Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

রুহের বিশেষ নিবন্ধ

স্বামীজি বনাম স্বামীজি

রু হ

‘আরে একটা পাঁঠা কী, যদি মানুষ বলি দিলে ভগবান পাওয়া যায়, তাই করতে আমি রাজি আছি।’
আমি, ‘আমি’ নই; বক্তা বাঙালির বিশ্বজনীন আইকন বিবেকানন্দ। বর্তমানে রাজ্যে নতুন সরকার আসার পর আমিষ-নিরামিষ, সাত্ত্বিক-থিমপুজো ইত্যাদি নিয়ে তুমুল বাগবিতণ্ডা চলছে। বাঙালি ‘বুদ্ধিজীবী’, রাজনীতি সচেতন, এমনকী অনেক প্রগতিশীল ব্যক্তিজন বিজেপির উগ্র ধর্মীয় রাজনীতির বিরোধিতায় বিবেকানন্দকে হাতিয়ার করে পাল্টা প্রতিরোধের চেষ্টা করছেন। সেটা করতে গিয়ে তাঁর স্তুতি-স্তাবকতায় মিডিয়া থেকে মাছের বাজার সরগরম— পৃথিবীর অন্যতম ‘CONFUSED PHILOSOPHER’-কে নিয়ে। না না, রে রে করে তেড়ে আসার আগে লেখাটা পড়ুন। অথবা বিবেকানন্দের নিজের বাণী ও রচনা, প্রবন্ধ, পড়ুন; পড়া থাকলে যুক্তি ও বিবেচনার দরজা খুলে আরও একবার পড়ুন। সমাজমাধ্যমে তাঁর উদ্ধৃতি পোস্টার ও কোটেশন আকারে ঘুরেফিরে আসছে। এরমধ্যে আবার বেশ কিছু ‘ভারতীয় কমিউনিস্ট’, (যাঁরা প্রয়োগের থেকে তত্ত্বে বিশ্বাস রাখেন) এমন লেখা লিখে ফেলছেন— পড়ে মনে হবে সেই সময় দেশে কমিউনিস্ট পার্টি থাকলে তিনিই এক নম্বর নেতা হতেন অথবা বিবেকানন্দই ভারতীয় ‘লেনিন’।
পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পেশ করার বিষয়ে সর্বকালের সেরার সেরা হতে পারেন বিবেকানন্দ। আজকের দিন হলে শুধুমাত্র ওঁর বক্তব্য নিয়েই মিডিয়ার TRP বছরভর সবথেকে উঁচুতে থাকত। তাঁর বহুল প্রচলিত/প্রচারিত মন্তব্যগুলোর বিশ্লেষণ ও পুরো বক্তব্য তুলে ধরাই এই লেখার উদ্দেশ্য। স্তাবকতা নয়, আন্তরিকভাবে তিনি যা বিশ্বাস করতেন, যা তাঁর গুণমুগ্ধ, ভাবশিষ্য বা অন্ধ ভক্তরা এড়িয়ে যান বা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন, সেই আলোচনা করব এখানে।
‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।’ যিনি এমন প্রেমময় বাণীসুধায় সারা দেশের মানুষের মন ভিজিয়ে দিচ্ছেন, তিনিই বরাহনগরের মঠে পশুবলির প্রবর্তন করছেন। শুধু তাই নয়, বাকি সন্ন্যাসীদের আপত্তি উড়িয়ে দিয়ে বেলুড়মঠেও দুর্গাপুজোতে পশুবলি দিতে উদ্যত হয়েছিলেন, যা গুরুপত্নীর (সারদামণি দেবী) প্রবল আপত্তিতে সম্ভব হয়নি। আর লেখা শুরুটাই করেছি ওঁর বিশ্বাস দিয়ে।
আধুনিক ভারতে ‘বাবাসাহেব’-এর অনুগামী থেকে শুরু করে ভারতের সব থেকে বড় কমিউনিস্ট পার্টির (সংখ্যার ভিত্তিতে) নেতারা কলম-বিপ্লব করেন— ‘হে ভারত ভুলিও না মেথর, মুচি, চণ্ডাল তোমার ভাই…’ এই অমোঘ বাণী নিয়ে। কিন্তু ভুলেও এই পণ্ডিতরা ‘ভারতে ব্রাহ্মণেরাই চরম আদর্শ’ বা ‘জাতিভেদ আছে বলেই ত্রিশ কোটি মানুষ এখনো খাবার জন্য এক টুকরো রুটি পাচ্ছে’— এই বক্তব্যের সমালোচনা দূরের কথা, আলোচনা করতে প্রস্তুত নন। বাংলার রেনেসাঁ সময়কালে অথবা যাঁদের পুরোধা বলা হয়— ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায়— এঁদের কাজের প্রতিও ক্ষুণ্ণ ছিলেন বিবেকানন্দ। বিভিন্ন সময়ে তাঁর মন্তব্যে বাল্যবিবাহ রোধ, সতীদাহ প্রথা বিলোপ, বিধবাবিবাহ প্রচলন ইত্যাদি সমাজসংস্কারমূলক কাজের বিরোধিতা বা অসন্তুষ্টি ধরা পড়ে। বাল্যবিবাহ দেয় এমন মানুষকে যিনি খুন করতে দ্বিধাবোধ করবেন না বলেন, তিনিই লিখছেন: ‘বাল্যবিবাহ হিন্দু জাতিকে পবিত্রতায় ভূষিত করিয়াছে’। এখানেই না থেমে আরও ব্যাখ্যায় গেছেন ‘প্রণয়বৃত্তি জাগ্রত হইবার পূর্বে বাল্যকালে বিয়ে দেওয়া ভাল হবে, নইলে ঘোর অনর্থ’। তাঁর ভাবনা ‘বিধবাদের পুনর্বিবাহ দিলে কুমারী মেয়েদের ভাগ্যে স্বামী কম পড়ে যাবে’। বা ‘বিধবাবিবাহ আন্দোলনে শতকরা সত্তর জন ভারতীয় নারীর কোন স্বার্থ নেই’। ‘সতী’র আদর্শকে মহৎ প্রতিপন্ন করতে গিয়ে তিনি বলেছেন— ‘এই আদর্শের চরম অবস্থায় হিন্দু বিধবারা সহমরণে দগ্ধ হতেন’, ব্যাখ্যাও দিচ্ছেন— ‘প্রথমে সেই ভাবটা উস্কে দিয়ে তাঁদের CHARACTER FORM করতে হবে— যাতে তাঁদের বিবাহ হোক বা কুমারী থাকুক, সকল অবস্থাতেই সতীত্বের জন্য প্রাণ দিতে কাতর না হয়। কোন একটা ভাবের জন্য প্রাণ দিতে পারাটা কি কম বীরত্বের?’ এই সমস্ত ধারণার মানুষকে কীভাবে বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায়ের পাশে এক আসনে বসানো যায়! এসব কথা ভুলেও সামনে আনা যাবে না। আসলে, স্রোতের বিপরীতে গেলে ভোট হারানোর ভয়।
আজকালকার রাজনৈতিক নেতাদের তথ্য বিকৃতি, ভিড়/জমায়েত বুঝে, তাদের হাততালি পাওয়ার জন্য বক্তব্য পেশ করা, ভিন্ন সময়ে সম্পূর্ণ বিপরীত মতামত পেশ করা— এইসব কিছু মনে হয় ওঁর কাছ থেকে পাওয়া! বিধবাবিবাহের বিরুদ্ধে বা কুমারী মেয়েদের স্বামী (পুরুষ) কম পড়ার কথা যখন বলছেন, তখন (১৯০১) জনগণনা অনুযায়ী নারী-পুরুষের অংশীদারি ৯৭২:১০০০। অর্থাৎ তথ্যই শুধু নয়, সেই তথ্যের ভয় দেখিয়ে বিধবাবিবাহের বিপক্ষে লোক জড়ো করার কাজও করছেন। তাঁর সমসাময়িকদের থেকে চিন্তা, চেতনা, মননে, বিচারবুদ্ধিতে তিনি কেবল পিছিয়েই ছিলেন না; তিনি ছিলেন হিন্দু ধর্মের কুপ্রথার সুচতুর রক্ষক।
এদেশের তথাকথিত প্রগতিশীল মানুষজন বিবেকানন্দের কিছু উক্তি, খণ্ডিত বক্তব্য হাজির করে তাঁকে তুখোড় মেধাসম্পন্ন, শিক্ষাবিদ, প্রগতিশীল, নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, সন্ন্যাসী, ব্রিটিশ-বিরোধী এমনকী সমাজতন্ত্রী বলতেও দ্বিধাবোধ করেন না। আসলে, যে দেশে বা সমাজে চরণামৃত বা জল পড়া খেয়ে দুরারোগ্য অসুখ ঠিক হয়, ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষের বিপর্যস্ত অবস্থা ভুলিয়ে দেওয়া যায়, সেখানে তকমা সাঁটা কোনও গুরু বা মনীষীকে যুক্তি, বিচার-বিশ্লেষণে তাঁর প্রকৃত রূপ বা স্ববিরোধী রূপকে সামনে আনার ঝুঁকি কেন নেবেন? এই ঝুঁকি নেওয়া মানে ত্রিশূলধারীদের দ্বারা শারীরিক নির্যাতন মায় হত্যা পর্যন্ত সংগঠিত হতে পারে। আবার যেচে জাতীয়তাবাদীদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধের সম্মুখীন কেইবা হতে চায়! এ লেখার উদ্দেশ্য বিবেকানন্দকে ছোট করে দেখানোর নয়। তথ্য-প্রযুক্তির যুগে, দ্বান্দ্বিকতার নিরিখে, সমাজবিজ্ঞানের আলোকে যদি কারও ভাবনা বা তত্ত্বের বিশ্লেষণ না করি, আদতে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভুল পথে বা ভাবনায় ঠেলে দেওয়ার সামিল।
সিস্টার নিবেদিতাকে সামনে রেখে বা বিদেশের মাটিতে নারীমুক্তি, নারী স্বাধীনতার দু’চারটে গরম গরম বক্তব্য তাঁর ভক্তকুল হাজির করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নারীর মুক্তি বা স্বাধীনতার বিষয়ে তাঁর মনোভাবে গুরু রামকৃষ্ণের প্রলাপের প্রভাব দেখা যায়। যিনি (রামকৃষ্ণ) বিশ্বাস করতেন ‘নারী নরকের দ্বার’। ‘কামিনী নরকস্য দ্বারম, যত লোক স্ত্রীলোকের বশ’। ফলে যিনি মঠ ও মিশন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে গুরুর আদর্শ বিশ্বব্যাপী প্রচার করতে চেয়েছেন তিনি তাঁর (রামকৃষ্ণ) ভাবাদর্শ থেকে ব্যতিক্রমী হবেন কী করে? ‘হে ভারত ভুলিও না তোমার নারীজাতির আদর্শ সীতা, সাবিত্রী ও দময়ন্তী।’ ‘ভারতীয় নারীগণকে সীতার পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া নিজেদের উন্নতি বিধানের চেষ্টা করিতে হইবে। ইহাই একমাত্র উন্নতির পথ’। এই ধারণা কতটা বদ্ধমূল হলে সতীদাহ প্রথাকে সমর্থন করা যায়!
দরিদ্র, ম্লেচ্ছ ভারতবাসীর জন্য যাঁর প্রাণ কাঁদে, তিনিই আবার ১৮৯৬-৯৭ সালের দুর্ভিক্ষপীড়িত ভারতীয়দের সাহায্যে এক নয়া পয়সা সাহায্য করতে অসম্মত ছিলেন। অথচ আমেরিকা থেকে ফেরার পর তাঁর প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে জনগণ ও বিভিন্ন রাজা-মহারাজাদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ বিপুল ভাবে খরচ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। একদিকে দুর্ভিক্ষ, অন্য দিকে, প্রবল আত্মপ্রচার। আজকের দিনে জীবিত অবস্থায় স্টেডিয়ামের নাম বদলে নিজের নামে করে নিজেই উদ্বোধন করা কিংবা সর্বক্ষেত্রে অনুপ্রেরণার হাস্যমুখ প্রদর্শন করাকে কী এক মনে হয় না? আর তাই এই প্রশ্ন সামনে আসে না যে নিজের পরিবারের জন্য খেতড়ির রাজার কাছ থেকে মাসিক ১০০ টাকা ভাতা হিসেবে আদায় করেছিলেন। যা প্রায় ২০ বছর ধরে চলেছিল।
বিশিষ্ট গবেষক, যুক্তিবাদী নিরঞ্জন ধর তাঁর ‘বিবেকানন্দ: অন্য চোখে’ বইতে লিখছেন— ‘বিবেকানন্দ স্বভাব সন্ন্যাসী ছিলেন না, ছিলেন অভাব সন্ন্যাসী।’ ফলত ওই গেরুয়া পোশাকের মধ্য দিয়েই উঁকি দিত তাঁর ভোগবাদী মন। নিবেদিতার মতো আর এক অনুরাগী ইসাবেলাকে তিনি চিঠিতে লিখছেন— ‘কিছু একটা করে দেখাও। মাদ্রাজে আমার জন্য একটা গৃহ নির্মাণ করতে না পারো তো আমি থাকব কোথায়?’ বিদেশ থেকেই আর এক চিঠিতে লিখছেন— ‘গতকাল ১৩ ডলার দিয়ে একটা মীরশ্যাম পাইপ* কিনেছি। ফাদার পোপকে যেন আবার বোলো না। কোটের দাম পড়বে ৩০ ডলার। আমি বেশ ভালই আছি। খাবার দাবার জুটছে, যথেষ্ট টাকাকড়িও। আগামী বক্তৃতাগুলো হয়ে গেলে ব্যাঙ্কে কিছু রাখতে পারব আশাকরি।’ মিল পাচ্ছেন আর এক ‘নরেন’-এর সাথে, কোটি টাকার স্যুট আর আশি হাজারি মাশরুমের সাথে। কিংবা একটা রাত কাটাতে কোটি টাকা খরচ করে হেলিপ্যাড আর ‘কুঠির’ বানিয়ে চমকে দেওয়া ‘জননেত্রী’র সাথে!
রামকৃষ্ণ স্বয়ং এঁদের বলতেন ‘পেট বৈরাগী’। ফলত নিরঞ্জন ধরের মন্তব্যে খুব একটা ভুল নেই। তাঁর জীবন যুক্তি দিয়ে পর্যালোচনা দেখা যায় যে, তিনি সন্ন্যাস জীবনের ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সন্ন্যাসী হননি, বরং অভাবের তাড়না ছিল প্রবল। তাই গৃহস্থের লোভাতুর দৃষ্টি, অভ্যাস বেরিয়ে পড়ত বারে বারে। আতিথ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে এই রূপ প্রকাশ পেয়েছে বার বার। তিনি সাধারণ গৃহস্থের বদলে রাজামহারাজা, তাঁদের ঘনিষ্ঠ আধিকারিক, রাজ কর্মচারী বা উচ্চবিত্ত মানুষের আতিথেয়তায় স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। তাঁর ‘স্বামীজি’ নামটাও খেতড়ির মহারাজার দেওয়া; মায় সর্বপরিচিত পোশাকটিও। শুধু তাই নয়, বহুল প্রচারিত ‘ভারত ভ্রমণে’ তিনি বিভিন্ন রাজ্যের রাজা বা তাঁদের দেওয়ানদের আতিথ্য গ্রহণ করতেন। আর সেখান থেকেই পরবর্তী আতিথেয়তার জন্য সুপারিশপত্র সংগ্রহ করে রাখতেন।’… ‘সন্ন্যাসজীবনের যে সর্বজন স্বীকৃত আদর্শ, তার সঙ্গে রাজা-গজাদের আতিথ্যের জন্য লালায়িত হওয়ার সামঞ্জস্য পাওয়া দুষ্কর’। (নিরঞ্জন ধর) তাঁর এই আচরণে বিক্ষুব্ধ হয়ে অন্যান্য সন্ন্যাসীরা গিরীন্দ্র ও হারাধনের নেতৃত্বে বেলুড়মঠের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে ১৮৯৯ সালে ‘গরীব রামকৃষ্ণ সভা’ নামে আলাদা সঙ্ঘ খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বিবেকানন্দের একদা অনুরক্ত আর এক বিদেশি হেনরিয়েটা ম্যুলারেরও অভিযোগ ছিল তাঁর ভোগবিলাসের বিষয়ে।
আজ যখন ২০ শতাংশ সংখ্যালঘু সমাজকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দল বা তাদের চ্যালাচামুণ্ডারা বলে ‘হিন্দু খতরেমে হ্যায়’, তখন তথাকথিত বহু প্রগতিশীল তার নিন্দা বা বিরোধিতা করেন বিবেকানন্দের বহুল প্রচলিত উদ্ধৃতি দিয়ে। কিন্তু তাঁর ‘বাণী ও রচনা’র ৫ম খণ্ডে তিনি বলছেন, ‘আমাদের সমাজে যে সকল বিশেষ দোষ রহিয়াছে, সেইগুলি বৌদ্ধ ধর্মজাত। বৌদ্ধধর্মই আমাদিগকে তাহার উত্তরাধিকার স্বরূপ এই অবনতির ভাগী করিয়াছে’। অথবা ‘কোন লোক হিন্দু সমাজ ত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করলে সমাজে শুধু যে একটি লোক কম পড়ে তা নয়, একটি শত্রু বৃদ্ধি হয়’। গত এক দশকে ‘হিন্দু’ বশ্যতা স্বীকার না করলে পাকিস্তান বা বাংলাদেশ ফেরত পাঠানোর যে উৎসাহ বা ধমকি, তার সাথে মিল পাবেন ওঁর রচনায়। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, ভারত হিন্দুদের দেশ। তাঁর মন্তব্য, ‘এ দেশে বুড়ো শিব ডমরু বাজাবেন, মা কালী পাঁঠা খাবেন, আর কৃষ্ণ বাঁশি বাজাবেন চিরকাল। যদি না পছন্দ হয় সরে পড়ো না কেন!’ (৬ষ্ঠ খণ্ড)
বিবেকানন্দকে খাটো করে দেখানো এই লেখার উদ্দেশ্য নয়; যুক্তি ও সমাজ-চেতনার আলোকে মূল্যায়ন করে ঠিক পথ বেছে নেওয়া। আমাদের দেশে মনীষী, মহামানব, গুরু হিসেবে পেশ করে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে ভুলিয়ে রাখা বা ভুল পথে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ইচ্ছে করেই ভেঙে দেওয়া হয় তাদের জীবন সংগ্রাম, হকের লড়াই। এটা শুরু হয়ে যায় ছাত্রজীবন থেকেই। যেমন কেউ কেউ ‘বিলে’কে তুখোড় মেধাবী ছাত্র হিসেবে দেখান বিবেকানন্দের জীবনী লিখতে গিয়ে। কেউ আবার তাঁকে দেশীয় শিক্ষাবিদ হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু বাস্তব কি তাই! তাঁর এফ এ’র মার্কশিট অন্য কথা বলে। নিতান্তই সাধারণ বা মধ্য মেধার ছাত্র ছিলেন তিনি। যদিও অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতি বা সাধারণ মানের ছাত্রও নিজেদের কাজের মাধ্যমে পরবর্তী জীবনে সমাজে বিশেষ ছাপ রেখে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ, আইনস্টাইন থেকে শুরু করে আজকের স্টিভ জোবস, বিল গেটস তার উদাহরণ। আসল কথা হল চিন্তা-চেতনার গভীরতা। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনার সাথে অধুনা বিজেপির পরিকল্পনা হুবহু মিলে যায়। ‘সব বেদে আছে’— এই ধারণায় কেবল বিশ্বাসী ছিলেন তাই নয়; নিজের লেখাতেই দ্বিধাহীনভাবে প্রকাশ করেছেন। ‘যত কম পড়বে তত মঙ্গল। গীতা ও বেদান্তের উপর যে সব গ্রন্থ আছে সেগুলি পড়। কেবল এগুলি হলেই চলবে।’ কিংবা ‘ধার্মিক হতে গেলে আপনাদিগকে প্রথমেই গ্রন্থাদি ফেলিয়া দিতে হইবে। বই যত কম পড়েন তত ভাল’। শুধু এদেশের শিক্ষার্থী নয়, পাশ্চাত্য শিক্ষার্থীদেরও উপদেশ দিয়েছেন এই বলে— ‘যতটা জানিলে তোমার পক্ষে কল্যাণ তোমরা তাহা অপেক্ষা বেশি জান— ইহাই তোমাদের মুশকিল’। এই মন্তব্যগুলো সাধারণত প্রকাশ্যে আসে না বা আনা হয় না। ফলে শিক্ষাবিদ হিসেবে তাঁকে যতই ফুলিয়েফাঁপিয়ে দেখানোর চেষ্টা হোক না কেন, আদপে তা অন্তঃসারশূন্য।
এদেশে সাভারকার আজ সবচেয়ে বড় দেশপ্রেমী আর বিজেপি-সহ তার লেজুড় সংগঠনগুলো দেশহিতৈষী। উল্টোদিকে তাদের এই বিপুল প্রচারের বিপক্ষে বা গৈরিক আগ্রাসন রুখতে জাতীয়তাবাদীদের সাথে এক সুরে বামপন্থীরা বিবেকানন্দের আংশিক উদ্ধৃতি তুলে তাঁকে মহান বিপ্লবী বানিয়ে ফেলছেন। সে শিক্ষা বা স্বরাজ দুই ক্ষেত্রেই। বিবেকানন্দের ‘বাণী ও রচনা’র ৫ম, ৬ষ্ঠ, ৭ম খণ্ডে বারে বারে ইংরেজদের ‘বীরের জাতি’, ‘প্রকৃত ক্ষত্রীয়’, ‘অটল ও অকপট’ বলে চিহ্নিত করেছেন। লিখছেন, ‘একদিক থেকে দেখলে তাদের বড়লাটের উপর কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ। High Education তুলে দিচ্ছে বলে দেশটা হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে’। কীভাবে ‘প্রভু’ (ইংরেজ) বীর্য, অধ্যাবসায় ও সহানুভূতির সাথে শাসন করলে ভারতে শতবার ব্রিটিশ শাসন বজায় থাকবে তার ফিরিস্তিও দিয়েছেন। ব্রিটিশকে তোষামোদ করতে গিয়ে এমন মন্তব্য করেছেন— ‘সকল কথার ধুয়ো হচ্ছে— ইংরেজ আমাদের দাও। বাপু আর কত দেবে? রেল দিয়াছে, তারের খবর দিয়াছে, রাজ্যে শৃঙ্খলা দিয়াছে, ডাকাতদের তাড়াইয়াছে, বিজ্ঞান শিক্ষা দিয়াছে। আবার কী দেবে? নিঃস্বার্থভাবে কে কী দেয়? বলি তোরা কি দিয়েছিস?’ এই ছিল তাঁর ভাবনার ব্যপ্তি। উপরের কথাগুলো বর্তমান সময়ে ‘অনুপ্রেরণার’ বাণীর মতো শোনাচ্ছে না! ভক্তবৃন্দ প্রচার করেন— ‘ইংরেজদের সম্বন্ধে যে ঘৃণার হৃদয় নিয়ে আমি ইংল্যান্ডের মাটিতে পদার্পণ করেছিলাম, কোন জাতি সম্বন্ধে তার থেকে অধিক ঘৃণার ভাব লয়ে সে দেশের মাটিতে আর কেউ কখনো নামেনি’। শিকাগো থেকে ফেরার পর কলকাতার এক সংবর্ধনা সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন। তাঁর স্তাবকরা ঠিক এর পরের লাইনটা আর বলেন/লেখেন না। পরের কথাটা ‘এই সভা মঞ্চে যেসব ইংরেজ বন্ধু উপস্থিত আছেন, তারাই সে বিষয়ে সাক্ষ্য দেবেন। কিন্তু যতই আমি তাদের মধ্যে বাস করতে লাগলাম, তাদের জাতীয় জীবন যন্ত্র কিভাবে কাজ করছে দেখতে পেলাম। তাদের সাথে মিশে জানলাম কোথায় রয়েছে তাদের জাতির হৃদ স্পন্দন— ততই আমি তাদের ভালবাসতে লাগলাম। তার ফলে, হে ভাতৃগণ, এখানে এমন কেউ নেই যিনি আমার থেকে ইংরেজদের বেশী ভালোবাসেন’। (৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২, বিবেকানন্দ ও সমকালীন ভারতবর্ষ) প্রসঙ্গত মনে রাখা দরকার, তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে অন্যতম সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। যিনি তাঁর ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে ঠিক এই মত দিয়েই শেষ করছেন। যা নিয়ে বিগত কয়েক মাস দেশ জুড়ে ইচ্ছাকৃত বিতর্ক (সুযোগ হলে এই নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত লেখা যাবে) তৈরি করা হল।
লেখা শেষ করব সমাজ-সংস্কারকের মুখ হিসেবে তাঁকে যে আসনে বসানো হয়েছে, প্রকৃতই কি তিনি তার অধিকারী? নাকি আদতে তিনি অচলায়তনের পক্ষেই ছিলেন! সতীদাহ প্রথা রদ, বিধবাবিবাহ প্রচলনের বিপক্ষে তাঁর মতামত আগেই দেখিয়েছি। এবার দেখা যাক তাঁর এক মন্তব্য, যা কি না প্রায় জাতীয় স্লোগানে পরিণত আজ। ‘হে ভারত ভুলিও না মেথর, মুচি, চণ্ডাল তোমার ভাই’। আবেগে গদগদ হয়ে অনেক আম্বেদকর-পন্থীরাও ভুলে যান বিবেকানন্দের মূল ভাব। সনাতন হিন্দুধর্মের প্রতি তাঁর এত মোহ ছিল যে, কখনও কখনও তাঁর মন্তব্যে সাম্প্রদায়িকতার আভাস মেলে। যিনি মুচি, মেথর, চণ্ডালদের ভাই বলছেন তাঁরই স্বীকারোক্তি— ‘যতই বয়োবৃদ্ধি হইতেছে, ততই এই প্রাচীন প্রথাগুলি আমার ভালো বলিয়া মনে হইতেছে’। চেতনার স্তর কত মধ্যমেধার হলে ‘জ্ঞানোন্মেষ হলেও কুমোর কুমোরই থাকবে’— এমন কথা লেখা যায়। জাতি প্রথাকে সমর্থন করতে গিয়ে বলছেন, ‘জাতি প্রথা এক ধরনের সমাজতন্ত্র, কেননা জাতির মধ্যে প্রত্যেকেই সমান’।
আজকের মিডিয়াসর্বস্ব যুগে খুব সহজে ও সুচতুর ভাবে তাঁর রচনা, বাণী, চিঠি থেকে আংশিক বা খণ্ডিত ভাষ্য তুলে তাঁকে ‘যুগাবতার’, ‘মহামানব’ বানানোর প্রচেষ্টা। কিন্তু ব্যক্তিপুজো না করে যুক্তি, বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে আমরা তাঁর কাজের বিচার করি, তবেই ভুল শুধরে আগামী দিনে সঠিক পথে এগোতে পারব।

Advertisement

* Meerschaum pipe তৎকালীন সময়ে ধূমপানের জন্য ব্যবহৃত এক বিশেষ ধরনের বিলাসবহুল পাইপ, যা সেপিওলাইট নামক একটি নরম, সাদা এবং ছিদ্রযুক্ত খনিজ পাথর খোদাই করে তৈরি করা হত।

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty + four =

Recent Posts

রুহ

রুহের বিশেষ নিবন্ধ

বিশিষ্ট গবেষক, যুক্তিবাদী নিরঞ্জন ধর তাঁর ‘বিবেকানন্দ: অন্য চোখে’ বইতে লিখছেন— ‘বিবেকানন্দ স্বভাব সন্ন্যাসী ছিলেন না, ছিলেন অভাব সন্ন্যাসী।’ ফলত ওই গেরুয়া পোশাকের মধ্য দিয়েই উঁকি দিত তাঁর ভোগবাদী মন। নিবেদিতার মতো আর এক অনুরাগী ইসাবেলাকে তিনি চিঠিতে লিখছেন— ‘কিছু একটা করে দেখাও। মাদ্রাজে আমার জন্য একটা গৃহ নির্মাণ করতে না পারো তো আমি থাকব কোথায়?’ বিদেশ থেকেই আর এক চিঠিতে লিখছেন— ‘গতকাল ১৩ ডলার দিয়ে একটা মীরশ্যাম পাইপ* কিনেছি। ফাদার পোপকে যেন আবার বোলো না। কোটের দাম পড়বে ৩০ ডলার। আমি বেশ ভালই আছি। খাবার দাবার জুটছে, যথেষ্ট টাকাকড়িও। আগামী বক্তৃতাগুলো হয়ে গেলে ব্যাঙ্কে কিছু রাখতে পারব আশাকরি।’

Read More »
শুভ্র মুখোপাধ্যায়

শুভ্র মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ প্রতিবেদন

আঞ্চলিক জীববৈচিত্রের সুরক্ষা শু ভ্র  মু খো পা ধ্যা য় প্রতিদিনের জীবনে একসঙ্গে জড়িয়ে থাকা অজস্র জীব আমাদের জীবনযাত্রার সহযাত্রী। চারপাশের এই জীববৈচিত্র প্রতিনিয়ত আমাদের

Read More »
সোমা দত্ত

সোমা দত্তের প্রবন্ধ

পিতৃতন্ত্র আসলে নারীপুরুষ নিরপেক্ষ গঠনতন্ত্র। দেবতা বা দেবী যেই হোন, ক্ষমতার কেন্দ্রে নারী বা পুরুষ যে কেউ থাকুক না কেন, তার প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্যই এর মূল বিষয়। গুরুশিষ্য পরম্পরাও আসলে এই গঠনতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্যই নির্মিত। যৌনতা এক্ষেত্রে ভোগের বিষয়, ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্যবহৃত। শাস্ত্রীয় নৃত্য সুচারু উপায়ে এই অভিপ্রায় পূর্ণ করে চলেছে দীর্ঘকাল ধরে। প্রেমের উদযাপন না, কামের পরিতৃপ্তি এর লক্ষ্য।

Read More »
নন্দিনী কর চন্দ

নন্দিনী কর চন্দের বিশেষ প্রতিবেদন

বৌদ্ধধর্মে ধ্যান ন ন্দি নী  ক র  চ ন্দ ধ‍্যান হল মনকে শান্ত ও একাগ্রতার সাথে মনোনিবেশ করার একটি বিশেষ অনুশীলন। এর মাধ‍্যমে আবেগীয় স্থিতিশীলতা

Read More »
অঞ্জন মুখোপাধ্যায়

অঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ

যে গান আপনি রোজ শোনেন, সেটাই হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে সবচেয়ে পুরনো প্রতিরোধ অ ঞ্জ ন  মু খো পা ধ্যা য় এক জোড়া ভাঙা মূর্তি, একটা প্রশ্ন

Read More »
গৌতমকুমার দে

গৌতমকুমার দের বিশেষ রচনা

মন্তব্যের আয়নায় উত্তর গোয়ার সমুদ্রসৈকত  গৌ ত ম কু মা র  দে গোয়া আর বিনোদন শব্দদুটো প্রায় সমার্থক। মস্তির ফাঁদ পাতা গোয়ার ভুবন বিশেষত তার

Read More »