Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

বিশেষ নিবন্ধ: মিতা নাগ ভট্টাচার্য

আমেদাবাদ, গান্ধীনগরের বসন্তসময়

এ এক মধুর সময়। না অসহ্য গরম, না জলজ স্যাঁতসেঁতে বাতাস। স্নিগ্ধ নির্মল আকাশে ফাগুনের আবাহন আবীর দিয়ে। পলাশে, শিমুলে, অশোকে, চাঁপাফুলে বসন্ত যেন জাগ্রত দ্বারে। এ হেন সময় বাংলার বাইরে কেমনভাবে চলে দোলের পরব, তার সঙ্গে ন্যাড়াপোড়া, তা নিয়ে আজ একটু কলম চালনা।
আজ বলব গুজরাটের কথা। আমেদাবাদ এয়ারপোর্ট ছাড়িয়ে প্রায় ঘণ্টা খানেকের পথ গান্ধীনগরের পালাজ। অবশ্যই গাড়িতে। এখানে অটোও পাওয়া যায় ফোন মারফত। পালাজে কালীমাতা মন্দিরে সন্ধ্যায় আরতি হয় রোজ। জাগ্রত কালীমাতা। দোল উৎসব উপলক্ষে আলোকমালায় খুব সুন্দর করে সাজানো হয় সমগ্র মন্দির চত্বর। স্থানীয় মানুষ ছাড়াও দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন ন্যাড়াপোড়া দেখতে। কাছাকাছি বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা যারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছেন, তারাও মহা উৎসাহে সামিল হন। এই বৃহদাকার বুড়ির ঘর পোড়া বা ন্যাড়াপোড়া আর কোথাও দেখিনি। অনেকদিন আগে থেকে কাঠ জড়ো করা হয়। বিশাল বিশাল গাছের কাণ্ড আর গুঁড়ি দিয়ে বুড়ির ঘর বানানো হয়। তিন-চারতলা বাড়ির সমান উঁচু। আগুন জ্বালানো দেখতে হাজির শয়ে শয়ে মানুষ। আগুন প্রদক্ষিণ করে ঘুরছে সব মানুষ। গায়ে এসে লাগছে তাপ, তবু কী এক নেশায় মানুষ আগুন প্রদক্ষিণ করে চলেছে। হঠাৎ করে কানে এল সমবেতভাবে ‘আজ আমাদের ন্যাড়াপোড়া কাল আমাদের দোল, পূর্ণিমাতে চাঁদ উঠেছে বলো হরিবোল!’
বাংলার ধ্বনি শুনে পুলকিত মন সমস্বরে শব্দ তুলল। এদিকে আগুনের লেলিহান শিখা, তার পিছনে পূর্ণিমার পূর্ণচাঁদ সম্রাট। অপূর্ব অনুভব এক। বসেছে বিরাট মেলা মন্দিরের বাইরে সমগ্র চত্বর জুড়ে।
ওদিকে মন্দিরে চলছে পুজো, মন্ত্রোচ্চারণ। জনসমাগমে আলোকিত জীবন এক। সরাসরি মন্দিরের ভিতরের দৃশ্য দেখানো হচ্ছে দূরদর্শনে।
মহিলা পুলিশের দল সতর্ক পাহারায় রত। কথা বললাম, মহিলা পুলিশ বাহিনীর কৌশল এবং পঞ্চাল দেবীর সঙ্গে। জানালেন, এক দিনের জন্য মেলা বসে। প্রচুর লোকসমাগম হয়। ভাল লাগল সবার জন্য চায়ের ব্যবস্থা। বিনামূল্যে। তিন জায়গা থেকে প্রসাদ বিতরণ হচ্ছে। বোঁদে আর নকুলদানা।
সমগ্র পরিবেশ কী এক পবিত্র আনন্দময়তায় পূর্ণ।

পর দিনের কথায় আসি। পালাজ গাঁও পিছনে রেখে বৈষ্ণো দেবী মন্দির ছাড়িয়ে গান্ধীনগর পেরিয়ে আমেদাবাদ কালীবাড়ির বসন্তোৎসব পালনের অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয় রবীন্দ্রনাথ এখনও কত প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রসঙ্গীতের তালে তালে চলল নাচ।
ছোটবড় সকলে মিলে আবির আর ফুল দিয়ে চলল দোল উৎসব। সঙ্গে ছিল স্বরচিত কবিতা পাঠ, গল্পপাঠ, গান, নাচ। দুপুরে নিরামিষ খাওয়ার ব্যবস্থা যত্ন সহকারে। চাঁদা দিয়ে অবশ্য।
শান্তিনিকেতনের দোলবাহার আমাদের প্রাণের উৎসব। বাঙালি তাই সুদূরে বসেও পালন করছে দোল উৎসব। আমেদাবাদ কালীবাড়িতে মা কালীকে দর্শন করা যাবে বেলা দুটো পর্যন্ত। কাঠের দরজা কিছু সময়ের জন্য বন্ধ। ১৯৩৮ সাল থেকে আমেদাবাদ কালীবাড়ির যাত্রা। রয়েছে রাধাকৃষ্ণ মূর্তি৷ সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে মায়ের দর্শন মেলে। দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ির মূর্তির ধাঁচে মায়ের মূর্তি।
সমস্ত পরিবেশের সবুজ আবহে মনে হয় ঈশ্বর সর্বত্র একমেবাদ্বিতীয়ম্।

Advertisement

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 5 =

Recent Posts

গৌতম চক্রবর্তী

ব্রিটিশ ছোটগল্প

আমি আগে থেকেই আমেরিকার পাখি বইটি সম্পর্কে জানতাম, কিন্তু কখনও বইটির সঙ্গে তেমনভাবে সময় কাটাইনি। ঠিক যেভাবে কেউ নদীর ধারে বসে সময় কাটায়। বাবার হাসপাতালের শয্যার পাশে বসে থাকতে থাকতে আমি যেন ধৈর্যের অর্থ শিখে নিয়েছিলাম। অপেক্ষা করতে শিখেছিলাম। এডি ঠিকই বলেছিল— আমিও মাছ ধরতে যেতে চাইছিলাম। জলের ধারে বসে থাকতে চাইছিলাম। কিন্তু বাবাকে দেখতে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও কাজে বাড়ি থেকে বেরোনো সম্ভব হয়নি। তাই আমি অডুবন-এর সরোবরসম বইয়ে আমার জাল ফেললাম।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের বিস্ফোরণ: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক নীরব পূর্বাভাস

পণ্যের এই ভয়াবহ সঞ্চালন সংকটে পড়ে পুঁজিপতিরা এখন আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তাই অবিক্রীত পণ্য গছিয়ে দেওয়ার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞাপনের প্রচার চালানো হচ্ছে। এই সুযোগেই বিশ্বজুড়ে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েশন’ বা আধেয় নির্মাণের এক নজিরবিহীন বিস্ফোরণ ঘটেছে। যখন বিশ্বের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ দু’বেলা অন্নসংস্থানে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ইন্টারনেটে ছোটখাটো ভিডিও প্রচার করে ক্রিয়েটররা বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন। এটি আসলে জমে যাওয়া শ্রম ও পণ্যের এক অস্বাভাবিক বণ্টন প্রক্রিয়া। যে পণ্যের রিভিউ করে একজন ক্রিয়েটর লাখ লাখ টাকা আয় করছেন, সেই পণ্যের প্রকৃত উৎপাদনকারী শ্রমিক হয়তো আজ কর্মহীন কিংবা নিম্নতম মজুরিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চন্দ্রাবতী: বঙ্গের প্রথম পদকর্ত্রী

চন্দ্রাবতীর জীবনের যেটি শ্রদ্ধেয় দিক, তা হল গরলকে অমৃতে পরিণত করা। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোককে কাটিয়ে উঠে একাগ্রতা নিয়ে পঠনপাঠন‌ ও সৃষ্টিকর্মে মন দেন। পিতাকে সহায়তা করেন কাব্যরচনায়। ১৫৭৫ নাগাদ, যখন চন্দ্রাবতীর বয়স মাত্র পঁচিশ, সেসময় তিনি পিতার লেখা মনসার ভাসান-এ সহযোগিতা করেছিলেন। তারপর একের পর এক নিজস্ব রচনায় ভাস্বর হয়ে থাকে তাঁর কারুবাসনা।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইসলাম

হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি ‌বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের‌ সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়‌ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।

Read More »
তপোমন ঘোষ

কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে…

হঠাৎ চোখ পড়ে বুথের এক্সিট দরজাটার দিকে… একটা ছোট্ট ছায়া ঘোরাফেরা করছে! চমকে উঠে সে দেখে, সেই বাচ্চাটা না! মায়ের কোলে চড়ে এসেছিল… মজা করে পোলিং অফিসার তার ছোট্ট আঙুলে লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভোটের কালি। হুড়োহুড়িতে মা ছিটকে গেছে কোথাও— নাকি আরও খারাপ কিছু! বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে তার। শুনশান বুথে পোলিং আর সেক্টর অফিসার গলা যথাসম্ভব নিচুতে রেখে ডাকতে থাকেন বাচ্চাটাকে। একটা মৃদু ফোঁপানি… একটা হালকা ‘মা মা’ ডাক— বাচ্চাটা এইসব অচেনা ডাকে ভ্রূক্ষেপও করে না, এলোমেলো পায়ে ঘুরতে থাকে।

Read More »