Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

বিশ্বকর্মার ব্রতকথা

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূজাপার্বণ দুভাবে পালিত হয়। তিথি-অনুসারে, যেমন দুর্গা, লক্ষ্মী, কালী, শিব, সরস্বতী পুজো। আবার বাংলা মাসের সংক্রান্তিতেও অনুষ্ঠিত হয় কোনও কোনও পুজো। শারদ কোজাগরী পূর্ণিমা তিথি ছাড়াও যেমন আষাঢ় মাসের সংক্রান্তিতেও লক্ষ্মীপুজোর বিধান আছে। শ্রাবণ, ভাদ্র, কার্তিক, পৌষ ও চৈত্র-সংক্রান্তিতে যথাক্রমে মনসা, বিশ্বকর্মা, কার্তিকেয়, মকর এবং চড়কপুজো হয়।

ভাদ্রসংক্রান্তি, অর্থাৎ ভাদ্র মাসের শেষ দিন। এই দিনটি বিশ্বকর্মার আরাধনা-দিবস। এই দেবতা হচ্ছেন স্থাপত্যের দেবতা। কথিত আছে, দ্বারকানগরী, শ্রীকৃষ্ণের সুদর্শনচক্র, দেবতাদের বাহন ইত্যাদির নির্মাতা তিনি।

পূজাপার্বণের মতো ব্রতপালনের মধ্যে দিয়েও হিন্দুরা তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন। ব্রতকথার রয়েছে বিচিত্র ও ব্যাপ্ত ঐতিহ্য।

আবহমান কাল থেকে ব্রতকথার চল। মেয়েরাই বিভিন্ন মাসে বিভিন্ন ব্রতকথা বলে লৌকিক দেবদেবী ও প্রকৃতির আরাধনা করে। মাঘ মাসে মাঘমণ্ডলের ব্রত, কার্তিকে তারার ব্রত। এরকম কুলুইচণ্ডী, থুরপল, শ্রীপঞ্চমী, যমবুড়ি, সুবচনীর ব্রত ইত্যাদি বহু ব্রতকথার প্রচলন রয়েছে আজ-ও, বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজে। ‘পথের পাঁচালী’-তে অপুর দিদি দুর্গাকেও ব্রতপালনরত দেখেছি আমরা।

বিশ্বকর্মা পুজোতেও কেউ কেউ বিশ্বকর্মার ব্রত পালন করে থাকেন। এমনিতে বিশ্বকর্মা যেহেতু স্থাপত্য ও কারিগরির দেবতা, তাই কলকারখানাতেই এই দেবতার পুজো হয়ে থাকে। সেখানে ব্রতকথার স্থান নেই। আবার কোন অলৌকিক কারণে এবং কবে থেকে যে এদিন ঘুড়িখেলার চল হয়েছে জানা নেই। তবে বিশ্বকর্মা পুজোর দিন শহর ও গ্রামের আকাশ ছেয়ে যায় নানা রঙের ও নানা আকৃতির ঘুড়িতে। বাহারি সব নাম-ও আছে সেসব ঘুড়ির,– চাপটাস, তেরঙা, কালকেউটে, ইত্যাদি ইত্যাদি। এমনকি বিশ্বকর্মার চার হাতের একটিতেও একটি ঘুড়ি দেবার চল হয়েছে ইদানীং।

কেবল কলকারখানাতেই নয়, গৃহস্থ বাড়িতেও বিশ্বকর্মা পুজো হয়। ঘরদোর পরিষ্কার করা, গোবর দিয়ে মোছা (এখন দালানকোঠা বলে তা আর হয় না), দরজায় মঙ্গলচিহ্ন হিসেবে বসুধারা দেওয়া ও মঙ্গলঘট স্থাপনের পর স্নানান্তে বাড়ির বয়স্কা সধবা মহিলারা এই ব্রতকথা মুখেমুখে বলেন। প্রতিবেশী এয়োস্ত্রীরা এসে জড়ো হন শুনতে। প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে প্রতিবছর ভাদ্র সংক্রান্তিতে আমার মায়ের মুখে এই ব্রতকথা শুনে শুনে মনে গেঁথে আছে। সেই ব্রতকথাটি পরিবেশন করি আজকের পাঠকের কাছে।

বিশ্বকর্মার ব্রতকথা বা চিল-চিলৈনীর কাহিনি

ধনপতি সওদাগর বিপুল বাণিজ্যদ্রব্য নিয়ে দেশে ফিরছেন। বিদেশে নিয়ে গিয়ে জিনিস বিক্রি করে লাভ হয়েছে প্রচুর। আর সেই লাভ থেকে যেসব জিনিস কিনেছেন, তা স্বদেশে বিক্রি করলে লাভ হবে আরও। ছেলে লক্ষপতির বিয়েটা বেশ জাঁকজমক করেই দেওয়া যাবে। মনেমনে এসব ভাবার সময় তাঁর দৃষ্টি গেল নদীপারে দূরের এক তালগাছের দিকে। এগিয়ে এসে দেখেন, এক পরমাসুন্দরী কেশবতী কন্যা। তালগাছের ওপরে বসা, আর তার চুল নেমে এসেছে মাটি পর্যন্ত। সওদাগর তাকেই নিজ পুত্রবধূ করবেন ঠিক করলেন।

পরিচয় জানতে চাইলেন সওদাগর। মেয়েটি তাতে কেঁদে সারা! বাপ ছিল তার গরীব। বছর বছর তার মেয়ে হত। এবার মেয়ে হলে নদীর জলে ভাসিয়ে দেবেন, এই ছিল বাপের পণ। তা এবার-ও মেয়েই হল। আর অমনি তাকে ভাসিয়ে দেওয়া হল কলার ভেলায়। নদীর পারে এক তালগাছ। তার ওপর চিল-চিলৈনীর বাস। মেয়েটিকে দেখে তাদের দয়া হল। নদী থেকে এনে নিজেদের কাছে এনে তাকে মানুষ করলেন। শেখালেন চৌষট্টি কলা।

Advertisement

ধনপতি বললেন, ‘এইবার থেকে আর তোমার কষ্ট হবে না মা’। বাড়ি এনে নিজপুত্র লক্ষপতির সঙ্গে মহা ধুমধামে বিয়ে দিলেন তার। রোশনচৌকি, সাতদিন আমোদ-আহ্লাদ, হৈচৈ কত! মেয়েটি সুখের মুখ দেখল।

বাড়ির অন্য বউরা একে দেখে তো ঈর্ষাকাতর! এ-মেয়েকে যে সবাই মাথায় করে রাখে, এমন কী গুণ আছে তার? না জানে রান্নাবান্না, না জানে সহবত, তবে? তার ওপর বাপের বাড়ি তালগাছে, বাপ রে! শুনলেই গা ঘিনঘিন! তাকে তাই শাস্তি দেবার জন্য ধনপতির অন্য পুত্রবধূরা সবাই তাদের আত্মীয়-কুটুমদের খাওয়ার নিমন্ত্রণ দিল। লক্ষপতির বউকে দিল রাঁধতে। কেমন জব্দ!

এদিকে নিজের ঘরের জানালায় সুতো বেঁধে রেখেছিল ধনপতির বউ। সুতোর অপর প্রান্ত বাঁধা সেই তালগাছে। সেখানেই তো থাকে চিল-চিলৈনী, তাকে যারা পালন করেছে। সুতোয় টান পড়তেই তারা বুঝল, তাদের মেয়ের কিছু একটা হয়েছে। অমনি চিলৈনী তার ঘরে এসে হাজির। সমস্যা শুনে বলল, ‘মেয়ে, রাঁধতে জানিস নে তো কী হয়েছে? তুই এক একটা রান্নার জিনিস উনুনে চড়াবি, আর বিশ্বকর্মাকে স্মরণ করবি। দেখবি, স-অ-ব রান্না উৎরে যাবে।’

সত্যি সত্যি হল-ও তাই। অতিথিরা তো খেয়ে ধন্য ধন্য! অন্যদিকে বউয়েরা আরও ক্ষুব্ধ।

একদিন তারা দেখে, রাতে ঘুম থেকে উঠে লক্ষপতির বউ সুতোয় টান মারছে, আর অমনি চিলৈনী এসে হাজির। তাদের মধ্যে সারারাত ক-ত সুখ-দুঃখের কথা! বউয়েরা এই দেখে গজর গজর করতে করতে ভাবল, ‘এই তবে কাণ্ড! দেখাচ্ছি মজা!’

পরদিন রাতে তারাই সুতো ধরে টানল। আর তৎক্ষণাৎ, আজ আবার চিল-সহ চিলৈনী এসে হাজির। অমনি বউয়েরা মিলে তাদের ধরে কেটে ফেললে। লক্ষপতির বউকে তার মাংস রেঁধে খেতে দিলে। আর ওদের হাড়গোড় রাখলে বাড়ির পেছনের উঠোনে গর্ত করে। লক্ষপতির বউ তো খেতে বসে মাংসের মধ্য থেকে তার বাপ-মা চিল-চিলৈনীর গন্ধ পায়! কান্নায় তার গলা বুজে আসে। কিচ্ছুটি না খেয়ে হাত ধুয়ে এসে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। তাকে তখন তারা স্বপ্ন দেখায়, ‘শোন! তোর বাড়ির বউয়েরা আমাদের মেরে ফেলেছে। তুই এখন থেকে স্নান করে শুদ্ধ কাপড় পরে বিশ্বকর্মার ঘট বাড়িয়ে (নতুন ঘট স্থাপন করে) একমনে বিশ্বকর্মাকে ডাকবি। তারপর ঘটের জল আমাদের হাড়গোড়ে ছিটিয়ে দিবি।’ ঘুম থেকে উঠে বউ তা করতেই চিল-চিলৈনীর নবজন্ম! উড়ে যাওয়ার আগে তারা মেয়েকে বলে গেল, ‘এখন আর আমাদের সুতো ধরে টানবার দরকার নেই। তোর যা মনোবাসনা, বিশ্বকর্মাকে জানালেই হবে।

সেই থেকে বিশ্বকর্মার প্রতিষ্ঠা। মজা লাগে ভাবতে, চিল= Kite. আবার Kite মনে ঘুড়ি। বিশ্বকর্মা পুজোয় ঘুড়ি ওড়ানোর সঙ্গে মিলটা বড় অদ্ভুত!

ছবি: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ten + 20 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আমেরিকার স্বাধীনতা: আড়াইশো বছর

১৬০৭ থেকে ১৭৮৩ পর্যন্ত সময়কাল আমেরিকায় ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক রাজত্ব। আজকের দিনে যে আমেরিকা, তা কিন্তু পুরোটা ব্রিটিশদের দখলে ছিল না। ছিল ভার্জিনিয়া, ম্যাসাচুসেটস, নিউ ইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া-সহ ১৩টি রাজ্য। আর কানাডার বেশ কিছু অঞ্চল। আমেরিকার অন্যান্য স্থানে ফরাসি, ডাচ, নরওয়েজিয়, সুইডিস উপনিবেশ-ও ছিল। তাছাড়া রাশিয়া আমেরিকার আলাস্কা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত দখল করে। পরে সে আলাস্কা আমেরিকার কাছে বিক্রিও করে দেয়।

Read More »
অপরাজিতা মৈত্র

গোদাবরীর গোমুখে

গঙ্গার মর্ত্যে আগমন নিয়ে যেমন ভগীরথের গল্প, তেমনই গোদাবরীর উৎসস্থলে না এলে জানা যেত না, দক্ষিণের গঙ্গা নিয়েও আছে হাজার গল্প। যে গল্প জানাবে আজও এই অঞ্চলের মানুষ অনেক সময়েই কাছাকাছি আর কোনও পানীয়জল না পেয়ে কষ্ট করে হলেও এই উৎসস্থলে এসেই শীতল এই পানীয়জল নিয়ে যান নিজেদের কাজের জন্য। গঙ্গা বা অন্য নদী সে শুধু ধার্মিক আবেগের কারণে পবিত্র না, হাজার প্রাণীর ‘তৃষ্ণা’ মেটাবার জন্য সে হয়ে ওঠে ‘দেবী’ বা ‘পবিত্র’। সে পথে মিশে যায় হাজার গল্প-কষ্ট কিংবা দিনযাপনের চরম বাস্তবতা।

Read More »
রুহ

রুহের কবিতাগুচ্ছ

একই আলোকমালায় কাটিয়েছি/ বহুকাল দু’জনে…/ বলিনি কখনও।/ তারা খসা দেখেছি একসাথে, যদিও/ গোপন থেকেছে চাওয়া-পাওয়া।/ মাঝে বহুদিন, বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো/ একা… নীরবে বয়েছি যাতনা।/ আজ মিথ্যের নেই অবকাশ/ তোমাকে কি পড়েনি মনে/ কোনও মুহূর্ত বা ক্ষণে/ ভাবিনি কি একান্ত বন্ধু আমার—/ এতদিন পরে, পুনর্মিলনে বলেছ/ পাখি হতে চেয়েছিলে এ জীবনে

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

যুদ্ধ: বৈশ্বিক কসাইখানা, পুঁজির সংকট ও শ্রমের মুক্তি

অবিক্রীত পণ্যের পাহাড় যখন পুঁজির পুনরুৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করে, তখন পুঁজিপতিরা তীব্র আতঙ্কে ভোগে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তারা প্রতিযোগী পুঁজিপতির বাজার ও পণ্য ধ্বংস করতে চায়। আর এই ধ্বংসের বৈধ হাতিয়ার হিসেবে তারা রাষ্ট্র ও সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করে যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়। অর্থাৎ, উদ্বৃত্ত পণ্য এবং অতিরিক্ত শ্রমকে ধ্বংস করে পুঁজির ভারসাম্য ফিরিয়ে আনাই বুর্জোয়া যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য। এই শোষণের প্রক্রিয়াকে আড়াল করতে রাষ্ট্র একদল বুদ্ধিজীবী ও নীতিবিদ লালন করে, যারা কৃত্রিম ‘দেশপ্রেম’ ও ‘জাতীয়তাবাদ’-এর আফিম খাইয়ে শ্রমিককে বিভ্রান্ত রাখে, যাতে তারা শোষক ও শোষিতের মধ্যকার মৌলিক শ্রেণি-পার্থক্য ভুলে যায়।

Read More »
প্রসেনজিৎ চৌধুরী

বিশ্বকাপ জৌলুসে আর্জেন্টিনা গণহত্যার বধ্যভূমি

বুয়েনস আইরেসের রিভার প্লেটের যে স্টেডিয়ামে তখন খেলা হত, তার মাত্র এক মাইল দূরে ছিল সামরিক সরকারের বন্দিশিবির নেভি স্কুল অব ম্যাকনিকস। সাংবাদিক ডেভিড কক্স ফুটবল বিশ্বকাপের খবর সংগ্রহ করতে গেছিলেন। তিনি ‘ডার্টি ওয়ার’ বইতে লিখেছিলেন, যখন স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার ম্যাচ চলত তখন ওই টর্চার সেল থেকে কান্নার শব্দ শোনা যেত। আর্জেন্টিনার ভুবনমোহিনী ফুটবলে লেগে আছে রক্ত।

Read More »
রাধাবল্লভ রায়

ধর্মযুদ্ধ

এই যে সংবাদমাধ্যমে প্রতিদিন শতমুখে বিদ্বেষ ছড়ানো হয়, এই যে ফেসবুক জুড়ে বিশেষ সম্প্রদায়কে চিহ্নিত করে সম্মানীয় নেতা-মন্ত্রীদের কুৎসিত ইঙ্গিত, হিংসার প্রদর্শনী— এর প্রতিক্রিয়া কোথায় গিয়ে ঠেকে তাঁরা কি জানেন? পাড়ায় পাড়ায়, রকের আড্ডায়, ক্লাবের আড্ডায়— সর্বত্র বয়োজ্যেষ্ঠদের নির্বোধ অসংযত উচ্চারণ কোন শিশুর হৃদয়ে কেমন ভাবে প্রোথিত হয় তাঁরা কি জানেন? ভেবে দেখেছেন কি এই বিদ্বেষিতার মধ্যে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে আগামী প্রজন্ম?

Read More »