Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

সাদা কাপড়, কড়ে আঙুল আর কাজলকালো চোখ: রামকেলির মেলার পাঁচসিকের বোষ্টমী

সাদা কাপড়ের আড়াল থেকে বাড়িয়ে দেওয়া কড়ে আঙুলের ডগাটুকু। বড়জোর ঘামেভেজা কপালের রসকলি আর একঝলক ভীরু, কাজলকালো চোখ… এই নিয়েই একসময় আলোড়ন পড়েছে রামকেলি মেলা প্রাঙ্গণ থেকে সারা বাংলায়। বছর বছর জ্যৈষ্ঠ সংক্রান্তিতে মালদায় রামকেলি মেলার সময় আসে। উদ্দাম ডিজে-র তালে ‘বান্ধবী ললিতা’-র আড়ালে হারিয়েই যেতে থাকেন রামকেলি মেলার পাঁচসিকের বোষ্টমীরা।

মালদা শহর থেকে বেরিয়ে মহদিপুর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ ধরে ১৩ কিলোমিটার মতো দূরে পিয়াসবাড়ি গ্রাম। সেই গ্রামের মোড় থেকে ডানদিকে আরও এক কিলোমিটারের একটু বেশি গেলে চোখে পড়বে রামকেলির মদনমোহন জিউ মন্দির। পাশেই বিস্তৃত রয়েছে বাংলার প্রাচীন রাজধানী গৌড়ের ধ্বংসাবশেষ। ষোড়শ শতাব্দীতে ধর্মজাগরণের মাধ্যমে সমাজ সংস্কারের যে কাজ চৈতন্যদেব শুরু করেন, তার সূত্রেই তিনি নবদ্বীপ থেকে পায়ে হেঁটে বৃন্দাবনের উদ্দেশে রওনা দেন। আনুমানিক ১৫১৪ খ্রিস্টাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংক্রান্তির আগের দিন তিনি গৌড়ভূমিতে উপস্থিত হন। তাঁর গৌড়ে স্থায়িত্ব ছিল তিনদিন। সেই সময় গৌড়ের শাসক ছিলেন নবাব হুসেন শাহ। নবাবের মন্ত্রীপরিষদের অন্যতম দুই সদস্য ছিলেন সাকর মল্লিক ও দবির খাস। তাঁরা দুজনেই চৈতন্যদেবের সংস্পর্শে এসে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হন। রামকেলিতে একটি তমাল গাছের নিচে তাঁদেরকে দীক্ষা দান করেন চৈতন্যদেব। দীক্ষাদানের পরবর্তী সময়ে সাকর মল্লিক সনাতন ও দবির খাস রূপ গোস্বামী নামে খ্যাত হন। পরবর্তীকালে তাঁরা সেই তমাল গাছের নিচেই একটি মন্দির নির্মাণ করান। চৈতন্যদেবের গৌড়ে আগমন উপলক্ষে রামকেলিতে মেলার সূচনা করেন নিত্যানন্দ গোস্বামী বংশের গুরুগোঁসাই অটলবিহারী দেবানন্দ প্রভুপাদ। তাঁর প্রবর্তিত মেলাই আজকের রামকেলি মেলার চেহারা নিয়েছে। ৫০৯ বছরেও এই ঐতিহ্য অটুট।

ইতিহাস বলে, ১৫৭৪-এর প্লেগে গৌড় নগরী জনশূন্য হওয়ার পর দীর্ঘকাল এই রামকেলি উৎসব ও মেলা বন্ধ থাকে। তারপর যখন চালু হয়, তখন থেকেই এই বৈষ্ণব গণবিবাহের রমরমা। বাউল, খুশিবিশ্বাসী, তিলকদাসী, দরবেশ, সাহেবধনী, বলাহাড়ি— মেলায় আগত সব সম্প্রদায়ের বৈষ্ণবদের মধ্যে এ প্রথা চালু ছিল। অধ্যাপক সুধীর চক্রবর্তীর বাউলবিষয়ক কালজয়ী গ্রন্থ ‘গভীর নির্জন পথে’-তে এই বৈষ্ণব গণবিবাহের ইতিহাস বলতে গিয়ে বলা হয়েছে— এই প্রথা ১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দে চৈতন্যদেবের মৃত্যুর দশ বছরের মধ্যেই বিভিন্ন মঠের প্রধান বা গোস্বামীদের হাতে পড়ে সর্বজনীনতার মূল সত্য থেকে সরে আসে।

পাতলা সাদা কাপড়ের একদিকে একেবারে বুক পর্যন্ত ঘোমটা টেনে দাঁড়াতেন বৈষ্ণবীরা। কাপড়ে ছোট ছোট ছিদ্র করে কনিষ্ঠা আঙুল বাড়িয়ে দেওয়া হত। পাঁচসিকে বা চার আনার বিনিময়ে সেই আঙুল দেখেই বৈষ্ণব বেছে নিতেন তার ‘মনের মানুষ’-কে। তারপর ওই কড়ে আঙুল ধরে বাইরে এনে ঘোমটা খুলিয়ে চারচক্ষুর মিলন, কণ্ঠীবদল— অনেকক্ষেত্রে মালাচন্দন করে আনুষ্ঠানিক বিবাহ। কিন্তু বৈষ্ণবী পছন্দ না হলে তাৎক্ষণিক বিচ্ছেদ। গলার কণ্ঠী নিষ্ঠুরভাবে ছিঁড়ে ফেলে, শেষবারের মতো একবার দইচিঁড়ে খাইয়ে বিদায়। সেই পরিত্যক্ত বোষ্টমীর দিকে ফিরেও তাকাত না কেউ। কবি গীতা চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘বেদানাদাসীর আশ্চর্যচরিত’ কবিতায় কণ্ঠীছেঁড়া বৈষ্ণবীর এই বুকভাঙা কান্নাকে বাংলা সাহিত্যে অমর করে রেখেছেন।

মালদার প্রাচীন মানুষেরা বলেন, এই অসহায় মেয়েরা অনেকক্ষেত্রেই লালসার শিকার হতেন। মেলাকে কেন্দ্র করে অস্থায়ী পতিতাপল্লির বিস্তারের কথাও অনেকে বলেছেন। তথ্য বলে, ১৯১২ পরবর্তী সময়ে গৌড়দূত সম্পাদক লালবিহারী মজুমদারের ধারাবাহিক প্রতিবেদন ও তৎকালীন জেলাশাসক জে. এন. রায়ের তৎপরতায় এই প্রথার সরকারি মতে অবলুপ্তি ঘটে। তবে লুকিয়েচুরিয়ে কিছু আসরের খবর তার পরবর্তী সময়েও পাওয়া যায়। চারের দশকে অধুনালুপ্ত ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এমন একটি আসরের উল্লেখ পাওয়া যায়।

Advertisement
রামকেলি মেলার পথে।

তবে আবার হারাতে হারাতেও হারায় না অনেক কিছু। বর্ধমান খণ্ডঘোষের কানাই ঘোষ ও হরিভামিনী, কলকাতার বাগুইআটির প্রসাদ বোষ্টম ও ললিতা বোষ্টমী, বীরভূম নলহাটির রূপচাঁদ ও কৃষ্ণভামিনী যেমন এসেছেন ‘মনের মানুষ’-এর সন্ধানে। তাঁরা কণ্ঠীবদলের এই বিশেষ রীতির কথা ভালভাবেই জানেন। তাই মালদা টাউন স্টেশন থেকে নেমে রামকেলি যাওয়ার আগে তাঁরা একটা আড়াল খোঁজেন। সে আড়াল হতেই পারে পুরাতন মালদা বা গাজোলের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনও বৈষ্ণব পাঠবাড়ি বা আখড়া। সেখানে হয়তো আড়াআড়ি টাঙানো কোনও সাদা থানের ওপার থেকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে দুটি কাজলপরা উৎসুক কালো চোখ… বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে কপালের রসকলির ওপর। তাঁর সারা শরীরে চন্দনগন্ধ… তুমুল হরিধ্বনির মধ্যে কণ্ঠীবদল। বয়স বা শরীর কোনও বাধা নয়— মন মেনে নিলে হাতে হাত রেখে ভিতরের ঘরে চলে যাওয়া। আর মেনে না নিলে শুধু একটা ছবি হোয়াটসঅ্যাপ করা। কিছু সময়ের মধ্যেই কালো কাচঢাকা স্করপিও চলে আসবে আশ্রমের বাইরে। এরকম কত শুরুর কোনও শেষ থাকে না; কত শেষের শুরুর তলটাই খুঁজে পাওয়া যায় না— ‘ও মন, কখন শুরু কখন যে শেষ কে জানে/ এ যে বাজিকরের খেলা রে মন যার খেলা হয় সে জানে!’ বলিউডের কোনও ৪৯ বছর বয়সী নায়ক ২১ বছরের নায়িকাকে পর্দায় তীব্রভাবে ভালবেসেছেন, তাই নিয়ে সমাজমাধ্যমে তোলপাড়… এ জগৎ তার থেকে খুব দূরে নয়। বা, স্থানগত ব্যবধান আছে— ভাবগত ব্যবধান তেমন নেই।

শরৎচন্দ্রের কালজয়ী উপন্যাসে শ্রীকান্তকে ঘরছাড়ার আহ্বান জানিয়ে বৈষ্ণবী কমললতা বলেছিল, ‘চলো ঠাকুর— বেরিয়ে পড়ি’। দেহসাধনা নিয়ে শ্রীকান্তের কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তরে এই কণ্ঠীছেঁড়া বোষ্টমী বলেছিল— এ পথ সত্যি যাদের জন্য নয়, তাদের সাধনা চিরকাল জলের ধারাপথে শুকনো বালির মতো আলগা থেকে যায়, কোনোদিন জমাট বাঁধে না। মেয়েরা দুঃখকে ভয় পায় না— আবার চোখের জলকেও এড়াতে চায় না। দ্বারিকাদাসের আখড়ায় এই চিরসত্য খুঁজে পেয়েছিলেন শ্রীকান্তরূপী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়— আর রামকেলির মেলায় সেই অসহায় বৈষ্ণবীদের দীর্ঘশ্বাস আজও পাকিয়ে ওঠে জ্যৈষ্ঠের তপ্ত হাওয়ায়। ওয়েবসিরিজে শ্রীকান্ত দেখা প্রজন্ম আদৌ তার হদিশ পায় কি?

চিত্র: লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen + twelve =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর চারটি কবিতা

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »
সালমিন রহমান

বেলুচিস্তান সংকট মোকাবিলা কতটা সহজ

বেলুচিস্তানের সংকটকে কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদ কিংবা কেবল নিরাপত্তা সমস্যার দৃষ্টিতে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি বোঝা যায় না। এখানে ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, প্রাকৃতিক সম্পদ, উন্নয়ন বৈষম্য, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা— সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্বাধীন বেলুচিস্তান গঠিত হলে বহু মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে পারে। একই সঙ্গে একটি নতুন রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াবে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা। অন্যদিকে, পাকিস্তান, চীন, ভারত এবং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

Read More »