Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ফ্লেমিঙ্গো কথা

গ্রেট ফ্লেমিঙ্গো। ‘Flamingo’, এই শব্দটা এসেছে স্প্যানিশ শব্দ ‘Flamengo’ থেকে, অর্থাৎ flame colored… আগুন রঙা।

হ্যাঁ… উজ্জ্বল আকর্ষণীয় লালচে গোলাপি রঙের পালক আর কমনীয় লম্বা গলা, অতীব লম্বা পা, লোকালয় থেকে দূরে নির্জন এলাকায় অগভীর জলের ধারে দলবদ্ধভাবে বাস… সব মিলে পক্ষীকূলে যেন এক স্বতন্ত্র অভিজাত পরিবার। এরা সবসময় বিশাল দলে, কয়েক হাজার পাখি একত্রে বাস করে। এরা strictly একগামী (monogamous)। পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছে, এক জোড়া পুরুষ ও স্ত্রী ফ্লেমিঙ্গো সারা জীবন (এদের গড় আয়ু ২০-৩০ বছর) একসঙ্গে থাকে। এরা একসঙ্গে বাসা বানায়। স্ত্রী ফ্লেমিঙ্গো ডিম পাড়বার পরে মা পাখি আর বাবা পাখি দুজনেই ভাগাভাগি করে সমানভাবে ডিমে তা দেয়। এরপর ডিম ফুটে বাচ্চার জন্মের পরও যতদিন পর্যন্ত বাচ্চারা স্বাবলম্বী না হয়, মা ও বাবা ফ্লেমিঙ্গো সমানভাবে তাদের বাচ্চাদের পালন ও রক্ষণাবেক্ষণ করে।

ফ্লেমিঙ্গোর পালকের আকর্ষণীয় উজ্জ্বল গোলাপি রং… এ কিন্তু জন্মসূত্রে পাওয়া অথবা কোনও জিনগত কারণের ফলে নয়। বস্তুত সদ্যোজাত ফ্লেমিঙ্গো শিশুর গায়ের রং থাকে ধূসর (dull grey)। এরপর ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে রঙের পরিবর্তন হতে থাকে। কীভাবে? এই রং পরিবর্তনের কারণ হল ফ্লেমিঙ্গোদের খাদ্যাভ্যাস। এই যে উজ্জ্বল গোলাপি রং… এর উৎস হল বিটা ক্যারোটিন নামে একটি রাসায়নিক যৌগ। এই বিটা ক্যারোটিন যৌগ হল কমলা রঙের একটি পিগমেন্ট।

পালকের উজ্জ্বল গোলাপি রঙের ব্যাপারেও এরা খুব সচেতন এবং যত্নশীল।

ফ্লেমিঙ্গো পরিযায়ী পাখি নয়। এরা মোটামুটি স্থায়ীভাবে বাস করে সমুদ্রের কাছাকাছি নোনাজলের হ্রদ বা উপহ্রদ (lagoon) সংলগ্ন জলাভূমি অথবা সমুদ্রের কাছাকাছি অবস্থিত ম্যানগ্রোভ জলাভূমিতে। আর এইরকম জলাভূমির অগভীর নোনাজলে থাকা প্রচুর পরিমাণ কুচো চিংড়ি (brine shrinps), বিশেষ ধরনের অ্যালগি, মশার লার্ভা ও নানা রকমের জলজ পোকা… যা হল ফ্লেমিঙ্গোদের অতি প্রিয় খাদ্য।

নোনাজলে থাকা এই চিংড়ি, পোকামাকড় আর অ্যালগিতে প্রচুর পরিমাণ ক্যারোটিন থাকে, যা ফ্লেমিঙ্গোর পাকস্থলিতে প্রবেশ করে। পাকস্থলিতে পরিপাক প্রক্রিয়ার সময় একটি বিশেষ এনজাইম, bita-carotine oxygenase1 (BCO1) ক্যারোটিনকে ভেঙে ফেলে… কমলা/ লালচে গোলাপি রঙের এক পিগমেন্ট তৈরি করে। এই পিগমেন্ট লিভারে থাকা ফ্যাট দ্বারা শোষিত হয় এবং পরবর্তী ধাপে এই ক্যারোটিনয়েড পিগমেন্ট ফ্লেমিঙ্গোর দেহের চামড়া (skin) ও পালকে জমা (deposited) হয়। এভাবেই বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ফ্লেমিঙ্গোর দেহ আর পালকের রং ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকে।

মিলনের ঋতুতে ফ্লেমিঙ্গোরা তাদের সুন্দর উজ্জ্বল কমলা-গোলাপি পালক প্রদর্শন করে সঙ্গী/ সঙ্গিনীকে আকৃষ্ট করে।

এবার আসি ফ্লেমিঙ্গোর রূপচর্চা প্রসঙ্গে। পাখির আবার রূপচর্চা? হাঁ ঠিকই পড়ছেন। ফ্লেমিঙ্গো পাখিরা, তাদের পালকে জমে থাকা নানান অবাঞ্ছিত প্যারাসাইট আর ময়লা নিয়মিত পরিষ্কার করে তাদের বিশেষ ধরনের লম্বা ঠোঁটের সাহায্যে। এছাড়াও এদের পালকের উজ্জ্বল গোলাপি রঙের ব্যাপারেও এরা খুব সচেতন এবং যত্নশীল (sensitive & caring)। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে ফ্লেমিঙ্গোর পালকের ক্যারোটিনয়েড যৌগগুলি খুব ধীরে ধীরে ভেঙে (slow decomposition) যেতে থাকে। এর ফলে পালকের রঙিন ঔজ্জ্বল্য কমতে থাকে। তবে এই ব্যাপারেও ফ্লেমিঙ্গোরা যথেষ্ট সচেতন। সম্প্রতি Ecology and Evolution Journal, October সংখ্যায় একদল গবেষক-বিজ্ঞানী এমনই এক পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছেন।

ফ্লেমিঙ্গো তার পালকের সাহায্যে শুধুই যে উড়তে পারে তা নয়, ঘন পালক তার দেহকে শুষ্ক রাখতে সাহায্য করে। আর এই উজ্জ্বল ঘন রঙিন পালকের আরও একটি বিশেষ ভূমিকা আছে। মিলনের ঋতুতে (mating season) ফ্লেমিঙ্গোরা তাদের সুন্দর উজ্জ্বল কমলা-গোলাপি পালক প্রদর্শন করে সঙ্গী/ সঙ্গিনীকে আকৃষ্ট করে।

মিলনের ঋতুতে পালকের রঙিন উজ্জ্বলতা বাড়াতে ফ্লেমিঙ্গো তার গাল ঘষতে থাকে তার সারা দেহের পালকের ওপরে।

গবেষকরা তাঁদের পর্যবেক্ষণে লক্ষ্য করেছেন… আসন্ন মিলনের ঋতুতে পালকের রঙিন উজ্জ্বলতা বাড়াতে ফ্লেমিঙ্গো তার গাল ঘষতে থাকে তার সারা দেহের পালকের ওপরে। এর ফলে পাখির গালে অবস্থিত ইউরোপিজিয়াল গ্ল্যান্ড (uropygial gland) থেকে একরকমের রঙিন সিরাম (serum) নিঃসৃত হয়। এরপর ফ্লেমিঙ্গো তার লম্বা গলা দিয়ে বুলিয়ে বুলিয়ে নিঃসৃত সিরামকে সমানভাবে ছড়িয়ে দেয় পালকে আবৃত তার সারা দেহে। আর এভাবেই উজ্জ্বল রঙিন পালকে সজ্জিত হয়ে মিলনসঙ্গীকে আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে নিজেকে প্রস্তুত করে ফ্লেমিঙ্গো।

ফ্লেমিঙ্গোর এই যে সজ্জা পর্ব… এ কিন্তু শুধুমাত্র তাদের মিলন ঋতুতেই (mating season) চলে। পছন্দমত সঙ্গী নির্বাচন, মিলন, প্রজনন, প্রসব ও তার পরে পক্ষীশাবকের রক্ষণাবেক্ষণ… এই দীর্ঘ সময়কাল কিন্তু ফ্লেমিঙ্গো পুরুষ ও স্ত্রী… উভয়েই নিজেদেরকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত রাখে সন্তান প্রতিপালনে।

পুরুষ ও স্ত্রী ফ্লেমিঙ্গো সারা জীবন (এদের গড় আয়ু ২০-৩০ বছর) একসঙ্গে থাকে।

গবেষকদের পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, এই সময়ে এদের ইউরোপিজিয়াল গ্ল্যান্ড নিঃসৃত সিরামে ক্যারোটিনয়েড যৌগের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। আর পরবর্তী মিলন ঋতুর ঠিক আগে ছাড়া মধ্যবর্তী দীর্ঘ সময়ে আর একবারও তারা রূপচর্চার জন্য সিরাম নিঃসৃত করে না। এই সময় এরা তাদের সমস্ত শক্তি ব্যয় করে তাদের সন্তান প্রতিপালনে।

প্রকৃতির বুকে নির্জনে নিরালায় এভাবেই সুন্দর নিয়ম নিগড়ে বাঁধা ফ্লেমিঙ্গোদের জীবনচক্র আবর্তিত হয়ে চলেছে কোন সেই সুদূর অতীত হতে!

Ref.: Ecology and Evolution. Vol.11, October 2021, p- 13773. doi: 10.1002/ece 3.8041.

চিত্র: গুগল

One Response

  1. চিত্তাকর্ষক এবং তথ্যসমৃদ্ধ। খুব ভালো লাগল লেখাটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × three =

Recent Posts

পবিত্র সরকার

পবিত্র সরকারের বিশেষ রচনা

বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষদের রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে একটু বেশি দুর্বলতা আছে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে যত কিছু, তাঁদের কাছেও তত কিছু তো বটেই, কিন্তু তারও চেয়ে অনেকটা বেশি। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেনাপতি। বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় থেকে, আয়ুব শাহি ফরমানে রেডিয়োতে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষেধ আর রবীন্দ্র-শতবার্ষিকীর ওপর ফতোয়া জারি থেকে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক মহাশক্তিধর যোদ্ধা, তাঁর সম্বন্ধে এঁরা তাই এত স্পর্শকাতর।

Read More »
মীরাতুন নাহার

মীরাতুন নাহারের প্রবন্ধ

হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতা এবং মুসলমান-সাম্প্রদায়িকতা উভয়কেই তিনি যুক্তি ও তথ্যদ্বারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ধ্বংসাত্মক বলে বোঝাতে চেয়েছেন দেশবাসীকে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত দেশবাসীকে তিনি হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যদিও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ‘সাম্প্রদায়িকতার বিষ’ দেশবাসীর মন থেকে নিষ্কাশন করে দেশকে বিপন্মুক্ত করা।

Read More »
গৌতম ঘোষ

গৌতম ঘোষের প্রবন্ধ

চলচ্চিত্রের ধর্ম হল সময়কে ধরে রাখা, সময়ের স্মৃতিমালাকে ধরে রাখা। সেই পদ্ধতি, সেই প্রক্রিয়া কিন্তু চলতেই থাকবে। এখন আমাদের আরও মানবিক হতে হবে। চলচ্চিত্র যারা তৈরি করবেন তারা শুধুমাত্র সস্তার বিনোদন সরিয়ে রেখে একটু মানবিক ছবি করবেন। যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক, মানুষ ও সমাজের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক থাকবে। যা আমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক সব সিনেমায় দেখেছি, সেই ভাবনায় ভাবতে হবে।

Read More »
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ নিবন্ধ

বস্তুত সুকান্ত কবিতার চাইতে বড়। তিনি এক প্রতীকচিহ্ন। সারা ভারতে যখন কবিকে ভাবা হয়েছে জনতার একজন প্রতিনিধি হিসেবে, তখন সুকান্তকেই ভাবা হয়েছে। তামিল বা হিন্দি সিনেমাতেও হয়েছে। যেমন রাজেশ খান্নার ‘অনুরোধ’ নামের ছবিটিতে যে কবিটি রাজেশের বন্ধু ছিলেন তার নাম সুকান্ত। অথবা অতদূরে কেন যাই, বাংলায় উত্তম-তনুজার ‘দেনা পাওনা’ ছবিতে উত্তম যে বন্ধুর চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন, তার নামও তো সুকান্ত। তিনিও তো ফুসফুসের রোগী।

Read More »
কালীকৃষ্ণ গুহ

কালীকৃষ্ণ গুহর কবিতা

একটি রাত্রি কা লী কৃ ষ্ণ  গু হ প্রতিটি রাত্রিকেই নতুন মনে হয়— অচেনা লাগে। আজকের রাত্রিটা যেন চির-অচেনা যেন কিছু ঘটার ছিল যা ঘটেনি

Read More »
অভিজিৎ সিরাজ

অভিজিৎ সিরাজের ছোটগল্প

ফরেস্ট বাংলো অ ভি জি ৎ  সি রা জ শঙ্কর দত্তকে আমি শেষ দেখি আনন্দপুরে মাদুরদহের একটা স্কুল বাড়িতে। অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল সেদিন। বাড়ির

Read More »