Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

বাঙ্গিটোলার মুক্তকেশী: উল্লেখ আছে বুকানন হ্যামিলটনের লেখায়

সিঁদুর, আলতা, ধূপকাঠি, গোটা ফল, ভোগের মিষ্টি। কখনও তার সঙ্গে শাড়িও। এ দিয়েই সাজানো হয় বাঙ্গিটোলার ঐতিহ্যবাহী মুক্তকেশী কালীর ভোগের ডালা। এসব চোখে দেখা যায়। আর যেটা দেখা যায় না, তা হল শতাব্দীপ্রাচীন অটল বিশ্বাস ও সংস্কার, মায়ের প্রতি সন্তানের অগাধ আস্থা ও নির্ভরতা। যে নির্ভরতা রোগতাপ অশান্তি থেকে মুক্তির প্রার্থনা করে; সুখসমৃদ্ধির কামনা করে; ভাঙন, অনাবৃষ্টি আর নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয় পেরিয়ে যাওয়ার সাহস যোগায়। হিন্দুর পাশাপাশি সংলগ্ন গ্রামের মুসলিম পরিবারের অনেকেও পুজোয় চাঁদার পাশাপাশি এই ডালা দেন— আর তা গৃহীতও হয়।

আচার্য শ্যামানন্দ ঠাকুর প্রণীত শ্রীশ্রীকালীপূজাপদ্ধতি-তে ডালা সাজানোর নয় রকম পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। কালীঘাট, দক্ষিণেশ্বর থেকে আরম্ভ করে তমলুকের সিদ্ধপীঠ দেবী বর্গভীমার মন্দিরেও ডালা সাজানোর পদ্ধতি মোটামুটিভাবে এক, শুধু স্থানীয় বৈশিষ্ট্য একে আলাদা করে দেয়।

বাঙ্গিটোলার মুক্তকেশী কালী মন্দির।

মালদার গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মৈথিল জনজাতি বিষয়ক গবেষক সৌমেন্দু বাবাই রায় তাঁর একটি যৌথ গবেষণাপত্রে দেখিয়েছিলেন, ১৮১৩ সালে রয়্যাল সোসাইটি অফ লন্ডন থেকে প্রকাশিত ব্রিটিশ সার্ভেয়ার জেনারেল স্যার ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিলটনের গবেষণাপত্রে পরোক্ষভাবে মা মুক্তকেশী দেবীর প্রাচীনত্ব স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। বুকানন হ্যামিলটন ছিলেন জীববিজ্ঞানী এবং তিনি ১৮০৭ পর্যন্ত রাজশাহী ডিভিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন।

তিনি নিম্নগতির গঙ্গার পূর্ব কূল বরাবর ইলিশ মাছের প্রজনন নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তাঁকে সার্ভের কাজে সাহায্য করছিলেন বর্তমানে পঞ্চানন্দপুর সংলগ্ন এলাকার মৎস্যজীবীদের একটা বড় অংশ। তাদের কাছ থেকেই হ্যামিলটন প্রথম শোনেন এই অঞ্চলের এক প্রাচীন শক্তিদেবীর অস্তিত্ব। সেই দেবীর কৃপায় নাকি প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে যেমন রক্ষা পাওয়া যায়, তেমনই এই দেবীকে ভয় ও ভক্তি করেন সকল গ্রামবাসী। হ্যামিলটন সাহেব তাঁর রিপোর্টের সংযোজন অংশে সসম্ভ্রমে উল্লেখ করেছিলেন এক ‘মাইটি ডিইটি’ (“Mighty Deity”)-র কথা। বলেছিলেন— তিনি এই অঞ্চলের জনজীবনের নিয়ন্ত্রক। এই দেবী আর কেউ নন, মা মুক্তকেশী। আরও নানা পার্শ্বীয় প্রমাণ, এমনকি মুঘল আমলের ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার সংরক্ষিত নথি থেকে জোতকস্তুরী নামের প্রাচীনত্ব আবিষ্কার করে গবেষকরা নিশ্চিত হয়েছিলেন দেবীর থানের বয়স আড়াইশো থেকে পৌনে তিনশো বছর।

স্থানীয়রা বলেন, অনেক কাল ধরে ডালা সাজানোর এই প্রথা চলে আসছে। এর সঙ্গে লোকবিশ্বাসের নিবিড় যোগ আছে। ইতিহাস বলে, চৈতন্যদেবের প্রভাব অধ্যুষিত গৌড়বঙ্গে শাক্ত সাধনার যে ধারা ধরে রেখেছিলেন মৈথিল ব্রাহ্মণদের একটা অংশ, পাল-সেন যুগের চণ্ডী থেকে কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের পরবর্তী পর্যায়ে পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকের কালী পর্যন্ত যার বিবর্তনের সূত্ররেখা ছড়িয়ে রয়েছে, তার নিরিখে শক্তিদেবী মা মুক্তকেশী এই অবস্থানবিন্দুর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই মতকে সমর্থন করেছিলেন মালদার প্রামাণ্য ইতিহাসবিদ প্রয়াত ড. তুষার কান্তি ঘোষ।

অনেক কাল ধরে ডালা সাজানোর এই প্রথা চলে আসছে।

বিশ্বাস কোন স্তর পেরিয়ে লোকবিশ্বাস হয়ে ওঠে, লোকবিশ্বাস হয়ে ওঠে একটি জনপদের প্রাপ্তি আর প্রত্যাশার আর্তি— তার খোঁজ জানেন সমাজতাত্ত্বিকরা। যেমন গঙ্গার তীরবর্তী ভাঙন অধ্যুষিত এই গ্রামে দেবীর কাছে অনেকেরই প্রার্থনা থাকে: ভাঙনের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে যেন তিনি গ্রামকে রক্ষা করেন। ২০২০-২১ সালের ভাঙন কবলিত এই বাঙ্গিটোলা-জোতকস্তুরী অঞ্চলে হিন্দু-মুসলিমের পাশাপাশি বসে অন্নকূট গ্রহণের মধ্যেও এই লোকবিশ্বাসের প্রতি সমর্থনই ঝরে পড়ে। বিপর্যয় মানুষকে একত্রিত করে, আর নিবিড় লোকবিশ্বাস হিন্দু-মুসলিম ভেদ ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়।

বাঙ্গিটোলা গ্রামের বাসিন্দা চৈতালী ঝা ব্যাখ্যা করে বলেন: ফুল, ধুপ, আলতা, সিঁদুর ছাড়াও ডালায় গোটা ফল দেওয়াটাই রীতি। মিষ্টির মধ্যে প্যাঁড়া বা বাঙ্গিটোলার মণ্ডার প্রাধান্যই বেশি। আগেই পুজোর ডালা দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপারটা একটু এলোমেলো ছিল। করোনা পরবর্তী সময় থেকে মন্দিরে গ্রামের নামে আলাদা তাক করে দেওয়ায় সমস্যা অনেক কমেছে। করোনার সময়টুকু ছাড়া দুশো-তিনশো বা তারও বেশি ডালা এখানে জমা পড়ে। এবছর সংখ্যাটা ৫০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। মায়ের আশীর্বাদ নিতে পাশের গ্রাম ছাড়াও দূরদূরান্তের মানুষ ডালা পাঠায়।

মন্দিরে গ্রামের নামে আলাদা আলাদা তাক রয়েছে।

স্থানীয় শিক্ষক মলয় কুমার ঝা জোর দিয়ে বলেন— গোটা পাঁচ ফলের মধ্যে একছড়া পাকা কলা ও নারকেল বাধ্যতামূলক। আর বাঙ্গিটোলার ছানার মণ্ডা তো থাকবেই। আশপাশের গ্রামের মুসলিম পরিবারের অনেকেই কারও না কারও হাতে দানের টাকা বা ভোগ পাঠিয়ে দেন। পায়রা বলি এবং পাঁঠা মানত করার ব্যাপারটাও আছে। আমার পূর্বপুরুষদের সময় থেকে এই সম্প্রীতির ছবিটা দেখে আসছি।

মিষ্টি বিষয়ক গবেষকরা পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়েছিলেন: বাঙ্গিটোলার মুক্তকেশী পূজায় শতকরা ৯০টা ডালায় বাঙ্গিটোলা ছানার মণ্ডার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। যে মিষ্টি একমাত্র এই গ্রামেই তৈরি হয়। প্রায় শতবর্ষ আগে ইন্দুভূষণ ঝা-র হাত দিয়ে শুরু হয়ে সম্প্রতি ষষ্ঠীচরণ সাহার হাতে যে ঐতিহ্য কোনওমতে টিকে আছে। ছানা, চিনি আর এলাচ গুঁড়োর সঙ্গে মিশে থাকে সেই অদৃশ্য দুটি উপকরণ— বিশ্বাস আর ভক্তি।

নদী বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, কালিয়াচক-২-এর অন্তর্গত বাঙ্গিটোলা এবং জোতকস্তুরী অঞ্চলদুটি ভাঙনপ্রবণ। বাঁধ উঁচু করার কাজ হলেও আসল বিপর্যয়ের সামনে তার পরীক্ষা এখনও বাকি। লোকবিশ্বাসের পাথুরে দেওয়ালে একফোঁটা আঁচড় পড়ে না।

২০১৯ সালে তরুণ পরিচালক অচল মিশ্র মৈথিলী ভাষার সিনেমা ‘গামক ঘর’ (গ্রামের বাড়ি)-এর জন্য জাতীয় পুরস্কার পান। সিনেমার টাইটেল কার্ডে বিহারের দ্বারভাঙ্গার ক্ষয়িষ্ণু মৈথিল গ্রামের পাশাপাশি সারা উত্তর-পূর্ব ভারতব্যাপী ছড়িয়ে থাকা মৈথিল গ্রামের সেই পরিবারগুলি, যারা খরা, বন্যা, নদীভাঙনে বারবার ঘর হারিয়েছে তাদেরও এক অদ্ভুত মায়ায় ঢেকে দিয়েছিলেন তিনি। সারি সারি বন্ধ দরজার বাড়িতে বোঝাই এককালের সমৃদ্ধ মৈথিল গ্রাম বাঙ্গিটোলা আর জোতকস্তুরীর মানুষের দমবন্ধ করা প্রার্থনা নীরবে শুনে যান উপাস্য গ্রামদেবী মা মুক্তকেশী। মানুষ মুক্তি চায়। ভাঙন থেকে— ভাঙনের স্মৃতি থেকেও। আর এই স্মৃতিযাত্রায় সময় ছুটি দিয়ে দেয় অসময়কে। অপেক্ষা শুরু হয় অন্য এক সময়ের।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়/ চিত্র: লেখক
5 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
5 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
সৌমেন্দু রায়
সৌমেন্দু রায়
1 year ago

লেখাটি তে খুব সুন্দর ভাবে সঠিক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

Anish Saha
Anish Saha
1 year ago

Excellent article

Krishnadas Ghosh
Krishnadas Ghosh
1 year ago

তথ্যবহুল লেখা।কিন্তু উত্তরপাড়ার মা মুক্তকেশী,যিনি দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণীর বোন হিসাবে খ্যাত,তাঁর সঙ্গে কি মালদার মা মুক্তকেশীর কোন সংযোগ রয়েছে?জানার আগ্রহ রইলো।

অভিজ্ঞান সেনগুপ্ত
অভিজ্ঞান সেনগুপ্ত
1 year ago

খুব প্রাসঙ্গিক লেখা … আসলে লৌকিক ধারণায় অনেক সময় ব্যক্তিগত স্মৃতি নির্ভর তথ্য সূত্রে ইতিহাস সম্মত সময় সারণির সমস্যা তৈরী হয়, যেটা মুক্তকেশী কালী -র ক্ষেত্রেও সত্য। ঋষি এই বিষয়ে যেভাবে বস্তুগত তথ্যসূত্র উল্লেখ করে এই পুজোর সময়কাল নির্ধারণ করেছে তাকে যথেষ্ট সঠিক বলেই মেনে নেওয়া যায় ….

S De
S De
1 year ago

গুরুত্বপূর্ণ। সমৃদ্ধ হলাম।

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »