Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

তন্ময় চট্টোপাধ্যায়ের বিশেষ নিবন্ধ

ম্যাজিক রিয়ালিজম: বাস্তবতার ভেতরে জাদুর নিঃশব্দ আনাগোনা

ত ন্ম য়  চ ট্টো পা ধ্যা য়

বাস্তবতা কখনও কখনও বড্ড ক্লান্তিকর আর যুক্তিনির্ভর হয়ে পড়ে। মানুষ তখন সেখান থেকে মুক্তি পেতে একটা ফাঁকফোকর খোঁজে বইকি। সে চায় একটু আলো, একটু অলৌকিক ঢুকে পড়ুক সেই ফাঁক দিয়ে। এই ফাঁকটাই হল ম্যাজিক রিয়ালিজম। এটা কোনও রূপকথা নয়, কোনও ফ্যান্টাসি নয়। এটা এমন একটি সাহিত্যরীতি, যেখানে জাদু আর বাস্তব পাশাপাশি হাঁটে, কেউ কাউকে অস্বীকার করে না, কেউ কাউকে ব্যাখ্যাও করে না।

মনে করুন, একটি গ্রামের মেয়ে প্রতিদিন সকালে উঠোন ঝাঁট দেয়, ভাত রাঁধে, হাটে যায়। ভীষণ আটপৌরে তার জীবন। একদিন সকালে উঠে সে দেখল, তার উঠোনের আমগাছটি কাঁদছে, টপটপ করে তার পাতা থেকে জল পড়ছে। মেয়েটি অবাক হল না। সে গাছের গায়ে হাত বুলিয়ে বলল, আজ তোমার মনখারাপ? এই যে অবাক না হওয়া, এই যে জাদুকে দৈনন্দিনতার মতো মেনে নেওয়া, এটাই ম্যাজিক রিয়ালিজমের প্রাণ।

‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন জার্মান শিল্পসমালোচক ফ্রানৎস রোহ, ১৯২৫ সালে। তিনি চিত্রকলায় এক নতুন ধারাকে বোঝাতে Magischer Realismus শব্দটি ব্যবহার করেন, যেখানে অতিপ্রাকৃত নয়, বরং অতি-স্পষ্ট বাস্তবতাই এক ধরনের রহস্য তৈরি করে। কিন্তু সাহিত্যে এর সত্যিকারের বিস্ফোরণ ঘটে লাতিন আমেরিকায়।

কেন লাতিন আমেরিকা? কারণ সেখানকার ইতিহাসটাই ম্যাজিক রিয়াল। ঔপনিবেশিক শোষণ, স্বৈরশাসন, গৃহযুদ্ধ, আদিবাসী মিথ আর ক্যাথলিক বিশ্বাস— সব মিলিয়ে সেখানে এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল, যা যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বাস্তবতাই যখন অবিশ্বাস্য, তখন অবিশ্বাস্যকে বাস্তব করে লেখাই হয়ে উঠল সবচেয়ে সৎ উপায়।

১৯৪৯ সালে কিউবার লেখক আলেহো কার্পেন্তিয়ের তার lo real maravilloso বা বিস্ময়কর বাস্তবতার ধারণা দেন। আর ১৯৬৭ সালে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘নিঃসঙ্গতার একশো বছর’ প্রকাশের পর এই ধারা বিশ্বসাহিত্যের কেন্দ্রে চলে আসে। মার্কেস বলেছিলেন, লাতিন আমেরিকায় জাদুকে কল্পনা করতে হয় না, বাস্তবতাকে হুবহু লিখলেই তা জাদু মনে হয়।

ম্যাজিক রিয়ালিজম আসলে কী, সেটা ঠিকঠাক বুঝতে গেলে আগে এটা বোঝার দরকার— এটি কী নয়।

প্রথমত, এটি রূপকথা নয়। রূপকথায় জাদুর একটি আলাদা জগৎ থাকে, যেখানে পরী থাকে, দৈত্য থাকে। পাঠক জানে এটা অন্য জগৎ। ম্যাজিক রিয়ালিজমে জগৎ একটাই, আমাদের এই চেনা পৃথিবী।

দ্বিতীয়ত, এটি ফ্যান্টাসিও নয়। হ্যারি পটার বা লর্ড অফ দ্য রিংস ফ্যান্টাসি, কারণ সেখানে জাদুর নিয়ম আছে, জাদুর স্কুল আছে, জাদুই প্রধান। ম্যাজিক রিয়ালিজমে জাদুর কোনও নিয়ম নেই, কোনও ব্যাখ্যা নেই। জাদু হঠাৎ আসে, চুপচাপ চলে যায়।

তৃতীয়ত, এটি সায়েন্স ফিকশনও নয়। সায়েন্স ফিকশন ভবিষ্যতের যুক্তি দিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করে। ম্যাজিক রিয়ালিজম অতীত, স্মৃতি আর মিথের যুক্তি দিয়ে সম্ভবকে অসম্ভবের দিকে ঠেলে দেয়।

এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে কিছু বলা দরকার। আলোচনা করলে দেখা যায় যে সেগুলি নিম্নরূপ:

১. দ্বৈত বাস্তবতার সহাবস্থান: এখানে বাস্তব ও অতিপ্রাকৃত একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহনাগরিক। মৃত মানুষ জীবিতদের সঙ্গে গল্প করে, আকাশ থেকে হলুদ ফুল বৃষ্টির মতো ঝরে, মানুষের শোক এতটাই গভীর হয় যে, তার ঘর থেকে অনন্তকাল ধরে পিঁপড়ে বেরোতে থাকে। কিন্তু কেউ চিৎকার করে বলে না, এটা অসম্ভব। সবাই মেনে নেয়।

২. ব্যাখ্যাহীনতা: লেখক কখনওই বলেন না কেন এমন হল। মার্কেসের উপন্যাসে সুন্দরী রেমেদিওস যখন চাদর মেলতে মেলতে আকাশে উড়ে যায়, লেখক বলেন না এটি বাতাসের কারণে, বা এটি প্রতীক। এটি ঘটে, ব্যস। এই ব্যাখ্যাহীনতাই পাঠককে বাধ্য করে বাস্তবতার সংজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে।

৩. অতিসাধারণ বর্ণনা: জাদুর বর্ণনা দেওয়া হয় অত্যন্ত সাধারণ, প্রায় রিপোর্টের মতো নিরাসক্ত ভঙ্গিতে। যেন লেখক বলছেন, আজ বৃষ্টি হয়েছে, আর আজ আমার ঠাকুরদা কবর থেকে উঠে এসে চা খেয়েছেন। এই নিরাসক্তিই জাদুকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

৪. সময়ের বৃত্তাকার ধারণা: ম্যাজিক রিয়ালিজমে সময় ঘড়ির মতো সরলরেখায় চলে না। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ একসঙ্গে মিশে থাকে। একই ঘটনা বারবার ফিরে আসে। ‘নিঃসঙ্গতার একশো বছর’ উপন্যাসে বুয়েন্দিয়া পরিবারে একই নাম, একই ভাগ্য বারবার ফিরে আসে, কারণ সময় এখানে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি।

৫. ইন্দ্রিয় ও মিথের প্রাধান্য: এই সাহিত্য প্রচণ্ড ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য। গন্ধ, স্বাদ, শব্দ দিয়ে বাস্তবতা তৈরি হয়। আর স্থানীয় মিথ, লোককথা, প্রবাদকে ইতিহাসের মতোই সত্য হিসেবে ধরা হয়।

সমালোচকেরা প্রশ্ন তোলেন, আধুনিক বিশ্বে ম্যাজিক রিয়ালিজম কেন এত প্রাসঙ্গিক? উত্তরটা হল এই যে, আজকের পৃথিবীতে বাস্তবতা অনেকাংশে ম্যাজিকের মতো হয়ে পড়েছে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, আমরা এমন একটা সময়ে বেঁচে আছি যেখানে একটি ভাইরাস গোটা পৃথিবীকে কয়েক বছরের মতো থামিয়ে দেয়। এখানে মোবাইল ফোনে হাজার মাইল দূরে থাকা একটি মানুষের মুখ ভেসে ওঠে আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনায়াসে লিখে ফেলে হাজার লাইনের কবিতা। আমাদের বাস্তবতাই এখন জাদুবাস্তব। যুক্তিবাদী আধুনিকতা আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি। বরং আমাদের ভেতরে শূন্যতা, একাকিত্ব, উদ্বেগ আর পরিচয়ের সংকট তৈরি করেছে। সেই শূন্যতার পরিসরে কথা বলে ম্যাজিক রিয়ালিজম।

এটি আজ আর শুধু লাতিন আমেরিকার নয়, এটি একটি বৈশ্বিক ভাষা হয়ে উঠেছে। টনি মরিসনের ‘বিলাভড’ উপন্যাসে দাসত্বের ট্রমা একটি শিশুর ভূত হয়ে ফিরে আসে। সলমন রুশদির ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’-এ ভারতের স্বাধীনতার মুহূর্তে জন্ম নেওয়া শিশুদের মধ্যে দেখা যায় অলৌকিক ক্ষমতার প্রকাশ। আর জাপানে হারুকি মুরাকামির জগতে বিড়াল কথা বলে, কুয়ো শূন্যতার প্রতীক হয়ে ওঠে। কারণ, আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গতা বাস্তবতা দিয়ে বোঝানো যায় না, তার জন্য জাদু লাগে।

বাংলা সাহিত্যেও এর শেকড় যথেষ্ট গভীর। আমরা সরাসরি ‘জাদুবাস্তবতা’ নাম না দিলেও এর চর্চা করেছি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অতিপ্রাকৃত গল্প, জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বাস্তব ও স্বপ্নের মিশে যাওয়া, এমনকী হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলি সিরিজে যুক্তির পাশে অব্যাখ্যাত রহস্যের উপস্থিতি, সবই ম্যাজিক রিয়ালিজমের কাছাকাছি। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’তে বাস্তবের ভেতর এক অলৌকিক আতঙ্ক কাজ করে।

শেষ পর্বে এটা বলা ভাল যে, ম্যাজিক রিয়ালিজম আসলে আমাদের শেখায় বাস্তবতাকে আরও বড় করে দেখতে। আমাদের স্কুল-কলেজ আমাদের শিখিয়েছে, যা দেখা যায়, ছোঁয়া যায়, মাপা যায়, শুধু সেটাই সত্যি। কিন্তু মানুষের সত্যি কি শুধু তাই? আমাদের স্বপ্ন, আমাদের স্মৃতি, আমাদের মায়ের মুখে শোনা রূপকথা, আমাদের পূর্বপুরুষের ভয়— এগুলো কি কম সত্যি?

ম্যাজিক রিয়ালিজম বলে, না, এগুলোও সত্যি। বরং কখনও কখনও এগুলোই বেশি সত্যি।

এই আধুনিক, ক্লান্ত, তথ্যে ভরা পৃথিবীতে ম্যাজিক রিয়ালিজম একটি প্রতিবাদ। এটি বলে, সবকিছুকে ডেটা দিয়ে, লজিক দিয়ে ব্যাখ্যা করার দরকার নেই। কিছু জিনিসকে শুধু অনুভব করতে হয়, মেনে নিতে হয়। একটা গাছ কাঁদতে পারে, একজন মৃত মানুষ ফিরে আসতে পারে, এক শহরের সমস্ত মানুষ দেখতে পারে একই স্বপ্ন।

আর যখন আমরা এই জাদুকে মেনে নিই, তখন তা আরও সহনীয়, আরও সুন্দর, আরও মানবিক হয়ে ওঠে। কারণ তখন আমরা বুঝতে পারি, জীবন কোনও গাণিতিক সমীকরণ নয়, জীবন একটি বিশাল, রহস্যময়, জাদুময় গল্প, যার অর্ধেকটা বাস্তব, আর অর্ধেকটা আমাদের কল্পনা দিয়ে বোনা।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 − 2 =

Recent Posts

ড. শ্যামল কান্তি দত্ত

ড. শ্যামল কান্তি দত্তর প্রবন্ধ

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ যে প্রকৃত বাংলা ভাষার স্বপ্ন দেখেছেন, সে লোকায়ত বাংলা ভাষা প্রথম সফলভাবে সাহিত্য সভায় এসেছিল চৈতন্য প্রভাবেই। বর্তমানে বাংলা ভাষা যে অন্তর্জাল-আন্তর্জাতিকতার আলোয় অবহেলিত তা থেকে মুক্ত করার উপায়ও ঐ শ্রীচৈতন্যের চেতনাজাত মানবিক প্রেম-ভক্তি তথা ‘অচিন্ত্যভেদাভেদতত্ত্ব’ চর্চায়।

Read More »
গোবিন্দ কুণ্ডু

গোবিন্দ কুণ্ডুর কবিতা

গো বি ন্দ  কু ণ্ডু দিশাহীন নিদ্রাহীন প্রতিটি রাত্রি কাটাই গভীর হতাশা নিয়ে, আমি কারও স্বপ্নের রাজপুত্র হয়ে উঠিনি কোনও দিন। এই পৃথিবীর মায়াজালে জড়ানো

Read More »
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ

বর্তমান সময়টা হয়তো সুখের নয়। চারিদিকে তাকালে মনে হয় দুর্ভেদ্য দেয়াল ঘেরা ‘রক্তকরবী’র যক্ষপুরী যেন। ‘রক্তকরবী’ নাটকের অধ্যাপক নন্দিনীকে পাকা দেয়ালের ফাটল দিয়ে আসা আচমকা আলোর কথা বলেছিলেন স্তূপকৃত জঞ্জালের নীচে খুঁজে পাওয়া রক্তকরবীর ছোট্ট গাছটাই সেই ফাটল ভেঙে বেরিয়ে আসা আলো। শতবর্ষী তৃপ্তি মিত্র এবং শতবর্ষী বাদল সরকার এই আলোর খোঁজে জীবনভর কঠিন সুড়ঙ্গ খোদাই করে গেছেন।

Read More »
প্রদীপ বকশি

প্রদীপ বকশির প্রবন্ধ

মার্ক্স-এঙ্গেলস-রচনাসমগ্র সম্পাদনা ও প্রকাশনা প্রসঙ্গে প্র দী প  ব ক শি   রূপরেখা সংক্ষিপ্তসার—গুরুত্বপূর্ণ নাম ও শব্দ— সংকেত ও শব্দ সংক্ষেপ নিবন্ধের পাঠ 0.ভূমিকা উদ্ভব:

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের কবিতা

ক ল্পো ত্ত ম সাড়া যখন সাড়া দাও উন্মত্ত হয়ে উঠি ছুটে যাই এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে যাই আলোর দিকে, আবির্ভাবের দিকে। অন্ধকার

Read More »