মিস্টার ব্রুক্স, হ্যাভ ইউ আন্ডারস্টুড দি মোহাভারাতা?
দ ত্তা ত্রে য় দ ত্ত
কিছুকাল আগে মহাকাব্য প্রসঙ্গে এক পত্রিকায় লিখেছিলুম যে, ১৯৮৯-৯০ সালে তিনদিন ধরে পিটার ব্রুকের বিশ্বখ্যাত মহাভারত প্রযোজনার চলচ্চিত্ররূপ কোলকাতায় দেখানো হয়েছিল, আর তার দ্বিতীয় দিনে নন্দনে কিছু খুচরো নাট্য-সিনে-বোদ্ধাদের একটা ছোট ভীড় মল্লিকা সারাভাই প্রমুখদের ঘিরে আলোচনায় মত্ত ছিলেন। সে-আলোচনার মর্মার্থ এই ধরনের ছিল যে: “হ্যাঁ! একেই বলে মহাভারত! আ-হাহা! আর এর কাছে ঐ বি. আর. চোপড়ার… এ-হেহে!!”
আমার অবন ঠাকুর পড়া ছিল— “একে বলে বিলাতি সুইমিঙ্ক, আর তাকে বলে পাড়াগেঁয়ে সাঁতার”। কাজেই আমি সরে গিয়ে এক শাড়ি-পরা মেমসাহেবের পাশে বসলুম। তো পার্শ্ববর্তিনী যেচে আলাপ জুড়ে দিলেন… ‘ঐ ওরা কী বলছিল কিছু শুনলে নাকি?’ আমি সায় দিতে তিনি প্রায় স্বগতোক্তির মতোই বললেন: ‘আমিও শুনছিলুম।… আমিও ভারতবর্ষেই অনেক বছর আছি… জানো, একটা ব্যাপার আমার খুব আশ্চর্য লাগে। প্রত্যেক রবিবার দেখি সকাল ন’টা থেকে দশটা পর্যন্ত কার্যত ‘ভারত-বন্ধ্’ হয়ে যায়। কারণ ঐ এক ঘণ্টা টেলিভিশনে মহাভারত দেখানো হয়, আর সব কাজ মুলতুব রেখে দেশসুদ্ধু লোক তাই দেখে। আমি তাই ভাবছিলুম, কারা ঠিক? দেশের এই আশি কোটি মানুষ, নাকি ঐ আটখানা রঙ-করা বুদ্ধিজীবী (painted intellectuals)?’ উত্তরটা আমার সঠিক জানা ছিল না, কিন্তু তাঁর প্রশ্নটা মনে বিঁধে রইল।
শেষদিনে অডিটোরিয়ামে চলছিল প্রশ্নোত্তরের পালা। সেই নিস্তরঙ্গ খাতির-বিনিময়ের মধ্যে হঠাৎ এক প্রবীণ উঠে দাঁড়িয়ে কিঞ্চিৎ কড়া সুরে প্রশ্ন রাখলেন: ‘মিস্টার ব্রুক্স, ডু ইউ থিঙ্ক ইউ হ্যাভ আন্ডারস্টুড দি মোহাভারাতা?’ তাঁর স্পর্ধা দেখে সকলে স্তম্ভিত! সায়েবকে চ্যালেঞ্জ! এমনকি স্বয়ং ব্রুকও ধাতস্থ হতে সেকেন্ড-দুয়েক সময় নিলেন। তারপর বললেন: আমি আজ সতেরো বছর ধরে মহাভারত অধ্যয়ন করছি অন্তত কিছুটাও বুঝে থাকব নিশ্চয়। সে-ভদ্রলোক ধপ্ করে বসে পড়লেন বটে, কিন্তু আমার মনের একটা খটকা গেল না: ‘অন্তত কিছুটা বোঝা’ বলতে কতটা বোঝা বোঝায়? যে-মহাভারতে ভীমকে সবাই ‘বিমা’ বলে উল্লেখ করে, সে-প্রযোজনায় অভিনেতাদের উচ্চারণের পরিশীলনের প্রতি কোনো যত্ন না-নেওয়াটা মহাভারতের প্রতি পরিচালকের তাচ্ছিল্যের পরিচায়ক হলেও তা নিছক তাঁর অক্ষমতা বলে মানা যায়। (অবশ্য Carrier-কৃত নাট্যলিপিতেও দুঃশাসনকে ক্রমাগত ‘দুশাস্সন’ বলে লেখা আছে; অর্থাৎ এঁরা জানেন না যে ভারতীয় ধ্রুপদী নামগুলোর একটা করে অর্থ আছে।) কিন্তু যাঁর মহাভারত-কল্পনায় পৌত্ররা পিতামহকে, স্ত্রী স্বামীকে, এবং সন্তানেরা মাতাকে নাম ধরে ডাকে, তাঁর মহাভারতের বোঝাটা মশা-মাছির চেয়ে বেশি ভারী বলে মনে হয় নি আমার। এর চাইতে চোপড়ার তাতশ্রী-মাতাশ্রীও যে বেশি ভারতীয় এবং মহাভারতীয় শোনায়! ব্রুক থিয়েটারসজ্জা বোঝেন নিশ্চয়; কিন্তু মহাভারত বুঝলে ভারতবর্ষকে বুঝতেন; আর ভারতবর্ষকে বুঝলে তার প্রথাধৃত মূল্যবোধকেও বুঝতেন।
অবশ্য সাহেবদের এই নিদারুণ মুদ্রিত অপমানে গ্লোবালাইজ্ড্ বাঙালিরা ভারি বিরক্ত হয়ে প্রকারান্তরে আমাকে নিতান্ত কূপমণ্ডূক বলে ইঙ্গিত করেছিলেন; উপরন্তু ভারতীয় নামের বিকৃত উচ্চারণ (এবং দুশো বছর ধরে ভারতীয়দের প্রতি অকথ্য গালাগালি ও গুলিগোলা বর্ষণ) সাহেবদের আত্মবিশ্বাসেরই প্রত্যক্ষ্য প্রমাণ, এমন একটা প্রশংসায়ী প্রত্যয়ও দেখা দিয়েছিল। তবে সেই সুবাদে এই একটা ধীমান প্রশ্ন উঠেছিল যে ব্রুকের মহাভারতে কৃষ্ণ কেন গণেশের মুখোশ পরে মহাভারত লিখছিলেন। সেটা একটা খোলা মনের প্রশ্ন, নাট্য-ব্যাখ্যানের প্রশ্ন, এবং সে-প্রসঙ্গে দুটো কথা লেখা এই কারণে যে সেই সূত্রে ব্রুকের মহাভারতদৃষ্টির বৈশিষ্ট্যের বিষয়ে কিছু বক্তব্য রাখা যেতে পারে।
গণেশের মুখোশের আড়াল থেকে কৃষ্ণকে প্রকাশ করে— আমার অনুমান— ব্রুক বোঝাতে চেয়েছেন যে মহাভারতের সবটাই কৃষ্ণের লীলা; সমগ্র মহাভারত কৃষ্ণই ঘটিয়ে রেখেছেন; লিপিকার হয়ে মহাভারতের প্রামাণ্য রূপ তিনিই স্থির করে দিচ্ছেন; তাঁরই কল্পনার মধ্যে তিনিই লীলা করছেন; এ-সকলই তাঁরই মায়া, তিনিই ঈশ্বরপুরুষ, ইত্যাদি। ভগবদ্গীতায় অনুরূপ তত্ত্ব বলা আছে বলে সেই থিওরি এদেশে অন্য সব অনুসন্ধানকে স্তব্ধ করেও রেখেছে। এমন তত্ত্বে মায়াপুরীরা খুশি থাকেন, আর পশ্চিমা খ্রিশ্না খন্শাস্নেসের দুনিয়ায় তার প্রভাবও ভালো ছড়ায়। কাজেই এই কৃষ্ণ-গণেশের ক্ষেত্রে ব্রুকের থিয়েটারি জাদুটা নিতান্ত গিমিকের যথেষ্ট ঊর্ধ্বে উঠে গেছে, এ-কথা মানতেই হবে। আর, যতদূর মনে পড়ে, ব্রুকের মহাভারতে দেবতাদের আনাগোনা নেই। কৃষ্ণ দেবতা নন, অবতারমাত্র; এবং মহাভারতের এক কেন্দ্রীয় চরিত্র। কাজেই তাঁকে মুখোশ পরিয়ে গণেশ দেবতার আবির্ভাব ঠেকানো গেছে, এও একটা কার্যকর যুক্তি হতে পারে।
কিন্তু এ-থিয়েটারে গণেশঠাকুর আছেনই বা কেন? সারা নাট্যক্রিয়ায় তাঁর কাজটা কী? এখানে যা-কিছু বিবৃত হচ্ছে, সবই তো ব্যাসের বয়ানে! সব বিবরণই যদি মুখে ভাষিত হয় (এবং ব্রুকের সিনে-মহাভারত আদৌ ‘নাট্য’ নয়, বিবরণমাত্র), তাহলে খামোকা গণেশকে দিয়ে একটা জাবেদা খাতা নাড়াচাড়া করানোর কারণটা কী? তাঁর উপস্থিতি কি শুধুই কৃষ্ণের কৃষ্ণত্ব প্রতিপাদনের নিমিত্ত? থিয়েটারের প্রেক্ষণে বলব, আমার মায়াপুরী অনুমানটা একেবারে ভ্রান্ত না-হতেও পারে। উদাহরণত, বনপর্বে ব্যাস বলছেন যে যুধিষ্ঠিরের পাশাখেলার সময়ে শাল্ব সৌভ বিমানে চড়ে দ্বারকা আক্রমণ করেছিলেন বলে কৃষ্ণ তাঁর সঙ্গে যুদ্ধে ব্যাপৃত ছিলেন; তাই তিনি দ্যূতসভায় আসতে পারেননি। কিন্তু ব্রুকের মহাভারতে দেখি কৃষ্ণ দিব্যি গুটিগুটি এসে ভীষ্মকে বলছেন যে দ্যূতসভায় যাই ঘটুক না কেন, তিনি যেন তাতে বাধা না দেন। ‘ওসব সিম্বলিক টিম্বলিক’ ইত্যাদি কথা বলে ওজর কাটা হয় বোধহয়, কিন্তু সিম্বলটা কোন্ দিকে ইঙ্গিত করছে, সেটাও তো বিচার্য!
তবে মোটের ওপরে ব্রুক যে মহাভারতটা বেশ একটু তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন, এ-কথা মানতেই হবে। ব্রুকের ফিল্মের শুরুতে ব্যাসের বর্ণনায় শুনি মহাভারতের যুগটা ছিল এমন যুগ, যখন সব মানুষেরা ধর্মপরায়ণ ছিল; যুদ্ধবিগ্রহ ও দুঃখদুর্দশা ছিল না; মানুষে-দেবতায় ঘনিষ্ঠতাও ছিল (দেবদূতরাও ‘এই রাজ্যে নাহি রবে হিংসা-অত্যাচার, নাহি রবে দারিদ্র্য, যাতনা’ বলতে চলে আসত বোধহয়)। ‘It was a Golden age’: অর্থাৎ কিনা সত্যযুগ। কিন্তু আসলে যুদ্ধটা ঘটেছিল দ্বাপরে, যখন জগতের অর্ধেকটাই অধর্মের অধীন: রাজারা যথেচ্ছ দিগ্বিজয়ে বেরোচ্ছেন, কামাসক্ত হচ্ছেন, লুঠতরাজ চলছে, ঋষিরা যত্রতত্র রেতঃপাত করছেন, ইত্যাদি।

মনে পড়ে, ত্রেতাযুগেই ভরত রামকে বলছেন: আপনি রাজসূয় যজ্ঞ করবেন না, কারণ তাতে বহু রাজার প্রাণহানি হবে; বরং অশ্বমেধ যজ্ঞ করুন। কিন্তু দ্বাপরে দেখি যুধিষ্ঠির হাতে রাজ্য পেয়েই রাজসূয় যজ্ঞ করছেন, আর সেই সূত্রে অতর্কিত আক্রমণে জরাসন্ধ ও শিশুপালকে হত্যা করা হচ্ছে। বনপর্বে তিনি নিজেই বলছেন যে দিগ্বিজয়কালে যত রাজাকে উৎপীড়িত করা হয়েছিল, তারা সব কৌরবপক্ষে গেছে। তাহলে উৎপীড়ন ছিল! দ্বাপরের শেষভাগে— অর্থাৎ মহাভারতের যুদ্ধের সময়ে— ধর্ম ক্ষয়ে গিয়ে ত্রিপাদ অধর্মে প্রায় পৌঁছেছে; এবং অন্যায়যুদ্ধে দুর্যোধনের নিপাতের সঙ্গে সঙ্গে কলিযুগ আরম্ভ হয়ে যাচ্ছে। এই যে ধর্মের ক্ষয় ও অধর্মের মহাজাগরণ, যাদবদের আত্মধ্বংসী অন্তর্দ্বন্দ্ব, দ্বারকায় প্লাবন ও দস্যুদের দ্বারা কৃষ্ণের হারেম লুণ্ঠন— এইখান থেকে যে-কোনো দায়িত্বশীল নির্দেশক মহাভারতের আধুনিক যুগোপযোগী একটা ব্যাখ্যান তৈরি করতে পারতেন। সে-সব চেষ্টা না-করে স্রেফ মহাভারতের গপ্পোটাকে নিজের অনধ্যায়ের ভেজাল মিশিয়ে ভিন্দেশীদের (বিশ্বায়িত ভারতীয়দেরও) আবার করে শোনানোটা মহাভারতের তাৎপর্যের প্রেক্ষণে অর্থহীন।
মহাভারতে ব্রুক কোন্ কোন্ পরিবর্তন করেছেন, এবং কেন সেগুলো করেছেন, তার কিছুই স্পষ্ট হয় না। তাঁর ব্যাখ্যানে দেখি পাণ্ডবরা একান্ত ধার্মিক, আর কৌরবরা শুধুই পাপী। অর্থাৎ তিনি বি.আর. চোপড়ার স্ট্যান্ডার্ড ব্যাখ্যাটাই গ্রহণ করেছেন। কৌরবরা যদি সত্যিই পাপী হয় তো জতুগৃহদাহটা বাদ গেল কেন? সেই বাদ যাওয়ার ফলে দেখি আদিপর্বের ভীম-হিড়িম্বির বিয়েটা টেনে বনপর্বে এনে হাজির করতে হয়েছে! ওই বিয়েটা (অর্থাৎ ঘটোৎকচকে) বাদ দিলে কিনা মহাযুদ্ধের একটা বিরাট চমক, উপরন্তু কর্ণর একঘ্নী অস্ত্র খোয়ানো, এ-সবই বাদ পড়ে যাবে, তাই ওটা অস্থানে সন্নিবিষ্ট করতে হয়েছে, উপরন্তু একটা হিড়িম্বি-দ্রৌপদী-সংবাদও উদ্ভাবন করতে হয়েছে, যেখানে হিড়িম্বি বলে যে দ্রৌপদী যদি পাঁচ স্বামী ভোগ করতে পারে, তবে ভীম কেন দুই স্ত্রী ভোগ করতে পাবে না? অর্থাৎ সে সতীন হবার ‘অধিকার’ দাবি করছে। ভালো পুংতান্ত্রিক যুক্তি! নাহয় পরপর তিন প্রজন্মে শান্তনু, বিচিত্রবীর্য, এবং পাণ্ডুর দুটি করে বিয়ের তথ্যটা ব্রুকের মাথাতেই আসে নি; আদিপর্বে অর্জুনের একাধিক স্ত্রীসম্ভোগ করে ব্রহ্মচর্য রক্ষার কথাও নয়; কিন্তু লক্ষণীয়ভাবে, এ-বিবাহে কুন্তীর সম্মতি কেউ নিলেন না (দ্রৌপদীকে নিয়ে উল্লসিত অর্জুনের মাতৃসম্ভাষণ নাটকে আগেই রয়েছে), আর অনার্য ঘটোৎকচই যে সর্বজ্যেষ্ঠ পাণ্ডবনন্দন তথা কুরুরাজ্যের আসল উত্তরাধিকারী, সে-তথ্যটা এইখানে চাপা পড়ে গেল।
ব্রুকের এই তালগোল পাকানোর একটা চাক্ষুষ প্রমাণ হলো চরিত্রদের গাত্রবর্ণের প্রতি তাঁর একাগ্র অনভিনিবেশ। মহাভারত এমন একটা যুগের কথা, যখন কৃষ্ণবর্ণ সম্মানের চিহ্ন ছিল। তাই মহাভারতের আত্মিক জগতের প্রধান পুরুষ কৃষ্ণ; সাধনার জগতের প্রধান পুরুষ কৃষ্ণ (দ্বৈপায়ন ব্যাস), আবার ঐহিক জগতেরও প্রধান পুরুষ অর্জুন বা কৃষ্ণ— কেননা ‘কৃষ্ণবর্ণ সুন্দর বালক সকলের প্রিয়’ (বিরাটপর্ব, উত্তরগোগ্রহ পর্বাধ্যায়)। পাণ্ডব-কৌরবকুলের সৃষ্টির মূলে ছিলেন সত্যবতী, যাঁর অপর নাম ‘কালী’, কারণ তাঁর গাত্রবর্ণ ছিল কালো (ব্রুকের সত্যবতীর চেহারার সঙ্গে তুলনা করুন)। সেই কালীরই সন্তান ‘কৃষ্ণ’-দ্বৈপায়নের ঔরসে বিচিত্রবীর্যের দুই সন্তানের জন্ম (যাদের শরীরে আসলে একফোঁটাও বেদোক্ত ‘কৌরব’-রক্ত ছিল না)। কালো রংটার প্রতীকী মূল্য মহাভারতে বস্তুত অসীম: কারণ এই বংশ ধ্বংসের জন্য যিনি জন্মেছিলেন— যাঁর থেকে “কুরুকুলের মহাভয় উৎপন্ন হবে”— সেই দ্রৌপদীও “কৃষ্ণা”। অতএব এ-বংশের উৎপত্তি ও বিলয় কালোতেই।
ফলত কৃষ্ণা দ্রৌপদীর ভূমিকায় মল্লিকা সারাভাইয়ের মল্লিকাতুল্য গাত্রবর্ণ, ব্রুকের শ্বেতাঙ্গ কৃষ্ণের মতোই, নিতান্ত বেখাপ লাগে। সারা ভারতে যত ‘ছবিতে মহাভারত’ গোছের শিশুপাঠ্য কমিক্স আছে, সেসবে কিন্তু কৃষ্ণকে সর্বদাই নীল রঙে আঁকা হয়; বস্তুত লোকসংস্কৃতিতে কৃষ্ণ ‘শ্যাম’ নামেই বেশি পরিচিত। সেসব দিকে ব্রুক তাকাননি। তার বদলে ভীম, যিনি পিঙ্গলনয়ন ও ‘শোধিত স্বর্ণের ন্যায় গৌরবর্ণ’, ব্রুক তাঁকে করেছেন কৃষ্ণাঙ্গ; আর যে অর্জুন ‘কৃষ্ণবর্ণ’, তাঁকে বানিয়েছেন শ্বেতাঙ্গ। এতে করে এঁদের সঙ্গে কৃষ্ণ-বলরামের সমান্তরটা হারিয়ে যাচ্ছে, কারণ বলরাম শ্বেতাঙ্গ, কিন্তু কৃষ্ণ কালো; দুর্যোধন ফর্সা, কিন্তু দুঃশাসন শ্যামবর্ণ। বলরাম, দুর্যোধন, ও ভীম— এ-তিনজনই অত্যধিক দৈহিক বলশালী। অন্যদিকে কৃষ্ণ, অর্জু্ন, ও দুঃশাসন দক্ষ ধনুর্যুদ্ধে। (আগের প্রজন্মে ধৃতরাষ্ট্রও ছিলেন অযুত হস্তীর তুল্য বলশালী ও পাণ্ডু ছিলেন অসামান্য ধনুর্বিদ্।)
পাশ্চাত্যসভ্যতার মানুষ হয়েও একটা ব্যাপার ব্রুক খেয়াল করেননি। মহারাজ প্রতীপ কামিনী স্বর্গবেশ্যা গঙ্গাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন; অর্থাৎ তিনি ছিলেন জিতেন্দ্রিয়। তাঁর ছোট ছেলে শান্তনু পেলেন রাজসিংহাসন (শান্তনুর অগ্রজ দেবাপি ভারতীয় মিথের অনেক অগ্রজদের মতোই রাজত্বে বঞ্চিত)। শান্তনু পেয়েছিলেন দেবব্রতর মতো অশেষ বীর্যবান পুত্র; কিন্তু ইন্দ্রিয়পরবশ হয়ে সেই ছেলেকে খোয়ালেন। তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র বিচিত্রবীর্যের সন্তানহীন অকালমৃত্যু হলো ইন্দ্রিয়পরবশতার কারণে; আবার তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র পাণ্ডুরও কামঘটিত কারণে সন্তান হলো না এবং কামঘটিত মৃত্যু ঘটল। গ্রীক পুরাণের প্রথিত বংশবাহিত পাপের কোনো লক্ষণ এখানে ধরা পড়ছে কি? পড়েছে কি, ব্রুকের চোখে?
গন্ধর্বরাজের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত সত্যবতীর প্রথম পুত্র চিত্রাঙ্গদের অস্তিত্বই ব্রুক স্বীকার করেননি। তাঁর বৃত্তান্তে “Santanu and Satyavati had a son, but the heir to the throne was a poor weakling. Santanu died” (তাঁর নাটককার Carriere-এর পাঠ)। মহাভারত বলে: সত্যবতীর প্রথম সন্তানটি অত্যন্ত বলবান ছিল, এবং সিংহাসনও পেয়েছিল। চিত্রাঙ্গদ নামে এই রাজাটি ছিলেন অগ্রজ, এবং তাঁর মৃত্যুর পরে সিংহাসন অর্শালো অনুজ বিচিত্রবীর্যে। এঁদের বৈমাত্র ভাই ভীষ্ম অমিতবিক্রম হয়েও রাজ্যে বঞ্চিত ছিলেন; তিনিও অগ্রজ। এঁদের পরের প্রজন্মে বলবান অগ্রজ ধৃতরাষ্ট্রর রাজ্যাধিকারও অনুজ পাণ্ডুতে বর্তালো। লক্ষণীয়ভাবে, বিচিত্রবীর্য ও পাণ্ডু— এই দুই অনুজেরই দুটি করে স্ত্রী ছিল, এবং দুজনেই নিঃসন্তান ছিলেন। এগুলো খেয়াল করলেও মহাভারতের অন্য কিছু তাৎপর্য বেরিয়ে আসতে পারতো, কিন্তু ব্রুক সাহেব সেসব গ্রাহ্য করেননি।
তা না-ই করুন, অগ্রজকে নাহয় ছেঁটেই ফেলা গেল— ব্রুকের ‘বিস্মা’ তো কাশীরাজের তিন কন্যাকে ধরেবেঁধে নিয়ে এলেন বিচিত্রবীর্যের সঙ্গে বিয়ে দেবেন বলে। কিন্তু সেই তিনকন্যার “The YOUNGEST was crying”! অহো! ব্রুকের এই কনিষ্ঠার দুঃখ সত্যিই মর্মন্তুদ! কারণ মহাভারত বলছে যে কনিষ্ঠা নয়, জ্যেষ্ঠা ভগিনী অম্বা-ই শাল্বরাজকে ভালোবাসতেন। তাতে অবশ্য ব্রুক সাহেবের কিছু যায় আসে না: দুটো বিয়ে তিনি দিয়েই দিলেন, এবং তক্ষুনি বিচিত্রবীর্য died on his wedding night! এটা ব্রুক কোন্ মহাভারত থেকে পেলেন জানি না; আমাদের মহাভারত বলছে, পরমাসুন্দরী দুই স্ত্রীকে পেয়ে বিচিত্রবীর্য সাত বছর ধরে এতই ইন্দ্রিয়াসক্ত হয়ে রইলেন যে, তাঁর যক্ষ্মারোগে মৃত্যু হল।
এই মৃত্যুর ফলে অম্বিকা-অম্বালিকার গর্ভাধান করার দায় পড়ল ব্যাসদেবের ওপর। মহাভারতের অম্বিকা শয্যায় শুয়ে ভীষ্ম ও অন্যান্য কুরুবীরগণের রূপের কথা ভাবছিলেন, তাই তিনি ব্যাসকে দেখেই ভয়ে চোখ বুজে ফেললেন। ব্রুকের নাটকেও বুজলেন। কিন্তু কেন? যে-অম্বিকা ব্রুকের ভীষ্মকে কাম্যপুরুষ ভাবছেন, তিনি ব্রুকের ব্যাসকে দেখে খামোকা ভয় পাবেন কেন? তাঁর তো উল্লসিত হবার কথা! ব্রুকের ভীষ্ম এবং ব্যাসের চেহারাদুটো একবার পাশাপাশি দেখুন! আমি কিন্তু কোনো বর্ণদ্বেষী ইঙ্গিত করছি না। বস্তুত এই ভীষ্ম-অভিনেতা অত্যন্ত সুজন। তাঁর সঙ্গে একটা অদ্ভুত ল্যাগব্যাগে নাচ নাচতে গিয়ে আমি একেবারে ল্যাজেগোবরে হয়েছিলুম; তাতে তিনি এতটুকুও তাচ্ছিল্য না-দেখিয়ে উল্টে হাসিমুখে আমায় কাছে টেনে নিয়েছিলেন (ভালো লেগেছিল, কারণ আমি কালা আদমি, তিনিও কৃষ্ণকায়)! আমি বলছি মহাভারতে যেসব অভ্যন্তরীণ টানা-পোড়েনের বুনোট আছে, তার সঙ্গে ব্রুকের মহাভারত-দর্শন একেবারেই মেলে না। ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ বলে রাজ্য পান নি; কিন্তু ব্রুকের নাটকে দেখি পাণ্ডুই তাঁকে ‘রাজা’ ঘোষণা করে দিলেন— যদিও অন্ধ মানুষ রাজা হতে পারে না, বলির জন্যও নির্বাচিত হতে পারে না। একেবারে ‘ভারতীয়’ বিধান।
এইখানে একটা কথা না-বলে পারা যাচ্ছে না। মহাভারতে প্রায় কোনো ঘটনাই ব্যক্তিবিশেষের ইচ্ছেয় ঘটে না— সবই নিয়ন্ত্রিত এক বিধানের বশে— পশ্চিমা পুরাভাবনায় যাকে logos বলে। ব্রুকের উপস্থাপনায় পাণ্ডুর পুত্রেচ্ছাটা পাণ্ডুর ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ হিসেবে দেখা দিয়েছে: ‘How deeply Pandu longed for children’! কিন্তু মহাভারতের পাণ্ডু পুত্র চেয়েছিলেন এই কারণে যে তিনি যতই তপস্যা করে থাকুন না কেন, পুত্রোৎপাদন না-করলে তাঁর পক্ষে স্বর্গে যাওয়া সম্ভব ছিল না। সেইটেই ছিল ‘বিধান’। He did not ‘long for children’, but he needed sons । তাই তিনি কুন্তীর কাছে ক্ষেত্রজ সন্তানের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। পুরাকথার যাবতীয় পুনর্নির্মাণে আমরা এমন নানান রোম্যান্টিক ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যাখ্যান হাজির করে ফেলি। প্রাবন্ধিক ও ঔপন্যাসিকদের এ-দোষ তো আছেই, এমনকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও এই ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছেন। ‘বিদায়-অভিশাপ’-এ তিনি কচ ও দেবযানীর দ্বন্দ্বটাকে ব্যক্তিগত ইচ্ছেপূরণ আর মহত্তর কর্তব্যের মধ্যে একটা ফরাসী লড়াইয়ে দাঁড় করিয়েছেন, যেখানে প্রেমের বিপরীতে কর্তব্যই জয়ী হয়, এবং দেবযানীর ব্যক্তিস্বার্থপ্রণোদিত অভিশাপের প্রতিদানে দেবযানীকে একটা বর দিয়ে কচ স্বর্গলোকে চলে যেতে পারে। কিন্তু মহাভারতের কচ বলেছিলেন, “তুমি-আমি দুজনেই শুক্রাচার্যের দেহ থেকে নির্গত হওয়ার ফলে আমরা এখন ভ্রাতা-ভগ্নী হয়ে গেছি, কাজেই আমাদের বিবাহ অসম্ভব”। আর দেবযানীর শাপের উত্তরে তিনি বর দেবার বদলে শাপই দিয়েছিলেন: “তুমি অন্যায়ভাবে আমাকে শাপ দিলে; অতএব তোমারও স্বজাতে বিবাহ হবে না”। এই “অন্যায়ভাবে” কথাটা লক্ষণীয়: সেকালে সবই একটা ন্যায়নীতির নিয়মে বাঁধা থাকত। এ-গল্পটাও মহাভারতেই আছে।
আদ্যোপান্ত মনে হয়, মহাভারতের দিকে তাকিয়ে ব্রুক আপনমনে একটা গপ্পো ফাঁদছেন। তাঁর খেয়াল করা উচিত ছিল যে অম্বা-অম্বিকা-অম্বালিকা— এই তিন ভগিনীর নামেই প্রমাণ যে, এঁরা মাতৃদেবীর তিন রূপ (যা বাজসনেয়ী সংহিতায় ‘অম্বে-অম্বিকে-অম্বালিকে’ সম্বোধনে আছে)। এঁরা পাশ্চাত্য পুরাণসমূহে তিন মাতৃকা হিসেবে গ্রীক হেকেটি-আর্টেমিস-সেলেনি (তথা Atropos-Lachesis-Clotho) নামে; রোমান Morta-Decima- Nona নামে; অথবা দেশান্তরে Verpėja (তন্তুকারিণী) Audėja (বয়নকারিণী) ও Nukirpėja (কর্তনকারিণী) নামের ত্রিরূপা নিয়তি বা Moirai হিসেবে; বা তিন নর্ন Urðr (বিগত), Verðandi (সাম্প্রত), এবং Skuld (আগামী) নামেও সুপরিচিত ।
এ-কথটা প্রাসঙ্গিক এই কারণে যে, এই জ্যেষ্ঠা ভগিনীরা— যেমন হেকেটি, মর্টা প্রমুখ— হলেন প্রাণহন্ত্রী দেবী, এবং ভারতীয় জ্যেষ্ঠা ভগিনী অম্বা ভিন্নরূপে ফিরে আসেন ভীষ্মের প্রাণহরণ করতেই (“Never forget me, Bishma, I am your Death”)। ভীষ্ম স্ত্রীসঙ্গ বর্জন করেছিলেন, এবং তিনি যাচিকা অম্বাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ফলত দেবীকে অস্বীকার করার শাস্তি হিসেবে ভীষ্ম মরেন গ্রীক হিপ্পলিতসের মতো, যিনি স্ত্রীসঙ্গ অস্বীকার করে দেবী আফ্রোদিতেকে অপমান (এবং যাচিকা অম্বা/মাতৃকা ফায়দ্রে-কে প্রত্যাখ্যান) করেছিলেন। এঁদের কথা জানলে জ্যেষ্ঠা কাশীরাজকন্যার সঙ্গে ভীষ্মের সম্পর্কটা বুঝতে ব্রুকের হয়ত একটু সুবিধে হতো। আর অম্বার অপর দুই ভগিনী অম্বিকা-অম্বালিকার সন্তানদুটি থেকেই যে কৌরব-পাণ্ডব বিভাজন, বিবাদের উৎপত্তি ও সার্বিক ক্ষত্রিয়কুলনাশ, তা নিশ্চয় কাউকে বলে দিতে হবে না। সে-হিসেবে এঁরা তিনে মিলে এক বিশাল সৃষ্টি ও ধ্বংসেতিহাসের জনয়িত্রী। উমা-জগদ্ধাত্রী-কালীর মতো এঁরা ত্রিরূপা মহামাতৃকার এক প্রকাশ।
ব্রুকের অম্বার মুখে শুনছি তার বাবা নাকি “bartered me like an animal”! Bartered! কিন্তু bartered against what? কাশীরাজের ডাকা স্বয়ংবরসভাটা গেল কোথায়? ব্রুক কোথা থেকে উক্ত তিন কন্যাকে তুলে আনালেন? ব্রুকের কল্পনায় কেন জানি না, কাশীর স্বয়ংবরসভাটা ইউরোপের ‘tournament’ হয়ে গেছে, যেখানে মধ্যযুগের নাইটরা লড়াই-লড়াই খেলত আর বেজায় শিভালরি দেখাত। অর্থাৎ আবার সেই পাশ্চাত্য myopia! এদেশি মহাভারতে অম্বা বলছেন যে, তিনি স্বয়ংবরে শাল্বরাজকেই বরণ করতেন। স্বয়ংবরে— ‘বর’ হিসেবে ‘বরণ’ করতেন! তাহলে এই তিন বোনের পতি নির্বাচনের স্বাধীনতা ছিল— যেমন স্বয়ংবরে কুন্তী ‘বরণ’ করেছিলেন মহারাজ পাণ্ডুকে, দময়ন্তী নলকে! তাঁরা তো দ্রৌপদী বা সীতার মতো বীর্যশুল্কাও ছিলেন না! তাঁরাও কি তবে পশুর মতো ‘bartered’ হয়েছিলেন বলব?
ব্রুক বৃথাই আধুনিক নারীবাদের ঝাঁকা মহাভারতের মাথায় চাপিয়ে দিয়ে তাকে ‘যুগোপযোগী’ করার চেষ্টা করেছেন। প্রাচীন ভারতে নারীরা যে রীতিমত স্বাধীন ছিল, ব্রুক সেটা জানেনই না: আদিপর্বেই মহারাজ পাণ্ডু কুন্তীকে বলেছেন যে আদতে নারীরা স্বাধীনা ছিল: স্বয়ম্বশ, স্বতন্ত্রা, বা স্বৈরিণী। এক স্বামীর অধীন না থেকে তারা ইচ্ছামতো পুরুষের সঙ্গে বিহার করত, কারণ প্রাচীন ধর্মই তেমন ছিল— “উত্তরকুরুবাসীরা এখনও সেই ধর্মানুসারে চলে; আর এদেশেও সে প্রথা অধিককাল রহিত হয়নি”। (তার প্রমাণাদি বাখোফেন হাজির করেছিলেন উনিশ শতকে তাঁর Mother Right গ্রন্থে।) বৈবাহিকপর্বাধ্যায়ে যুধিষ্ঠির এবং ব্যাসদেবও দ্রুপদকে জানান যে সেইটেই সনাতন ধর্ম। ব্রুকের ব্যাস কিম্বা বাখোফেন না-পড়ার এর চেয়ে ভালো উদাহরণ চট্জলদি দিতে পারছি না; তবে যে-পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে বিবাহে সম্মতি/অসম্মতি জানাবার অধিকার ঐতিহ্যগতভাবে মেয়েদেরই আছে (পুরুষরা propose করে মাত্র), সেই সংস্কৃতির মানুষ হয়ে ব্রুক কী করে ভাবলেন যে অম্বা was bartered like an animal? সে কি অম্বা নিতান্তই বুনো ভারতীয় বলে?
সেই একই মানসিকতার প্রতিফলন আমরা দেখি দ্যূতসভায় গান্ধারীর এই কথাতে যে যাবতীয় নারীর মতন দ্রৌপদীও তাঁর স্বামীরই অংশ; কাজেই যুধিষ্ঠির নিজে দাস হবার আগে তাঁকে বাজি ধরেছিলেন, নাকি পরে, সে-প্রশ্ন অবান্তর: দ্রৌপদী বিজিতাই হয়েছেন। সারা মহাভারত ঘেঁটে এই কথাগুলোর মূল শ্লোক কেউ কি দেখাতে পারবেন, বা গান্ধারীর এবম্বিধ মানসিকতার কোনও ইঙ্গিত? ভারতীয় মহাভারতে দেখি যে তিনি দ্বিতীয় দ্যূতের আগে ধৃতরাষ্ট্রকে এই বলে সাবধান করছেন যে, এই দ্যূতের ফলে ধৃতরাষ্ট্রের বংশলোপ হবে। কোনও আঞ্চলিক ব্যতিক্রমী মহাভারতে যদি ব্রুক দৈবাৎ এমন কথা পেয়েও থাকেন, তবে সেগুলো এইখানে গান্ধারীর মুখে বসিয়ে দেওয়াটা স্পষ্ট ইঙ্গিত করে যে, তিনি প্রাচীন ভারতকে কেবলমাত্র নারীর হীনায়নের জগৎ হিসেবেই দেখেছেন। অর্থাৎ আবার সেই নারীবাদের ফ্যাশনেব্ল ঝাঁকা!
*
কৃষ্ণর স্বহস্তে বয়ে নিয়ে যাওয়া তীরের খোঁচায় ভীষ্মর মৃত্যুটা অবশ্যই ব্রুকের থিয়েটারের বিখ্যাত ম্যাজিক! থিয়েটারে ওটাকে আমরা সম্ভ্রমের সঙ্গে মেনে নেব। কিন্তু, ভীষ্ম মরলেন একখানা তীরের খোঁচায়; অথচ তাঁকে দেখা গেল শরশয্যায়? এখানে ম্যাজিক ভেস্তে গেল? ঐ অতগুলো বাড়তি তীর কোথা থেকে এল? শরশয্যাটা তাহলে কি স্রেফ লোক-দেখানো ব্যাপার ছিল? অর্জুনের তীর মেরে পাতাল থেকে ভোগবতীর জল তুলে আনাটা কিন্তু সিনেমায় আছে। সেটা থিয়েটারের নয়— ক্যামেরার ম্যাজিক। সেক্ষেত্রে ভীষ্মের পতনটাও ক্যামেরার ম্যাজিকেই হতে পারত— চোপড়ার হাস্যকর ধনুর্যুদ্ধের মতো। আসলে এ-দুটো মাধ্যম খাপ খায় না। প্রশ্ন ওঠে: চাক্ষুষ যাঁকে একটামাত্র তীরের আঘাতে কাবু করা হলো, তিনি শরশয্যায় চড়লেন কোন্ যুক্তিতে? তার ওপর ভীষ্মের মাথা তুলে রাখার তীরগুলোও পরে এসে হাজির হয়েছে দেখতে পাচ্ছি! থিয়েটারের তো একটা লজিকও আছে— নাকি তার সবটাই ম্যাজিক? প্রযোজনার নির্দেশক কে— পিটার ব্রুক, না পি.সি. সরকার?
কৃষ্ণের গরিমা দেখাতে গিয়ে ব্রুক ভীষ্মবধে কৃষ্ণ-অনুগামী পাণ্ডবদের শঠতার ব্যাপারটা একেবারেই চাপা দিয়ে গেছেন; কারণ সেটা চোপড়া-মায়াপুর অনুমোদিত ব্যাখ্যান নয়। মহাভারতের ভীষ্ম বরাবরই শিখণ্ডীর বৃত্তান্ত জানতেন। তাই তিনি শিখণ্ডীর সঙ্গে লড়বেন না বলেছিলেন। শিখণ্ডীর দিকে তিনি পিঠ ফিরিয়ে যুদ্ধ করেছেন, আর শিখণ্ডীর আড়ালের নিরাপত্তা ব্যবহার করে অর্জুন তাঁকে ক্রমাগত তীরে বিঁধেছেন। সেই কারণেই ভীষ্মের পিঠের দিকটা শরকণ্টকিত ছিল, এবং পতনের পরে তাঁর দেহ ভূমি স্পর্শ করেনি। পতনের কিছু আগে তিনি—
ঈষৎ হাস্য করে দুঃশাসনকে বললেন, এইসকল মর্মভেদী বজ্রতুল্য বাণ নিরবচ্ছিন্ন হয়ে আসছে, এ বাণ শিখণ্ডীর নয়, অর্জুনেরই।
অতএব ভীষ্মকে আঘাত করার ব্যাপারে শিখণ্ডীর অসহায়তা, অর্জুনের পরম দ্বিধা, এ-সমস্তই ব্রুকের মহাভারতে পাশ্চাত্য romantic সুড়সুড়ি। মহাভারত এসবের চাইতে ঢের tough এক বৃত্তান্ত। সেই toughness ব্রুক কিচ্ছু বোঝেননি। আমাদের মহাভারতে সাত্যকির সঙ্গে যুদ্ধরত ভূরিশ্রবার হাত অর্জুন দূর থেকে অতর্কিতে ছিন্ন করে দেন ও রথহীন নিরস্ত্র কর্ণকে অঞ্জলিক বাণে বধ করেন; যে-শল্য ধর্মপুত্রের একান্ত প্রার্থনায় স্বপক্ষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন, সেই শল্যকে “পাপী” বলে ধিক্কার দিয়ে ধর্মপুত্র তাকে স্বহস্তে হত্যা করেন; ভীমসেন এক ভাইয়ের বুক চিরে ও মাথা কেটে ফেলে তার রক্ত পান করেন, আর এক ভাইয়ের অধমাঙ্গ গুঁড়িয়ে দিয়ে পা দিয়ে তার মাথা মাটিতে দলে দেন। আর এ-সমস্তই ঘটে কৃষ্ণের তদারকিতে; প্রায়শ তাঁর পরামর্শেই।
অভিমন্যুর চক্রব্যূহ ভেদ করার ঘটনায় ব্রুক জাদুবিদ্যার (মন্ত্রসিদ্ধির) আমদানি করেছেন তার থিয়েট্রিক্যাল মূল্যের জন্য। সেটা নাট্য হিসেবে উচ্চাঙ্গের, দৃশ্য হিসেবে চমৎকার, চিত্তহারী, ও বিস্ময়কর। মূলে কিন্তু কোথাও এমন ইঙ্গিত নেই যে, অভিমন্যু মন্ত্রবলে চক্রব্যূহ ভেদ করেছিল। তবু নাটকের খাতিরে সেটা আমরা মেনে নিতেই পারি। কিন্তু পুরো ব্যাপারটা মাটি হয়ে যায় এই অসম্ভাব্য দৃশ্যে যে যুধিষ্ঠিরাদি পাণ্ডবরা ও অন্যান্য বীরগণ তাকে অনুসরণ না-করে হাঁ করে তার ম্যাজিক দেখতে লাগলেন। মনে পড়ে যায়, অ্যারিস্টটল বলেছিলেন যে, অসম্ভাব্য দৃশ্য কখনও মঞ্চে দেখানো উচিত নয়; এবং তিনি কার্কিনসের একটা নাটকের উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন যে, নাটকটা এমনিতে বেশ হলেও, অসম্ভাব্য দৃশ্য মঞ্চস্থ করার দরুন মঞ্চে একেবারে ডুবে গেল।
অভিমন্যু প্রসঙ্গে জয়দ্রথের প্রসঙ্গটা ব্রুক একেবারেই বাদ দিয়ে দিলেন? মহাভারতে কিন্তু পাণ্ডবদের মন্ত্রাভাব নয়, তাদের ঠেকিয়ে রেখেছিলেন জয়দ্রথ— আপন বাহুবলে। আর সতেরো বচ্ছর ধরে মহাভারত অধ্যয়ন করার কথা যদি বলতেই হয়, তবে বলি, মহাভারতের ছয় রথী ফিল্মে একেবারে আট রথী হয়ে (পদব্রজে) অভিমন্যুকে বধ করল কোন্ পাঠের ভিত্তিতে? অম্বা তার প্রতিশোধস্পৃহা মেটাবার জন্য এসে ভীমের কাছে সাহায্য চাইছে কেন? পরশুরাম কোথায় গেলেন? আমরা জানি, দুর্যোধন হলেন ক্রোধের মহাবৃক্ষ, কর্ণ তার গুঁড়ি, এবং শকুনি তার শাখা। কিন্তু ব্রুক দেখি দুর্যোধনের বদলে দুঃশাসনকে ভিলেন বানিয়ে তাঁর ওপরেই যত ক্রোধ অর্পণ করে বসে আছেন। তা তিনি করতেই পারেন, কিন্তু তাতে করে মহাভারতের ব্যাখ্যানে কী সুবিধে হচ্ছে?
এসবের মধ্যে আবার রবি ঠাকুরের “কর্ণ-কুন্তী সংবাদ” থেকেও বেশ কিছু আবেগ-অনুভূতি নেওয়া আছে। মহাভারতে কর্ণ ও কুন্তীর দেখা হয়েছিল মধ্যাহ্ন পেরোলে। রবীন্দ্রনাথে সেটা ‘সন্ধ্যাসবিতা’ হয়েছে; কারণ সূর্যাস্তের সঙ্গে কর্ণের জীবন অস্তমিত হবার একটা সম্পর্ক আছে। ব্রুক এই সাক্ষাতের সময়টাকে আরও পিছিয়ে নিয়ে গেছেন রাত্রিকালে, যখন আকাশে চন্দ্র বিরাজমান, এবং সূর্যের পক্ষে অন্তরীক্ষ থেকে কর্ণকে পরামর্শ দেওয়া অসম্ভব। মহাভারতে সূর্য আকাশ থেকে কর্ণকে বলেছিলেন কুন্তীর কথা মেনে নিতে। পিতার সেই পরামর্শ অগ্রাহ্য করার মধ্যে কর্ণচরিত্রের মহত্ত্বের একটা দিক উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের কর্ণ-কুন্তী সংবাদের স্পন্দমান আবেগধর্মিতার মোহে পড়ে ব্রুক উপেক্ষা করেছেন মহাভারতে ঠিক তার পূর্ববর্তী ঘটনা কৃষ্ণ-কর্ণ সংবাদ, যেখানে কৃষ্ণকে বলা কর্ণের কথায় মহাকাব্যের বিশাল বিশ্ববীক্ষা ধরা পড়েছে:
“মহাবাহু, সব জেনেও কেন আমায় ভোলাতে চাচ্ছ? এই পৃথিবীর ধ্বংস আসন্ন, দুর্যোধন, দুঃশাসন, শকুনি আর আমি তার নিমিত্তস্বরূপ। আমি দারুণ স্বপ্ন ও দুর্লক্ষণ দেখেছি, তুমি যেন রুধিরাক্ত পৃথিবীকে হাতে ধরে নিক্ষেপ করছ, অস্থিস্তূপের উপরে বসে যুধিষ্ঠির যেন সুবর্ণপাত্রে সানন্দে ঘৃতপায়স ভোজন করছেন এবং তোমার প্রদত্ত পৃথিবী গ্রাস করছেন। … আমরা সকলেই গাণ্ডীবরূপ মহাগ্নিতে প্রবেশ করব।
এই সংলাপটা ব্রুকের খেয়াল করা উচিত ছিল; কারণ এটা শুধু ভারতীয় ভাবনার একটা প্রকাশ নয়: এর মধ্যে ইন্দোয়োরোপীয় মহাকাব্যিক বিশ্ববীক্ষারও একটা চিত্র লুকিয়ে আছে। মহাভারতকার সে-তত্ত্বটা অতি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন: “সকল সঞ্চয়ই পরিশেষে ক্ষয় পায়, উন্নতির অন্তে পতন হয়, মিলনের অন্তে বিচ্ছেদ হয়, জীবনের অন্তে মরণ হয়”। মহাভারতের যুদ্ধের শেষে সার্বিক ধ্বংস তারই চিত্রণ। যদি মহাভারতকে মহৎ কাব্যের মর্যাদা দিতে হয়, তবে তার এই অংশটা অগ্রাহ্য করা যায় না। সতেরো বচ্ছর মহাভারত পড়েও যদি কর্ণর ঐ সংলাপটা কারোর চোখে না-বিঁধে থাকে, তাহলে তাঁকে প্রশ্ন করাই যায়: “মিস্টার ব্রুক্স, ডু ইউ থিঙ্ক ইউ হ্যাভ আন্ডারস্টুড দি মোহাভারাতা?”
ব্রুকের মহাভারত এক অতিদীর্ঘায়িত ব্যাপার, যার সবগুলো নড়বড়ে গাঁট খুলে দেখানো সীমিত পরিসরে অসম্ভব। আর সে-বিশাল পরিশ্রম আসলে পণ্ডশ্রম হয়ে দাঁড়াবে; কারণ ও-জিনিস বেশিদিন টেঁকবার নয়। তবে ‘থিয়েটার’ প্রসঙ্গে এ-কথা বলতেই হয় যে, যাঁরা নাটক করেন এবং নাটক করান, তাঁরা দেখতে পাবেন, ব্রুকের মহাভারতের প্রায় কোনো অভিনেতারই নিজের অভিনীত চরিত্রের বাস্তবতা সম্বন্ধে কোনো প্রত্যয় নেই: পুরাণেতিহাসের সঙ্গে অসম্পৃক্ত এক ভিন্ন ধর্ম-সামাজিক পরিমণ্ডলের মধ্যে জীবন কাটানোর ফলে তাঁরা মহাভারতীয় সংঘটন বা পরিস্থিতির তাৎপর্য কিছুই বুঝছেন না; তার চরিত্রদের সংলাপগুলো শুধুমাত্র আউড়ে যাচ্ছেন। আর তাঁরা নিজেরাই যেখানে নিজেদের অভিনীত চরিত্রে কোনও আস্থা রাখতে পারেননি; সেখানে আমাদের প্রত্যয় আসবে কোথা থেকে? ব্যতিক্রম বলা যায় ধৃতরাষ্ট্র, কর্ণ, প্রমুখ দু-চারজন মাত্র, যাঁরা মুখাবয়বের অভিব্যক্তি দিয়ে চরিত্রের মানসিক কাঠামো বোঝাতে পেরেছেন। তবে একটা অচেনা কাহিনীর অজানা কিছু চরিত্র সেজে অনভ্যস্ত একটা ভাষায় সংলাপ বলার জন্য যদি মঞ্চে নাবতেই হয় (ভীষ্মর মুখের অস্বাভাবিক ইংরেজিটাই খেয়াল করুন), তবে এর চেয়ে ভালো কিছু করে ওঠা কঠিন, সেইটুকু মেনে নেওয়া যায়।
আর Carriere-এর নাট্যলিপিতেও দেখি পাত্রপাত্রীরা সঠিক অর্থে কোনও ‘ক্রিয়া’-তে লিপ্ত নন। তাঁরা কেবলই ‘appears’ আর ‘disappears’: চরিত্রদের অন্তর্জীবন তো নেই বটেই, উপরন্তু পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া বলতেও কিছুই নেই। অর্থাৎ আধুনিক যুগের নাট্যের প্রধান বৈশিষ্ট্যটাই এখানে অনুপস্থিত। এমন নাট্যলিপিতে (তথা নির্দেশনায়) লোকে অভিনয় করবেই বা কী করে? এর চাইতে বি. আর. চোপড়ার যাত্রাটিক্যাল মহাভারত ভালো এই কারণে যে, মহাভারতের অন্তর্নিহিত যে dynamism ও tensions আছে, সেগুলো তাঁর ঐ চড়া রঙের টেলি-যাত্রায় ঢের বেশি ধরা পড়েছে। নাটকের প্রাণ যেহেতু অভিনয়, অতএব থিয়েটারের সেই প্রেক্ষিতে ব্রুকের মহাভারত প্রধানত ব্যর্থ: অনেক সজ্জাগজ্জা, অনেক আয়োজন করেও মোটের ওপরে তাঁর সেই ব্যর্থ Conference of the Birds-এর চেয়ে খুব বেশি কিছু তিনি করে উঠতে পারেননি: অন্তত ভারতীয় প্রেক্ষণে। আমাদের তৃপ্তি শুধু এইখানে যে এক খোদ ব্রিটিশ সায়েব আমাদের নেটিভ মহাকাব্যকে পাত্তা দিয়েছেন। অতএব তাঁকে মাথায় তোলা নিশ্চয় আমাদের জাতীয় কর্তব্য।
উপস্থাপনাকে আধুনিক চিন্তার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্রুক meta-narrative ব্যবহার করেছেন, যেমন ব্যাস কাহিনীর চরিত্র হয়েও স্পষ্টতই কাহিনী বানিয়ে চলেছেন, যার দিক্নির্দেশ বা সমাপ্তি তিনি নিজেই জানেন না। কিন্তু মহাভারত তো কোনো বানিয়ে তোলা গপ্পো নয়— অন্তত ভারতীয় ভাবনায় মহাভারত হলো পুরাণেতিহাস: ব্যাসোক্ত মহাভারতেই বলা আছে ‘এই কাহিনী পূর্বে অনেকে বলে গেছেন’। অতএব ব্যাস এর একমাত্র বা আদি রচয়িতা নন। ব্রুকের মহাভারতে দেখি থেকে থেকেই নানা গম্ভীর প্রশ্ন তোলা হয়, এবং নির্বিকারভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। এমনকি ব্যাসদেব কৃষ্ণকে উদ্ভাবন করেছেন, নাকি কৃষ্ণ তাঁকে, এ-প্রশ্ন স্বয়ং কৃষ্ণই ব্যাসকে করছেন, যার উত্তর নেই। নাটকের ধর্ম অনুযায়ী, ওগুলো নাটকের ওপর বোঝা। ছেঁটে ফেলাই সঙ্গত। ধর্মবকের প্রায় যাবতীয় প্রশ্নই ব্রুক পাল্টে দিয়েছেন; তাতে আমরা দোষ দেখিনা, কারণ সেসবের উত্তরগুলো অন্তত তিনি যোগ করেছেন। কিন্তু নাটকে সংযোজিত গভীরতর প্রশ্ন— কৃষ্ণই বিষ্ণু কিনা— এর উত্তর দেখি কৃষ্ণ ব্যাসের কাছে জানতে চান, এবং ব্যাস সে-উত্তর দিতে পারেন না। অথচ মহাভারতে দেখি ব্যাস অশ্বত্থামাকে বলছেন: ‘স্বয়ং নারায়ণ মায়ার দ্বারা জগৎ মোহিত করে কৃষ্ণরূপে বিচরণ করছেন’। ব্রুকের গণেশকৃষ্ণ ফিউশনের ন্যায্যতা সপ্রমাণ করতে এ-কথাটা যোগ করার চাইতে সহজতর আর কী ছিল?
ধর্মবকের কথাই যখন উঠল, তখন বলি, এদেশে মহাভারতের প্রধান পরিচয় কিন্তু ধর্মগ্রন্থ হিসেবে। গীতার কথা এবং স্বধর্ম-পরধর্মের কথা ছেড়েই দিলুম; কিন্তু যক্ষ-যুধিষ্ঠির সংবাদে তো বিশ্বরূপের চাইতেও ভয়ঙ্কর এক রূপে এক চিরন্তন সত্য বর্ণিত হয়েছে:
অস্মিন্ মহামোহময়ে কটাহে
সূর্যাগ্নিনা রাত্রিদিনেন্ধনেন
মাসর্তুদর্বীপরিঘট্টনেন
ভূতানি কালঃ পচতীতি বার্তা ।
—সময় এই মহামোহময় কড়াইয়ের মধ্যে সূর্যের আগুনে, দিন-রাত্রির জ্বালানি দিয়ে, মাস ও ঋতুর হাতা দিয়ে ঘেঁটে ঘেঁটে সর্বভূতকে রন্ধন করছে।
ক্রমাগত উদ্ভূত ও ক্রমাগত বিলুপ্ত গ্যালাক্সিতে ঠাসা এই চরাচরে মানুষের অবস্থানের এর চেয়ে সত্য চিত্র আর কিছু আছে কি? এ-প্রসঙ্গ বাদ দিয়েও বলি: ধর্ম নিয়ে অন্ধতার এই অন্ধ যুগে যুধিষ্ঠিরের এই কথাটা কি প্রাসঙ্গিক ছিল না—
বেদাঃ বিভিন্নাঃ শ্রুতয়োঃ বিভিন্নাঃ
নাসৌ মুনির্যস্য মতং ন ভিন্নম্
ধর্মস্য তত্ত্বং নিহিতং গুহায়াং
মহাজনো যেন গতঃ স পন্থাঃ ।
—বেদগুলি ও শ্রুতিগুলি ভিন্ন ভিন্ন কথা বলে; এমন কোনও মুনি নেই, যাঁর মত ব্যতিক্রমী নয়। ধর্মের তত্ত্ব গুহায় নিহিত, তাই মহাজনেরা যে-পথে গেছেন, তাই হলো পথ।
*
তবে শেষ একটা কথা উঠতেই পারে । আমরা যা দেখেছি— সেই ১৯৮৯ সালে কোলকাতায়, এবং পরে ইন্টারনেটের সম্পাদিত ও ক্ষুদ্রায়িত সংস্করণে— তার কোনোটাই ১৯৮৫ সালের ফ্রান্সের সেই থিয়েটার নয়; তার ফিল্ম-রূপ মাত্র। সিনেমায় দেখে সেই থিয়েটারের মাহাত্ম্য বোঝা নিশ্চয় আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমি নিজেই নন্দনে তিনটে দিনে যা দেখেছিলুম, আর তুলনায় ইন্টারনেটে পাওয়া মহাভারত নিতান্ত ভিখিরি-মার্কা একটা ব্যাপার।
এক্ষেত্রে কিছু কথা বিশেষত বলার থাকে। এক— এ-লেখায় গোড়াতেই বলে নেওয়া আছে যে, ব্রুকের মহাভারতবোধ শূন্যের কাছাকাছি হলেও তাঁর থিয়েটারসজ্জা প্রশংসনীয়। আর সেক্ষেত্রে, দুই— ব্রুকের উচিত ছিল মূল থিয়েটারটি ফিল্মে ডকুমেন্ট করে রাখা, যাতে ভবিষ্যতে তার আশ্চর্য মহিমা নিয়ে কারও মনে কোনও সন্দেহ না থাকে। কিন্তু এর পরে থাকে তিন— থিয়েটার থেকে সিনেমায় মহাভারতের ব্যাখ্যান কি এতটাই পাল্টে গেছে যে, নাট্যের তথাকথিত সুমহিম ব্যাখ্যান ফিল্মে প্রায় অর্থহীন হয়ে পড়েছে?
ঘটেছে তাই। কারণ ব্রুক নাট্যজাদুগর হবার তাড়নায় পশ্চিমা দুনিয়ার তথা নাট্যবিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যবোদ্ধা অ্যারিস্টটলের সতর্কবাণী পড়ে দেখার দরকার বোধ করেননি। পোয়েটিক্স থেকে সেই সতর্কবাণী মাত্র দুটো নাম পাল্টে এখানে উদ্ধৃত করে দিচ্ছি:
One should… not write a tragedy on an epic body of incidents (that is, one with a plurality of stories in it), by attempting to dramatize, for instance, the entire story of the [Mahabharata]. In the epic, owing to its scale, every part is treated at proper length. With a drama, however, on the same story, the result is very disappointing… For that and that alone was enough to ruin even a play by [Brook].
অর্থাৎ কিনা, Brook has rushed in where Angels fear to tread. ব্রুকের মহাভারত কোলকাতায় বসে আমি এবং আরও বেশ কিছু দর্শক যতটা দেখেছি, এবং এখন আন্তর্জালের কল্যাণে সকলেই ঘরে বসে যতটুকু দেখতে পাচ্ছেন, তাতে করে একটাই প্রশ্ন প্রখর হয়ে ওঠে: ব্রুক কেন এমন একটা নাটক করেছিলেন, যেটা দেখলে মনে হয় যেন একটা কাঠবেড়াল একটা হাতির সঙ্গে কোলাকুলি করবার চেষ্টা করছে? হাতির সর্বাঙ্গে চরে বেড়িয়েও তো সে হাতির চামড়াটুকুর বেশি কিচ্ছু বুঝতে পারবে না। মহাভারত অবশ্যই একটা যুদ্ধবৃত্তান্ত, যাতে কাব্যৈশ্বর্য আছে; কিন্তু সে-বৃত্তান্তের তলায় চাপা আছে ভারতের সমাজবিবর্তনের চিত্র। আবার সেই বৃত্তান্তকে ব্যবহার করা হয়েছে নৈতিক মানদণ্ড স্থাপনের জন্য, যুগে যুগে সমকালীন যুগের প্রতি প্রযোজ্য নীতির আদর্শ প্রবিষ্ট করা হয়েছে, যা পরের যুগে অপ্রযোজ্য হয়ে পড়েছে, কিন্তু বাদ পড়েনি: একপাতিব্রত্যের মহিমার জগতেই সগৌরবে বিরাজ করেছেন পঞ্চকন্যার দুই কন্যা কুন্তী ও দ্রৌপদী। ধর্মের ধ্বজা পোঁতা হয়েছে সেই বৃত্তান্তেরই ওপর, যার ফলে পাপকর্মারা দেবনন্দন হিসেবে হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ও একই মুখ দিয়ে গীতা, দুর্নীতিমূলক যুদ্ধ, ও গুরুহত্যার প্ররোচনা বেরিয়েছে। সর্বোপরি যুদ্ধের ঈশ্বরের যে কালান্তক, সর্বধ্বংসী, সর্বগ্রাসী বিশ্বরূপ— সেও তো মহাভারতের একটা মৌলিক ব্যাখ্যা। ব্রুক কোন্ প্রেক্ষণে মহাভারতকে দেখেছেন?
সেই প্রশ্নের সূত্রেই মূল ব্যাখ্যান বা interpretation-সংক্রান্ত এই প্রশ্নটা ওঠে: এক বহুরাষ্ট্রিক শিল্পীদল ব্যবহার করে এই এই ‘poetical history of mankind’ বানিয়ে ব্রুক ১৯৮৫ সালে ঠিক কী বলতে চেয়েছিলেন? তাঁর সমাচারটা কী? পৃথিবীর বহুরাষ্ট্রিক যুদ্ধগুলো— যেমন প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ— এ সবই সিদ্ধিদাতার মুখোশধারী কৃষ্ণের নাট্যলিপি? যেমন এখন আমেরিকা-ইস্রাইল-ইরান-প্যালেস্টাইনের ধর্মযুদ্ধ— অথবা পূর্ববর্তী ভিয়েতনাম, ইরাক, য়ুক্রেন? ধর্মপক্ষই জয়ী হয়, নাকি জয়ীরাই ধর্মপক্ষ হয়? এ-সব খেলার ট্রাম্প-কার্ড কি তাহলে সর্বদাই কৃষ্ণের হাতে, যিনি ঘটনার লিপিকরণে নিজেকে ঈশ্বরপুরুষ বলে ঘোষণা করছেন? ভগবদ্গীতা তাহলে কি এ-সবেরই সাফাইগান— “সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ”? প্যালেস্টাইনে অগণ্য শিশুহত্যা, ইরানে মেয়েদের স্কুলে বোমাবর্ষণ— এ সকলই তাহলে ধর্ম? দ্যূতসভায় দ্রৌপদীর প্রতি ভীষ্মের বক্তব্যটা ব্রুক নিশ্চয় পড়েননি: ‘তার পর, জগতে প্রবল লোক যেটাকে ধর্ম বলে, ধর্মবিচারের সময় সেইটাই ধর্ম হয়; কিন্তু দুর্বল লোক যা বলে, তা প্রতিহত হয়ে যায়’। সেটাও কি এক আধুনিক poetical history of mankind নয়, যা UNO-র Security Council-এর কল্যাণে এখন প্রাসঙ্গিক? মায়াপুরী ব্যাখ্যানটার কথা দিয়ে লেখা শুরু করে আমি বোধহয় খুব ভুল করিনি— এসকল তাঁরই লীলা!
অজস্র ত্রুটি ও অপব্যাখ্যায় পরিকীর্ণ ব্রুকের এই ফাঁপা মহাভারত-নাট্য সম্বন্ধে সংক্ষেপে কিছু বলতে গেলে বলতে হয়, ওটা হলো মহাভারতের মলাট অবলম্বনে ব্রুকের বানানো একটা গপ্পো মাত্র: মহাভারতের নাম-না-শোনা পশ্চিমা দর্শকমণ্ডলীকে ঘেবড়ে দেবার জন্য তৈরি। তাই আমাদের দেশেও চট্ করে পশ্চিমা হয়ে যাবার লোভে অনেকেই ব্রুকের মহাভারতের স্তুতি গেয়ে থাকেন— বিশেষত তাঁরাই, যাঁরা মহাভারত পড়েননি।
চিত্র: গুগল





