আঞ্চলিক জীববৈচিত্রের সুরক্ষা
শু ভ্র মু খো পা ধ্যা য়
প্রতিদিনের জীবনে একসঙ্গে জড়িয়ে থাকা অজস্র জীব আমাদের জীবনযাত্রার সহযাত্রী। চারপাশের এই জীববৈচিত্র প্রতিনিয়ত আমাদের চলার পথ যেমন সুগম করছে, তেমনই আমাদের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নিখরচায় রক্ষা করে চলেছে। এইসব জীববৈচিত্র আমাদের দিনাতিপাতের চিরাচরিত নানান অভ্যাস, ধর্মাচরণ, অর্থকরী রসদ সংগ্রহ কিংবা মনের আরামের সঙ্গে মিলেমিশে আছে। তাই সেগুলির সুরক্ষার প্রয়োজন অনুভব করে আমাদের দেশের ভারতীয় জীববৈচিত্র বোর্ড যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছে। চিহ্নিত হয়েছে জীববৈচিত্রে ঐতিহ্যপূর্ণ অঞ্চল বা Biodiversity Heritage Site (BHS)। অঞ্চলের মানুষজনকে বুঝতে হবে তাঁদের এলাকা কত গুরুত্বপূর্ণ; তাঁদেরই মুখ্য দায়িত্ব নিতে হবে গর্বের সেই অঞ্চলের জীবকুলকে সুরক্ষিত রাখার। এইসব অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জীবকুলের সঙ্গে পরিচিত হতে নিশ্চয়ই ছাত্রছাত্রীরা আগ্রহী হবে, পর্যটকরাও আসবেন; কিন্তু কোনওভাবেই যেন এই আঞ্চলিক জীববৈচিত্রের কোনও রকম ক্ষতি না হয়, সেদিকে সকলকেই সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে।
জীববৈচিত্র্য আইন (২০০২), ধারা ৩৭ ও উপধারা ৩৭(২) অনুযায়ী, প্রতিটি রাজ্য সরকার তার স্থানীয় পঞ্চায়েত ও পুরসভাগুলির সঙ্গে আলোচনা করে সেই রাজ্যের জীববৈচিত্রে ঐতিহ্যপূর্ণ অঞ্চলগুলি চিহ্নিত করে তার সীমানা নির্ধারণ করার কাজ করবে। রাজ্যের বোর্ড ও কেন্দ্রীয় বোর্ড আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে এইসব অঞ্চলগুলি রক্ষা করার নীতি ও পদ্ধতি নির্ধারণ করবে। সেইমতো আমাদের দেশের প্রতিটি রাজ্যেই তাদের নিজ নিজ সরকার এমন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যের জীববৈচিত্রময় অঞ্চলগুলি চিহ্নিত করেছে ও অঞ্চলগুলির সুরক্ষার ব্যবস্থা নিচ্ছে।
আমাদের পশ্চিমবঙ্গে ২০১৫ থেকে ২০২০ অবধি এমন চারটি জীববৈচিত্রে ঐতিহ্যপূর্ণ অঞ্চল চিহ্নিত হয়েছিল; আর সম্প্রতি ২০২৩-এ আরও ছ’টি অঞ্চল যোগ হয়ে এখন মোট দশটি এমন অঞ্চল উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে সাগরতট অবধি ছড়িয়ে রয়েছে। প্রথমেই বলি উত্তরে দার্জিলিং জেলার টংলু BHS (২৩০ হেক্টর) ও ধোতরে BHS (১৮০ হেক্টর) অঞ্চল; হিমালয়ের এই দু’টিই ভারি মনোরম স্থান। মূলত এই দু’টি অঞ্চলই ঔষধি গাছপালায় সমৃদ্ধ, আর সেই কারণে ২০১৫ সালে BHS হিসাবে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
এরপর ২০১৮-য় গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে ঝাড়গ্রামের চিল্কিগড় কনকদুর্গা BHS (২২.৬২ হেক্টর) ঘোষিত হয়। এই অঞ্চল দীর্ঘদিন পবিত্র উপবন (Sacred Grove) হিসেবে সুরক্ষিত; মালভূমি অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বনভূমির অবশিষ্টাংশ এই উপবন আঞ্চলিক মানুষজনের নানান ধর্মীয় আচার ও বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ২০২০ গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে আমরা পেয়েছি কোচবিহারের বাণেশ্বর শিব দিঘি BHS (০.৬৬৭ হেক্টর); এই জলাশয় কালো নরম খোলের কাছিমের বাসস্থল। এই কালো সফ্টশেল টার্টল (Black Softshell Turtle; Nilssonia nigricans) এখানে ধর্মীয় আচারের কারণেই বেঁচে আছে। IUCN ইতমধ্যেই CITES Appendix-I-এ অন্তর্ভুক্ত এই কাছিমের প্রজাতিটিকে তার স্বাভাবিক বন্য বাসস্থানগুলিতে লুপ্ত (Extinct in the Wild, EW) হিসেবে ঘোষণা করেছে।
নদিয়া জেলার রাজ্য উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা এবং উন্নয়ন (State Horticulture Research and Development) সংস্থার অধীনে থাকা ৩৯.৬১ হেক্টর উদ্যান নানান আঞ্চলিক ফুল, ফল ও ঔষধি গাছপালার জিন-বৈচিত্রের এক বিপুল ভাণ্ডার। ২০২৩-এর ১০ মার্চ এই উদ্যানটিকে BHS হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। নদিয়ার জেলারই চর বালিডাঙা একই সঙ্গে (২০২৩-এর ১০ মার্চ) আরেকটি ঘোষিত BHS; হুগলি নদীর দু’টি চর নিয়ে এই জীববৈচিত্র অঞ্চলে জোয়ারভাটার জন্য কিনার জুড়ে স্থানে স্থানে পুরু শৈবালের চাদর বিছিয়ে থাকে। সুরক্ষিত বাসস্থান ও নানান খাবারে উপকরণ ছড়িয়ে আছে বলে স্থানীয় ও পরিযায়ী মিলিয়ে ১০০-র বেশি পাখি প্রজাতির আনাগোনা; এছাড়া নানান প্রজাতির উভচর, সরীসৃপ ও ছোট স্তন্যপায়ীর বাস। এখানে ভাল সংখ্যায় নির্ভয়ে বসবাস করছে আমাদের রাজ্য-প্রাণী, মেছো বেড়াল (Fishing Cat; Prinonailurus viverrinus; IUCN-VU, Schedule -I Part A); এই একই Schedule-I Part A-এ অন্তর্গত অন্যান্য বিরল প্রাণীগুলি, যেমন স্বর্ণগোধিকা (Golden Monitor Lizard; Varanus flavescens; IUCN-EN), মসৃণ প্রলিপ্ত উদ্বিড়াল (Smooth Coated Otter; Lutrogale perspicillata; IUCN-VU), পাতিশিয়াল (Golden Jackel; Canis aureus), খেঁকশিয়াল (Bengal Fox; Vulpes bengalensis), ছোট খটাশ বা ভাম বিড়াল (Small Civet Cat; Viverriculata indica) এখানে অবাধে বসবাস করে। এছাড়া Schedule-IV Appendix-III অন্তর্গত নেউল (Mongoose; Herpestes edwardsii) আর নানান ধরনের ইঁদুরের দেখা মেলে।
একই সময়ে (১০ই মার্চ, ২০২৩) দার্জিলিং জেলার নামথিং পোখরি (৪.১৮৯ হেক্টর) BHS ঘোষিত হয়; এই জলাশয়টিতে অতীব সংবেদী ও বিরল দার্জিলিং স্যালামান্ডার বা ভারতীয় নিউটের বাস। সেই প্রাচীন ও মধ্য মিওসিন যুগ থেকে বিবর্তনের পথে আজও টিকে আছে ভারত-নেপাল হিমালয়ের এই নিউট। এটিকে দেখতে কতকটা টিকটিকির মতো হলেও এরা উভচর শ্রেণির; এদের ত্বকে কোনও আঁশ নেই আর জলে ডিম পাড়ে ও জলেই ছানাপোনারা বড় হয়। শুধুমাত্র পূর্ব হিমালয়ের কিছু জলাশয়ে এদের বাস আর তার মধ্যে নামথিং পোখরি অগ্রগণ্য।
২০২৩-এর ১০ মার্চ বীরভূম জেলার আমখই কাষ্ঠ-জীবাশ্ম উদ্যান BHS (১০ হেক্টর) ঘোষিত হয়েছে। এই উদ্যান জুরাসিক সময়ের শেষদিকে সৃষ্ট অরণ্যভূমি-জাত কাঠের জীবাশ্মের; এগুলি দীর্ঘদিন ছিল তাদের আদিম স্বাভাবিক বিন্যাসে, কোনও কৃত্রিম সজ্জায় নয়। এখন দর্শকদের উৎসাহী করতে বৈজ্ঞানিক তথ্য-সহ সজ্জিত হয়েছে; এককথায়, রাজ্যে এই উদ্যান নিঃসন্দেহে এক বিস্ময়কর ও অনন্য তথ্যভাণ্ডার।
২০২৩-এর ১৬ মে পূর্ব মেদিনীপুরের ৪.৭৩ হেক্টর অঞ্চলের হলদীর চর দ্বীপভূমি একটি BHS-র মর্যাদা পেয়েছে। এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছে স্বাভাবিক বাদাবন; জোয়ারভাটার কারণে, বিস্তৃত প্লাবিত উপকূলীয় তটভূমিতে নানান বাদা অঞ্চলের গাছপালা রয়েছে আর সেখানেই বাস করছে নানান প্রজাতির মাছ, উভচর, সরীসৃপ, দেশি ও পরিযায়ী পাখি ও স্তন্যপায়ী। একই সঙ্গে এই জেলারই আরেকটি BHS হল বিরামপুর-বগুরান জলপাই (৯৫.৯১ হেক্টর) সৈকত। এই বিস্তৃত ৭.৩ কিমি দীর্ঘ উপকূলীয় এলাকায় নানান কাঁকড়ার মেলা। লাল কাঁকড়া (Ocypod macrocera), ডটিল্লা কাঁকড়া (Dotilla myctiroides), ফিড্লার কাঁকড়া (Uca lactea)-সহ নানান লিটোরাল প্রাণীকুলের স্বাভাবিক বাসস্থান। এছাড়াও Wildlife Protection Act 1972-র শিডিউলগুলিতে অন্তর্ভুক্ত এমন নানান প্রাণীর দেখা মেলে এখানে।
দেশের বিভিন্ন জাতীয় উদ্যান, অভয়ারণ্য, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, পবিত্র বনভূমি ইত্যাদি সংরক্ষণ পদক্ষেপের পাশাপাশি, এই ছড়ানো-ছিটানো ঐতিহ্যপূর্ণ জীববৈচিত্রে সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলিকে সুরক্ষিত করার উদ্যোগ স্বাগত। শ্লাঘার বিষয়, দেশের মধ্যে এই পশ্চিমবঙ্গেই BHS-র সংখ্যা সবচেয়ে বেশি; তার মূল কারণ, এই রাজ্যের উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী এলাকা জুড়ে অসাধারণ ভূপ্রাকৃতিক বৈচিত্র। সম্প্রতি আমাদের বন দপ্তর, ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া ও স্থানীয় WINGS নামের একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পশ্চিম বর্ধমান জেলার বসতি সন্নিহিত জঙ্গলে বুনো শুয়োর, নেকড়ে, হায়না, খেঁকশিয়াল ও নানান ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর উপস্থিতি ক্যামেরাবন্দি করেছে। এই কাজে বন দপ্তর বেশ উৎসাহী। পশ্চিম বর্ধমানের দুর্গাপুর-ফরিদপুর ব্লকের অধীনে মাদারগঞ্জ, শ্রীকৃষ্ণপুর, বেনেবান্ধিতে পাঁচ বর্গ কিলোমিটার এলাকা চিহ্নিত হয়েছে, নানা বিরল বন্যপ্রাণের আশ্রয়স্থল হিসেবে। আবার তেমনই হাওড়া জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের জলার আশপাশের ঝোপঝাড়ের ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী আর জলার মাছ নির্ভর করে দিব্য বহাল তবিয়তে বেঁচেবর্তে আছে আমাদের রাজ্য প্রাণী মেছো বেড়াল। তাই আগামী দিনে এই সব শহর সন্নিহিত ঝোপঝাড়, জলা-জঙ্গলেই বাঁচিয়ে রাখতে হবে আমাদের প্রতিবেশী বন্য জীবকুলের অবশিষ্টাংশ। এই সহাবস্থানকে, সম্ভাব্য সবরকম সংঘাত এড়িয়ে, যতদূর সম্ভব সহনীয় করে তুলতে হবে। এইসব অঞ্চলের BHS তকমা হয়তো সময়ের অপেক্ষা। আইনি রক্ষাকবচ না থাকলে শহর-ঘেঁষা পতিত জমির গাছপালা, ঝোপঝাড়, জলাভূমি নির্ভর করে যে জীববৈচিত্র আজও মানিয়ে নিয়ে বেঁচে রয়েছে, তারা সবাই প্রোমোটারের উন্নয়নের কোপে অচিরে চিরতরে হারিয়ে যাবে। সে-কারণে BHS তকমা স্থানীয়স্তরে আমাদের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকা উদ্ভিদ ও প্রাণী বৈচিত্রের সম্ভারকে চিহ্নিত করে বাঁচিয়ে রাখার অত্যন্ত সাধু উদ্যোগ। এই উদ্যোগ সফল করে তোলা আমাদের সকলেরই কর্তব্য।
কোচবিহারের বাণেশ্বর শিব দিঘিতে কালো নরম খোলের কাছিম। চিত্র: গুগল







