মহাকাশের ঈগল অলটিমিটার
সু জি ত ব সু
চাঁদ যে পৃথিবীর একটি উপগ্রহ, তা আমরা সবাই জানি। আমরা অবশ্যই তার সৌন্দর্য উপভোগ করি কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাছে তার তেমন কদর নেই। তার কারণ তার কোনও ব্যবহারিক উপযোগিতা নেই। নিজেদের প্রয়োজনে মানুষ মহাকাশে অনেক কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়েছে। আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ইওরোপ এরা তো আছেই। আমাদের দেশও ইতিমধ্যেই অনেকগুলি উপগ্রহ মহাকাশে নিক্ষেপ করেছে। এরা নানারকম কাজে লাগে, যেমন উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, সরাসরি সম্প্রচারের দ্বারা বিনোদন ইত্যাদি। এই যেমন আমরা ক্রিকেটের বিশ্বকাপ, অলিম্পিক ইত্যাদি টিভিতে দেখে থাকি। কিন্তু অন্য ধরনের উপগ্রহও আছে, যেমন সুদূর সংবেদ বা রিমোট সেন্সিং উপগ্রহ। আমাদের আলোচনা এদের নিয়ে।
সহজ ভাষায় সুদূর সংবেদ মানে দূর থেকে কোনও বস্তুর বিষয়ে জ্ঞান আহরণ। সুদূর সংবেদের প্রধান মাধ্যম হল বিদ্যুৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ। দৈর্ঘ্য অনুসারে এই তরঙ্গদের বিভিন্ন শ্রেণিতে ফেলা হয়। আলোও (যা আমরা চোখে দেখতে পাই) এইধরনের তরঙ্গ, যার দৈর্ঘ্য ০.৪ থেকে ০.৭ মাইক্রনের মধ্যে। ১ মাইক্রন হল ১ সেন্টিমিটারের ১০ হাজার ভাগের এক ভাগ। সুদূর সংবেদ দু’রকমের। নিষ্ক্রিয় এবং সক্রিয়। প্রথমটির কথা বলি। পৃথিবী তাপ বিকিরণ করে ইনফ্রারেড তরঙ্গের মাধ্যমে। সেটি উপগ্রহে স্থিত রেডিওমিটারে ধরা যায় এবং গণিতের সাহায্যে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা পরিমাপ করা যায়। আবার আছে প্রতিফলিত সূর্যকিরণ। এটিও উপগ্রহে স্থিত যন্ত্রে ধরা যায় এবং ভূপৃষ্ঠের প্রতিফলন ক্ষমতা (বিজ্ঞানের ভাষায় আলবেডো) বলে দেওয়া যায় অবশ্যই গাণিতিক উপায়ে।
এবার আসি সক্রিয় সুদূর সংবেদের বিষয়ে। উপগ্রহে থাকে একটি রাডার। সেটি পৃথিবীর দিকে তরঙ্গ পাঠায় এবং প্রতিফলিত তরঙ্গ আবার ওই রাডারেই ধরা পড়ে। তিন রকমের রাডার হয়। তাই যন্ত্রও তিনটি। অলটিমিটার, স্ক্যাটারোমিটার এবং সিনথেটিক অ্যাপারচার রাডার। প্রথমটি নীচের দিকে তাকায় একেবারে সোজাসুজি আর অন্য দু’টি তেরছা ভাবে। তিনটিই বিশেষ ভাবে সমুদ্রবিজ্ঞানের জন্য নির্মিত, তবে শেষেরটি জমি এবং ফসল সংক্রান্ত কিছু কাজেও লাগে।
প্রথমটি সমুদ্র বিজ্ঞানের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এবং আজকের আলোচনা একে নিয়ে। প্রথমে বলে নেওয়া ভাল যে, পৃথিবী কিন্তু ঠিক গোলক নয়, বরং অনেকটা ডিম্বাকৃতি, যাকে গণিতের ভাষায় বলা হয় এলিপসয়েড। এর কিছুটা ওপরে সমুদ্রপৃষ্ঠ। এদের মাঝে আবার আছে জিওয়েড। এটি কী? আমরা জানি, অভিকর্ষ সব কিছুকে কেন্দ্রের দিকে টানে। অভিকর্ষ একটি বল, যার একটি পোটেনসিয়াল আছে। জিওয়েডের প্রতিটি বিন্দুতে এই পোটেনসিয়ালের মান একই এবং অভিকর্ষ আছে লম্ব রেখায় ।
সমুদ্রে স্রোত না থাকলে সমুদ্রপৃষ্ঠ এই জিওয়েডেই স্থিত হত। কিন্তু সমুদ্রের ওপরে দ্রুত গতি বাতাস থাকায় সমুদ্রে স্রোত থাকবেই। আসলে বাতাসই এই স্রোতের চালিকাশক্তি। তা হলে আমরা দেখছি তিনটি আলাদা আলাদা পৃষ্ঠ— এলিপসয়েড, জিওয়েড এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ। গবেষণার জন্য দরকারি জিনিসটি হল জিওয়েড থেকে সমুদ্রপৃষ্ঠের দূরত্ব, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, সংক্ষেপে স উ (h)। এলিপসয়েড থেকে সমুদ্রপৃষ্ঠের দূরত্ব ধরা যাক H আর এলিপসয়েড থেকে জিওয়েডের দূরত্ব ধরা যাক hg। পদার্থবিদ্যা, গণিত এবং নানা পর্যবেক্ষণের সাহায্যে এলিপসয়েড ও জিওয়েডের আকৃতি ও অবস্থান আমরা জানি, অর্থাৎ hg আমরা জানি। h সরাসরি মাপা অসম্ভব। ধরা যাক, কোনওভাবে আমরা H জানতে পারলাম। তা হলে h আমাদের হাতের মুঠোয় কেননা সহজেই দেখা যায় যে H = hg + h, অলটিমিটারের কাজ হল H পরিমাপ করা। কিন্তু কীভাবে? সে একটি তরঙ্গ পাঠাবে যেটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রতিফলিত হয়ে কিছু সময় পরে আবার তার কাছে পৌঁছে যাবে। ধরা যাক এই সময় হল T । যদি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অলটিমিটারের দূরত্ব R হয়, তবে R = cT/2 যেখানে c শূন্যে আলোর গতিবেগ (সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার) কেন না তরঙ্গ আলোর গতিতে চলে। আমরা R জানতে পারলাম কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য ছিল H জানা। যখন কৃত্রিম উপগ্রহ (অলটিমিটার সমেত) নিক্ষেপ করা হয় তখন তার কক্ষপথ আগে থেকেই বিজ্ঞানীরা নির্ধারিত করে রাখেন গণিতের সাহায্যে অর্থাৎ এলিপসয়েড থেকে অলটিমিটারের দূরত্ব আমরা জানি। ধরা যাক এই দূরত্ব D । সহজেই বোঝা যায় যে, D= H + R, অর্থাৎ H = D – R। যেহেতু সমীকরণের ডান দিকের দু’টি রাশিই আমরা জানি, তাই H আমরা জেনে গেছি। আগেই আমরা দেখেছি যে h= H – hg।
এবার তা হলে আমাদের কাজ শেষ । কিন্তু সত্যিই কি শেষ? গোলমালটা হল আলোর গতিবেগকে নিয়ে। আমরা ধরেছি c হল সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার, যেটি শূন্যে আলোর গতিবেগ। তরঙ্গ যে পথ দিয়ে আসছে (প্রায় হাজার কিলোমিটার) তার বেশির ভাগটা শূন্য হলেও শেষের বেশ কয়েক কিলোমিটার বায়ুমণ্ডলের মধ্যে দিয়ে যেখানে আছে অনেক গ্যাস এবং জলীয় বাষ্প যারা তরঙ্গের গতিবেগ অনেকটা কমিয়ে দেয়। কতটা কমবে তা নির্ভর করে স্থান এবং কালের ওপর। বিভিন্ন মডেলের সাহায্যে এই জটিল হিসেবটি বিজ্ঞানীরা করে থাকেন।
আমরা এসবের মধ্যে যাব না। শুধু বলে রাখি যে, অনেকগুলি অলটিমিটার নিক্ষেপিত এবং তাদের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা প্রশান্ত, আটলান্তিক ও ভারত মহাসাগরের স উ সাফল্যের সঙ্গে পরিমাপ করে থাকেন। ফ্রান্স ও ভারত দু’টি দেশের সহযোগিতায় এরকম একটি অলটিমিটার (অলটিকা) কয়েক বছর আগে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, যার সাহায্যে বিজ্ঞানীরা সমুদ্র নিয়ে অনেক জটিল গবেষণা করেছিলেন এবং এই প্রতিবেদকেরও সামান্য অবদান ছিল।
কিন্তু কেন আমরা এত কষ্ট করে স উ মাপতে চাই, বিশেষত যখন অলটিমিটার তৈরি করা অনেক জটিল ও ব্যয়বহুল। উপগ্রহ তৈরি ও নিক্ষেপের খরচও অনেক। আবহাওয়ার পূর্বাভাস ব্যাপারটি নিশ্চয় সকলের জানা আছে। কেন এর দরকার তাও সবাই জানেন বোধ হয়। এর জন্য জটিল আবহাওয়া মডেল ও খুব শক্তিশালী কম্পিউটার লাগে। সমুদ্রের স্রোতের পূর্বাভাসও জাহাজ চলাচল ছাড়াও আরও অনেক কাজে লাগে। এখানেও জটিল মডেল ও প্রচণ্ড শক্তিশালী কম্পিউটার লাগে। এ ছাড়াও লাগে অনেক তথ্য, যার মধ্যে প্রধান হল স উ এবং সেটি যোগায় অলটিমিটার। কীভাবে, তা আমরা বিশদে আলোচনা করেছি। আর এক ধরনের মডেল আছে, যা দেয় সমুদ্রে তরঙ্গের পূর্বাভাস। এর লাগে তরঙ্গের উচ্চতার পরিমাপ। অলটিমিটার এটিও সরবরাহ করে থাকে। সমুদ্রে তরঙ্গ থাকলে অলটিমিটার প্রেরিত তরঙ্গের আকৃতি প্রতিফলনের পর অনেক বদলে যায়। জটিল গণিত ও কম্পিউটারের সাহায্যে এই বদল থেকে গণনা করা যায় তরঙ্গের উচ্চতা। আর একটি বিস্ময়জনক উপযোগের কথা এখানে না বললেই নয়। তা হল সমুদ্রে ডুবোপাহাড়। এদের অবস্থান জানা না থাকলে সাবমেরিন চলাচলের পক্ষে এরা কতটা বিপজ্জনক তা নিশ্চয় বুঝিয়ে বলতে হবে না। আনন্দের কথা যে, এবারও অলটিমিটার সাহায্য করতে প্রস্তুত। অভিকর্ষের কারণে যেখানে ডুবোপাহাড় আছে, সেখানে স উ স্বাভাবিকের থেকে অনেক বেশি উঁচু হয়ে
থাকে। নানা জটিল গণিত এবং অবশ্যই কম্পিউটার ব্যবহার করে অলটিমিটারের মাপা স উ থেকে ডুবোপাহাড়ের অবস্থান জানা যেতে পারে। ভারতীয় বিজ্ঞানীরা এভাবে ভারত মহাসাগরের ডুবোপাহাড়ের অবস্থানের একটি ম্যাপ তৈরি করে নৌবাহিনীকে উপহার দিয়েছেন।
এই নিবন্ধ অলটিমিটারকে নিয়ে। তবু শেষ করার আগে দ্বিতীয় যন্ত্রকে নিয়ে অন্তত দু-এক লাইন না লিখলে অন্যায় হবে। সমুদ্রে স্রোত ও তরঙ্গের জন্য আলাদা মডেল থাকলেও দু’টিরই চালিকাশক্তি কিন্তু বাতাসের গতিবেগ। গতির মাপ এবং দিক দু’টিই লাগে এবং এর জন্য লাগে স্ক্যাটারোমিটার। অলটিমিটারের মতো এটিও বিদ্যুৎচৌম্বকীয় তরঙ্গের সাহায্যে সমুদ্রকে দেখে। তবে তেরছা ভাবে। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা এরকম বেশ কয়েকটি যন্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এরা সারা বিশ্বের মহাসাগরের ওপরে বয়ে যাওয়া বাতাসের গতিবেগ মেপেছিল এবং নিরন্তর মেপে চলেছে।
চিত্র: গুগল







