Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ছোটগল্প: কাঁপন

উইচেতা পর্বতমালা অঞ্চল পেছনে ফেলে ধীরে ধীরে সামনে আসছে বিস্তীর্ণ খোলা তৃণভূমি, আবাদের মাঠ। শোঁ শোঁ করে কতক্ষণ পর পর গাড়িগুলো চলে যাচ্ছে নিজের গন্তব্যে। ফিকে হয়ে আসছে সূর্যের তেজ। যতদূর চোখ যায় প্রসারিত, বিস্তৃতি সবুজের গেঁয়ো অঞ্চল। একঘেয়েমি লেগে আসে, চোখ জ্বালা করে ওঠে। তারপর একসময় শুষ্ক ভূখণ্ড আর বিস্তীর্ণ তৃণভূমির দীর্ঘক্ষণের নীরসতা ভেঙে হাইওয়ের দুইদিকে ভুসভুস করে পাশ কেটে পেছনে চলে যায় ছোট ছোট বন উপবন। বেলা পড়ে আসা আলোয় বাতাসে মৃদু দুলতে থাকা লম্বা গাছগুলো দেখে তখন কিছু সময়ের জন্য চোখে সতেজতা ফিরে আসে।

ওরা মাউন্ট স্কট ছেড়ে ল্যটন থেকে স্টিলওয়াটারে ফিরছে। ওকলাহোমার রাস্তায় গাড়ির সামনে এত জীবজন্তু আসে বলার মত না। কাঠবিড়ালি, হরিণ, র‌্যাকুন, হাঁস, খরগোশ আরও কত কী যে রাস্তায় মরে পড়ে থাকে। ওদের গাড়িটার সামনে কী একটা আসল, মনে হল র‌্যাকুন, কিন্তু র‌্যাকুন তো আস্তেধীরে নড়ে, র‌্যাকুনের মতই মনে হল, অথচ কাঠবিড়ালির মত দ্রুততা, শেষমুহূর্তে টের পেয়েছিল হয়তো বড় ভুল হয়ে গেছে তাই এই দ্রুততা, কিন্তু রক্ষা আর হল না শেষ পর্যন্ত। র‌্যাকুন বেচারি ফিরছিল হয়তো পরিবারের কাছে, খাবারের খোঁজে বেরিয়েছিল হয়তো, ঘরে কি কোনও ক্ষুধার্ত শিশু অপেক্ষায় ছিল তার ফিরে আসার?

কয়েক মিলিসেকেন্ড, ঠিকই বুঝতে পারল ও, ওরই গাড়ির চাকার নিচে পড়তে যাচ্ছে জীবটি। গাড়িতে সামান্য একটু ঝাঁকুনি, টায়ারে খুব সামান্য একটা ভোঁতা ধাক্কা, ওই কয়েক মিলিসেকেন্ডের জন্য সেই ধাক্কা নিজের শরীরেও টের পেল ও। বাকি পথ স্বামী-স্ত্রীতে আর তেমন কোনও কথা এগোল না।

খোলা আকাশ, দূরের পর্বতাঞ্চল আর ওকলাহোমার সুবিস্তীর্ণ তৃণভূমির মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া এইসব হাইওয়েতে কত নিষ্প্রাণ জীবই তো পড়ে থাকতে দেখেছে ও কতবার। কত সময় চলতি পথে চোখ পড়েছে ওদের দুমড়েমুচড়ে যাওয়া শরীরের ওপর। কিন্তু আগে বোঝেনি হৃদয়ে এমন কাঁপনও লাগে। একটা দুঃখ, একটা অপরাধবোধে মনটা ছেয়ে থাকল বাকি পথ। স্বামী-স্ত্রীতে আর তেমন কোনও কথাই হল না বাকি রাস্তাটুকু। মন বিক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছে, রাতের হাইওয়েতে মনোযোগ রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

হতচ্ছাড়া র‌্যাকুন আর কাজই পেলি না, তোকে ওই মুহূর্তেই আসতে হল সামনে, একটু সাবধান হতেও শিখিসনি, এত কাল ধরে তোরা এইসব বিশাল তৃণভূমিতে জলাভূমিতে আছিস, রাস্তা দিয়ে কত গাড়ি যেতে-আসতে দেখিস, আর-্একটু সাবধানতাও তো শিখতে পারতি, এই মহাকালে কত জীবনের আনাগোনায়, কত পার্মুটেশন-কম্বিনেশনের যোগাযোগ যাতায়াতে, ওর হাতেই ছিল সেই র‌্যাকুনের মরণ, যত্তসব…

তারপর জীবনে আর যত জীবের নিঃসাড় শরীর দেখেছে রাস্তায়, ওই র‌্যাকুনটার কথা বিদ্যুৎ চমকের মত মনে পড়েছে ওর; কী একটা অসহায়ত্ব, কী একটু অনুশোচনা। একটা ক্ষুদ্র অজানা জীব রাতের অন্ধকারে যাকে দেখাই গেল না বলতে গেলে, তবু তার শরীরের ওজনের সমান ছোট্ট একটা কাঁপন গাড়ির শরীর হয়ে ওর নিজের শরীরেও এসে মিশেছিল। যেন এক অজানা তরঙ্গ বয়ে আসে জীবন থেকে আর-এক জীবনে, সময় থেকে আর-এক সময়ে। বিশ্বপ্রকৃতির এ কেমন বন্ধন, এ কেমন শক্তি…

Advertisement

কত বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় একবার বাচ্চার স্কুলে, স্কুল কম্পাউন্ডের ভেতর একবার ও দেখল, বালক-বালিকার একটা দল প্লাস্টিকের বাক্সে করে ইকোসিস্টেমের একটা ডেমো তৈরি করছে সায়েন্স প্রোজেক্টের জন্য। বাক্সে মাটি নিয়েছে, লতাপাতা নিয়েছে, ডালপালা দিয়ে বনবাদাড় বানিয়েছে, পাখি বানিয়েছে। ওরই মধ্যে এক অতিউৎসাহী বালক ফেন্সের ঝোপঝোড় থেকে অনায়াসে ছোট্ট একটা গিরগিটির বাচ্চা তুলে এনে বাক্সে পুরল। মুক্তির প্রবল আশায় গিরগিটি-শিশুর কী সে তিড়িংবিড়িং ধড়ফড়ানি। ডিম ফুটে বের হওয়ার পর যে গিরগিটি-শিশুর তার মাকে আর লাগেই না, সেই গিরগিটি-শিশু কি মানবশিশুর হাত থেকে মুক্তির জন্য সাহায্য চেয়েছিল মায়ের, ডেকেছিল, মা মা মা…

বালক-বালিকারা হয়তো সায়েন্স প্রজেক্ট শেষে আবার গিরগিটির বাচ্চাটাকে যথাস্থানে ফেরত দিয়েও যাবে, হয়তো দেবে না, হয়তো নিজেদের বাগানে ছেড়ে দেবে, হয়তো ইকোসিস্টমের ডেমোতে অভিনয় করতে গিয়ে গিরগিটি-শিশু তার প্রাণটাই হারাবে…

এইসব ভাবতে ভাবতে, দক্ষিণ গোলার্ধের এক ক্ষুদ্র গিরগিটির অস্থির ছটফটানি বহু বছর আগের উত্তর গোলার্ধের কোনও এক হাইওয়েতে ফেলে রেখে আসা সেই র‌্যাকুনের ছোট শরীরের ওজনের সমান কাঁপন চকিতে ওকে আবার মনে করিয়ে দিল যেন। জীবন, মৃত্যু, আনন্দ, বেদনা অতিক্রম করে করে বছরের পর বছর চলে গেছে। ও কত মানুষের নাম ভুলে গেছে, কত আত্মীয় ওর জীবন থেকে আপনাআপনি সরে গেছে, কত অনাত্মীয় আবার বন্ধু হয়ে উঠেছে, দেশের কত বন্ধু ওকে ভুলে গেছে, কত সময় চলে গেছে, কত স্মৃতি ঝাপসা হয়ে গেছে, কিন্তু সেই হাইওয়েতে রাতের নিস্তব্ধতায়, এক ঝলকায় যে প্রাণ একদিন হারিয়ে গেছে ওরই হাতে, আজ বহু বছর পরও চপল চঞ্চল সেই প্রাণীটির সাথে ক্ষণিকের দেখা, ছোট প্রাণের সেই বেদনার্ত ভয়, সেই সংক্ষিপ্ত মুহূর্ত বিনিময় এখনও কত প্রবল, কত জ্যান্ত হয়ে ফিরে আসে।

চিত্র: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

2 Responses

  1. কী অসামান্য ছোট্র এই লেখাটি, ঐ রেকুন বা গিরগিটিটির মত আমায়ও কাঁপিয়ে দিয়ে গেল, টায়ারের শরীর বেয়ে সেই ধাক্কা উঠে এল আমার শরীরেও। কিন্তু ‘এই মহাকালে কত জীবনের আনাগোনায়, কত পার্মুটেশান-কম্বিনেশানের যোগাযোগ যাতায়াতে, ওর হাতেই ছিল সেই রেকুনের মরণ..’ তবু ‘ যেন এক অজানা তরঙ্গ বয়ে আসে জীবন থেকে আর এক জীবনে , সময় থেকে আর এক সময়ে, বিশ্বপ্রকৃতির এ কেমন বন্ধন, কেমন শক্তি…”

    1. অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, পড়ার ও মন্তব্যের জন্য! ভাল থাকবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × one =

Recent Posts

প্রসেনজিৎ চৌধুরী

অগ্নিবীর: বন্দুকের মুখে ঈশ্বর

১৯৫০ দশকে নেপালের রাজতন্ত্র ও রাজার মন্ত্রিগোষ্ঠী রানাশাহী শাসনের বিরুদ্ধে সফল সশস্ত্র বিদ্রোহ হয়েছিল। সেই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন অনেক ভারতীয়। তাঁদের মধ্যে অনেকে বাঙালি। নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সেই প্রথম সংঘর্ষ সে-দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত। ভারত ও চীনের মধ্যে একফালি দেশ নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম সশস্ত্র ও নিরস্ত্র দুই পথ ধরে চলেছিল। ডান-বাম-অতিবাম— ত্রিমুখী রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতের চূড়ান্ত সফলতা আসে ২০০৮ সালে রাজার শাসনের অবসানে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারী: এক দৈবী আখর

আমরা ৮-ই মার্চের আন্তর্জাতিক নারীদিবসে আবহমান নারীবিশ্বকে সামান্য একটু ছুঁয়ে যেতে চাইলাম মাত্র। হাজার হাজার বছর ধরেই তাঁদের ওপর কড়া অনুশাসন, জবরদস্ত পরওয়ানা আর পুরুষতন্ত্রের দাপট। সে-সবের ফল ভুগতে হয়েছে আন্তিগোনে থেকে সীতা, দ্রৌপদী; জোয়ান অফ আর্ক থেকে আনারকলি, হাইপেশিয়া; রানি লক্ষ্মীবাঈ থেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বেগম রোকেয়া; রোজা পার্কস থেকে মালালা ইউসুফজাই— তাঁদের মতো হাজারো নামহীন নারীকে।

Read More »
তন্ময় চট্টোপাধ্যায়

মাতৃভাষা: অবিনাশী হৃৎস্পন্দন ও বিশ্বজনীন উত্তরাধিকার

প্রতিটি ভাষার নিজস্ব একটি আলো আছে, সে নিজের দীপ্তিতেই ভাস্বর। পৃথিবীতে আজ প্রায় সাত হাজার ভাষা আছে। ভাষাবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই শতাব্দীর শেষে তার অর্ধেকেরও বেশি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এ তথ্য সত্যিই বেদনাদায়ক। একটি ভাষার মৃত্যু মানে কেবল কিছু শব্দের মৃত্যু নয়— সে মানে একটি জগৎদর্শনের অবলুপ্তি, একটি জাতির স্মৃতির চিরকালীন বিনাশ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক বহুমাত্রিক। নিজের মাতৃভাষাকে ভালবাসা, তাকে চর্চায় রাখা, তার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আর তার সাথে অন্য সমস্ত ভাষার প্রতি আরও বেশি করে শ্রদ্ধাশীল হওয়া।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

শংকর: বিচিত্র বিষয় ও আখ্যানের কথাকার

শংকরের জনপ্রিয়তার একটি কারণ যদি হয় সাবলীল ও সহজ গতিচ্ছন্দময় ভাষা, অন্য আরেকটি কারণ হল, নিজ সময়কে করপুটে ধারণ করা। তার সঙ্গে মিশেছে আমাদের পরিকীর্ণ জগতের বহুকিছু, আমাদের নাগালের মধ্যেই আছে, অথচ আমরা এ-পর্যন্ত যার হদিশ পাইনি, তাকে পাঠকের দরবারে এনে হাজির করা। ১৯৫৫-তে যে উপন্যাসটি দিয়ে বাংলা-সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব, সেই ‘কত অজানারে’ হাইকোর্টের জীবনযাপন, সেখানকার আসামি-ফরিয়াদি, উকিল-ব্যারিস্টার প্রমুখের চিত্র। লেখকের নিজ অভিজ্ঞতাপ্রসূত রচনা এটি। তিনি প্রথম জীবনে হাইকোর্টের সঙ্গে চাকরিসূত্রে যুক্ত ছিলেন।

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর তিনটি কবিতা

তারপরে একদিন আকাশে মেঘের সাজ, মুখরিত ধারাবারিপাত/ রঙিন ছাতার নিচে দু’গালে হীরের গুঁড়ি, মন মেলে ডানা/ আরো নিচে বিভাজিকা, নিপুণ শিল্পীর হাতে গড়া দুই উদ্ধত শিখর/ কিছুটা অস্পষ্ট, তবু আভাসে ছড়ায় মায়া বৃষ্টিস্নাত নাভি/ তখনই হঠাৎ হল ভূমিকম্প, পাঁচিলের বাধা ভাঙে বেসামাল ঝড়/ ফেরা যে হবে না ঘরে মুহূর্তে তা বুঝে যাই, হারিয়েছি চাবি/ অনেক তো দিন গেল, অনেক ঘুরেছি পথে, বিপথে অনেক হল ঘোরা/ তাকে তো দেখেছি, তাই নাই বা পড়ুক চোখে অজন্তা ইলোরা।

Read More »
সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

ছোটগল্প: ফাউ

গরমকালে ছুটির দিনে ছাদে পায়চারি করতে বেশ লাগে। ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়োয় শরীরটা। আকাশের একপাশে আবির। সন্ধে হবে হবে। অন্যদিকে কাঁচা হলুদ। চায়ের ট্রে নিয়ে জমিয়ে বসেছে রুমা। বিয়ের পর কি মানুষ প্রেম করতে ভুলে যায়? নিত্যদিন ভাত রুটি ডালের গল্পে প্রেম থাকে না কোথাও? অনেকদিন রুমার সঙ্গে শুধু শুধু ঘুরতে যায়নি ও।

Read More »