Search
Generic filters
Search
Generic filters

১৪ জুলাই: কবি ও বিজ্ঞানীর কথোপকথন

নিজের নিজের যে জ্ঞানচর্চার কক্ষ সেই পরিধির বাইরে অন্য বিভাগে আগ্রহ প্রকাশ করতে খুব কম মানুষজনকেই দেখতে পাওয়া যায়। আসলে নিজের অধীতবিদ্যা এবং নিজের জ্ঞানচর্চার কক্ষের মধ্যে থাকতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করেন সকলে। একদিকে মানবীয়বিদ্যা আর অন্য দিকে বিজ্ঞান বিভাগ— এই দুই বিভাগ যেন দুটি বিপরীত মেরুতে বিচ্ছিন্ন। বিজ্ঞানের মানুষজন যেমন সাহিত্যের ভুবনের কোনও খবর রাখেন না, অন্যদিকে শিল্প সাহিত্যের চর্চা করেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যেও বিজ্ঞানের জগতের কী ঘটছে না ঘটছে সে ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ দেখতে পাওয়া যায় না। যদিও এক বিভাগের সঙ্গে অন্য বিভাগের এই যে সংযোগহীনতা, তা নতুন কথা কিছু নয়। তাছাড়া শিল্প ও বিজ্ঞানের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে এই যে দূরত্ব, তা কয়েক শতাব্দী আগে থেকেই চলে আসছে। সিপি স্নো-র লেখা ‘টু কালচার্স’ বইটির মধ্যে এই দুই সংস্কৃতির ব্যবধানের কথা রয়েছে, সে কথা আমরা অনেকেই জানি।

তবু এই সাংস্কৃতিক ব্যবধানের মধ্যে মেলবন্ধন বা আদান-প্রদানের দৃষ্টান্তও রয়েছে। বিজ্ঞানচর্চাকারীদের কবিতা বা শিল্পচর্চার দৃষ্টান্ত অনেক পাওয়া যায়, কিন্তু সেই তুলনায় কবি বা শিল্পীদের বিজ্ঞানে অনুরাগের কথা খুবই কম শোনা যায়। বিষয় আর বিভাগের সীমারেখা মুছে তবু কেউ কেউ পারেন বা পেরেছেন মুক্তমনে ভাবতে। সেরকমই একজন কবির কথা বলব এখানে। তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

জার্মানির পটসডামের কাছে বার্লিনের উপকন্ঠে কাপুথ (Caputh) নামের একটি ছোট জায়গা। বিশ্ববন্দিত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন সেখানে একটি ছোট বাড়ি কিনেছিলেন। টিলার ওপর সেই চমৎকার বাড়ি। চারপাশে পামগাছ। বাড়ির সামনে ঘন হয়ে আছে সবুজ ঘাস। অদূরে দুটি লেক। অরণ্যের সবুজ নিঃশব্দ। যেন স্বর্গীয় পরিবেশ। প্রকৃতি যেন উজাড় করে দিয়েছে সৌন্দর্য। অপরূপ পরিবেশে সেই বাড়ি। ১৯২৯ থেকে ১৯৩২ সালে প্রত্যেক গরমের সময় এই বাড়িতেই থাকতেন আইনস্টাইন। বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী অটোহান থেকে ফ্রিজৎ হেবার, ওপেনহাইমার, ম্যক্স প্ল্যাঙ্ক, শ্রয়েডিঙ্গার, সমারফিল্ড সহ আরও বহু প্রথিতযশা মনীষা এসেছেন আইনস্টাইনের কাপুথের এই বাড়িতে।

দিনটি ছিল ১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই। ওই দিন বিকেল বেলায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে বিশ্ববন্দিত বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের কথোপকথন হয়েছিল কাপুথ-এর ওই বাড়িতে। এই সাক্ষাৎকারে কবির সঙ্গে ছিলেন কবি ও রবীন্দ্রনাথের সচিব অমিয় চক্রবর্তী।

১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের জন্ম যথাক্রমে ১৮৬১ আর ১৮৭৯ সাল। তার মানে কবি প্রায় আঠারো বছরের মত বয়সে বড় ছিলেন বিজ্ঞানীর চেয়ে। এই সাক্ষাৎকারের সময়ে আইনস্টাইনের বয়স সবে পঞ্চাশ বছর আর কবির বয়স ছিল সত্তরের কাছাকাছি। কবি ও বিজ্ঞানীর এই দেখা হওয়ার ষোলো-সাতেরো বছর আগেই রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। অন্যদিকে ১৯০৫ সালে আইনস্টাইনের জগদ্বিখ্যাত আবিষ্কারের জন্যে ১৯২১ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। অর্থাৎ এই সাক্ষাৎকারের আট-ন’বছর আগের কথা।

যদিও এর আগেও কবির সঙ্গে বিজ্ঞানীর সাক্ষাৎ হয়েছে। তাঁরা প্রথম মুখোমুখি হয়েছিলেন ১৯২৬ সালে। রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয়বার জার্মান ভ্রমণের সময় আইনস্টাইনের সঙ্গে প্রথম দেখা হয় কবির। যদিও আরও আগে থেকেই কবির কথা শুনেছিলেন আইনস্টাইন। তবে তাঁদের এই প্রথম বারের সাক্ষাৎকারটি রেকর্ড করা হয়নি, তবে এর পরে পরেই আইনস্টাইনের একটি চিঠির বার্তা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে কবির প্রতি এই মহান বিজ্ঞানীর ছিল কী গভীর শ্রদ্ধা। আইনস্টাইন লেখেন, ‘If there is anything in Germany that you would like and which could be done by me. I beg you to command me at any time.’। ১৯৩০ সালেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের চার বার সাক্ষাৎ হয়েছিল। তিনবার জার্মানিতে এবং একবার নিউ ইয়র্কে। ১৯ আগস্ট বার্লিনে দ্বিতীয় এবং সেপ্টেম্বরের শেষে আবার বার্লিনে তৃতীয় সাক্ষাৎকারটি হয়েছিল, কবি মস্কো থেকে ফিরে আসার পরে। নিউ ইয়র্কে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে হয় তাঁদের চতুর্থ সাক্ষাৎকার।

তবে দুজনের সবচেয়ে সার্থক এবং উল্লেখযোগ্য সাক্ষাৎকারটি হয় ১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই। অর্থাৎ আজকের দিনে। ‘মর্ডান রিভিউ’ সহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এই সাক্ষাৎকারের বিবরণী বেরিয়েছিল। তাঁদের সেই সাক্ষাৎকারে নানান প্রসঙ্গ এসেছে ওই আলোচনায়। বিজ্ঞানের প্রসঙ্গ থেকে দর্শন থেকে ঈশ্বর। তেমনি আলোচনা গড়িয়েছে সত্য, সুন্দর ও সৌন্দর্য নিয়ে। আগেই উল্লেখ করেছি, ১৯৩০ সালেই মোট চারবার মুখোমুখি হয়েছেন এই দুই মনীষা। তাঁদের মধ্যে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সঙ্গীত, তাল, মাত্রা, বাদ্যযন্ত্র ও শিল্পকলা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আইনস্টাইনের সঙ্গে কবির আলাপচারিতা নিয়ে একাধিক রচনা এবং বই রয়েছে। আইনস্টাইনের সঙ্গে তাঁর কী নিয়ে কথাবার্তা হয়েছিল সে সব কিছু বিস্তারিতভাবে অনেক লেখকই লিখেছেন। আগ্রহী পাঠকদের অনেকেই সে সম্পর্কে ওয়াকিবহাল আছেন। তাই সেসব কথার পুনরুক্তি করতে চাই না এখানে। কিংবদন্তি দুই মনীষার সাক্ষাৎকারের দিনটি স্মরণ করার জন্যেই এই লেখা।

শুধু আইনস্টাইন নন, দেশ-বিদেশের সমসাময়িক একাধিক শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীর সঙ্গে কবির সাক্ষাৎ হয়। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু সঙ্গে কবির অন্তরঙ্গ সম্পর্কের কথা বহু আলোচিত। প্রায় চার দশক ধরে তাঁদের বন্ধুত্ব ছিল। মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সি ভি রমন প্রমুখ বরেণ্য বিজ্ঞানীদের সঙ্গেও গড়ে উঠেছিল কবির পরিচয়। আইনস্টাইনের সঙ্গে কবির আলাপচারিতা ছাড়াও কবি হাইজেনবার্গ রয়েন্টগেন, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক, রাদারফোর্দ প্রমুখ বিজ্ঞানীদের কাজের সঙ্গেও যথেষ্ট পরিচিত ছিলেন।

বেদনার হলেও একথা সত্যি যে কবির বিজ্ঞানপ্রীতি এবং তাঁর প্রবল বিজ্ঞান ভাবুকতার বিষয়টি নিয়ে চর্চা হয় না বললেই চলে। রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানবোধ আর উপলব্ধি তাঁকে এমন এক স্তরে উন্নীত করেছিল যাতে সমসাময়িক আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি সম্যক ওয়াকিবহাল ছিলেন। কবির সঙ্গে স্বনামধন্য বিজ্ঞানীদের এই নিবিড় যোগাযোগ এক বিরল ও বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four − three =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »