Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রলেখা’ হাসিরাশি দেবী

রবীন্দ্রনাথ তখন ষাটোর্ধ্ব তরুণ। আর এই মেয়েটির বয়স মেরেকেটে চোদ্দো কী পনেরো। সেই কিশোরীর আঁকা একটা ছবি পট্ করে ছিঁড়ে ফেললেন রবি ঠাকুর। তা দেখে ঝোলাব্যাগ কাঁধে পাশে দাঁড়ানো কিশোরী-শিল্পী থতমত। পরক্ষণেই স্মিত হেসে কিশোরীর মাথায় হাত বুলিয়ে বিশ্বকবি বোঝালেন— ‘এটা ঠিক হয়নি, এই ভাবে আঁকো।’ দেখিয়ে দিলেন হাতে ধরে। ক্রমে সেই মেয়ে রবীন্দ্রনাথের স্নেহ ও প্রশ্রয়ে বেড়ে উঠলেন, হয়ে উঠলেন অসামান্য চিত্রশিল্পী। গুরুদেব তাঁকে একটা নতুন নামও দিলেন— ‘চিত্রলেখা’। আরও পরে কবিগুরুর ভাইপো দিকপাল চিত্রকর অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরও প্রতিভাময়ী শিল্পী সম্পর্কে ঘোষণা করেন— ‘এঁর আঁকা ইলাস্ট্রেশন দিয়ে আমার গল্প যেন ছাপা হয়।’ এই কন্যাই ক্রমে ‘বেঙ্গল স্কুল’ ধারার অন্যতম শিল্পী হয়ে ওঠেন। অধুনা বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া এই শিল্পীর নাম— হাসিরাশি দেবী।

শকুন্তলা। ফ্রান্সের debaecque.fr ছবিটিকে নিলামে তুলেছে।

১৯১১ সালে হাসিরাশির জন্ম, বাবার কর্মস্থল তৎকালীন পশ্চিম দিনাজপুরে। বাবা আইনজীবী গোপালচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও মা সুশীলাবালা দেবীর পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে তিনিই সর্বকনিষ্ঠ। বাবার মৃত্যুর পর মা-দিদির হাত ধরে গোবরডাঙ্গার খাঁটুরায় মামাবাড়িতে চলে আসেন হাসিরাশি। মামাবাড়ির সবাই স্বনামধন্য। হাসিরাশির দাদু ছিলেন সেকালের শ্রেষ্ঠ কথক ধরণীধর শিরোমণি, দাদুর খুড়তুতো ভাই প্রথম বিধবা-বিবাহকারী শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন। শ্রীশচন্দ্রের পিতা আবার সুবিখ্যাত কথক রামধন তর্কবাগীশ। শ্রীশচন্দ্রের দাদু পণ্ডিত রামপ্রাণ বিদ্যাবাচস্পতি। হাসিরাশির মামা বিখ্যাত অধ্যাপক মুরলীধর বন্দ্যোপাধ্যায়। মামাতো ভাই রবীন্দ্র-সাহিত্যের সুপণ্ডিত হিরন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্যদিকে, হাসিরাশির ভাইবোনেদের মধ্যে কেউ সাহিত্যিক, কেউ বা চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার। প্রথিতযশা মহিলা ঔপন্যাসিক প্রভাবতী দেবী সরস্বতী তাঁর দিদি। হাসিরাশি সবচেয়ে বেশি সাহায্য ও সুপরামর্শ পেয়েছেন তাঁর চেয়ে ছ’বছরের বড় দিদি প্রভাবতী দেবী ও দাদা সাধনচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। আর মাথার ওপর গুরু হিসেবে পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথের মতো বরেণ্য মানুষকে। চিত্রাঙ্কনের সহজপাঠ দিয়েছেন তাঁরাই। তাঁদের নির্দেশ ছিল, ‘যত পারো ছবি এঁকে যাও, প্রয়োজনমতো দেখিয়ে নিয়ে যেয়ো।’

‘স্মৃতি’।

তেরো বছর বয়সে হাসিরাশির বিয়ে হয় সুশীলকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। ততদিনে, দিদি প্রভাবতী দেবী সাহিত্যিক হিসেবে নাম করেছেন। প্রভাবতী একলা থাকেন, তিনি অনিবার্য কারণে বাল্যবিবাহিত এবং পরবর্তীতে স্বামী গৈপুরের বিভূতিভূষণ চৌধুরির পরিবারের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে বেরিয়ে এসেছেন। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে তাঁর অবারিত দ্বার। হাসিরাশিকে বরাবর আঁকতে উৎসাহ দিয়ে গিয়েছেন স্বামী সুশীলকৃষ্ণ। হাসিরাশি একদিকে যেমন ছবির উপকরণ সংগ্রহ করেছেন আর-এক ভগ্নীপতি প্রশান্তকুমার চক্রবর্তীর কাছ থেকে, অন্যদিকে মিতালি পাতাতে কখনও স্বামীর সঙ্গে, আবার কখনও বা দিদির সঙ্গে ছুটেছেন ঠাকুরবাড়িতে। ক্রমে যৌবনে পা রাখলেন হাসিরাশি। সেইসঙ্গে তাঁর ছবিতেও তারুণ্যের জোয়ার এল যেন। ছবির নেশায় মেতে উঠলেন তিনি। কলকাতা, দিল্লি, বোম্বাই সর্বত্র প্রদর্শনীর পর প্রদর্শনী, প্রশংসার পর প্রশংসা। স্নেহের হাসিরাশি সম্পর্কে শ্রদ্ধা ঝরে পড়ল কবি কাজী নজরুল ইসলামের কলমেও—
‘লেখার রেখার পিঞ্জর খুলে যে কথা উড়িয়া যায়—
শিল্পীর তুলি, সেই লেখাগুলি ধরিয়া রাখিতে চায়।
তুলির তিলক কালে মুছে যায়, লেখা হয়ে যায় বাসি
কালের কপোলে টোল্ খেয়ে ওঠে তাহাদেরই হাসিরাশি।’

‘গোরাহারা গৃহ’।

কিন্তু রইল না সেই নানা রঙের দিনগুলি। জীবনে নেমে এল বিপর্যয়। একমাত্র কন্যা মারা গেল ৭ বছর বয়সে। আর সে শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই হারালেন স্বামীকে। মনও চলে না, হাতও চলে না। এইভাবে চলল কিছুকাল, তারপর একলা মানুষ ঘুরলেন ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে। দু’চোখ ভরে দেখতে থাকলেন দেশের অতুলনীয় শিল্পসম্ভার। নয়ন তৃপ্ত হল, তবু ভরিল না চিত্ত। আবার তুলি চলল, আঁকার নেশা ফিরে এল। রঙের ওপর রং বুলিয়ে কুড়িয়ে আনা সৌন্দর্যকে ধরে রাখতে শুরু করলেন জাপানি ওয়াশ পদ্ধতিতে। হাসিরাশি জলরঙেই ছবি করতে ভালবাসতেন, এবং ছবির মধ্যে জমজমাট রং তিনি আদৌ পছন্দ করতেন না। ভালবাসতেন পৌরাণিক কাহিনিসমৃদ্ধ ছবি আঁকতে, তার সঙ্গে আধুনিকতার সংমিশ্রণ ঘটাতেও পছন্দ করতেন। কারণ, তাঁর বিশ্বাস ছিল, এতে ছবিটি যেমন যুগোপযোগী হবে, তেমনই পৌরাণিকের প্রতি বর্তমানের বিশ্বাসও নষ্ট হবে না। তাঁর ছবির মধ্যে কোথাও ফুটে উঠেছে প্রকৃতির আদি-অকৃত্রিম রূপ আপন সুষমামণ্ডিত হয়ে, কোথাও বা বুদ্ধের ধ্যানগম্ভীর মূর্তি, আবার কোথাও বা সই-পরিবৃতা রাধিকা। এইধরনের ছবিগুলির জন্যে পুরস্কৃতও হয়েছেন। মিলেছে স্বর্ণপদক, রৌপ্যপদক, স্তুতি এবং প্রশংসা। অবশ্য শিল্পীমন তাতেও তৃপ্ত হয়নি।

শিরোনাম অস্পষ্ট।

কেবল চিত্রশিল্পী হিসেবেই যে হাসিরাশি দেবীর হাতযশ, তা কিন্তু নয়। সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা অঙ্গনে বিচরণ করেছেন। অগুনতি বই ও পত্রপত্রিকায় প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ করেছেন। ভাস্কর্য গড়েছেন। লিখেছেন গান। এইচএমভি থেকে তাঁর গানের রেকর্ডও বেরিয়েছে। পাশাপাশি, ভাবতেন নারীচেতনা ও প্রগতির কথাও। আকাশবাণীতে ‘মহিলামহল’ অনুষ্ঠানে তাঁর আলোচনা শুনতে অপেক্ষা করতেন তৎকালীন মেয়েরা। তাঁর পদ্য ও কবিতার সঙ্গে পরিচয় ছিল প্রায় সকলেরই। শিল্পী হিসেবে হাসিরাশি নিজে যেমন অনেক ব্যক্তির কাছে ঋণী, তেমনই ‘ভারতবর্ষ’, ‘জয়শ্রী’, ‘মোহম্মদী’, ‘বিচিত্রা’, ‘মাসিক বসুমতী’ প্রভৃতি পত্রপত্রিকাও তাঁর কাছেও কৃতজ্ঞ। তৎকালীন ওইসব প্রথমসারির কাগজে নিয়মিত ভাবে তাঁর ছবি ছাপা হত। হাসিরাশি সম্বন্ধে অবনীন্দ্রনাথের উক্তিটি এই অবসরে দেখে নেওয়া দরকার। সেই মন্তব্য শিল্পগুরুর অত্যন্ত উঁচু মনের পরিচয় বহন করে—
‘শ্রীমতী হাসিরাশি দেবীর লেখা ছবি গল্প ইত্যাদি আমি বেশ মনোযোগের সঙ্গে দেখি ও পড়ি। ছবি আঁকা ও গল্প লিখতে এঁর বেশ একটু দক্ষতা আছে। এঁর ছবি আমি আমার দু-একটা লেখার মধ্যে দেখে প্রথম থেকেই আমি এঁর ছবি আঁকা Book illustration drawing-এর নিপুণতা ধরতে পেরে সব মাসিকপত্রের মালিকদের জানাই যে এঁর আঁকা illustration দিয়ে আমার গল্প যেন ছাপা হয়। উপযুক্ত শিক্ষার অভাবে ও সহানুভূতির অভাবে এঁর যদি নৈপুণ্য ভাল করে না প্রকাশ হতে পারে তবে সেটা আমাদের দেশের আর্ট স্কুলগুলির পক্ষে বিশেষ অগৌরবের বিষয় হবে। আমি একান্তভাবে শ্রীমতি হাসিরাশি দেবীর লেখা ও ছবির দিক দিয়ে উৎকর্য কামনা করি। কিমতি মতি শুভমন্তু।’

শিরোনামহীন।

রংতুলির সঙ্গে হাসিরাশির অসামান্য কলমের জোরও ছিল। ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, আত্মজীবনী, আঞ্চলিক ইতিহাস— সর্বত্র বিচরণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ছাড়াও জলধর সেন, সজনীকান্ত দাস, জসীমউদ্দিন, রাজশেখর বসু, তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়, মুকুল দে, অশোকনাথ শাস্ত্রী, নরেন্দ্র দেব, প্যারীমোহন সেনগুপ্ত প্রমুখ বরেণ্য শিল্পী-সাহিত্যিক হাসিরাশির ছবি ও লেখায় মুগ্ধ দর্শক ও পাঠক ছিলেন। হাসিরাশির কিছু উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে: ‘বকবাবাজি ও কাঁকড়ামাসি’, ‘নিষ্প্রদীপ’, ‘বন্দীবিধাতা’, ‘ভোরের ভৈরবী’, ‘দ্বারী’, ‘লাগ ভেলকি লাগ’, ‘রাজকুমার জাগো’, ‘রক্তনীলার রক্তরাজি’, ‘মানুষের ঘর’, ‘দাই’, ‘কুশদহের ইতিহাস’, জীবনী গ্রন্থ ‘স্বামী অভেদানন্দ’ ইত্যাদি। প্রভাবতী দেবীর সঙ্গে একত্রে লিখেছেন ‘দায়ী’। হাসিরাশির কবিতার বই ‘বর্ণালী’র জন্য আশীর্বাণী লিখে দিয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ—
‘লেখা আর আঁকা
তব মন বিহঙ্গের
এই দুটি পাখা
ধরণীর ধূলিপথ তপ্ত হয় হোক
আকাশে রহিল মু্ক্ত তব মুক্তিলোক।’

পত্রিকার প্রচ্ছদে হাসিরাশির অঙ্কিত ছবি।

রায় বাহাদুর জলধর সেন সম্পাদিত ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার ফাল্গুন ১৩৫২ (ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬) সংখ্যায় প্রকাশিত হয় হাসিরাশি দেবীর কবিতা, ‘যে গেছে সে চলে যাক্’। সে-কবিতায় গভীর বিষণ্ণতা, স্মৃতি, অস্তিত্বচেতনা এবং জীবনের অনিত্যতার এক অন্তর্মুখী দর্শন প্রকাশ পেয়েছে। কবির জীবনবীক্ষা মূলত নিঃসঙ্গ মানবমনের আত্মসমীক্ষা, বিচ্ছেদবোধ, এবং মায়াময় আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্তির আকুতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এই জীবনবীক্ষা রবীন্দ্র-পরবর্তী আধুনিক বাংলা কাব্যের অস্তিত্ববাদী ও বিষণ্ণ সুরের সঙ্গে গভীর ভাবে সম্পর্কিত। কবিতাটি পড়ে নেওয়া যাক—
অস্ফুট নক্ষত্রালোকে তোমার লিখিয়া যাওয়া নাম,—
আজিকে প্রথম হেরিলাম।

ফাল্গুনের ফুলবনে বসন্তের শেষ বেলা মোর,—
পাণ্ডুর চাঁদেরে চাহি নিঃশব্দে ফেলিছে আঁখি লোর
আলো ও আঁধারে ঢাকা নিঃসঙ্গ স্বপন বুকে রাখি,—
তন্দ্রাহীন দীর্ঘ রাতি জাগি
বিগত বন্ধুরে স্মরি,
শুষ্ক শীর্ণ পল্লবে মর্ম্মরি;
সহসা শিহরি উঠা আমার আকাশ,
ফেলে দীর্ঘশ্বাস।

Advertisement

খণ্ডহীন মোর অবসর।
আমার মুহূর্ত্তগুলি অলস মন্থর
পদে একে একে চলে ধীরে ধীরে—
অন্তহীন তমসার তীরে

চির বিস্মৃতির দূর দেশে,
আপনারে ডুবাতে নিঃশেষে।
নবাগত বন্ধু মোর! তবু আজ তোমারে জানাই,
যদি তুমি এসে দেখো, আমার দুয়ার খোলা, শুধু আমি নাই,
নিভে গেছে আমার দীপালী,
বুকের সৌরভ ঢালি
হেমন্ত-রাত্রির শেষে প্রভাতের নভ-নীলিমায়,
যদি শোনো তোমার বীণায়
বাজিছে আমারই নাম নয়নের জলে,
তারে মোর শূন্য গৃহতলে
হে বন্ধু, ফেলিয়া যেও। ব’লে যেও, আর যারা সব
এপথে আসিছে ঐ আশা করি— আনন্দ উৎসব;
বলিও তাদের ডাকি,— ক’রোনাক’ ভুল,—
যেথা শুধু মরীচিকা বরষায় ফোটে না বকুল,
সেখা হ’তে ফিরে যাও;— আর আসিও না,
যে গেছে সে চ’লে যাক;— ক’রো তারে নীরবে মার্জ্জনা।

শেখার শেষ নেই। একথা হাসিরাশি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। ১৯৬০ সালে শিল্পীর বয়স যখন প্রায় পঞ্চাশ, মাথার চুলে যখন পাক ধরেছে, এমন সময় তিনি ভর্তি হন সরকারি চারু ও কলা শিল্পালয়ে ছাত্রী হিসেবে। শেখেন ক্র্যাফট, বাটিক ও মডেল— প্রায় দেড় বছর ধরে। হিন্দিও শিখতে শুরু করেন এরই মধ্যে। শোনা যায়, তখনকার দিনে প্যারিসে তাঁর আঁকা ছবি বিক্রি হয়েছে বিস্তর, যা সেযুগে কেউ ভাবতেও পারতেন না। একবার রুমানিয়ার রাষ্ট্রদূত শিল্পীর একটি ছবি দেখে এতই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন যে, লোক মারফত শিল্পীর কাছে শুভেচ্ছা ও উপহার পাঠান। অথচ প্রবল ব্যক্তিত্বময়ী ও আত্মনির্ভরশীল এই মানুষটির শেষজীবন কেটেছে পরানুগ্রহে। থাকতেন খাঁটুরা হাইস্কুল কোয়ার্টারের একটি অপরিসর কক্ষে। স্থানীয় ঘোষ পরিবারের বদান্যতায় হাসিরাশি দেবীর জীবননির্বাহ হত।

শিরোনামহীন।

১৯৯৩-এর ৬ জুন এই অসামান্যা নারীর জীবনাবসান হয়। মৃত্যুর অল্পকাল আগে ১৯৯১-এ লেখা তাঁর সম্ভবত শেষ ছড়াটিতে ধরা পড়েছে শিল্পীর নিঃসঙ্গতা ও অসহায়তার করুণ ছবি—
‘চাঁদের ভেতর চরকা কাটা বুড়ি
আজো হাঁটে দিয়েই হামাগুড়ি
সেও কি, আমার মতো থরথুরিয়ে হাঁটে
আর, বসে বসে কেবল চরকা কাটে?’

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

দেখুন, হাসিরাশি দেবীকে নিয়ে প্রথম ও একমাত্র তথ্যচিত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × three =

Recent Posts

গৌতম চক্রবর্তী

ব্রিটিশ ছোটগল্প

আমি আগে থেকেই আমেরিকার পাখি বইটি সম্পর্কে জানতাম, কিন্তু কখনও বইটির সঙ্গে তেমনভাবে সময় কাটাইনি। ঠিক যেভাবে কেউ নদীর ধারে বসে সময় কাটায়। বাবার হাসপাতালের শয্যার পাশে বসে থাকতে থাকতে আমি যেন ধৈর্যের অর্থ শিখে নিয়েছিলাম। অপেক্ষা করতে শিখেছিলাম। এডি ঠিকই বলেছিল— আমিও মাছ ধরতে যেতে চাইছিলাম। জলের ধারে বসে থাকতে চাইছিলাম। কিন্তু বাবাকে দেখতে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও কাজে বাড়ি থেকে বেরোনো সম্ভব হয়নি। তাই আমি অডুবন-এর সরোবরসম বইয়ে আমার জাল ফেললাম।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের বিস্ফোরণ: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক নীরব পূর্বাভাস

পণ্যের এই ভয়াবহ সঞ্চালন সংকটে পড়ে পুঁজিপতিরা এখন আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তাই অবিক্রীত পণ্য গছিয়ে দেওয়ার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞাপনের প্রচার চালানো হচ্ছে। এই সুযোগেই বিশ্বজুড়ে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েশন’ বা আধেয় নির্মাণের এক নজিরবিহীন বিস্ফোরণ ঘটেছে। যখন বিশ্বের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ দু’বেলা অন্নসংস্থানে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ইন্টারনেটে ছোটখাটো ভিডিও প্রচার করে ক্রিয়েটররা বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন। এটি আসলে জমে যাওয়া শ্রম ও পণ্যের এক অস্বাভাবিক বণ্টন প্রক্রিয়া। যে পণ্যের রিভিউ করে একজন ক্রিয়েটর লাখ লাখ টাকা আয় করছেন, সেই পণ্যের প্রকৃত উৎপাদনকারী শ্রমিক হয়তো আজ কর্মহীন কিংবা নিম্নতম মজুরিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চন্দ্রাবতী: বঙ্গের প্রথম পদকর্ত্রী

চন্দ্রাবতীর জীবনের যেটি শ্রদ্ধেয় দিক, তা হল গরলকে অমৃতে পরিণত করা। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোককে কাটিয়ে উঠে একাগ্রতা নিয়ে পঠনপাঠন‌ ও সৃষ্টিকর্মে মন দেন। পিতাকে সহায়তা করেন কাব্যরচনায়। ১৫৭৫ নাগাদ, যখন চন্দ্রাবতীর বয়স মাত্র পঁচিশ, সেসময় তিনি পিতার লেখা মনসার ভাসান-এ সহযোগিতা করেছিলেন। তারপর একের পর এক নিজস্ব রচনায় ভাস্বর হয়ে থাকে তাঁর কারুবাসনা।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইসলাম

হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি ‌বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের‌ সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়‌ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।

Read More »
তপোমন ঘোষ

কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে…

হঠাৎ চোখ পড়ে বুথের এক্সিট দরজাটার দিকে… একটা ছোট্ট ছায়া ঘোরাফেরা করছে! চমকে উঠে সে দেখে, সেই বাচ্চাটা না! মায়ের কোলে চড়ে এসেছিল… মজা করে পোলিং অফিসার তার ছোট্ট আঙুলে লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভোটের কালি। হুড়োহুড়িতে মা ছিটকে গেছে কোথাও— নাকি আরও খারাপ কিছু! বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে তার। শুনশান বুথে পোলিং আর সেক্টর অফিসার গলা যথাসম্ভব নিচুতে রেখে ডাকতে থাকেন বাচ্চাটাকে। একটা মৃদু ফোঁপানি… একটা হালকা ‘মা মা’ ডাক— বাচ্চাটা এইসব অচেনা ডাকে ভ্রূক্ষেপও করে না, এলোমেলো পায়ে ঘুরতে থাকে।

Read More »