Search
Generic filters
Search
Generic filters

চম্বল: দস্যুদের আপন দেশে

জীবনে দু’বার আমায় চম্বল (Chambal) উপত্যকায় যেতে হয়েছিল। কোনও গবেষণার কাজে বা বেড়ানোর জন্য নয়। প্রথম বার ১৯৭৯ সালে এবং পরের বার ১৯৮২ সালে। তখন আমি তরুণ, আলোকচিত্রী। বয়েস একুশ বছর। কাজ করি তৎকালীন খুব নামকরা সংবাদ পাক্ষিক ‘পরিবর্তন’ পত্রিকায়। হঠাৎই চম্বল যাবার সুযোগ এসে যায়, প্রায় অলৌকিকভাবে।

আমাদের তৎকালীন সম্পাদক ছিলেন ধীরেন দেবনাথ। চম্বল যাবার সূত্র পাওয়া গেছে জেনে একটা টিম করে দিলেন। মৃদুল দাশগুপ্ত ও আমার। চটজলদি রওনা হয়ে গেলাম চম্বলের দিকে। তুফান মেল। গন্তব্য আগ্রা। চম্বল কিন্তু কোনও নির্দিষ্ট জায়গার নাম নয়। আসলে চম্বল একটা নদী, যা যমুনা নদীর একটি উপনদী। তার অববাহিকার নাম চম্বল ভ্যালি বা উপত্যকা। মূলত তিনটি রাজ্যের মধ্যে দিয়ে এই নদী বয়ে গিয়েছে, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ আর রাজস্থান।

এই উপত্যকা ভৌগোলিক কারণেই অদ্ভুত এবং বলা ভাল দস্যু-স্থান হয়ে ওঠার জন্য উপযুক্ত। নদী স্বভাবতই তার গতিপথ পরিবর্তন করে। চম্বলও তাই। কিন্তু এই পরিবর্তনের ফলে ভেঙে দিয়ে যায় বিস্তীর্ণ প্রান্তকে। চম্বল অঞ্চলে এই ভাঙা জায়গাটাকে ‘বেহড়’ বলে। বলা যেতে পারে মাটির নিচে পাহাড়। এর গভীরতা কখনও পাঁচশো ফুট, কখনও হাজার ফুট, কখনও বা পাঁচ হাজার ফুট। পথ বলে কিছু নেই। পুরোটাই গোলকধাঁধা।

যাইহোক, আমি আর মৃদুলদা কলকাতা থেকে আগ্রা হয়ে পৌঁছলাম উত্তরপ্রদেশের ‘রছেড়’ গ্রামে। সম্বল বলতে একটা হাতে লেখা চিঠি। কলকাতার এক চম্বলবাসী যিনি আমাদের যাওয়ার মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছিলেন। ‘রছেড়’ গ্রামে আমাদের অভ্যর্থনা কেমন হয়েছিল তার কাহিনিটিও মজার ও বিস্তৃত। এখানে তা খোলসা করছি না। তবে সেখান থেকে আমরা চললাম চম্বলের কিংবদন্তি, স্থানীয় রবিনহুড মান সিংয়ের (Daku Man Singh) কোঠিতে।

বেহড়ের আশপাশ দিয়ে টানা আট থেকে নয় ঘণ্টা উটের পিঠে চেপে সে এক দুরন্ত অভিজ্ঞতা। ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত অবস্থায় এসে পৌঁছনো গেল মান সিংয়ের গ্রাম উত্তরপ্রদেশের আগ্রা জেলার ‘খেরা রাঠোর’। পুলিশের গুলিতে মান সিং মারা গেছেন ছয়ের দশকে। সেই মান সিং, যিনি ১১১২টি ডাকাতি, ১৮৫টি খুন এবং ৩২ জন পুলিশকর্মীকে হত্যা করেছিলেন বলে মনে করা হয়। কিন্তু যার সঙ্গে দেখা হল তিনিও খুঁখার ডাকু নবাব সিং। মান সিংয়ের বড় ভাই। চম্বলের মানুষ যাকে ‘বড়ে বাবা’ বলে ডাকেন। তখনও চম্বলের জনজীবনে নবাব সিংয়ের নামে মাথা ঝোঁকায় আপামর জনতা।

১৯৭৯ সালে তার বয়েস ছিল ১০৭ বছর। প্রায় ১২০টা খুনের অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। ফাঁসির হুকুমও হয়েছিল তার। বিনোবা ভাবের ‘ডাকাতদের হৃদয় পরিবর্তন’ মিশনের জেরে তার শর্তসাপেক্ষে মুক্তি হয়েছিল। তাদের পরমযত্নে ‘খেরা রাঠোর’-এ মান সিং এবং নবাব সিংয়ের বাড়িতে আমরা দু’রাত কাটিয়েছিলাম। সেই স্মৃতি আজও অমলিন। ‘খেরা রাঠোর’ থেকে ‘রছেড়’ ফিরেই আমরা যাই আগ্রায় মান সিংয়ের পুত্র তেহসিলদার সিংয়ের (Tehsildar Singh) বাড়িতে। দেখা হল, কথা হল তার সঙ্গে। মোটা গোঁফের আড়ালে এক সৌম্যকান্তি বৃদ্ধ। ঠিক যেন আমাদের ঘরের সেই প্রজন্মের জ্যাঠামশাই। তারও ফাঁসির হুকুম হয়েছিল, বিনোবা ভাবের সৌজন্যে তিনিও মুক্তি পেয়েছিলেন।

তারপর একে একে অনেক ‘চম্বলদস্যু’-র খোঁজই পেয়েছি। দেখা করেছি, ছবি তুলেছি, আড্ডা মেরেছি। যেমন, ডাকু রূপ সিং, ডাকু মোধো সিং, ডাকু জান্ডেল সিং প্রমুখ। উত্তরপ্রদেশ থেকে মধ্যপ্রদেশ হয়ে রাজস্থান চষে বেড়িয়েছি ডাকাতদের সঙ্গে দেখা করব বলে। কখনও সফল হয়েছি, কখনও হইনি। মৃদুলদা আর আমার এই যাত্রা শেষ হয় প্রায় দেড় মাস পরে।

দ্বিতীয়বার চম্বল গিয়েছি ১৯৮২ সালে। ইতিমধ্যে ঘটে গিয়েছে ‘বেহমাই’ কাণ্ড। যে কাণ্ডের পরেই দেশ-বিদেশে নাম ছড়িয়ে পড়ে ফুলনদেবীর (Phoolan Devi)। ‘পরিবর্তন’-এ তখন ধীরেন দেবনাথের জায়গায় সম্পাদক হয়ে এসেছেন ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়। পার্থদার নির্দেশে আবার চম্বল যেতে হল। এবারের টিমে আমি আর দিব্যজ্যোতি বসু। অ্যাসাইনমেন্ট ফুলন আর মালখান সিং (Malkhan Singh)। ১৯৮২ সালে এরা দু’জনেই আত্মসমর্পণ করেছিলেন পুলিশের কাছে। তারা তখন গোয়ালিয়র জেলে। লখনউ পৌঁছেই খবর পেলাম ফুলনের মেন্টর বাবা ঘনশ্যাম (Baba Ghanshyam) জেল থেকে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন বুন্দেলখণ্ডের পাহাড়ি জঙ্গলে। যেভাবেই হোক তার দেখা পেতে হবে। রওনা দিলাম বুন্দেলখণ্ডের দিকে।

সূত্র বা যোগাযোগ বলতে কিছু নেই। ভরসা স্থানীয় মানুষ। কী কষ্ট করে যে দিব্যজ্যোতি আর আমি খুঁজে পেলাম একজনকে, যিনি আমাদের গাইড হয়ে নিয়ে যাবেন বুন্দেলখণ্ডের দুর্ভেদ্য জঙ্গলে। সে কাহিনিও দীর্ঘ। আমরা প্রায় খুঁজে পেয়েছিলাম বাবা ঘনশ্যামকে। কিন্তু একেবারে নাকের ডগা থেকে ফসকে গিয়েছিলেন তিনি। কারণ পুলিশ যে আমাদের ফলো করছে, তা আমরা টের পাবার আগেই ঘনশ্যাম ও তার দলবল বুঝে ফেলেছিলেন। তাই দেখা পেতে পেতেও খালিহাতে ফিরতে হয়েছিল। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বোধহয় সেখান থেকে প্রাণ নিয়ে ফেরা।

তখনও ফুলনদেবী আর মালখান সিংয়ের সঙ্গে দেখা করা বাকি। এলাম গোয়ালিয়রে। গোয়ালিয়র জেলে ফুলনদেবী আর মালখান সিংয়ের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি পাওয়া গেল অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে। কিন্তু ছবি তোলা নিষেধ। দেখা হল। আগে মালখান সিং, তারপর ফুলন। জেলের সেল, না ফাইভ স্টার হোটেল! মালখান সিংয়ের সেলে অন্তত পাঁচটা টেবিল ফ্যান ঘড়ঘড় শব্দে ঘুরে যাচ্ছে। জেলরক্ষী তার পদসেবা করছেন। নিজের চোখে দেখা। তার ডাকাত হবার কাহিনি শোনা হল। এত সুপুরুষ আমরা আগে দেখেছি বলে মনে হয় না। ফুলনের দেখা পাওয়া গেল জেল প্রাঙ্গণে। তখনও হিংস্র বাঘিনীর মত তার চেহারা। ফুলনের কথাও আপাতত এটুকুই।

আমাদের প্রথমবারের চম্বল সফর প্রায় ৪৩ বছর আগের ঘটনা। দ্বিতীয়বারের ঘটনা তাও চল্লিশ বছর আগেকার। সেসবের ধারাবিবরণী গ্রন্থাকারে বেরচ্ছে। বইটির নাম ‘চম্বল লাইভ’। মৃদুলদা, দিব্যজ্যোতি আর এই প্রতিবেদকের চম্বল কাহিনি সচিত্র আর সবিস্তারে লেখা আছে এই বইতে। উৎসাহী পাঠক যদি চম্বল সম্পর্কে কিছু জানকারি নেবার প্রয়োজন অনুভব করেন, তবে বইটি হাতে তুলে নিতে পারেন।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 1 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »