মনাদার আমসত্ত্ব
ছোটবেলা থেকেই আমি খুব আমসত্ত্ব খেতে ভালবাসি। আর সে আমসত্ত্ব যদি মনাদার হয়, তবে তো কথাই নেই।
ট্রেনপথে বনগাঁ লাইনে এক সময় এই মনাদার আমসত্ত্বের বেশ কদর ছিল। তা ছাড়া তার আমসত্ত্ব ফেরি করবার কায়দাটাও ছিল জব্বর, ‘অ্যাই যে দাদা, লেকচার বা গলাবাজি নয়, এক বার খেলেই বুঝবেন কাকে বলে আমসত্ত্ব।’
দিন গড়িয়েছে, বয়সও গড়িয়েছে খানিকটা। অন্য অনেক কিছুর মতোই মনাদার আমসত্ত্বও হারিয়ে গেছে আমার জীবন থেকে। কারণ, বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সে চাকরি করি। পোস্টিং পাঞ্জাবের জলন্ধরে। তাই দেশ-গাঁয়ে আর তেমন থাকা হয়ে ওঠে না।
অনেক দিন পর ছুটি পেয়ে বাড়ি ফিরছি। মনটাও বেশ খুশি খুশি। কিন্তু সেই খুশি খুশি ভাবটা বেশিক্ষণ রইল না। কারণ হাওড়া স্টেশনে নামতেই সন্ধে সাতটা বেজে গেল। এদিকে নিম্নচাপের দরুন আবহাওয়াও বিরূপ। মনে হচ্ছে কেউ যেন গায়ে একের পর এক বর্শা ছুড়ে মারছে।
অনেক চেষ্টাচরিত্র করে একটা ট্যাক্সি থামালাম, ‘অ্যাই ট্যাক্সি, শেয়ালদা যাবে?’ ট্যাক্সিওয়ালা যেতে চাইল। তবে আড়াইশো টাকা ভাড়া চেয়ে বসল।
বললাম, ‘আড়াইশো টাকা কেন? মিটারে যা উঠবে তাই দেব।’
লোকটা বাঙালি। সিড়িঙ্গেপানা চেহারা। ভাঙা চোয়ালে বসন্তের দাগ। কণ্ঠার হাড়ও অনেকটা বেরিয়ে আছে। দেখলেই বোঝা যায় নেশাভাঙ করে। আমার কথা শুনে ডাঁট দেখিয়ে বলল, ‘তা হলে যেতে পারছি না, আপনি বরং অন্য ট্যাক্সি দেখে নিন।’
রাগ হলেও উপায় ছিল না। আমার জওয়ানি মেজাজ প্রশমিত করতেই হল। লোকটার শর্ত মেনে ঝপ করে উঠে পড়লাম ট্যাক্সিতে।
একে ঝড়-বাদলের রাত। তার ওপর প্রায় দু-দিনের ট্রেন জার্নির ধকল। শরীর আর বইছে না। ট্যাক্সির সিটে এলিয়ে দিলাম নিজেকে।
শেষ পর্যন্ত যখন শিয়ালদহ পৌঁছলাম, তখন ঘড়িতে আটটা দশ। ভিজে একশা হয়ে কোনও মতে স্টেশন চত্বরে গিয়ে ঢুকলাম। তারপর তড়িঘড়ি টিকিট কেটে উঠে পড়লাম গোবরডাঙ্গা লোকালে।
ট্রেনটা প্রায় খালিই ছিল। পছন্দসই একটা সিট বেছে নিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে বসলাম আমি। নামব প্রান্তিক স্টেশনে। একে শনিবার। তার ওপর ঠান্ডার মধ্যে এলোপাথাড়ি ঝড়-বাদলায় কাহিল মানুষজন সব আগেভাগেই ফিরে গেছে। সবাই যেন কেমন চুপচাপ! দু-একজন মাথা নীচু করে বোধ হয় কাঁপুনি সামলাচ্ছে। একজন তো হেঁচে উঠল– হ্যাঁচ্চো।
বারাসত আসতেই বেশিরভাগ প্যাসেঞ্জার নেমে গেল। আর ট্রেনের গতিও বেড়ে গেল। আমার কম্পার্টমেন্টে যে দু-চারজন লোক বসেছিল, হাবরা আসতেই তারা সব দুদ্দাড় করে নেমে পড়ল। ট্রেনও আবার চলতে শুরু করল।
পুরো কম্পার্টমেন্টটায় এখন আমি ছাড়া দ্বিতীয় কোনও প্যাসেঞ্জার নেই।
তার ওপর সংহতি পার হতেই হুট করে সব আলো কেন যেন নিভে গেল। অন্ধকারের বুক চিরে ছুটে চলেছে ট্রেন। বুক যে একটু ঢিপঢিপ করছিল না, তা বলব না। কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই ভয় কেটে গেল একজন হকারের আবির্ভাবে, ‘অ্যাই যে দাদা, কী ভাবছেন? অত ভাবতে হবে না। সস্তায় মনাদার আমসত্ত্ব নিয়ে যান।’
সাবাশ! এই ঝড়-বদলার রাতেও মনাদা আমসত্ত্ব নিয়ে হাজির। যাক শেষ পর্যন্ত তবে একজন সঙ্গী পাওয়া গেল। তাই গা ছমছম করা ভাবটাও নিমেষে উধাও।
কত দিন পরে বাড়ি ফিরছি। কিন্তু তাড়াহুড়োয় কিছু আর কেনা হয়ে ওঠেনি। ভাবলাম খানিকটা আমসত্ত্ব নিয়ে যাই। সবাই খুশি হবে। তাই বললাম, ‘ও মনাদা, কেজিটাক আমসত্ত্ব দাও তো। এসো এদিকে।’
‘যাই বাবু।’ মনাদা আমসত্ত্বের ঝুড়িটা নামাল আমার সামনে। তার পর আমসত্ত্ব মাপতে শুরু করে দিল।
আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এই ঝড়-জলের রাতে বেরিয়েছ কেন?’
আমার প্রশ্নের কোনও উত্তর না-দিয়ে ঝটপট মনাদা আমসত্ত্বের ঠোঙাটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘এই নিন। খুব ভাল আমসত্ত্ব, একবার খেলে আবার নিতে হবে।’ আমসত্ত্ব দেওয়ার সময় সব খদ্দেরকেই সে এমনটা বলে থাকে।
দাম মিটিয়ে আমসত্ত্বের ঠোঙাটা ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম। কিন্তু তার পর মুখ ফেরাতেই মনাদাকে আর দেখতে পেলাম না। তাজ্জব ব্যাপার। এই তো এইমাত্র এখানে ছিল সে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে গেল কোথায়? ভাবলাম নিশ্চয় কাছে-পিঠে কোথাও আছে। হয়তো খদ্দেরের আশায় কম্পার্টমেন্টের পিছনের দিকে চলে গেছে।
হঠাৎ ট্রেনের গতি কমে গেল বেশ কিছুটা। কেমন যেন একটা শব্দ হল– ঘ্যাচাং-ঘটাং-ঘট। তারপর দুলুনি দিয়ে আবার আগের মতো চলতে শুরু করে দিল ট্রেনটা।
শেষ পর্যন্ত গোবরডাঙ্গায় নেমে একটা রিকশা ধরে বাড়ি ফিরে তবে শান্তি।
সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করে একটু ফ্রেশ হয়ে নিলাম। তার পর খেয়েদেয়ে সেই যে শুয়ে পড়লাম, ঘুম ভাঙল একেবারে পরের দিন সকাল ন’টায়। তা-ও মায়ের ডাকে, ‘অ্যাই-অ্যাই বাপন ওঠ। তোর বাবা আর দাদা তোর জন্য অপেক্ষা করছে। আয়, খেতে আয়।’
আড়ামোড়া ভেঙে কোনওমতে চোখ কচলাতে কচলাতে বললাম, ‘যাচ্ছি।’
তার পর বাথরুমে ঢুকে সাফসুতরোর হয়ে এসে বসলাম খাওয়ার টেবিলে। কত দিন পর নিজেদের বাড়িতে বসে সবার সঙ্গে খাচ্ছি। এই তৃপ্তিটাই আলাদা। গরম-গরম কচুরি আর আলুর দম আয়েশ করে চিবুতে লাগলাম।
বাবা জানতে চাইল, ‘কাল এই দুর্যোগের মধ্যে পড়ে তোর খুব কষ্ট হয়েছে, তাই না? আমরা তো সবাই খুব চিন্তা করছিলাম।’
‘ওই আর কী? কী আর করা যাবে।’
‘তুই আসবি শোনার পর থেকে যে আমি পথ চেয়ে বসে আছি বাবা।’ মায়ের চোখ ছলছল করে উঠল।
প্রসঙ্গ পাল্টে দাদা বলল, ‘কাল থেকে সেই যে বৃষ্টি নেমেছে, এখনও পর্যন্ত ধরবার কোনও লক্ষণ দেখছি না।’
এত সবের মধ্যে হঠাৎ মনাদার আমসত্ত্বের কথা মনে পড়তেই একটুখানির জন্য উঠে গেলাম। আমসত্ত্বের ঠোঙাটা এনে মাকে দিয়ে বললাম, ‘এই নাও, মনাদার আমসত্ত্ব। একবার খেলেই আবার চাইতে হবে।’
‘সত্যি বাপন, তুই পারিসও বটে। যে মানুষটা আর নেই, তাকে নিয়ে মস্করা।’ দাদা ফুট কাটল।
আমি ফুঁসে উঠলাম, ‘নেই মানে? কাল গোবরডাঙা লোকালে মনাদা নিজের হাতে আমসত্ত্ব মেপে আমাকে দিল। আর বলছ মানুষটা নেই।’
পরিবেশটা হালকা করতে বাবা বলল, ‘ছাড়দিকি ওই সব কথা। তুই কী দেখতে কী দেখেছিস ঠিক আছে। হয়তো মনা আমসত্ত্বওয়ালার মতো কোনও লোককে দেখেছিলি।’
‘হবে হয়তো।’ মুখে বললাম বটে। কিন্তু মনের মধ্যে খচখচানি রয়েই গেল।
ছুটির দিনগুলো বেশ আনন্দেই কাটল। আর ছুটি ফুরোতেই মনটা হু-হু করতে লাগল। কিন্তু উপায় তো নেই। তাই ছলছল চোখে সবাইকে বিদায় জানিয়ে আবার বেরিয়ে পড়তে হল।
ডাউন বনগাঁ লোকাল প্ল্যাটফর্মে ঢুকতেই ঝটপট উঠে পড়লাম। রাতের ট্রেন। তা-ও আবার রবিবার। আর ঠান্ডাও পড়েছে জম্পেস। লোকজন তাই কম বেরিয়েছে। এরকম অবস্থায় সিট পেতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। পেয়েও গেলাম সহজে।
ট্রেন ছাড়তেই ধীরে ধীরে আমার চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে যেতে থাকল চেনা স্টেশন, বাড়ি-ঘর, দোকানপাট, আলো-আঁধারি মাখা মানুষজন সব কিছু। বুকের মধ্যে দলা পাকিয়ে উঠতে লাগল সবাইকে ছেড়ে চলে যাওয়ার একরাশ কষ্ট।
সংবিৎ ফিরল পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে, ‘অ্যাই যে দাদা, এসে গেছে আপনাদের আমসত্ত্বওয়ালা। মনাদার আমসত্ত্ব, একবার খেলেই আবার নিতে হবে।’
মনা আমসত্ত্বওয়ালা! বেশ ভয় পেয়ে গেলাম আমি। মনে পড়ে গেল হলিউডের একটি ভৌতিক সিনেমার কথা। মনা আমসত্ত্বওয়ালাও হয়তো ওই সিনেমায় দেখা অতৃপ্ত আত্মার মতো কোনও কিছু। সত্যিই আমি ছাড়া কেউ দেখতে পাচ্ছে না তাকে, শুনতেও পাচ্ছে না তার কথা। হতেও তো পারে, এখনই তার বজ্রমুষ্ঠি চেপে ধরবে আমার গলা। একনিমেষে বেরিয়ে যাবে প্রাণবায়ু। সিটের ওপর ঢলে পড়বে নিথর দেহ। লোকে ভাববে নির্ঘাত হার্টফেল করেছি। ভয়ে আমার হাত-পা সব কাঁপছে। শুকিয়ে যাচ্ছে গলা।
হঠাৎ আমার সামনের সিটে বসা এক ভদ্রলোক ডাকল তাকে, ‘ও আমসত্ত্বওয়ালা ভাই, একবার এসো তো এদিকে।’
‘যাচ্ছি বাবু’ বলতে-বলতে মনাদা আমসত্ত্বের ঝুড়িটা নামাল একেবারে আমার সামনে, ‘বলুন বাবু, কতটা দেব?’
‘আড়াইশো মতোই দাও।’ ভদ্রলোক বললেন।
সত্যি কী ভিতু, কী ভিতু আমি! জলজ্যান্ত লোকটা দিব্বি আমসত্ত্ব বেচছে ট্রেনে। আর আমি ভাবছি, মরে ভূত হয়ে সে গলা টিপে মারতে এসেছে আমাকে।
এ বার সব কুণ্ঠা ঝেড়ে ফেলে জিজ্ঞাসা করলাম তাকে, ‘মনাদা, তোমাকে নিয়ে যে একটা গুজব রটেছে তা জানো?’
‘গুজব নয় বাবু, আপনি ঠিকই শুনেছেন।’
বিস্মিত আমি কোনও রকমে বললাম, ‘তবে?’
‘আসলে দাদার আর আমার চেহারার মধ্যে খুব মিল রয়েছে তো। তাই অনেকেই ভুল করে থাকেন।’
‘সব বুঝলাম। কিন্তু তাই বলে তুমি নিজেকে মনাদা বলে চালাবে?’
‘আপনি আবার ভুল করছেন। আমি কখনও ও রকমটি বলি না। আসলে দাদা মারা যাওয়ার পর সংসারের হাল ধরতে দাদার ব্যবসাটাই বেছে নিয়েছি। আর দাদাকে স্মরণীয় করে রাখতে আমার আমসত্ত্বের নাম দিয়েছি ‘মনাদার আমসত্ত্ব’।
নিজের ভুল বুঝতে পেরে আর কথা বাড়ালাম না। আমসত্ত্বওয়ালারও তাড়া ছিল। সে ঝটপট আমসত্ত্ব বেচে চলে গেল নতুন খদ্দেরের সন্ধানে। আর আমি ফ্যাল-ফ্যাল করে চেয়ে রইলাম সেদিকে।
চিত্রণ: মনিকা সাহা







