Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

কালিকাপ্রসাদ: যেদিন ‘মধ্যপথে ঠেকল গাড়ি’

এখন শূন্যতা লেখা চলে। না লিখলে সে ঘরের কথা বলব কেমনে মরমিয়া, যে ঘর শূন্যের উপর? জানত যদি হাছন রাজা বাঁচব কতদিন…। এ কথা লিখতে বসে শক্তিগড়ের মাঠ মনে আসছে। সেই যে গৌর ক্ষ্যাপা, ক্ষ্যাপার পরম, স্তিমিত কণ্ঠকে উজ্জ্বল করে সে নৌকার কথা বলছিলেন যাতে ক্ষ্যাপা চড়লেই হবে না, সাধন জানতে হবে। সত্তরের প্রবলকে নিভতে দেখছিলাম। সেদিন সেখানে, যেন শেষ। শেষ তারপরই। জয়দেব থেকে ফেরার পথে— হ্যাঁ, পথেই, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছে ধাক্কা মারে গাড়ি।

গাড়ি একদা গাড়ী ছিল। দীর্ঘ স্বর তো বাংলার উচ্চারণে নেই, তাই গাড়ি। তবু গাড়ী সংস্কৃত নিষ্ক্রান্ত বুঝি? উচ্চজনের উচ্চকোটির ভাষা বলে দীর্ঘ স্বর না থাকা বাংলাতে, আমাদের কাংলাতে দীর্ঘ আনতে হত। জয়দেব দীর্ঘ কবি। সংস্কৃতে।
‘‘মেঘৈর্মেদুরমম্বরং বনভুবঃ শ্যামাস্তমালদ্রুমৈর্‌ —
নক্তং ভীরুরয়ং ত্বমেব তদিমং রাধে গৃহং প্রাপয়।’’
[জয়দেব : গীতগোবিন্দ, ১.১]

আহা, হেদে মন আউলায়। কবিত্বে কাব্যে যে সুষমা ঝরে। তবু যে প্রাণের নহে, নয়। রাধা এল, ত্রাস-ভীত বালক এল, মন্মথর তীর ঘনাল, মেঘে আন্ধার হল দ্যাশ। দেশ যে। আন্ধারের টান বাংলাতেই থেকে যায়, মাতৃভাষায়। শিলচর থেকে উড়া দিলেন বা কালিকাপ্রসাদ? ডানা ভাঙল কি? সেই যে সুরমা নদীর গাঙচিল, ডানা ভেঙে কলকাতায়, যাকে কলকাতা চিনে না, সেই অচিনের আপনিও? সাহিত্যে, সহিতে এলেন যাদবপুর। একদা দুর্বার। তাও থেকে গেল শিলচরের আসনাই।

এই তো সেদিন কাকার মৃত্যুর পর— সেই মৃত্যু যা স্তব্ধ করে এককে, অপরকে দেয় যাত্রা— আপনি দল বাঁধলেন। আপনারা। মনে আছে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন আপনি সামনে চলে এসেছেন বটে, তবু বাকিরা ছাড়া দল দল নয়। আপনি আপনি না। ভাঙনের থেকে সরে থেকে এই সব আপনাদের। দোহার।

‘‘আমরা হাজার বছরের বাংলা গান নিয়ে একটি কাজ শুরু করব। বাংলা গান শুরু হয়েছে চর্যাপদ থেকে। আর শেষ হয়েছে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত। তার মধ্য গানগুলো নিয়ে একটি প্রজেক্ট করার ইচ্ছা আছে।’’
আপনি দীক্ষিত বাউল সাধক না। আপনি লোক। যার জন্য লোকগান। যে লোকের জন্য আপনার বিস্তার। হাজার বছর নিয়ে ভাবছিলেন। দেখছিলাম, শুনছিলাম আপনাকে।

‘‘গান আমার জপমালা
গানে খুলে প্রেমের তালা
প্রাণ বন্ধু চিকনকালা
অন্তরে দেয় ইশারা
আর কিছু চায় না মনে গান ছাড়া
ভাবে করিম দীনহীন
আসবে কি আর শুভদিন?
জল ছাড়া কি বাঁচিবে মীন
ডুবলে কি ভাসে ভরা?
আর কিছু চায় না মনে গান ছাড়া।’’

শাহ আবদুল করিম। ভাটি-পুরুষ। হেমাঙ্গ বিশ্বাস একদা বলেছিলেন, আপনি মনে করিয়েছিলেন, তিস্তার মাঝি মাঝনদীতে গান গাইলে তা ভাটিয়ালি না। যেখানে জলা-খাল-বিল-হাওড়-মনযমুনা সেখানেই সুর ওঠে বাতাসে, ভাটি দেশে, সেই ভাটিয়ালি। শাহ আবদুল করিম আপনার চোখে তাই। এবং আপনি দীক্ষিত না।

‘‘…সিলেটের বাউলদের ঘরানাটা আবার এ রকম না। দূরবীন শাহ, আরকুম শাহ, জালাল উদ্দিন শাহ, এঁরা এমনিতে সংসারী মানুষের মতই পোশাক পরে আছেন। তাঁদের সংসারও আছে। তাঁরা ‘স্ত্রী’ বলছেন, ‘সাধনসঙ্গিনী’ নয়। সাধনা তাঁদের গানে, তাঁদের জীবনে। আমরা কি শুনেছি, হাসন রাজায় কয় রে আমি কিছু নয় রে আমি কিছু নয়, হাসন রাজা বাউল ছিলেন না সেটা অন্য একটা জিনিস। লালন বলেন, দুদ্দু বলেন, পাঞ্জুশাহ মনে করে, এই কথাগুলো আমরা ভনিতায় শুনি। তো তাদের কাউকে আমরা চিনি না, ভাইবে রাধারমণ বলে চিনি না। এই প্রথম দেখলাম একজন বাউল নিজের মুখে বলছে বাউল আবদুল করিম বলে। এটা যে কী রোমাঞ্চকর আমার কাছে! তারপর তো তাঁর সঙ্গে কথা বললাম। স্বপ্নে কিছু কিছু মানুষ থাকে। ইনি এমন একজন স্বপ্নের মানুষ যাকে দেখে ফেলেছি। লোকায়ত সংস্কৃতি আর আধুনিক সংস্কৃতির ঠিক প্রান্তসীমায় কেউ যদি দাঁড়িয়ে থাকেন তাহলে তাঁর নাম বাউল শাহ আবদুল করিম।’’

Advertisement

এই বলেছিলেন দৈনিক জনকণ্ঠকে। কাল শুনেছে কালিকা। সিলেট, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, যশোর, নদিয়া, বীরভূম, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদের বাউল ফকিরি গান— সে সব তত্ত্বতালাশ আপনার। মঞ্চে অবিরল ঝরেছে। এই বাংলার সেই সব যা এবারে আপনার কাছে ঋণ শুধবে। বা শুধবে সুধার ঋণ। বাংলার ভাঁটফুল, নদী ও নক্ষত্র ছিন্ন খঞ্জনার পা’য় যেমন যেভাবে বেজেছিল, আপনার সুধাকরতায়। এখন শূন্য লিখতে লিখছি অতীত কাল দিয়ে। বেজেছিল। অথচ বাজবেও। যা রয়ে গেল তা বাজবে তো। তবু গাড়ি কেন দীর্ঘ থেকে হ্রস্ব হবার পথে আমাদের নিঃস্ব করে কালিকা? এ ভুবন, ব্যথাভার, নিবিড়ের এ কি অতিরেক নয়, নহে?

‘‘গাড়ি চলে না চলে না,
চলে না রে, গাড়ি চলে না।
চড়িয়া মানব গাড়ি
যাইতেছিলাম বন্ধুর বাড়ি
মধ্যপথে ঠেকল গাড়ি
উপায়-বুদ্ধি মেলে না।।’’

শাহ আবদুল করিম, গুরু-মোর্শেদের কথা মান্যতায়। এও কি ন্যায্য তবে? এইভাবে? একে একে ক্ষ্যাপার দল পথে পথে, পথে পথেই? যদি মূর্খ তবে আলো দাও। চলে যাওয়া দেখে বিস্মিত হই, আঁচে আঁচে ঘুরি সন্তাপে সান্ত্বনা নিতে। যদি দিতে পারি অনুভবে কিছু— তবে তাই সামান্য।

“পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন— মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে, ঠ্যঙারে বীরু রায়ের বটতলায় কী ধলচিতের খেয়াঘাটের সীমানায়! তোমাদের সোনাডাঙা মাঠ ছাড়িয়ে, ইছামতী পার হয়ে, পদ্মফুলে ভরা মধুখালি বিলের পাশ কাটিয়ে, বেত্রবতীর খেয়ায় পাড়ি দিয়ে, পথ আমার চলে গেছে সামনে, সামনে, শুধুই সামনে। দেশ ছেড়ে বিদেশের দিকে, সূর্যোদয় ছেড়ে সূর্যাস্তের দিকে, জানার গণ্ডি এড়িয়ে অপরিচয়ের উদ্দেশে। দিন রাত্রি পার হয়ে, জন্ম-মরণ পার হয়ে, মাস বর্ষ মন্বন্তর, মহাযুগ পার হয়ে চলে যায়, তোমাদের মর্মর জীবন-স্বপ্ন শেওলা ছাতার দলে ভ’রে আসে, পথ আমার তখনো ফুরোয় না। চলে, চলে, এগিয়েই চলে।’’

এই মেনে নেওয়া, এরপরে?

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

14 + 1 =

Recent Posts

গৌতম চক্রবর্তী

দুই হুজুরের গপ্পো

১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই, আলবার্ট আইনস্টাইন বার্লিনের উপকণ্ঠে নিজের বাড়িতে স্বাগত জানান ভারতীয় কবি, দার্শনিক ও সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। তিনি ছিলেন প্রথম অ-ইউরোপীয় নোবেল বিজয়ী। তাঁদের এই সাক্ষাৎকারটি ইতিহাসের অন্যতম বুদ্ধিদীপ্ত ও মননশীল আলাপচারিতায় পরিণত হয়, যেখানে তাঁরা বিজ্ঞান ও ধর্মের চিরন্তন দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করেন। “সায়েন্স অ্যান্ড দ্য ইন্ডিয়ান ট্রাডিশন: হোয়েন আইনস্টাইন মেট টেগোর” গ্রন্থে এই ঐতিহাসিক সাক্ষাতের বিবরণ পাওয়া যায়। এই বইতে বিশ শতকের শুরুতে ভারতের বৌদ্ধিক পুনর্জাগরণ এবং ভারতীয় ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক চিন্তার মেলবন্ধন তুলে ধরা হয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আশা ভোসলে ও তাঁর বাংলা গান

সুদীর্ঘ আট দশক ধরে তিনি তাঁর সঙ্গীতের সুধায় ভরিয়ে দিয়েছেন কেবল ভারত বা এই উপমহাদেশকেই নয়, বিশ্বকে। পরিণত বয়সেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর, যেমন কয়েক বছর আগে হয়েছিল তাঁর স্বনামখ্যাত অগ্রজা লতা মঙ্গেশকরের। আশা ভোসলে তাঁর সমগ্র জীবনে বারো হাজার গান গেয়ে গিনেস বুকে স্থান পেয়েছেন। একদিকে ধ্রুপদী সঙ্গীত, অন্যদিকে লঘু, পপ, এমনকী চটুল গানেও তাঁর সমকক্ষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। সমসাময়িক কিংবদন্তি শিল্পীদের মধ্যে এজন্য অনায়াসে স্থান করে নিয়েছিলেন তিনি।

Read More »
গৌতম চক্রবর্তী

স্প্যানিশ ছোটগল্প: পুতুল রানি

সত্যিকারের আমিলামিয়া আবার আমার স্মৃতিতে ফিরে এসেছে, আর আমি আবার— সম্পূর্ণ সুখী না হলেও সুস্থ বোধ করছি: পার্ক, জীবন্ত সেই শিশুটি, আমার কৈশোরের পঠনকাল— সব মিলিয়ে এক অসুস্থ উপাসনার প্রেতচ্ছায়ার ওপর জয়লাভ করেছে। জীবনের ছবিটাই বেশি শক্তিশালী। আমি নিজেকে বলি, আমি চিরকাল আমার সত্যিকারের আমিলামিয়ার সঙ্গেই বাঁচব, যে মৃত্যুর বিকৃত অনুকরণের ওপর জয়ী হয়েছে। একদিন সাহস করে আবার সেই খাতাটার দিকে তাকাই— গ্রাফ কাগজের খাতা, যেখানে আমি সেই ভুয়ো মূল্যায়নের তথ্য লিখে রেখেছিলাম। আর তার পাতার ভেতর থেকে আবার পড়ে যায় আমিলামিয়ার কার্ডটি— তার ভয়ানক শিশুসুলভ আঁকাবাঁকা লেখা আর পার্ক থেকে তার বাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার মানচিত্র। আমি সেটা তুলে নিয়ে হাসি।

Read More »
যদুনাথ মুখোপাধ্যায়

বিজ্ঞানমনস্কতা কারে কয়?

শ্রদ্ধেয় বসুর বইতে হোমিওপ্যাথি সম্পর্কিত অধ্যায়টি তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্কদের, বিশেষ করে মুদ্রা-মূর্ছনায় মজে থাকা, বা রাজনীতিজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃতির দাবেদার-ঘনিষ্ঠ চিকিৎসকদের বিরক্তিকর বা অপ্রীতিকরই মনে হবার কথা। কেননা, উল্লিখিত দুটি বিষয় নিয়ে তাদের মনের গহীন কোণে প্রোথিত বিজ্ঞানবাদিতার শেকড় ওপড়ানোর সম্ভাবনা নেই বলেই মনে হয়। প্রশ্ন হল, তাঁর উপরিউক্ত বইটির কারণে তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্ক বন্ধুদের চোখে ব্রাত্য বলে চিহ্নিত হবেন না তো? হলে আমি অন্তত আশ্চর্যচকিত হব না। দাগিয়ে দেবার পুরনো অভ্যাস বা পেটেন্ট এই মহলের বাসিন্দাদের প্রধান অস্ত্র, তা ভুক্তভোগীরা হাড়ে হাড়ে জানেন।

Read More »
প্রসেনজিৎ চৌধুরী

অগ্নিবীর: বন্দুকের মুখে ঈশ্বর

১৯৫০ দশকে নেপালের রাজতন্ত্র ও রাজার মন্ত্রিগোষ্ঠী রানাশাহী শাসনের বিরুদ্ধে সফল সশস্ত্র বিদ্রোহ হয়েছিল। সেই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন অনেক ভারতীয়। তাঁদের মধ্যে অনেকে বাঙালি। নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সেই প্রথম সংঘর্ষ সে-দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত। ভারত ও চীনের মধ্যে একফালি দেশ নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম সশস্ত্র ও নিরস্ত্র দুই পথ ধরে চলেছিল। ডান-বাম-অতিবাম— ত্রিমুখী রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতের চূড়ান্ত সফলতা আসে ২০০৮ সালে রাজার শাসনের অবসানে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারী: এক দৈবী আখর

আমরা ৮-ই মার্চের আন্তর্জাতিক নারীদিবসে আবহমান নারীবিশ্বকে সামান্য একটু ছুঁয়ে যেতে চাইলাম মাত্র। হাজার হাজার বছর ধরেই তাঁদের ওপর কড়া অনুশাসন, জবরদস্ত পরওয়ানা আর পুরুষতন্ত্রের দাপট। সে-সবের ফল ভুগতে হয়েছে আন্তিগোনে থেকে সীতা, দ্রৌপদী; জোয়ান অফ আর্ক থেকে আনারকলি, হাইপেশিয়া; রানি লক্ষ্মীবাঈ থেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বেগম রোকেয়া; রোজা পার্কস থেকে মালালা ইউসুফজাই— তাঁদের মতো হাজারো নামহীন নারীকে।

Read More »