Search
Generic filters
Search
Generic filters

জেমস ওয়াট: যিনি শিল্পবিপ্লবের জনক

বাড়ির বৈদ্যুতিক আলোর বাল্ব ফিউজ হয়ে যাওয়া এবং বাল্ব পাল্টানোর সঙ্গে ‘ওয়াট’ (Watt) শব্দটা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। তাই ‘ওয়াট’ শব্দটির সঙ্গে কম-বেশি সকলেরই পরিচয় আছে। ‘ওয়াট’ আসলে শক্তির (Power) একটি একক। মেকানিক্যাল বা ইলেকট্রিক্যাল পাওয়ার বা শক্তি বোঝাতে বা ইলেকট্রিক-লাইটের বাল্ব বা মেশিন-পত্তরের শক্তি বা ক্ষমতা-র (Power) পরিমাপ বোঝাতে ব্যবহার করা হয় এই একক। কিন্তু কোত্থেকে এসেছে এই ওয়াট শব্দটি? অনেকেই হয়তো জানি, ‘জেমস ওয়াট’ (James Watt) নামের উদ্ভাবক, ইঞ্জিনিয়ার এবং বিজ্ঞানীর সম্মানেই বৈদ্যুতিক শক্তি এবং তাপের একক হিসেবে ‘ওয়াট’ শব্দটি এসেছে।

কে ছিলেন এই জেমস ওয়াট? এই লেখায় অতি সংক্ষেপে সেই জেমস ওয়াটের কথা জানব আজ।

১৭৩৬ সালে স্কটল্যান্ডের একটি জায়গায় এক লব্ধপ্রতিষ্ঠ পরিবারে জন্ম হয় জেমসের। তাঁর বাবা-র নামও ছিল জেমস ওয়াট। বাবা ছিলেন একজন সুদক্ষ কারপেন্টার। জাহাজ তৈরি করার একজন মেকানিক ছাড়াও তিনি ছিলেন একজন কন্ট্রাক্টরও। তাঁর নিজেরও একটি জাহাজ ছিল। বাড়িতে যন্ত্রপাতি তৈরি করা এবং সারানোর জন্যে একটি ছোটখাটো ওয়ার্কশপের মতও ছিল তাঁর। সেই ওয়ার্কশপে থাকত প্রয়োজনীয় মেশিন টুলস। এমনকি সেখানে মেটাল-ফর্জিং করার ব্যবস্থাও ছিল। সেই ওয়ার্কশপের প্রতি বালক জেমসের ছিল দারুণ আকর্ষণ। বাবার কাছে এখানেই বালক জেমসের প্রথম ক্রাফটিং-এর হাতেখড়ি হয়।

জেমসের মা-ও পড়াশোনা জানতেন। ছোটবেলায় মায়ের কাছে অন্যান্য বিষয় এবং বাবার কাছে নিয়মিত অংক শিখেছেন জেমস। প্রাইমারি এবং পরে হাইস্কুলে পড়াশোনা করলেও জেমস বেশি পছন্দ করতেন বাড়িতে বসেই পড়াশোনা করতে। নৌকো নিয়ে জেলেদের মাছ ধরে ফিরে আসা দেখতে পেতেন বাড়ির দাওয়ায় বসে। মাঝে মাঝে অদূরে বন্দরে জাহাজের ফিরে আসা দেখতেন বালক জেমস। সেই পালতোলা জাহাজ যে একদিন স্টিম-ইঞ্জিনেও চলতে সক্ষম হবে, তখন এমন কোনও স্বপ্ন জেমসের মাথায় এসেছিল কি না, আজ আর তা জানার কোনও উপায় নেই।

তবে তদানীন্তন পুরোনো মডেলের স্টিম ইঞ্জিনের সঙ্গে জেমসের পরিচয় হয়েছে আরও অনেক পরে। জেমসের যখন মাত্র আঠারো বছর বয়স, মা মারা যান। তারপর থেকে বাবারও শরীর খারাপ হওয়া শুরু হয়। খারাপ সময় যখন আসে, সব কিছু যেন এক সঙ্গেই আসে। সেসময় থেকে বাবার ব্যবসাতেও নেমে এল চরম মন্দা।

তারপর এক বছরের জন্যে লন্ডনে গিয়ে নানান ধরনের ইন্সট্রুমেন্ট তৈরির কাজ শিখে ফিরে এলেন জেমস। গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাস্ট্রোনমি ডিপার্টমেন্টে যন্ত্রপাতি সারানোর একটি অস্থায়ী কাজ পেলেন জেমস। গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ধরনের নানান ইন্সট্রুমেন্টের সঙ্গে পরিচয় হল তাঁর। যন্ত্রপাতি সারানো এবং নির্মাণের ক্ষেত্রে জেমসের জ্ঞান, দক্ষতা এবং মেধা দেখে, তাঁর ইউনিভার্সিটির চাকরিটি স্থায়ী হয়ে গেল। শুধু তাই নয়, সেখানকার কর্তৃপক্ষ জেমস-কে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ওয়ার্কশপ নির্মাণেরও দায়িত্ব দিলেন। ফিজিক্স এবং গণিতে জেমসের পড়াশোনা এবং জ্ঞানের গভীরতা সেখানকার অধ্যাপকদের মুগ্ধ করে তুলেছিল। যন্ত্রপাতি সম্বন্ধে জেমসের বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান আর ব্যুৎপত্তি দেখে অধ্যাপকরা ক্লাসে যন্ত্রপাতি সম্পর্কে কিছু পড়ানোর সময় মাঝে মাঝেই জেমস-কে ডেকে পাঠাতেন।

গ্লাসগো সিটি-সেন্টারের জর্জ স্কোয়ারে জেমস ওয়াটের মূর্তি।

তখন কতই বা বয়স জেমসের। পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর। এর আগে জেমস শুনেছিলেন ‘নিউকমেন’ (Thomas Newcomen) নামের একজন প্রায় বছর পঞ্চাশেক আগে, স্টিম–এ চলতে সক্ষম সে ধরনের একটি ইঞ্জিন তৈরি করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে একজন অধ্যাপক ছাত্রদের দেখাতেন সেই ‘নিউকমেন ইঞ্জিন’। একদিন সেই ক্লাসে ডাক পড়ল জেমসের। ইঞ্জিনটি বিকল হওয়ায় তা সারানোর দরকার পড়েছে। তখন-ই আশ্চর্য হয়ে জেমস লক্ষ্য করেছিলেন, কত সামান্য শক্তি নিউকমেন মডেলের সেই ইঞ্জিনের! যাইহোক, বিকল ইঞ্জিনটি সারিয়ে তুললেন জেমস। কিন্তু তারপর থেকেই শুরু হল তাঁর নতুন সিস্টেম-এ আমূল পরিবর্তন করে উচ্চ ক্ষমতার ইঞ্জিন তৈরির চেষ্টা। সেই কাজেও বছর দুয়েকের মধ্যে সফল হলেন জেমস ওয়াট। আশি শতাংশ কম জ্বালানি ব্যবহার করে জেমস ওয়াটের এই স্টিম ইঞ্জিন (বাষ্পীয় শক্তিতে চালিত)। জেমস ওয়াটের স্টিম ইঞ্জিনের এই উদ্ভাবনার সময়কেই অনেকে মনে করেন শিল্পবিপ্লবের সূচনাকাল।

তাঁর সম্বন্ধে বিশ্ববন্দিত রসায়ন বিজ্ঞানী হামফ্রি ডেভি যা বলেছেন সেই কথাগুলি পড়ি— ‘James Watt was equally distinguished as a natural philosopher and chemist; his inventions demonstrate his profound knowledge of those sciences, and the peculiar characteristic of genius— the union of them for practical application.’

জেমস ওয়াটের মৃত্যুর দুশো বছর পেরিয়ে এসেছি। এই ব্রিটিশ ‘ম্যাথেমেটিক্যাল-ইন্সট্রুমেন্ট-মেকার’ ও ইঞ্জিনিয়ারকে আজ অন্তত একবার মনে করা দরকার। আরও একাধিক মেশিনারি উদ্ভাবনের সঙ্গে স্টিম ইঞ্জিনের আমূল পরিবর্তন করে নতুন রূপ দিয়েছেন তিনি। ‘লেটেন্ট-হিট’-এর (লীন তাপ) ধারণা দিয়েছেন উদ্ভাবনকারী ও ইঞ্জিনিয়ার জেমস ওয়াট। তাঁর উদ্ভাবনার সময়কাল থেকেই শিল্পবিপ্লবের শুরু হিসেবে ধরা হয় এবং ‘Father of the industrial revolution’ হিসেবে তাঁকে মান্যতা দেওয়া হয়। গ্লাসগো সিটি-সেন্টারের জর্জ স্কোয়ারে জেমস ওয়াটের একটি মূর্তি স্থাপিত হয়েছে।

আজ ১৯ জানুয়ারি। জেমস ওয়াটের (১৭৩৬-১৮১৯) জন্মদিন। এই মেধাবী ইঞ্জিনিয়ার, উদ্ভাবক, রাসায়নিক ও দার্শনিককে আমাদের শ্রদ্ধা জানাই।

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 5 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »