Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

হাপু: কৌতুক-কথায় বিদ্ধ করে সমাজকে

হাপু গান? না কি খেলা? এ নিয়ে মতের ফারাক বিস্তর। গান যদি হয় তবে অভাব, অনটন, হাহাকারে ভরা সে গানের মোটিভ। আর যদি তা হয় খেলা, তাতে সেরা হয়ে উঠবার প্রয়াস নেই কোনও। আছে কেবল চারপাশের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের আকুল আকাঙ্ক্ষা। তার জন্যই যত কসরত, অঙ্গভঙ্গি, সুরের কারিকুরি।

‘হাপু’— মোটে দুটো অক্ষরের ছোট্ট একটা কথা। কতজনে তার কত কথাই না বলেছেন! সঠিক অর্থটি পাওয়া যায় বঙ্গীয় শব্দকোষ (সাহিত্য আকাদেমি, নতুন দিল্লি) গ্ৰন্থে। সেখানে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন হাপু-র সঠিক অর্থটি— হাঁপ, হাপু (দীর্ঘশ্বাসজনক) দুর্ভাবনা, দুশ্চিন্তা, বিপত্তি, কষ্টভোগ করা ইত্যাদি। হাপু শব্দের ব্যবহার হয়েছে এমন উদাহরণ অনেক আছে আমাদের সামনে— বিদ্যাসুন্দর (রামপ্রসাদ সেন)-এ আছে— “(বুড়া) কহে বাপু কেন আপু গণ, যুক্তি আছে…”। ভারতচন্দ্র লিখেছেন— “মালিনী কইছে বাপু, কেন এত ভাবা হাপু, আমি হাট-বাজার করিব।” আবার দাশরথী রায় তাঁর ‘পাঁচালী’-তে লিখেছেন, “আমি ত পাল্লাম না বাপু! এ কষ্টের হাটে গুণতে হাপু।” এমনকি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত ‘বঙ্গসাহিত্য পরিচয়’ গ্রন্থেও হাপু সম্পর্কে একটু উল্লেখ পাওয়া যায়— “পেট নিয়ে দ্বারে দ্বারে যদি গুণো হাপু। এমন সন্ন্যাসে তোর কাম কিরে বাপু।” এখানেই শেষ নয়। আধুনিককালের ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এড়িয়ে যেতে পারেননি ‘হাপু’ শব্দটিকে। তাঁর ‘কুহু ও কেকা’-য় দুলাইন লিখেছেন— “হাপু খেলা হ’য়ে হবু মহারাজ, হাপুস-নয়নে চান!”

গানই হোক বা খেলা— হাপুর কুশীলব কারা? এলাকাভেদে বাজিকর, মাল, কাকিমারা, বেদে, পটুয়া ইত্যাদি সম্প্রদায়ের ছেলেরা। তাও আবার শৈশব থেকে কিশোর বয়স পর্যন্ত। পরে ভিন্ন জীবিকায় চলে যায় তারা। মেদিনীপুর জেলার দক্ষিণ আর পূর্ব এলাকায় প্রধানত— কাকমারা পরিবারের ছেলেরাই হাপু দেখায়। বহু পূর্বে এদের ঠাকুরদার ঠাকুরদার ঠাকুরদারা এসেছিলেন এবঙ্গে। কলিঙ্গ বা দাক্ষিণাত্য এলাকা থেকে রাজরাজড়াদের যুদ্ধ অভিযানে পদাতিক কিংবা মালবাহক হয়ে। নিম্নবিত্ত আর নিম্নবর্গীয় মানুষজন সব। ভিন্ন এলাকায় এসে একেবারে প্রথম পর্বের দিনগুলিতে গ্রামগঞ্জের বাইরে গাছতলায়, পোড়োবাড়িতে দিনযাপন করতেন।

বাংলা না জানায় ভিক্ষাও জুটত না যখন, শুকনো ভাত ছড়িয়ে কাক শিকার করতেন এরা। রান্না করতেন শ্মশানের আধপোড়া কাঠ জ্বালিয়ে। কয়েকটা দিন কাটিয়ে আবার নতুন এলাকায় পাড়ি দিতেন যাযাবর এই মানুষের দল। কাক মেরে খেতেন তাই নাম হয়েছে ‘কাকমারা’। তাদেরই প্রজন্মান্তরের মানুষ হাপু গায়কেরা।

পরে পরে বাংলা রপ্ত হল একদিন। পুরুষরা হাতে লোহার বালায় বাঁটবিহীন ছুরির আঘাতে শব্দ করে ভিক্ষা করে বেড়াতেন গৃহস্থের দ্বারে দ্বারে। মেয়েরা যেতেন ফিরি করতে। মাথায় চুবড়ি ঝুড়িতে ডাঁই করা কম দামের ছোটখাট জিনিস মূলত গৃহস্থবাড়ির অভাবী মহিলাদের ব্যবহার্য আলতা সিঁদুর আয়না চিরুনি বড়শির ডোর-কাঁটা এইসব। শিশুদের ঘরোয়া টোটকা চিকিৎসায় ভারি পটুত্ব এদের। পুরুষেরা তাবিজ দিতেন।

এদেরই ছোট ছেলেমেয়েরা হাপু খেলা দেখিয়ে বেড়ায়। ডান হাতে থাকে শক্তপোক্ত একটা লাঠি। বেত কিংবা বাঁশের সেটা। হাত ঘুরিয়ে সপাটে আঘাত করে চলে নিজেরই খোলা পিঠে। সপাং সপাং শব্দ ওঠে দর্শক-শ্রোতাদের চমকে দিয়ে। একই সঙ্গে বাম হাতের চেটো ডান বগলে ঢুকিয়ে বিচিত্র শব্দের উচ্চারণ করতে থাকে তখন। আর মুখে ফোয়ারার মত ঝরতে থাকে গানের কলি। আর মাঝে মাঝে হাপু শব্দের উচ্চারণ। সে এক ভারি অতুলনীয় কৌতুককর পরিবেশ গড়ে ওঠে।

বীরভূম বর্ধমান মুর্শিদাবাদ ইত্যাদি মধ্যবাংলা এলাকাতেও হাপুর প্রচলন আছে। তবে সেখানে তা নেহাতই ভিক্ষাসঙ্গীত নয়। শিব ও ধর্মের গাজন, মনসার গানের বা বোলান গানের আসরেও হাপু গান পরিবেশিত হয় বলে জানা যায়। বীরেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, সমীরকুমার অধিকারী প্রমুখের রচনা থেকে জানা যায়, সেসব আসরে হাপুগানের সঙ্গে মৃদঙ্গ, খোল, নূপুর, ঘুঙুর ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হয়। কিন্তু নিম্নবঙ্গের জেলাগুলিতে ভিন্ন ছবি। মূলত ভিক্ষার জন্য গৃহস্থের দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়ানো গায়কেই হাপু পরিবেশন করতে দেখা যায়। তাতে কোনও বাদ্যযন্ত্র থাকে না। গান শুরুর মুখে বিচিত্র শব্দ করে শ্বাস নেওয়া, আর বগল বাজিয়ে শব্দ করা— এই কেবল গানের অনুষঙ্গ।

গ্রামীণ খেলা নিয়ে কাজ করেছেন শংকর সেনগুপ্ত, ওয়াকিল আহমেদ, স্বপনকুমার দাস, পিনাকীনন্দন চৌধুরী প্রমুখ। হাপুর কথা তো তারা কেউ বলেননি। আবার একে গানই বা বলি কেন? যা আমরা শুনি, এগুলো গান কি? আসলে তো এগুলো ছড়া। গানের পদগুলিতে ছড়ার বুনন স্পষ্ট। কয়েকটি গানের গঠন দেখা যাক—

(১)
হাট গেলাম বাজার গেলাম
কিনে আনলাম ওল
ওল খায়া ঘরে আমার
বেজায় গণ্ডগোল।

(২)
হাট গেলাম বাজার গেলাম
কিনে আনলাম নাড়ু
নাড়ু খায়া বউর আমার
পেট হয়েছে গাড়ু।

(৩)
হাট গেলাম বাজার গেলাম
কিনে আনলাম তাল
তাল খায়া বউ আমার
করে গালাগাল।

Advertisement

আরেকটি ছড়াও গ্রামাঞ্চলে বহুল প্রচলিত ছিল—

(৪)
বৌদি তুমি, আম খাবে জাম খাবে
তেঁতুল খাবে না
তেঁতুল খেলে পেট গোলাবে
ছেলে হবে না।

গানের ভাষা, তার গায়কী ও সুর এবং সর্বোপরি পরিবেশনের ঢং এমনই কৌতুকের আবহ তৈরি করত যে শ্রোতারা হেসে লুটোপুটি খেত। কপাট ধরে দাঁড়ানো বউ-ঝিদের আমোদ হত দেখবার মত। হাপুর গায়করা চলে যেত, কিন্তু গানটা অনেক দিন ঘুরে বেড়াত ছেলেপুলেদের মুখে মুখে।

সমাজজীবনের চালচিত্র দেখা যেত হাপুর গানগুলিতে। কৌতুক-কথায় বিদ্ধ করে সমাজকে—

(৫)
জমিদারের লম্বা কোঁচ
মুখজুড়া ঝাঁতুয়া মোচ
সকাল সন্দ্যা হাঁকাডাকা
বাবুর কিন্তু পকেট ফাঁকা।

কিংবা—

(৬)
দাদা চলল সিনিমা
বৌদি রইল ঘরে
পাড়ায় যত চ্যানকামনে
উঁকিঝুঁকি মারে।

ইত্যাদি এরকমই সব গান। যে কালে দুমুঠো চাল, এক-আধটা ছেঁড়া কাপড়চোপড় বা ভরদুপুরে পাতের দুমুঠো ভাতের আশায় গৃহস্থ বাড়ির দরজায় দরজায় পটের গান, যুগির গান, ফকির গান শোনা যেত, গৃহস্থ বিরক্তও হতেন না, গান শুনতেন সাগ্রহে, বিদায় করতেন শিল্পীদের হাতে-পেটে কিছু দিয়ে, বর্তমানে সেই ছবি বদলেছে। তারা নিজেদের রুজিরুটির জন্য ভিন্ন জীবিকায় যুক্ত হয়েছেন।

তবু কিছু অভাবী মানুষ এই কাজে রয়ে গেছে। এরা এখনও পুরনো বৃত্তি আঁকড়ে। গৃহস্থবাড়িতে যেহেতু তেমন একটা আর ভিক্ষে জোটে না, তাই হাপু গানকে সম্বল করে এখন উঠে এসেছে লোকাল ট্রেনের কামরায়। আজও চলন্ত ট্রেনের কামরায় হাপু শোনেন দেখে সকলে দুটো-একটা পয়সাও তুলে দেন তাদের হাতে। কিন্তু তাতে পোড়া পেট ভরে না ভাল করে। পিঠের কালশিটে দাগগুলোই কেবল চওড়া হতে থাকে প্রতিদিন।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

মুঘল মিনিয়েচার ও এক আশ্চর্য সম্রাটের গল্প

2 Responses

  1. বিষয় টিয়আমার অজানা ছিল , পড়ে ভালো লাগলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 + four =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আমেরিকার স্বাধীনতা: আড়াইশো বছর

১৬০৭ থেকে ১৭৮৩ পর্যন্ত সময়কাল আমেরিকায় ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক রাজত্ব। আজকের দিনে যে আমেরিকা, তা কিন্তু পুরোটা ব্রিটিশদের দখলে ছিল না। ছিল ভার্জিনিয়া, ম্যাসাচুসেটস, নিউ ইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া-সহ ১৩টি রাজ্য। আর কানাডার বেশ কিছু অঞ্চল। আমেরিকার অন্যান্য স্থানে ফরাসি, ডাচ, নরওয়েজিয়, সুইডিস উপনিবেশ-ও ছিল। তাছাড়া রাশিয়া আমেরিকার আলাস্কা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত দখল করে। পরে সে আলাস্কা আমেরিকার কাছে বিক্রিও করে দেয়।

Read More »
অপরাজিতা মৈত্র

গোদাবরীর গোমুখে

গঙ্গার মর্ত্যে আগমন নিয়ে যেমন ভগীরথের গল্প, তেমনই গোদাবরীর উৎসস্থলে না এলে জানা যেত না, দক্ষিণের গঙ্গা নিয়েও আছে হাজার গল্প। যে গল্প জানাবে আজও এই অঞ্চলের মানুষ অনেক সময়েই কাছাকাছি আর কোনও পানীয়জল না পেয়ে কষ্ট করে হলেও এই উৎসস্থলে এসেই শীতল এই পানীয়জল নিয়ে যান নিজেদের কাজের জন্য। গঙ্গা বা অন্য নদী সে শুধু ধার্মিক আবেগের কারণে পবিত্র না, হাজার প্রাণীর ‘তৃষ্ণা’ মেটাবার জন্য সে হয়ে ওঠে ‘দেবী’ বা ‘পবিত্র’। সে পথে মিশে যায় হাজার গল্প-কষ্ট কিংবা দিনযাপনের চরম বাস্তবতা।

Read More »
রুহ

রুহের কবিতাগুচ্ছ

একই আলোকমালায় কাটিয়েছি/ বহুকাল দু’জনে…/ বলিনি কখনও।/ তারা খসা দেখেছি একসাথে, যদিও/ গোপন থেকেছে চাওয়া-পাওয়া।/ মাঝে বহুদিন, বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো/ একা… নীরবে বয়েছি যাতনা।/ আজ মিথ্যের নেই অবকাশ/ তোমাকে কি পড়েনি মনে/ কোনও মুহূর্ত বা ক্ষণে/ ভাবিনি কি একান্ত বন্ধু আমার—/ এতদিন পরে, পুনর্মিলনে বলেছ/ পাখি হতে চেয়েছিলে এ জীবনে

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

যুদ্ধ: বৈশ্বিক কসাইখানা, পুঁজির সংকট ও শ্রমের মুক্তি

অবিক্রীত পণ্যের পাহাড় যখন পুঁজির পুনরুৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করে, তখন পুঁজিপতিরা তীব্র আতঙ্কে ভোগে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তারা প্রতিযোগী পুঁজিপতির বাজার ও পণ্য ধ্বংস করতে চায়। আর এই ধ্বংসের বৈধ হাতিয়ার হিসেবে তারা রাষ্ট্র ও সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করে যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়। অর্থাৎ, উদ্বৃত্ত পণ্য এবং অতিরিক্ত শ্রমকে ধ্বংস করে পুঁজির ভারসাম্য ফিরিয়ে আনাই বুর্জোয়া যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য। এই শোষণের প্রক্রিয়াকে আড়াল করতে রাষ্ট্র একদল বুদ্ধিজীবী ও নীতিবিদ লালন করে, যারা কৃত্রিম ‘দেশপ্রেম’ ও ‘জাতীয়তাবাদ’-এর আফিম খাইয়ে শ্রমিককে বিভ্রান্ত রাখে, যাতে তারা শোষক ও শোষিতের মধ্যকার মৌলিক শ্রেণি-পার্থক্য ভুলে যায়।

Read More »
প্রসেনজিৎ চৌধুরী

বিশ্বকাপ জৌলুসে আর্জেন্টিনা গণহত্যার বধ্যভূমি

বুয়েনস আইরেসের রিভার প্লেটের যে স্টেডিয়ামে তখন খেলা হত, তার মাত্র এক মাইল দূরে ছিল সামরিক সরকারের বন্দিশিবির নেভি স্কুল অব ম্যাকনিকস। সাংবাদিক ডেভিড কক্স ফুটবল বিশ্বকাপের খবর সংগ্রহ করতে গেছিলেন। তিনি ‘ডার্টি ওয়ার’ বইতে লিখেছিলেন, যখন স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার ম্যাচ চলত তখন ওই টর্চার সেল থেকে কান্নার শব্দ শোনা যেত। আর্জেন্টিনার ভুবনমোহিনী ফুটবলে লেগে আছে রক্ত।

Read More »
রাধাবল্লভ রায়

ধর্মযুদ্ধ

এই যে সংবাদমাধ্যমে প্রতিদিন শতমুখে বিদ্বেষ ছড়ানো হয়, এই যে ফেসবুক জুড়ে বিশেষ সম্প্রদায়কে চিহ্নিত করে সম্মানীয় নেতা-মন্ত্রীদের কুৎসিত ইঙ্গিত, হিংসার প্রদর্শনী— এর প্রতিক্রিয়া কোথায় গিয়ে ঠেকে তাঁরা কি জানেন? পাড়ায় পাড়ায়, রকের আড্ডায়, ক্লাবের আড্ডায়— সর্বত্র বয়োজ্যেষ্ঠদের নির্বোধ অসংযত উচ্চারণ কোন শিশুর হৃদয়ে কেমন ভাবে প্রোথিত হয় তাঁরা কি জানেন? ভেবে দেখেছেন কি এই বিদ্বেষিতার মধ্যে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে আগামী প্রজন্ম?

Read More »