Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

বিজ্ঞান-লেখক সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

তাঁর কথা আমরা কে না জানি। ‘সাহিত্য সম্রাট’ তিনি। যাঁর নামের আগে ‘সাহিত্য সম্রাট’— সেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানের লেখা লিখেছেন। সত্যিই অভাবনীয়। স্বনামধন্য সাহিত্যিক, মাতৃভাষায় সবার বোঝার মত করে বিজ্ঞানের বিষয় নিয়ে লিখছেন— এমন কথা শুনলে আশ্চর্য লাগে বৈকি। ১৮৭৫ সালে প্রকাশিত তাঁর লেখা সেই বইটির নাম ‘বিজ্ঞান রহস্য’। ১৪৭ বছর আগে চিত্তাকর্ষক বিজ্ঞানের কথা লেখা হয়েছিল সবার কাছে বিজ্ঞানকে পৌঁছে দেওয়ার জন্যে। পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীদের গবেষণালব্ধ জ্ঞান এবং বিজ্ঞান লেখাগুলি পড়ে সেগুলি আত্মস্থ করে বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা ভাষায় লিখেছেন। বলা বাহুল্য তাঁর এই বিজ্ঞান বিষয়ের লেখার উদ্দেশ্য ছিল বিজ্ঞান মানসিকতা তৈরি করা, বিজ্ঞান সম্পর্কে সবার মনে কৌতূহল সঞ্চারিত করা।

‘বিজ্ঞান রহস্য’ বইটির মধ্যে রয়েছে মোট ন’টি রচনা। বই হিসেবে প্রকাশ পাওয়ার আগে রচনাগুলি প্রথম ছাপা হয়েছিল ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায়। কী কী বিষয়ের ওপর সেই লেখাগুলি? বইয়ের প্রথম রচনাটির নাম ‘আশ্চর্য্য সৌরোৎপাত’। পরে আছে— ‘আকাশে কত তারা আছে?’, ‘ধূলা’, ‘গগনপর্য্যটন’, ‘চঞ্চল জগৎ’, ‘কত কাল মনুষ্য?’ ‘জৈবনিক’, ‘পরিমাণ রহস্য’, ‘চন্দ্রলোক’ ইত্যাদি।

প্রথম লেখাটিতে সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব বোঝাতে কী সুন্দরভাবে বলেছেন সেই নমুনা একটু তুলে ধরতে লোভ হল। পড়ুন সেই লাইনগুলি— “যদি পৃথিবী হইতে সূর্য্য পর্য্যন্ত রেইলওয়ে হইত, তবে কত কালে সূর্যালোকে যাইতে পারিতাম? উত্তর— যদি দিন রাত্রি ট্রেণ, অবিরত, ঘণ্টায় বিশ মাইল চলে, তবে ৫২০ বৎসয় ৬ মাস ১৬ দিনে সূর্যলোকে পৌছান যায়। অর্থাৎ যে ব্যক্তি ট্রেণে চড়িবে, তাহার সপ্তদশ পুরুষ ঐ ট্রেণে গত হইবে।”

এইভাবে নানান বিষয়গুলি সকলের বোঝার মত আর কী প্রাঞ্জলভাবে উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন। এখানে বেশি কথা লিখে লেখার কলেবর না বাড়িয়ে বরং ‘বিজ্ঞান রহস্য’ বই থেকে ‘আশ্চর্য্য সৌরোৎপাত’ রচনাটির প্রারম্ভিক অংশ তুলে দিলাম এখানে।

‘‘১৮৭১ শালে সেপ্টেম্বর মাসে আমেরিকা-নিবাসী অদ্বিতীয় জ্যোতির্ব্বিদ্ ইয়ঙ্ সাহেব যে আশ্চর্য্য সৌরোৎপাত দৃষ্টি করিয়াছিলেন, এরূপ প্রকাণ্ড কাণ্ড মনুষ্য চক্ষে প্রায় আর কখন পড়ে নাই। তত্তুলনায় এট‍্না বা বিসিউবিয়াসের অগ্নিবিপ্লব, সমুদ্রোচ্ছ্বাসের তুলনায় দুগ্ধ-কটাহে দুগ্ধোচ্ছ্বাসের তুল্য বিবেচনা করা যাইতে পারে।

যাহারা আধুনিক ইউরোপীয় জ্যোতির্ব্বিদ্যার সবিশেষ অনুশীলন করেন নাই, এই ভয়ঙ্কর ব্যাপার তাঁহাদের বোধগম্য করার জন্য সূর্য্যের প্রকৃতিসম্বন্ধে দুই একটি কথা বলা আবশ্যক।

সূর্য্য অতি বৃহৎ তেজোময় গোলক। এই গোলক আমরা অতি ক্ষুদ্র দেখি, কিন্তু উহা বাস্তবিক কত বৃহৎ, তাহা পৃথিবীর পরিমাণ না বুঝিলে বুঝা যাইবে না। সকলে জানেন যে, পৃথিবীর ব্যাস ৭০৯১ মাইল। যদি পৃথিবীকে এক মাইল দীর্ঘ, এক মাইল প্রস্থ, এমত খণ্ডে খণ্ডে ভাগ করা যায়, তাহা হইলে, ঊনিশ কোটি, ছষট্টি লক্ষ, ছাব্বিশ হাজার এইরূপ বর্গ মাইল পাওয়া যায়। এক মাইল দীর্ঘে, এক মাইল প্রস্থে এবং এক মাইল ঊর্দ্ধে, এরূপ ২৫৯,৮০০০০০,০০০ ভাগ পাওয়া যায়। আশ্চর্য্য বিজ্ঞানবলে পৃথিবীকে ওজন করাও গিয়াছে। ওজনে পৃথিবী যত টন হইয়াছে, তাহা নিম্ন অঙ্কের দ্বারা লিখিলাম। ৬,০৬৯,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০। এক টন সাতাশ মনের অধিক।

এই সকল অঙ্ক দেখিয়া মন অস্থির হয়; পৃথিবী যে কত বৃহৎ পদার্থ, তাহা বুঝিয়া উঠিতে পারি না। এক্ষণে যদি বলি যে, এমত অন্য কোন গ্রহ বা নক্ষত্র আছে যে, তাহা পৃথিবী অপেক্ষা, ত্রয়োদশ লক্ষ গুণে বৃহৎ, তবে কে না বিস্মিত হইবে? কিন্তু বাস্তবিক সূর্য্য পৃথিবী হইতে ত্রয়োদশ লক্ষ গুণে বৃহৎ। ত্রয়োদশ লক্ষটি পৃথিবী একত্র করিলে সূর্য্যের আয়তনের সমান হয়।

তবে আমরা সূর্য্যকে এত ক্ষুদ্র দেখি কেন? উহার দূরতাবশতঃ। পূর্ব্বতন গণনানুসারে সূর্য্য পৃথিবী হইতে সার্দ্ধ নয় কোটি মাইল দূরে স্থিত বলিয়া জানা ছিল। আধুনিক গণনায় স্থির হইয়াছে যে, ৯১,৬৭৮০০০ মাইল অর্থাৎ এক কোটি, চতুর্দ্দশ লক্ষ, উনসপ্ততি সহ সার্দ্ধ সপ্তশত যোজন, পৃথিবী হইতে সূর্যের দূরতা।[১] এই ভয়ঙ্কর দূরতা অনুমেয় নহে। দ্বাদশ সহস্র পৃথিবী শ্রেণীপরম্পরায় বিন্যস্ত হইলে, পৃথিবী হইতে সূর্য্য পর্যন্ত পায় না।

এই দূরতা অনুভব করিবার জন্য একটি উদাহরণ দিই। অম্মদাদির দেশে রেলওয়ে ট্রেণ ঘণ্টায় ২০ মাইল যায়। যদি পৃথিবী হইতে সূর্য্য পর্য্যন্ত রেইলওয়ে হইত, তবে কত কালে সূর্যালোকে যাইতে পারিতাম? উত্তর—যদি দিন রাত্রি ট্রেণ, অবিরত, ঘণ্টায় বিশ মাইল চলে, তবে ৫২০ বৎসয় ৬ মাস ১৬ দিনে সূর্যলোকে পৌছান যায়। অর্থাৎ যে ব্যক্তি ট্রেণে চড়িবে, তাহার সপ্তদশ পুরুষ ঐ ট্রেণে গত হইবে।

এক্ষণে পাঠক বুঝিতে পারিবেন, যে সূর্য্যমণ্ডলমধ্যে যাহা অণুবৎ ক্ষুদ্রাকৃতি দেখি তাহাও বাস্তবিক অতি বৃহৎ। যদি সূর্য্য মধ্যে আমরা একটি বালির মত বিন্দুও দেখিতে পাই, তবে তাহাও লক্ষ ক্রোশ বিস্তার হইতে পারে।

কিন্তু সূর্য্য এমনি প্রচণ্ড রশ্মিময় যে, তাহার গায়ে বিন্দু বিসর্গ কিছু দেখিবার সম্ভাবনা নাই। সূর্য্যের প্রতি চাহিয়া দেখিলেও অন্ধ হইতে হয়। কেবল সূর্যগ্রহণের সময়ে সূর্যতেজঃ চন্দ্রান্তরালে লুক্কায়িত হইলে, তৎপ্রতি দৃষ্টি করা যায়। তখনও সাধারণ লোকে চক্ষের উপর কালিমাখা কাঁচ না ধরিয়া, হৃততেজা সূর্য্য প্রতিও চাহিতে পারে না।’’ ১. নূতন গণনায় আরো কিছু বাড়িয়াছে।

২৬ জুন বঙ্কিমচন্দ্রের (১৮৩৮-১৮৯৪) জন্মের তারিখ। সাহিত্য সম্রাট এবং বিজ্ঞান অনুরাগী বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মদিনে আমরা তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই।
চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × two =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »
সালমিন রহমান

বেলুচিস্তান সংকট মোকাবিলা কতটা সহজ

বেলুচিস্তানের সংকটকে কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদ কিংবা কেবল নিরাপত্তা সমস্যার দৃষ্টিতে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি বোঝা যায় না। এখানে ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, প্রাকৃতিক সম্পদ, উন্নয়ন বৈষম্য, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা— সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্বাধীন বেলুচিস্তান গঠিত হলে বহু মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে পারে। একই সঙ্গে একটি নতুন রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াবে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা। অন্যদিকে, পাকিস্তান, চীন, ভারত এবং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও দুই বিখ্যাত বাঙালি

কী অসাধারণ শিক্ষাই না আমরা পেতে পারি, উৎসাহিত হয়ে পারি খেলোয়াড়দের থেকে! একটি উদাহরণ: প্রথম বিশ্বকাপে সোনাজয়ী উরুগুয়ে দলে ছিলেন হেক্টর কাস্ত্রো। তেরো বছর বয়সে মেশিনে তাঁর ডানহাত কাটা পড়েছিল। অদম্য উৎসাহে তিনি ফুটবল খেলেছেন, জাতীয় দলে স্থান করে নিয়েছেন, আর ফাইনালে জয়সূচক গোলটিও তাঁর-ই করা! তাঁর স্বদেশবাসী তাঁকে ডাকতেন— ‘এল ডিভিনো মানকো’, অর্থাৎ একহাত-বিশিষ্ট ঈশ্বর।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আমেরিকার স্বাধীনতা: আড়াইশো বছর

১৬০৭ থেকে ১৭৮৩ পর্যন্ত সময়কাল আমেরিকায় ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক রাজত্ব। আজকের দিনে যে আমেরিকা, তা কিন্তু পুরোটা ব্রিটিশদের দখলে ছিল না। ছিল ভার্জিনিয়া, ম্যাসাচুসেটস, নিউ ইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া-সহ ১৩টি রাজ্য। আর কানাডার বেশ কিছু অঞ্চল। আমেরিকার অন্যান্য স্থানে ফরাসি, ডাচ, নরওয়েজিয়, সুইডিস উপনিবেশ-ও ছিল। তাছাড়া রাশিয়া আমেরিকার আলাস্কা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত দখল করে। পরে সে আলাস্কা আমেরিকার কাছে বিক্রিও করে দেয়।

Read More »
অপরাজিতা মৈত্র

গোদাবরীর গোমুখে

গঙ্গার মর্ত্যে আগমন নিয়ে যেমন ভগীরথের গল্প, তেমনই গোদাবরীর উৎসস্থলে না এলে জানা যেত না, দক্ষিণের গঙ্গা নিয়েও আছে হাজার গল্প। যে গল্প জানাবে আজও এই অঞ্চলের মানুষ অনেক সময়েই কাছাকাছি আর কোনও পানীয়জল না পেয়ে কষ্ট করে হলেও এই উৎসস্থলে এসেই শীতল এই পানীয়জল নিয়ে যান নিজেদের কাজের জন্য। গঙ্গা বা অন্য নদী সে শুধু ধার্মিক আবেগের কারণে পবিত্র না, হাজার প্রাণীর ‘তৃষ্ণা’ মেটাবার জন্য সে হয়ে ওঠে ‘দেবী’ বা ‘পবিত্র’। সে পথে মিশে যায় হাজার গল্প-কষ্ট কিংবা দিনযাপনের চরম বাস্তবতা।

Read More »
রুহ

রুহের কবিতাগুচ্ছ

একই আলোকমালায় কাটিয়েছি/ বহুকাল দু’জনে…/ বলিনি কখনও।/ তারা খসা দেখেছি একসাথে, যদিও/ গোপন থেকেছে চাওয়া-পাওয়া।/ মাঝে বহুদিন, বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো/ একা… নীরবে বয়েছি যাতনা।/ আজ মিথ্যের নেই অবকাশ/ তোমাকে কি পড়েনি মনে/ কোনও মুহূর্ত বা ক্ষণে/ ভাবিনি কি একান্ত বন্ধু আমার—/ এতদিন পরে, পুনর্মিলনে বলেছ/ পাখি হতে চেয়েছিলে এ জীবনে

Read More »