Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

গরিব হওয়ার সহজ উপায়

আবাদমহলের এক দ্বীপের প্রতাপশালী জোতদার ছিলেন দেবেন মণ্ডল। এক ঘেরিতে পাঁচশো বিঘে জমির মালিক। কিন্তু, সেই দেবেন মণ্ডলের তৃতীয় ও চতুর্থ পুরুষ এখন অনেকেই পরিযায়ী শ্রমিক। এক পৌত্র অন্ধ্রপ্রদেশে কাজ করতে গিয়ে কোমরে ঘোরতর আঘাত পেয়েছে। পায়ের নার্ভ শুকাতে শুকাতে এখন পঙ্গু। আবার ও বাড়ির এক পুত্রবধূ কলকাতার উপকণ্ঠে আয়া সেন্টারে কাজ করে। আম্ফান-ইয়াসের ত্রাণের লাইনে হাত পেতে দাঁড়ায় মোড়লবাড়ির মহিলা-পুরুষ। অথচ, কী ঐশ্বর্যশালীই না ছিলেন একসময় ওরা! কুড়ি বাইশজন জন-মাহিন্দার দুই মরসুমে খাটত জমিতে। গরুর গাড়ি, মোষের গাড়ি, ধোলাই নৌকা, পেটুয়া নৌকা, ডিঙি-পানশি। সেই সঙ্গে মাঝি-মাল্লা এবং বাউলে-মউলে। কাঠ ও মধুর ব্যবসার সঙ্গে আমদানি-রপ্তানির কারবারও চলত যে। দুই গোয়ালে গাই-বলদ ছিল পঞ্চাশ-বাহান্নটি। সে সব দেখাশুনোর জন্য থাকত দু’-চারজন রাখাল। এছাড়া ফাইফরমাস খাটার জন্য আরও কিছু মেয়ে-মদ্দ এবেলা-ওবেলা মোড়লবাড়ির দরজায় হত্যে দিয়ে থাকত। এ তো গেল বারমহলের কথা। অন্দরমহলে গিন্নিমাদের আশপাশে যে মেয়ে-বউরা ঘুরে বেড়াত তার সংখ্যাও কম নয়। সকাল-সন্ধ্যা তিনবেলা রান্না। মোড়লবাড়ির ছেলেমেয়েদের ফাইফরমাসও যে ভালই। চা, কফি, গরম দুধ, ডিম টোস্ট, গরম জল— হাঁক পাড়লেই পৌঁছে দিতে হত ঘরে। দুই বউ মিলে পাঁচ ছেলে চার মেয়ে কর্তার। বড়গুলি শহরে পড়াশুনো করত, ছোট কয়েকটি গাঁয়ে। ছুটি পড়লে উৎসব লেগে যেত বাড়িতে। দাসদাসী-মাহিন্দারদের কাজের অন্ত থাকত না।

দেবেন মণ্ডল করিতকর্মা মানুষ ছিলেন। সারাদিনে ঘুমানোর সময়টুকু ছাড়া সর্বক্ষণ তাঁকে কোনও না কোনও কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখা যেত। সকালবেলা বাইরের কাজ না থাকলে বারান্দায় বসে জাল বুনতেন। দুই বউয়ের মন বুঝে আলাপ করতেন সামলে-সুমলে। পাশের জলচৌকিতে বসানো থাকত পেল্লায় সাইজের রেডিও। খবর শুনতেন তাতে। দেশ-বিদেশের খবর। ওরই মাঝে এক পাক মেরে আসতেন বাড়ির চারিদিকে, কিংবা জমির আলে। জন-মাহিন্দাররা কাজে ফাঁকি দিচ্ছে কি না লক্ষ্য রাখতে হত যে। বেলা বাড়লে আবার চলে যেতেন নায়েব বা চাপরাশিবাবুর কাছে। উমেদারি-মোসায়েবি না করলে সুযোগ-সুবিধে মেলে না তো। অতএব একবার অন্তত দেখা দিয়ে আসতে হতই। এছাড়া ছিল হাটবারে আড়তদার ও ব্যাপারিদের সঙ্গে কেনা-বেচার চুক্তি, নানান ধারার ব্যবসার সুলুক-সন্ধান। তেষট্টি বছর বয়সে অসুস্থ হওয়ার আগে পর্যন্ত কাজের বহর কমেনি। কিন্তু শেষ সময়টা ভাল যায়নি তাঁর। পাঁচটি ছেলের একটাও তেমন কিছু করে উঠতে পারেনি। পড়াশুনোর জন্য শহরে গিয়েছিল বটে; কিন্তু শহরের আদবগুলি যতটা আয়ত্ত করেছিল, শিক্ষাটা সেই অনুযায়ী নিতে পারেনি। বরং মেয়েগুলি ভাল বিয়ে দিয়েছিলেন দেবেন। নিজে স্কুলের সেক্রেটারি থাকার সুবাদে চারটে মেয়েকেই চার মাস্টারের হাতে তুলে দিতে পেরেছিলেন। বিরাশি বছর বয়সে দেবেন মণ্ডল মারা গিয়েছিলেন। তারপর বয়ে গেছে আরও পঁয়তাল্লিশটা বছর। আজ তাঁর পরিবারের অবস্থার দিকে তাকালে মায়া হবে। সেই ছেলেমেয়েরা অনেকেই আর বেঁচে নেই। কয়েকজন থাকলেও বার্ধক্যে পৌঁছেছে। দেবেন মণ্ডলের নাতিপুতিরা  অনেকেই এখন একশো দিনের কাজ পাওয়ার জন্য পঞ্চায়েতবাবুর লেজে লেজে ঘোরে। বেঙ্গালুরু-চেন্নাইয়ে ধান রোওয়ার কাজ করে, পাইপলাইনের কাজে যায়। আবাদের ঠিকেদার-কন্ট্রাক্টরবাবুরা হাটে হাটে গরিব খোঁজে। মোবাইলে যোগাযোগ চালায়। দেবেন মণ্ডলের ছেলের ছেলে, কিংবা তার ছেলে সেই গরবের তালিকায় নাম লেখায়। ট্রেন বা প্লেনের টিকিট কাটা হয়ে যায় দু’মিনিটেই। অবাক হওয়ার বিষয় এইটে যে, যারা এখন ঠিকেদার-কন্ট্রাক্টর বা রাজনৈতিক নেতা, তাদের বাপ-ঠাকুর্দারা অনেকে দেবেন মণ্ডলের মাহিন্দার ছিল। এখন সেই ঠিকেদারের ধমক-ধামক গায়ে মেখে নিতে হয় দেবেন মণ্ডলের নাতিপুতিদের। রাজনৈতিক নেতাদের কাছে হাত পেতে দাঁড়াতে হয়। তুই-তোকারি, ছোট-বড় কথা সইতেও হয়। এটা অবশ্যি স্বাভাবিক। কেন না, মঞ্চে যার যেমন পাঠ তেমন অভিনয়ই তো করতে হবে, ঠিকেদারি-আড়তদারি করতে গিয়ে স্বামীজি সাজলে তো চলে না। রূঢ় কথার চাষ দিয়েই তো ব্যবসাটা চলে। মোবাইলের এমাথা-ওমাথা ছুটে বেড়ায় শক্তিশেল তিরের মতো রূঢ় কথা। তারই ভয়ে একবেলায় পাঁচ বিঘে জমি রোওয়া হয়ে যায় অন্ধ্রপ্রদেশের মাটিতে। কোথায় সন্দেশখালি আর কোথায় বিজয়ওয়াড়া! ফোনে ফোনে কারবার, শব্দভেদী শক্তিশেল ছোটে এবেলা, ওবেলা।

যুগ বদলায়, রাজা বদলায়। সমাজ বদলায়, অর্থনীতি বদলায়। আজ যে রাজা কাল সে ফকির। এসব কথা সকলের জানা। শুনতে পাই মোগল সম্রাটের বংশধররা দক্ষিণ ভারতে কোথায় যেন দর্জির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। আবার টিপু সুলতানের বংশধররা খিদিরপুর কলকাতায় রিকশা চালান। হতে পারে। অসম্ভব কিছু নয়। চোখের সামনে কলকাতার জমিদারবাড়িগুলিই দেখুন না। জানবাজার কিংবা কৈলাস বোস স্ট্রিটের পেল্লায় পেল্লায় বাড়িগুলির কী ভগ্নদশা! অন্ধকার গলি ধরে ভিতরে ঢুকলে দেখা মেলে রুগণ, বিধ্বস্ত বংশধরদের। ওষুধ-পথ্য কেনার পয়সা নেই, জ্ঞাতিকলহে বাড়ি সারানোর উপায় নেই, আলো নেই, বাতাস নেই। চোখেমুখে শুধু সন্দেহ আর অবিশ্বাস। হিন্দুস্তানি ভাড়াটিয়ারা যা দু-চারশো ভাড়া দেয়, তা-ও জমা পড়ে কোট-কাছারিতে। দু’লক্ষ বিঘের জমিদারের চতুর্থ পুরুষ দুশো টাকার জন্য হাপিত্যেশ করে বসে থাকেন অন্ধকার সিঁড়ির দোরগোড়ায়। কেন এমন হয়? কীভাবে হয়? ধনী হওয়ার উপায় তো সবারই জানা। তা হলে? দেবেন মণ্ডলের চরিত্রটি পড়ে নিলেই বুঝতে পারবেন ধনী হওয়ার উপায়। এমনকী বাবরের চরিত্র, হায়দার আলির চরিত্র বুঝে নিলেও হবে। অথবা বুঝে নিতে পারেন কলকাতার বেনিয়াবাবুদের অনেকের উত্থানের কাহিনিও। মহারাজ দুর্গাচরণ লাহা, দিগম্বর মিত্র, মতিলাল শীল, কাশিমবাজারের কান্ত নন্দী, উত্তরপাড়ার জয়কৃষ্ণ মুখার্জী, জোড়াসাঁকোর দ্বারকানাথ ঠাকুর— আরও কত! এঁরা সব আধুনিক ইতিহাসের প্রথম যুগের ধনী মানুষ। বড় বড় মানুষ। অতি সাধারণ অবস্থা থেকে বড় মানুষ হয়েছিলেন। কিন্তু গরিব হওয়ার উপায় কী? গরিব হতে গেলে কী কী করণীয়? বেশ খানিকদিন ধরে ব্যাপারটি নিয়ে ভাবতে শুরু করেছি। ভাবতে ভাবতে বুঝতে পারলাম বিষয়টি সহজ নয়। ধরুন, স্বেচ্ছায় তো কেউ গরিব হতে চায় না। তার ওপর সবারই দুটো হাত, দুটো পা; চোখ-মুখ-কান-মাথা সবই আছে। বুদ্ধিও আছে কম-বেশি। তা হলে সমস্যাটা কোথায়? বিষয়টি গভীরভাবে বোঝার জন্য দেবেন মণ্ডলের এক নাতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম একদিন। মেজছেলের ছোটছেলে। নাম লাল্টু। বয়স বছর পঞ্চাশ। পরিযায়ী শ্রমিক। তবে পার্ট-টাইম রাজনীতিও করে। ভোটের আগে দায়িত্ব পালনের জন্য পাড়া ছেড়ে নড়ে না কোথাও। কিন্তু একটা বদনামি আছে। বছর কয়েক আগে ওর গোয়ালঘরের পিছনে বোমা বিস্ফোরণ হয়েছিল। দু’টি গোরু মরলেও মানুষের ক্ষতি হয়নি। পুলিশি ঝামেলা চলে অনেক। শেষে নেতা-মন্ত্রী ধরে নিস্তার মেলে। শোনা যায়, ভোটের আগে বিরুদ্ধ-পার্টিকে সায়েস্তা করার জন্য সে নিজেই বোমা আমদানি করে। কেউ কেউ বলে, লাল্টুর দুই ছেলেই বোমা বাঁধার ট্রেনিং নিয়ে এসেছিল। ব্লক স্তরের এক নেতা পূর্ণ সাহায্য করে তাদের। তা সে যাহোক গে। ও বিষয়টি আমার জানার কথা নয়, প্রসঙ্গও নয়। আমার দরকার, লাল্টুর জীবনের কথা। কীভাবে মরা গরিব হয়ে গেল সেই কথা। এত বড় পরিবারের ছেলে; সে কিনা আজ হাত পেতে ভিক্ষে নেওয়ার জন্য বসে থাকে! চিকিৎসা করার পয়সা নেই, খাবার সংস্থান নেই, সহায়-সম্বল কিচ্ছু নেই!

বছর পঁয়ত্রিশ আগের কথা। বাপ-ঠাকুর্দার আমলের মামলা টানতে টানতে লাল্টুর ভাগে তখনও বিঘে দশেক জমি ছিল। বড়বাড়ির ছেলে বলে বিয়েও হয়েছিল বড় ঘরে। চাষবাসের সঙ্গে একটা মুদি দোকান খুলে চলে যাচ্ছিল ভালই। কিন্তু ব্যবসা বাড়াতে গিয়ে বিপদ হয় লাল্টুর। প্রচুর ধারদেনায় জড়িয়েছিল। তার ওপর চোরাই মাল, মানে মদ-গাঁজা বেচতে গিয়ে ঝামেলায় পড়ে গেছে কয়েকবার। আরও কী সব গোপন ব্যাপার-স্যাপার নাকি ছিল। তবে সবচেয়ে ক্ষতি করেছে যেটা, সেটা হল জুয়া। রাতারাতি বড় লোক হবার নেশায় নিজের দোকানের মধ্যে জুয়ার ঠেক বসাত লাল্টু। ছেলেগুলিকে অবশ্য এসব থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। ভাল পরিবেশে মানুষের মতো মানুষ করতে চেয়েছিল। মেয়েদু’টিকে বাড়িতে রেখে ওদের পাঠিয়েছিল মিশনের হোস্টেলে। স্বামীজিদের কাছে। প্রচুর ব্যয় করত। কিন্তু সেই মিশন থেকে প্রায় সন্ন্যাসী জীবন নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল ছেলেদু’টি। নিরামিষ আহার, সকাল সন্ধে নাম সংকীর্তন, ধর্মগ্রন্থ পাঠ— এ সব ওদের ডেইলি রুটিনের মধ্যে ছিল। গ্রামের লোক অবশ্য ধন্য ধন্য করত। সকলে বলত, আহা! মানুষের মতো মানুষ হয়ে ফিরেছে ছেলেগুলি। কিন্তু বছর কয়েক যেতে না যেতেই ওরা সন্ন্যাসী ভাব পরিত্যাগ করে। নিরামিষ খেয়ে শরীর টিকছিল না নাকি। অতএব পাঁঠার মাংস, মুরগির মাংস, মাছ-কাঁকড়া— সব খেয়ে ঘাটতি পুষিয়ে নিল কয়েক মাসেই। তারপরে দুই ভাই কিনল দু’টি বাইক। সেই বাইকে পক্ষীরাজের মতো উড়তে উড়তে বছর খানেকের মধ্যে ঘরে নিয়ে এল রাঙা টুকটুকে বউ। আগুপিছু দু’জনেই। সুখের সংসার লাল্টুর। পুব দিকের বারান্দায় সকালের রোদ জেল্লা দিলে রাঙা বউদের গায়ের রং উছলে পড়ত। খিলখিল হাসি, কলকল কথা। পুকুরঘাট থেকে উঠোন কিংবা বারান্দা থেকে রান্নাঘর— সর্বত্রই ছাপিয়ে যেত সুখ। কিন্তু লাল্টুর সংসারে এই সুখও স্থায়ী হল না।

কাজকম্ম কিছু না থাকায় ছেলে দু’টি রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিল। সে-ও ভাল একটা ব্যাপার। নেতা-মন্ত্রীদের গায়ে গা ঠেকিয়ে ছবি, পঞ্চায়েতের বুথ এজেন্ট, ব্লকের কাউন্টিং এজেন্ট— এমনকি দু’-দশটা ছাপ্পা মারার ক্ষমতাও ছিল। এছাড়া চুপকে চুপকে লুকিয়ে থাকা বিরোধী পার্টির লোকজনদের নিখুঁতভাবে চিহ্নিত ক’রে অ্যাকশান গেম ব্যাপারটিও আয়ত্ত করেছিল ওরা। এগুলোতেও অবশ্য বিশেষ সমস্যা হয়নি। একটু নিন্দে-মন্দ হলেও সুখ কমেনি। অসুবিধাটা শুরু হল আরও কিছুদিন পরে। নেতাদের সঙ্গে ঘুরতে গেলে ‘মদ খাব না’ বললে তো চলে না। তার উপর ফ্রি পয়সার উদার মদ। দেশি সস্তা জিনিস নয়। ভাল ব্রান্ডের দামি জিনিস। ওই উদার মদে উদর ভরে মাঝে মাঝে বাড়ির পথ খুঁজে পেত না লাল্টুর ছেলেরা। বাইক নিয়ে মরা খালের কচুরিপানার মধ্যে ডুব মেরেও নিয়েছে কয়েকবার। সমস্যাটি এখান থেকে তৈরি হল। আয়-ইনকামের পথটা স্পষ্ট বুঝতে না পারায় রাঙা টুকটুকে বউমাদের মনে ঘোরতর অশান্তি দেখা দিল। তার ওপর মদের সঙ্গে মেয়েমানুষের যতই এক বেঞ্চের সখীভাব থাকুক বঙ্গদেশের ঘরণীরা এটা ভালভাবে নেয় না। লাল্টুর বড়ছেলের বউটা এই ফাঁক দিয়েই পালিয়ে গেছে। জানা গেল, হায়ার লেভেলের এক নেতার সঙ্গেই পালিয়েছে। মানে মিনি থেকে মেইন ধরেছে। ছোটছেলের বউটা আছে বটে, কিন্তু সে-ও না থাকার মতো। রুগণদশা। রোগব্যাধির খরচ জোগাতে নাজেহাল অবস্থা। তার ওপর লাল্টুর ছোটছেলে বেশ কয়েকটা পরকিয়া-টরকিয়াতেও নাকি জড়িয়েছে। সেখানেও ব্যয় আছে ভালই। মোট কথা, সংসারে শান্তি নেই লাল্টুর। ওর বউ অবশ্যি শান্তির জন্য ধর্মকর্মে মন দিয়েছে। কণ্ঠিমালা নিয়েছে, মালা জপ করে, তিলক কেটে সকাল-সন্ধ্যা নামগান গায়। কিন্তু শান্তি যেন কোথায় লুকিয়ে পড়েছে। লাল্টু এই অবস্থার মধ্যে পড়েই চেন্নাই-বেঙ্গালুরুতে কাজে যায়। পরিযায়ী শ্রমিক হয়েছে।

লাল্টুর পরিযায়ী শ্রমিক হওয়ার আরও কিছু অর্থনৈতিক কারণ অবশ্য আছে। লকডাউনেরও বেশ কয়েক বছর আগের কথা বলছি। ঋণের দায়ে জমিজমা বন্ধক পড়তে পড়তে বিঘে চারেকের চাষ ছিল। ওই জমির আয়ে সংসার চলত না। ফলে জমিগুলিকে ফিশারিবাবুদের হাতে লিজ দিয়ে অন্য কারবারে নেমেছিল। শোনা যায়, কলকাতায় সিকিউরিটি গার্ডের কাজ ধরেছিল খানিকদিন। সামাজিক পরিচয় চেপেচুপে চলে যাচ্ছিল কোনও মতে; কিন্তু সমস্যা বাধিয়ে দেয় বড়ছেলে। চিটফান্ডের এজেন্সি নিয়েছিল সে। সেই চিটফান্ড উঠে যেতে ঝাড়েমূলে সব গেছে। ফিশারি মালিকের কাছে জমিজমাটুকু বেচে হেটোমারের হাত থেকে বেঁচেছে কোনওরকমে। এখনও নাকি লোকে ওর কাছে টাকা পায়। দু-চারশো নয়; লাখ লাখ। হাইস্কুলে চাকরি দেবে বলেও নাকি টাকা তুলেছিল। এসব শোনা কথা। সত্যি কিনা বলতে পারব না। তবে এখন আর লাল্টুর বড়ছেলে রাজনীতি করে না। বেশ খানিকদিন এলাকা ছেড়ে কোথায় পলাতক ছিল। তারপর মাঝে মাঝে বাড়িতে দেখা যায় বটে; কিন্তু বিশেষ কারও সঙ্গে কথা বলে না। গেরুয়া নিয়েছে যে। নেড়ামাথায় লম্বা টিকি। তিলক, কণ্ঠিমালা, জপমালা, গীতা। ফুলটাইমার ধার্মিক। ছোট ছেলেটা অবশ্য পলিটিক্সেই আছে। সে-ও ফুলটাইমার। ফলে তাতে কিছু সুবিধেও হয়েছে। গত বছর পাকাবাড়ি ঢুকেছে দুটো। এক লাখ কুড়ি করে বাপের নামে একটা, ছেলের নামে একটা। সেই টাকায় ভিটের দুই মাথায় দুটো ভিত উঠেছে। কিন্তু সমস্যাটা হয়েছে কী, এক লাখ কুড়িতে তো মাটি ভেজে না এখন। ভিত উঠতে গিয়েই ফুরিয়ে গেছে সব। এবারে টান পড়ল লাল্টুর বউয়ের সোনাদানাটুকুতে। তাতেও অবশ্যি হল না। ঋণ-দেনা হল আরও এক কিস্তি। ইট-বালি-সিমেন্টের আড়ত খুলেছে অঞ্চলপ্রধানের হাজব্যান্ড। আয়রন রডের দোকান অবশ্য সমিতির এক নেতার শ্যালকের। অত্যন্ত ভাল মানুষ ওরা। ওরাই বাকি-জুকি দিয়েছে। তা, ধরুন দেওয়াল পর্যন্ত তুলতে লাখ চারেক। তারপর আবার লাল্টুর বউ হরিমন্দিরের বায়না করল; সেটাতেও লাখ খানেক গেছে। সব মিলে লাখ পাঁচেক। সবই বাকিতে। এখন লাল্টুর বয়স চুয়ান্ন। হাড়ে যা শক্তি অবশিষ্ট আছে, এই ঋণ শোধ করা অসম্ভব নয়। ইতিমধ্যে চেন্নাইয়ের কাজের পয়সায় অর্ধেক শোধ করেছে সে। এবার ইট-বালি-সিমেন্টের দোকানদার ছাদ ফেলার পরামর্শ দিয়েছে। ধার দিতে কোনও আপত্তি নেই তার। মানুষ ভাল। লাল্টুর বউ বলেছে, ‘এরপর আর পারবা না, টানে টানে কুরে নেও। পচা খড়ের চাল তে কেন্নো পড়ে দু’বেলা। ঘরডা কুরে নেও।’ কথাটা অযৌক্তিক কিছু বলেনি। খড়ের ছাউনির ঘর বাদ দিয়ে পাকাঘরে ছাদ ফেলতে শুরু করেছে লাল্টু। ওর ছোটছেলে অবশ্য ঝাঁ-চকচকে দু’তলা কমপ্লিট ক’রে ফেলেছে আগেই। কিন্তু সে এখন বাপের থেকে ভিন্ন। অতএব ওর ব্যাপারটা আলাদা। পার্টির ফুলটাইমার হিসেবে আয়-ইনকামের পথ আছে নিশ্চয়ই কোথাও। কিন্তু বউমা-শাশুড়ির সম্পর্কটা খারাপ হওয়ায় আড়াআড়ি ফাটল ধরেছে বাপ-ছেলের সম্পর্কতেও। আরও কী সব ব্যাপার আছে। ছেলের পথ এখন বাপের বাসঘরের পিছন দিয়ে। বাইকে যায়, বাইকে আসে। চোখাচোখিও হয় না।

মেয়েদু’টিকে বিয়ে দিতে বেগ পেতে হয়নি লাল্টুর। বছর তিনেক আগের কথা। একটা নাইন আর একটা ইলেভেন। এক পুজো থেকে আর এক পুজো আসতে না আসতেই দু’জনই পালিয়ে বিয়ে করেছে। বাবা থাকত না বাড়িতে, মা-ও না থাকার মতো। অতএব মেয়েরা পথ দেখে নিয়েছে। তা ভালই হয়েছে। কোনও পয়সাকড়ি লাগেনি তো কিছু। ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্য। কিন্তু সমস্যা বেধেছে এখন। সেই মেয়ের একজন ছেলে কোলে নিয়ে ফিরে এসেছে ঘরে। ওর বর গিয়েছিল নাসিকে ব্রিজের কাজে। ঠিকেদাররাই নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই ছেলে আর ঘরে ফেরেনি। জানা গেছে, সে নাকি আবার একজনকে বিয়ে করে হরিয়ানা সীমান্তে কোথায় পাথরখাদানে কাজ নিয়েছে। কী আর বলা যায়। খোঁজও করেনি লাল্টু। মন যার নড়ে গেছে তাকে খুঁজবে কোথায়? মানুষের পথটা যে এখন অনেক প্রসারিত হয়েছে। খোলাপথের খোলা মানুষ। গ্রাম-শহর সর্বত্র। পথ হারিয়ে ফেললে আর ঘরে ফেরার পথ মেলে না। লাল্টুর মেয়ে জেনে গেছে, ভালবাসা এখন ক্ষণস্থায়ী। পাখির মতো স্বাধীন। পরিযায়ী পথে ফাঁদে পড়লে ফেরে না আর কেউ। অতএব লাল্টুর সংসারে দায় বেড়েছে, ব্যয়ও বেড়েছে। ছোটছেলে এই দায় থেকে মুখ ঘুরিয়েছে। আবার বড়ছেলে বনেছে সাধু। অতএব সমস্ত দায় কাঁধে নিয়ে পরিযায়ী শ্রমিক হয়েছে সে।

লাল্টু যা টাকা পাঠায় তার অর্ধেক ঢোকে ইট-বালি-সিমেন্টের ঘরে, আর অর্ধেক আসে বউয়ের অ্যাকাউন্টে। ওর বউ সংসারের মঙ্গলকামনায় তুলসীগাছ বসিয়েছে মন্দিরের সামনে। সেখানে পাড়ার সাধু-গোঁসাইদের ডেকে হরিনাম সংকীর্তন করে প্রতি সন্ধ্যায়। চোখ জলে ভেসে যায়। ভিজে যায় আঁচল। কিন্তু ঈশ্বর যেন শুধুই পাথর। এত কান্নাকাটিতেও তার মন ভেজে না। কত লোকের ভাগ্যে কত অলৌকিক ভেলকি ঘটে যায়! রাতারাতি ভাগ্য ফেরে, শূন্য থেকে পূর্ণ হয়ে যায়; কিন্তু লাল্টুর সংসারের দিকে কিছুতেই যেন ঈশ্বরের চোখ পড়ে না। এর মধ্যে আবার খারাপ খবর এল। ভয়ানক খারাপ খবর। এক সপ্তাহের মধ্যে ষাট বিঘে জমিতে ধান রোওয়ার চুক্তি নিয়েছিল লাল্টুর দল। দশজন লেবার। সেই কাজ টেনে তুলতে কাহিল হয়ে গেছে সবাই। কিছুদিন আগে ফোন এসেছিল, লাল্টুর কোমর উঠছে না আর। হাসপাতালে ভর্তি করেছিল সঙ্গীরা; কিন্তু কোনও সুরাহা হয়নি। যন্ত্রণাটা কমানো গেলেও সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা একেবারেই নেই। ঠিকেদারবাবুরা উপকার করেছে। বিনে পয়সায় বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে লাল্টুকে। সঙ্গে ওর প্রাপ্য মজুরিটুকু। পঙ্গু, অকর্মণ্য হয়ে ঘরে ফিরে এসেছে সে। হাঁটার ক্ষমতা নেই, নিজের কাজ নিজে করার ক্ষমতা নেই। সারাদিন একদিকে কাত হয়ে শুয়ে থাকে। মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আর ঠাকুরকে ডাকে। খড়ের চালের নিচে লুকিয়ে থাকা কেন্নোর মতো হয়ে গেছে শরীরটা। কেন্নো তাড়াতে গিয়ে নিজেই সে আজ যেন কেন্নো। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে নিরন্তর। লাল্টুর মাথার উপর এখনও লাখ দুই ঋণ। তার ওপর যে পাকাঘরের জন্য এত ব্যয়, এত কষ্ট, সেই ঘরের একটা দিক বসে গেছে হঠাৎ। ফাটল নিয়েছে দেওয়ালের কোণ-বরাবর। রাতদিন এক বিছানায় শুয়ে থাকে সে। দেওয়াল ফাটলটি ক্রমশ বড় হয়ে এগিয়ে আসে ওর দিকে। বুক কেঁপে যায়। ভয় করে। এখনও কিছুটা ভয় আছে যে লাল্টুর। মেয়ের ঘরের নাতিটা খেলে বেড়ায় মাথার চারিপাশে। মাঝে মাঝেই মনে হয় দেওয়ালটা বোধহয় ভেঙে পড়বে। কী করবে সে? কীইবা করার আছে? এ তো আর মাটির ঘর নয়, যে দু’চাপ মাটি গেঁথে দিতে বলবে। এ যে পাকাঘর। এক ব্যাগ সিমেন্টের দাম সাড়ে চারশো টাকা, একটা ইটের দাম দশ থেকে বারো। অতএব লাল্টু শুকিয়ে শুকিয়ে আরও কেন্নো হতে থাকল ক্রমে। আর লাল্টুর বউ প্রতি সন্ধ্যায় হরিনাম ভাসিয়ে দিতে থাকল ভবনদীর এপার-ওপার। এ ঘাট থেকে কবে নৌকা ছাড়বে জানা নেই ওদের।

পাঠক, মার্জনা করবেন। প্রবন্ধ লেখার নাম করে গল্প শুনিয়ে গেলাম এতক্ষণ। এবার আসল কথায় আসি। লাল্টু যে এখন মরা গরিব এ বিষয়ে আর কারও সন্দেহ থাকার কথা নয়। লাল্টু কেন গরিব হয়েছে সেটাও নিশ্চয়ই এতক্ষণে অনুমান করতে পেরেছেন। আমাদের চারিপাশে এমনিভাবেই লাল্টুরা প্রতিক্ষণে নিজদের গরিব করে তোলে। নিজের গরিব হওয়ার পথ নিজে প্রস্তুত করে। কিন্তু এখানে প্রশ্ন যে, রাষ্ট্রের কি এখানে কোনও ভূমিকা নেই? রাষ্ট্র কি পারে না মানুষের অবস্থা বুঝে, অর্থনীতি বুঝে, উন্নয়নের ভাবনা ভাবতে? ধরুন, যে এলাকার মানুষের আয়-ইনকামের কোনও পথ নেই, সেই এলাকায় বিশ্বায়িত বাজারের দরজা খুলে দিলে কী কী হতে পারে রাষ্ট্র কি অনুমান করতে পারে না? যাদের নিজের শরীর ছাড়া বেচার কিছু নেই, খোলাবাজারের বিরাট ময়দানে তারা কী বেচবে? কোকাকোলা, সেভেনআপ, দামি মদ, ফর্সা হওয়ার প্রসাধনী, দামি মোবাইল, দামি বাইক সবই তো এখন অভাবের তালিকায়। আগের মতো খাওয়া-পরার অভাব নিয়ে পড়ে নেই তো মানুষ। সোশ্যাল মিডিয়া প্রতি মুহূর্তে এই অভাবগুলিকে নির্মাণ করে দিচ্ছে প্রান্তবাসী প্রতিটি মানুষের মনে। এই অবস্থায় যার কিছু আয় নেই, সে কী করবে? চার বিঘে জমির আয়ে কি বাইক কেনা যায়, নাকি পাকাঘরের ছাদ তোলা যায়? কিছুই হয় না। সপ্তাহের তেল-ডাল-মশলার হাট-বাজারটুকুও জমি থেকে হয় না; ছেলেমেয়ের পড়াশুনার খরচ তো দূর অস্ত্। অতএব মানুষকে পরিযায়ী শ্রমিক হতে হয়েছে। রাজা হরিশ্চন্দ্রের মতো শেষ পর্যন্ত নিজেকে বেচতে হয়েছে, স্ত্রী-পুত্রকেও। দেখে আসুন চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, ভাইজাগ। দেখবেন, কীভাবে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার কৃষিজীবীরা শ্রমিক জীবনের নামে বিক্রি হয়েছে ঠিকেদার-কন্ট্রাক্টরদের কাছে। ক্রীতদাসের জীবন থেকে সেই বেঁচে থাকার পার্থক্য খুব বেশি নয়। এক কামরার ঘরে ষোলোজন-আঠারোজন আড়ে লম্বায় পড়ে থাকে। মাথার উপর পাকাবাড়ির দেনা, ছেলের বাইক কেনার দেনা, মেয়ের টিউশনের দেনা, স্বপ্ন দেখার দেনা। খাওয়া-থাকার ব্যয় বাড়ালে চলে না তো। এককালে পর্তুগিজ-মগরা আমাদের নিম্নবঙ্গ থেকে দাস সংগ্রহ করত মালয়-বার্মাতে শ্রমিকের কাজের জন্য, ইংরেজ সাহেবরাও কিনত গোলাম। আজ আবার মানুষ সস্তা হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসকের দরকার নেই। খোলাবাজারে নিজেরাই নিজেদের কিনছে দেশের মানুষ। মানুষ বিক্রির মেলা বসে এখন গ্রামগঞ্জের হাটে হাটে।

মানুষ যে গরিব হয়, বা নিজেকে গরিব করে তোলে, সে তার জীবন-দর্শনের পরিণতি। সময়কে না বোঝার অজ্ঞানতা, সংকীর্ণতা, অকর্মণ্যতা, অসততা আয়ত্ত করতে পারলেই মানুষ সহজে গরিব হতে পারে।  এইখানে দেবত্ব এবং দানবত্বের পার্থক্যটি তুলে ধরা যায়। সমসময়ের বুকে স্বার্থপর সৌধ এবং ভোগের প্রসাদ সাজিয়ে দানবত্ব প্রকাশিত হয়। কিন্তু দেবত্ব সাধনা করে সমসময় পেরিয়ে অনন্তের। দূরদর্শিতার অভাব থেকেই মানুষ সময়ের বুকে দানব হতে চায়, অসুর হয়ে ওঠে, দেবত্বের পথ ভুলে যায়। এইখানেই গরিব হওয়ার বীজ লুকিয়ে থাকে। অনেকে ভাবেন, অসৎ উপায়ে বড়লোক হয়ে ওঠা যায়, দেবত্বও মেলে। দু-পাঁচ বছরের মধ্যে কোটিপতি হয়ে ময়দানবের মতো বিরাট প্রাসাদ নির্মাণ করা যায়, সুখের বন্যা বইয়ে দেওয়া যায়। চোখ-কান খোলা রাখলে চারিদিকেই এখন এসব দেখতে পাবেন। কিন্তু, ভাল করে ভেবে দেখবেন, ওইসব অট্টালিকার মধ্যে যেগুলি হারিয়ে যাচ্ছে, সেগুলি হল মনুষ্যত্ব, সততা এবং কর্মক্ষমতা। আগামী প্রজন্মের সুখ-সমৃদ্ধি কিনে দিতে চায় ওরা টাকা দিয়ে; প্রকৃত শিক্ষা দিয়ে নয়। ওরা ভুলে গেছে মানুষ অমর নয়, সব ছেড়ে চলে যেতে হবে একদিন। ওরা মনে করে, ভোগের বন্যাই সুখ, জীবনের সার্থকতা পার্থিব ভোগে।  কিন্তু এইখানেই দারিদ্রের সূত্রগুলি লুকিয়ে আছে। ভোগের মধ্যেই বিষ লুকিয়ে থাকে যে। সেই বিষ জন্ম দেয় কর্মবিমুখতা এবং অসততা। সময়ান্তরে এগুলিই দারিদ্রের আসল কারণ হয়ে ওঠে। দেবেন মণ্ডলের পাঁচশো বিঘেও টেকেনি, অসৎ জমিদারদের রাজত্বও টেকেনি। অথচ সেদিনের সেই মধ্যবিত্ত, বর্গাদার, ক্ষুদ্রচাষি, উদ্বাস্তু গরিবরা চিরকাল গরিব থাকেনি। জীবন সংগ্রাম তাঁদের উত্থানের পথ শিখিয়ে দিয়েছিল। সেই পথের নাম শিক্ষা। কর্মতৎপরতা, সততা এবং নিষ্ঠার শিক্ষা। সেই শিক্ষায় ভর করে তাঁদের সন্তান-সন্ততিরা গত শতকের শেষ পর্বে বঙ্গসমাজের ভগীরথ হয়েছিলেন। শিক্ষা-সংস্কৃতির অঙ্গনে আজও যে ক’জন আলো হাতে ঘোরেন, সাহিত্য-বিজ্ঞানের পথে আজও যে ক’জন আলো দেখান, সে তো তাঁরাই।

গরিব হওয়ার পথ আছে আরও অনেক। কিন্তু সে সব বলতে গেলে পাতা ভারী হবে আরও। অতএব এ পর্বে এখানেই শেষ করব। তবে শেষ করার আগে বলব, আমাদের প্রতিবেশী এক মুদি দোকানদারের কথা। বউ-মেয়েকে দোকানে বসিয়ে নিজে সারাদিন ক্লাবে গিয়ে তাস খেলত। জিনিসের দাম বেশি নিত ওর বউ-মেয়ে। মানুষের সঙ্গে ব্যবহার খারাপ করত। অভিযোগ আরও অনেক। ওজনে কম দেওয়া, খারাপ মাল দেওয়া— পাড়ার খরিদ্দাররা তিতি-বিরক্ত একেবারে। এরই মধ্যে এক অবাঙালি ভদ্রলোক ফ্ল্যাটবাড়ির নিচে খুলে দিলেন শপিং মলের আদলে এক ‘গ্রোসারি শপ’। ব্যাস! পাড়ার সব লোক এখন সেখানে। চকচকে মাল, ন্যায্য দাম। তার সঙ্গে একেবারে ফ্রিতে সুমিষ্ট হাসি এবং সুমিষ্ট ব্যবহার। সদ্য বছরের মধ্যে ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেছে সেই ভদ্রলোকের। কিন্তু পুরনো সেই দোকানটির অবস্থা এখন কাহিল। রকমারি মাল এনে বাঁচানোর চেষ্টা হয়েছিল বটে। গালাগালি, ঝগড়া, বদনাম— সব চেষ্টাই হয়েছিল। কিন্তু কাজ হয়নি। এখন প্রোমোটারের কাছে দোকান সমেত গোটা বাড়িটা তুলে দিয়ে এক-দেড়খানা ফ্ল্যাট ভাগে পাওয়ার আশায় আছে। কিন্তু ভাঙনকূলে যতই বোল্ডার ফেলুন, কংক্রিট ঢালাই দিন, বৃক্ষরোপণ করুন, ভাঙন রদ করা যায় না। নির্মাণের গোড়ায় গলদ থাকলে তার পতন অবশ্যম্ভাবী। সময়ের অপেক্ষা মাত্র। মানুষের ক্ষেত্রেও তাই হয়। মনুষ্যত্ব নির্মাণে, ব্যক্তিত্ব নির্মাণে, সমাজের দর্শন নির্মাণে যদি ভুল থেকে যায়, অন্যায় থেকে যায়, টাকা দিয়ে সুখ কিনে দেওয়া যায় না। সমৃদ্ধিও না, শান্তিও না। চালাকির পথ এবং সোজা পথের মধ্যে পার্থক্য আছে, থাকবে। সে পার্থক্য বোঝা যায় ফুলে, ফলে। জীবনের শেষে যে মার্কশিট হাতে আসে তার ফলাফলে। এইখানে একটিই সমাধানের পথ ছিল আমাদের। সেটি হল শিক্ষা। প্রকৃত শিক্ষা। পরাধীন দেশের ফাঁদে পড়ে অনেকটা পিছিয়ে ছিলাম আমরা। কিন্তু পিছিয়ে শুরু করেও গত শতকের শেষ পর্ব পর্যন্ত এগিয়েছিলাম অনেক। গ্রামগঞ্জে নানা ধারার আলো ছড়িয়েছিল সেই পথে। উনিশ শতকের অসম্পূর্ণ নবজাগরণ সম্পূর্ণতার পথে ছুটে চলেছিল অশ্বমেধের তুরঙ্গের মতো। কুসংস্কার, অন্ধ বিশ্বাস, অযুক্তি, অসততা বিপদে পড়ে গিয়েছিল দিকে দিকে। কিন্তু একুশ শতকের চার আনা পথ এগিয়ে আমরা বুঝতে পারলাম, ওরা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে, সম্মিলিত হয়েছে। নবজাগরণের সেই তুরঙ্গটিকে বন্দি করেছে ওরা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে শুকিয়ে দিয়েছে। বন্দি করেছে ক্লাবগুলিকে, খেলার মাঠকে, যুবচেতনাকে। যূপকাষ্ঠে চড়িয়েছে যুক্তিকে, সৎ-জ্ঞানকে, সততাকে, নীতিবোধকে। জানি, রাজা আদেশ ফিরিয়ে না নিলে এ মৃত্যুদণ্ড রদ হবে না আর। ঘাতকের শাণিত খড়্গ উদ্যত হয়ে আছে। কিন্তু এই দণ্ড কি মেনে নেওয়া যায়? কী করবেন এখন? কী ভাবছেন?

চিত্রণ: গুগল

9 Responses

  1. Pingback: viagra generique
  2. Pingback: finasteride
  3. Pingback: udenafil tablet

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × three =

Recent Posts

কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইসলাম

হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি ‌বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের‌ সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়‌ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধ: অন্ধকারে আলোর দিশারী

তিনি বলেন গেছেন, হিংসা দিয়ে হিংসাকে জয় করা যায় না, তাকে জয় করতে প্রেম ও ভালবাসা দিয়ে। মৈত্রী ও করুণা— এই দুটি ছিল তাঁর আয়ুধ, মানুষের প্রতি ভালবাসার, সহযোগিতার, বিশ্বপ্রেমের। তাই তো তাঁর অহিংসার আহ্বান ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে,— চীন, জাপান, মায়ানমার, তিব্বত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটানে। এই বাংলায় যে পালযুগ, তা চিহ্নিত হয়ে আছে বৌদ্ধযুগ-রূপে। সুদীর্ঘ পাঁচ শতাব্দী ধরে সমগ্র বাংলা বুদ্ধ-অনুশাসিত ছিল। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ বৌদ্ধ কবিদের দ্বারাই রচিত হয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

স্যার রোনাল্ড রস, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য

রোনাল্ড রসকে তাঁর গবেষণার সহায়তাকারী এক বিস্মৃত বাঙালি বিজ্ঞানীর নাম কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৭-১৯২৯)। তাঁর অবদান কিন্তু খুব কম নয়। তিনি ছিলেন রস-এর অধীনে সহ-গবেষক। রস নোবেল পেলে উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর নেতৃত্বে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, শিবনাথ শাস্ত্রী, আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ কিশোরীনাথের ভূমিকার বিষয়টি বড়লাট লর্ড কার্জনকে জানান। কার্জন এ-বিষয়টি ব্রিটিশ সরকারের গোচরে আনেন। এর ফলে ১৯০৩ সালে যখন দিল্লিতে দরবার বসে, তখন ডিউক অফ কনট-এর মাধ্যমে কিশোরীনাথকে ব্রিটিশরাজ সপ্তম এড‌ওয়ার্ড-এর তরফ থেকে স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। পরে কলকাতা
র সেনেট হলে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সভাপতি ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ।

Read More »
গৌতম চক্রবর্তী

দুই হুজুরের গপ্পো

১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই, আলবার্ট আইনস্টাইন বার্লিনের উপকণ্ঠে নিজের বাড়িতে স্বাগত জানান ভারতীয় কবি, দার্শনিক ও সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। তিনি ছিলেন প্রথম অ-ইউরোপীয় নোবেল বিজয়ী। তাঁদের এই সাক্ষাৎকারটি ইতিহাসের অন্যতম বুদ্ধিদীপ্ত ও মননশীল আলাপচারিতায় পরিণত হয়, যেখানে তাঁরা বিজ্ঞান ও ধর্মের চিরন্তন দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করেন। “সায়েন্স অ্যান্ড দ্য ইন্ডিয়ান ট্রাডিশন: হোয়েন আইনস্টাইন মেট টেগোর” গ্রন্থে এই ঐতিহাসিক সাক্ষাতের বিবরণ পাওয়া যায়। এই বইতে বিশ শতকের শুরুতে ভারতের বৌদ্ধিক পুনর্জাগরণ এবং ভারতীয় ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক চিন্তার মেলবন্ধন তুলে ধরা হয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

শতবর্ষী বাঙালি

বাঙালিদের মধ্যেও শতায়ু লোক নেহাত কম নেই। একটা কথা মনে রাখা জরুরি, বিখ্যাত ব্যক্তি ছাড়া সাধারণ মানুষের আয়ু নিয়ে বিশেষ কোনও গবেষণা থাকে না। আবার একটু বেশি বয়স্ক মানুষকে শতায়ু বলে চালিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ-ও রয়েছে। তবে শতবর্ষের আয়ুলাভ যে মানুষের কাঙ্ক্ষিত, তা উপনিষদের‌ একটি বাক্যে সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে— ‘জীবেম শরদঃ শতম্’, অর্থাৎ শতবর্ষ বাঁচতে ইচ্ছে করবে। কেবল অলস জীবন নিয়ে বাঁচবার ইচ্ছে করলেই হবে না, কর্ম করে বাঁচার কথাও বলা হয়েছে সেখানে— ‘কুর্বেন্নেবেহ কর্মাণি জিজীবিষেচ্ছতম্ সমাঃ’।

Read More »