া/ লাগিয়ে প্রাণে’ গাইতে গাইতে যায়, কপাল ভাল থাকলে (ইচ্ছে করেই লিখছি) বুবিট্র্যাপে পড়ে বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হতেই পারে। যেহেতু আমি শ্রীলঙ্কা সরকারের দেওয়া ‘ফরেন জার্নালিস্ট’ লেখা অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডধারী, তাই আমার খানিক নিরাপত্তা দেওয়া তাদের দায়িত্বে।

নিয়ে গেল মাটির নীচে। সিঁড়ি বেয়ে নামছি। তখনও রক্তের ধারা শুকিয়ে কালো। রক্তের ছিটে, পাশে লেখা সিংহলি যোদ্ধাদের নাম। শেষ বুলেট চালানোর আগে নাম লিখে গিয়েছিল।
২
ঘোরানো সিঁড়ি। খুব গরম। উৎকট গন্ধ। ক্রমাগত ঘামছি। বাতাস যাতায়াতের পথ অবশ্য আছে। এগজস্ট ফ্যান আছে। মানে ছিল। ভারতের পিস কিপিং ফোর্সের ক্রমাগত শেলিংয়ের জন্য সেসব ভেঙে চৌচির। যখন রাজীব গান্ধী খুন হয়েছিলেন। সেসব ইতিহাস, কিছু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের গোপন ফাইলে। কিছু আজও লোকমুখে। থাক সে কথিত ও অকথিত (যা কোনদিনও সামনে আসবে না)। সেনাকর্মীরা এই দরজার কাছে থামলেন।
দেখুন। এই সেই ঘর। যেখানে বসে আপনাদের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীকে খুনের ছক কষা হয়েছিল। এই ঘরে বসেই থাম্বি লোক পাঠিয়েছিল চেন্নাইয়ের অদূরে শ্রীপেরামবুদুরে। বাকি ইতিহাস আপনি নিশ্চয় জানেন?
সেদিন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এই ঘরের ছবি যথাস্থানে দেওয়া আছে।
আমি একজন ভারতীয়। আমার দেশ। আমার প্রাণ।
চিত্র: লেখক






