Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার…

রবীন্দ্রনাথের ‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থের ‘সবলা’ নামে এই কবিতাটি নারী-স্বাতন্ত্র্যের দিকচিহ্ন হয়ে আছে। এমন নয় যে, নারী নিয়ে এহেন‌ উচ্চারণ এই প্রথম।
সুদূর প্রাচীন কাল থেকেই ভারতে নারীকে মর্যাদা, শিক্ষা, সমানাধিকার, স্বাতন্ত্র্য এমনকী কোথাও কোথাও পুরুষের চেয়েও সম্মান দিয়েছে সমাজ। যাজ্ঞবল্ক্যের সঙ্গে তর্কে সবাই পরাজিত হলে গার্গী যে এগিয়ে এসেছিলেন তাঁর সঙ্গে তর্কযুদ্ধে, তাতেই প্রমাণ, নারীর স্থান সে-যুগে কতখানি উচ্চে নির্মিত ছিল। নারী শিক্ষালাভ করতেন, উপনয়ন হত তাঁদের। বেদরচনায় নারীর-ও ভূমিকা ছিল। অমৃতত্ব-ই যে মানুষের শেষ লক্ষ্য, সাধারণ ভোগীজীবন নয়, তা উচ্চারিত হয়েছিল মৈত্রেয়ীর মতো এক নারীর-ই কণ্ঠে। কেনোপনিষদ দেখিয়েছে, পৃথিবীর যাবতীয় শক্তির উৎস পুরুষ নয়, নারী। ঘোষা, অপালা, শাশ্বতী, বাক্-সহ বহু নারী মন্ত্র রচনা করেছেন। তাঁদের রচনা দু’খণ্ডে অনুবাদ করেছেন ড. রমা চৌধুরী।
পরবর্তীকালে পুরুষতান্ত্রিক ব্রাহ্মণ্য সমাজ নারীর অধিকার খর্ব করে।
নারী গৃহ সামলাতেন, বাহির-ও। আরও অবাক করা তথ্য, সে-যুগে নারী যুদ্ধেও যেতেন। রোমান লেখক কার্টিয়াস-এর লেখায় আছে যুদ্ধরত ভারতীয় নারীদের কথা। পতঞ্জলির বর্ণনাতেও অস্ত্রধারিণী নারীর কথা আছে,— ‘শক্তিকী’ বলা হত যাঁদের।
বৌদ্ধ যুগ ফের নারীর মর্যাদা ফিরিয়ে আনে। বৌদ্ধ ভিক্ষুণীরা ছিলেন শিক্ষিতা। তাঁরা পুরুষদের মতোই সাহিত্যচর্চা করতেন। তাঁদের লেখা কবিতার সংকলন পাই ‘থেরীগাথা’-য়।
তিয়াত্তর জন কবয়িত্রী স্থান পেয়েছেন সেখানে। সে-যুগের তুলনায় সংখ্যাটা নেহাত কম নয়। পণ্ডিতদের মতে, এই সংকলনটি বিশ্বের প্রথমতম সাহিত্য সংকলন, যেখানে শ্রদ্ধা, সুমেধা, উত্তরা প্রমুখ নারীর মনের নিভৃত কারুবাসনা স্থান পেয়েছে।
উত্তর ভারতে বেদরচনার সমকালে দক্ষিণ ভারতে তামিল ভাষায় রচিত হচ্ছিল সঙ্গমসাহিত্য। এখানেও বেশ কয়েকজন কবিকে পাই আমরা, যাঁরা ছিলেন নারী। তাঁরা হলেন অউভাইয়র, কাবেরী, ইয়ারপাল, নাক্কিনাইয়ার।
কিন্তু পরবর্তীকালে মনু-পরাশর-বৃহস্পতি-কৌটিল্যদের অনুশাসন এসে নারী প্রগতির রাশ টেনে ধরল। নারীর শিক্ষালাভের ইতি ঘটল, অন্তঃপুরে বাস নির্দিষ্ট হল তাঁর জন্য। তাঁকে বাঁধা হল একের পর এক অনুশাসনে। বলা হল, স্বাধীনতা বলে কোনও পদার্থ থাকবে না তাঁর, ‘ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি’! কুমারী অবস্থায় পিতা-মাতার অধীন থাকবে সে, বিয়ের পর স্বামীর, বার্ধক্যে সন্তানের। ধাপে ধাপে তাঁর ওপর চাপানো হতে লাগল কঠিন, কঠিনতর, কঠিনতম শাস্তি। সতীদাহের মতো নির্মম নিষ্ঠুরতার শিকার হন নারী। আছে বৈধব্যের কঠোর নিয়মাবলি। কৌলিন্যপ্রথা এসে নারীকে অবমানবীর পর্যায়ে দাঁড় করিয়ে দিল। তাছাড়া পুরুষের অর্থহীন গন্ডায় গন্ডায় বিয়ে, এর মতো কুৎসিত প্রথার বিরুদ্ধতা দেখাল না কেউ। দেখিয়েছিলেন বীরসিংহের সেই সিংহশিশু। কিন্তু বিধবা বিবাহের মতো তিনি বহুবিবাহ আইন পাশ করাতে পারেননি।
কেবল কি তাই? ইতিহাস নারীর অবদানকে সযত্নে পাশ কাটিয়ে যেতে পারল। আজ যখন আমরা বাংলায় উনিশ শতকের নবজাগরণের কথা পড়ি, দেখতে পাই, কোনও পর্যায়েই সেখানে নারীর ভূমিকা নিয়ে বিশেষ কিছু বলা হয়নি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তো প্রথম আত্মজীবনীকার রাসসুন্দরীর নাম উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা থাকবে! আছে কি? রামমোহনের যুগে দুই নারী, হটী ও হটু বিদ্যালঙ্কার যে শিক্ষাসত্র খুলে ছাত্র পড়াচ্ছেন, তাঁর শ্রদ্ধেয় বার্তাটি নেই কোথাও।
স্বাধীনতা আন্দোলনেও নারীদের অবদান উপেক্ষিত। প্রান্তিক অবস্থানে রাখা হয়েছে তাঁদের। মাতঙ্গিনী হাজরা, প্রীতিলতা-কল্পনা-শান্তিদের নাম পাদপূরণের মতো থাকলেও সেখানে মুসলিম নারীদের নামোচ্চারণ একেবারেই করা হয় না। অথচ খিলাফত আন্দোলনের সময় আবাদী বানো বেগম হাল ধরেছিলেন নিজের অলঙ্কার বিক্রি করে দিয়ে গণসংগঠনের। তেমনি অসহযোগ আন্দোলনের পর্যায়ে ভূমিকা পালন করেন বেগম হজরত মহল। তাঁর সঙ্গে এ আন্দোলনে যুক্ত বিয়াম্মা সাফিয়া খাতুন নামটিও শ্রদ্ধার সঙ্গে যুক্ত হওয়া উচিত ছিল। যেমন উচিত অরুণা আসফ আলির নামটিও। তাছাড়া আমরা ক’জন মীরা আর্যাকে চিনি? আজাদ হিন্দ বাহিনীর এই গুপ্তচর যখন জানতে পারেন, তাঁর স্বামী নেতাজিকে হত্যা করবেন ব্রিটিশের পরামর্শে, তখন নিজ হাতে তাকে মেরে ফেলতে বাধেনি তাঁর। এজন্য আন্দামানে যেতে হয়েছিল তাঁকে। এমনকী তাঁর স্তন পর্যন্ত কেটে ফেলার আদেশ দেয় বর্বর ব্রিটিশ সরকার।
অন্দরের অবরোধ ভাঙা শুরুও হয়ে গেছে এ-সময়, ওই নারীকে আপন ভাগ্য জয় করার অভীপ্সায়। রানি রাসমণি, নবাব ফয়জুন্নেসা, বেগম রোকেয়া। কাদম্বিনী গাঙ্গুলি, অবলা বসু, নটী বিনোদিনী। সারদাদেবী, নিবেদিতা, ফাতিমা শেখ (প্রথম নারী শিক্ষক)। ঠাকুরবাড়িতে জ্ঞানদানন্দিনী লেখালেখি করছেন, করছেন পত্রিকা সম্পাদনা, একাই পুত্রকন্যা নিয়ে জাহাজে পাড়ি জমাচ্ছেন বিলেতে। তাঁর কন্যা ইন্দিরা-ও উচ্চশিক্ষিতা, ফরাসি-জানা মেয়ে। সে-বাড়ির মেয়ে স্বর্ণকুমারী দেবী আর এক উজ্জ্বল ও সম্ভ্রান্ত নাম। এবং তাঁর মেয়ে সরলা দেবী তো অগ্নিশিখা! রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনীও স্কুলে যাচ্ছেন, রামায়ণ অনুবাদে রত থেকেছেন। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের হাত দিয়েই আমরা প্রতিবাদী নারীচরিত্র পাচ্ছি, যেমন, ‘স্ত্রীর পত্র’-তে মৃণাল, ‘গোরা’-তে ললিতা। চিত্রাঙ্গদা।
তবে বেদনাও আছে ঢের। কবি তাঁর তিন মেয়েকেই অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দিলেন, যে কারণে শান্তিনিকেতন তাঁদের কারও কাছেই ‘সব হতে আপন’ হতে পারল না!
কবি একদিকে নতুন যুগের ভোর আনছেন নন্দিনী, সুধা, লাবণ্য, এলা, চন্দরা (‘শাস্তি’) সোহিনী, দামিনী, শ্রীমতী, বিনোদিনীদের মধ্য দিয়ে। তারা সরিয়ে দিচ্ছে নিরুপমার নিরুপায়তা, কাদম্বিনীর অসহায় ও মর্মন্তুদ আর্তি (তাকে মরে প্রমাণ করতে হয়েছিল ‘যে সে মরে নাই’), সুভা (‘সুভা’ লিখলেন যিনি, পরবর্তীকালে তিনিই পরিচিত হয়েছিলেন ভাগ্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হেলেন কেলারের সঙ্গে, তাঁকে শুনিয়েছিলেন গান!), ‘সাধারণ মেয়ে’, বা ‘রাজর্ষি’ উপন্যাসের হাসি, ‘নৌকাডুবি’-র হেমনলিনী আর ‘চিরকুমার সভা’ নাটকের অতি শীতল শৈলবালা (বিধবা শৈলবালা বনাম দামিনী ও বিনোদিনী, কী তুমুল বিষম মেরুর!), কুমুর প্রতিকূলতাকে। আমরা বলতেই পারি, ‘আলো ক্রমে আসিতেছে’। এই আলোর পথ ধরেই সাহিত্য ও বাস্তবতা, উভয় পক্ষের যোগসাজশে নারীর স্বমহিম আত্মপ্রকাশ ঘটবে।
রবীন্দ্রনাথ সম্ভবত নারীর মর্যাদা ও মাহাত্ম্য সর্বোপরি তুলে ধরেছেন তাঁর ‘চিত্রাঙ্গদা’-য়, যেখানে দেবী ও সামান্যা নারী, এই দুটি পদবির কোনও পদবিতেই আরূঢ়া হওয়ার বাসনা নেই তার। আছে এই ঘোষণা, ‘যদি পার্শ্বে রাখো মোরে/ সঙ্কটে সম্পদে/ সম্মতি দাও যদি কঠিন ব্রতে/ সহায় হতে/ পাবে তুমি চিনিতে মোরে’।
এ হচ্ছে আজকের ও শাশ্বত সময়ের নারীপ্রতিমা। অর্ধেক আকাশ।
আরও এক চিত্রাঙ্গদাও আছে। সমীহা আদায় করার মতো। শেক্সপিয়ারের ‘দি মার্চেন্ট অফ ভেনিস’-এর পোর্শিয়া যেন সে। মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ’ কাব্যে রাবণপত্নী চিত্রাঙ্গদা। বীরবাহুর মা। পুত্রশোকে আকুল চিত্রাঙ্গদা কিন্তু রাবণের সীতাহরণকে সমালোচনা করেছেন নিশ্ছিদ্র যুক্তির মাধ্যমে, যে যুক্তিবোধ বাঙালি রমণীর-ই নয় কেবল, রমণীমাত্রের-ই সহজাত। চিত্রাঙ্গদা রাবণকে বলছেন, ‘—কোথা লঙ্কা তব;/ কোথা সে অযোধ্যাপুরী? কিসের কারণে/ কোন্ লোভে, কহ রাজা, এসেছে এ দেশে/ রাঘব? এ স্বর্ণলঙ্কা দেবেন্দ্রবাঞ্ছিত/ অতুল ভবমণ্ডলে; ইহার চৌদিকে/ রজতপ্রাচীর সম শোভেন জলদি।/ শুনেছি সরযূতীরে বসতি তাহার—/ ক্ষুদ্র নর। তব হৈম সিংহাসন আশে/ যুঝিছে কি দাশরথি? বামন হইয়া/ কে চাহে ধরিতে চাঁদে? তবে দেশরিপু তারে কেন বল, বলি?’
তা হলে ঠিক কী কারণে রামের লঙ্কা-অভিযান? এর সহজ সত্যটি মধুসূদন চিত্রাঙ্গদার মুখ দিয়ে বলালেন, ‘কাকোদর সদা নম্রশিরঃ, কিন্তু তারে প্রহরয়ে যদি/ ঊর্ধ্বফণা ফণী দঙশে প্রহরকে।’
নারীরা যে কেবল ভারতে তথা প্রাচ্যের (পার্ল এস বাক তাঁর ‘The Good Earth’ উপন্যাসে চীনা নারীদের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন। জাপানি লেখিকা মিয়াকো কাওয়াকিমির উপন্যাস ‘Earthlings’ বা মায়ানমারের বো থেক ঠোন-রচিত ‘Broken Dreams’-এর পাঠক তা জানেন। উদাহরণ আরও আছে) সমাজেই পুরুষতন্ত্রের শিকার ছিল তা কিন্তু নয়। পাশ্চাত্যের দিকটিও নারীর পক্ষে সমান অমর্যাদাকর ছিল। ১৮ শতকে মারি ওলস্টোনক্রাফট তাঁর ভুবনবিখ্যাত গ্রন্থ ‘A Vindication of the Rights of Woman’ লিখে সমগ্র ইয়োরোপ-আমেরিকায় বজ্রপাত ঘটালেন। সালটা ১৭৯২। জন্ম হল নারীবাদী সংগঠন ও আন্দোলনের, কবি শেলীর ভাষায় বললে, If winter comes, can spring be far behind’? ওলস্টোনক্রাফট দেখা দিলেন winter হয়ে। প্রসঙ্গত, শেলী আবার ছিলেন এই ওলস্টোনক্রাফ্ট-এরই জামাতা!
এই পথেই এলেন সিমোন দ্য বোভোয়া, মুক্তচিন্তক এক ফরাসি নারী, ১৯৪৯-এ যার ‘The Second Sex’ একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ, যাকে নারীমুক্তিচিন্তার টেস্টামেন্ট বলে ধরা হয়। তাছাড়া এ-পর্যায়ে বোভোয়ার ঢের আগে, সেই ১৮৬৯-এ জন স্টুয়ার্ট মিল লিখেছিলেন ‘The Subjection of Women’, যেখানে এক পুরুষ সহযোদ্ধা হলেন নারীমুক্তির। এর আগে-পরে এলেন এলিজাবেথ ক্যান্ডি স্টানটন, সুসান সি এন্টনি, গ্লোরিয়াস স্টেইনেম, সেনেকা ফলস, আবিগেল এডামস, মার্সি ওটিস প্রমুখ। ‘Feminism’ কথাটির জন্ম হয় এসময়, যার তিনটি স্তর। প্রথম স্তরে গুরুত্ব পেল নারী ভোটাধিকার। এ আন্দোলনের পেছনে নেদারল্যান্ডের উইলহেলমিনা ড্রুকারের ভূমিকা অপরিসীম। ১৯১৮-তে ব্রিটেন ও পরের বছর আমেরিকায় অর্জিত হল তা। এর ফলে দ্বিতীয় নারী মুক্তি আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে। একে বলা হয় দ্বিতীয় স্তর। তৃতীয় স্তরকে অভিহিত করা হয় ‘Extension of Gender Dissemination’ হিশেবে। ওলস্টোনক্রাফটের বার্তাটি ক্রমেই অর্থবহ হয়ে উঠল এর ফলে,— ‘I do earnestly wish to see the distinction of sex confounded in society’.
নারীমুক্তির সঙ্গে সমান্তরালভাবে যুক্ত আমেরিকায় প্রচলিত দাসব্যবসা। তাতেও কুঠার হানলেন এক নারী,— হ্যারিয়েট বিচার স্টো। তাঁর ‘Uncle Tom’s Cabin’ গদ্যে রচিত এক মরমী ও মর্মান্তিক কাব্য, যা অন্তিমে আব্রাহাম লিংকনের মাধ্যমে দাস ব্যবসাকে আমেরিকা থেকে চিরতরে উন্মূল করায়। অবশ্য তা লিঙ্কনের প্রাণের বিনিময়ে। আর পৃথিবীতে আরও একটি অমর অধ্যায় রচিত হল আমেরিকাতেই, ১৯১২-তে। তা-ও এক নারীর হাত ধরে, হ্যারিয়েট। রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দ, দুই যুগপুরুষ অন্বিত তার সূত্রে। শিকাগো ধর্মমহাসভায় স্বামীজীর ঐতিহাসিক বক্তৃতা শুনেছিলেন তিনি। আর তাঁর পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যাতেই স্থান দিয়েছিলেন ‘Song Offerings’-এর কয়েকটি কবিতা, কবির নোবেল পাওয়ার আগেই। হ্যাঁ, ‘Poetry’ পত্রিকার আত্মপ্রকাশ তাঁর হাত ধরেই।
বোভোয়া জা পল সার্ত্রের সঙ্গে কাটান আজীবন। সহবাস ঘটাতে বিবাহিত হতে হয়নি দুজনের। আজকের দিনে একেই বলে ‘Live together’। এর বহু আগেই মাইকেল মধুসূদন এ কাজ করে গেছেন। রেবেকার সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয়নি মধুসূদনের। তাই হেনরিয়েটার সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল আদপেই ‘extra marital’। সেযুগে! ভাবা যায়? কেবল মধুসূদনের আধুনিক মন-ই যে এর পেছনে কার্যকর ছিল তা নয়, এতে হেনরিয়েটার-ও দুঃসাহস ও উদার মানসিকতা প্রমাণিত হয়েছে। এবং তা আরও বেশি করে।
অন্যদিকে মধুসূদনের দুঃসাহসিকতা অন্যত্র। তা আছে তাঁর ‘বীরাঙ্গনা’ কাব্যে। বলা চলে সুদুঃহসিকতা।
কীরকম? কাব্যটিতে এগারোজন পৌরাণিক নারী চিঠি লিখে তাঁদের প্রিয়তমের কাছে ভালবাসার স্মৃতি, তাঁর সঙ্গে অভিমান-অভিযোগ দাখিল করেছেন। মধুসূদন সম্ভবত ওভিদ-এর ‘Epistulai Heraiduum’ থেকে এ কাব্য লিখবার প্রেরণা পেয়ে থাকবেন, যেখানে গ্রীক নারীরা চিঠি লিখছেন তাদের প্রিয়ের কাছে।
এ পর্যন্ত ঠিক আছে। সাহসের প্রথম পরিচয় পাই শ্রীকৃষ্ণকে লেখা রুক্ষ্মিণীর পত্রে, যেখানে তিনি স্বেচ্ছায় অপহৃতা হওয়ার বাসনা ব্যক্ত করেছেন! নারী কতরকমের-ই না হন!
আরও মারাত্মক ও নারীর যৌন স্বাধিকার-স্বাধীনতার চূড়ান্ত নিদর্শন পাই ‘সোমদেবের প্রতি তারা’-য়। তারা দেবগুরু বৃহস্পতির স্ত্রী। তিনি প্রেমে পড়েছেন বৃহস্পতির শিষ্য সোমদেবের। শাস্ত্রে এ-প্রেম হচ্ছে অন্যায়ের-ও অন্যায়। একে বলা হয় ‘অগম্যায় গমন’! অথচ তারার এ প্রেম ব্যক্ত, অনুরাগে সোচ্চার এবং প্রকাশে নিঃসঙ্কোচ! সব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ বলছে, এমনকী তারার বুধ নামে যে পুত্র, তাঁর পিতা বৃহস্পতিশিষ্য এই সোমদেব। তা প্রাচীন ভারতীয় সমাজ তো কুন্তী-দ্রৌপদী-ব্যাসদেব নিয়ে অনেকটাই পারমিসিভ। তাই বলে সদ্য সতীদাহ-বৈধব্যহীন বাংলায় তারার এমন দুঃসাহসী প্রেমপত্র! পড়া যাক, ‘তুষেছ গুরুর মন, সুদক্ষিণাদানে,/ গুরুপত্নী চাহে ভিক্ষা, দেহ ভিক্ষা তারে’!
বাস্তবে যে নারী অবরোধবাসিনী ও হরেক জালে বন্দি, কল্পলোকের সেই নারীকেই অবাধ মুক্তির স্বাদ পাইয়ে দিলেন মধুকবি। পুরুষতন্ত্রের মুখে তীব্র ও চূড়ান্ত চপেটাঘাত। If winter comes,— আজ চিত্রটাই কী বিপরীতে দাঁড়িয়ে! বিজ্ঞানে নারী, এভারেস্টে, মহাকাশে, প্রধানমন্ত্রিত্বে, কর্পোরেটে, নোবেলে, সঙ্গীত-চিত্রকলা-অভিনয়-খেলাধুলা-সাহিত্যে। এবং সম্পাদনায়!
আলো ক্রমে আসিতেছে।

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 − 14 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বঙ্গের প্রথম নারীকবি চন্দ্রাবতী

চন্দ্রাবতীর জীবনের যেটি শ্রদ্ধেয় দিক, তা হল গরলকে অমৃতে পরিণত করা। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোককে কাটিয়ে উঠে একাগ্রতা নিয়ে পঠনপাঠন‌ ও সৃষ্টিকর্মে মন দেন। পিতাকে সহায়তা করেন কাব্যরচনায়। ১৫৭৫ নাগাদ, যখন চন্দ্রাবতীর বয়স মাত্র পঁচিশ, সেসময় তিনি পিতার লেখা মনসার ভাসান-এ সহযোগিতা করেছিলেন। তারপর একের পর এক নিজস্ব রচনায় ভাস্বর হয়ে থাকে তাঁর কারুবাসনা।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইসলাম

হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি ‌বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের‌ সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়‌ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।

Read More »
তপোমন ঘোষ

কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে…

হঠাৎ চোখ পড়ে বুথের এক্সিট দরজাটার দিকে… একটা ছোট্ট ছায়া ঘোরাফেরা করছে! চমকে উঠে সে দেখে, সেই বাচ্চাটা না! মায়ের কোলে চড়ে এসেছিল… মজা করে পোলিং অফিসার তার ছোট্ট আঙুলে লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভোটের কালি। হুড়োহুড়িতে মা ছিটকে গেছে কোথাও— নাকি আরও খারাপ কিছু! বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে তার। শুনশান বুথে পোলিং আর সেক্টর অফিসার গলা যথাসম্ভব নিচুতে রেখে ডাকতে থাকেন বাচ্চাটাকে। একটা মৃদু ফোঁপানি… একটা হালকা ‘মা মা’ ডাক— বাচ্চাটা এইসব অচেনা ডাকে ভ্রূক্ষেপও করে না, এলোমেলো পায়ে ঘুরতে থাকে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধ: অন্ধকারে আলোর দিশারী

তিনি বলেন গেছেন, হিংসা দিয়ে হিংসাকে জয় করা যায় না, তাকে জয় করতে প্রেম ও ভালবাসা দিয়ে। মৈত্রী ও করুণা— এই দুটি ছিল তাঁর আয়ুধ, মানুষের প্রতি ভালবাসার, সহযোগিতার, বিশ্বপ্রেমের। তাই তো তাঁর অহিংসার আহ্বান ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে,— চীন, জাপান, মায়ানমার, তিব্বত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটানে। এই বাংলায় যে পালযুগ, তা চিহ্নিত হয়ে আছে বৌদ্ধযুগ-রূপে। সুদীর্ঘ পাঁচ শতাব্দী ধরে সমগ্র বাংলা বুদ্ধ-অনুশাসিত ছিল। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ বৌদ্ধ কবিদের দ্বারাই রচিত হয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

স্যার রোনাল্ড রস, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য

রোনাল্ড রসকে তাঁর গবেষণার সহায়তাকারী এক বিস্মৃত বাঙালি বিজ্ঞানীর নাম কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৭-১৯২৯)। তাঁর অবদান কিন্তু খুব কম নয়। তিনি ছিলেন রস-এর অধীনে সহ-গবেষক। রস নোবেল পেলে উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর নেতৃত্বে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, শিবনাথ শাস্ত্রী, আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ কিশোরীনাথের ভূমিকার বিষয়টি বড়লাট লর্ড কার্জনকে জানান। কার্জন এ-বিষয়টি ব্রিটিশ সরকারের গোচরে আনেন। এর ফলে ১৯০৩ সালে যখন দিল্লিতে দরবার বসে, তখন ডিউক অফ কনট-এর মাধ্যমে কিশোরীনাথকে ব্রিটিশরাজ সপ্তম এড‌ওয়ার্ড-এর তরফ থেকে স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। পরে কলকাতা
র সেনেট হলে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সভাপতি ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ।

Read More »