Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

জলাভূমি সহায়

জলাভূমি: প্রকৃতির ফুসফুস

পৃথিবীর যন্ত্রচালিত শিল্পের প্রায় সূচনাপর্ব (১৮৫০) থেকে আজ অবধি মানুষের নানান কর্মকাণ্ডে বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ প্রায় ৪৬ শতাংশ বেড়েছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, যদি জলাভূমি না থাকত তাহলে এই বৃদ্ধির পরিমাণ অনেক আগেই পৃথিবী ধ্বংসকারী জলবায়ু পরিবর্তন ডেকে আনত। অথচ জলাভূমির‌ পরিমাণ পৃথিবীর ভূভাগের মাত্র ২ থেকে ৬ শতাংশ; এই সামান্য শতাংশের জলা অঞ্চলগুলি স্থলভাগের মাটির চেয়েও অনেক বেশি কার্বন জমিয়ে রেখেছে। ছ’য়ের পরে চোদ্দোটি শূন্য বসালে যে সংখ্যাটি হবে তত কিলোগ্রাম কার্বন জমে আছে পৃথিবীর জলাভূমিতে। বর্জ্য জলের নানান দূষক এমনকি বিভিন্ন ক্ষতিকর ধাতব লবণ জলাভূমি তার শরীরে জমিয়ে রেখে পরিবেশের বৃক্ক (nature’s Kidneys) হিসেবে জগৎজোড়া সম্মানে সম্মানিত। এখন বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড সরিয়ে নেবার সুচারু কাজের জন্য জলাভূমিগুলি পরিবেশের ফুসফুস (nature’s lungs) হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু এই জলাভূমির ওপর যত উন্নয়নের নানা চাপ বাড়ছে ততই জলাভূমিগুলি থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইডের মত বিভিন্ন গ্যাস, যেগুলি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বাড়িয়ে আবহাওয়ার পরিবর্তন ত্বরান্বিত করে, সেগুলি বাতাসে মুক্ত হচ্ছে। ফলে পৃথিবী জুড়ে সভ্যতার চাহিদায় কমে আসা জলাভূমির পরিমাণ এখন হাত মিলিয়েছে পৃথিবীর আবহাওয়া পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান আবর্তে। বিগত ১৯০০ থেকে ২০০০, এই একশো বছরে পৃথিবীর জলাভূমির পরিমাণ কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ আর সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে আবহাওয়া মণ্ডলের কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ। এখনই যদি পৃথিবীব্যাপী উন্নয়নের অভিমুখ পরিবেশবান্ধব না করে তোলা যায় তাহলে আগামী ২০৫০-এ আবহাওয়ার কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বিশ্বের আবহাওয়া পরিবর্তনকে এক বেসামাল অবস্থায় নিয়ে যাবে, এতে কোনও সন্দেহই নেই। মনে রাখা দরকার, আমাদের পৃথিবী যত সবুজ থাকবে ততই আমরা আবহাওয়ার তাপমাত্রা বেড়ে চলার পরিমাণ কমাতে পারব। আর বিশ্বের জলাভূমি, পরিমাণে সে মত নগণ্যই হোক (সাকুল্যে বাইশ লক্ষ বর্গ কিলোমিটারের মত), পৃথিবীর আবহাওয়া মণ্ডলের তাপমাত্রা কমিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন আটকাতে তার জুড়ি মেলা ভার।

গত চার দশকে ভারতের জলাভূমির পরিমাণ কমেছে এক-তৃতীয়াংশ। তার পরেও পড়ে আছে কমবেশি এগারো লক্ষ হেক্টরের মত জলাভূমি। এই জলাভূমিগুলির মধ্যে এখন ৪২টি রামসার সাইট হিসেবে সংরক্ষিত। উল্লেখযোগ্য তথ্য হল, পূর্ব ভারতের চারটি রামসার সাইটের আয়তনে উত্তর ভারতের কুড়িটি রামসার সাইটের আয়তনের চেয়ে ঢের বড়। তাই পূর্ব ভারতের বাসিন্দা হিসেবে আমাদের জলাভূমিগুলিকে রক্ষা করার লক্ষ্যে উদ্যোগী হওয়া বিশেষ জরুরি। বলাই বাহুল্য, আবহাওয়া মণ্ডলের কার্বন সরিয়ে ফেলে পূর্ব ভারতের জলাভূমিগুলি আগামী দিনে দেশের কার্বন-অডিটে উল্লেখযোগ্য জায়গা করে নেবে। আইপিসিসি-র তথ্য জানাচ্ছে, হারাতে চলেছি এমন জলাভূমিগুলির পুনরুদ্ধারের কাজে এখনই উদ্যোগী হওয়া জরুরি; কেননা তেমন পুনরুদ্ধার করা জলাভূমিও বছরে হেক্টার প্রতি ০.৪ টন কার্বন জমিয়ে তুলতে সক্ষম। এই লেখায় বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের রাজ্যের প্রথম রামসার সাইটটি (২০০২ সালের স্বীকৃতি) কার্বন সঞ্চয় করে রেখে পরিবেশের ক্রমবর্ধমান তাপ নিরাময়ে কতটা সহায়ক ভূমিকা পালন করে সেটুকুতেই এই আলোচনা সীমায়িত রাখব।

পূর্ব কলকাতা জলাভূমি: কার্বনের বিশাল ভাঁড়ার

প্রথমেই জানিয়ে রাখি, ভারতবর্ষের যে জলাভূমিটিতে দেশের ও বিদেশের বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিগত পাঁচ দশক নিরবিচ্ছিন্ন গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন সেই জলাভূমির নাম পূর্ব কলকাতার জলাভূমি। তাই গরিব দেশে মানুষের কল্যাণে জলাভূমি যে কতটা সহায়ক ভূমিকা পালন করে সেসব খবর এখন বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কলকাতা মেগাসিটি সংলগ্ন পূর্ব কলকাতা জলাভূমি (East Kolkata Wetlands; অক্ষাংশ ২২° ৩৩′-২২° ৪০′ উ.; দ্রাঘিমাংশ ৮৮° ২৫′ -৮৮° ৩৩′ পূ.) রাজ্যের প্রথম রামসার সাইট (নং ১২০৮)। কলকাতার পুবদিকে আশেপাশের এলাকাগুলিকে শহুরে পরিবেশে (urban landscape) রূপান্তরিত করে কলকাতা মেগাসিটির যে ক্রমাগত প্রসার ঘটে চলছে তাতে এই আন্তর্জাতিক তকমা পাওয়া রামসার সাইট জলাভূমিটির অস্তিত্ব এখন গুরুতর প্রশ্নের সম্মুখীন। ভূমি-ব্যবহার পরিবর্তন বিশ্লেষণে (land-use change analysis) জনবসতির ক্রমাগত আগ্রাসন সহজেই চিহ্নিত করা যায়; তাই পূর্ব কলকাতার জলাভূমি, যেটি ভারতের শহর-সন্নিহিত সবচেয়ে বড় জলাভূমি, সেটির বাস্তুতন্ত্রকে ক্রমশ নগরসভ্যতা গ্রাস করে ফেলছে। গত ষাট-সত্তর বছরে জলাভূমি ও ভেড়ি এলাকার যথাক্রমে ৩৭ শতাংশ এবং ৭৫ শতাংশ হারিয়ে যাবার পরেও কলকাতার পূর্ব প্রান্তে ১২,৫০০ হেক্টর এলাকা জুড়ে পূর্ব কলকাতা জলাভূমির বিস্তার। অথচ এই জলাভূমি, কলকাতার মানুষ ও পরিবেশের অনুকূলে বহুমাত্রিক উপকারের হাত বাড়িয়ে রেখেছে, একেবারে নিখরচায়। কিন্তু নগরায়নের লোভী হাতের কুৎসিত ছোঁয়ায় অবশিষ্ট জলাভূমির সংরক্ষণে সবচেয়ে বড় বাধা।

আশ্চর্যের খবর এই যে, অবশিষ্ট সাড়ে বারো হাজার হেক্টরের এই জলাভূমি এখনও এর বাস্তুতন্ত্রে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কার্বন আত্তীকরণ ও দীর্ঘকাল জমিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখে। ভূউষ্ণায়নের পরিপ্রেক্ষিতে একাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ এই কাজ নিখরচায় যে জলাভূমিটি করে চলেছে তার খবর আমরা ক’জন রাখি! কঠিন এবং তরল বর্জ্য বিভিন্ন জৈব এবং অজৈব পদার্থ বহন করে নানা খালের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে। এইসব বর্জ্যের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে কার্বন থাকে আর এই বর্জ্যগুলির কার্বন পূর্ব কলকাতা জলাভূমিতে ক্রমাগত জমা হতে থাকে। এছাড়া, পূর্ব কলকাতা জলাভূমিতে উদ্ভিদকণা বা ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন, জলজ শ্যাওলা, নানা রকম পানা ও অন্যান্য জলজ গাছপালা, পাড়ের স্থলজ আগাছা এবং কৃষিজ উৎপাদন ইত্যাদি বিপুল পরিমাণ কার্বন বাতাস থেকে নিরন্তর আহরণ করছে আর সেই কার্বন এই অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের বিভিন্ন স্তরে জমে থেকে যায়। তাই এই অঞ্চলের কার্বন আত্তীকরণ (assimilation), সংক্ষিপ্ত থেকে দীর্ঘ সময় সেই কার্বন জমা করে (storage) রাখে। আর জমে থাকা কার্বন বাস্তুতন্ত্রের নানান স্তরে প্রায় স্থায়ীভাবে জমিয়ে রাখার ক্ষমতা (sequestration) পূর্ব কলকাতার বাস্তুতন্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে আজ চিহ্নিত। পূর্ব কলকাতার জলাভূমি নানান কৃষিজ পণ্যের জন্য বিখ্যাত। কৃষিজাত উৎপাদনের শেষে ফসলের গোড়ায় সঞ্চিত কার্বনটুকুও ওখানে মাটিতেই মিশে থাকে। এমন নানাভাবে কার্বন আহরণ, আত্তীকরণ ও দীর্ঘকালীন সঞ্চয়ের কাজটি নিখরচায়, নীরবে করে চলেছে এই জলাভূমি। আর জলাভূমির এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি কলকাতার বাতাসের মানোন্নয়ন করছে। শুধু তাই নয়, এই কাজ ভূউষ্ণায়ন কমানোর কাজে সহযোগী হয়ে কলকাতা শহরের কার্বন পদচিহ্ন (carbon footprint) কমিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা পালন করে চলেছে।

পূর্ব কলকাতা জলাভূমিতে এই কার্বন ধারণ ক্ষমতা জলাশয়ের প্রান্তের জলার উদ্ভিদ প্রজাতির ক্ষেত্রে ১.১৭ কেজি/বর্গসেমি/বছর (শুষ্ক ভর)। পাশাপাশি, ভাসমান জলজ উদ্ভিদ প্রজাতিগুলি ০.৭৪ কেজি/বর্গসেমি/বছর কার্বন ধরে রাখছে। এই এলাকায় জন্মানো কৃষি উদ্ভিদগুলিও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাতাসের কার্বন গ্রহণ করে। নির্বাচিত আটটি কৃষিজ উদ্ভিদ ৬৩৪৩.৬ কেজি/হেক্টর কার্বন একত্রিত করে যা থেকে ২৩১৩.৬ কেজি/হেক্টর কার্বন ফসল বা সবজি সংগ্রহের পরে অবশিষ্ট অংশ হিসাবে কৃষিজমিতেই জমা হয়ে থাকে। এই জমে থাকা কার্বন শুধু মাটির কার্বন সঞ্চয়কেই বৃদ্ধি করে না বরং মাটির বিভিন্ন অনুজীব, পোকা-মাকড় ইত্যাদির পুষ্টির সহায়ক আর তাই অতিরিক্ত সার ছাড়াই পরবর্তী ফসলের জন্য মাটিকে আরও উর্বর করে তোলে। ফলত কৃষিজ উৎপাদনের অবশিষ্টাংশ কৃষিজমির উর্বরতা বাড়িয়ে এই অঞ্চলের কৃষকদের অর্থিক সুবিধা এনে দেয়। পূর্ব কলকাতা জলাভূমিতে ময়লাজলে মাছচাষ বাতাস থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কার্বন সংগ্রহ করে মূলত ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের কার্বন-আত্তীকরণের মাধ্যমে। সেই কার্বন খাদ্যজালে প্রবেশ করে বিভিন্ন খাদ্য-খাদক স্তরে ক্রমাগত জমা হতে থাকে। সেগুলির দেহাবশেষ জলের নিচে মাটির কার্বন বাড়িয়ে তুলতে থাকে। খাদ্যস্তর অনুযায়ী জলাভূমির পুকুরগুলিতে উৎপাদক স্তরে (ফাইটোপ্লাঙ্কটন) ২৩০৮.৬ ± ২৪৪.৮ মিলিগ্রাম/বর্গসেমি/দিন, প্রথম খাদক স্তরে (জুপ্লাঙ্কটন) ৩০৭ ± ১৯.৩ মিলিগ্রাম/বর্গসেমি /দিন এবং দ্বিতীয় খাদক স্তরে ১১৫৩১.৪ ± ৩১৮.২ মিলিগ্রাম/ বর্গসেমি /দিন জমা হয়। উল্লেখযোগ্য পুষ্টি-সমৃদ্ধ মাটি, জল এবং জীববৈচিত্র্যের মধ্যে কার্বন জমিয়ে রাখার জন্য জলাভূমি এলাকা কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সেসব জানা-বোঝার উপযুক্ত সময় এখনই। এখানে ৪০ প্রজাতির শৈবাল, ২ প্রজাতির ফার্ন, ৭ প্রজাতির একবীজপত্রী এবং ২১ প্রজাতির দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদ রয়েছে। জলাভূমির ময়লাজলে মাছ-চাষের ভেড়িগুলির অতিরিক্ত পুষ্টিদ্রব্য চাষিরা এমনভাবেই নিয়ন্ত্রণ করেন, যেন কখনওই ক্ষতিকর শ্যাওলার অনিয়ন্ত্রিত বাড়-বৃদ্ধি (eutrophication) না হয়। কীভাবে চাষিরা ময়লাজলের ভেড়ির উদ্ভিদ কণা, আগাছার বৃদ্ধি হ্রাস করে, অক্সিজেনের জৈব-অজৈব ক্ষয় রোধ করে এবং মাছের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার, বেড়ে ওঠার বিষয়টি নিশ্চিত করে, ভেড়ির বিভিন্ন আকার-আয়তনের জলাশয়ে কিভাবে বর্জ্য জল ব্যবহার হয়, কীভাবে কী পরিমাণ ময়লাজল কতদিনে কতটা পরিষ্কার করতে পারে, এমন নানান গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তরের মধ্যে জলাভূমির বাস্তুতন্ত্রে কার্বনের গতিবিধির অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে। প্রসারিত নগরায়ন ও উন্নয়নের মারাত্মক হাঁ-মুখ এই জলাভূমিকে গিলে খাবার আগে আরও অনেক গবেষণা দরকার; জানা দরকার শহরের বাতাসের অতিরিক্ত কার্বন সরিয়ে ফেলার মত কাজটির অর্থমূল্য এই সময়ে ঠিক কতটা! জলাভূমি যে কাজ নিখরচায় করে চলেছে তার সঠিক মূল্যায়ন এখনি দরকার। কলকাতা চর্ম-নগরী বা কলকাতা লেদার কমপ্লেক্স পূর্ব কলকাতা জলাভূমি এলাকায় তরল ও কঠিন বর্জ্য কী পরিমাণ কার্বন সংযোজন করছে এবং জলাভূমির গাছপালা, কৃষি ও মাছচাষে কার্বন আত্তীকরণ ও পৃথকীকরণের পরিমাণ জানার জন্য কিছু গবেষণা হয়েছে। এছাড়াও, বিভিন্ন ভৌত-রাসায়নিক অবস্থার মূল্যায়ন, জৈব পদার্থের পরিমাণ, পচনের হার ও কার্বন নির্গমন এবং সংযোজন, কার্বনের স্থায়ী পৃথকীকরণে কৌশল আরও বিশদ গবেষণায় অনুসন্ধান করা জরুরি। পূর্ব কলকাতার জলাভূমির আবর্জনা নির্ভর চাষাবাদ আর ময়লাজলে মাছচাষ যথাযথ সরকারি উৎসাহ পেলে অদূর ভবিষ্যতে কার্বন ক্রেডিটের আওতায় আনা যায়। সেইসঙ্গে এই অঞ্চলের কর্মীবাহিনীও কার্বন ক্রেডিট থেকে আর্থিকভাবে আরও লাভবান হতে পারে। তেমনটি হলে প্রান্তিক কৃষি-শ্রমিক ও কৃষক সমাজের কাছে পরিবেশ চেতনা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূক্ষ্ম যোগাযোগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠবে। এমনকি ভারতবাসীর জন্য পরিবেশের সুস্থতা ও আর্থিক উন্নয়নের আন্তঃসম্পর্কটিও স্পষ্ট হয়ে উঠত। স্বচ্ছ পরিবেশ নীতি ও কল্যাণকর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া একাজ কখনও সম্ভব হবে না। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন নিবারণে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, সামগ্রিক সমাজ উন্নয়ন এবং পরিকল্পিত নগরায়নে কার্বন কয়েন অর্জনে সাধারণ মানুষের ভূমিকা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

কলকাতা শহরের জন্য তার জলাভূমিটি পরিবেশ সংরক্ষণে সুস্থিত সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে সারা দুনিয়ায় বিবেচিত হলেও রাজ্যে সেটি কোনও কদর পেল না। এই জলাভূমি কলকাতার প্রায় দেড়-দু কোটি বাসিন্দার জন্য প্রতি বছর প্রায় তিনলক্ষ টন অক্সিজেন জুগিয়ে চলেছে। ময়লাজল-আবর্জনার কার্বনের ৬০ শতাংশ কার্বন জমা করে রাখে এই অবাক জলাভূমি। হিসেব বলে, প্রতিদিন শ্বাসকাজ, যানবাহন আর শহর-সন্নিহিত ছোট আর মাঝারি শিল্পের মোট বর্জ্য কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ প্রায় ৩৫০০ টন। তার বিপুল অংশ জলার গাছপালা ধরে রাখে; বছরে প্রতি বর্গ মিটার পিছু প্রায় দুই কিলোগ্রাম কার্বন। এই জলাভূমি না থাকলে আরও কত বেশি কার্বন আবহাওয়া উষ্ণ করে তোলার কাজে হাত মেলাত বেশ বোঝা যায়। হিসেব বলে ৩০ থেকে ৪০ মিটার পুরু কার্বনযুক্ত পলি-স্তরের ওপরে আমাদের কলকাতা শহর দাঁড়িয়ে। সাড়ে বারো হাজার হেক্টর জলাভূমিটি বিপুল পরিমাণ কার্বন এই পলিস্তরে আটকে রাখার পাশাপাশি মাটির নিচে স্বাদু পেয় জল জমিয়ে রাখার বন্দোবস্ত করছে। এসব কাজের গুরুত্ব আমরা আর কবে বুঝব!

পূর্ব কলকাতার জলাভূমি সংরক্ষণের এক অন্যতম পথিকৃৎ ড. ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ বিশ্বাস করতেন যে “Serendipity” বাংলায় যার অর্থ যদি করি ‘হাতের লক্ষ্মী’— তার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য উদাহরণ আমাদের দেশের জলাভূমিগুলি। জলাভূমির নানান সাশ্রয়ী পরিষেবা কলকাতাকে “ecologically subsidized city” অর্থাৎ ‘বাস্তুতান্ত্রিক ভর্তুকিপ্রাপ্ত শহর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের যেসব আইনি সুরক্ষার বন্দোবস্ত আছে তার অন্যতম আইনটি হল “পূর্ব কলকাতা জলাভূমি, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৬।’’ এই আইনটিতে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি বাস্তুতন্ত্রের যেকোনও পরিবর্তনের জন্য দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের ভারতীয় মুদ্রায় এক লক্ষ টাকা জরিমানা এবং ৩ বছরের কারাদণ্ডের বিধান দেওয়া হয়েছে। এই জলাভূমি সংরক্ষণ করতে হলে কঠোর আর নিরপেক্ষভাবে এই আইন বলবৎ করতে হবে। নানান অজুহাতে বাংলার এই প্রথম রামসার সাইটকে আত্মসাৎ করতে সক্রিয় ও সর্বদা উৎসুক হয়ে আছে দুষ্টচক্র।

উপসংহার

বর্তমান সময় সঠিক সুস্থিত (sustainable) প্রযুক্তি-নির্ভর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করার সময়। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মত ভারতবর্ষ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহায্যে, ২০৪০ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশ হওয়ার পরিকল্পনা করছে। নগরকেন্দ্রিক ভারতসহ বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশই উদার পুঁজিবাদের ওপর ভর করে নগরায়ন দ্রুত প্রসারিত করছে। রাষ্ট্রপুঞ্জর “ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেসান প্রসপেক্ট ২০১৪” অনুসারে, ১৯৫০-এর দশকে বিশ্বে নগরকেন্দ্রিক জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৩০ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৫৪ শতাংশ এবং ২০৫০-এ তা ৬৬ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছাবে (United Nations, 2015)। সেই হারে যে পরিবেশের ওপর আরও আরও চাপ বাড়তে থাকবে, সেকথা বলাই বাহুল্য। উন্নয়ন মানে যে প্রকৃতির অপার দাক্ষিণ্য উপেক্ষা করা নয় আর তেমনটি করলে মানুষেরই বড় ক্ষতি, আমাদের কলকাতা শহর সন্নিহিত জলাভূমি তার বড় উদাহরণ।

প্রাকৃতিক কারণেই যেকোনও জলাভূমির চরিত্র বদল হতে থাকে; জলাভূমির বিপুল পরিমাণ আগাছা মরে পচে সেখানেই জমতে থাকে। একই সঙ্গে বছরের পর বছর পলি জমে জলাভূমিগুলি কালক্রমে ধীরে ধীরে শুষ্ক স্থল-ভূমিতে পরিণত করে যা শুধুমাত্র ভরা বর্ষার মরসুমে জল ধরে রাখে। এই সুদীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক কারণে পাল্টে চলা জলাভূমির এলাকাগুলি সহজেই লোভী ক্ষমতাবান প্রোমোটারদের দখলে চলে যায়। সমগ্র ভারতের জলাভূমিও সর্বগ্রাসী উন্নয়নের চাপের সম্মুখীন তা বলাই বাহুল্য। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এই দুইয়ের অভাবে দেশের জলাভূমি এলাকাগুলি দখল করে উন্মত্ত নির্মাণ কাজ বেড়েই চলেছে। বলা বাহুল্য, এমন চাপের ফলে আমাদের কলকাতার জলাভূমিটিও হয়তো তার আন্তর্জাতিক তকমা ও আইনগত অধিকার অচিরে হারিয়ে ফেলবে। এ দেশের অসংখ্য জলাভূমি বিভিন্ন কাজের সুফল ও বিপুল আর্থিক সাশ্রয়কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে উন্নয়নের অজুহাতে অধিগৃহীত হয়েছে। ভূউষ্ণায়ন আটকাতে কার্বন জমিয়ে রেখে, কলকাতার বাতাসকে নির্মল করার কাজ অথবা ভূগর্ভস্থ পেয় জলের ভাণ্ডার ভরিয়ে তোলা, এমনকি প্রায় দেড়লক্ষ মানুষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ রুটি-রোজগার এসব কিছুই হাজার-হাজার কোটি টাকার জমি কেনা-বেচা আর আবাসন ব্যবসায়ের সঙ্গে কখনও পাল্লা দিয়ে উঠে পারবে কি! পরিবেশের হিতাকাঙ্ক্ষী মানুষের সঙ্ঘবদ্ধ প্রতিবাদ, আন্তর্জাতিক পরিবেশবিদদের সমর্থন আর সুচিন্তিত বিজ্ঞান-নির্ভর ব্যবস্থাপনার রূপরেখা দেশের জলাভূমি এলাকাগুলিকে বাঁচাতে সুস্থ সামাজিক-রাজনৈতিক পদক্ষেপ আদায় করে নিতে পারবে, একথা নিশ্চিত বলা যায়।

চিত্র: গুগল
5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
সিদ্ধার্থ মজুমদার Siddhartha Majumdar
সিদ্ধার্থ মজুমদার Siddhartha Majumdar
1 year ago

গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি লেখা

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »