অভয় মল্লিক ও সহোদর অমর মল্লিক মোহনপুরের বহু পুরনো জমিদারদের বংশধর। কিন্তু এদের মধ্যে এখন সেই দাপট না থাকলেও মরা গাঙের রেখাটা সুস্পষ্ট। দীর্ঘদিন একান্নবর্তী থাকার পর বিশেষ কারণবশত পৃথক হয়ে যান দুই ভাই এবং একজন আর-একজনের দা-কুমড়োয় পরিণত হন।
গয়ের রক্ত জল করে অভয় তার ছোটভাই অমরকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করান। আজ তিনি গাড়ি-বাড়ি, ছেলে-মেয়ে বিদেশে পড়িয়ে মানুষ করানো সবই করেছেন। আর অভয়প্রসাদ মল্লিক একটা ছোটখাটো শাড়ি ছাপাখানা দাঁড় করানো ছাড়া কিছুই করতে পারেননি।
মোহনপুর মফস্বল শহর এলাকা হলেও বিরাট সরোবরের তীরে মল্লিক পরিবার ও শাড়ি ছাপাখানা। সরোবরের উত্তর দিকটা বাড়ি সংলগ্ন বাঁধানো ঘাট, ঘাটের কাছে প্রাচীন বটগাছ, তিন পাড়েই নারকেল, তাল, সুপারি গাছের সারি। জলের একপাশে ফুটন্ত শাপলা, পদ্ম ও পানিফল।
ঝগড়ু অগ্রবাল ও রাম থাপা নামে দুজন চল্লিশ ও বিশ বছরের যুবক অভয়বাবুর ছাপাখানার কর্মচারী। ঝগড়ু বিবাহিত, সংসারী। পাঁচবছর আগে থেকে নিযুক্ত অভয় ব্যবসাটাকে বেশ রমরমিয়ে এগিয়ে নিয়ে এসেছেন। রাম ছেলেটি এই মাত্র ছ’মাস হল সুদূর নেপাল থেকে কলকাতা এসে ঘুরে ঘুরে অবশেষে কাজ খুঁজে নিয়েছে এই ছাপাখানায়। রাম থাপা জাতিতে নেপালি। বাবার একমাত্র আদরের ছেলে রাম বড় জেদি ও একরোখা। বিদ্যায় উচ্চমাধ্যমিক। একটি হরিণশাবক ধরে খাঁচায় পুরেছিল পুষবে বলে, সেই অপরাধে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করবে বলে খুঁজছিল। ভয়ে সে পালিয়ে চলে আসে মোহনপুর। আর কাজে লেগে যায় শাড়ি ছাপাখানায়। যদিও মা-বাবা শিশু হরিণটিকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হন। পাহাড় ও জঙ্গলে ঘেরা ওদের বাড়িঘর। মা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিক্ষিকা। পর্বত উপত্যকা, পাহাড়ের গুহা, পাহাড়িয়া ঝর্নার জল, ফুল-ফল-পাখি ইত্যাদি প্রকৃতির মধ্য দিয়েই মানুষ রাম। পাহাড়িয়া সঙ্গীত খুব ভালবাসে। নিজেও মায়ের কাছে তালিম নিয়ে ভাল গান শিখেছিল। বর্তমানে সে ক্রমাগত সুচেষ্টার ফলে বাংলা ভাষা করায়ত্ত করেছে। রবীন্দ্রসঙ্গীত তার প্রিয় সঙ্গীত এখন।
তীক্ষ বুদ্ধি, সততা ও বিশ্বস্ততার মধ্য দিয়ে মাত্র ছ’মসের ভিতর কাজে বড় পাকা হয়ে উঠেছে রাম। প্রায় ঝগড়ুকে ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম।
অভয়বাবুর শাড়ি ছাপাখানা ও অমরবাবুর বড় ঘর পাশাপাশি, মাত্র দু’হাত জায়গা ফাঁকা রেখে দণ্ডায়মান। অমরবাবুর ঘরের জানলা ও অভয়বাবুর জানলায় পর্দার কোনও বালাই নেই, কেবলমাত্র অমরবাবুর ঘরের জানলায় একটি রঙিন পর্দা টাঙানো।
অভয়বাবুর স্ত্রী বন্ধ্যা। কত ওঝা-কবিরাজ, কত ঈশ্বর সাধনা ভজনা করেও নিঃসন্তান জীবনযাপন করছেন। ছোটভাই অমর তিন সন্তানের বাপ হওয়ায় তিনি চাপাভাবে গর্ববোধ করেন। কিন্তু দাদার কথা মনে পড়লে চুরমার হয়ে যায় তার গর্ববোধ। বড়ছেলের জাপানে ইনকাম করা পয়সায় অমরবাবু তার বড়মেয়ের ঘটা করে বিয়ে দিয়েছেন ধানবাদে। তার ইচ্ছে ছোটমেয়ে কবিতাকে নাচ-গান শিখিয়ে বড় করে তোলা ও মানবসমাজে হাজির করানো। অমরবাবুর ঘরে তাই বাদ্যযন্ত্রের কোনও অভাব নেই।
একদিন ভুল করে জানলার পর্দা বন্ধ না করেই কবিতা প্রাণখুলে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছে আর রাম কাজকর্ম ফেলে দিয়ে ছাপাখানার জানলায় দাঁড়িয়ে একমনে হাঁ করে সেই গান ঢোঁক গেলার মত গিলছে। দ্বিতীয় গান ‘কাঁদালে তুমি মোরে’ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উভয়ের উভয়কে চোখে পড়ে। রাগে ডগমগ কবিতা হাওয়ার বেগে পর্দা টেনে দেয়। সেদিন সঙ্গীত শিক্ষাগুরু আসা সত্ত্বেও কবিতা কিছুতেই সঙ্গীত অনুশীলনে হারমোনিয়াম নিয়ে বসল না। রামের হৃদয়ে সীতার মত কিনা জানি না তবে কবিতার ছবি আঁকা হয়ে যায়। সে উদাস মনে ভাবে এমন সুন্দর মুখ কী করে হয়!
দুর্গপুজোর আর বেশি দেরি নেই। ঢাকে কাঠি পড়ে গেছে। অনেক শাড়ি জমা পড়েছে। যা কিনা বেগুনি, নীল, আশমানি, সবুজ, হলুদ, কমলা, লাল— এককথায় বেনীয়াসহকলায় ছাপাতে হবে।
একমুহূর্ত সময় অপব্যয় করার ফুরসত নেই রাম ও ঝগড়ুর। ছাপাখানায় শুধু ছাপাই হয় না, সেই সঙ্গে কাপড়চোপড় ধৌতকার্যও সম্পন্ন হয়। ঝগড়ুর কাপড় কাচায় মলিনতা দূর হয় না বলে রাম কাপড়ের গাঁট বাঁধানো ঘাটে বয়ে নিয়ে কেচে কেচে পাড় দিয়ে মাটির ওপর ঘাসে মেলে দেয়। এই সময় কত লোক যে স্নান করে ফেরে। কিন্তু একজন অভিপ্রেত মানুষ ঘাটে আসে না, ভাবে রাম। তার সন্ধানী দৃষ্টি শুধু একজনকেই খুঁজে খুঁজে ব্যর্থ হয়। তার মাতৃভাষায় কত কবিতা মুখস্থ অথচ বাংলা ভাষায় একটা কবিতাও তার মুখস্থ হয়নি। কবে মুখস্থ হবে? পাড়ে বসে বসে শাপলা ও পদ্মফুলের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে রাম। উদাস দৃষ্টি নিয়ে দেখে শালুক ও পদ্মফুল কেমন দখিনা বাদলা হাওয়ায় আন্দোলিত হয়।
সমস্ত শাড়ি শুকিয়ে ঘরে ফেরে রাম। শুরু করে দেয় ছাপাকার্য। ঠিক এইমুহূর্তে তার কর্ণকুহরে নূপুরের ধ্বনি আঘাত মারে। সেই পার্কাশান তার বুকে গিয়ে লাগে। বন্ধ হয়ে যায় ছাপা কাজ। জানলার কাছে হেঁটে যায় তার পাদুটো। চোখদুটো জানলার রঙিন পর্দায় গিয়ে কম্প লাগায়। যেন সঙ্গীত তরঙ্গে আন্দোলিত হয়। হঠাৎ মালিকের পায়ের শব্দ কানে আসায় রংরেঙের ছাপাকাজ শুরু হয়ে যায় শাড়ির ওপর। কিন্তু তার মন-প্রাণ সবই পড়ে থাকে পর্দার ওপারে পা ও নূপুরের মধ্যে। অন্যমনস্কতায় ভুল ছেপে বসে রাম।
অভয়বাবু ঘরে ঢুকে যখন বললেন, ‘রাম, শাড়িটা একটু মন দিয়ে ছাপিস, ওটা আমার ভাইঝির শাড়ি।’ তখন পর্দার আড়ালে কী নাচ শেষ হল কত্থক না ভরতনাট্যম, তা আর বোধগম্য হল না, ছাপার প্রতিটি রঙের মধ্য থেকে ফুটে উঠছিল কবিতার চোখ, ঠোঁট, ভুরু, চিবুক… নূপুর। সে মৃদু হেসে হেসে এমন দ্রুত হাত চালায় যে দেখতে দেখতে শাড়ি নেমে যায়। সামান্য একটু বাড়তি সুতো শাড়ির সঙ্গে ঝুলছিল, ওই সুতোটুকু টেনে ছিঁড়ে অনামিকায় জড়ায় রাম।
ঝগড়ু এসবের কিছুই জানে না। কারণ ঝগড়ুর কক্ষ ও রামের কক্ষের মাঝখানে একটা পিসবোর্ডের পাটিশন এমনভাবে করা যে উপরে তিন-চার ফুট ফাঁকা। স্বাভাবিকভাবে মাঝে মাঝে অপ্রস্তুতি নিয়ে হঠাৎ রামের গাওয়া নেপালি গানের টানা সুর ঝগড়ু খুবই হৃদয় দিয়ে গ্রাস করত। শুধু তাই নয়, বিদ্রূপাত্মক কথা তথা বিভিন্ন রসিকতায় সায় না দিয়ে পারত না, তাই নিয়ে কখনও একঝলক হাসাহাসি হত।
পনেরোই আগস্ট। সকাল সকাল স্নানের প্রয়োজন উঠল। ওইদিন সকালে ঘাট ফাঁকা দেখে ব্যস্ততা সহকারে কবিতা বাঁধানো পুকুরের সানের ধাপগুলো বেয়ে জলে নেমেই সাঁতার কাটতে শুরু করল। কখনও চিৎ সাঁতার, কখনও ভুট সাঁতার দিতে লাগল। কখনও হাত দিয়ে জল টানা কখনও হাত স্থির রেখে পা দাপাদাপি করে এগিয়ে যাওয়া। এ যেন ডাঙায় তোলা বড় মাছকে জ্যান্ত থাকতে থাকতেই পুনরায় জলে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
দাঁত মাজতে মাজতে রাম খুবই আনমান ঘাটে এসে সিঁড়িতে বসল। হঠাৎ তার নজর যায় জলে। প্রথমটায় ভাবল সুবিশাল মাছ বুঝি! পরক্ষণেই দেখে পদ্মপাতা ঠেলে একটি সুন্দরী মুখ পানকৌড়ির মত মাথা জাগাল। আজ কথা বলবেই, চোয়াল শক্ত রে মনে মনে বায়না ধরলো রাম। আবার ভাবল, ‘নাঃ, জলে নেমেই যাই, ও পদ্মফুল ছিঁড়ছে, আমি না হয় শালুক ফুল ভুলব, তুলব পানিফল।’ সত্যি সত্যি একমুহূর্ত দেরি না করে পরনে যা ছিল, সবকিছু নিয়ে এক্কে ডুবে পানিফলের কাছে গিয়ে মাথা জাগাল। ‘এত বড় আস্পর্দা’, বলে খেপে গেল কবিতা, ঠিক মনসা পদ্মার মত। ঘাট থেকে উঠে গিয়ে তার বাবাকে ডেকে নিয়ে এল। ততক্ষণে রাম পটাপট ঘরে গিয়ে ছাপার কাজ শুরু করে দেয়। অমরবাবু এসে দেখেন— পদ্মফুলের উপর উড়ছে বিরাট এক রঙিন প্রজাপতি। ‘কীরে মামণি, কী জন্যে আমাকে ডেকে নিয়ে এলি কিছু বললি না তো।’ ‘যাও কিছু না যাও…’ ‘রাগ করলে হয়?’ ‘ওই বোঁচা থ্যাবড়া যেন ঘাটে না আসে বলে দিয়ো…।’ ‘আচ্ছা ঠিক আছে আমি বলে দেবখন…।’
***
প্রতিবছর ভাদ্রমাসের সংক্রান্তিতে অভয়বাবুর স্ত্রী পিঠাপুলি তৈরি করেন, যেমন তালের বড়া, কলার বড়া, ছাঁচপিঠে, কুলিপিঠে ইত্যাদি। রাম যেহেতু নিজহাতে রান্না করে খায়, সেহেতু তিনি যা একটু কিছু তৈরি করেন তা রামকে না দিয়ে আহারই করেন না। এমনি সহৃদয়া মহিলা তিনি। এইভাবে একদিন একবাটি পিটেপুলি রামকে খেতে দিয়ে পরমতৃপ্তি পেলেন অভয়বাবুর স্ত্রী লীলাদেবী। রাম মাত্র দুটো বড়া রেখে আর সব একটা সাদা কাগজে লাল রঙে ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ লিখে মোড়ক করে বাইরে গিয়ে সন্ধ্যার অব্যবহিত পরেই জানলায় হাত গলিয়ে কবিতার খাটে হারমোনিয়ামের ওপর রেখে এল। কবিতা খেলেই তার খাওয়া হয়ে যাবে, এটাই রামের একমাত্র মনোবাসনা।
নৈশভোজ সমাপনে অভয়বাবু ও তাঁর স্ত্রী লীলা একত্রে বসে গেলেন। পোস্ত দিয়ে মেখে প্রথম গ্রাস চর্বণ করাকালীন স্ত্রী সহাস্যবদনে পাড়লেন, ‘এই যে, আমি একটা জিনিস ভেবেছি।’ ‘কী?’ ‘‘রাম আমাকে এমন ভক্তিমেশানো সুরে জ্যেঠিমা বলে ডাকে, আমি তা সহ্য করতে পারি না। মনে হয় পুত্রস্নেহে কেলে টেনে নিই। অথচ পারি না। কী করি বলো তো? আর আমি যদি কিছু খেতে দিই ও কেমন ভক্তিভরে পরিষ্কার করে খায়। এই তো সন্ধ্যার সময় খালি বাটি ফেরত দিয়ে বলল, ‘জ্যেঠিমা তালের বড়া কী অপূর্ব হয়েছে। এবার দেশে গিয়ে মা-কে বানাতে বলব।’’ শেষ গ্রাস কাছিয়ে নিয়ে অভয়বাবু বললেন, ‘আমি তো একই সমস্যায় পড়েছি লীলা। ও যখন আমাকে জ্যেঠু বলে ডাকে তখন আমার পিতৃহৃদয় যেন শান্তি ও পরিতৃপ্তিতে ভরে যায় স্নেহমায়ায়। কী করব বলো তো?’ আনন্দে আটখানা হয়ে লীলা বলেন, ‘এসো না আমরা ওকে ছেলে পরিচয় দিই।’ কিয়ৎক্ষণ মৌন থেকে অভয়বাবু বলেন, তা কী করে হয়। শত হলেও একটি নীড়হারা পরিযায়ী পাখি।’ ‘তুমি আর দ্বিমত পোষণ করো না, নিশ্চয়ই থাকবে।’ বিরক্তির সুরে লীলা বলেন। সম্মতি জানিয়ে অভয়বাবু বলেন, ‘তাহলে দেখো।’
সক্কালবেলা মৃদু পদক্ষেপে দাঁতে ব্রাশ করতে করতে ছাপাখানার চৌহদ্দি একবার পরিক্রমা করে আসা অভয়বাবুর নিত্যনৈমিতিক কাজ। দুইঘরের মাঝখানে থমকে দাঁড়িয়ে যান তিনি। দেখেন, দুই জানলার মাঝখানে মাটিতে ছড়ানো রয়েছে গতকালের বানানো বিভিন্ন প্রকার পিঠাপুলি এবং কয়েক টুকরো সাদা কাগজ। ক্ষণিক চিন্তা করে সোজা ঘরে এসে স্ত্রী লীলাকে বললেন, ‘ওই দেখো গে যাও তোমার ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের কাজ। দেখো গে দুই ঘরের মাঝখানে জানলার কাছে। বললাম, নীড়হারা পরিযায়ী পাখি।’ বাসিমুখে ছুটে আসেন লীলা। ছাপাখানার জানলা দিয়ে নাক গলিয়ে ‘রাম ও রাম’ বলে ডাকলেন। রাম তখনও নীল মশারির মধ্যে ঘুমে সীতার স্বপ্নে অচেতন। মুখ ধুয়ে পুনরায় হন হন করে ছুটে এসে বলেন অভয়বাবু, ‘বেলা বাজে আটটা, ইয়াং ছেলে এখনও ঘুমে? এভাবে চলবে না বুঝলে? এটা বনবাস নয়।’ চট করে মশারি খুলে বিছানা তুলে অপরাধীর ন্যায় চুপচাপ বসে ‘এটা বনবাস নয়’ কথাটা মনের মধ্যে পুনরাবৃত্তি ঘটায় রাম। ‘রাম দরজা খোল তো বাবা।’ খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পিঠেগুলি ফেলে দোওয়ার কারণ সুধালেন লীলাদেবী। চোখ ডলতে ডলতে একটু বানিয়ে বলল রাম, ‘জ্যেঠিমা, দুটো বড়া খাওয়ার পর দেখি বিরাট এক প্রজাপতি বাদবাকি পিঠের উপর জুড়ে বসেছে। তখন ভবলাম, কীটের পায়ে তো জীবাণু থাকে, ওটা খেয়ে ফেলে দেওয়াই শ্রেয়।’ মনে মনে স্বামীর কথার প্রতিবাদ করে লীলা বললেন, ‘তুই কিছু মনে করিস না রাম, তোর জ্যেঠা সবদিনই একটু বদমেজাজি।’ একটু সমাধানের সুরে রাম বলল, ‘না না জ্যেঠিমা আমি কিছু মনে করিনি।’
***
বিশ্বকর্মা পুজো। ছাপাখানায় পুজোর জন্য সকলপ্রকার আয়োজন সেরে স্নানে গেল রাম। ইতিপূর্বেই কবিতা তার দুই বান্ধবীকে নিয়ে জল ছোড়াছুড়ি করে চান করছিল ফুটন্ত পদ্মসরোবরে। বটগাছের ছাড়ায় দাঁড়াতে না দাঁড়াতে ওদের তিনজনের সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যায় রামের। কবিতা দেখেও না দেখার ভান করে। পরক্ষণেই তিনজন একত্রে অট্টহাস্যে হেসে ওঠে। অপলক দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে নিশ্চুপ রাম নিজেকে খুব বেমানান মনে করে। তার বাটি-ছাঁট চুলে হাত বোলায়, মনে মনে ভাবে তার বোঁচা-চ্যাপ্টা নাকের কথা। ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখে বটগাছের মগডালে দুটো কপোত-কপোতী বসে আছে। ‘এ যুগের চণ্ডীদাস’ বলে কবিতারা তিনজন টিপ্পনী ছুড়ে মারে। ইচ্ছেমত চানটান সমাপন করে ভিজে শাড়িতে জল দিয়ে লক্ষ্মীর পা এঁকে প্রস্থান করে। নীরবে নিঃশব্দে একাকী মনপ্রাণভরে রাম তার রঙিন নয়ন-ক্যামেরায় কবিতার পদচিহ্নের ছবি তোলে। কিন্তু রোদের তাপে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায় সে চিহ্ন। অবশেষে বেলা যায় ভেবে স্নানের উদ্দেশে জলে নেমে পড়ে রাম। চিৎ ভুট সকলপ্রকার সাঁতার কেটে স্নান করা এমনকী জলের গভীরতা মাপার জন্য জলের বিতলে ডুবে ডুবে কাদা তোলা কখনও বা ঝিনুক তোলা অভ্যেস ছিল রামের। একদিন কাদার পরিবর্তে শক্ত একটি বস্তুখণ্ড হাতে পড়ে, প্রথমটায় ভেবেছিল কচ্ছপ। ফের দীর্ঘ দম নিয়ে ডুব দিয়ে বেশ ওজনের একটি পাথরের মূর্তি তুলে আনে। কর্দমাক্ত অবস্থায় ভেবেছিল তার আরাধ্য দেবতা বুদ্ধমূর্তি। ওই অবস্থায় প্রণাম করে। পরক্ষণেই কাদামাটি জলে ধুয়ে পরিষ্কার করে দেখে এক বুড়িমার বহু পুরনো মূর্তি। পুনরায় প্রণাম করে। ভক্তিভরে মাথায় করে বয়ে ঘরে এনে রাখে রাম।
পূজাশেষে পাড়ার আবালবৃদ্ধবনিতা প্রসাদ নিয়ে গেল। সদলবলে কবিতাও অপরূপাসাজে সজ্জিতা হয়ে প্রসাদ নিতে এসেছিল। ভেবেছিল তার বড়মার হাতে প্রসাদ গ্রহণ করবে। কিন্তু যখন দেখল কর্মচারী রামচন্দ্র নিজের হাতে প্রসাদ বিতরণ করছে, তখন অসম্মতি প্রদর্শন করে বান্ধবীদের দল থেকে ছুটে পালাল। ‘ডুবে ডুবে জল খাওয়া হচ্ছে’ উচ্চারণপূরক কবিতার দুর্বলতা পরিস্ফুট হল তার বান্ধবীদের কাছে। রাবণের শক্তিশালী বাণ এসে যেন বিঁধল রামের বুকে। তার চোখে জল এসে গেল; ভেবেছিল অন্তত এই শুভদিনে একটু পরিচয় করবে, তার পাহাড়িয়া দেশের কথা শোনাবে, এমনকী ভেবেছিল তার কাছে একটা ছবি চাইবে দেশে নিয়ে বাঁধিয়ে রাখবে। অথচ সব অকালবোধন হয়ে গেল তার। উপবাসী রামের সারারাত উপোসে কাটল, একটু আখের খণ্ডও নয়। নিদ্রাহীন শুয়ে শুয়ে বালিশ ভেজাল।
প্রিয়বন্ধু চৌধুরীবাবুর চানাচুরের ফ্যাক্টরি থেকে নেমন্তন্ন রক্ষা করে এসে ঘরে দরজা দিলেন অভয়-লীলা। সকালে রাম বিষণ্ন মনে অভয়বাবুকে পাথরের মূর্তি দেখালে অভয়বাবু ও স্ত্রী লীলাবতী আনন্দে দিশাহারা হয়ে যান। ‘এ যে মায়ের কষ্টিপাথরের সেই মূর্তি।’ খুশিতে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বললেন অভয়বাবু। খবর শুনে ছুটে এলেন ছোট মল্লিকবাবু অর্থাৎ অমরবাবু ও তাঁর স্ত্রী, পুত্র ও অপরূপা সুন্দরী মুখ নিয়ে কবিতা। সকলের মুখে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। শুধু রামচন্দ্রের চোখে জল, লেশমাত্র হাসি নেই। ‘বাবা তুমি কাঁদছ কেন একী! তুমিও একটু হাসো।’ বললেন অভয়-লীলা। ‘না না জ্যেঠামশাই, না জ্যেঠিমা, আনন্দে আমার চোখে জল এসে গিয়েছে।’ অবনতমস্তকে কবিতা রামের দিকে তাকয়ে একটু লৌকিকতার ক্ষীণ শুষ্ক হাসি হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু ফুটল না! পাড়ার লোক সকলে ছুটে এসে যেন রামকে মাথায় তুলে নাচায়। হঠাৎ দেখা যায় অমরবাবু ও অভয়বাবু আনন্দে আপ্লুত হয়ে দুই ভাই কোলাকুলি করতে করতে অশ্রু ঝরালেন। তৎক্ষণাৎ দুই ভাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন পাড়ার পাঁচশত লোককে খাওয়াবেন। ঠিক একসপ্তাহের মধ্যে আত্মীয়স্বজন সমাগমে আয়োজন করলেন বিরাট এক প্রীতিভোজের। রান্নার কাজ চলছে। মাইক, সানাই সবই বাজছে। মূর্তিটা আসনে বসিয়ে ফুলচন্দনে সাজাচ্ছে কবিতা। সকলপ্রকার সবজি কাটা ধোয়াপালা রামই দৌড়ে দৌড়ে সমাপন করল সরোবরের ঘাটে।
সকালে একপশলা বৃষ্টির পর একটানা রোদ ওঠে। কাজের ফাঁকে রামচন্দ্র সরোবরতীরে দশখানা রঙিন শাড়ি শুকাতে ব্যস্ত। হঠাৎ উৎফুল্ল হৃদয় নিয়ে খালিপায়ে নিজঘর থেকে জ্যেঠামশাইয়ের ঘরে দৌড়ে যায় কবিতা। গোষ্পদে জলকাদা জমার মত একজায়গায় দুটি পা-ই পড়ে যায় তার। দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে হরিণমনা মেয়ে বিছানো শাড়ির ওপর দিয়েই লক্ষ্মীর পা এঁকে ছুটে যায়। নজর যায় রামের। সব শাড়ি তুলে আনে। আলাদা করে রাখে ওই সবচেয়ে দামি শাড়িটি। যাতে বাম ও ডান পায়ের স্পষ্ট কর্দমাক্ত পদচিহ্ন লেগে আছে।
একাগ্র চিত্তে কাপড়কাটা কাঁচি দিয়ে বাম ও ডান পদচিহ্নদুটি নিখুঁতভাবে কেটে সাইডব্যাগে রাখে রাম। তল্পিতল্পা গুটিয়ে কাউকে না বলে বেরিয়ে পড়ে। ওদিকে খাওয়ার বৈঠক বসে গেছে। সকল নিমন্ত্রিত ব্যক্তি রামকে দেখতে চাইছেন। রামকে না দেখা পর্যন্ত কেউ মুখে গ্রাস তুলছেন না। ইতিপূর্বে রাম ফটোর দোকান থেকে বাঁধিয়ে নিয়ে চলেছে গাড়িতে সুদূর পাহাড়ের কোণে। তল্লাশি পড়ে গেল রামের। লোক ছুটে গেল চতুর্দিক। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ বলেন, ‘খাওয়া শুরু করুন তো। রাম গেছে বনবাসে।’ কেউ বলেন, ‘রাম এখন অযোধ্যায়।’ কেউ বলেন, ‘রাম গেছে সীতার খোঁজে।’ শ’য়ে শ’য়ে লোকের মধ্য থেকে খাওয়া ফেলে তখন ছুটে বাড়ির ফটক টপকে নিজের কক্ষান্তরে এসে ভেঙে পড়ে কবিতা। চোখ যায় জানলায়। দেখে তার রঙিন শাড়িটি এলোমেলো পড়ে আছে। অপলক দৃষ্টিতে উলটপালট করে দেখে শাড়িতে কাটা। অপূর্ব নকশায় দুটি পায়ের আকৃতি। এ যে তারই পা! বুঝতে আর বাকি থাকে না কবিতার। দু’হাতে দু’টি কাটা পা ধরে ‘পা চোর’ বলে এক চেঁচানি দেয়। তারপর পর্দাখোলা জানলার দিকে চোখের জল ছেড়ে দিয়ে অপলক দৃষ্টিতে ভুট হয়ে নির্বাক তাকিয়ে থাকে।