Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

আমার রেডিয়ো

ঐতিহ্য মানে যদি ঐতিহাসিক ধারা, বা কথা অথবা পরম্পরাগত চিন্তা ও সংস্কার কিংবা ট্রাডিশন হয়, তবে বলতে দ্বিধা নেই যে আমি সেই বংশগত অথবা পরম্পরাগত সংস্কারে আক্রান্ত। আক্রান্ত হয়ে আবার গর্বিতও বটে। মনে পড়ে আমার সেই প্রথম রেডিয়ো-প্রেমের দিনগুলো। অবশ্যই তা এসেছিল আমার বাবার কাছ থেকে, আমার পরিবারের কাছ থেকে। রাস্তা চলতে-চলতে কতদিন দেখেছি বহু লোক একটা রেডিয়োকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। সেদিনের সেই দোকানটা হল হাই স্ট্রিটের একটা সেলুন, ‘ওয়েল-কাট্ সেলুন’। বুঝে-না বুঝে আমিও কখন যেন দাঁড়িয়ে পড়েছি সেই সেলুনের সামনে তার ঠিক নেই। চলছে কলকাতায় আই এফ এ শিল্ড-এর ফাইনাল। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের ফুটবল খেলা। রেডিয়োর সামনেই তখন সে কী উত্তেজনা। আসল রেডিয়োটির কিন্তু কোনও খোঁজ নেই, শুধু সেলুনের কাচের হাফ-দরজার বাইরে একটা লম্বা তার বার করা। আর সেই তার শেষ হয়েছে ঠিক রেডিয়োর মত দেখতে একটা সুদৃশ্য কাঠের বাক্সতে, যা আসলে মূল রেডিয়োর স্পিকার বা সাউন্ড বক্স। ওটির গায়ে ওপর-নীচে সুন্দর করে তারা চিহ্ন আঁকা।

আরও ছিল ‘আকাশবাণী’ নামে সীতেশদার দোকান, আর ‘মিউজিক সেলুন’ নামে হাই স্ট্রিটে পর-পর দুটো রেডিয়োর দোকান। আমাদের পাশে ছিল স্যাকরা বাড়ি, সেখানেও ছিল এক ভালব্ সেট রেডিয়ো। ওঁদের বাড়িতে সকাল-বিকাল বিবিধ ভারতী-র দারুণ-দারুণ জনপ্রিয় হিন্দি গান বাজত তারস্বরে। ওঁদের ছাদের দু’পাশে ছিল দুই পেল্লাই লম্বা বাঁশ। সেই বাঁশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত ছিল লম্বা কালো তার। সেখান থেকে আরও একটা তার এসে ঢুকত রেডিয়োর পেছনে। বার-বার ঝড়ঝাপটায় আর পায়রা বসার ফলে ক’দিন পর-পর সেই তার ছিঁড়ে যাওয়ার জন্য আউটডোর এরিয়াল বাদ দিয়ে ওই বাড়ির লম্বা দালানে টাঙানো হল চা-ছাঁকনির মত সরু তারের তৈরি একটা আস্ত বেনারসির জরিবোনা পাড়। অনেক পরে জেনেছি ওটাকে ইনডোর এরিয়াল বলে। আর এই এরিয়ালের জেরেই বিবিধ ভারতী-র মত দুর্বল স্টেশনও ধরা পরত ওঁদের রেডিয়োতে। সেই রেডিয়োটার পাশে ছিল আরও একটা রেডিয়ো সাইজের আয়তাকার বাক্স। সাদার ওপর লাল নীল রঙের প্রলেপ। একটা ইংরেজি নাইন সংখ্যার গোলের ভেতর দিয়ে একটা কালো বিড়াল লেজ তুলে দৌড়ে পালাচ্ছে। অনেক পরে জেনেছি আসলে ওটা এভারেডি ব্যাটারি। বহু-বহু দিন আয়ু ছিল ওই ব্যাটারির। আরও পরে ফেলে দেওয়া সেই ব্যাটারি নিয়ে খেলতে-খেলতে ওটা ভেঙে মোটাসোটা বেকারি বিস্কুটের মত তিন-চার সারি খণ্ড দেখেছিলাম। সেগুলো ভেঙে আবার কয়লার গুঁড়োর মত কার্বন পেয়েছি। রেডিয়ো নিয়ে এমনই কৌতূহল ছিল আমার।

আবার প্রতিবেশীর বাড়ির ঢাউস ভালব্ সেটের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করে থেকেছি কখন ওই বাক্স থেকে কথা বলা বা গান গাওয়া মানুষটা সশরীরে স্বয়ং বেরিয়ে আসবে। কী যে অপূর্ব দেখতে ছিল সে রেডিয়ো তা বলে বোঝানো যাবে না। নীচে ছিল বেশ কটা নব্, টিপলে টক্ শব্দ-করে বসে যাওয়া সুইচ্। আমার ধান্দা ছিল বড়রা ঘর থেকে চোখের আড়াল হলেই টকাস-টকাস শব্দে ক্রমাগত সেই হাতির দাঁতের রঙের সুইচ্ টেপাটেপি খেলা খেলার। আর ওপরের দিকের এককোণে ছিল একটা সবুজ রঙের বড় মায়াবী এক লাইট। যে মাঝেমাঝে চোখ পিটপিট করে জানান দিত সেন্টারটি সঠিকভাবে ধরা হল কিনা? রেডিয়োর ক্যাবিনেটটি থাকত দারুণ সুন্দর পালিশ করা ঝাঁ-চকচকে দৃষ্টিনন্দন। সামনে থাকত বাহারি গ্রিল-এর সুদৃশ্য আঁকিবুকির ঝালর। দুই পাশে থাকত কত রকমের ছোটবড় বিভিন্ন ধরনের নব্। সেবার দেখি ঘরে কেউ নেই। ব্যাস, আর আমাকে পায় কে? দিয়েছি সব সুইচ্ পেঁচিয়ে-ঘুরিয়ে। শুনি খটাস্ করে শব্দ হল। আর আমার হাতের তালুতে দেখি একটুকরো ভাঙা সুইচের অংশ। চোঁ-চাঁ দৌড় মেরে ত্রিসীমানার বাইরে।

আসলে ভাললাগা ভালবাসার জিনিস নিয়ে যেমন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা যায় তেমনই রেডিয়ো নিয়ে আমার অনুভব, আমার অভিযোগ বিষয়ে বহুক্ষণ ধরে বলতে ইচ্ছা হয়। বাবাকে দেখেছি চিকিৎসা পেশা থেকে পুরোপুরিভাবে অবসর গ্রহণের পর প্রচণ্ড কথা-বলা আড্ডাবাজ মানুষটি কেমনভাবে একটা ট্রাঞ্জিস্টর-কে বুকে আঁকড়ে ধরে সময় কাটাচ্ছেন। সাতসকালের সিগনেচার টিউন থেকে শুরু হত তাঁর দিন। সে ‘কৃষিকথার আসর’ হোক বা ‘মজদুরমণ্ডলীর আসর’-ই হোক না কেন? বাবার শোনা চাই-ই চাই। আর এই রেডিয়ো শুনে-শুনে বাবা ঘরের চার দেওয়ালে বন্দি থেকেও অত্যাধুনিক সমাজসচেতন নাগরিক হিসাবে সদাই নিজেকে আপ-টু-ডেট রাখতে পেরেছিলেন জীবনের শেষদিন অবধি। আমার কাজ ছিল সঠিক সময় ব্যাটারি কিনে দেওয়া, আর মাঝে-মাঝে রেডিয়োটির পেছনের ঢাকনা খুলে রোদে দেওয়া। না হলে একপ্রকার ছোট-ছোট আরশোলা ভেতরে ঢুকে বাসা বানাত। মা আর মেজদি মিলে রেডিয়োটার সুন্দর দুটো জামা বানিয়ে দিয়েছিল। পাশের বর্ডারে ছিল ক্রুশ-কাঁটা আর ক্রচেড সুতোর সুদৃশ্য লেসের পাড়। তখন রেডিয়োর যত্ন ছিল অর্থাৎ মহার্ঘ সম্পত্তির মত তখন ঘড়ি রেডিয়ো সাইকেল পণ দিলে মেয়ের বিয়ে হয়ে যেত।

আমার আর এক রেডিয়ো-প্রেমিক বন্ধু সিরাজ সেখ ছিল ক অক্ষর গোমাংস বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই। শেষের কয়েক বছর টিপসই বন্ধ করে সই আঁকতে শিখেছিল আমাদের চেষ্টায়। কিন্তু— কিন্তু তার জ্ঞানের বহর দেখলে সবাই লজ্জা পাবে। মাঝে-মাঝে কাউকে দিয়ে খবরের কাগজ পড়িয়ে নিলেও ওর আউট নলেজ অর্থাৎ সাধারণ জ্ঞান যা ছিল তা সবই রেডিয়োর দৌলতে। রাজনীতিতে কোন দিকে ঝোঁক, আন্তর্জাতিক খবরাখবর— সব সিরাজের নখদর্পণে ছিল। কখন কী-কী সার বা কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে এসব বেতারের অনুষ্ঠান ‘চাষিভাইদের বলছি’ থেকে হুবহু ও বলে দিতে পারত। এখন ভাবি একজন নিরক্ষর মানুষও শ্রুতিধর হতেই পারে। আর এভাবেই তো একদিন বেদ বা শ্রুতি লোকের মুখে-মুখে ফিরত। সেদিন চমকে উঠেছিলাম, নূর আলী যখন জিজ্ঞাসা করে, ‘আচ্ছা সিরাজভাই, আজ কি বৃষ্টি হবে?’ আমি নূর আলীকে জিজ্ঞাসা করি, ‘তুমি বৃষ্টির খবর জেনে কী করবে? আর সিরাজভাই বা বৃষ্টির খবর জানাবে কী করে?’ নূর আলী বলে, ‘পাটের জমিতে জো পাওয়া যাবে কিনা তাই? আর আমাদের আবহাওয়ার আগাম খবর তো বরাবর সিরাজ ভাই-ই দেয়!’ সিরাজ বলে, ‘আজ আমি আবহাওয়ার খবর বলতে পারব না— কারণ আমার রেডিয়োতে ব্যাটরি নেই, তাই আজ ওয়েদার রিপোর্ট শুনতে পাইনি।’ কথার ফাঁকে-ফাঁকে এমন দু-একটা নির্ভুল ইংরেজি কথা গুঁজে দিয়ে সিরাজ আমাদের চমকে দিত। তাই রেডিয়ো আজ আর শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, রেডিয়ো হল অনেকানেক কাজের অতি প্রয়োজনীয় মাধ্যম। অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক অতি প্রয়োজনীয় শানদার হাতিয়ার। বিকল্প দৃষ্টান্তমূলক আমোদ উপকরণ ও নির্ভেজাল শিক্ষার প্রথম পাঠ পাওয়া যাবে এই রেডিয়োতে।

এই রেডিয়ো কি তবে আধুনিকতার মোড়কে একদিন হারিয়ে যাবে? এশিয়া-প্যাসিফিক ইনস্টিটিউট ফর ব্রডকাস্টিং ডেভেলপমেন্ট (AIBD) বলে মালয়েশিয়াতে একটি আন্তর্জাতিক ফোরাম আছে। রয়েছে এশিয়া স্পেসিফিক ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন (ABU)। সেখানে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের এমনকি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকেও প্রতিনিধিরা এসে পরস্পর মতবিনিময় করেন। গত বছর লন্ডনের প্রতিনিধি ‘Will Radio Survive’, অর্থাৎ ‘রেডিয়ো কি বাঁচবে’ বিষয়ে বলতে গিয়ে বলেন যে, রেডিয়ো আছে, ছিল, থাকবে। উন্নত বিশ্বেও রেডিয়ো আছে, তবে তা সম্পূর্ণ এক অন্য আঙ্গিকে, ভিন্ন প্রোগ্রামে, ভিন্ন মাত্রায়, ভিন্ন মাধ্যমে, ভিন্ন ডাইমেনশনে। এখন রেডিয়ো শুধু ঢাউস ক্যাবিনেটের সেটে বন্দি নয়। রেডিয়ো আছে ইন্টারনেটে, এফ এম-এ, ওয়েবসাইট বা অ্যাপস্-এর মত অন্য মাধ্যমে। বাক্সবন্দি হয়ে নয়, দূরদর্শনের মত দর্শক বা শ্রোতাদের সরাসরি কাছে চলে আসছে জলসার মত অনুষ্ঠানের উদযাপনে। এ বিষয়ে পথিকৃৎ বিবিসি, জার্মানির ডয়েচে ভেলে, ভয়েস অফ আমেরিকা, জাপান বা ফিলিপিন্স-এর রেডিয়ো। তাদের রেডিয়োতে ভারতীয় ভাষায়; বিশেষত বাংলায় নিয়মিত অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়। তার মধ্যে আছে জনপ্রিয় গান, ক্যুইজ, প্রতিবেদন ছাড়াও শ্রোতাদের জন্য প্রশ্নোত্তর পর্বে আকর্ষণীয় পুরস্কারাদি। এমনকী এইসব প্রতিবেশী দেশের প্রতিনিধিরা সরাসরিভাবে আমাদের দেশে এসে শ্রোতা-ক্লাবের সদস্যদের সঙ্গে মিলিত হন। কখনও বা বিচিত্রানুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁরা তাঁদের দেশের রেডিয়ো প্রোগ্রামকে তুলে ধরেন।

এখন যদি আপনার কাছে একটা অ্যানড্রয়েড হ্যান্ডসেট থাকে তো সারা পৃথিবীর রেডিয়ো আপনার হাতের মুঠোয় চলে এল। অ্যাপ ডাউনলোড করুন, গুগল প্লে স্টোর-এ গিয়ে ‘অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো লাইভ’ বা ‘অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো’ বা ‘অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো – নিউজ’ ইত্যাদি প্রভৃতি নামে বহু অ্যাপ ডাউনলোড করলেই কেল্লাফতে। ‘বাংলা টিউন’ নামে একটি দারুণ সুন্দর অ্যাপ ডাউনলোড করুন। এখানে যুগপৎ আকাশবাণী কলকাতা গীতাঞ্জলি, আকাশবাণী শিলিগুড়ি ও আকাশবাণী মৈত্রী-র সঙ্গে ওখানে রেডিয়ো মির্চি-র সর্বক্ষণের রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনা যায়। শোনা যায় ফ্রেন্ডস্ এফ এম। ‘বাংলা টিউন’-এর আর একটি সুবিধা এদের ফেসবুক পেজে তাদের সম্প্রচার নিয়ে কথোপকথন চালানো যেতে পারে। আরও আছে ইসরো-র তৈরি ই-গ্লোব। সেখানে আছে অসংখ্য ছোট-ছোট ডট্ বা বিন্দু। গ্লোবের সেই দেশে সেই নির্দিষ্টভাবে রাখা বিন্দুর ওপর ক্লিক্ করলেই গুনগুন করে বেজে উঠবে এক-একটা আলাদা আলাদা রেডিয়ো স্টেশন। আবার ‘আকাশবাণী মৈত্রী’ জন্মলগ্ন থেকেই নিজস্ব অ্যাপ ই এস ডি নামে আলাদা স্থান নিয়ে উপস্থিত। বৃহত্তর কলকাতার শহরতলিতে সব বাস-ট্যাক্সি-প্রাইভেটে এমনকি সকল রকম ছোট-বড় সব রকম মোবাইলেই পাওয়া যাবে স্থানীয় এফ এম স্টেশনগুলো।

ডিটিএইচ্ হল ‘ডাইরেক্ট টু হোম’। কেন্দ্রীয় সরকারের স্যাটেলাইট-নির্ভর বেতার সম্প্রচার, যেখানে মোবাইল অ্যাপস্ বা ডিস অ্যন্টেনা আর সেট টপ্ বক্সের সহায়তায় আকাশবাণী কলকাতা গীতাঞ্জলি ও কলকাতা এফ এম রেনবো দুটো পৃথক চ্যানেলের মাধ্যমে চব্বিশ ঘণ্টাব্যাপী শোনা যায়। প্রসার ভারতী-র ছত্রছায়ায় বিবিধ ভারতী এ আই আর বাংলা, গুজরাতি, উর্দু, পঞ্জাবি, ন্যাশনাল, গোল্ড, রেনবো, রাগম, অসমীয়া, ওড়িয়া ইত্যাদি চোদ্দটি অডিয়ো চ্যানেল আর চল্লিশ-পঞ্চাশটি ভিডিয়ো চ্যানেল উপলব্ধ। ফ্রি-টু এয়ার শিরোনামে এই চ্যানেলগুলি আমরা নিজের মত বাজার-চলতি একটা ডিশ্ অ্যান্টেনা আর একটা সেট টপ্ বক্স একটা টিভি বা সাউন্ড বক্স আর কিছু তার। আকাশবাণী কলকাতা গীতাঞ্জলি প্রচারতরঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে এফ এম রেনবো কলকাতা পাওয়া যায়।

আকাশবাণী কৃষ্ণনগর

সালটা ছিল ২০১০-এর প্রথম দিক। কৃষ্ণনগর থেকে আমাদের তিন বন্ধু কলকাতা এসেছে ডাক্তার দেখাতে। তাড়াতাড়ি ডাক্তার দেখানো হয়ে গেলে আমার বন্ধু ইনাসউদ্দীন বলে, ‘চলুন, একটু আকাশবাণী থেকে ঘুরে আসি।’ আকাশবাণীর নাম শুনে রাজি হয়ে যায় রেডিয়ো শোনা অপর দুই বন্ধু বিমলেশ দাস আর প্রদীপ বাগচী। আকাশবাণীর পদস্থ ইঞ্জিনিয়ার এ. আর. সেখ ছিলেন ইনাসের পূর্বপরিচিত। সেদিন তিন বন্ধু মিলে সেখ সাহেবের সঙ্গে গল্পগুজবের ফাঁকে কৃষ্ণনগরে আমাদের সাহিত্য-সাংস্কৃতির অনিয়মিত আড্ডা ‘সুজন-বাসর’-এ আসার আহ্বান জানিয়ে রাখলে উনি সানন্দে রাজি হয়ে যান। তখন ‘সুজন-বাসর’ এর বহু সদস্য-সদস্যা প্রাত্যহিকীতে নিয়মিত চিঠি লেখেন।

পরবর্তীকালে সেখ সাহেবের কৃষ্ণনগর সফরের সময় আমরা তাঁর সঙ্গে বিস্তারিত আলাপচারিতায় রেডিয়ো নিয়ে আমাদের সমস্যার কথা জানাই। কলকাতা থেকে একশো কিলোমিটার দূরের কৃষ্ণনগরে বসে রেডিয়োতে ভালভাবে না শুনতে পাই কলকাতা ‘ক’ কেন্দ্রের সম্প্রচার, না শুনতে পাই কলকাতা ‘খ’, এফ এম প্রচারতরঙ্গের বিভিন্ন অনুষ্ঠান। তখন সেখ সাহেবের কাছে জানতে পারি কেমনভাবে মাত্র একজনের একক প্রচেষ্টায় কোচবিহারে বেতার সম্প্রচার কেন্দ্র বা রিলে সেন্টার তৈরি হয়ে গেছিল শুধুমাত্র একটার পর একটা চিঠি লিখে। আমাদের ‘সুজন-বাসর’-এ প্রস্তাব হল আমরাও ‘লড়কে লেঙ্গে হিন্দুস্থান’। আমরা তখন পাগলের মত চিঠি লিখে চলেছি দিল্লি-কলকাতা সহ সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরে একের পর এক। পথে নেমে মিছিল করা, ট্রেন অবরোধ তো আর এই বয়সে করতে পারি না। ‘মসিকে অসি’ বানিয়ে তখন নেমে পড়েছি আকাশবাণীর ময়দানে। সালটা ২০১০ সালের মে মাসের ঘটনা।

আর পিছিয়ে দেখার সময় নেই। ২০১০-এর সেপ্টেম্বর মাসে এক দুপুর। ডিং-ডং বেল শুনে ছুট্টে গিয়ে দরজা খুলেই পেলাম দিল্লি থেকে প্রসার ভারতী-র পাঠানো অশোকস্তম্ভমার্কা সরকারি খাম। সেই বহুপ্রতীক্ষিত চিঠিটি প্রসার ভারতীর বরিষ্ঠ আধিকারিক জিতেন্দ্র প্রসাদ আরোরা সাহেবের সই করা। কৃষ্ণনগরে একটি ১০০ ওয়াটের ট্রান্সমিটারের সাহায্যে ডি টি এইচ্ রিলে সেন্টার বসানোর পরিকল্পনা হচ্ছে। ব্যাস, আর কী চাই? আমাদের মত রেডিয়ো-পাগল মানুষগুলোর বুকে তখন হাজার হাতুড়ি পেটা চলল। ভূতের রাজার বর পেয়ে গুপি-বাঘা যেমন একচোট নেচেছিল, মাটিতে গড়াগড়ি খেয়েছিল ঠিক ততটা নাহলেও অনেকটা তেমনই আনন্দে লুটোপুটি খেলাম।

ইতিমধ্যে ২০১১ সালের ২০ নভেম্বর, রবিবার কৃষ্ণনগরের এ. ভি. হাইস্কুলে আকাশবাণীর প্রাত্যহিকী অনুষ্ঠানের পত্রলেখক ও শ্রোতাদের ষোড়শ রাজ্য সম্মেলন হয়ে গেল সুজন-বাসর-এর প্রত্যক্ষ সহায়তা ও সহযোগিতায়। সেখানে সম্মেলনের মঞ্চ হাজির করানো হল এক সত্তরোর্ধ্ব রিকশাচালক সন্ন্যাসী দে-কে। গত চল্লিশ বছর ধরে হাটে-মাঠে-বাটে সন্ন্যাসী দে-কে কেউ কখনও দেখেননি যখন তাঁর হাতে রেডিয়ো নেই। এহেন শ্রোতা নম্বর ওয়ান-কে মঞ্চে ডেকে তুলে প্রাত্যহিকী পরিবারের সকলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হল বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে।

এদিকে সেখ সাহেবের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানতে পারি, আমাদের রিলে সেন্টার তৈরি করার কাজের অগ্রগতি কতটা কোথায় কী হচ্ছে। একদিন শুনলাম ঢাউস ট্রান্সমিটার যন্ত্র বিদেশ থেকে প্রথমে দিল্লি, পরে বড়-রাস্তা (এন. এইচ্.) ধরে কৃষ্ণনগরের পথে রওনা দিয়েছে। এইবার যন্ত্রটি এসে পৌঁছে গেলেই সব সমাধান হবে।

এদিকে কৃষ্ণনগরের অবস্থান অনেকটা সসেমিরা-র মত। কলকাতার দূরত্ব পাক্কা একশো কিলোমিটার আবার উল্টোদিকে বহরমপুরের এফ এম সেন্টারও প্রায় আশি কিলোমিটার দূরে যা আগেই বলেছি। একটা সময় ছিল যখন অ্যান্টেনা ও বুস্টার লাগিয়ে কিছু-কিছু এফ এম স্টেশন কৃষ্ণনগরে পাওয়া যেত। ইদানীং এসবের বালাই নেই— শত চেষ্টাতেও এখানে রাতের বেলা ছাড়া এফ এম ধরা যায় না। বহু আগে আমরা পূর্বাঞ্চলীয় শ্রোতাদের জন্য হুগলির মগরা থেকে গাঁই-গাঁই করা সাউন্ডের রেডিয়ো শুনতে পেতাম। এমনকি হাতে তৈরি দু-একটা ডায়ট আর ট্রাঞ্জিস্টর দিয়ে সঙ্গে ওপরে একটা এরিয়ালের তার ও মাটিতে একটা লোহার শিক পুঁতে দিয়ে ওই চার-পাঁচটা তার দিয়েও রেডিয়ো শুনেছি। আমরা পূর্বাঞ্চলীয়দের সম্প্রচারিত অনুষ্ঠান কত শুনেছি।

বছর দুয়েক পর ২০১৩ সালের মে মাসে খবর পেলাম সব কিছু রেডি। এবার ‘আকাশবাণী কৃষ্ণনগর’ সম্প্রচারের অপেক্ষায়। ব্যাস, সুজন-বাসর-এর পক্ষ থেকে ফ্লেক্স ছাপানো হল। তাতে বড়-বড় করে লেখা: প্রাত্যহিকী এখন মোবাইলে… এখন থেকে 100.1 Mhz এ আকাশবাণী কৃষ্ণনগর শুনুন। বহু প্রতীক্ষার শেষে আগামী ২০-৫-২০১৩ থেকে কৃষ্ণনগরে চালু হল DTH, সকাল থেকে রাত্রি (হ্যাঁ, তখন প্রথমে ভোর ৫টা থেকে রাত ১১টা) পর্যন্ত DTH এ বাংলা গান, নাটক শুনুন। নীচে প্রসার ভারতীর এফ এম প্রসারণ কেন্দ্র, আকাশবাণী কৃষ্ণনগর লেখা। এই ফ্লেক্স আমরা সারা শহরের প্রধান-প্রধান রাস্তার মোড়ে লটকে দিই। একটি বাদকুল্লা ও একটি ধুবুলিয়া রেলস্টেশনের পাশে প্রকাশ্যস্থানেও লাগিয়ে দিই।

এরই ভেতর প্রসার ভারতীর বেশ কয়েকজন বরিষ্ঠ আধিকারিকের আকাশবাণী কৃষ্ণনগর পরিদর্শনের সময় আমরা ক’জন সুজন-বাসর-এর পক্ষে কৃষ্ণনগর দূরদর্শন কেন্দ্রর সংরক্ষিত অঞ্চলের ভেতরে ঢুকবার সুযোগ পাই। কীভাবে কোন মেশিনগুলির সাহায্যে সম্প্রচার হচ্ছে সেখ সাহেব আমাদের বুঝিয়ে দেন। আমরা তখন আর্জি জানাই ডিটিএইচ্-এর মত জনপ্রিয় অনুষ্ঠান সারা দিনরাত নন্-স্টপ কৃষ্ণনগর বেতার কেন্দ্রও চালু রাখুন। তাৎক্ষণিক এক আদেশবলে সারা রাত নন্-স্টপ কৃষ্ণনগর বেতার কেন্দ্র চালু রাখার কাগজপত্রে উনি দস্তখত করে দেন। সেই থেকে আর কোনও দিন কৃষ্ণনগর বেতার কেন্দ্র রাত ১২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত বন্ধ থাকে না।

ডিটিএইচ্ কাকে বলে?

ডিটিএইচ্ কীভাবে চলে? এ সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান অনেকটা ভাষা-ভাষা বললে কমই বলা হবে। ডিটিএইচ্ মানে ডাইরেক্ট টু হোম – টিভি। আর এখনকার সব বাজারচলতি সকল সার্ভিস প্রোভাইডারই আলাদা করে ফ্রি টু এয়ার অডিয়ো সহ ভিডিয়ো তাদের টিভিতে দিতে আইনত বাধ্য। এতে আপনি বিনা পয়সায় ত্রিশটির বেশি অডিয়ো আর পঞ্চাশটির ওপর ভিডিয়ো চ্যানেল পাবেন। আর কারও ওপর নির্ভর না করে আপনি যদি একটি সেট টপ বক্স কিনে নিয়ে জুড়ে নির্দিষ্ট কোণ করে আপনার বাড়ির ছাদ বা খোলা জায়গায় একটা বাজারচলতি ডিস্ লাগিয়ে দেন তবে মাসের পর মাস কেবলওলাকে টাকা না দিয়েই ঝাঁ-চকচকে ডিজিটাল ছবি পাবেন। আপনার পাড়ার কেবল্ অপারেটরকে বলুন তিনিও তাঁর কেবল লাইনে কেন্দ্রীয় সরকারের বিনা পয়সার ডিটিএইচ্-এ আপনার রেডিয়ো শোনার ব্যবস্থা করে দেবেন বলে আমার স্থির বিশ্বাস।

এখন আমাদের এখানে ইচ্ছা করলেই মোবাইলের সঙ্গে হেডফোন জুড়ে নিয়ে ওটাকেই অ্যান্টেনা বানিয়ে ১০৩.৭ মেগাহার্টজ-এ দশ কিলোমিটার ব্যাসার্ধে বাদকুল্লা থেকে ধুবুলিয়া পর্যন্ত কৃষ্ণনগর রিলে সেন্টারের কোনও আজেবাজে আওয়াজবিহীন সুন্দর শ্রুতিমধুর রেডিয়ো অনায়াসে চলে আসে। তবে আরও সুখবর, দশ কিলোওয়াটের একটি নতুন ট্রান্সমিটার আগামী বছর বসবে। বসে গেলেই ভবিষ্যতে এই সম্প্রচার ১০ কিলোমিটার থেকে দশ গুণ অর্থাৎ ৮০-৯০ কিলোমিটার দূরত্ব সহজেই অতিক্রম করতে পারবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

এত দিন আমরা যেভাবে রেডিয়ো শুনে এসেছি এখন নতুন এফ এম রিলে সেন্টারের দৌলতে এই অপরূপ প্রচারতরঙ্গ সম্পূর্ণ আলাদা আস্বাদ নিয়ে কৃষ্ণনাগরিকদের সামনে হাজির। রেডিয়োর সেই সাবেক পুঁ-পাঁ, সোঁ-সাঁ আজেবাজে শব্দ উধাও। এমনকি ঝড়-বৃষ্টি-বজ্রপাতেও এই সম্প্রচার থাকে সুমধুর, কোনও রকম বিকৃতি ছাড়াই বেজে চলে সারাক্ষণ ডিজিটাল সাউন্ড। কৃষ্ণনগরে বাস করে আমরা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করি। তাই তো বলব, এফ এম রেডিয়োর মত বিশুদ্ধ বিনোদনধর্মী সম্প্রচার মাধ্যমের দৌলতে বহুসংখ্যক পত্রলেখক এখন আকাশবাণীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে চিঠি লিখছেন, বিশেষত প্রাত্যহিকী, ভোরাই, গানের ইন্দ্রধনু, সবিনয় নিবেদন বা মাননীয়েষু ইত্যাদি প্রভৃতি অনেকানেক অনুষ্ঠানে। আমরা চাই, সরকারি এফ এম-এর মত বেসরকারি এফ এম চ্যানেলগুলিও শহরতলি ছাড়িয়ে গ্রামেগঞ্জে তাদের সম্প্রচার চালু করুক, আর বোকাবাক্সর বদলি বিকল্প সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিয়ে আমাদের সমাজের গরল মুক্ত করুক।

চিত্র: গুগল
5 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
J.Ghosh
J.Ghosh
1 year ago

সঞ্জীববাবুর নিবন্ধটি পড়ে মনকেমন করছে। রেডিও আমাদের জীবনের অনেকখানি জুড়ে ছিল, আজ শুধু স্মৃতি।

সিদ্ধার্থ মজুমদার Siddhartha Majumdar
সিদ্ধার্থ মজুমদার Siddhartha Majumdar
1 year ago

অনেক অজানা তথ্য জানতে পারলাম। তাছাড়া রেডিও নিয়ে প্রত্যেকেরই মনে পড়ে যাবে নানান পুরোন কথা। খুব ভালো লাগল লেখাটি।

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »