Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

প্রেমের জন্য ছেড়েছেন মুঘল দরবার, বর্গিদের সঙ্গেও লড়েছেন এই বীরাঙ্গনা

প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে। কখনও কখনও প্রেম আসে, তবুও সব প্রেম শেষ পর্যন্ত মোহনায় পৌঁছয় না। ব‍্যতিক্রম অবশ্যই আছে। এই যেমন, বীরভূমের হেতমপুরের হাফেজ-শেরিনার প্রেম। শত বাধা পেরিয়ে এ প্রেম ঠিকানায় পৌঁছেছিল। চলুন, সেই একজোড়া নরনারীর সফল প্রেমের খোঁজে আমরা ঘটনাস্থলেই যাই। তবে তার আগে আমাদের পিছিয়ে গিয়ে পৌঁছতে হবে ভারতের মুঘল আমলে।

১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে এপারের পাট চুকিয়ে চিরকালের মত চলে গিয়েছেন শেষ শক্তিশালী মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব। এরপর অনেক গৃহযুদ্ধের পর দিল্লির মসনদে বসলেন দুর্বল মুঘল বাদশাহ মহম্মদ শা। বাদশাহের কন্যা শাহজাদী আমিনা প্রেমে পড়লেন পিতার সেনাপতি ওসমানের। এদিকে সম্রাট তাঁর ভাইপো হোসেন খানের সঙ্গে শাহজাদী আমিনার সাদি পাকা করে রেখেছেন। সব কিছু জেনে একদিন গোপনে বাড়ি ছাড়লেন আমিনা ও ওসমান। দিল্লি থেকে ঘুরতে ঘুরতে একসময় তাঁরা এসে পৌঁছলেন বীরভূমের হেতমপুরে।

হেতমপুর রাজবাড়ি। ছবি: উইকিপিডিয়া

হেতমপুর ছিল তখন রাজনগরের পাঠান রাজাদের অধীনস্থ একটি গড় অর্থাৎ সেনানিবাস। তার অধিপতি ছিলেন হাতেম খাঁ বা হেতম খাঁ। তাঁর নাম থেকেই তল্লাটের নাম হয়েছে ‘হেতমপুর’। আমিনা ও ওসমান হেতমপুরে এসে নিজেদের পরিচয় দিলেন ‘শেরিনা বিবি ও হাফেজ খাঁ’ নামে। হেতমপুর গড়ের প্রতিষ্ঠাতা হাতেম খাঁ-র কোনও পুত্র-কন্যা তখন জীবিত ছিল না। হাফেজ ও শেরিনাকে তিনি পিতৃস্নেহে আশ্রয় দিলেন। মৃত্যুকালে হাতেম খাঁ তাঁর সব সম্পত্তি তাঁদের দিয়ে গেলেন।

এরপর এল ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দ। মারাঠা বর্গির আক্রমণে অস্থির বাংলা। এদিকে ফকিরের ছদ্মবেশে আমিনার খোঁজে একসময় হেতমপুরে দেখা গেল মুঘল সেনাপতি হোসেন খাঁ-কে। হোসেন খাঁ হাত মেলায় বর্গিদের সঙ্গে। ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে বর্গিবাহিনী একদিন রাতে হঠাৎ আক্রমণ করল হেতমপুর গড়। দু’পক্ষের তুমুল যুদ্ধে নিহত হলেন হাফেজ। বীরাঙ্গনা শেরিনা ঘোড়ায় চেপে যুদ্ধ চালালেন। শেষমেশ প্রণয়প্রার্থী হোসেনকে সামনে দেখে একমাত্র শিশুপুত্রকে কোলে নিয়ে গড়ের ছাদ থেকে লাফ দিলেন নিচে দিঘিতে। দিঘির জলে একটা প্রবল আলোড়ন উঠল। আর তাতেই তলিয়ে গেলেন শেরিনা।

গ্রীষ্মের দিনে ‘হাফেজ খাঁ-র বাঁধ’। ছবি: লেখক

এভাবেই চলে গেলেন বীরাঙ্গনা শেরিনা। হেতমপুরের পূর্বদিকে আজও রয়েছে সতী শেরিনার সমাধি। তার ফলকে খচিত ‘‘বাদশা দুহিতা শা আমিনা বা শেরিণা বিবির সমাধি-মন্দির। এই বীরাঙ্গনা বর্গীদের সহিত যুদ্ধ করিয়াছিলেন।’’ পথচলতি মানুষজন সেই বীরাঙ্গনার উদ্দেশে প্রণাম জানান। আর তার কিছুটা দূরেই রয়েছে ‘হাফেজ খাঁ-র বাঁধ’। বিশাল লম্বা শুকনো মরা দিঘি। ঠিকমত সংস্কার হলে সারা বছর জল থৈথৈ করবে এই বাঁধে। কিন্তু না, কোনও উদ্যোগ নেই। সংস্কারের অভাবে কেঁদেই চলে হাফেজ খাঁ-র বাঁধ।

হেতমপুরের রাঙামাটির ধূধূ প্রান্তরে হাফেজ-শেরিনা একে অপরের জন্য আজও যেমন কেঁদেই চলেন বিরহ-বেদনায়। শেরিনা ঘুমিয়ে থাকেন কবরে। শুধুমাত্র ভরা বর্ষায় হাফেজ খাঁ বাঁধের জল শেরিনা বিবির কবরের পাশে এসে হাজির হয়। তারপর যেন কবি বিদ্যাপতির ভাষায় আক্ষেপ করেন, ‘এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর।/ এ ভরা বাদর মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর’। সত্যিই প্রেমের মৃত্যু নেই! হাফেজ-শেরিনার অমর প্রেমের স্মৃতি নিয়ে বীরভূমের হেতমপুর এখনও জেগে।

চিত্রণ : মুনির হোসেন

পায়রা, পালকি থেকে পোস্টকার্ড: ভারতীয় ডাকব‍্যবস্থার বিবর্তন

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »