Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

যুদ্ধপ্রস্তুতি

ভিতরে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে যেন দম আটকে যাচ্ছে রুদ্রর। দোতলার এই ঘরটা খুব একটা বড় বা ছোট, তা নয়। এই লিভিংরুমের ভিতরে দাঁড়ানোর জায়গা থাকলেও কয়েকজন লোকের সমাগমে ভর্তি হয়ে গেল। ঘরের মধ্যিখানে একটি টুলের ওপর সাদা কাপড় বিছিয়ে বসানো রয়েছে একটা ছবি। বিভিন্ন রকমের ফুলের তোড়া সেই ছবি ঘিরে, যেন আগলে রেখেছে। ধুপকাঠির ধোঁয়া খুব সামান্য হলেও আস্তে আস্তে গোটা ঘর ধোঁয়াশা করে তুলল। কয়েকজন ভারতীয় দম্পতি ছবির সামনে প্রজ্জ্বলন করলেন কয়েকটা মোমবাতি। মেডিকেল ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রী এবং প্রফেসরদের সমাগম বিস্তারিত; কারণ একটাই। মোমবাতির আলো ছবির প্রতিবিম্ব হয়ে জ্বলজ্বল করছে। কেউ মাথা নত করে দাঁড়িয়ে, কেউ একদৃষ্টে ছবির দিকে চেয়ে।

এই ঘরের মুখোমুখি রয়েছে ব্যালকনি। বাইরে ধ্বংসস্তূপ। রুদ্র বেরিয়ে ব্যালকনির কাছে দাঁড়াল। কোথাও কেউ নেই। সবাই যেন ইতিমধ্যে পালিয়েছে নিজেদের নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্যে। আশেপাশের বিল্ডিং, অ্যাপার্টমেন্ট সব কিছু ছিন্ন; গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে অসাড় হয়ে। বাইরে রোদের তীব্রতা প্রবল, কিন্তু সেই রোদে নেই কোনও প্রাণ, আলোর রেখা যেন কোথাও পৌঁছল না। দূর থেকে ম্লান দৃষ্টিতে দেখতে লাগল এই যুদ্ধের দুর্যোগ। ব্লাইন্ডগুলো নামিয়ে দিল রুদ্র, পাছে কেউ যদি সন্দেহ করে; যতটা সম্ভব এড়ানো যায় আর কী। ঘরের মধ্যে ফের তাকিয়ে ছবির সামনের ভিড়টাকে মনোযোগ দিয়ে দেখল, এদের কয়েকজনকে ছাড়া বাকিদের সে আগে কখনও দেখেনি। সোমকের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে চেনা-অচেনা সবাই তাঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে ছুটে এসেছে। এদের দেখলে আশ্চর্য হত বটে। কিন্তু সেটা আর সম্ভব নয়। ছবির মধ্যে একটা মৃদু হাসির ভাব; সোমক হয়তো হাসছে লোকের সমাগমে, আর হয়তো হাসছে তাঁর বন্ধুকে অতীত এবং আগামীর মধ্যে রেখে চিরকালের জন্য বিদায় নেওয়ার জন্যে।

—রুদ্র?

গলার আওয়াজ শুনে বিস্ময়ের সঙ্গে রুদ্রর চোখ পড়ল তার পাশে দাঁড়ানো যুবতীর ওপর। আজই তার সাথে প্রথম দেখা হল, ভাগ্যের খেলা এমন; যুদ্ধের টানে দুই মানুষের সাক্ষাৎ, ভেবেই লজ্জা লাগল। সোমক কত বার তার ব্যাপারে বলেছিল। একবার দেখা করবার প্রসঙ্গও উঠেছিল। ছয় মাস আগেই বিয়ে করেছিল সোমক, কলকাতায় মা-বাবা ওঁর জন্যে পাত্রী দেখে রেখেছিলেন। শেষমুহূর্তে যদি বিয়ে না করার বেগড়বাই করে বসে, সেই ভেবে ছেলেকে ডেকে তড়িঘড়ি বিয়ে দেন।

সে পাশে কখন দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারেনি। কণ্ঠস্বর শুনে তার দিকে ঘুরে দাঁড়াল।

—অনেক ধন্যবাদ তোমায়, আসার জন্য।

—ধন্যবাদ কীসের? আমায় আসতেই হত।

একটা হালকা হাসির ভাব এসেও যেন আবার মিলিয়ে গেল প্রণতির গম্ভীর মুখে। সে বলে উঠল, সোমকের কাছে তোমার অনেক কথা শুনেছি।

—আমিও।

প্রণতির দৃষ্টিতে রয়েছে দুঃখ, প্রবল কষ্ট, আর মনে ভয়ংকর বেদনা। রুদ্র খেয়াল করে দেখল, তার চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। কয়েকদিন যে ঠিক করে ঘুমাতে পারেনি সেটা বেশ বোঝা গেল। অথচ প্রণতিকে দেখে মনে হল না তার এই বিষয়ে কোনও ধারণা আছে। বাইরের সংগ্রাম ও কোলাহল তার শরীরে কোনও আঁচ আনেনি, কিন্তু মনের দুর্দশা রৌদ্রহীন সূর্য ও ছিন্ন গাছের সদৃশ। এই বাস্তবের সঙ্গে জড়িয়ে কীভাবে নিজেকে সামলে রাখছে, খুব জানতে ইচ্ছে করল রুদ্রর। অবশ্য এটা নিয়ে বিশেষ কিছু প্রকাশ করল না।

—আমি জানি না এটা আমার বলা উচিত কিনা, কিন্তু কোনও অসুবিধা হলে আমি তোমার পাশে আছি। বলতে দ্বিধা বোধ করো না। কথাটা শেষ হতেই প্রণতির মুখে আবার একটা ক্ষুদ্র হাসির রেখা দেখা দিল।

—অসহায়তায় আমি কোনওদিন কারুর কাছে কিছু চাইনি। তোমার কাছ থেকে কী চাইতে পারি বলো?

একটু ভেবে, রুদ্র বলল, এই যুদ্ধ তোমার একার নয়, আমাদের সবার।

এই কথা শুনে প্রণতি তাকিয়ে রইল রুদ্রর দিকে। সেই দৃষ্টি যেন অপলক। ঘরের দিকে চেয়ে দেখল এক এক করে সবাই বেরিয়ে যাচ্ছে। অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং এভাকুয়াতে করে সাবওয়ের অধীনে সব নাগরিকদের ঠাঁই নেওয়া নিরাপদ, ঘোষণা করেছিল রাষ্ট্রপতি। কয়েকজন চেনা লোক বাদে একে একে সব বেরিয়ে পড়ল।

রুদ্র চোখ নামাল মাটির দিকে। পাশে তাকিয়ে দেখল, প্রণতি ছবিটার দিকে চেয়ে; দুফোটা জল গড়িয়ে পড়ল তার চোখ থেকে। ক্ষণিকের জন্য রুদ্রর মনে হল হাতটা বাড়িয়ে সেই জলের রেখাটা মুছে দিক। কিন্তু তার ক্ষত যেরকম স্পষ্ট, রুদ্র ততটাই ভাবশূন্য। নিজের শরীর যেন স্নিগ্ধতা ত্যাগ করেছে।

—ওদের সাথে তুমি চলে যাও, আর সতর্ক থেকো।

—আর তুমি?

—আমি আসছি। একটু ইতস্তত করে বলে উঠল রুদ্র।

প্রণতি কিছু বলল না। তার সামনে হাতজোড় করে, মাথানত করে বেরিয়ে গেল। ছবির দিকে আর তাকাল না।

***

সকাল সাড়ে দশটায় বেরিয়ে কোনও রকমে একটা ক্যাবে করে রুদ্র গেছিল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং সেদিনই পূর্বাভাস দেওয়া হয় এক হিংস্র মিলিটারি অপারেশনের। কলেজের ক্লাস নিতে গিয়ে খবর আসে রাজ্যের কিছু অংশে হয়েছে বিস্ফোরণ। রাতারাতি গোটা শহর ও দেশের রূপ পাল্টে যায় ভয়ংকর আতঙ্কে। কিছুটা আনমনা হয়ে রুদ্র ভাবতে লাগল দুদিন আগের ভোরবেলার ফোন কলটা। রাত ২টো অবধি লেখার কাজ শেষ করে শুতে শুতে প্রায় আড়াইটে-তিনটে বেজে যায়। আধ ঘণ্টাও হয়নি, বালিশের পাশে রাখা মোবাইল বেজে উঠল। প্যাট্রিসিয়া নামক এক ছাত্রী, সোমকের ফেলো জার্নালিস্ট, পুরো ঘটনা সংক্ষেপে জানায়। মিলিটারি নিউট্রালাইজ হয়ে যাওয়ার ফলে প্রতিপক্ষের সেনাবাহিনী শহরের কাছাকাছি থাকার সম্ভাবনায় সোমক ও তার টিম বেরিয়ে পড়ে একটি সেফহাউসের উদ্দেশে। পুলিশরাও সঙ্গে ছিল, কিন্তু সন্দেহ হতেই শত্রুসেনা হামলা চালায় সেফহাউসের ওপর। কয়েকজন পুলিশও আহত হয়। সব শোনার পরে ফোনটা রেখে পাথর হয়ে বসেছিল রুদ্র। তারপর কী মনে হতেই উঠে মুখ ধুয়ে জামাকাপড় পরে বেরিয়ে গেল হাসপাতালের উদ্দেশে। সেখানে গিয়ে কোনও কথা বলতে পারেনি। আর আজ সেই ছবির আশেপাশের ভিড় যেন তাকে ঠেলে বের করে দিল।

ইউনিভার্সিটি থেকে টিচার’স ডরমিটরির দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার। ফিরে রুদ্র ওর শার্টটা খুলে ঘরের তারে ঝুলিয়ে দিল। হাওয়াতে সেটা আস্তে আস্তে দুলছে। হাতমুখ ধুয়ে কোনও রকমে খাওয়া শেষ করে ঘরের আলো নিভিয়ে নিজের বিছানায় শুয়ে পড়ল। ওর চোখে অবশ্য ঘুম নেই, মনটা যেন কীরকম ব্যতিব্যস্ত লাগছে। মাথা ঠান্ডা করতে গিয়ে সে চোখ বুজল আর অমনি যেন দেখতে পেল এক মুখশ্রী, খুবই পরিচিত, কিন্তু কোথাও যেন মনে হল, সে বেশ অসহায়। সেই ছবি আর কারও না, আজই সকালে দেখা ওর পাশে দাঁড়ানো সেই যুবতী।

একটা ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল রুদ্রর ঠোঁটে। তৎক্ষণাৎ এই চিন্তাগুলো ঝেড়ে ফেলে আবার বালিশে মাথা দিল। কতরকম যুদ্ধের বিষয় সে বইয়ে পড়েছে। লাভক্ষতি সব কিছু বিচার করা হয়েছে। তাহলে কি ইতিহাসের পাতায় আবারও আরেক যুদ্ধের নাম প্রকাশ হতে চলল? ফের লেখা হবে হারজিতের ব্যাপারে; ফের লেখা হবে অতিক্রমের ফলাফল। কিন্তু কেউ যুদ্ধ-কান্নার বিশ্লেষণ অক্ষর দিয়েও বর্ণনা করতে পারবে না; যুদ্ধের নেই কোনও ভাষা, সবই ছিনতাই করা মানুষের গোঙানি। মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় মর্ম, চেতনা এবং ভালবাসাকে। প্রণতির কথা ভেবে নিজেকে তার সাথে জড়ানো খুব একটা উচিত কাজ হবে না। চোখ বুজে পড়ে রইল অন্ধকার ঘরে।

***

সময় দাঁড়িয়ে আছে অর্থহীন, রাস্তাগুলো মরুভূমির আকার ধারণ করেছে। কোথাও কেউ নেই। চারিদিক খাঁ খাঁ করছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুদ্রর একটু যেন হালকা লাগল নিজেকে। আজ শনিবার, এইটুকু সে আন্দাজ করতে পারল, কারণ একটা বই ফেরত দিতে যেতে হবে লাইব্রেরি। ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে লোকজনের সম্মুখীন হওয়া, তাদের কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়া সবই যেন এক কর্মের নিষ্ফলতার ইঙ্গিত। সময়ের সাথে সাংঘাতিক রকম পাল্লায় পড়লে সব মুহূর্ত যেন ক্ষণিকের মধ্যে ক্ষুদ্র হয়ে হারিয়ে যায়। কিন্তু এই সময়টাই থেকে থেকে প্রসারিত হয়ে, প্রতিটা উঁচুনীচুকে সংগঠন করে। আজ সে হাঁটছে আগামী যুদ্ধক্ষেত্রের ওপর।

Advertisement

কলেজের সামনে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে একবার গেটের দিকে তাকাল, যেখানে সোমক ওর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকত। এক মুহূর্তের জন্য সেই দৃশ্য ভেসে উঠল ওর চোখে। শরীরে একটা উত্তেজনা খেলে গেল। চোখ সরিয়ে মাটির দিকে স্থির হয়ে তাকাল। তারপর অবিলম্বেই একটা সিগারেট ধরিয়ে হেঁটে এগিয়ে গেল লাইব্রেরির উদ্দেশে।

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে ডান দিকের বুক শেলফে কতগুলো বাংলা এবং ইংরেজি গল্প সংকলন একত্রে সাজানো। তার পাশেই হচ্ছে লাইব্রেরিয়ানের ডেস্ক। রুদ্র বইটাকে শেলফে রেখে এগিয়ে গেল ডেস্কে; পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে সেটা দেখাতেই লোকটা অবাক হয়ে ওর দিকে চেয়ে দেখল। একটা রেজিস্টার এগিয়ে দিল সই করার জন্যে। সেটা ফেরত দিতেই রুদ্র লক্ষ্য করল ডেস্কের পিছনে শেলফের এক কোনায় ধুলো পড়া কতগুলো স্টুডেন্টস রেজিস্টার। ক্লাস ব্যাচ অনুযায়ী পর পর রাখা হয়েছিল।

—ইয়ং ম্যান! হোয়াই আর ইউ হিয়ার? লোকটা ক্ষীণ স্বরে বলে উঠল।
—টু রিটার্ন দি বুক।
—ইন দি মিডিল অব ডিস্ ক্রাইসিস?
একটু হেসে রুদ্র বলল, আই উইল কাম ব্যাক তো রিড এগেইন। টিল দেন ইট শুড বি হয়ার ইট ওয়াস।

লোকটা বেশি কিছু বলল না। লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে আর একটা সিগারেট ধরাল। কিছু কিছু জিনিস দেওয়া-নেওয়া করা খুব শক্ত কাজ নয়। কিন্তু দেওয়ার বদলে কী চাইছি সেটাই তো আসল বাস্তব। আর কে দেওয়া-নেওয়ার এই মীমাংসা করে? যদি ভগবান থাকেন, তাহলে কীসের বদলে প্রাণ নেন তিনি? রাস্তায় নেই কোনও ট্রাফিক, নেই গাড়ি। মনে মনে কী ভেবে আবার হাঁটতে শুরু করল, ফুটপাত থেকে নেমে রাস্তার ওপার চলে গেল কোনও দিকে না তাকিয়ে।

ডরমিটরির কাছাকাছি আসতেই গেট খোলা দেখে একটু অবাক হল রুদ্র। এই সময় কে আসতে পারে? কোনও ফোর্স এলে বাড়ি অবধি হেঁটে আসা সম্ভব ছিল না, তাহলে কারা?

সিঁড়ি দিয়ে উঠে দেখল, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে প্রণতি।

—তুমি এখানে!

বিদ্যুৎ বেগে একটা ভয় নেমে গেল রুদ্রর শরীর দিয়ে।

—এই জায়গাটা নিরাপদ নয়। আর একা থাকাটাও সেফ না।

—তাই বলে তুমি এখানে আসলে কী করে? বাকিরা সবাই কোথায়?

—সাবওয়েতে। একটা গোটা রাত তোমায় দেখতে না পেয়ে ওয়ার্ডেনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তোমার ঠিকানাটা। সে আমায় আসতে দিচ্ছিল না ঠিকই, কিন্তু সোমককে হারিয়েছি, তোমার কোনও ক্ষতি হতে দিতে চাই না।

রুদ্র চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনল, তারপর বলল, ভেতরে এসো।

ঘরে ঢুকতেই দুজনের ছায়া মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। ব্যালকনির দরজা খুলতেই আলো ঢুকে পড়ল।

রুদ্র বসল একটা মোড়ার ওপর। বাইরের হাওয়া তার ঘরে ঢুকে যেন তাকে হালকা ছুঁয়ে চলে গেল। ওর সোমকের কথা মনে পড়ল। অবাক লাগছিল, যার সাথে এত সময় কাটিয়েছে, আজ তাকে বেশি সময় দেওয়া গেল না। যার কাছে প্রাণখোলা গল্প করতে পারত, তার কাছে হঠাৎ এমনভাবে বদ্ধ অনুভব করবে, ভাবতেও পারেনি রুদ্র। বন্ধুর কথা যতই মনে করতে লাগল, সাথে সাথে প্রণতির ছবিও ভেসে উঠল। তার চুল ছিল আলখোলা, পরনে হালকা কাজ করা অফ হোয়াইট শাড়ি, ডান হাতে একটা ঘড়ি এবং গলায় শুরু চেন। কোনও সাজ ছাড়াই তাকে বেশ মানানসই লাগছিল।

—প্রণতি?

ব্যালকনির দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ফিরে তাকাল রুদ্রর দিকে।

—তুমি চলে গেলে না কেন?

খানিকক্ষণ চুপ থাকার পর প্রণতি জবাব দিল, খুব কাছ থেকে মৃত্যুর সাক্ষী হয়েছি আমি। কীভাবে এখনও শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছি নিজেও জানি না। হয়তো এরকমই হয়। আঘাত এমন বিচ্ছেদ আনে যে মন আর শরীর অসংযুক্ত হয়ে পড়ে। যদি দেশে ফিরে যাই, কার জন্য ফিরব আমি?

রুদ্রর মুখে কথা নেই; কী বলবে বুঝতে পারল না। সেও কি তাই ভেবে যায়নি? যুদ্ধ এখনও গাঢ় হয়নি, এমবেসি সব ব্যবস্থা করেই দিয়েছিল। নিজের দেশের মাটির ছোঁয়া এখন সবচেয়ে বড় পাওনা ছাড়া আর কী হতে পারে?

—তুমি রয়ে গেলে কেন? পাল্টা প্রশ্ন করল প্রণতি।

দূরে কোথাও একটা ভীষণ বিকট শব্দ ভেসে উঠল। দুজনে ঘুরে তাকাল ব্যালকনির বাইরে। আশেপাশে কিছু নেই, কিন্তু দূরে, বহু দূরে আকাশে কালো ধোঁয়ার ছোঁয়া লেগেছে। গাঢ় কালো মেঘের মত, কালবৈশাখী ঝড়ের আকাশ মনে হল। রুদ্র ও প্রণতি পাশাপাশি দাঁড়াল, বলার আর কিছু বাকি নেই, ভয়ের সংবেদন দুই পক্ষকে এক করেছে।

—এটাই কি শেষ?

ঢোঁক গিলে রুদ্র বলল, ‘এটাই শুরু।’

চিত্রণ: মুনির হোসেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

17 − 15 =

Recent Posts

কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইসলাম

হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি ‌বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের‌ সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়‌ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধ: অন্ধকারে আলোর দিশারী

তিনি বলেন গেছেন, হিংসা দিয়ে হিংসাকে জয় করা যায় না, তাকে জয় করতে প্রেম ও ভালবাসা দিয়ে। মৈত্রী ও করুণা— এই দুটি ছিল তাঁর আয়ুধ, মানুষের প্রতি ভালবাসার, সহযোগিতার, বিশ্বপ্রেমের। তাই তো তাঁর অহিংসার আহ্বান ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে,— চীন, জাপান, মায়ানমার, তিব্বত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটানে। এই বাংলায় যে পালযুগ, তা চিহ্নিত হয়ে আছে বৌদ্ধযুগ-রূপে। সুদীর্ঘ পাঁচ শতাব্দী ধরে সমগ্র বাংলা বুদ্ধ-অনুশাসিত ছিল। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ বৌদ্ধ কবিদের দ্বারাই রচিত হয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

স্যার রোনাল্ড রস, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য

রোনাল্ড রসকে তাঁর গবেষণার সহায়তাকারী এক বিস্মৃত বাঙালি বিজ্ঞানীর নাম কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৭-১৯২৯)। তাঁর অবদান কিন্তু খুব কম নয়। তিনি ছিলেন রস-এর অধীনে সহ-গবেষক। রস নোবেল পেলে উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর নেতৃত্বে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, শিবনাথ শাস্ত্রী, আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ কিশোরীনাথের ভূমিকার বিষয়টি বড়লাট লর্ড কার্জনকে জানান। কার্জন এ-বিষয়টি ব্রিটিশ সরকারের গোচরে আনেন। এর ফলে ১৯০৩ সালে যখন দিল্লিতে দরবার বসে, তখন ডিউক অফ কনট-এর মাধ্যমে কিশোরীনাথকে ব্রিটিশরাজ সপ্তম এড‌ওয়ার্ড-এর তরফ থেকে স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। পরে কলকাতা
র সেনেট হলে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সভাপতি ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ।

Read More »
গৌতম চক্রবর্তী

দুই হুজুরের গপ্পো

১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই, আলবার্ট আইনস্টাইন বার্লিনের উপকণ্ঠে নিজের বাড়িতে স্বাগত জানান ভারতীয় কবি, দার্শনিক ও সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। তিনি ছিলেন প্রথম অ-ইউরোপীয় নোবেল বিজয়ী। তাঁদের এই সাক্ষাৎকারটি ইতিহাসের অন্যতম বুদ্ধিদীপ্ত ও মননশীল আলাপচারিতায় পরিণত হয়, যেখানে তাঁরা বিজ্ঞান ও ধর্মের চিরন্তন দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করেন। “সায়েন্স অ্যান্ড দ্য ইন্ডিয়ান ট্রাডিশন: হোয়েন আইনস্টাইন মেট টেগোর” গ্রন্থে এই ঐতিহাসিক সাক্ষাতের বিবরণ পাওয়া যায়। এই বইতে বিশ শতকের শুরুতে ভারতের বৌদ্ধিক পুনর্জাগরণ এবং ভারতীয় ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক চিন্তার মেলবন্ধন তুলে ধরা হয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

শতবর্ষী বাঙালি

বাঙালিদের মধ্যেও শতায়ু লোক নেহাত কম নেই। একটা কথা মনে রাখা জরুরি, বিখ্যাত ব্যক্তি ছাড়া সাধারণ মানুষের আয়ু নিয়ে বিশেষ কোনও গবেষণা থাকে না। আবার একটু বেশি বয়স্ক মানুষকে শতায়ু বলে চালিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ-ও রয়েছে। তবে শতবর্ষের আয়ুলাভ যে মানুষের কাঙ্ক্ষিত, তা উপনিষদের‌ একটি বাক্যে সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে— ‘জীবেম শরদঃ শতম্’, অর্থাৎ শতবর্ষ বাঁচতে ইচ্ছে করবে। কেবল অলস জীবন নিয়ে বাঁচবার ইচ্ছে করলেই হবে না, কর্ম করে বাঁচার কথাও বলা হয়েছে সেখানে— ‘কুর্বেন্নেবেহ কর্মাণি জিজীবিষেচ্ছতম্ সমাঃ’।

Read More »