Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও ভারত

রাশিয়া-ইউক্রেনের দ্বৈরথের যথাবিহিত নিন্দা করেছে ভারত। তথাপি কৌশলী পশ্চিমা বিশ্ব— ইউরোপ আর আমেরিকা— চেষ্টা করছে ভারতের তরফে একটা কড়া প্রতিক্রিয়া নিতে, রাশিয়াকে অপদস্থ করার জন্য। অবশ্য এই যে যুদ্ধ হচ্ছে, সেটা উপর উপর দেখলেই শুধু হবে না, গোটা বিষয়টা বুঝতে গেলে তলিয়েও দেখতে হবে। শুধু রাশিয়াকে দোষ দিলে চলবে না। বুঝতে হবে কেন এমন অবস্থা হল, কেন আক্রমণের পথ বেছে নিতে হল, কেন এখনও যুদ্ধ থামছে না, কী কী উদ্দেশ্য, কারা রয়েছে এর নেপথ্যে— সবটাই বুঝে নিতে হবে। এই বিষয়গুলি বুঝতে পারলে তবে বিষয়টি সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যেতে পারে। তবে বিষয়টি নিয়ে বলতে গেলে ভারতের তেমন কিছুই করার নেই।

একলা রাশিয়াকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। এর জন্য ওদেরও অনেক দোষ আছে, বিশেষত আমেরিকার। ইউরোপিয়ান সোসাইটির অনেক ত্রুটি আছে। তাদেরই কৃতকর্মের ফল এসব। তা বলে যুদ্ধ কখনও সমাধান হতে পারে না। তাই তার নিন্দা জানাতেই হবে। এছাড়া বিষয়টি নিয়ে রাশিয়াকে ভারতের তরফে বিশেষ কিছু বলবার নেই। ভারতের যেটুকু বলবার, তা বলেছে। ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার এত ভাল সম্পর্ক, প্রায় ৭০-৮০ বছরের সেই সম্পর্ক। প্রথম থেকেই তারা আমাদের সব কিছুতে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে। মনে রাখতে হবে, ইউএসএ আর ইউরোপ কখনও ভারতকে সাপোর্ট করেনি। বরং যখনই কোনও যুদ্ধ হয়েছে তখনই আমাদের বিরুদ্ধে গিয়েছে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিরোধী পক্ষকে সমর্থন যুগিয়েছে।

১৯৭১ যুদ্ধে কী করল? নিক্সন-কিসিঞ্জার মিলে পাঠিয়ে দিল ওদের সপ্তম নৌবহর। বঙ্গোপসাগরে পাঠিয়ে বলল, যাও, ভারতকে ভয় দেখাও। লড়াই করো। বাংলাদেশ কেন ওরা স্বাধীন করছে। সেরকম একটা বিদ্বেষী আচরণ ভারতের প্রতি। সব সময় একটা অবমাননাকর, বিরাগমূলক একটা ভাব। এখনও তার ধারা বজায় রেখেছে। ওরা তো সব জায়গাতেই যুদ্ধবিগ্রহ করে বেড়ায়। ইরাকে কী করল, second gulf war in Iraq। ওরা তো খুব অপরাধ করেছে। ওখানে WMD ছিল? ডব্লিউএমডি হল weapons of mass destruction। সব মিথ্যে কথা বলে বলে ওদের ওপর হামলা করল। দেশটাকে ধ্বংস করে দিল। তারপরে এখন কতরকম মৌলবাদীদের জন্ম হয়ে গেল ওখানে। ইসলামিক র‌্যাডিকালিজম। আইসিস, আলকায়েদা নানারকম। তারা সব মাথায় উঠে বসল। আমেরিকা নিজেই এসব ভুলভাল নীতি নিয়েছে।

রাশিয়াও এখন কর্নারে পৌঁছে গেছে। তাকে কোণঠাসা করে দেওয়া হয়েছে। সেইজন্য ওরা রেসপন্স করছে। যদিও এই ধ্বংসযজ্ঞ, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। You can’t use force। এই সেঞ্চুরিতে ফোর্স ইউজ করা is not correct। করলেও এত খারাপভাবে অ্যাটাক করছে সব জায়গায়, ধ্বংস করে দিচ্ছে সব। এটা ভীষণই দুঃখজনক ঘটনা। সব ইনফ্রাস্ট্যাকচার, সবরকম ফ্যাক্টরি, মানুফ্যাকচারিং সব কিছুই বিনাশ করে দিচ্ছে। কত হাজার হাজার মানুষের হয়তো প্রাণ যাবে, সে ইউক্রেনিয়ান হোক অন্য যেকোনও দেশের। মানুষ মারা যাচ্ছে। এটা ঠিক হচ্ছে না। বড় রকমের যুদ্ধে নেমে পড়া করা উচিত হয়নি। অনুচিত কাজ। আর শুধু রাশিয়াই যে অনুচিত কাজ করছে, এমনটা তো নয়। আমেরিকা কী করেছিল? কিউবা, ভিয়েতনাম, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, আফগানিস্তান। সব জায়গা স্রেফ ধ্বংস করে দিয়েছে। আর তার পেছনের যুক্তিও তো তেমন ছিল না। কোনও কারণ ছাড়াই সব ধূলিস্যাৎ করে দিয়েছে। এক একটা সভ্যতাকে ছারখার করে দিয়েছে।

ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার অনেক দিনের সম্পর্ক। সব জায়গাতেই, ইউনাইটেড নেশনস-এও আমাদের সাপোর্ট করেছেন রুশিরা। ১৯৭১ যুদ্ধে ওরা সমর্থন না করলে বাংলাদেশ স্বাধীনই হতে পারত না। গোটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি যদি দেখা যায়, দেখা যাবে রাশিয়া সর্বদাই ভারতকে সহায়তা দিয়েছে। আর আমেরিকা এবং ওয়েস্টার্ন ইউরোপ সবসময়ই ভারত-বিরোধী। ওরা ধোয়া তুলসীপাতা নয়। ওরা সব এককাট্টা ওদের ব্যবসার জায়গায়। আর্মস ইন্ডাস্ট্রি, অয়েল লবি, ফার্মাসিউটিক্যাল লবি— ওরা চায় যুদ্ধবিগ্রহ হোক। তাহলে ওরা বিক্রি করবে ওদের সাজসরঞ্জাম, ওরা ডলার পাবে আরও, ওদের ইকোনমি আরও স্ট্রং হবে। They are not bothered about World Peace truly। এই যুদ্ধ সম্ভবত রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যেই সীমিত থাকবে। কিন্তু তাদের প্ররোচিত করেছে যারা, তাদের কী হবে?

এই পরিস্থিতিতে ভারত নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। ভারত বলছে যে, তোমরা এই যুদ্ধবিগ্রহ না করে এটাকে আলোচনার মাধ্যমে তাড়াতাড়ি মিটিয়ে নাও। কিন্তু উসকানি তো দিচ্ছে অন্যরা। ন্যাটো-কে কেন ওখানে যাওয়ার দরকার পড়ল? Why are you trying to put NATO into Ukraine? যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন বা ইউএসএসআর বিলুপ্ত হয়ে গেল ১৯৯১-এ, তখন ওদের প্রেসিডেন্ট গরবাচেভ। তখন Warsaw Pact তো বিলীন হয়ে গেল। The Warsaw Pact officially disbanded in 1991 following the dissolution of the Soviet Union। তাই যদি হয়, তারপরে ন্যাটোর কী রোল আছে?

Advertisement

ন্যাটো কী জন্য হয়েছিল? যদি ইতিহাস জানা থাকে, জানবেন, The NATO was a military alliance against the soviet union and soviet empaire and Warsaw Pact country. তো, মূল কারণটাই যদি চলে যায় তাহলে ন্যাটোকে দিয়ে কী হবে? রাশিয়া ও ইউক্রেন— Thay are two brotherly state. Their economy is totally integrated। ওদের ম্যানুফ্যাকচারিং, সব ফ্যাক্টরি, ডিজাইন ব্যুরো, রিপেয়ার প্ল্যান্ট— সবকিছুই সংহত। সবেতেই একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। সোভিয়েত ইউনিয়নের সময়কালে ওরা ক্রিমিয়া অঞ্চলটাকে তো দিয়ে দিল। ৭০ শতাংশ রুশ ভাষাভাষী মানুষের বাস যে দেশে, যারা রাশিয়ান অরিজিন। এখন রাশিয়ার কথা হচ্ছে, তুমি কেন ন্যাটোকে আনছ আমার দোরগোড়ায়, সেই ন্যাটো, যারা চায় না আমাদের ভাল হোক, ভাল প্রতিবেশী হলে তুমি এটা কেন করবে? আমার বাড়ির পাশে শত্রুকে আনছ, আমি মানব কেন?

আর একটা জিনিস বুঝতে পারছি না, ন্যাটোর সঙ্গে গিয়ে ইউক্রেনের লাভটা কী হবে। যাদের অর্থনীতি পুরোটাই রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত, যারা প্রায় একই ভাষা বলে, একই আচার-ব্যবহার, রীতিনীতি, একই স্লাভিক কমিউনিটির অংশ যারা। বেলারুশ, রাশিয়া আর ইউক্রেন স্লাভিক রেস। রাশিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে প্রশ্নটা সঙ্গত যে, কেন তুমি ওদের সঙ্গে যাবে? আর কেন ন্যাটোর ফোর্স সেখানে রাখবে যাতে আমার ক্ষতি হয়। বলতে গেলে ওরা তো আমার শত্রু। সেরকম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সেইজন্যেই যুদ্ধটা হচ্ছে। ধুরন্ধর আমেরিকা ও ইউরোপীয় বেনিয়াদের কৌশলটা যদি ইউক্রেনিয়ানরা একটু বুঝতেন? ওরাই উসকানি দিয়েছে লড়াই করা জন্য। আমার বন্ধু হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকবে, আর আমি প্রতিবেশীর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করব, তা কী করে হয়? বর্তমান অবস্থার এটাই মূল কারণ বলে আমার মনে হয়।

রাশিয়া এতকাল ধরে এতবার আমাদের পাশে থেকেছে। বন্ধু হয়ে এতবার ভেটো দিয়েছে ইউনাইটেড নেশনস সিকিউরিটি কাউন্সিলে ইন্ডিয়াকে বাঁচানোর জন্য। সে ১৯৬৫ হোক, ১৯৭১ হোক, সব যুদ্ধেই ওরা ভারতের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। এই যুদ্ধে তাই ভারতের কিছু বলার নেই, ‘যুদ্ধ ভাল নয়’ বলা ছাড়া। যুদ্ধ অবশ্যই নিন্দার্হ। এই জগতে এই সময়ে দাঁড়িয়ে রাশিয়ার এই আগ্রাসী আচরণ ঠিক নয়। এটা খুব অনুচিত। তবে ঔচিত্য-অনৌচিত্যের দায় তো শুধু একলা রাশিয়ার নয়। একইসঙ্গে এর দায় এড়াতে পারে না সবান্ধব ইউক্রেন, যারা ন্যাটোকে রাশিয়ার ঘাড়ের ওপর নিয়ে আসতে চেয়েছে। তাই যুদ্ধ থামাতে দু’পক্ষকেই এগিয়ে আসতে হবে। এবং তা যত দ্রুত সম্ভব। সর্বনাশের আগেই।

চিত্র: গুগল

[লেখক ভারতের প্রাক্তন বায়ুসেনা প্রধান। তাঁর জন্ম ১৯৫৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর। তিনি পুরুলিয়ার সৈনিক স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। তাঁর সুদীর্ঘ কর্মজীবন যথেষ্ট আকর্ষণীয়। ১৯৭৪ সালে বায়ুসেনায় কমিশনড অফিসার হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন। ২০১৬ সালে অবসর নিয়েছেন এয়ার চিফ মার্শাল হয়ে। ভারতীয় বায়ুসেনার আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়ার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে অরূপ রাহার বিরাট অবদান রয়েছে।]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 + 10 =

Recent Posts

মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধদেব বসু: কালে কালান্তরে

বুদ্ধদেব বসুর অন্যতম অবদান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য (Comparative Literature) বিষয়টির প্রবর্তন। সারা ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়-মানে এ বিষয়ে পড়ানোর সূচনা তাঁর মাধ্যমেই হয়েছিল। এর ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। এর ফলে তিনি যে বেশ কয়েকজন সার্থক আন্তর্জাতিক সাহিত্যবোধসম্পন্ন সাহিত্যিক তৈরি করেছিলেন তা-ই নয়, বিশ্বসাহিত্যের বহু ধ্রুপদী রচনা বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে তাঁরা বাংলা অনুবাদসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। অনুবাদকদের মধ্যে কয়েকজন হলেন নবনীতা দেবসেন, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবীর রায়চৌধুরী প্রমুখ। এবং স্বয়ং বুদ্ধদেব।

Read More »
দেবময় ঘোষ

দেবময় ঘোষের ছোটগল্প

দরজায় আটকানো কাগজটার থেকে চোখ সরিয়ে নিল বিজয়া। ওসব আইনের বুলি তার মুখস্থ। নতুন করে আর শেখার কিছু নেই। এরপর, লিফটের দিকে না গিয়ে সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে উঠে বসল গাড়িতে। চোখের সামনে পরপর ভেসে উঠছে স্মৃতির জলছবি। নিজের সুখের ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ‘ডিফল্ট ইএমআই’-এর নোটিস পড়তে মনের জোর চাই। অনেক কষ্ট করে সে দৃশ্য দেখে নিচে নেমে আসতে হল বিজয়াকে।

Read More »
সব্যসাচী সরকার

তালিবানি কবিতাগুচ্ছ

তালিবান। জঙ্গিগোষ্ঠী বলেই দুনিয়াজোড়া ডাক। আফগানিস্তানের ঊষর মরুভূমি, সশস্ত্র যোদ্ধা চলেছে হননের উদ্দেশ্যে। মানে, স্বাধীন হতে… দিনান্তে তাঁদের কেউ কেউ কবিতা লিখতেন। ২০১২ সালে লন্ডনের প্রকাশনা C. Hurst & Co Publishers Ltd প্রথম সংকলন প্রকাশ করে ‘Poetry of the Taliban’। সেই সম্ভার থেকে নির্বাচিত তিনটি কবিতার অনুবাদ।

Read More »
নিখিল চিত্রকর

নিখিল চিত্রকরের কবিতাগুচ্ছ

দূর পাহাড়ের গায়ে ডানা মেলে/ বসে আছে একটুকরো মেঘ। বৈরাগী প্রজাপতি।/ সন্ন্যাস-মৌনতা ভেঙে যে পাহাড় একদিন/ অশ্রাব্য-মুখর হবে, ছল-কোলাহলে ভেসে যাবে তার/ ভার্জিন-ফুলগোছা, হয়তো বা কোনও খরস্রোতা/ শুকিয়ে শুকিয়ে হবে কাঠ,/ অনভিপ্রেত প্রত্যয়-অসদ্গতি!

Read More »
শুভ্র মুখোপাধ্যায়

নগর জীবন ছবির মতন হয়তো

আরও উপযুক্ত, আরও আরও সাশ্রয়ী, এসবের টানে প্রযুক্তি গবেষণা এগিয়ে চলে। সময়ের উদ্বর্তনে পুরনো সে-সব আলোর অনেকেই আজ আর নেই। নিয়ন আলো কিন্তু যাই যাই করে আজও পুরোপুরি যেতে পারেনি। এই এলইডি আলোর দাপটের সময়কালেও।

Read More »