Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ছোটগল্প: কল্পডোম

প্রথম বোধোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই বালসুলভ কৌতূহল জেগেছিল বেড়াবার, দেশ দেখার, বিরাট বিশ্বের প্রকৃতির রূপ দেখার আকাঙ্ক্ষা। যত বয়স বেড়েছে পড়াশুনোর সঙ্গে সঙ্গে অনেকখানি পাঠ্য হয়েছে ভ্রমণসাহিত্য— অরণ্য, পর্বত, সাগর। কিন্তু বাস্তব ভ্রমণ কিছুই প্রায় ঘটে ওঠেনি। শেষ বয়সে পৌঁছে মনে হলো, আর তো সময় হবে না, ক্ষমতাও থাকবে না হয়তো, এখনি বেরিয়ে পড়া দরকার। চলতে চলতে পথেই যদি বা ঘটে জীবনান্ত মায়ের বুকেই তো ঠাঁই মিলবে। আর দেরি করা নয়, নিশিভোরেই রওনা হতে হবে।

যা জিদ্দি তাই সিদ্ধি। ভোরেই বেরিয়ে পড়া গেল, কিন্তু কে বেরিয়ে পড়ল! আমাকে তো কোন চেষ্টাই করতে হচ্ছে না— আমি তো পথ চলছি না, পদক্ষেপ করছি না, যেন ভেসে যাচ্ছি পথের ওপর দিয়ে, সে পথ জঙ্গলের ওপর দিয়ে, জলের ওপর দিয়ে পাহাড়পর্বতের ওপর দিয়ে তরতর করে বয়ে চলেছে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে। বন আমাকে ডাকছে আয়, আয়। পর্বত আমাকে সাদর অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। আমাকে কোন আয়াস করতে হচ্ছে না, আপনা থেকেই এগিয়ে যাচ্ছি। যাচ্ছি, যাচ্ছি, কত কাল ধরে চলে চলে শেষ পর্যন্ত এক শহরে গিয়ে হাজির। মনে হলো অনেকক্ষণ চলেছি, এবার একটু বিশ্রাম নিলে মন্দ হতো না। হঠাৎ সামনে এল এক আয়না, তার মধ্যে ফুটে উঠল লেখা “যে কোন বাড়িতে ঢুকে পড়, খুশি মতো বিশ্রাম নাও।” আয়না মিলিয়ে গেল।

বাড়িগুলো সবই একরকম, সবগুলোই দোতলা, কোনটারই বিশেষ কোন প্রকট বৈশিষ্ট্য নেই। দেখতে দেখতে একটাতে ঢুকে পড়লাম। নীচে বসবার ঘর, স্নানঘর, পায়খানা, রান্নাঘর ও খাবার ঘর। লোকজন ঘুরে বেড়াচ্ছে, কাজকর্ম করছে, কিন্তু সবই যেন ছাঁচে ঢালা। মানুষগুলোর চেহারাতেও বিশেষ তফাৎ যেন মালুম পড়ে না।

যাই হোক, মন বিশ্রাম চেয়েছিল, একখানা আরামকেদারায় অঙ্গরক্ষা করলাম। আঃ সত্যিই আরামদায়ক। একজন এসে বলল, “বিশ্রাম করে কলঘর থেকে হাতমুখ ধুয়ে আসুন, প্রাতরাশের সময় হলো।”

যাচ্ছি যাব করছি, একটি মহিলা খাবার ভর্তি ট্রে হাতে করে খাবার টেবিলে রাখল; বলল, “এখনো হাতমুখ ধোননি, খাবার নষ্ট হয়ে যাবে না?”

ঝটিতি উঠে পড়লাম। শাওয়ারে কবোষ্ণ জলের ধারায় হাতমুখ মাথা ধুয়ে পাশের আলনায় রাখা তোয়ালেতে মুছে এলাম বাইরে। মহিলাটি আমি আসতেই খাবার সাজিয়ে দিয়ে বলে গেল, “খেয়ে নিয়ে কাজ না করার মানসিকতা তৈরির চেষ্টা করুন।”

কী ফ্যাসাদ রে বাবা, কাজ না করবার মানসিকতা তৈরি করতে হবে! সে আবার কী রকম? সবাইতো বলে কাজ করো। শ্রমের বিকল্প নেই। আলস্যে দেহ নষ্ট, মগজ নষ্ট— তাই কাজ অর্থাৎ শারীরিক বা মানসিক পরিশ্রম করাই চাই। শ্রমে ক্ষুধা হবে, আহার্য সুষ্ঠুভাবে জীর্ণ হবে, দেহের পুষ্টি ও লাবণ্য বৃদ্ধি পাবে। আর এখানে এরা বলছে কাজ না করবার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। কী অনাছিষ্টি!

একটি সুঠাম যুবক এসে উদয় হলেন। আমাকে ধমকে বললেন, “আপনার ও সব পুরাকালের ধ্যান ধারণা পাল্টে ফেলুন, এখানে খাবেন, পান করবেন, ঘুমোবেন, আনন্দ করবেন, ফুর্তি করবেন কিন্তু চেষ্টা করবেন যত কম সম্ভব অঙ্গ সঞ্চালন করতে। মলমূত্র ত্যাগের জন্যে উপস্থিত যতদিন বিকল্প ব্যবস্থা না হচ্ছে ততদিন শৌচাগারে যাতায়াত বহাল থাকবে বটে তবে সেও বেশিদিনের জন্য নয়। বিপুল উদ্যমে পুরীষ নিষ্কাশন ও পায়ু প্রক্ষালনের স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে শ্রম লাঘবের উদ্দেশ্যে।

আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমি তো কাউকে কিছু বলিনি। কিন্তু এরা দেখছি মনের ভাবনাচিন্তাও টের পায়, সেও তো বিপদের কথা। ব্যক্তিগত নিজস্ব কিছু থাকবে না, ভাবনাচিন্তাও হাটের বেসাতি হয়ে যাবে?

আমার চিন্তার খেই ধরেই লোকটি বলল, “তাতে ক্ষতি কী? এখানে তো প্রতিযোগিতা নেই, এগিয়ে যাওয়া পিছিয়ে পড়া নেই। একমাত্র নবিশিকালের তারতম্য হতে পারে। কৈবল্য লব্ধ না হলে তোমাকে দিয়ে আমাদের প্রয়োজন সিদ্ধ হবে না।”

আমি বলে ফেললাম, “কৈবল্য, সে আবার কী বস্তু?”

সামনে তাকিয়ে দেখি লোকটি নেই। একেবারেই হাওয়া হয়ে গেল কোন ফাঁকে? যেমনভাবে লোকটি আচমকা উবে গেল ঠিক তেমনিভাবেই আবার এক চমক, কী বলব উদয় না আবির্ভাব? দ্বিতীয় মূর্তি আমার চিন্তার খেই ধরেই বলল, “অবাক হবার কিছু নেই। আমাদের প্রযুক্তি মনোভাব ও মানসিক চিন্তার যথাযথ অনুধাবন করতে পারে। আমাদের কাজকর্ম সবকিছুই যারা নির্বাহ করে তারা সবাই যান্ত্রিক মনুষ্যানুকৃতি। অন্যরা কোষবিবৃদ্ধি প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত নরনারী। এরা মানবিক রিপুচয় বিবর্জিত; ক্ষোভ, বিক্ষোভ, সংক্ষোভ, আনন্দ, উল্লাস সমস্ত প্রবৃত্তিবেগ প্রশমিত শুধু নয় বিবর্জিত। স্থূলবস্তুকে আণবিকায়ন, আবার অণুসংযোজনে পুনরাবর্তন অভ্যাসসাপেক্ষে সকলেরই কমবেশি অধিগত। বিশেষ পারঙ্গম যারা তারা কখনো কখনো রূপ পরিবর্তনে, এমনকী যোনি পরিবর্তনে সমর্থ। যদিও তা পুরোপুরি নিষ্প্রয়োজন, কারণ প্রজননে প্রজাবৃদ্ধি এখানে অপ্রয়োজনীয় শুধু নয়, অবাঞ্ছিতও বটে। কারণ প্রবৃত্তি পরিচালনে জাত প্রজায় প্রবৃত্তির উত্তরাধিকার সংক্রমণ সম্ভাবনা সমূহ।”

বলতে বলতেই বক্তার অবলুপ্তি। যেন কর্পূরের মতো হাওয়া হয়ে যাওয়া। আমি চিন্তা করলাম, আমাকে তো কোন কাজ না করতে বলেছে, অঙ্গ সঞ্চালন যেন যথাসম্ভব কম হয়, কিন্তু সে কী সম্ভব?

প্রাতরাশ শেষ হয়েছে, সময় কোথা দিয়ে কেটে যাচ্ছে ধরা যাচ্ছে না। যাই হোক আমি উঠে পড়লাম। একটু ঘুরেফিরে দেখা যাক। আগেই বলেছি নীচের তলায় বৈঠকখানা, রান্নাঘর, খাবার ঘর, স্নানঘর ও পায়খানা। রান্নাঘরের একাংশেই ভাঁড়ার, সেখানে মজুদ খাদ্যসামগ্রী, সব্জী শাকপাতা, চাল ডাল, আটা ময়দা। দেখতে বেশি সময় লাগল না। উঠে গেলাম সিঁড়ি বেয়ে ওপরে।

গোটা দোতলা জোড়া একটাই ঘর। চারপাশের দেয়ালে আটকানো বাঙ্ক, এখন সবগুলোই ঝোলানো দেয়ালের গায়ে। এক দিকের দেয়াল থেকে খানিকটা দূরে বেশ বড় একটা টেবিল, বেশ উঁচুও। টেবিলের চারপাশেই সব তাক, কোনটায় যন্ত্রপাতি, কোনটায় বা বোতল ভর্তি নানারকম রাসায়নিক আরক।

দুটি যন্ত্রমানব নানারকম খুটখাট করছে। আমি প্রশ্ন করলাম, “আপনারা কী করছেন?” দুজনেই যুগপৎ আমার দিকে তাকাল, মুখে ফুটে উঠল বিরক্তিরেখা। কথা না বলে আঙুল দিয়ে ইশারা করল নেমে যেতে। আমি বিরক্ত হলাম, নীচে নামার বদলে ওপরে যাবার সিঁড়ি খুঁজতে লাগলাম, কিন্তু তার কোন ব্যবস্থাই নেই, ছাদে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। অগত্যা নেমে এলাম, বাড়ির সদর দরজা দিয়ে বাইরে যাব, সামনে হাজির এক আয়না, লেখা ফুটে উঠল “বাড়ির দরজায় নম্বর দেওয়া আছে। দেখে মনে রেখ, না হলে খুঁজে পাবে না।” আয়না মিলিয়ে গেল। বাইরে এসে দরজার গায়ে দেখি লেখা ‘স—সতেরো’।

‘স—সতেরো’ জপ করতে করতে পা চালালাম। দিক ঠিক নেই। পুব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ কিছুই হদিস করা যায় না। সূর্য বা চাঁদ কিছু একটা আছে বটে তবে কেমন যেন স্বাভাবিক নয়। পরিপার্শ্ব–আবহাওয়া বাড়ির ভেতরে এবং বাইরে একইরকম, ইতরবিশেষ কিছু বোঝা যায় না। আকাশে গোলকটি যদি সূর্য হয় তবে সে অত্যন্ত স্তিমিত— আর যদি চন্দ্র হয় তবে অধিক দীপ্তিমান। চিন্তা করে বুঝলাম এখন দিনই বটে, স্তিমিত গোলকটি সূর্যই, কারণ চন্দ্রগোলক সর্বদা সুগোল নয়, তার হ্রাসবৃদ্ধি আছে। মনের মধ্যে তোলপাড়, একী ভূতুড়ে ব্যাপার নাকি! সামনে ফুটে উঠল আয়না— তার বুকে লেখা— “ভুলে যেও না— তুমি এক নতুন জগতে এসে পড়েছ।” মিলিয়ে গেল আয়না তার লেখা নিয়ে। অবাক যতখানি তার সাথে পাল্লা দিয়ে চলেছে বিরক্তি। এ কীরে বাবা, কথা বলার একটা লোক পাওয়া যায় না! আবার আয়না— “এখানে নৈষ্কর্মের সাধনা— কৈবল্য আয়ত্ত করো।”

মহা বিরক্ত হয়ে সামনের বাড়িতে ঢুকে পড়বার ইচ্ছে হলো। দরজায় লেখা হ—বারো। দরজার সামনে যেতেই— দরজা আপনা থেকেই খুলে গেল— ভেতরে যেতেই আবার আপনা আপনিই বন্ধ হয়ে গেল। এগিয়ে গেলাম বসার ঘরে— সঙ্গে সঙ্গেই জলপাত্র ও পানপাত্র হাতে মহিলার প্রবেশ, প্রসারিত হাতে জলভরা গ্লাস। আমি নিশ্চেষ্ট। মৃদু হাসি মুখে জলের গ্লাস মুখের সামনে এগিয়ে এল, পিপাসা ছিল, চুমুক দিলাম, একপাত্র শেষ হলে আরো একপাত্র। দুটিই নিঃশেষ হলে মহিলা বললেন, “পিপাসার শান্তি হয়েছে। আর দরকার নেই।”

জিজ্ঞাসা করলাম, “কী করে বুঝতে পারলেন?”

—“এখানে থাকতে থাকতে অভ্যাস করলে আপনিও অপরের মানসিক বিবর্তনের হদিশ পাবেন, অপরের ইচ্ছা অনিচ্ছা বুঝতে পারবেন। এক মনে কৈবল্য সাধনা করুন।”

—“এখানে তো দেখছি কথাবার্তা একরকম নেই, এখানে মানুষ সময় কাটায় কেমন করে?”

—“এখানকার মানুষদের মধ্যে কর্মীদল মানুষের অনুকৃতি যন্ত্রমানব— এরা সীমিত বোধশক্তির অধিকারী শুধু পরাবর্তী প্রতিক্রিয়া প্রকাশে সক্ষম, তার ব্যতিরিক্ত কিছু নয়। কোষবিবর্ধনে যারা জাত তাদের মানসিকতা নিয়মিত অনুশীলনে সুনিয়ন্ত্রিত। নিরন্তর চলছে নৈষ্কর্মের সাধনা।”

—“কিন্তু আমার তো কৈবল্যলাভের বিন্দুমাত্র বাসনা নেই। আমার তো বাসনা সবার সঙ্গে মেলামেশা, আলাপ আলোচনা ঘনিষ্ঠতা স্থাপন করা। যেমন এখন ইচ্ছে করছে আপনাকে জড়িয়ে ধরে আদর করি।”

—“তাতে লাভ হবে না, শীতলতা ভিন্ন অন্য কিছুই পাবেন না— পরন্তু আপনার ভোগান্তি বৃদ্ধি পাবে— এখানে আপনার অবস্থানকাল অনর্থক বিলম্বিত হবে।”

মহিলাটি যাই বলুক না কেন আমার তেমন শ্রদ্ধা হলো না, আমি দুপা এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলাম। মুখ থেকে বেরিয়ে এল আহ্। একটা ধাক্কা দেওয়া তুহিন শীতল অসাড় করা— যেন বিদ্যুতের ছোবল! ছিটকে গেলাম। মহিলাটি হাসিমুখেই বললেন, “কথা মানলেন না, ফলে ভুগতে হলো। এমন আর করবেন না। ভোগান্তিই বাড়বে।”

আমার শরীরের মধ্যে তখনও ঝিনঝিন করছে। শ্লথপদে বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এলাম। কয়েক পা কষ্ট করে চলতে না চলতেই খানিকটা ধাতস্থ হলাম আর এতক্ষণে যেন মনে হলো কিছু খাওয়া দরকার।

কিছুদূর যেতেই আবার একসারি বাড়ি। দেখতে দেখতে চললাম। ইচ্ছে হলো ঢুকে পড়ি, দরজায় লেখা ন—সাত। সামনে যেতেই দরজা যথারীতি খুলে গেল। ঢুকে গেলাম ভেতরে। চেয়ারে বসতে না বসতেই খাবার টেবিলে নানারকম খাবার হাজির। সদ্য তৈরি। তখনো গরম বাষ্প উঠছে। বাহকটি বলল, “খেয়ে নিন চটপট, জুড়িয়ে গেলে খাদ্যগুণ কমে যাবে।” অবাক হয়ে বলে ফেললাম, “জুড়িয়ে গেলে খাদ্যগুণ কমে যায় নাকি, আবার গরম করলে বাড়ে?”

—“না, তৈরির সময়ে যে খাদ্যগুণ বরাদ্দ করা হয় জুড়িয়ে গেলে কমে যায়, আবার গরম করলে আরো কমে। সময়ের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত বস্তুতই অসার হয়ে যায়।”

—“আপনাদের ওপর তলায় যাওয়া যাবে না, একটু দেখবার ইচ্ছে হচ্ছে।”

—“এখনো আপনার ইচ্ছে হয়? কামনা বাসনা নিবৃত্ত করবার শম এখনও আপনার অধিগত হয়নি? ঠিক আছে, দেখবার ইচ্ছে যখন, চলুন দেখিয়ে দিচ্ছি।”

এখানেও ওপরে উঠে দেখলাম একটামাত্র বড় ঘর। একদিকের দেয়ালে অনেকগুলো কাচের জার সাজানো, ছোট থেকে ক্রমান্বয়ে বড়। সঙ্গীর দিকে তাকালাম, দৃষ্টি জিজ্ঞাসু। সঙ্গী বলল, “এখানে কোষবিবৃদ্ধি প্রক্রিয়ায় নতুন নরানুকৃতির প্রস্তুতি চলছে। দেখতে পাচ্ছেন, প্রথম জারটি এখন শূন্য— কিছু নেই। এখানে নতুন কোন কোষ স্থাপন করা হবে। সেই উদ্দেশ্যেই আপনাকে এখানে আনা হয়েছে। কিন্তু আপনি আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করছেন না। আপনি কৈবল্য অনুশীলন করছেন না, ফলে আমাদের কাজ বিলম্বিত হচ্ছে— আপনার প্রত্যাবর্তনও বিলম্বিত হচ্ছে।”

আমি অবাক হয়ে গেলাম, প্রশ্ন করলাম, “একটা কোষ আপনা থেকেই পরিণতি পাচ্ছে, পুষ্টি ও পোষণের জন্যে কোন প্রস্তুতি ব্যতিরেকেই?”

—“তাই হয় নাকি, প্রত্যেকটি পাত্রেই নিয়মিত পোষক ও বিবর্ধক খাদ্য নির্যাস নিষেক করা হয় যতদিন না তারা খাদ্য গ্রহণের উপযুক্ততা লাভ করে। সময় হলেই এদের পাত্রের বাইরে এনে এদের পরবর্তী উপযুক্ত বাড়িতে সরিয়ে দেওয়া হয় উপযুক্ত পোষণ এবং প্রশিক্ষণের জন্যে। বদলাতে বদলাতে এরা পনেরো নম্বর বাড়ি থেকে ফিরে আসে ছয় নম্বর বাড়িতে, সেখান থেকে পাঁচ, চার, তিন, দুই ও সবশেষে ন—এক নম্বরে তাদের পূর্ণতা প্রাপ্তি ঘটে এবং সেখান থেকে তারা কর্মী হিসাবে বেরিয়ে যায় অন্য অন্য ব্লকে যেখানে যেমন প্রয়োজন। এ পত্তনের নিয়মবিরুদ্ধ অনেক বকবকানি হয়ে গেছে, এবার তুমি এখান থেকে যেতে পারো।”

কী আশ্চর্য্য, আমাকে বেরিয়ে যেতে বলল। অতিথি বলেও পরোয়া নেই। সামনে আয়নায় লেখা ফুটে উঠল, “এখানে কেউ অতিথি নেই। আমাদের প্রয়োজনে তোমাকে আনা হয়েছে, প্রয়োজন শেষ হলেই তোমাদের অতিথি অভ্যাগত রাজ্যে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হবে।”

রাগে পিত্তি তেতে গেল; দুমদুম করে পা ফেলে বেরিয়ে এলাম ওখান থেকে। এদিকে খিদে পেয়ে গেছে। হাঁটতে হাঁটতে ফিরে গেলাম স—সতেরো নম্বর দরজায়। দরজা যথারীতি খুলে গেল, আবার ঢুকলে বন্ধও হয়ে গেল। ঘরে ঢুকে বসতে না বসতেই খাবার টেবিলে এক যন্ত্রমানব খাবার এনে রাখল। হাতে মুখে জল দিয়ে বিনা বাক্যে খাবারে মন দিলাম। খাওয়া শেষ হলে যন্ত্রমানব বাসনপত্র নিয়ে উধাও। চেয়ারে এলিয়ে বসে ভাবছি এবেলা যন্ত্রমানব খাবার আনল কেন? মহিলাটির কী হল?

হাজির আয়নার লেখা। “তুমি অসংযত তাই এখন থেকে যন্ত্রমানবই তোমার দেখাশোনা করবে যতদিন না তুমি সংযম পালন করতে পারো।” আমার ক্রোধ আরও চড়ে গেল। অপেক্ষা না করেই আবার বেরিয়ে পড়লাম। ঘুরতে। আগাপাছতলা ঘুরে বেড়ালাম। দেখলাম গোটা পত্তনটা সাতটা অংশে ভাগ করা। প্রথম অংশের বাড়িগুলো বেগুনী রঙের, বাড়িগুলির নম্বর ব—এক, ব—দুই করে। ভেতরে ঢুকলাম না। এগিয়ে গেলাম পরের ব্লকে। গাঢ় নীল রঙের বাড়িগুলো; নম্বর গ—এক, গ—দুই করে গোটা বারো বাড়ি। তার পরের পত্তনের বাড়িগুলোর নম্বর ন—এক, ন—দুই ইত্যাদি। পরের পত্তনে স—এক, স—দুই ইত্যাদি। এরই সতেরো নম্বর বাড়িতে এসে প্রথম ঢুকেছিলাম। তারপরের পত্তন আগেই দেখেছি, নম্বর হ—এক, হ—দুই ইত্যাদি। পরের পত্তনের বাড়িগুলো কমলা রঙের, নম্বর ক—এক, ক—দুই ইত্যাদি। তারও পরে অর্থাৎ শেষ পত্তন; রক্তবরণ বাড়িগুলির নম্বর ল—এক, ল—দুই ইত্যাদি করে ছয় নম্বর বাড়িতে পত্তন শেষ। আরো এগিয়ে গেলে ল, ক, হ করতে করতে ব পত্তনে শেষ যদিও উল্টো দিকে।

ঘুরতে ঘুরতে ক পত্তনের এক নম্বর বাড়ি ঢুকে পড়লাম। একতলায় সব বাড়িগুলোই একই ধাঁচের, সাজসজ্জা সবই একরকম। অভ্যর্থনার ভঙ্গিও অবিকল। সামনে এসে পড়লেই দরজা খুলে যাওয়া, ঢুকলে বন্ধ হওয়া, ভেতরে গেলেই আপ্যায়ন, জল কিংবা খাবার। মনের ইচ্ছামতোই সামনে হাজির যন্ত্রমানবের হাতে। ক—এক বাড়ি। প্রথমে এল জল, তার পেছনে দ্বিতীয় জনের হাতে খাবার।

জল খাবার শেষ করে উঠে পড়লাম। ওপরে যেতে হবে। সারি সারি কতকগুলো ছোট ছোট টেবিল। তার ওপরে তিন জন যন্ত্রমানব তিন টেবিলে কাজ করছে। কতকগুলো টুকরো লোহা নিয়ে টেবিলের ওপরের যন্ত্রে ফেলে ছোট ছোট যন্ত্রাংশ তৈরি করছে। এরা কী করছে? একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, “তোমরা কী করছ?” কেউ কর্ণপাত করল না। জোরে চেঁচিয়ে বললাম, “কী করছ তোমরা; কথা শুনতে পাও না?”

যুগপৎ তিন জনই মুখ ফিরিয়ে ভ্রূকুটি করে তাকাল। মুখে আঙুল চেপে চুপ করতে ইসারা করল। আমার সামনে আয়নায় লেখা ফুটে উঠল, “ব্যাঘাত সৃষ্টি করো না, ওদের কাজ করতে দাও।” নীচে নেমে বসার ঘরে চেয়ারে বসে পড়লাম, একটু বিশ্রাম নেওয়া যাক। মনে চিন্তা ওপরে ওরা কী করছে? আয়না জানাল, “ওরা বিকল যন্ত্রমানব মেরামত করছে। পুরানো ক্ষয়প্রাপ্ত দেহাংশ ঘষেমেজে নতুন করে তুলছে যাতে আর একজন যন্ত্রমানব তৈরি করা যায়।”

প্রশ্ন মনে এল— “এরাই কী সব করছে?” আয়না জবাব দিল, “এরা শুধু অংশ তৈরি করছে। তৈরি অংশগুলো পাশের বাড়িতে যাবে— সেখানে হবে সংযোজন— এটা হবে অঙ্গ সংস্থাপন। ওখান থেকে তিন নম্বর বাড়িতে হবে সংবেদনশীল অংশ যোজনা। চার নম্বর বাড়িতে হবে বহিরঙ্গ সজ্জা। পাঁচ নম্বরে মগজে শক্তি সঞ্চার। এতক্ষণে একটা যন্ত্রমানব সম্পূর্ণ হয়ে ছয় নম্বরে যাবে যেখানে হবে সর্বাঙ্গীণ পরীক্ষা, যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে অঙ্গসজ্জা পর্যন্ত সমস্ত কিছু খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেওয়া হবে ছাড়পত্র। তখন যাবে সপ্তম অর্থাৎ শেষ বাড়িতে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য। সেখান থেকে যে যে বাড়িতে প্রয়োজন সেখানে পাঠানো হবে কাজ করবার জন্য।”

বাপরে বাপ! জ্ঞান আর উপদেশের অঝোর ঝরণে নাজেহাল। অত্যন্ত ক্ষোভে আর বিরক্তিতে মন বিষিয়ে গেল। কোথায় দেশভ্রমণে আনন্দ আর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করব তার জায়গায় একী এক দুস্তর ঊষর অঞ্চল?

বিক্ষিপ্ত মানসিকতা নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে গেলাম ল—পত্তনে। তাইতো, এ পত্তনে তো কিছু দেখা হয়নি। কে যেন বলছে ঢুকে পড়, ঢুকে পড় এবং ঢুকে সত্যিই পড়লাম। পত্তনটিতে সবই লাল রঙের বাড়ি, কিন্তু গৃহসজ্জা একই রকম। বৈঠকখানায় আরামকেদারা। অঙ্গ না রাখতেই অঙ্গনা হস্তে পানীয়জল, একটু যেন অন্য স্বাদের, পান করে ভালই লাগল, দ্বিতীয় পাত্র শেষ করলাম। প্রশ্ন করলাম, “ওপরে যাওয়া যাবে?” সঙ্গে সঙ্গে পানদাত্রীর প্রগলভ জবাব, “নিশ্চয়, নিশ্চয় যাওয়া যাবে। আমিই সঙ্গে করে নিয়ে যাব।”

উঠে পড়লাম। রমণী এগিয়ে এসে হাত ধরলেন। চমকে উঠেছিলাম। কিন্তু কিমাশ্চর্যম রমণীর হস্তে জান্তব প্রাণদ উত্তাপ; অযান্ত্রিক প্রাণজ আবেগাধানী আমন্ত্রণ। এপর্যন্ত অপ্রাপ্ত সহজ প্রাণের এই সাদর আপ্যায়নে অপর্যাপ্ত উল্লাস জাগল মনে। সাগ্রহে তার হস্ত আকর্ষণে সাড়া দিলাম। অগ্ন্যাকর্ষিত পতঙ্গবৎ সোপানমালা অতিক্রম করে উপরিতলে পৌঁছে গেলাম।

চার দেয়ালে ভাঁজ করা বাঙ্কগুলি প্রলম্বিত। মধ্যস্থলে বিরাট এক পর্যঙ্কে সজ্জিত ফরাস আস্তৃত। প্রবেশ মাত্রই স্মিতাননা ললনাকুল পরিবেষ্টনে চমৎকৃত হলাম। কলস্বরে সকলেই হার্দিক সমাদর প্রকাশ করল। দুজনে আমার দুহাত ধরে নিয়ে গিয়ে ফরাসে বসিয়ে দিল। আরো কয়েকজন এসে ঘিরে বসল আমাকে। এদের শরীরে এক রকম মৃদু মিষ্ট সুবাস মনকে সতেজ স্নিগ্ধ করে তুলল। আমাকে যে ওপরে নিয়ে এসেছিল সে সাথিদের বলল, “তোমরা তো জানো এই আগন্তুক যান্ত্রিকতা পছন্দ করে না, পচা পুরোনো মানবিকতাই তার পছন্দ। আমাদের আদরের অতিথিকে খুশি করাই আমাদের উচিত। এসো যথোচিত আপ্যায়ন করি।”

বলতে বলতে তারা চারপাশ থেকে আমাকে ঘিরে ফেলে ফরাসের ওপর চেপে শুইয়ে দিল। আমার পোশাক আসাক সমস্ত টেনেটুনে ছিঁড়ে খুঁড়ে ছুড়ে ফেলে দিল। প্রতিটি প্রত্যঙ্গে তাদের হস্তার্পণ হস্তাবলেপ হয়ে উঠল। আমার কান নাক মুখে অধরোষ্ঠ সমস্ত পিষ্ট হতে লাগল, তারপর তিনজন মিলে আমাকে দুর্দান্ত আশ্লেষে মথিত করে চলল— কতক্ষণ আমি জানি না, ক্রমে আমি বোধশক্তি হারালাম।

আবছা আবছা মনে হলো যেন আমার শরীরে সূঁচ ফোটানো হল, একটা নয়, একাধিক এবং অনেকবার। শেষ পর্যন্ত আমি হতজ্ঞান হয়ে গেলাম।

চেতনাহীন হয়ে কতক্ষণ বা কতদিন ছিলাম জানি না। মনে হলো যেন আমাকে স্থানান্তরিত করা হলো, তারপর যেন আমার শুশ্রূষা করা হলো, ওষুধ প্রয়োগ করা হলো। একটু একটু করে চেতনার জগতে প্রবেশ করতে লাগলাম, প্রচণ্ড দুর্বলতা, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নাড়ানো যায় না, ইন্দ্রিয়সমূহও বড় শ্লথ। কয়েকবার সামনে মনে হলো আয়না ভেসে উঠল, বুকে লেখা ভরা, চোখে ছায়া এলেও মন তাকে গ্রহণ করতে পারল না।

মনে পড়ছে শেষ পর্যন্ত মহিলাকুল আমাকে বহন করে কয়েকটি বাড়িতে ঢুকল এবং আবার বেরিয়ে গেল। মগ্ন চৈতন্য ক্রমে ফিরতে লাগল। শেষ পর্যন্ত ল—পত্তনের শেষ বাড়িতে আমাকে নিয়ে গেল। মনে হলো শেষ বাড়ির ছাতে একটি চেতালো মুখ সুড়ঙ্গে আমি প্রবেশ করলাম আর বিপুল বেগে নিক্ষিপ্ত হলাম। চলেছি আর চলেছি, ভাসতে ভাসতেই চেতনা জাগরিত হতে লাগল। মনে হলো যে স্রোতে ভাসতে ভাসতে ভ্রমণে বেরিয়েছিলাম তারই উল্টো প্রবাহে নদী বন গিরিদরী ডিঙিয়ে ডোঙ্গা ভাসিয়ে আবার চলেছি— কোথায় তা জানি না। চলতে চলতেই যখনই জানবার বাসনা গন্তব্য সম্পর্কে সামনে বুকে লেখা নিয়ে আয়না, “তোমাকে আমরা যেখান থেকে সংগ্রহ করেছিলাম সেইখানেই আবার ফেরৎ পাঠালাম। জেনে রাখো তোমার কোষ সংগ্রহকালে তোমার মগজে আমরা কিছু কারিগরী করে দিয়েছি। পূর্ব জীবনে ফিরে গিয়ে যদি ভাল না লাগে, যদি এই কল্পডোমে ফেরবার বাসনা জাগে, একমনে নিষ্ঠা নিয়ে স্মরণ করো, জপ করো ‘কল্পডোমে যাব’; সংকল্প ও নিষ্ঠার জোর থাকলে আমাদের গোচরে আসবে, আমরা আরো একবার শোষকযান পাঠাব, প্রস্তুত থাকব তোমাকে স্বাগত জানাতে।”

বার্তা পুরোপুরি অধিগম্য হলো, বুঝলাম পূর্ণজ্ঞান ফিরে পেয়েছি। আমি দাঁড়িয়ে আছি আমাদের বাড়ির ছাদে।

শরীরের হাল বুঝবার জন্য একটু পায়চারি করছি এমন সময় পাশের বাড়ির ছাদ থেকে কেউ যেন চেঁচিয়ে আমার ছেলেকে ডেকে বলল, তোমার বাবা ছাদে পায়চারি করছেন। ছেলে ছুটে এসে ছাদে হাজির। আমার চেতনা দুরস্ত হলেও শরীরের স্বাভাবিকতা পুরো ফিরে আসেনি— একটা আচ্ছন্নভাব যেন ঘিরে আছে। ছেলের ডাকে ছাদ থেকে নামতে গেলাম, কেমন যেন টলোমলো, ছেলে হাত ধরে নামিয়ে আনল। চেতনা পুরো ফিরলেও মানসিকতা আগের মতো সাবলীল হলো না, আচ্ছন্ন হয়ে রইল কল্পডোমের স্মৃতিভারে। আচরণ, কথাবার্তায় একটু তফাৎ হতে লাগল— মগজে করা কারিকুরির জন্যে কী? আমার কথাবার্তায় সবাই চমকে যায়, হয়তো গ্রহণ করতেও পারে না।

তবে কি নিষ্ঠাভরে উদগ্র ইচ্ছায় আবার কল্পডোমেই ফিরে যাব?

[(১৮/০৭/১৯৯৯) বানান অপরিবর্তিত]

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়
5 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
6 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
স্বপ্না অধিকাবরী
স্বপ্না অধিকাবরী
1 year ago

বেশ লাগলো, নুতুনত্ব আছে

Ruoanjan Goswami
1 year ago

স্মৃতির অতল থেকে হারিয়ে যাওয়া হিরে খুঁজে আনার জন্য ভালভাষাকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা। সত্যিই এ এক অসাধ্য সাধন। এভাবেই স্মৃতির ধুলো সরিয়ে চলুক ভালভাষা। ফিরিয়ে দিক হারিয়ে যাওয়া সেই মুখগুলোকে, যে মুখগুলোর হারিয়ে যাওয়ার কথা ছিল না।

সুতপন চট্টোপাধ্যায়।
সুতপন চট্টোপাধ্যায়।
1 year ago

অসাধারন গল্প

Anindita Mandal
Anindita Mandal
1 year ago

কতদিন আগে গল্পটি লেখা হয়েছে জানি না কিন্তু কি আধুনিক মনন! গল্পে এক গভীর দর্শন নিহিত। বড় দুঃখের যে এতকাল লেখক বিস্মৃতির অন্ধকারে ছিলেন। ভালোভাষাকে ধন্যবাদ। কাজটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার্হ।

Satyaban Roy
Satyaban Roy
1 year ago

AI / ML, ChatGPT -র সমূহ প্রতর্ক্যের আবর্তে এই শতবর্ষ পার করা বিস্মৃত লেখকের গল্পখানির প্রাসঙ্গিকতা বিস্ময়কর। ভাষা ও ভাষ্যের আধুনিকতাও লক্ষ্যণীয়। ভালভাষা-কে ধন্যবাদ এই উজ্বল উদ্ধারের জন্য।

স্বপন নাগ
স্বপন নাগ
1 year ago

যে লেখা পড়িয়ে নেয় শেষ অবধি, তার গুণ নিশ্চিত ভাবেই ব্যতিক্রমী। ‘কল্পডোম’ এমনই একটি লেখা শেষ অবধি পড়ে যেতেই হয়। ভালো লেখা, সন্দেহ নেই।

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »