Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

পূর্ণাঙ্গ নাটক: এবং বিদ্রোহ

চরিত্রলিপি

থুরান

ইউমেনেস

নিকোমেডেস

ইম্ব্রাসিস

স্ট্রেপসিয়াডেস

দাস

পিহাজিটি

১ম রোমান সৈন্য

২য় রোমান সৈন্য

বিচারালয়ে রক্ষীদল

কাটো

এডোনিস

ঘোষক

ডেমোক্রিটাস

পেলোনিয়াস

একজন জুরি

দ্বিতীয় জুরি

আরো তিনজন জুরি

গ্রীক দাসদের নাটকের দল (কয়েকজনের কোরাস এবং ১ম ও ২য় এই দু’জন ভাঁড়ে বিভক্ত)

১ম গ্রীক

২য় গ্রীক

টালিমাকিস

ইফিজিয়া

স্পেক্টাস

সিন্না

ক্রোনাস

ক্রাসাস

বারাক

নেস্টর

লেক্সাস

নাটক করার দলের কোরাস দুভাগে ভাগ হয়ে দুই দল হয়ে যাবে ত্রয়োদশ দৃশ্যে

রোমান সৈন্যদল

নতুন জুরিগণ এবং তাদের মুখপাত্র

 

প্রথম দৃশ্য

[এক বৃদ্ধ বসে আছেন উঁচু দাওয়ায়। তিনি থুরান। বসে কিছু পড়ছেন। দুজন প্রবেশ করেন। একজন বয়স্ক, অন্যজন তরুণ। ছেলেটির নাম ইউমেনেস। বয়স্ক তার বাবা। তার নাম নিকোমেডেস।]

নিকো।। অভিবাদন থুরান।

[থুরান বই রাখে। তাকায়।]

থুরান।। নিকোমেডেস! আরে! তা এই দরিদ্রের কুটিরে?

নিকো।। এই আমার ভাইপো ইউমেনেস!

ইউমেনেস।। অভিবাদন।

থুরান।। অভিবাদন তোমাকেও। বসো বসো। [দুজনে বসে] তারপর? হঠাৎ আমাকে স্মরণ?

নিকো।। আপনি তো জানেন থুরান, সাম্প্রতিক কালে আমি রোমান নাগরিকত্ব পেয়েছি। এতদিন ধরে ঘাম-রক্ত জল করে— !

থুরান।। তা তো শুনেছি। তুমি এখন মান্যিগণ্যি লোক। তো তাতে কি সমস্যা?

নিকো।। সমস্যা আমার এই ভাইপোটি!

থুরান।। কেন? বেশ তো শান্ত-শিষ্ট ছেলে।

নিকো।। আর শান্ত-শিষ্ট! তিনি এখন মামলা লড়তে চাইছেন।

থুরান।। আরে বাবা! একেবারে উকিল। বাহ বাহ! সে তো ভাল সংবাদ। তোমারও তো ভালই হল। তোমার হয়ে লড়ার জন্য—

নিকো।। ইনি লড়বেন এক ক্রীতদাসের হয়ে! [থুরান শোনে] সেই ক্রীতদাস তার মালিকের ঘোড়া চুরি করে পালিয়েছে। ধরাও পড়েছে। তাকে ক্রুশে ঝোলানোর ব্যবস্থা চলছে। ইনি তার মধ্যে গিয়ে আধিকারিকের দপ্তরে জানিয়ে এসেছেন ইনি মামলা লড়বেন ক্রীতদাসের হয়ে। সে নাকি দোষী না!

থুরান।। তাই? তা হ্যাঁ ভাই, সে দোষী না তুমি ঠিক জান?

ইউমেনেস।। আজ্ঞে মাননীয়!

থুরান।। কী করে জানলে?

ইউমেনেস।। কারণ ঘোড়াটা তাকে দিয়েছিলাম আমি। এবং সে ঘোড়ার মালিকও আমিই।

থুরান।। তাহলে তাকে ধরা হল কেন?

ইউমেনেস।। কারণ আমার বাবা দাবি করছেন দাসটি আদপে তাঁর। আমি আমার দাসকে তাঁর অনুমতি ছাড়া মুক্তি দিতে পারি না। ঘোড়া তো অনেক দূরের বিষয়। বাবার লোক ধরে এনেছে। এখন রোমানরা তাকে ক্রুশে ঝোলাবে বলে—

নিকোমেডেস।। ইনি তাই এখন বাপের বিরুদ্ধে মামলা লড়বেন। প্রমাণ করে ছাড়বেন দাসটি তাঁর, তিনি মুক্তি দিতে আইনত সক্ষম।

থুরান।। বাবার বিরুদ্ধে মামলা? হুম! কিন্তু সত্যিই যদি ওর সে অধিকার থেকে থাকে—

নিকোমেডেস।। আমার ভাই তো একেবারে উন্মাদ হয়ে যাচ্ছে থুরান। জানেনই তো, আনাতোলিয়ার বিস্তৃত গ্রামাঞ্চলে আবার দাসবিক্ষোভ শুরু হয়েছে। শুরু হয়েছে গ্রামীণ ভূমিহীনদের সমস্যা। আবার যেন সেই বিদ্রোহের হাওয়া। আবার দমন-পীড়ন হবে। আবারো ক্রুশের সারি রাস্তায় রাস্তায়! উফ্‌! তার মধ্যে ইনি এখানে দাসের মুক্তি নিয়ে মামলা লড়বেন নিজের বাবার বিরুদ্ধে।

থুরান।। আমি এখানে কি করতে পারি তা তো বুঝছি না!

নিকো।। আপনি পারেন। আপনিই পারেন। কারণ ইনি গুরু মেনেছেন আপনারই শিস্য ইম্ব্রাসিসকে।

থুরান।। ইম্ব্রাসিস তো এখানে আর থাকে না।

নিকো।। জানি। কিন্তু তার গল্প এখানে ছড়িয়ে। সেই একমাত্র সক্রাতিসের ঐকান্তিক অনুগামী। ন্যায়ের পক্ষে, সত্যের পক্ষে সেই হেমলক পান করতে সক্ষম। আমরা বাকী গ্রীকরা নিতান্তই রোমের পা-চাটা। এই সব ইনি ভাবেন।

থুরান।। তুমি ঠিক কি চাইছ আমার থেকে?

নিকো।। আমি চাই আপনি স্পষ্ট করে ওকে ইম্ব্রাসিসের গল্প বলুন! গুজব, কিংবদন্তী, জনশ্রুতি এ সব না। আপনার মুখ থেকেই শুনুক আসলে কী ঘটেছিল! বুঝুক কত ধানে কত চাল। আমরা বললে সে সব—!

থুরান।। তুমি শুনবে সে ঘটনার কথা?

ইউমেনেস।। হ্যাঁ। আমি শুনতে ইচ্ছুক।

থুরান।। বেশ তো। তবে শোনো।

নিকো।। আজ্ঞে, আমি আগে বিদায় হই! আমার আজ অনেক কাজ। একে এনেদিলাম, আগে শুনুক আপনার থেকে, তারপরে— ! আচ্ছা, অনুমতি দিন আমায়।

থুরান।। এসো। [অভিবাদন করে বেরিয়ে যায় নিকো] কিন্তু তুমি কেন শুনতে চাইছ ইউমেনেস? মামলা করাটা সত্যি উচিত কী না জানতে?

ইউ।। আজ্ঞে না। মামলা আমি করব। তবে মামলাই যখন লড়ব তখন এর থেকে আমিও চাই শিক্ষা নিতে।

[থুরান একটু চোখ বুঁজে থাকে। তারপর শুরু করে -]

থুরান।। ইম্ব্রাসিসের বাবাও বোধহয় গোপনে স্বপ্ন দেখত রোমান নাগরিক হবার। আর ইম্ব্রাসিসের বয়স তখন তোমারই কাছাকাছি।

[আলো নেভে]

*

দ্বিতীয় দৃশ্য

[প্রচুর নাকডাকার শব্দ। দুজনে ঘুমোচ্ছে একটা অঞ্চলে। একটা সময় অল্প বয়সী যুবক উঠে পরে। বৃদ্ধ লোকটিকে নাড়া দেয়। লোকটি উম-হুম শব্দ করে নড়ে। খানিক বন্ধ হয় নাক ডাকা। ছেলেটা শোয়। আবার নাক ডাকে বৃদ্ধ। ছেলেটা আবার তাকে তোলে। বৃদ্ধ এবারে উঠে বসে। দাঁড়ায়। পাশের থেকে জল নেয়, মঞ্চের বাইরে গিয়ে খানিক কুলকুচি করে আসে। ছেলে ইম্ব্রাসিস, বৃদ্ধ স্ট্রেপসিয়াডেস। ]

ইম্ব্রা।। কতবার বলেছি একটু তেলমালিশ করে ঘুমোও, বুকে তো সর্দি জমে জমে—

স্ট্রেপ।। দাস!— দাস!! (দ্বিতীয়বার রেগে)

দাস।। আজ্ঞে প্রভু।

স্ট্রেপ।। বাইরের আলোটা কী হল?

দাস।। তেল আজকে বড্ড তাড়াতাড়ি টেনেছে।

স্ট্রেপ।। চাবকে তোমার তেল বার করলে বুঝতে পারবে হারামজাদা। [দাস দাঁড়িয়ে থাকে।] যা, এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে জল তোল। ভোর হতে চলল।

ইম্ব্রা।। [নিজে শুতে শুতে] যতক্ষণ বাকি আছে, খানিক শুতে চেষ্টা কর। তেলটা নিয়ম করে মাখালে নিজেরই শরীর ঠিক থাকে। ঘুমটা ভাল হয়। সারাদিন ঝিমোতে হয় না।

স্ট্রেপ।। বাপের এত ভাল যখন বোঝোই তখন বাপের ধারগুলো শোধের ব্যবস্থা করলেই তো হয়!

ইম্ব্রা।। করব না কখন বলেছি?

স্ট্রেপ।। করেও তো উদ্ধার করছ না।

ইম্ব্রা।। তার জন্য হাতে অন্তত মামলা তো আসতে দিতে হবে। উকিল হব এমন কোনো ইচ্ছে তো আমার ছিল না। একটা মামলা এসেছে। দেখি কত জোটে। [উল্টোদিক করে শুয়ে পড়ে। খানিকক্ষণের মধ্যেই সে ঘুমে আচ্ছন্ন। বুড়ো দেখে। তারপর বলে—]

স্ট্রেপ।। কী সুখ! উল্টোল আর ঘুম! বাপের জন্য ভাবনা। হ্যাঃ!

ইম্ব্রা।। না না, বল কেমন করে রথটা বাঁক নেবে! প্রথম মোড় থেকেই তো শুরু হয়ে যাবে— উম উম— [ঘুমের মধ্যেই এ সব বলে। স্বপ্ন দেখছে বোঝা যাচ্ছে।]

স্ট্রেপ।। ঘুম হচ্ছে। বাবু ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ঘোড়া, রথ আর প্রতিযোগিতার স্বপ্ন দেখছেন! কী আহ্লাদ!— এ সব ওর মায়ের জন্য। গাঁয়ের লোক, কেন যে শহুরে মেয়ে বিয়ে করলাম! স্ট্রেপসিয়াডেস, তুমি মূর্খ! ওসব রঙ চঙ বাইরের, আসলে ঘোড়ার নাদিও মাখতে পারে না।

ইম্ব্রা।। এই সোজা চালা রথটা ফিলো। খুব অন্যায় হচ্ছে।

স্ট্রেপ।। অন্যায় হচ্ছে? অ্যাঁ? তাই? তা বাপের টাকা ঘোড়ার পিছনে দিয়ে তুমি কি ন্যায় করছ? [ইম্ব্রা চুপ] হুঁহ! ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে— ! কত ভেবেচিন্তে ছেলেকে উকিল বানাতে পাঠালাম। ঐ যে ঐ পাহাড়ের গায়ের মন্দিরে— একটা কী যেন করেছে, চিন্তা— চিন্তা— চিন্তাশ্রম হ্যাঁ হ্যাঁ। ঐ চিন্তাশ্রমে যুক্তি-টুক্তি শেখায়। সে সব ভারী কঠিন। ওরা দু’রকম যুক্তিই জানে। একদিকে কথায় ভালকে মন্দ বানাতে পারে, অন্যদিকে কথায় মন্দকে ভাল। ভাবলাম, ছেলে যদি ঐ করে-টরে উকিল হয়, মান্যি পায় সমাজে, তাহলে আমার ধারগুলোতেও— ! মানে ঐ যা হোক যুক্তি দিয়ে আমাকে খালাস করে দেবে। হায় রে ভাগ্য! গাধার বাচ্চা গাধাই হয়, ঘোড়া হয় না।

ইম্ব্রা।। ভাল করে রগড়ে দাও। রগড়ে দাও।

স্ট্রেপ।। হ্যাঁ। সকালে মহাজন তোমার বাপকে রগড়াবে। মা নেওটা ছেলে, তুমি কী জান দুনিয়ার মানে! এমন একটা মামলা নিয়েছে শেষে যাতে না আছে তেল না আছে মাল। বেছে বেছে— ! [গলার স্বর বদলায়] বাবা, সোনা বাপ আমার—

ইম্ব্রা।। উঁ!

স্ট্রেপ।। ওঠো একবার বাপ!

ইম্ব্রা।। সবে ঘুমটা— উঁ— কেন?

স্ট্রেপ।। বাপের বিয়ে দেখবে বলে হারামজাদা! [গর্জন করে প্রায়। উঠে পড়ে ইম্ব্রা। চোখ ডলে। তারপরে বলে,]

ইম্ব্রা।। ভেবেছিলাম থাকব। কিন্তু না, এভাবে থাকা চলে না।

স্ট্রেপ।। এখানে?

ইম্ব্রা।। হ্যাঁ এখানে!

স্ট্রেপ।। দেশে থাকতে পারবে তো এই মামলা নিয়ে? [চুপ করে থাকে ইম্ব্রা] কী আক্কেলে নিয়েছিলে? অ্যাঁ? একজন গ্রীক হয়ে আরেকজন গ্রীকের বিরুদ্ধে মামলা? তাও একজন মান্যগণ্য গ্রীকের খুনের মামলা?

ইম্ব্রা।। উফ্‌! আমার কিছু করার ছিল না! ডিমোক্রিটাস বলল, মামলাটায় আমাকে কিচ্ছু করতে হবে না। এমনিতেও লোকটার ফাঁসি হবে, অমনিতেও। আমাকে শুধু—

স্ট্রেপ।। তা বলে নিকাটোরকে যে খুন করল— তোমার কোনো ধারণা আছে নিকাটোর কে ছিল?

ইম্ব্রা।। এখানকার রোমান পরিষদের সর্বকনিষ্ঠ গ্রীক সদস্য— হতে পারত। হয়নি।

স্ট্রেপ।। এই জন্য গাধার বাচ্চা—! আরে ও তো এই নির্বাচন নির্বাচন খেলায় হয়েই যেত! শোনো বাপ,  নিকাটোর এখানে রোমানদের কাছাকাছি থাকা লোক ছিল। গোটা আনাতোলিয়া জুড়ে তার ঘোড়া থেকে শস্য কত্ত রকমের ব্যবসা। সেই ছেলে মরল কী না একটা ঘৃণ্য লুলাহির হাতে? ক্ষেপবে না গ্রীকরা? কারিয়ানগুলো, যেগুলো নিজেদের গ্রীক বলে, অথচ আমরা গ্রীকরা মনে করি না তারা গ্রীক— তারা পর্যন্ত ক্ষেপে গেছে।

ইম্ব্রা।। আশ্চর্য! এই তুমি ধার শোধ ধার শোধ করে মাথা খারাপ করছ। এই তুমি বারণ করছ কাজ নিতে?

স্ট্রেপ।। এ কাজ নিয়ে—

ইম্ব্রা।। ডিমোক্রিটাস বলেছে, এই কাজটা যদি আমি করে দিই, তাহলে তার শ্বশুরকে বলে আমাকেও সিন্নার দপ্তরে কেরানীর কাজ দেবে।

স্ট্রেপ।। কেরানির কাজ?

ইম্ব্রা।। হ্যাঁ। কিন্তু কেসটায় যেহেতু কেউ দাঁড়াচ্ছে না লোকটার পক্ষে তাই আমাকে দাঁড়াতেই হবে। ঐ রোমান বিচারক কাটো ভীষণ কড়া। দরকার হলে সে রোম থেকে লোক আনাবে। আর রোম থেকে লোক আনলে ডিমোক্রিটাস— !

স্ট্রেপ।। হুঁ। তা কেরানির কামাই বেশ ভাল। উপরি নিতে পারলে—

ইম্ব্রা।। তেমন তেমন হলে কোনো একদিন কোনো এক বিভাগের সচিবও—

স্ট্রেপ।। থাক থাক। অত স্বপ্ন দেখ না। আগে যা করছ শেষ কর। [ইম্ব্রা চুপ করে থাকে] —আরে বসে রইলে কেন, শুয়ে পড় যাও! [নিজেও শুয়ে পড়ে] আজ কি বিচার শুরু?

ইম্ব্রা।। না। আজ একবার ঐ লোকটার সঙ্গে দেখা করে তার বয়ান নিতে হবে।

স্ট্রেপ।। হুঁ। [দুজনেই চুপচাপ। একটু সময় যায়। স্ট্রেপ-এর নাক ডাকার শব্দটা বাড়ে। মোরগ ডাকে। বেশ কয়েকবার। স্ট্রেপ ধড়মড়িয়ে উঠে বসে। ইম্ব্রাও আদ্ধেক মাথা তোলে।] —শালা, গলা দেখ! ভোর করে দিল। [ইম্ব্রা মাথা নামায়। আলো নেভে।]

*

তৃতীয় দৃশ্য

[বন্দী পিহাজিটি। জাতে লুলাহি। হাতে-পায়ে শেকল। দু’জন রোমান সৈন্য ঢোকে প্রথমে। ]

১ম।। এই ওঠ! [পিহাজিটি ওঠে] এখানে এসে দাঁড়া। [আসে] তোর উকিল আসছে!

২য়।। হা হা! এই শুয়োরের বাচ্চারও উকিল।

১ম।। বললে হবে বাওয়া, খরচা আছে। রোমান গণতন্ত্র বলে কথা।

২য়।। আমি না বুঝতেই পারি না এই সেনেট-ফেনেট করেটা কী! সবই তো চালান অগাস্টাস।

১ম।। রোমের প্রথম নাগরিক। হুঁ হুঁ।

২য়।। এক গাছি চুল ছেঁড়ার ক্ষমতাও তো আজ সেনেটের নেই। যা অগাস্টাস বলেন তাতে সই মারা ছাড়া—! তাহলে এদের জন্য শালা আমরা করের টাকা কেন দিই?

১ম।। গণতন্ত্র মামা, গণতন্ত্র।

২য়।। ছালের গণতন্ত্র! সেবারে ভোট দিতে গিয়ে দেখি কে একটা মেরে দিয়ে চলে গেছে ! গণতন্ত্র!

১ম।। কিন্তু মাইনে, সে তো ছালের নয়! সে তো দিচ্ছে।

২য়।। সে জন্যই তো রে বাবা! মাইনে দিচ্ছেন অগাস্টাস। তাহলে আর গণতন্ত্র দিয়ে—

১ম।। গণতন্ত্র দিয়ে মাইনেটা অগাস্টাস রোমের জনগণের থেকে তুলছে। এই আনাতোলিয়ার মত প্রদেশগুলো থেকে তুলছে। গণতন্ত্র না থাকলে— [চোখ মটকায়] খুব চাপ। বিদ্রোহ, যুদ্ধ, হ্যাপাই হ্যাপা।

২য়।। তা বটে তা বটে! তবে যাই বল বাপু বড় হ্যাপা গণতন্ত্রের। এই যে একে দেখ। এরও বিচার করতে হবে। হাতে-নাতে ধরা পড়েছে, ক্রুশে তুলে দিলে হবে না।

১ম।। শুধু বিচার হবে এমনটাই না। এর জন্য আবার গ্রীকদের মত জুরি ব্যবস্থা চালু করেছে। আমাদের রোমের মত জুডিস নিয়োগই খানিক, কিন্তু আরেকটু ছাড় দিয়ে— যাতে গ্রীকদের মনে না হয় তারা রোমান বিচারে—

[হন্তদন্ত হয়ে ঢোকে ইম্ব্রাসিস। ]

ইম্ব্রা।। কই? কোথায়?

১ম।। কে? কী চাই?

ইম্ব্রা।। আমি উকিল

১ম।। তো!

২য়।। আমার বাবার?

ইম্ব্রা।। ইয়ে না। ঐ পুহা না পিহা কে যেন আছে বন্দী—

১ম।। পিহাজিটি!

ইম্ব্রা।। হ্যাঁ, ওর উকিল। দেখা করতে এসেছি। বয়ান নেব।

২য়।। মক্কেলের নামও জানো না উকিল হয়ে চলে এলে? অ্যাঁ? [১ম কে দেখিয়ে বলে] গণতন্ত্র! [তারা দুজনেই হাসে] ঐ যে তোমার মক্কেল ঐ কোণে। [ইম্ব্রা এগোয়। পিহাজিটি নিশ্চুপ নিশ্চল।]

ইম্ব্রা।। বলছিলাম যে— মানে আমি হচ্ছি— তোমার উকিল। —তোমার হয়ে মোকদ্দমা লড়ব। মহান কাটোর আদালতে—। [পিহাজিটি চুপ] আচ্ছা, আমি কি ওর সঙ্গে একটু আলাদা কথা বলতে পারি?

১ম।। নিশ্চয়ই পারো। গণতন্ত্র তোমাকে সে অধিকার দিয়েছে।

ইম্ব্রা।। তাহলে আপনারা যদি—

২য়।। আমাদের এই দুই কোণে দাঁড়ানোর কথা। গণতন্ত্র তেমনই আদেশ দিয়েছে। [রোমান দুজনেই হা হা করে হাসে]

ইম্ব্রা।। তাহলে তোমার বয়ানটা শুনি একটু। [চুপ পিহা]

১ম।। বয়ান মানেটা ও বোঝে না। অশিক্ষিত লুলাহি।

ইম্ব্রা।। মানে তোমার কিছু বলার আছে? এই যে ধরো, খুন করা নিয়ে বা ধরো— মানে ধরো— যা হোক যেকোনো বিষয় নিয়ে—

২য়।। রোমান গণতন্ত্র নিয়েও বলতে পারো। [দুজনে আবার হাসে]

ইম্ব্রা।। কেন খুনটা করলে? —না, মানে আগের কথাটা হল, তুমি কি খুনটা করেছ? এ কথা কি সত্যি?

১ম।। যাক! আমি তো ভাবলাম পরের প্রশ্নটা হচ্ছে কবে ক্রুশে চড়লে তোমার সুবিধে! [রোমান দুজনেই হাসে]

[এখানে পিহাজিটি হাঁটতে শুরু করে। যে কোণে ছিল সে কোণ থেকে অন্য কোণের দিকে। ইম্ব্রা তার পিছু নেয় খানিক। থেমেও যায়। তাকে ১ম প্রহরী থামিয়ে দেয়।]

ও কিছু বলবে না বুঝতে পারছ না?

ইম্ব্রা।। কিন্তু আমাকে তো বয়ান নিতে হবে!

২য়।। নিয়ে নিয়েছ তো!

ইম্ব্রা।। কই?

১ম।। এই যে, কিছু বলেনি। মানে সব ঠিকঠাক। মানে ও খুন করেছে। এবারে কেটে পড়। ওকে বন্দীশালায় ফেরত নিয়ে যাব।

ইম্ব্রা।। যাচ্চলে!

[পিহাজিটি হাঁটতে শুরু করে। প্রহরীরা তার পেছন পেছন ঠিক। আলো নেভে।] 

 *

চতুর্থ দৃশ্য

[বিচারের জায়গা। আগের মতই সব। শুধু জনতা হৈ হৈ করছিল। রক্ষীদল সামলাচ্ছিল। বিচারক কাটো আসার ঘোষণা হতে সবাই চুপ করে। কাটো আসে। বসে চেয়ারে। এডোনিস উঠে দাঁড়ায়। বলে,]

এডোনিস।। মাননীয় বিচারপতি, অভিযুক্তের উকিলের সঙ্গে প্রাশাসনিকভাবে আপনার এবং জনগণের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই। [কাটো চুপ] ইম্ব্রাসিস, সামনে এসো। [সে সামনে আসে। কাটোকে অভিবাদন জানায়। লোকজন হৈ হল্লা করে— একটা লুলাহি খুনের হয়ে দাঁড়িয়েছ কেন ইত্যাদি ইত্যাদি বলে। কাটো হাতুড়ি ঠোকে। বলে,]

কাটো।। এরপর যে একবারও অভিযুক্ত পক্ষের উকিলের থেকে কেন দাঁড়িয়েছে বলে কৈফিয়ৎ চাইবে, তাকে এখান থেকে বের করে দেব। এমন কী দরকার হলে বন্দী করব। রোমান আইনে সবার বিচার পাবার অধিকার আছে কেউ যেন না ভোলে! —বিচার শুরু হোক।

ঘোষক।। আমাদের গৌরবময় মহান গ্রীক ঐতিহ্যকে স্মরণে রেখে প্রথমে জুরি বাছাই হবে। পাঁচজন জুরি। বাদী-বিবাদী দুই পক্ষের তালিকা পেশ হোক। [বাদী পক্ষের তালিকাই আসে, বিবাদীর আসে না]

কাটো।। বিবাদীর তালিকাই নেই কোনো?

ইম্ব্রাসিস।। আজ্ঞে— কীসের তালিকা?

কাটো।। গাধার সংখ্যার!

ইম্ব্রা।। গাধা? আমার?

কাটো।। না, আমার।—জুরির তালিকা নেই কেন?

ইম্ব্রাসিস।। আজ্ঞে, আমি তো এই শহরে এলে বেশীরভাগ মন্দিরেই থাকি। তেমন চিনিও না কাউকে।

কাটো।। বাহ বাহ! [এডোনিসের দিকে চেয়ে] খুবই ভাল আয়োজন করেছেন দেখছি। [এডোনিস কিছু বলার সুযোগ পায় না] তা অভিযুক্তকে চেন? মানে তার চেহারাটা অন্তত জান?

ইম্ব্রাসিস।। আজ্ঞে!

কাটো।। কে? দেখাও তো!

ইম্ব্রাসিস।। ঐ যে উনি! [পিহাজিটিকে দেখায়]

কাটো।। চেন?

ইম্ব্রাসিস।। আজ্ঞে না। মানে হ্যাঁ। এই সেদিন বয়ান নিতে গিয়ে—

কাটো।। তো একে ক্রুশে ঝোলাবার এত তাড়া কেন? শত্রুতা?

ইম্ব্রাসিস।। না, মানে— আজ্ঞে—

কাটো।। শোনো হে, যদি উকিল হও, তাহলে উকিলের কাজটা কোরো। আর যদি মনে কর জ্বলজ্যান্ত একটা মানুষ মরে গেলে তোমার কিছু যায় আসে না, স্রেফ ক’টা তেলেন্ত পেলেই হল, তাহলে সে জাহান্নামেই যেও। আমি অভিযুক্তের উকিল চেয়েছিলাম, এরা দিয়েছে তোমাকে। এখন তোমার হয়ে তো আমি মামলা করে দিতে পারি না। —জুরির তালিকা অনুযায়ী ডাক জুরিদের [ঘোষককে বলে]। [জুরিদের ডাকা হয়। তারা আসে। একেকজন করে আসবে, বিচারক দু’পক্ষকেই জিজ্ঞেস করবে জুরিতে সম্মত কী না! এই হচ্ছে পদ্ধতি। প্রথম জুরি আসে।] বাদী পক্ষ এই জুরিকে ডেকেছেন। বিবাদীর আপত্তি আছে? [ইম্ব্রাসিস হাঁ করে তাকিয়ে থাকে] আপত্তি আছে? [তাও সে হাঁ করে চেয়ে থাকে] উফ্‌, সেই এরিস্টোফানেসের নাটক যেন! আপত্তি না থাকলে ঘাড়টা অন্তত নাড়াও হে মহামান্য উকিল! [সম্বিৎ ফেরে ইম্ব্রাসিসের]

ইম্ব্রাসিস।। এরিস্টোফেনিসের নাটক? আজ্ঞে বিচারপতি কোন নাটকটা—?

কাটো।। [সামান্য চেয়ে থেকে] যেখানে সক্রাতিসের পিণ্ডি হয়েছে! [চেয়ে থাকে ইম্ব্রাসিসের দিকে]

ইম্ব্রাসিস।। [যেন আবার সম্বিৎ ফেরে] আজ্ঞে সক্রাতিসের পিণ্ডি আমি করব না মাননীয়! তিনি আমার গুরু বংশেরও গুরু।

কাটো।। তা দেখাই যাচ্ছে!

ইম্ব্রা।। জুরিকে আমার জিজ্ঞেস করার আছে।

কাটো।। তো কর! কে বারণ করেছে?

ইম্ব্রাসিস।। জুরি পেলোনিয়াস, মাননীয় নিকাটোরকে আপনি চিনতেন?

পেলোনিয়াস।। সে চিনব না। কত বড় মাপের মানুষ ছিলেন। তাকে এই হারামজা— [ পিহাজিটিকে বলতে গিয়ে থেমে যায় কাটোর দিকে চেয়ে]!

ইম্ব্রাসিস।। মাননীয় বিচারপতি, আমার জ্ঞানী সহকর্মী ডেমোক্রিটাস এঁদের সবাইকেই ডেকেছেন। যদি অনুমতি করেন এঁদের সবার থেকেই দু-একটি কথা একসঙ্গে জানতে চাইব!

কাটো।। অদ্ভুত পদ্ধতি। তবু অনুমোদন দিলাম।

ইম্ব্রাসিস।। মাননীয় জুরিগণ,  আপনারা কি আমাদের এই লিসিয়ারই মানুষ?

একজন জুরি।। রোম থেকে কাউকে আনেনি। [বাকিরা হাসে]

কাটো।। সোজা উত্তর দিন জুরি সদস্য!

জুরিগণ।। [সমস্বরে] আমরা সবাই লিসিয়ার লোক।

ইম্ব্রাসিস।। আপনারা সকলেই নিশ্চয়ই সম্মান করতেন মাননীয় নিকাটোরকে।

দ্বিতীয় জুরি।। সে আর বলতে! প্রত্যেকে— এই এখানে যতজনকে দেখছেন— আমরা প্রত্যেকে জানতাম নিকাটোর আমাদের গ্রীকদের আশা-ভরসা। তাঁর এই অকালপ্রয়াণে— (প্রায় কেঁদে ফেলে)!

ইম্ব্রাসিস।। আচ্ছা আচ্ছা, কাঁদবেন না অনুগ্রহ করে। আমারও— ইয়ে মানে— হৃদয় খুব নরম। বাকীরাও কি নিকাটোরকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন?

জুরিগণ।। [সমস্বরে] হ্যাঁ চিনতাম এবং ভালবাসতাম।

ইম্ব্রাসিস।। বেশ। কিন্তু মাননীয় বিচারপতি জুরিরা সবাই যদি তাঁকে চেনেনই এবং এত সম্মান করেন, সেক্ষেত্রে তাঁদের মতামত ব্যক্তিগত আবেগ, অনুভূতিতে ভর্তি হতে বাধ্য। অতএব তাঁদের রায়ের নিরপেক্ষতা নিয়ে আমাদের সন্দেহ থাকতে বাধ্য।

[চারপাশে হৈ হৈ। কাটো হাতুড়ি ঠুকে বন্ধ করেন সে সব। বলেন—]

কাটো।। এতক্ষণে একটা যুক্তির কথা শুনলাম ঠিকঠাক।

ইম্ব্রাসিস।। আমার অনুরোধ সেক্ষেত্রে জুরি সব এমন জায়গা থেকে আনা হোক যাতে তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে নিকাটোরকে না চেনেন।

ডেমোক্রিটাস।। আমাদের জুরিরা তাঁদের কর্তব্য জানেন। তাঁদের—

কাটো।। ব্যস ব্যস! ঐ কর্তব্য জানাটাতেই সমস্যা আছে। বিবাদীর অনুরোধ আদালত বিবেচনা করবে। আদালত প্রশাসনকে নির্দেশ দিচ্ছে, যাতে লিসিয়া ছাড়া অন্য অঞ্চল থেকে জুরিদের আনা হয়। এবং নিহতকে ব্যক্তিগতভাবে চেনে এমন কাউকে আনা যাবে না। যতক্ষণ না নতুন জুরি আসছে, এই আদালত মুলতুবি রইল।

*

পঞ্চম দৃশ্য

[গ্রামের এক অংশ যেন মেলা। একটি নাটকের দল সেখানে অভিনয় করছে। তারা গ্রেকো-রোমান ব্যঙ্গ নাট্যাভিনয় করছে। তাদের নাটক হার্মাফ্রোডিটাস এবং সালামাকিসকে নিয়ে। সেখানে কোরাস আছে। দরকার মত তারা ভাঁড়ও হয়ে যায়। মুখোশ ব্যবহার করে। দর্শকরা আছে রোমান সৈন্যদের প্রহরায়। নাটকটা রোমান সৈন্যরা উপভোগ করে খুব। স্থানীয় গ্রীকরা চুপ করে দেখে যায়।]

কোরাস।। জয় জয় হে কামের দেবতা।

ভাঁড় ১।। সারাক্ষণ ছুঁকছুঁক হেথা হোথা।

কোরাস।। যুবক হার্মাফ্রোডিটাস যেই না বনে এল

ভাঁড় ২।। অমনি সব খাড়া হয়ে দাঁড়ালো!

ভাঁড় ১।। সালামাকিস তো নারী, ওরে ঘাটের মড়া!

তার কখনো দাঁড়ায়? হয় কখনো খাড়া?

ভাঁড় ২।। ও হো ও হো ভুল হয়ে গেছে বিলকুল

নিম্ফ তো— তবে তবে—

[বাক্যটা কোরাস সম্পূর্ণ করে]

কোরাস।। বনে ও মনে ফুটিল ফুল।

ভাঁড় ১।। নাটক তো না, যেন সন্তের কাব্য বাবা!

মাদী-মদ্দা লাগাচ্ছে, সঙ্গম বলবে হাবা!

ভাঁড় ২।। যত বড় বুক তার তত বড় পাছা

হাঁটে-চলে আঁঠা দিয়ে আঁটা যেন বাছা।

ভাঁড় ১।। সে সব বাগিয়ে সেই মেয়েছেলে

চললো ঝুলিতে আহা নায়কের গলে।

ভাঁড় ২।। সেই ব্যাটাছেলে যেন মেয়েরও অধম

ড্যাব ড্যাব করে দেখে মেয়ে নয় যম।

ভাঁড় ১।। লাগাবার ভয়ে সে দৌড়ে পালায়

মেয়ে বলে আয় সোনা, আয় কাছে আয়।

[দুই ভাঁড়ে মুখোশ পরে হার্মাফ্রোডিটাস আর সালামাকিস সেজে অভিনয় করবে এই সব অংশ]

কোরাস।। হুড়োহুড়ি গড়াগড়ি ঠেলাঠেলি যত

বিফল যতন সব, হে দেব মন্মথ।

ভাঁড় ১।। হার্মাফ্রোডিটাস, আফ্রোদিতির ব্যাটা

চায় না নিম্ফের যৌবন এত মাথামোটা।

ভাঁড় ২।। হার্মেসের বাচ্চা নাকী খোকা সে দেবতা

দেওয়া-নেওয়া খেলাতে একেবারেই যা তা।

কোরাস।। মন দুঃখে সালমাকিস ওঠে ছেড়ে জল

আপনারে বলে ওরে চল বনে চল।

ভাঁড় ১ ।। নিম্ফ চলে যেতেই ছোকরা পেল বল

ন্যাংটো হয়ে নামে পেয়ে সুশীতল জল।

ভাঁড় ২।। গাছের ডালে লুকিয়ে বসেছিল সালমাকিস বেটি

অমনি লাফিয়ে জলে ধরে ছেলের ঘেঁটি।

কোরাস।। হে দেব জিউস, অন্য দেব-দেবী, কহিতেছে সালামাকিস শুন দিয়া মন

বিধির বিধানে জন্ম হতে তোমাদের যথা ধর্ম করেছি ভজন-পূজন।

ত্রুটি কভু হয় নাই কোনো উপচারে

এবে মনোবাঞ্ছা তার দাও পূর্ণ করে।

চাহিয়াছি প্রাণনাথ বলে আমি এরে

কভু না পৃথক কেউ করিবে দোঁহারে।

এই শুনি মঙ্গল-শঙ্খ বাজিল জগতে

এক দেহে দুই লীন হল দেব মতে।

ভাঁড় ১।। বড় বড় দুইখানা বুকেতে গজালো

ভাঁড় ২।। লম্বা বড় একখানা নীচেতে ঝুলিল।

ভাঁড় ১।। নিজের এমন দশা দেখে ব্যাটাচ্ছেলে

ভাঁড় ২।। তেড়েফুঁড়ে ডাক দিল মা-বাপ সকলে।

ভাঁড় ১।। আমার এমন দশা হইল এই জলে

ভাঁড় ২।। যে নামবে সেও যেন পরে এই কলে।

ভাঁড় ১।। না থাকবে ছেলে সে বেটা, না থাকবে মেয়ে

ভাঁড় ২।। মিলেমিশে এমনই আজব— হবে সে দু’পেয়ে।

ভাঁড় ১।। অভিশাপ দিতেই হবে শোন মায়ে বাপে

ভাঁড় ২।। নইলে মরিব আমি এখনি মনস্তাপে।

কোরাস।। সন্তানের দেখিয়া এরূপ দুর্গতি

দেব-দেবী হইলেন ব্যাকুল চিত্ত অতি,

যতেক দেবতা-বিধি নহে খণ্ডিবার

সন্তানের দশা দেখি হইলা ছারখার,

ক্রোধেতে এই শাপ দিয়া জলাশয়ে

ফিরিলা নিষ্কল শোকে আপন আলয়ে।

সেই হতে শাপগ্রস্ত এই জলাশয়

কেহ আর ব্যবহার করিও না হায়!

[কোরাস ভঙ্গিমার মধ্যে দিয়ে সমাপ্ত করে নাট্যাংশ। বেরিয়ে যায় মঞ্চ থেকে সকলে। গ্রীকদের মধ্যে কথা হয়।]

১ম গ্রীক।। জলাশয়টা বন্ধ করে দিল। ওদিকে নিকাটোর খুন হয়ে গেছে। বুঝতে পারছি না আমাদের এবারে কী হাল হবে!

২য় গ্রীক।। ওই জলাশয়ে আমিও নিজে স্নান করেছি— আমার কিচ্ছু হয়নি। এখন এ সব কী গল্প কে জানে! —ঐ যে, পুরোহিত টালিমাকিস যাচ্ছে। ওকে একবার ডাকি দাঁড়াও। টালিমাকিস— টালিমাকিস—

টালি।। বল! তাড়া আছে খানিক।

২য় গ্রীক।। আচ্ছা, একটা কথা খানিক বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে। একটু বুঝিয়ে দেবে?

টালি।। জানলে বলব নিশ্চয়ই।

২য় গ্রীক।। ঐ যে লুলাহিটা খুন করল নিকাটোরকে, কেউ কেউ বলছে ও নাকী কাজটা করেছে রাগে। লেক্সাসের মেয়ে সাসালডার সঙ্গে নাকি ওর ইয়ে ছিল? নিকাটোর সাসালডাকে ডাইনি ঘোষণা করতে চেয়েছিল বলে—! এ সব কি ঠিক কথা?

টালি।। আর কোনো কাজ নেই তোমাদের? এ সব কথা কেউ আলোচনা করে এখন? [এদিক-ওদিক দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে বলে]

১ম গ্রীক।। আরে এ সবই তো শোনা কথা। জানি না বলে জানতে চাইছিলাম তোমার কাছে। এত রেগে যাবার কী আছে?

টালি।। না আহ্লাদ করব! যাক গে, আমার সময় নেই। চললাম। [চলে যায়]

২য় গ্রীক।। জায়গামত লেগেছে।

১ম।। অ্যাঁ?

২য়।। নিকাটোরের চ্যালা ছিল তো। ওকে দিয়েই তো নিকাটোর সাসালডাকে ডাইনি ঘোষণা করিয়েছিল। সাসালডার নানা রোগ সম্পর্কে জ্ঞান এবং চিকিৎসা ওরও সহ্য হচ্ছিল না। ওর মন্দিরে চিকিৎসা মার খাচ্ছিল যে! আমি বলছি শোনো, এই জলাশয় বন্ধ, নিকাটোরের খুন, সাসালডাকে ডাইনি বলে জ্বালিয়ে মারার ফন্দি— এ সব জড়িয়ে। কিছু একটা পাকছেই পাকছে ভেতরে।

১ম।। কিন্তু একজন লুলাহি একজন গ্রীককে খুন করলে—

২য়।। ধ্যাত্তেরি লুলাহি আর গ্রীক! সবাই আমরা এখন রোমের জুতো চাটি। কি হবে এই নিয়ে ভেবে? এই যে পরিষদ নির্বাচন হল, এরা কি করল এসেই? কর বাড়িয়ে দিল না? আমরা নাকি গণতন্ত্র? পরিষদে পক্ষও ওরাই, বিপক্ষও ওরা! মাঝখান থেকে আমাদের গলায় পা দেবার লোক বাড়লো।

১ম।। আস্তে আস্তে! তুমি দেখছি মার্সেলাসের অনুগামীদের মত কথা বলছ! গ্রীক-কারিয়ান-লুলাহি ঐক্য না কী সব যেন! ছাতার মাথা! সর্বনাশ হয়ে যাবে রোমানরা শুনলে। ক্রুশে ঝুলিয়ে দেবে।

২য়।। শোনো বাপু, সত্যি কথাটা মাঝে মধ্যে বলা দরকার। অন্তত নিজেদের মধ্যেও। নইলে জিভের অভ্যাসই চলে যাবে। পয়সাওলা গ্রীক, পয়সাওলা রোমান তারা এক শিবিরে। তোমার আমার মত হাভাতে হাঘরেরা গ্রীক-কারিয়ান যাই হোক না কেন একই জায়গায়। ওদের লাথ খেয়েই বাঁচব বা মরব! এমন কী ঐ খুনী লুলাহিটাও। কাজেই গ্রীক-কারিয়ান ভাই ভাই কিম্বা গ্রীক মানেই আত্মার আত্মীয়, এ সব ন্যাকামিতে আমি নেই। ঐ নিকাটোর বেঁচে থাকতে তোমার অমন সরেস জমিটা স্রেফ জালিয়াতি করে নিজের নামে করে নিল। কি করতে পেরেছিলে? অমন হারামি বাঁচলে তোমার ভাল?

১ম।। তা অবশ্য ঠিক। জান, তারপরেও আবার আমাকে নিকাটোরের লোক এসে বলেছিল বিচার যেখানে হচ্ছে সেখানে গিয়ে যদি ওদের হয়ে হৈ হৈ করি তাহলে টাকা দেবে। আমি ইনিয়ে বিনিয়ে কাজের অজুহাত দিয়ে না করে দিয়েছি।

২য়।। বেশ করেছ। চারপাশে যা হচ্ছে ভাল হচ্ছে না।

১ম।। কী হবে বল তো?

২য়।। তুমিও যেখানে আমিও সেখানে। কী হবে কী করে জানব! স্রেফ দেখে যেতে হবে আপাতত!

[আলো নেভে]

*

ষষ্ঠ দৃশ্য

[ইম্ব্রাসিস কাঠের বোঝা নিয়ে এসে নামায়। বুড়ো থুরান একটা লাঠি নিয়ে ঝুঁকে বসে আছে। থুরানের পাশে বসে গিয়ে। ইম্ব্রা আসতে থুরানের ঘর থেকে বেরোয় ইফিজিয়া।]

ইফিজিয়া।। দুপুরে এখানেই খেয়ে যাবি!

ইম্ব্রা।। মন্দিরে—

ইফিজিয়া।। হ্যাঁ, তোর জন্য এডোনিস শুড্ডাটা থালা সাজিয়ে বসে থাকবে তো! বেশি বকিস না, যা বলছি শুনবি। দাদুর সঙ্গে কথা হয়ে গেলে স্নান করে আসিস সামনের ঝরনার থেকে।

ইম্ব্রা।। বেশ। আচ্ছা দাদু, সালামাকিসের জলাশয়ে এমন অভিশাপ কি সত্যিই ছিল?

থুরান।। হুঁ! এদ্দিনে তাই বুড়ো থুরানের কথা মনে পড়ল! নইলে তো তুই বড় পণ্ডিত হয়েছিস।

ইম্ব্রা।। জানই তো সব। তোমার কাছেই শেখা শুরু করেছি। মা যদ্দিন ছিল এখানে ছিলাম। তারপর মন্দিরে না ঠাঁই নিলে আমাকে শহরে টিকতে দিত? টেনে নিয়ে যেত গ্রামে! —আমার ওপর রাগ করছ তুমি?

থুরান।। রাগ না রে! মস্করা! [থুতনি নেড়ে দেয় ইম্ব্রার] – এমন অভিশাপের কথা একবার উঠেছিল অনেক আগে। রোমানরা তখনও হামাগুড়ি দিচ্ছে জগতে। গ্রীকরাই রাজা। তখন আসল সালমাকিসের ঝর্ণাটা ঢুকে যায় হালিকার্নেসস প্রাসাদে, ওরা সেখানে একটা পাথরের ফলকে লিখেছিল এক গল্প।

ইম্ব্রা।। কী গল্প?

থুরান।। হালিকার্নেসস ঐখানে হার্মাফ্রোডাইটকে লালন-পালন করেছেন। বাণিজ্য দেবতা হার্মেস আর সৌন্দর্যের দেবী আফ্রোদিতির সন্তান হার্মাফ্রোডাইট। তিনি বিবাহের আইন দিয়েছেন আমাদের।

ইম্ব্রা।। বিবাহের আইন? তাহলে সে মানুষটার শরীরে দুই লিঙ্গ একত্রে—? সেটা প্রধান না?

থুরান।। সে জন্যই দুই লিঙ্গের বিবাহ সম্পর্কে তিনি জানেন, হয়তো এমনই ভাবনা ছিল।

ইম্ব্রা।। এই যে সালমাকিস হ্রদটা— আচ্ছা, তুমি তো ঝরনা বলছ!

থুরান।। এই হ্রদটা ছিল। নাম ছিল না। আর আসলটা ছিল ঝরনা। সেটা প্রাসাদে ঢুকে যেতে, কিছুদিন পরে ওরাই হয়তো হ্রদটার নাম দিয়ে ছিল সালমাকিসের জলাশয়।

ইম্ব্রা।। তাহলে এখানে তো শাপ লাগারই কথা নয়! লাগলে তো ঐ ঝরনায়—! আচ্ছা, আমাদের হেরোডোটাস বা অন্য কেউ লেখেননি এ নিয়ে? কিম্বা এই যে শুনছি হার্মাফ্রোডাইট—! আচ্ছা, দাদু তুমি এই নিয়ে নাটকটা দেখেছ?

থুরান।। নাটক? কোথায় রে?

ইম্ব্রা।। এই তো কয়েকদিন ধরে ওরা শহরে-গ্রামে করে বেড়াচ্ছিল। হার্মাফ্রোডাইটকে নিয়ে নাটক। সেই যে নিম্ফ সালামাকিস আর…।

থুরান।। হা হা হা! এইবারে বুঝেছি। রোমানগুলো গ্রীক দাসদের দিয়ে নাটক করিয়ে করিয়ে নাট্যক্রীড়ার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। যাক গে! এই গল্পটা তো রোমানদের কবিরই বানানো গল্প।

ইম্ব্রা।। কে সে কবি?

থুরান।। ওভিদ ওভিদ।

ইম্ব্রা।। শুধু ওভিদ-ই লিখেছেন? আর কেউ লেখেননি কিছু এ নিয়ে?

[ইফিজিয়া ঢুকেছিল]

থুরান।। আছে তো! ভিত্রুভিয়াস, স্ট্রাবো অনেকেই লিখেছে। কিন্তু তোর মামলায় এ সব কি কাজে লাগবে? —আচ্ছা, লোকটা কি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছে?

ইম্ব্রা।। না না। কোনো কথাই তো বলছে না। ওদিকে বিচারক তো আমার উপর খাপ্পা। একটা লোকের জীবন-মরণ নিয়ে আমি নাকি ছেলেখেলা করছি!

ইফিজিয়া।। করছিস না?

ইম্ব্রা।। আরে, ও কিছু না বললে—

ইফিজিয়া।। নিয়েছিস কেন মামলা?

ইম্ব্রা।। ডিমোক্রিটাস বলল— ঝামেলা নেই। লোকটা এমনিতেই ফাঁসিতে ঝুলবে। আমাকে শুধু ওর হয়ে দাঁড়াতে হবে। ভাল টাকা পাব।

ইফিজিয়া।। টাকা? টাকাই সব? তোর বাপ তাহলে কি দোষ করল টাকা টাকা করে?

ইম্ব্রা।। কী করব-টা কী আমি? অ্যাঁ? বন্দী বলছে না সে খুন করেনি। ওরা হাতেনাতে ধরেছে ওকে—

ইফিজিয়া।। খুন হতে কেউ দেখেছিল?

ইম্ব্রা।। সেটা তো— হ্যাঁ, একজন দেখেছে।

ইফিজিয়া।। যে দেখেছে সে সত্যি বলছে তার প্রমাণ কী?

ইম্ব্রা।। মিথ্যে বলছে যে তারই বা প্রমাণ কী?

ইফিজিয়া।। দুটোরই কোনো প্রমাণ নেই যখন তাহলে তো সাক্ষীকে চেপে ধরাটা কাজ। অবশ্য কাজ আর করবি কখন! সারাদিন শুধু ভাববি এককোপে তুই বড়লোক হয়ে যাবি!

ইম্ব্রা।। অকারণে আমাকে কথা শোনাচ্ছিস।

ইফিজিয়া।। তাই? তুই জানিস যাকে খুনী বলা হচ্ছে সেই ছেলেটা কে?

ইম্ব্রা।। হ্যাঁ, পিহাজিটি।

ইফিজিয়া।। ওই নামটুকুই জানিস। কি করত সে?

ইম্ব্রা।। একসময় লেক্সাসের দাস ছিল, তারপরে পালিয়ে ছিল রোমান বন্দীত্ব থেকে। তখন কী করত জানি না! কেউ কেউ বলে চুরি করত।

ইফিজিয়া।। লেক্সাসের দাসত্ব থেকে অনেকদিন আগেই ওদের পরিবার মুক্তি পেয়েছে। লেক্সাসের পরিবারের হয়ে ওর বাবা যুদ্ধে গেছিল। লেক্সাস যায়নি। যুদ্ধ থেকে ফেরার পর লেক্সাসের বাবা পিহাজিটির বাবাকে মুক্তি দিয়েছিল নিয়ম মতে। ওরা শুধু ওখানে কাজ করে। দাস নয়। এটুকুও জানিস না। স্রেফ কটা তেলেন্তের জন্য—

ইম্ব্রা।। তেলেন্ত না হলে কারো চলবে? বাবার ধার তো আছেই। তারপরে আমাদের? সংসার হবে কোনোদিন? আমি তো আর শহরের অভিজাত নই, যে বাপের অগাধ অর্থ উড়িয়ে বেড়াব! কি গো দাদু, তুমি কিছু বলছ না কেন?

থুরান।। সক্রাতিস বলতেন, সেই ধনী যে স্বল্পে তৃপ্ত। কেন না তৃপ্তিই প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ।

ইম্ব্রা।। সক্রাতিসকে আমিও মানি, কিন্তু—

ইফিজিয়া।। কিন্তু ওভাবে বাঁচতে পারি না। আদর্শের জন্য হেমলক পান করার চাইতে, আদর্শ ছেড়ে দামি রোমান মদটা—

ইম্ব্রা।। যা কিছুই চাইছি, তা আমার একার জন্য চাইছি না। সবার জন্য চাইছি। অর্থ এলে আমাদের ঘরটুকু হবে। অর্থ এলে দাদুকে এফেসুসের গ্রন্থাগারে নিয়ে যেতে পারব। সব অর্থের উপর নির্ভরশীল। চলতে হলে—

ইফিজিয়া।। চলতে হলে তেলেন্ত লাগবে, না? তোর বাবা সম্পদ সম্পদ করে কেমন হালে আছে? অত সম্পদ থেকেও নিকাটোর মন পায়নি সাসালডার। সে মন নিয়েছিল পিহাজিটি। যার কিচ্ছু নেই।

ইম্ব্রা।। সাসালডা? মানে লেক্সাসের মেয়ে?

ইফিজিয়া।। হ্যাঁ।

ইম্ব্রা।। ওকে তো নিকাটোরই ডাইনি বলেছিল। তার উদ্যোগেই তো ওকে নির্বাসিত করার—

ইফিজিয়া।। এমন করে যদি বাকীটা জানার কষ্ট করতি— তাহলে খুন, খুনী আর খুন হয়ে যাওয়া লোকের সম্পর্কটা বুঝতেও পারতি হয়তো। কিন্তু অত সময় তোর কোথায়? বা ইচ্ছে! আর তোর যে ইচ্ছেটাই নেই, তাও পিহাজিটি বুঝেছে। আদালতে মক্কেলের জন্য জুরীও যখন ঠিক করিসনি, তখনই ও বুঝেছিল তুই-ও আসলে আর পাঁচটা গ্রীকের মতই লুলাহি বিদ্বেষী। ঘেণ্ণায় কথা বলেনি তোর সঙ্গে তাই।

ইম্ব্রা।। আমি বিদ্বেষী নই। কোনো ভাবেই নই।

ইফিজিয়া।। তোর কাজ সে কথা তো বলছে না।—যাক গে! খাবার বাড়ছি। স্নান করে চলে আয়। দাদু, তুমিও এসো।

*

সপ্তম দৃশ্য

[সিন্নার আলোচনা কক্ষ। ক্রোনাস, সিন্না, ক্রাসাস এবং স্পেক্টাস।]

স্পেক্টাস।। দাসদের নিয়ে জাহাজগুলো পৌঁছবে বসন্তের ঠিক মুখটায়। তার মধ্যে যদি খনির অঞ্চলটা আমরা ঠিক করে ফেলতে পারি—

সিন্না।। বালক আর যুবক সমান সমান অনুপাতে তো?

স্পেক্টাস।। হ্যাঁ মাননীয়। এই সব দাসেরা খনিতে কাজ করতে অসম্ভব দক্ষ!

সিন্না।। কতগুলো জাহাজ পাহারা দিয়ে আনবে?

স্পেক্টাস।। এইটা তো ঠিক করবেন মার্কোস নিজে। আমি এর কিছু জানি না মাননীয়।

সিন্না।। আসার পথে জলদস্যুদের হাতে লুঠ হয়ে গেল, আমরা দ্বিগুণ দাম দিয়ে তাদের থেকে আবার কিনলাম, এমনটা কিন্তু এখানে হয় না। দাস এসে নামবে এজিয়ান-এর বন্দরে। আমরা দাম দিয়ে দেব। যদিও দামটা খুব যে কম তা নয়! ভাবতে হবে আমাকে আরো।

স্পেক্টাস।। আমার ফেরার জাহাজ কিন্তু চারদিন পরেই।

সিন্না।। জানি। এখন তুমি এসো। সময় মত সব জানিয়ে দেওয়া হবে। [স্পেক্টাস অভিবাদন জানিয়ে বেরিয়ে যায়] আচ্ছা ক্রাসাস, স্থপতি নেরো কি বলছেন?

ক্রাসাস।। জলাশয়ের জল পাহাড়ে তোলার ব্যবস্থা করতে— ঠিকঠাক মজুর পেলে— তাঁর তিন মাস লাগবে।

সিন্না।। তিন মাস? না না! অসম্ভব!

ক্রাসাস।। সামনেই বর্ষা আসবে এখানে সিন্না।

সিন্না।। সে জন্যই এ কাজ একমাসের মধ্যে হওয়া দরকার।

ক্রাসাস।। হাতে যে পরিমাণ দাস থাকবে—

সিন্না।। দাস— দাস— তেমন হলে আমরা এখানকার অধিবাসীদের—

ক্রাসাস।। কিন্তু এ বিচারের আগে যদি আমরা এই অঞ্চলের লোকদের শ্রমিক করি—

সিন্না।। নাহ ক্রাসাস। বিচারের আগে সম্ভব নয়। কিন্তু বারেবারে সমুদ্র পার হয়ে দাস আনা, তাদের দেখভাল— অনেক খরচ। তার চেয়ে—! সোনার খনি বানাতে গেলে নুনঘাম কাউকে না কাউকে ঝরাতেই হবে।

ক্রোনাস।। মাননীয় সিন্না, আপনি যে কাজ ধরবেন, তাতে সোনা ছাড়া আর কিছুই ফলতে পারে না।

সিন্না।। ক্রোনাস, পুরোহিত ক্রোনাস, দেবতা মার্সের মন্দিরের তেল ফুরোয় না। তাই তোমার তেলও কখনো ফুরোয় না। [সবাই হাসে]

ক্রোনাস।। কিন্তু বিচারটা দ্রুত ফুরোনো দরকার যে! বিচারের জন্য কাজটা আটকে—

সিন্না।। কাজ আমরা শুরু করে দেব। আটকাবে কেন?

ক্রোনাস।। বিচারের পাশাপাশিই?

সিন্না।। আহ, বিচারটাকে একটা একটা প্রদর্শনী বানাতে চাই আমি। কেন বুঝছ না? যতক্ষণ না জলাশয় থেকে জল পাহাড়ের মাথায় তোলার ব্যবস্থা হচ্ছে—! তার ফাঁকে বিচার চলুক। বিচার গণতন্ত্র দেখাবে, সোনা উন্নতির স্বপ্ন। ক্রোনাস ক্রোনাস, স্বপ্নই একমাত্র অস্ত্র ছাড়া ব্যবস্থাকে চালাতে পারে। অস্ত্রের ব্যয়—

ক্রোনাস।। কিন্তু খনি যে হবেই তার ঘোষণা তো হয়নি এখনো।

সিন্না।। তবু কেমন করে যেন সবাই জেনে গেছে! [চোখ টেপে] এই জেনে যেতে দেওয়াটাই হল রাজনীতি। গ্রীকরা ভাবছে আমাদের সঙ্গে থাকলেই ওদের আরো সুবিধে হবে। চাইছে, তেমন হলে লুলাহিগুলোকে দাস করে দিই আমরা। দরকার হলে কারিয়ানদেরও। কারিয়ানগুলো যতই নিজেদের গ্রীক ভাবুক, গ্রীকরা তো ভাবে না। গ্রীক-কারিয়ান মৈত্রী শেষ। কারিয়ানরা ভাবছে লুলাহিগুলোকে এমনিই তো মরবে, মরুক। গ্রীকদের চেয়েও বেশী কেমন করে আমাদের কাছে আসা যায় সে চেষ্টাই করছে তারা!

ক্রোনাস।। সক্কলেই তো আর এমনটাই ভাবছে না সিন্না!

সিন্না।। সক্কলকে লাগবে না, ওদের মাথাগুলোকে পেলেই হবে। যার আছে সে আরো বাড়াতে চায়। এই হচ্ছে জগতের নিয়ম। যাদের আছে তাদের শুধু উস্কে দিলেই বাকীরা কুকুরের মতন তাদের পেছনে পেছনে—! রোম এখন বিশাল, বি-শা-ল! সৈন্য দিয়ে শুধু রোম ধরে রাখা সম্ভব নয়। তার অনেক খরচ। এ ভাবে চললে রোম রক্তবমি করে মরবে ক্রোনাস। তার চেয়ে গ্রীক-কারিয়ান-লুলাহিদের মধ্যে লাগিয়ে রাখতে পারলে খরচ অনেক কম। কাজও হাসিল হয়ে যাবে।

ক্রোনাস।। আমার একটাই ভয় সিন্না, আবারো লাল নদীর মতন না হয়ে যায় বিষয়টা। ওরা যদি ভুল করেও আবার ঐক্যবদ্ধ হয়—

সিন্না।। মার্সেলাস?

ক্রোনাস।। আমি জানি সে এখানে নেই। কিন্তু পাশের সিথিয়াতে তারা সক্রিয়। সীমান্ত পার হয়ে এখনো আসে-যায়, তাও জানি। সেবারে আমাদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছিল গ্রীক-কারিয়ান ঐক্য করে। এডোনিস, ঐ এডোনিস পেছন থেকে ওদেরই সহায়তা করেছিল। আমি ওকেও বিশ্বাস করি না।

সিন্না।। এবারে কাউকে এদিকে আসতে দেখেছ ক্রাসাস? বা এমন খবর—?

ক্রাসাস।। পশ্চিম আনাতোলিয়াতে আনাগোনা চলছে। এদিকেও এসেছে কয়েক রাত্রে।

সিন্না।। এ নিয়ে কিছু শুনেছ? বিচার নিয়ে?

ক্রাসাস।। এখনো না।

সিন্না।। বেশ ক্রোনাস। তোমার কথাটা মাথায় রাখলাম। কিন্তু বিচারটা দেখার মত তামাশা হতেই হবে। লুলাহিটাকে এমন ভাবে ক্রুশে ঝোলাতে হবে যাতে কারিয়ান আর গ্রীকদের মনে হয় রোম তাদের পক্ষেই সব সময়। তারা জান দিয়ে রোমকে রক্ষা করবে তখন।

ক্রাসাস।। খনি উদ্বোধনের সময়ও তো এসে গেল। এর মধ্যে যদি বিচার সম্পূর্ণ না হয়—

ক্রোনাস।। শুধু খনি? গোটা নির্বাচনটাই বন্ধ হয়ে গেছে। নির্বাচন না হলে আমার ঐ অতটা জমি—

ক্রাসাস।। আপনার জমি তো সিন্নাই করে দিতে পারবেন।

ক্রোনাস।। তিনি অনুমতি দিতে পারবেন। কিন্তু দখল? রোমান সৈন্য নিয়ে যদি জমি দখলে যাই—! এমনিই আমাকে রোমের চামচা বলে পেছনে। না না। তার চেয়ে পরিষদ এলে তারা যদি অনুমতি দেয় তাহলে ঝামেলা কম হবে। না হলে—

সিন্না। জমিগুলোর কি হবে তাই তো?

ক্রোনাস।। না মানে—

সিন্না।। রোমের অলিভ ক্ষেত থেকে যা কামাচ্ছেন তাতেই তো আমাদের মতন সেনেটর পুষে রাখতে পারবেন দিব্য। তাতেও এত চিন্তা?

ক্রোনাস।। আসলে মাননীয় সিন্না—

সিন্না।। খনির জন্য বসতি হবে। সেখানে পৌঁছোনোর জন্য যে রাস্তা হবে তার চল্লিশ শতাংশ জমি আপনি এবং নিকাটোর মিলে কিনেছিলেন। সে সময় আমাকে বলেছিলেন কি?

ক্রোনাস।। আমি জানতাম নিকাটোর আপনাকে—

সিন্না।। না। ভেবেছিলেন পরিষদে নিকাটোর নির্বাচিত হবে। তাহলে আমাকে আগে জানানোর দরকারই নেই। জানালে যদি এর থেকে বখরা চাই? নিকাটোর তো মরে গেছে। এবারে?  [হেসে বলে সিন্না] একটা খুন হয়েছে ক্রোনাস! এলেবেলে খুন না। একজন সম্ভাব্য পারিষদ খুন হয়েছেন। রোমের একজন গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু। মানে বোঝেন এর? —এ আপনাদের দেব-দেবীর মন্দির না, যেখানে স্রেফ ভয়ে বা ভক্তিতে সব মেনে মেনে চলে লোক। আমরা রাজনীতির লোক। একে অবহেলা করতে পারি না। নইলে এ নিয়ে বিক্ষোভ-বিদ্রোহ হলে রোম চিন্তিত হয়ে পড়বে।

ক্রাসাস।। বিচারে কি লুলাহিটাকে ক্রুশে ঝোলানো যাবে? কাটো যা একগুঁয়ে বিচারক। ওকে এ বিচারের ভার যে কেন দিলে? আর এই সব গণতন্ত্র গণতন্ত্র খেলেই বা কী হবে? যাদের স্বাধীনতা রোমের উপর নির্ভরশীল তাদের স্বাধীনতার দাম কি? এর চেয়ে সরাসরি যা করতে চাই করলেই তো হল! রোমের বিরুদ্ধে কে মাথা তুলে দাঁড়াবে? দাঁড়ালে সে মাথা গুঁড়িয়ে দিতে—

সিন্না।। ক্রাসাস ক্রাসাস, আবারও ভুল করছ। মহান অগাস্টাস চাইছেন সাম্রাজ্যের ব্যায় কমাতে। তার জন্য চাই শাসিতের আস্থা। রোম তো এই দেশটা দখল করেনি। প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে মাত্র। এ দেশটাও অন্য সব রোমান প্রদেশের মতই স্বাধীন। কাজেই লোকটাকে ধরলাম, ঝুলিয়ে দিলাম, হয়ে গেল? অজস্র প্রশ্ন থাকবে অন্য লোকেদের মধ্যে। সে সবের উত্তর না পেলে একদিন এখানেই বিষ্ফোরণ হবে না কে বলতে পারে? গণতন্ত্রের কাজ হল—! থাক গে! মাথা ঠাণ্ডা করে কাজটা কর। সোনার স্বপ্ন মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পারলে একবার— ! বাদ বাকির জন্য আমি তো আছি! [হাসে] আচ্ছা, আপাতত বিদায় নিচ্ছি। আজকে ঘোড়ার চালান আসবে।

[চলে যায় সিন্না। ক্রাসাস আর ক্রোনাস।]

ক্রাসাস।। সিন্না যাই বলুক, রোমান হয়ে এত কিন্তু কিন্তু করে সাম্রাজ্য চালাতে দেখলে আমার বড্ড অস্বস্তি হয়! এ সব বিচারের ভড়ং—! আসলে রোমান সাম্রাজ্যের সীমান্ত সামলাই আমরা। এই যে হাজারো নতুন জাতি রোমের শাসনে আসে তাদের সামলাই আমরা। আমরা জানি, রোমকে পারলেই এরা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে চায়। একমাত্র ভয় পায় আমাদের লোহার হাতকে। এ সব সিন্না বুঝবে না। সেনেটর হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধে কখনো তো যায়নি। রোমে গুন্ডা লাগিয়ে শুধু নির্বাচন জিতেছে। বুঝবে না!

ক্রোনাস।। ভয় হচ্ছে যদি বিচারে কিছু গোলমাল হয়—

ক্রাসাস।। সিন্না কী করবে জানি না! আমি জানি আমি কী করব!

[আলো নেভে]

*

অষ্টম দৃশ্য

[বিচারালয়। যেমন ছিল তেমনই। শুধু সাক্ষী একজন দাঁড়িয়ে। নাম বারাক। প্রশ্ন করছে ডেমোক্রিটাস।]

ডেমো।। তাহলে আর্ত-চিৎকারটা হতেই আপনি দৌড়ে এসে দরজা খুললেন, বেরোলেন বাড়ি থেকে, বেরিয়েই দেখলেন এই খুনী—

ইম্ব্রা।। প্রমাণিত হয়নি ইনি খুনী।

কাটো।। ঠিক।

ডেমো।। আচ্ছা! এই পিহাজিটি, যে নিজে স্বীকার করেছে সে খুন করেছে—

ইম্ব্রা।। কয়েদখানায় স্বীকারোক্তি নেবার অনেক রাস্তা। আদালত তাকে মান্য করবেনই এমন কিছু নেই কিন্তু।

কাটো।। আপাতত মান্য করছি না।

ডেমো।। এই পিহাজিটি ঐখান থেকে পালাচ্ছিল। গলির অন্য মুখে সে প্রায়! তখন আপনার চিৎকারে সে একবার ঘুরে দাঁড়ায়ও পালাতে গিয়ে, তাই তো?

বারাক।। আজ্ঞে হ্যাঁ। তখন তাকে স্পষ্ট করে দেখি।

ডেমো।। তারপর?

বারাক।। তারপর আরো কয়েকজন বেরোতেই ধাওয়া করি তাকে আমরা। হয়তো পালিয়েই যেত। কিন্তু ওর দুর্ভাগ্য যে উল্টোদিকে আসছিল রোমান সেঞ্চুরিয়ানদের টহলদারী একটি দল। তারা তাকে ধরে ফেলে।

ডেমো।। মাননীয় বিচারপতি ও জুরিগণ এই সাক্ষী বারাককে আমার আর কোনো প্রশ্ন করার নেই।

কাটো।। বিবাদী উকিল কোনো প্রশ্ন করতে ইচ্ছুক?

[ইম্ব্রাসিস হেঁটে সাক্ষীর থেকে বেশ কিছুটা দূরে সরে যাবে। সেখানে দাঁড়িয়ে গলা পাল্টিয়ে একটু নীচু গলায় বলবে—]

ইম্ব্রা।। আজ সকালে কি খেয়েছিলেন? [বারাক নিস্তব্ধ] আজ ভেড়াগুলোকে কে চড়াতে নিয়ে গেছে? [বারাক চুপ]

কাটো।। কি হল? প্রশ্নের উত্তর নেই কেন?

বারাক।। আজ্ঞে?

কাটো।। বিবাদীপক্ষের উকিলের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন না কেন?

বারাক।। কোথায়? কই? আমি তো—

কাটো।। আমি তো— মানে?

বারাক।। উনি? কোথায় প্রশ্ন করলেন?

ইম্ব্রা।। [আবার ওখান থেকেই প্রশ্ন করে] কীভাবে এলেন আজ আদালতে? [শুনতে পায় না বারাক, দেখতেও পায় না। এবারে ইম্ব্রা চিৎকার করে খানিক।] কীভাবে এলেন আজ আদালতে? [শুনতে পায় বারাক]

বারাক।। উকিল মশাই?

ইম্ব্রা।। না। আমি পেয়াদা বলছি! উকিল মশাই খেতে গিয়েছেন! [সামান্য গলা পাল্টে বলে]

বারাক।। পেয়াদা?

ইম্ব্রা।। [ডেমো কিছু বলতে যায়, কাটো এবং ইম্ব্রা তাকে হাত তুলে থামায়] হ্যাঁ, এই আদালতে পেয়াদারও প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।

বারাক।। ওহ আচ্ছা! তা এই ধরুন গে, আমি তো আজকে ডুলিতে চড়ে এসেছি। পায়ে হেঁটে এদ্দূর আসা তো আমার পক্ষে সম্ভব নয়! ওঁরা বললেন ডুলিতে নিয়ে যাবেন, আমিও ভাবলাম জীবনে কখনো চড়িনি ডুলি—

ইম্ব্রা।। মাননীয় কাটো, দেখতেই পাচ্ছেন, এই কয়েক পা দূরত্বে আমি দাঁড়াতে, আমাকে সাক্ষী দেখতে পাচ্ছেন না স্পষ্ট। শুনতেও পাচ্ছেন না। মাননীয় জুরীগণ, ইনি হেঁটে আসতে পারেন না আদালতে, অথচ দ্রুত দরজা খুলে খুন হতে দেখতে পারেন। এঁর শোবার ঘর থেকে বাড়ির দরজার দূরত্বই প্রায় দশ পা অন্তত। আর্ত-চিৎকার হতেই ইনি তাই এসে দরজা খুলে ফেলতে পারেন না। অর্থাৎ খুন হবার সময় ইনি দেখেননি খুনটা। তারপর এই পায়ের অবস্থা নিয়ে খুনীকে ধাওয়া করার তো প্রশ্নই নেই। ইনি কানে শুনতে পারেন না ভাল, চোখে দেখতে পারেন না, কিন্তু খুনী যখন প্রায় গলির অন্য মুখে, যে গলি অন্তত এই আদালতের তিনগুণ লম্বা, সেখানে দেখে চিনে নিতে পারেন খুনীকে? এর চেয়ে বিচার-টিচার না করে আমার মক্কেলকে এমনিই ক্রুশে ঝুলিয়ে দিলে ভাল হত না? —এই সাক্ষীকে আমার আর কোনো প্রশ্ন করার নেই।

কাটো।। [চারপাশে গুঞ্জনের মধ্যে] আজকের মত আদালত এখানে মুলতুবি হল!

[একে একে সবাই চলে যায়। ইম্ব্রা থাকে। আর ইফিজিয়া ভীড় থেকে আলাদা হয়ে আসে তার কাছে।]

ইফিজিয়া।। তাহলে সময় দিলে পৃথিবীতে কত কিছু দেখতে পাওয়া যায়, জানতে পারা যায় বুঝলি?

ইম্ব্রা।। [হাসে] সবচেয়ে দেখার বিষয় ছিল ডেমোক্রিটাসের আমার দিকে চাওয়াটা। এই এক্ষুণি যাবার সময় যেমন করে চেয়ে গেল—! হা হা—

ইফিজিয়া।। ভেবেছিল উল্টোদিকে তোকে দাঁড় করিয়ে জিতে চলে যাবে।

ইম্ব্রা।। যাক, তাহলে সক্রাতিসের রক্ত আমার মধ্যেও আছে তো?

[হাসে ইফিজিয়া। আলো নেভে।]

*

নবম দৃশ্য 

[সিন্নার মন্ত্রণাকক্ষ। সিন্না পায়চারি করছে দ্রুত পায়ে। থামে হঠাৎ। বলে—]

সিন্না।। সাক্ষী জোগাড় করেছ, তার সম্পর্কে জানও না যে সে প্রায়ান্ধ? আগে দেখনি বুঝলাম— তাকে ধরে ধরে আনছে কাঠগড়াতে, দেখেও বোঝোনি?

ক্রাসাস।। সিন্না, ভেবেছিলাম বয়স হয়েছে বলে—

সিন্না।। তুমি ডেমোক্রিটাস? তুমি তো বিরাট উকিল! তুমি কেন ভাল করে যাচিয়ে দেখনি লোকটা প্রায়ান্ধ? একটা শিশুকে নিজের বিরুদ্ধে দাঁড় করাবার ব্যবস্থা করলে, তাতেও এই হাল? নিজেই বলেছিলে ও শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হারবে। সেই শিশু তোমাকে—! টাকার কথা বলনি ওকে?

ডেমোক্রিটাস।। আজ্ঞে বলেছিলাম। ও রাজি-ও ছিল। কিন্তু তারপর এই কাটো যা করলেন—

সিন্না।। নাককাটা গেল আমার! ছি ছি! কাটো যা মজা পাচ্ছে—

ডেমোক্রিটাস।। কাটোই আসলে মামলাটাকে টানার দিকে যাচ্ছেন। আপনার কথামতন আমিও ভেবেছিলাম গোটা মামলাটাই সহজে সেরে ফেলা যাবে। এ ছেলে যে আচমকাই বিগড়ে যাবে বুঝিনি। তবে মাননীয় সিন্না এবং মাননীয় ক্রাসাস যে মামলায় জড়িয়ে সেখানে এমন একের পর এক অঘটন—

সিন্না।। ঘটলে চলবে না। সব দরজার চাবি থাকে। এই ছোকরার চাবিটা আমার চাই। চাই-ই চাই। ছোকরা এডোনিসের কাছে পাঠ নিত না? আফ্রোদিতির মন্দিরে পুরোহিত?

ডেমোক্রিটাস।। আজ্ঞে হ্যাঁ!

সিন্না।। ডাকো এডোনিসকে।

ক্রাসাস।। ওই ছোকরা উকিলের বাপের নাম স্ট্রেপসিয়াডেস। ধারে ডুবে আছে বলে ছেলেকে উকিল করতে পাঠিয়েছিল।

সিন্না।। ক্রাসাস ক্রাসাস, অবশেষে কাজের মত কাজ কিছু করলে তুমি।

ক্রাসাস।। আরো কাজ করতে পারি। তোমার এই বিচার বিচার খেলাটা যদি বাদ দাও, একদিনে ঠাণ্ডা করে দেব সব।

সিন্না।। মাথা ক্রাসাস মাথা। এখনও পেশীশক্তির সময় আসেনি, পেশীশক্তির সময় এখন নয়।

[এই অংশের আলো কমে, মঞ্চের অন্য অংশে অভিনয় শুরু হয়। সেখানে বুড়ো থুরান আর ইম্ব্রাসিস। ইফিজিয়া বসে আছে।]

থুরান।। ভিত্রুভিয়াস বলেছিলেন ওভিদের গল্পটা আসলে গুজব মাত্র। সালমাকিসের জলাশয়ে কেউ স্নান করলে বা সে জল পান করলে তাকে হার্মাফ্রোডিটাসের মতন হয়ে যেতে হবে, এমন মোটেও না। বরং তিনি আমার ছেলেবেলায় শোনা গল্পটাই বলেছেন।

ইম্ব্রা।। কী গল্প?

থুরান।। অনেককাল আগে গ্রীকরা, মানে আমরা— যখন এখানে আসি, তখন এখানে থাকত কারিয়ান আর লিসিয়ানরা। লিসিয়ান মানে—

ইম্ব্রা।। কেউ কেউ বলে লুলাহিরাই লিসিয়ান!

থুরান।। হ্যাঁ। তাদের নগর থেকে উৎখাত করি আমরা। তারা চলে যায় জঙ্গলে-পাহাড়ে। সেখান থেকে দস্যুবৃত্তি চালিয়ে যেতে থাকে।

ইম্ব্রা।। এখন যেমন কিছু গ্রীক এবং লুলাহিরা চালায়।

থুরান।। অবশ্য দস্যুবৃত্তি বলতাম আমরা, গ্রীকরা। তাদের কাছে ছিল প্রতিশোধ। গ্রীকদের থেকে লুট করার জন্য মাঝেমধ্যেই হামলা চালাত। এমন সময় সালমাকিসের জলাশয়ের কাছে একজন গ্রীক একটি বিপণী খোলে।

ইম্ব্রা।। বিপণী? বিপণী কেন?

থুরান।। যাতে নগরের গ্রীকরা ওখানে আরো প্রাকৃতিক পরিবেশে চড়ুইভাতি এবং ফুর্তি দুই-ই করতে আসতে পারে।

ইম্ব্রা।। মানে জলাশয় বন্ধ হবার আগে অবধি যেমন বিপণী অগাস্টা চালাত? নানা আকর্ষণীয় দেশীয় শিল্প সামগ্রীর দোকান? সঙ্গে মদ আর খাবারেরও ব্যবস্থা?

থুরান।। হ্যাঁ। জমে উঠল দোকান। জমলো ফূর্তিও। পাহাড়-জঙ্গলের গোপন আস্তানা থেকে কারিয়ান আর লুলাহিরাও দেখত সে কাণ্ড-কারখানা। আকৃষ্ট হত। এই চলতে চলতে ওদের এক-আধজন এসেও পড়তে লাগল সেই দোকানে। প্রথমে গোপনে। তারপর প্রকাশ্যে।

ইম্ব্রা।। গ্রীকরা, মানে আমরা তাদের তখন ধরতাম না? বন্দী করতাম না?

থুরান।। না। যারা শাসন করত তারা বুদ্ধিমান ছিল। ঝকঝকে চকচকে জিনিস যখন এদের আকর্ষণ করছে। তার মানে এরা আস্তে আস্তে তাঁবে আসবে তারা বুঝেছিল। হলও তাই। ঐ দোকান, বাণিজ্য, গ্রীকদের আনন্দের ধরন-ধারণ সবটাই তাদের গ্রাস করে নিল। তারা হেলেনীয় গ্রীকে পরিণত হল। ভিত্রুভিয়াস বলছেন, এই হল আসলে খেলাটা। একদল যোদ্ধা জনজাতিকে নারীর মতন কোমল করে দেওয়ার পদ্ধতি।

ইফিজিয়া।। নারীর মতন কোমল কথাটায় আমার আপত্তি আছে। নারী কোমল, অবলা এই সব বড্ড বাজে কথা!

থুরান।। ঠিক ঠিক!

ইম্ব্রাসিস।। জানতাম তুই বলবিই! হা হা!

ইফিজিয়া।। কেন? ভুল বলেছি?

ইম্ব্রা।। না! একদম ঠিক কথা। ভিত্রুভিয়াস তো তোকে দেখেনি কখনো—

ইফিজিয়া।। অথবা ভিত্রুভিয়াসের মতন তোরাও সব তো পুরুষ। তাই নারীকে নিয়ে এ সব আমোদ বেশ লাগে!

ইম্ব্রা।। আরে ভিত্রুভিয়াস হল গে রোমান। তাই ওই সব বলেছে। আমরা জানি নারীর মূল্য! তার শক্তি! তাই না দাদু?

ইফিজিয়া।। তাই তোদের মহান আথেন্সেও নারীদের একা একা বাড়ি থেকে বেরোনো, স্বৈরিণী না হলে, নিষিদ্ধ ছিল?

ইম্ব্রা।। এই রে! মজা করছিলাম একটু। জানি রেগে যাবি! আচ্ছা বাবা ঘাট হয়েছে আমার!

ইফিজিয়া।। এগুলোতে কেন মজা পাস তোরা সেটাই ভাবি!

ইম্ব্রা।। আচ্ছা আচ্ছা বাবা! আর করব না। খুবই অনুচিত কাজ হয়েছে। এই দেখ, এই মামলায় তুই-ই তো আমাকে শক্ত করে দাঁড় করালি। নইলে তো —!

ইফিজিয়া।। একটু বেশিই সহজে মেনে নিচ্ছিস না?

থুরান।। মেনে নিতে পারলে মানানোটা সহজ হয়!

[সবাই হাসে খানিক]

ইম্ব্রা।। আচ্ছা, গ্রীকরা কেউ এ কথা লেখেনি?

থুরান।। না। নিজেদের কৌশল কে চায় অন্যকে জানাতে? বিশেষ করে সেই জানা যদি অধীনস্থদের মধ্যে বিক্ষোভ সৃষ্টি করে?

ইম্ব্রাসিস।। এই যদি বিষয় হয় তাহলে সে বিষয় আমাকে ওরা আদালতে তুলতে দেবে? তাছাড়া আরেকটাও কথা আছে। গ্রীকদের এই কৌশল রোমানরা ব্যবহার করছে কেন?

থুরান।। অতবড় জলাশয়ের জল সঞ্চয় শুধুমাত্র খাবার জন্য হতে পারে না। অনেক জলাশয় আছে লিসিয়া থেকে কারিয়ার মধ্যে। তাছাড়া সালমাকিসের ঝর্ণা আছে প্রাসাদের জন্য।

ইম্ব্রা।। তাহলে কেন করছে এমন?

থুরান।। একটাই হতে পারে কারণ। বহুকাল ধরে কানাকানি আছে পাহাড়ে কন্দরে আছে সোনা। কখনো সখনো পাহাড়ের ঝরণাতে কেউ পেয়েওছে শুনেছি। যদি সত্যি সোনা থেকে থাকে, বা কেউ ভাবে আছে, তাহলে খনি হবে। এবারে তেমন কানাকানি শুনছি। তুই শুনিসনি?

ইম্ব্রা।। এই রে! হ্যাঁ শুনেছি তো! কিন্তু সে যে ওখানেই—! যাত্তেরিকা!

থুরান।। রোমানরা খনি থেকে সোনা তোলার জন্য বিপুল জলের শক্তি ব্যবহার করে। জানিস তো?

ইম্ব্রা।। হ্যাঁ, তা জেনেছি। আনাতোলিয়াতে তাহলে এখানেই খনি করবে? সত্যিই যদি এমন হয়ে থাকে—! তাহলে তো ভীষণ বিপদ। এ তো আমার একার পক্ষে—

থুরান।। মার্সেলাসের লোকজনকে বল।

ইম্ব্রা।। ওদের থেকে খানিক দূরত্ব রাখতে চাই আমি। একবার যদি ক্রাসাস বা সিন্না জানতে পারে—! পিহাজিটিকে বাঁচানোর আর—।

ইফিজিয়া।। আমি যদি যাই?

ইম্ব্রা।। কোথায়?

ইফি।। মেনেজেস এখন কারিয়াতেই ঘুরপাক খাচ্ছে। আমি জানি। মার্সেলাস ওকে পাঠিয়েছে এখানে আবার গ্রীক-কারিয়ান আর লুলাহিদের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে।

ইম্ব্রা।। খুব সাবধানে।

ইফি।। সে তোকে বলতে হবে না পাকা! আমাকে সাবধানতা শেখাচ্ছে! খেয়ে যাস। [বেরিয়ে যায়]

ইম্ব্রা।। কিন্তু লিখিত প্রমাণ পাব কোথায় দাদু? এফেসুসের গ্রন্থাগার ছাড়া এ সব লেখা—! আচ্ছা, কাটোর কাছে যদি যাই?

থুরান।। সে কি দেবে? সেও তো রোমান!

ইম্ব্রা।। শুনেছি কাটো সিন্নাকে পছন্দই করেন না। তিনি মনে করেন রোমান গণতন্ত্রের পতনের মূলে এই দুর্নীতিগ্রস্ত সেনেটররা আছে। বংশ পরম্পরায় আছে। এদের তিনি যে কোনো মূল্যে দমনের পক্ষপাতি।

থুরান।। দেখ চেয়ে! বিষে বিষে যদি বিষক্ষয় হয়!

[এডোনিস এসে গিয়েছে সিন্নার ওখানে। ক্রাসাস আছে। সেখানে অভিনয় শুরু হয় এই অঞ্চলে বন্ধ হয়ে।]

সিন্না।। এডোনিস, এখন তোমাকেই রাস্তা বের করতে হবে। তোমার ঐ শিশু – ইম্ব্রাসিস – এত জোর ছোবল মারল কেমন করে?

এডো।। এই শিশুটি বহুকাল ধরে সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল পড়ছে। পড়াচ্ছে। যুক্তি এবং অলঙ্কারশাস্ত্রে যথেষ্ট দখল আছে এর।

সিন্না।। হুঁ? ইচ্ছে করেই বোধহয় বলনি আমাকে?

এডো।। আপনি হুকুম করেছিলেন, ডেমোক্রিটাস জোর করেছিল, কেউ জানতে চাননি তো! হুকুম শিরোধার্য করেছি।

সিন্না।। ঠিক ঠিক। তাহলে এখন আরেকটা হুকুম করছি, তোমার ওই কুকুরটাকে চিৎকার করতে দিও না আর! কেমন! ওর গলার শেকলটা একেবারে এঁটে ধর।

এডো।। ইস্‌! যদি আরেকটু আগে হুকুমটা পেতাম—

সিন্না।। এখন কীসের দেরি?

এডো।। মন্দিরে পুঁথি নকলের কাজটা যে ও ছেড়ে দিয়েছে মাননীয়! একসঙ্গে মামলা আর মন্দিরের কাজ সামলাতে পারছিল না বলে—

সিন্না।। তাহলে? সে এখন কোথায়?

এডো।। আজ্ঞে ঠিক জানি না! তবে শুনেছি গ্রামের দিকেই বেশি—

সিন্না।। আচ্ছা তোমার কি মনে হয়, মার্সেলাসরা রয়েছে এর পিছনে?

এডো।। মনে হয় না। এ ছেলে খুব বিদ্রোহ করবে এমন না! তবে শুনছি, কাটো তাকে এই মামলা শেষ হলে সম্ভবত রোমেই নিয়ে যাবেন। সেখানে কী সব লেখালিখি— সে আমি ভাল জানি না।

সিন্না।। আশা করি, এ সবের পেছনের মাথাটা তুমি নও এডোনিস!

এডো।। আজ্ঞে আমার মাথা নিয়ে বিস্তারিত মাথা-ব্যথা আছে মাননীয়। এখানে আমি নিমিত্ত মাত্র।

সিন্না।। হুঁ! বেশ, তুমি আসতে পার এখন। [চলে যায় এডোনিস। ক্রাসাসকে সিন্না বলে—] ওর বাপটা এসেছে? [ক্রাসাস মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে।] বেশ, তাহলে ওকে ডাক। সবাই নিমিত্ত হলে চলে না। এডোনিসকেও বোঝাবো। তার আগে একে বোঝাই।

[এখানে আলো বন্ধ হয়ে, মঞ্চের অন্য অংশে যাবে। সেখানে ইম্ব্রা কাটোর মুখোমুখি।]

কাটো।। তোমার কেন মনে হল আমার কাছে থাকতে পারে ভিত্রুভিয়াসের লেখা?

ইম্ব্রা।। আপনার জ্ঞানের খ্যাতি আপনার আগেই আমাদের এ অঞ্চলে—

কাটো।। থাক থাক। আচ্ছা, এই সব পুঁথি আমি তোমাকে দিতে পারি এ কথা ভাবলে কেন? আমি এই মামলার বিচারক। এটি একটি প্রমাণ। সে তোমাকে আমি তুলে দিলে পক্ষপাত হয়ে যায় না?

ইম্ব্রা।। এফেসুসের গ্রন্থাগারে এখন আর আমাদের বিশেষ অধিকার নেই। যদিও গ্রীকরাই বানিয়েছিল গ্রন্থাগার। আর একদা সেই শহরেই জন্মেছিলেন হেরাক্লিটেস।  অথচ কারিয়ান বা লুলাহি তো দূরের কথা, গ্রীকরাও ওখানে ভাল করে জায়গা পায় না। নানা অজুহাতে তাদের সে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। পক্ষপাত নয় মাননীয়?

কাটো।। যে রাস্তা উপরে যায়, সে নীচেও যায়। হেরাক্লিটেস বলেছিলেন। আহা আহা! সবই বিপরীতের সমন্বয়। এক নদীতে দু’বার স্নান করা যায় না। আহা আহা! [ইম্ব্রা চুপ থাকে।] আমার কাটো পদবিটাও কি এখান থেকে এসেছে? তুমি বলতে পারবে?

ইম্ব্রা।। আজ্ঞে আমি জানি না।

কাটো।। অথচ একই জায়গা কতজনের অধিকারে আসে। এই যে এফেসুসের কথা বলছ, একদিন অ্যামাজনের যোদ্ধা নারীরা নাকি শাসন করত এ অঞ্চল! তারপর লেলেজিয়ান মানে লুলাহিরা। তাই তো? তারপরে কারিয়ানরা। আয়োনিয়ানরাও এল। এই হেরাক্লিটাস যখন জন্মালেন এ ছিল পার্থিয়ার মধ্যে। আজ এ রোমান। এ সব সম্পর্কে বেঁচে থাকলে কি বলতেন বলতো হেরাক্লিটাস?

ইম্ব্রা।। পৃথিবীর কোথাও কেউ-ই চিরকাল থাকবে এমন কোনো কথা নেই। পৃথিবীর কোনো অংশ চিরকাল কারোর হয়েই থাকবে এমনও কোনো কথা নেই। কারণ মানুষ পরিযায়ী এবং পৃথিবী পরিবর্তনশীল।

কাটো।। বেশ বলেছ। বেশ। কিন্তু পক্ষপাত কেমন করে করব আমি?

ইম্ব্রা।। আপনিও জ্ঞানের পূজারী। আপনি জানেন মহান কাটো, জ্ঞানও পৃথিবীরই দান। তাকে কেউ যদি দখল করে রাখে—! তাছাড়া একটি মামলাতে বাদী বা বিবাদীকে যথাযথ বিচার দিতে গেলে তাকে এভাবে বাধা দেওয়া অনুচিত।

কাটো।। হুম! তো একদিন ছিল যখন তুমি তোমার মক্কেলকেই জানতে না। আজ এতদূর চলে এলে কেমন করে? এ রহস্যটা শুনি!

ইম্ব্রা।। বাবা ধার শোধ করার জন্য উকিল হতে পাঠিয়েছিলেন। আমিও সে কারণেই – । তখন বুঝিনি কোন পেশায় আসছি! সেদিন যখন আপনি ভর্ৎসনা করলেন এবং বন্দী যখন ঘৃণায় আমার সঙ্গে কোনো কথাই বলল না, তখন নিজেকে বড্ড ছোট মনে হল। আমি গ্রীক? সক্রেটিস, প্লেটো, আর্কিমিডিসের দেশের মানুষ? তাই ভাবলাম—

কাটো।। বেশ দেব তোমাকে ভিত্রুভিয়াসের লেখা। শুধু মাথায় রেখ, যা জানবে তা রোমের বিরুদ্ধে ব্যবহার কর না কখনো। আমি কাটো। আমি রোমের অনুগত অনুচর। মনে থাকবে?

[ইম্ব্রা হাসে]

[মঞ্চে এদের অংশের আলো চলে যায়]

*

দশম দৃশ্য

[কাটোর আদালত।]

ডেমো।। তুমি যখন বললে নিকাটোরকে, পিহাজিটির পরিকল্পনা তুমি জান, নিকাটোর কি বললেন?

নেস্টর।। নিকাটোর হেসে উড়িয়ে দিলেন। তাঁর কথা অনুযায়ী পিহাজিটিকে তিনি লেক্সাসের হাত থেকে রক্ষা করেছেন, সে এমন করতেই পারে না। – কিন্তু আমি বলেছিলাম, বাকী সব লুলাহিদের মতই ওরা আমাদের ঘৃণা করে। লুলাহি, কারিয়ান এরা সব -। আমরা গ্রীকরা ওদের সভ্যতা দিলাম, শাসন দিলাম, আর ওরা শুধু—। [গুঞ্জন ওঠে বিচারালয়ে]

ডেমো।। পিহাজিটিকে কিছু বলেছিলে?

নেস্টর।। ভেবেছিলাম ফিরে গিয়ে তাকে একেবারে ধরেই নিয়ে আসব, কিন্তু নিকাটোরের সঙ্গে কথা বলে পানশালায় ফিরে দেখি সে আর নেই। ওদিকে সন্ধে হয়ে গেছে। দৌড়লাম ক্রাসাসের কাছে। খানিকক্ষণ পরে তাঁকে ধরতে পারলাম। সব শুনে তিনি বাহিনী নিয়ে বেরোলেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল ঘটনা ঘটার আগেই পিহাজিটিকে ধরে—! তা আর হল না।

ডেমো।। মাননীয় জুরিরা, একদিকে গ্রীক নিকাটোরের, লুলাহি পিহাজিটির উপর অগাধ বিশ্বাস! অন্যদিকে তার রক্তাক্ত কলঙ্কিত খুনে হাত, যে হাত গ্রীকদের ঘৃণা করে। এই দুটোই পাশাপাশি রইল। বিবাদীপক্ষের উকিল চাইলে প্রশ্ন করতে পারেন।

ইম্ব্রা।। আপনি কতদিন চেনেন পিহাজিটিকে?

নেস্টর।। প্রায় বছর বারো-তেরো।

ইম্ব্রা।। কীভাবে?

নেস্টর।। আট-ন’বছর হবে, এমন সময় ওর বাবা মারা যায়। খুবই অভাব। ওদিকে ওরা একসময় ছিল লুলাহিদের পুরোহিত বংশ। কিন্তু পুরোহিত হতে গেলে যে বয়স লাগে তখনো তা পিহাজিটির হয়নি। তাছাড়া সে শিক্ষাও তো ছিল না। ওদিকে সংসার চলছে না। এই সময় লেক্সাসের কাছে ও কাজটা পায়। ঘোড়ার দেখভাল। তখনই আমি ওকে চিনলাম।

ইম্ব্রা।। আপনি কী করতেন ওখানে?

নেস্টর।। আমি ঐ মাঝেসাঝে এটা ওটা কাজে যেতাম ওখানে আর কী!

ইম্ব্রা।। আচ্ছা আপনাকে চুরির দায়ে কবে যেন অভিযুক্ত করা হয়েছিল? মানে ঘোড়া চুরির দায়ে? [গুঞ্জন ওঠে। নেস্টর চুপ।] ওহ মনে পড়েছে। আজ থেকে বছর পাঁচেক আগে, তাই না?

ডেমো।। এ সব কথা এখন তোলার মানে কি? মাননীয় বিচারপতি— [কাটো হাত দেখিয়ে থামিয়ে দেয়]

ইম্ব্রা।। ঘোড়া তো লেক্সাসেরই ছিল। এবং আপনাকে ধরেছিল যারা, মানে দীর্ঘ রাস্তা আপনাকে অনুসরণ করে করে, তাদের নেতৃত্বে তো পিহাজিটিই ছিল। একে লুলাহি, এদেশের প্রতিটি ঝোপ-ঝাড়ও চেনে। তায় শিকারী। খোঁজ পাবার জন্য লেক্সাস ওকেই তো দিয়েছিলেন দায়িত্ব। সে খুঁজেও বের করেছিল আপনাকে, তাই না?

নেস্টর।। না মানে— কিন্তু আমি চোর এ কথা সত্যি নয়। স্বয়ং নিকাটোর স্বাক্ষী দিয়েছিলেন আমি তখন—

ইম্ব্রা।। জানি জানি। যে সময় আপনি ঘোড়া চুরির দায়ে ধরা পড়লেন, তার ঠিক কিছুদিন আগেই নিকাটোর ঘোড়ার ব্যবসায় সদ্য এসেছেন। তাঁর পরিবারে তেমন অর্থ কোনোদিন ছিল না। অথচ কেমন করে যেন নিকাটোর তদ্দিনে ঘোড়ার ব্যবসা শুরু করেছেন। আবার সেই সময়েই এদিকে খালি ঘোড়া চুরি হচ্ছিল। কে বা কারা যেন করছিল। লোক বলতো সে সব ঘোড়া আনাতোলিয়ার নানা প্রান্তে বিক্রি হয়ে টাকাটা আবার এখানেই ফিরছিল। আপনিই তো নিকাটোরের ঘোড়ার ব্যবসার অংশীদার হয়েছিলেন পরে। এমন কিছু শুনেছেন কখনো?

ডেমো।। মাননীয় কাটো, এ অত্যন্ত অবিচার। সুপরিকল্পিতভাবে আমার সাক্ষীর মানহানি করা হচ্ছে। এবং বিগত নিকাটোর, যিনি অসম্ভব জনপ্রিয় গ্রীক নেতা এবং সম্ভাব্য পারিষদ ছিলেন, তাঁকেও ছাড়া হচ্ছে না। আমি তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

কাটো।। বাদী পক্ষের উকিল ঠিক কী বলতে চাইছেন বোঝা গেল না। অনর্থক বিষয়কে যদি টেনে আনতে থাকেন বিচারে— তাহলে তাঁর শাস্তিও হতে পারে রোমান আইনে, সে কথা যেন তিনি ভুলে না যান।

ইম্ব্রা।। আজ্ঞে, সাক্ষী নেস্টর সেদিন পিহাজিটির নেতৃত্বেই ধরা পড়েন। এবং তাঁকে হাজির করা হয়েছিল মাননীয় সিন্না’র কাছে, বিচারের জন্য। তাঁর পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন নিকাটোর। তাঁর বক্তব্য ছিল ঘটনার সময় নেস্টর তাঁরই আস্তাবল পরিস্কার করছিলেন। সেখান থেকে বেরোবার পথে পিহাজিটির নেতৃত্বে লেক্সাসের দল-বল তাঁকে বন্দী করে। এ কথা শুনে মাননীয় সিন্না সেদিন বলেছিলেন, একদল লুলাহি এবং একজন গ্রীকের মধ্যে কথার দাম দিয়ে বিচার হলে গ্রীককেই তিনি সে মর্যাদা দেবেন। ওদিকে লেক্সাস নিজে গ্রীক হলেও পিহাজিটিরা যখন ঘোড়া সমেত নেস্টরকে ধরে, তখন লেক্সাস উপস্থিত ছিলেন না। অতএব লেক্সাস এ বিষয়ের সাক্ষী নয়। সে জন্যই এই নেস্টর নিঃশর্তে মুক্তি পেয়েছিলেন। এর সমস্তটাই নথি হিসেবে সুরক্ষিত রয়েছে।

কাটো।। সে নথি কোথায়?

ইম্ব্রা।। রোমান প্রশাসনের কাছে চেয়েছিলাম, তাঁরা জানি না কেন আজ অবধি দিয়ে ওঠেননি। তাই লেক্সাসের কাছ থেকে সে নথির প্রতিলিপি সংগ্রহ করা হয়েছে। এই সেই প্রতিলিপি। [বিচারককে দেয়] এবং আমার সাক্ষীকে আর কোনো প্রশ্ন করার নেই। কারণ এই যদি বিচারের পদ্ধতি হয়ে থাকে, তাহলে গ্রীক নেস্টর বনাম লুলাহি পিহাজিটির কথার দামে গ্রীক নেস্টরই তো জয়ী হবেন!

কাটো।। আদালত এই নথি দেখবে। তার জন্য কিছুক্ষণ শুনানী মুলতুবি রইল।

[মঞ্চের যে অংশে বিচার চলছিল সেখান থেকে সরে আসে ইম্ব্রা। ডিমোক্রিটাসও আসে সরে। এবং আসে স্ট্রেপসিয়াডেস।]

ডেমো।। ইম্ব্রাসিস! [ইম্ব্রা তাকায়] এই ভদ্রলোককে চেন নিশ্চয়ই!

ইম্ব্রা।। তুমি এখানে বাবা?

স্ট্রেপ।। দেখতে এলাম আমার পিণ্ডিটা ঠিক কেমন হচ্ছে!

ইম্ব্রা।। তোমার পিণ্ডি হবে কেন?

স্ট্রেপ।। কারণ তোমার মামলা লড়ার বদান্যতায় পাওনাদারেরা আমার মাথায় পা দিয়েছে। আজ বাদে কাল বাড়িও গেল বলে তাদের গ্রাসে।

ইম্ব্রা।। তাহলে এইটাই তোমাদের মামলা লড়ার পদ্ধতি ডেমোক্রিটাস?

ডেমো।। জেনেই তো নিয়েছিলে মামলা। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হেরে গেলে বেশ কয়েক তেলেন্তে তোমার থলে ভারী হত। তোমার বাপের ধার শোধের সুবিধে। বলিনি তাই? জেনে নাওনি সে কথা?

ইম্ব্রা।। নিয়েছিলাম। কিন্তু তেলেন্তই সব? একটা মানুষের জীবন-মৃত্যু—

স্ট্রেপ।। হ্যাঁ হ্যাঁ। অন্যের জীবন-মৃত্যুর খুব পরোয়া আছে। নিজের বাপের নেই। – তুই থাম বাপ আমার! এঁরা যা বলছেন কর, নইলে আমার আর রক্ষা নেই। [কেঁদে ফেলে]

ইম্ব্রা।। বাবা, এ হল বিচারালয়। আর বিচারক কাটো খুব কড়া। এখানে এ সব দেখলে বা শুনলে তোমারও রক্ষা নেই। ডেমোক্রিটাস, তুমিই এনেছ ওঁকে, ফেরার ব্যবস্থাও তুমিই করবে। এবারের মত কাটোর কাছে তোমার নামে আমি অভিযোগ করছি না। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ-এ করবো না এমনটাও না।

স্ট্রেপ।। তাহলে তুই তোর বাপের কোনো কথাই শুনবি না? পথে বসাবি এই বুড়ো বয়সে? [উত্তেজিত হয়ে যায় বলে চিৎকার করে। রক্ষীদের একজন তাড়াতাড়ি এসে বলে—]

একজন রক্ষী।। কী হচ্ছে কী এখানে? এটা তামাশা করার জায়গা না! এক্কেবারে চালান করে দেব সো-ও-জা!

ডেমোক্রিটাস।। চলুন চলুন!

স্ট্রেপ।। এমন ছেলে জন্মানোর চেয়ে—

ডেমোক্রিটাস।। আহ, বলছি না চলুন! চালান যাবার শখ হয়েছে নাকি?

[স্ট্রেপসিয়াডেস গজগজ করতে করতে সরে যায়। সঙ্গে যায় রক্ষী। ডেমোক্রিটাস দাঁড়িয়ে ওদের চলে যাওয়া দেখে। তারপর ঘুরে বলে—]

কথায় বলে সাপের গর্তে হাত দিলে ছোবল খাবার জন্য তৈরি থাকাই ভাল।

[ওদিকে বিচারালয়ে বিচারকের আগমনের ঘোষণা শোনা যায়। ইম্ব্রা ইতস্তত করে। আলো নেভে।]

*

একাদশ দৃশ্য

[পিহাজিটির বন্দীশালা। দুই সৈন্য আছে যথারীতি।]

১ম।। এই ওঠ, উঠে দাঁড়া। [পিহাজিটি ওঠে]

২য়।। মাননীয় উকিল মশাই এসেছেন গো! [ইম্ব্রা ঢোকে]

১ম।। এই যে উকিল বাবু! তা রোমান গণতন্ত্র কেমন লাগছে?

ইম্ব্রা।। প্রথম নাগরিক মহান অগাস্টাসের মতন।

২য়।। অ্যাঁ? সে আবার কেমন হেঁয়ালি?

ইম্ব্রা।। তিনি সর্বত্র আছেন রোমান বিশ্বে। আবার শুধুমাত্র রোমেই তাঁর দর্শন পাওয়া যায়।

১ম।। বাব্বা! ভারী বুদ্ধি বেড়েছে দেখছি উকিল মশাইয়ের!

২য়।। আরও বাড়বে। সিন্না যেভাবে চটেছেন তাতে এইখানে ওরই পাশে জায়গা হয়ে যাবে মনে হয়!

ইম্ব্রা।। ভয় দেখাচ্ছ নাকি?

১ম।। পাচ্ছ না?

ইম্ব্রা।। না। বরং দেখাচ্ছ খোলাখুলি বললে কাল মাননীয় কাটোকে বলতে সুবিধে হবে। আমার মক্কেলের সঙ্গে দেখা করতে এসে ঠিক কী হয়! [দুজনেই সামান্য সন্ত্রস্ত হয় বোঝা যাচ্ছে] আর কাটোর মেজাজ তো জান নিশ্চয়ই। [পিহাজিটি শুনছে সব কথা]

২য়।। বেশ বেশ। পিপীলিকার পাখা ওঠে মরিবার তরে।

ইম্ব্রা।। সে যখন আসবে মরণ দেখা যাবে। আপাতত এই জায়গা থেকে তোমরা সরে গেলে ভাল। মানে সেটাই নিয়ম। আমার মক্কেলের কথা বলতে অসুবিধে না হওয়াই দরকার। [দুজনে আর কথা না বাড়িয়ে সরে যায় মঞ্চের বাইরে] বল এবারে! [পিহাজিটিকে বলে] অনেকটা রাস্তা এসেছি। আমার মত সাধারণ মানুষের পক্ষে যতটা আসা সম্ভব তার চেয়েও বেশী এসেছি। এবারে আমাকে জানতে হবে। যা জানি না, তা হল খুনটা আদৌ তুমি করেছ কী না! আর করলে কেনই বা! [চুপ করে যায়] তবে এখনো যদি আমাকে একজন স্থুলবুদ্ধির গ্রীক দখলদার মনে হয় তাহলে আমি নিরুপায়!

পিহাজিটি।। এ যুদ্ধে তোমার জেতার সম্ভাবনা নেই। ওরা আমাকে ক্রুশে ঝোলাবেই।

ইম্ব্রা।। কীভাবে জানলে? মাননীয় কাটো—

পিহাজিটি।। কাটো যে গণতন্ত্রে আস্থা রাখেন সে রোমান গণতন্ত্র নয়। বোধহয় কোথাও এমন গণতন্ত্র নেই, বইয়ের পাতায় ছাড়া।

ইম্ব্রা।। তুমি খুনটা করেছ কি? সোজা কথা বলো?

পিহাজিটি।। তোমার বোধহয় খুবই অসুবিধে হচ্ছে!

ইম্ব্রা।। হ্যাঁ হচ্ছে। আমার পেছনে ওরা লেগে গেছে। আমার বাবাকে—! যাক গে! আমি জানতে চাই যে আমি যাকে ক্রুশকাঠ থেকে বাঁচাতে লড়ছি সে নির্দোষ কী না! সে সত্যিই ওদের কথামত খুনি কী না!

পিহাজিটি।। আচ্ছা, যখন যুদ্ধ হয়, হাজারে হাজারে লড়ে-মারে-মরে তখন তাকে খুন বলা চলে না কেন?

ইম্ব্রা।। কারণ সে এক বিশেষ পরিস্থিতি! সেখানে মরা বা মারা ছাড়া রাস্তা থাকে না।

পিহাজিটি।। জীবনে এমন বিশেষ পরিস্থিতি শুধু যুদ্ধেই আসে? অন্য কোনো সময় আসে না?

ইম্ব্রা।। কেমন করে আসবে?

পিহাজিটি।। এই ধর তুমি লিসিয়া থেকে কারিয়া যাচ্ছ। পথে যেতে যেতে পড়লে সিংহের মুখে। হয় সে তোমাকে মারবে নয় তুমি তাকে। হয় না এমন? যে মারবে সে কি খুনি?

ইম্ব্রা।। সিংহ মারা আর মানুষ মারা এক হয় না!

পিহাজিটি।। কেন হয় না? সে কথাই তো জানতে চাইছি আমি।

ইম্ব্রা।। আরে মানুষ তো মানুষই। সিংহ কি তার চেয়ে বেশী গুরুত্বের? [একটু ভাবে] একজন মানুষ অন্যজনকে মারলে আত্মধ্বংসের ভয় জন্মায়। তাই মানুষ নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতেই এই সব – করেছে।

পিহাজিটি।। এইটাই আসলে সমস্যার। সবই নিজের জন্য শুধু। অন্যের প্রাণ তাই গুরুত্বের নয়। সিংহ বলে না, মানুষ মানুষকে মারলেই একই রকম নৈতিকতা থেকে দেখবে সব সময় তা হয় না।

ইম্ব্রা।। তুমি খুনটা করেছ কি?

পিহাজিটি।। হ্যাঁ করেছি।

[ইম্ব্রা হতশ্বাস হয়ে পড়ে যেন। আস্তে আস্তে কারাগারের শিক ধরে দাঁড়ায়, যা কারাগারের গা দিয়ে চলে গিয়েছে। ]

*

দ্বাদশ দৃশ্য

[বিচারালয় কাটোর।]

ইম্ব্রা।। তাহলে আপনি জানতেন না যে মহান রোমান স্থপতি ভিত্রুভিয়াস স্বয়ং এ কথা বলেছেন যে এই সালমাকিসের জলাশয় নিয়ে গুজবের কোনো অর্থ নেই?

ক্রোনাস।। ওভিদের মতন পুণ্যশ্লোক কবি যখন বলেছেন—

ইম্ব্রা।। আমার প্রশ্নটার উত্তর হ্যাঁ অথবা না-তে দিলে ভাল হয় মাননীয় ক্রোনাস।

ক্রোনাস।। কিন্তু মহান ওভিদ যখন—

কাটো।। সোজা উত্তর দিন।

ক্রোনাস।। জানতাম।

ইম্ব্রা।। অথচ আপনি মাননীয় প্রাদেশাধিকারিক অরেলিয়াস সিন্নাকে এ কথা জানাবার প্রয়োজন বোধ করেননি? [ক্রোনাস ইতস্তত করে] কি হল বলুন? জানিয়েছিলেন না জানাননি?

ক্রোনাস।। জানিয়েছিলাম।

ইম্ব্রা।। আশ্চর্য, তা সত্ত্বেও মাননীয় সিন্না – ! ভারী আশ্চর্য! এতকাল ধরে এ অঞ্চলের মানুষ যে জলাশয় ব্যবহার করছে আচমকা তাকে এভাবে বন্ধ করে দিতে কারো—!

ডেমো।। মাননীয় বিচারপতি, এখানে মহান সিন্নার বিচার চলছে কি?

কাটো।। তোমার কি আর প্রশ্ন করার আছে? [ইম্ব্রাকে জিজ্ঞেস করে]

ইম্ব্রা।। আজ্ঞে আছে। —মাননীয় ক্রোনাস, দেবতা মার্সের মন্দিরে আপনি কতদিন আছেন?

ক্রোনাস।। মাননীয় সুল্লা যখন মিথ্রাডেটিসের বিরুদ্ধে অভিযানে আসেন সেই সময় থেকে।

ইম্ব্রা।। সেই সময় থেকে এই এতকাল লাগল কেন মহান কবি ওভিদের লেখার কথা আপনার মনে পড়ার জন্য?

ক্রোনাস।। সুল্লার জয়ের পর থেকে এই রোমান প্রদেশে নতুন করে সব তৈরী হচ্ছে। এই সময় আমরা প্রাচীন গ্রীক সংস্কারগুলি উদ্ধার করার চেষ্টা করছি, মাননীয় সিন্নার নেতৃত্বে। তাই এতদিনে প্রকৃত গ্রীক সংস্কৃতিতে ফেরা।

ইম্ব্রা।। আচ্ছা, গ্রীক সংস্কৃতিতে ফেরার জন্যই কি আপনি নিকাটোরের সঙ্গে মিলে ঐ জলাশয়ের আশেপাশের অনেক জমি কিনে ফেললেন?

ডেমো।। এ সব কথার অর্থ কি মাননীয় কাটো? আমরা যার বিচারে বসেছি তার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। আমার ঘোর আপত্তি আছে।

কাটো।। বিবাদী, সম্পর্ক যদি না থেকে থাকে—

ইম্ব্রা।। আছে।

কাটো।। সম্পর্কটা তাড়াতাড়ি প্রতিষ্ঠা হোক। সময় নষ্ট করাটা আমার পছন্দ না।

ইম্ব্রা।। নিকাটোর, সাসালডা-পিহাজিটির প্রেমের কথা জানতেন। [গুঞ্জন আদালতে] নিজেই একসময় তাদের পালাবার পরামর্শ দিয়ে শেষমেশ ধরিয়ে দিয়েছিলেন লেক্সাসের হাতে। দেবী আফ্রোদিতির মন্দিরে। লেক্সাস, পিহাজিটিকে প্রাণে মারতে পারেননি। কিন্তু কাজ থেকে তাড়ান। তারপর নিকাটোর লেক্সাসের কাছে সাসালডাকে বিয়ে করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সাসালডা একদম রাজী ছিল না সে বিয়েতে। আবার জলাশয় বন্ধ হওয়াও সে মানতে রাজী ছিল না। এতে বিক্ষুব্ধরা তার আশেপাশে জড়ো হচ্ছিল। তখনই সাসালডাকে ডাইনী বললেন স্থানীয় পুরোহিত টালিমাকিস। আর সবাই জানেন টালিমাকিস নেস্টরের মতই নিকাটোরের অত্যন্ত কাছের লোক। এই সময়, মাননীয় ক্রোনাস, আপনি লেক্সাসের কাছে গিয়েছিলেন নিকাটোরের প্রস্তাব নিয়ে। সাসালডার বিরোধিতা নিকাটোর ছেড়ে দিতে পারেন দুটি শর্তে। এক, লেক্সাসকে তার ঘোড়ার ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে। আর দুই, সালমাকিসের জলাশয়ের আশেপাশে থাকা লেক্সাসের জমি আপনাকে আপনার নির্দিষ্ট দামে বিক্রি করতে হবে। গ্রীক সংস্কৃতির ব্যবসাটা বেশ ভাল না ক্রোনাস?

ক্রোনাস।। মিথ্যে কথা! এ সব মিথ্যে কথা!

ইম্ব্রা।। মাননীয় বিচারপতি, আমার পরের সাক্ষী লেক্সাস।

ক্রোনাস।। এ সব গুজব ছড়ানোর জন্য তোমাকে যথেষ্ট দাম দিতে হবে হে ছোকরা!

[কাঠগড়া থেকে সরতে সরতে বলে]

কাটো।। এটা আমার আদালত। এখানে দাম নিতে হলে আমি জানি কেমন করে নিতে হয়! প্রহরী, একে নিয়ে যাও বাইরে।

[প্রহরী নিয়ে যায় ক্রোনাসকে। লেক্সাসকে আসতে বলা হয়। লেক্সাস এসে দাঁড়ায়। শপথ নেয় দেবতা জিউসের নামে।]

ইম্ব্রা।। আপনার কাছে মাননীয় ক্রোনাস যখন জমি কিনতে চেয়েছিলেন তখন ঠিক কি বলেছিলেন?

লেক্সাস।। মাননীয় কাটো, আমার মেয়েকে রক্ষা করুন। এ সব যা হচ্ছে সব হচ্ছে সোনার জন্য। [হৈ হৈ শুরু হয়ে যায় আদালতে।] এই জলাশয় বন্ধ, জমি কেনা— ওই পাহাড়ে সোনার খনি বানাবে বলে—

[তুমুল হৈ হৈ হতে থাকে। ডেমোক্রিটাস তীব্র আপত্তি জানাতে থাকে। কাটো সকলকে থামান। রেগে বলেন,]

কাটো।। ইম্ব্রাসিস, যদি বাদী পক্ষের সাক্ষী আদালতের রীতি-নীতি ভঙ্গ করে, যদি তার জানা না থাকে সে সব, আমি তাকে সাক্ষ্য দিতে দেব না। সাক্ষীকে এ সব ভাল করে বুঝিয়ে দাও। এই আদালত কিছুক্ষণের জন্য মুলতুবি থাকছে।

[কাটো উঠে বেরিয়ে যাবেন। আলো নেভে।]

*

ত্রয়োদশ দৃশ্য

[সিন্নার আলোচনাকক্ষ।]

সিন্না।। [পায়চারি করতে করতে] সামান্য কাজ! অতি সামান্য একটা কাজ! একটা খুনের মামলায় একটা লোককে ক্রুশে ঝোলাতে হবে। সেকাজটাও তোমরা—

ক্রাসাস।। এই ছোকরা যে এতরকমের সাহায্য পাবে তা তো বুঝতে পারিনি!

সিন্না।। একের পর এক সাক্ষী— এমনকী ঐ বুড়ো লেক্সাসও! নিশ্চয়ই এর পেছনে মার্সেলাসরা আছে।

ক্রোনাস।। আছে।

ক্রাসাস।। কাটোকে এ বিচারে বসিয়ে আমাদের সমস্যা হয়েছে সিন্না। আবারো বলছি এ সব বিচার-টিচার বন্ধ কর। আমার বাহিনীকে হুকুম দিলেই –

সিন্না।। আহ! এখন আর সম্ভব না।

ক্রাসাস।। কিন্তু কাটো—

সিন্না।। কাটো অগাস্টাসের কাছের লোক। তাকে সরানো যাবে না। আর আমি কী বুঝেছি তোমরা এই কাণ্ড হতে দেবে? ঐ ইঁদুরটার— ঐ ইম্ব্রাসিসের এত স্পর্ধা, আমার সঙ্গে লড়তে চাইছে! আমার সঙ্গে! ক্রাসাস—

ক্রাসাস।। সিন্না!

সিন্না।। আগুনে হাত দিলে কেমন পোড়ে হাত তা একবার দেখিয়ে দাও! —যে কোনো মূল্যে আমাকে এই খনি পেতেই হবে।

[আগুন লাগে মঞ্চের অন্য প্রান্তে। ইম্ব্রার বাবা আর কয়েকজন হায় হায় করতে করতে দৌড়য়। এরা হাসে। ইম্ব্রা হন্তদন্ত হয়ে আসে। স্ট্রেপ্সিয়াডেস তাকে দেখে আর্তনাদ করে।]

স্ট্রেপসিয়াডেস।। সব খেয়ে নিলি রে! সব খেয়ে নিলি! —আমার সব চলে গেল রে! সব চলে গেল! [ইম্ব্রা সামলাতে যায়] দূর হয়ে যা! আমার কেউ নেই। আজ থেকে আমার কোনো সন্তান নেই। মরে গেছে! মরে গেছে! [দৌড়ে চলে যেতে যায়, একজন এসে আচমকা তাকে আঘাত করে। সে টলতে টলতে মঞ্চের বাইরের দিকে চলে যায়।]

ইম্ব্রা।। বাবাআআআআ— [ছুটে যায়। তাকেও একজন জোরে আঘাত করে। সে ছিটকে পড়ে মঞ্চে। অন্য দিক থেকে দু-একজন এসে যায়। তারা বলে —]

কোরাস ১।। দাঙ্গা লেগে গেছে। কারিয়াতে দাঙ্গা লেগে গেছে। এখানে ওরা হত্যা করল স্ট্রেপসিয়াডেসকে।

[এর মধ্যেই কয়েকজন ইম্ব্রাসিসকেও মারে খানিক। তারপর তাকে টানতে টানতে এনে ছেড়ে দেয় মঞ্চের সামনে। কোরাস বলে চলে—]

দাঙ্গা লেগে গেছে। কারিয়া থেকে লিসিয়ার দিকে ছড়াচ্ছে। লুলাহিরা সব আক্রমণ করছে। কারিয়ান আর গ্রীকরা হুঁ-শি-য়াআআআআআআআ-র!

[আরেকদল মঞ্চে আসে। তারাও বলে কোরাসে।]

কোরাস ২।। খবরদার! মিথ্যে ছড়ানো হচ্ছে। লুলাহিরা নয়, ক্রাসাসের গোপন বাহিনী দাঙ্গা ছড়াচ্ছে। ভাইসব, বোনেরা, রুখে দাঁড়াও। যার হাতে যা আছে তাই নিয়ে রুখে দাঁড়াও।

[দুদিকের কোরাস মুখোমুখি। ইফিজিয়া ছুটে আসে। ইম্ব্রাকে তোলে। রক্তাক্ত। রোমান সৈন্যরা আসে। ইফিজিয়া ইম্ব্রাকে নিয়ে আস্তে আস্তে মঞ্চের অন্যদিকে চলে যায়। যে অঞ্চলে দুই কোরাস মুখোমুখী এবং রোমান সৈন্যরা সেই অংশ অন্ধকার হয়ে যায়। ইম্ব্রা আর ইফিজিয়া যেখানে সেখানে আসে কাটো।]

কাটো।। তোমাকে সান্তনা দেবার ভাষা নেই আমার। [ইম্ব্রা চুপ করে থাকে] —এই রোম আমরা চাইনি। না, চাইনি।

ইফিজিয়া।। গোটা নগরে দাঙ্গা ছড়িয়ে দেবার ব্যবস্থা হয়েছে! দাঙ্গা বন্ধ না হলে—! তাছাড়া বন্ধ হতে হতে যদি আরো সাক্ষী খুন হয়ে যায়? হয়তো লেক্সাসও?

কাটো।। তাদের নিরাপত্তার আদেশ দিয়েছি আমি। তবুও—!

ইফিজিয়া।। এরপরে আদালতে সাক্ষীরা না-ও আসতে পারে।

কাটো।। সমস্ত রকমের সরকার যে সব আইন বানায় – গণতান্ত্রিক, অভিজাত অথবা স্বৈরাচারী— বানায় স্রেফ নিজেদের বেশ কিছু স্বার্থর দিকে চেয়ে। এই আইনগুলোকে তারা মনে করে তাদের শাসিতদের প্রতি ন্যায়। আর যে সে আইনের সীমানা অতিক্রম করে তাকে আইনভঙ্গকারী বলে শাস্তি দেয় এবং  বলে সে অন্যায়কারী।

ইম্ব্রা।। এবং আমি যখন বলছি যে সব রাষ্ট্রে ন্যায়ের মূল নীতি আসলে একই, সরকারের স্বার্থ; এবং সরকারের হাতেই যেহেতু ক্ষমতা থাকে, তাই এর যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হল যে সর্বত্র একটাই মূল নীতি। শক্তিমানের স্বার্থই হল ন্যায়।—দার্শনিক থ্র্যাসিম্যাকাস বলেছিলেন সক্রাতিসকে, প্লেটো রিপাবলিকে তাই লিখেছেন।

কাটো।। বহুকাল হল। একই কথা আবার বলতে হচ্ছে।

ইম্ব্রা।। হয়তো আরো অনন্তকাল বলতে হবে। তবুও— তবুও মাননীয় কাটো— আদালতে আমি লড়ব। লড়বই।

*

চতুর্দশ দৃশ্য

[একটু উঁচু জায়গায় ক্রাসাস দাঁড়িয়ে, যেখানে সাক্ষীরা দাঁড়ায়। কাটো বসে নিজের আসনে আরেকটু উঁচু অবস্থানে।]

ডেমো।। মাননীয় ক্রাসাস, নিজের হাতে ধরেছিলেন ঐ খুনিটাকে!

ইম্ব্রা।। আপত্তি জানাচ্ছি। খুন হতে দেখেননি ক্রাসাস। শুধু একজন দ্রুত ধাবমান মানুষকে ধরেছিলেন মাত্র।

ডেমো।। গায়ের জামাকাপড়ে রক্তমাখা, খালি পা।

ইম্ব্রা।। আজ্ঞে। হাতে যদিও ছুরি ছিল না।

ডেমো।। মাননীয় ক্রাসাস স্বয়ং ঐ রক্তমাখা ছুরি ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করেন। বিবাদীপক্ষের স্মৃতি দুর্বল হতে পারে। মনে করালাম তাই।

ইম্ব্রা।। ঠিক। আপনার মত বিজ্ঞ মানুষ পাশে থাকলে আমার মতন মূর্খের অজস্র সুবিধে। মাননীয় বিচারপতি, আমি মাননীয় ক্রাসাসকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। [খানিক গুঞ্জন। ডেমো আপত্তি করে না।] মাননীয়, সালমাকিসের জলাশয় যেদিন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়, সেদিন আপনিই তো ছিলেন বাহিনীর দায়িত্বে সেখানে?

ডেমো।। খুনের সঙ্গে এর কী সম্পর্ক মাননীয়? [কাটোর দিকে তাকায়]

কাটো।। না শুনলে বুঝব কেমন করে! শুনি।

ইম্ব্রা।। সেদিন যে মেয়েটিকে বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেবার জন্য সাময়িকভাবে বন্দী করা হয়েছিল তার নাম কী ছিল?

ক্রাসাস।। সাসালডা।

ইম্ব্রা।। আপনি জানতেন এঁর সঙ্গে সংসার করবে বলে এই বন্দী পালিয়েছিল একদা?

ক্রাসাস।। না।

ইম্ব্রা।। আপনি কি জানতেন নিকাটোরই এঁদের আফ্রোদিতির মন্দির থেকে ধরে আনতে সাসালডার বাবা লেক্সাসকে সহায়তা করেছিলেন?

ক্রাসাস।। আমি এ সব কেন জানতে যাব?

ইম্ব্রা।। জানেন না তাহলে?

ক্রাসাস।। না।

ইম্ব্রা।। নিকাটোর যে সাসালডাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল তার পরে সে কথাও—

ক্রাসাস।। না না এবং না! এ সব প্রশ্নের অর্থ কি?

ডেমো।। দুটি পুরুষের খুনোখুনির গল্পে একটি নারী এনে বিবাদী উকিল মশলা দিচ্ছেন রান্নায়! [হাসে কয়েকজন] এর মানে কি?

কাটো।। মানে-টা আমিও বুঝতে চাইছি।

ইম্ব্রা।। এরিস্টোফানেসের নাটক করছি না মাননীয় বিচারপতি। নিশ্চিত থাকতে পারেন।

কাটো।। অতটা নিশ্চিত হবার মতন কারণ দেখছি না এখনো। তবু দেখতে চাই। বেশীক্ষণ যদি এদিক ওদিক প্রশ্ন চলে তাহলে কিন্তু—

ইম্ব্রা।। যে আজ্ঞে মাননীয়! —মাননীয় ক্রাসাস, যে গলি থেকে আপনি বন্দী করেছিলেন এই পিহাজিটিকে, সেই গলিতে সাক্ষী বারাকের বাড়ির দরজায় পড়েছিল মাননীয় নিকাটোরের দেহ। তাই তো?

ক্রাসাস।। ঠিক তাই।

ইম্ব্রা।। বারাকের ঠিক পাশেই যে সাসালডার বাড়ি— থুড়ি লেক্সাসের বাড়ি আপনি জানেন?

ক্রাসাস।। এর সঙ্গে খুনের কি সম্পর্ক?

ডেমো।। আমরা কি ঘন্টার পর ঘন্টা সব কাজ ফেলে এই সব আজগুবি প্রশ্ন-উত্তর শুনব? বিচারকে এই প্রশ্নোত্তর কোনদিকে নিয়ে যাচ্ছে?

কাটো।। কী সম্পর্ক হে বিবাদী?

ডেমো।। মাননীয় কাটো, আপনি তো ওকে এই হাবিজাবি বলার সুযোগ দিচ্ছেন আরও।

কাটো।। কী করতে হবে তা কি আপনার থেকে শিখব আমি? তাহলে আপনিই বিচারপতি হয়ে যান এখানে!— [ইম্ব্রাকে বলেন] এর সঙ্গে খুনের কি সম্পর্ক?

ইম্ব্রা।। আজ্ঞে, মাননীয় ক্রাসাস, কেন যেন ভুলেই গেছেন যে তিনিই আফ্রোদিতির মন্দির থেকে সাসালডা-পিহাজিটিকে ধরেছিলেন। [গুঞ্জন] সাসালডা, মাননীয় লেক্সাসের মেয়ে। লেক্সাস রোমে উন্নতমানের ঘোড়া সরবরাহ করেন। সাসালডা মুক্তি পেয়েছিল। কিন্তু, এই পিহাজিটিকে জেলে নেওয়া হচ্ছিল। [ক্রাসাসকে বলে] —নিশ্চয়ই এবারে মনে পড়ছে আপনার?

ক্রাসাস।। হ্যাঁ খানিক মনে পড়ছে! [গুঞ্জন ওঠে সভায়]

ইম্ব্রা।। মাননীয় জুরিগণ, আমার কন্ঠস্বর বাদী উকিল মাননীয় ডেমোক্রিটাসের মতন ওজস্বী নয়। তাঁর মত অভিজ্ঞতা ও খ্যাতিও আমার নেই। তাই যখন আমাকে পিহাজিটির হয়ে দাঁড়াতে হল, এবং মাননীয় কাটো যখন আমাকে যথার্থ ভর্ৎসনা করলেন আদালতে তৈরী না হয়ে আসার জন্য, সেইদিন থেকে ভালভাবে বুঝতে চেয়েছি বিষয়টা। আমার হাতে একজন মানুষের জীবন-মৃত্যুর দায়িত্ব। আপনাদের মতনই। প্রথমেই মনে হল, যদি ধরেই নিই খুন করেছে, তাহলে কেন করল? কারণ ছাড়া যদি কেউ খুন করে, সে তো উন্মাদ। কারণ খুঁজতে গিয়ে—

ডেমো।। খুব ভাল করেছেন। এই পুরোনো বিবাদটা মনে করিয়ে দিয়ে। তাহলে মাননীয় জুরিগণ নিশ্চয়ই বুঝলেন পিহাজিটি কেন খুনটা করেছে?

ইম্ব্রা।। যদি ধরে নিই খুন করেছে এবং খুন করেছে— দুটো নিশ্চয়ই এক-ই কথা নয় মাননীয় ডেমোক্রিটাস। জেনেশুনে জুরিদের ভুল পথে চালিতে করছেন? —কারণ খুঁজতে গিয়ে এই ঘটনাটা সামনে এল যেমন, তেমনই এল পিহাজিটির জেলের রাস্তা থেকে পালিয়ে যাবার ঘটনা।

ক্রাসাস।। অপরাধী বলেই পালিয়েছে।

ইম্ব্রা।। আর যদি সে আপনারই দায়িত্ব থেকে পালায়? – কি হল, চুপ কেন, বলুন? আপনার মতন ক্ষমতাবান সেঞ্চুরিয়ানের আওতা থেকে যদি সে পালায় ক্রাসাস এবং তারই জন্য আপনার রোমে ফেরার দেরী  হয়ে যায়—

ক্রাসাস।। এ সব গল্প শোনার জন্য কি আমাকে ডাকা?

ইম্ব্রা।। তাহলে আপনি বলছেন পিহাজিটি আপনারই হেফাজত থেকে পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে আপনার রোমে ফিরতে না পারার কোনও সম্পর্ক নেই?

ক্রাসাস।। না নেই।

ইম্ব্রা।। কিন্তু একই সময় হয়েছিল—

ক্রাসাস।। হলেও নেই।

ডেমো।। আমার গুলিয়েই যাচ্ছে কোন মামলার ফয়সালা আমরা করতে বসেছি! ক্রাসাসের সঙ্গে কবে কোন কারণে কার কার ঝগড়া হয়েছিল তা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাচ্ছি কেন? আমাদের সামনে রয়েছে খুন, সামনে রয়েছে খুনি। সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে দিতেই কি এই নিপুণ ষড়যন্ত্র?

ইম্ব্রা।। আমি তো আপনার মতন চ্যাঁচাতে পারি না! আমার দুর্বল স্বরের অক্ষমতা এ। তবে স্বর দুর্বল হলেও যুক্তি খুব দুর্বল বলে মনে হয় না। এখনো কী আপনি বুঝতেই পারছেন না, তথাকথিত খুনী ও নিহতের সঙ্গে এত রকমের স্বার্থ সংঘাত থাকা একজন আধিকারিকের ঠিক সেই রাত্রেই ঐ অঞ্চলেই রাত-পাহারার উপস্থিতি— খুবই— মানে খুবই কাকতালীয়! উনি খুন হতে দেখেননি, কিন্তু রক্তমাখা পিহাজিটিকে ধরে ফেললেন, অতএব পিহাজিটি খুনী। এও ভীষণ কাকতালীয়। কোথাও কি কোনো সন্দেহর অবকাশ নেই? সব কি এতই জলের মত পরিষ্কার?

ডেমো।। সন্দেহ করতে চাইলে সবেতেই করা চলে। আমার কাছে পরিষ্কার। এবং মাননীয় জুরিদের কাছেও পরিষ্কার— [একটু থেমে] সম্ভবত।

ইম্ব্রা।। আমার কাছে পরিষ্কার না। যে সাসালডাকে নিকাটোর বিয়ে করতে চাইলেন, তাকে হঠাৎ মনে হল ডাইনি? তাও জলাশয় নিয়ে প্রতিবাদের পরেই? মাননীয় ক্রাসাস, ডাইনি বলে ঘোষিত হলে তাকে যে অঞ্চল থেকে তাড়ানো হবে তা নিশ্চয়ই আপনি জানেন?

ক্রাসাস।। এ সব জেনে আমি কি করব? আমি কি ঘোষণাকারী? না আমি গ্রীক?

ইম্ব্রা।। আপনি রোমান শান্তি-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান ক্রাসাস। প্রাদেশাধিকারিকের ডানহাত। অঞ্চলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে আপনাকেই তো আসতে হবে। তাছাড়া এখানে কোথায় কী হচ্ছে তা আপনার নখদর্পণে থাকার কথা। আপনি জানেন না?

ক্রাসাস।। মাননীয় কাটো, সারাদিনে আমার অনেক কাজ থাকে। এই সব ছেলেখেলায় আমাকে আর কতক্ষণ সময় দিতে হবে?

কাটো।। যতটা সময় লাগে সত্যি জানতে! তার বেশিও না, একমুহূর্ত কমও না।

ইম্ব্রা।। সাসালডাকে ডাইনি ঘোষণা করলে পিহাজিটি যে বার হয়ে আসবে, তা আপনি ভাবেননি ক্রাসাস?

ক্রাসাস।। একটা লুলাহিকে নিয়ে এত ভাবব এ সময় আমার নেই।

ইম্ব্রা।। তাই? কিন্তু নিকাটোরকে আপনিও এমন পরামর্শই দিয়েছিলেন।

ক্রাসাস।। কী সব হাস্যকর কথা!

ইম্ব্রা।। আফ্রোদিতির মন্দিরে পিহাজিটিকে ধরার পর তার ব্যবস্থা করার জন্য নিকাটোর প্রথমবার আপনাকে টাকা দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সত্যি?

ক্রাসাস।। বাজে কথা।

ইম্ব্রা।। সে টাকা সে পালিয়ে যাওয়ায় আপনি পাননি! আপনার রোমে যা ধার আছে তা শোধ করার অসুবিধে হয়েছিল তাই! ফেরাও—

ক্রাসাস।। আদ্যন্ত বাজে কথা এ সব!

ইম্ব্রা।। আপনি নিজেই সেলুসিডের পানশালায় মত্ত হয়ে নিকাটোরকে এ সব কথা তুলে শাসিয়েছিলেন তার খুন হবার কিছুদিন আগেই! এমনকী তাকে খুন করবেন বলেছিলেন। সঙ্গে বলেছিলেন – মাননীয় নিকাটোর যে সাসালডার দিকে এত লোভ নিয়ে চেয়ে আছে— তাকে সৈন্যশিবিরে রাত্রে তুলে নিয়ে গিয়ে—

ক্রাসাস।। মিথ্যে কথা। একেবারে মিথ্যে কথা। সাহস কী করে হয় একজন রোমান আধিকারিকের বিরুদ্ধে এই মিথ্যে সব বলার?

ইম্ব্রা।। আদালতের কাছে এই ছোট্ট চিঠিটা পেশ করতে চাই, যা আপনি পরের দিন সুস্থ মাথায় লিখেছিলেন নিকাটোরকে। অবশ্য সুস্থ মাথাটা আমার অনুমান মাত্র। [হাতে হাতে কাটোকে দেয় চিঠি] এবং এতেও একই ভয় দেখিয়েছিলেন। নিকাটোর আদ্ধেক টাকা দিয়েছিল সেই ভয়ে। আর বলেছিল পিহাজিটি ধরা পড়লে আর ক্রুশে ঝুললে বাকি টাকা দেবে।

ক্রাসাস।। চিঠিটা—?

ইম্ব্রা।। চিঠিটা নিকাটোরই রাখতে দিয়েছিলেন সেলুসিডকে। তাঁর ভয় ছিল পিহাজিটিকে ধরতে না পারলে আপনি টাকার জন্য তার উপর আবার চাপ তৈরী করবেন। তেমন হলে মাননীয় প্রাদেশাধিকারিকের কাছে এই চিঠি নিকাটোর জমা দেবেন বলে ভেবেছিলেন। এবারে আপনি যদি মধ্যে তাকে খুন করেন, তার বাড়িতে চিঠিটা থাকলে তা আপনার হাতে চলে আসবে। কোনো প্রমাণই থাকবে না। তাই সেলুসিডকে দেওয়া। এবং ভুলে যাবেন না ক্রাসাস, একইভাবে অবৈধ টাকা আদায়ের কারণে সেলুসিড, রোমান হলেও, আপনাকে পছন্দ করেন না বিশেষ। এ মামলায় তিনিও সাক্ষ্য দিতে তৈরী এ সব নিয়ে। সেলুসিড এখন এই আদালতে উপস্থিতও আছেন।

ক্রাসাস।। তুমি একজন সামান্য গ্রীক হে ছোকরা! তুমি এ সবের কী বুঝবে! নিকাটোরকে ভয়-টয় কিচ্ছু দেখাইনি। বুঝলে? সে এই রোমান শাসনে নিজের উন্নতি করতে চেয়েছে। সে রোমান হতে চেয়েছে। চাইলেই হবে? রোমান হতে আমরা যে ঘাম-রক্ত ঝরিয়েছি তার দাম নেই? সেই দাম দিচ্ছিল! এই লুলাহি, ঐ মেয়েটা, জলাশয় এ সব কিছু নিয়েই আমার মাথাব্যথা নেই। গণতন্ত্র? হাঃ! তোমরা গ্রীকরা গণতন্ত্রের কি বোঝো? সক্রাতিসকে হেমলক খাইয়ে দিয়েছিলে পাড়া-শুদ্ধু বসে বিচার করে! হা হা! আমরা রোমানরা বুঝি! গণতন্ত্র মানে দুর্বলতা নয়। গণের প্রতিনিধি যাঁরা তাঁরাই ভাল বোঝেন। তাঁরা ঠিক করবেন বাকীদের পক্ষে কোনটা ভাল, কোনটাই বা মন্দ! এই লুলাহিটার মত, মেয়েটার মত, লেক্সাসের মত কীটানুকীট এর কী বুঝবে? এখানে একটা সোনার খনি হবে! হ্যাঁ হবে। জলাশয়ের সমস্ত জল লাগবে। তবে উন্নতি হবে এ অঞ্চলের। উন্নতি হবে এ প্রদেশের। সোনার খনি। জীবন বদলে যাবে তোমার মতন গ্রীক-কারিয়ান-লুলাহিদের। তার জন্য খাটবে কে? অপ্রিয় হবে কে? আমরা! রোমানরা! —সেই রোমানরা যারা তলোয়ারের ডগায় সমগ্র বিশ্বকে এক করছি। তার দাম নেই?

ইম্ব্রা।। তার মানে আইন-কানুন কোনও কিছুরই কোনও দাম নেই? আপনার শক্তি আছে বলে আপনার ইচ্ছেমতন—

ক্রাসাস।। আমার বা আমাদের শক্তি আছে বলেই তোমরা টিকে আছ এখানে। পার্থিয়ান, সিথিয়ানরা তোমাদের এখনো উপড়ে ফেলে দিতে পারেনি। গ্রীস ছেড়ে এই দেশে করে-কম্মে খেতে পারছ। হাহ! রোমানরা না থাকলে সারি সারি জাহাজে করে এদ্দিনে দাস হয়ে চালান চলে যেতে!

ইম্ব্রা।। তাহলে তো রোমানরাই সব! আমরা— বাকি যারা— তারা—

ক্রাসাস।। কীটপতঙ্গ! আমি সিন্নাকে বলেছিলাম, এই সব গণতন্ত্র-ফন্ত্র না করে সোজা একেবারে সৈন্য নামিয়ে দিতে। আরও দু-একটা লিজিয়ন আনিয়ে নিয়ে—

কাটো।। ব্যস! ব্যস! অনেক হয়েছে!

ক্রাসাস।। সত্যি কথা কটুই লাগে কাটো!

কাটো।। এই মূহুর্তে ক্রাসাসকে আমি তার দায়িত্ব থেকে অপসারণ করলাম। [রোমান সৈন্যরা ইতস্তত করে। কাটো আবার বলে—] মহান অগাস্টাসের আদেশনামার অধিকারে আমি নির্দেশ দিচ্ছি! এই নির্দেশ যে বা যারা অমান্য করবে তারা বাহিনী থেকে অসম্মানজনকভাবে বরখাস্ত হবে। এবং তাদেরও ঠাঁই হবে রোমান কারাগারে। [রোমান সৈন্যরা এগিয়ে আসে। ক্রাসাস নামে কাঠগড়া থেকে। কাটো হাতের চিঠি দেখিয়ে বলেন—] এই চিঠির ভিত্তিতে আমি প্রাদেশিক রোমান সরকারকে আধিকারিক ক্রাসাসের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিচ্ছি, যার ফলাফল এই বিচারালয়ের কাছে এক সপ্তাহের মধ্যে হাজির করতে হবে। এবং এই আদালত তাঁর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত না নেওয়া অবধি ক্রাসাসকে সমস্ত সরকারি দায়িত্বচ্যুত করা হচ্ছে। এবং আজকের মতন আদালত মুলতুবি রাখছি। পরের তারিখে এই আদালত এই মামলার রায় ঘোষণা করতে ইচ্ছুক।

*

পঞ্চদশ দৃশ্য 

[প্রথমে অঞ্চলটা পথ, তারপরে আদালত হবে]

১ম গ্রীক।। জল এদ্দূর গড়াবে কে জানত রে ভাই!

২য়।। রোমান সৈন্যরা গোটা শহরটা ঘিরে রেখেছে। শুনেছি কারিয়া থেকে বাহিনী এসেছে কাটোর নির্দেশে। ক্রাসাসকে দায়িত্বচ্যুত করার পর এ শহরের বাহিনীর উপর কাটো ভরসা রাখতে পারেননি শুনলাম। ওদিকে সিন্না স্বয়ং নাকী আজ বিচার দেখতে আসবেন।

১ম।। আরে সিন্নাকেও তো চাপে রাখতে হবে। সে জন্যও এনেছে বাহিনী!

২য়।। আজ যে কী হবে আদালতে কে জানে! বিচারই না বন্ধ হয়ে যায়। লুলাহিটাকে ক্রুশে ঝোলাতে একদল বদ্ধপরিকর। অন্যরা বলছে বিচার বিচারের মত হওয়া চাই। জলাশয়ের দখল থেকে চোখ ঘোরানোর খেলা হলে ফল ভাল হবে না।

১ম।। তুমি কি বলছ?

২য়।। কিচ্ছু না। চুপচাপ চেপে আছি। এই বাজারে বলে বিপদে পড়ে কেউ!

[দুজনে চলে যায়। কাটো আর সিন্না মুখোমুখি সিন্নার পরামর্শ কক্ষে। সিন্না]

সিন্না।। এই পরিস্থিতিতে বিচার চালানোটা ঝুঁকির কাজ হয়ে যাচ্ছে কাটো।

কাটো।। বিচার, বিচারালয়ের বাইরের বিষয় দিয়ে প্রভাবিত হতে পারে না সিন্না।

সিন্না।। এ তো সকলেই জানে। কিন্তু নগরে দাঙ্গা লেগে যাচ্ছে। সে দাঙ্গা বাড়তে তো দিতে পারি না। একটা বিচারের জন্য—

কাটো।। একজন মানুষের জীবন-মৃত্যু বাকিদের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়!

সিন্না।। আপনি আদর্শের কথা বলছেন। আমাকে অঞ্চলের শাসন চালাতে হয়।

কাটো।। আমি বিচারের কথা বলছি, যা শাসনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যা বাদ দিলে শাসন থাকা আর না থাকার মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই।

সিন্না।। রোমের কাছে আমাকে এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে কাটো।

কাটো।। রোম আমার কাছেও জবাব চাইবে। আমরা সবাই রোমের কর্মচারী। কাজেই যার যার কাজ তাকে করতে হবে।

সিন্না।। এই অবস্থায় আদালতের নিরাপত্তা বিধান করাটা—

কাটো।। অসম্ভব?

সিন্না।। প্রায়!

কাটো।। তাহলে আমিই ব্যবস্থা করে নিচ্ছি।

সিন্না।। আমার আপত্তি সত্ত্বেও?

কাটো।। সিন্না, ভুলে যাবেন না রোম আমাকে কতটা ক্ষমতা দিয়েছে।

সিন্না।। দেবতা মার্সের পুরোহিত ক্রোনাস অশুভ সঙ্কেত দেখেছেন। তিনি দেখেছেন গতকাল রাতে সিংহ গর্জন করতে করতে আকাশ থেকে রক্ত চেটে নিচ্ছে। আমি দেখেছি আজ পাখির ঝাঁক সকালে উল্টো হয়ে উড়ছিল। পা আকাশের দিকে, ডানা মাটির দিকে। ক্রোনাস বলছেন এ সব সঙ্কেতের অর্থ বিপর্যয় আসন্ন। রোমান আইন অনুযায়ী এই সব বিপর্যয়ের সঙ্কেতের জন্য আমি এই বিচার বন্ধ করার দাবী তুলছি।

কাটো।। এমনও তো হতে পারে এই সব বিপর্যয় আসলে সোনার খনি বানানোর জন্য হচ্ছে?

সিন্না।। পুরোহিত ক্রোনাস বলছেন—

কাটো।। পুরোহিত তেলেন্ত ছড়ালে অনেক কেনা যায় সিন্না। ওতে কিছু যায় আসে না। বিচারের আজ শেষ দিন। আমি সেখানেই চললাম।

[কাটো বেরিয়ে যায়। ক্রোনাস আসে। ক্রাসাসও।]

ক্রোনাস।। তাহলে?

সিন্না।। একটাই রাস্তা আছে। ক্রাসাস— সেই রাস্তা নিতে হবে।

[কাটোর বিচারশালায় কাটো পৌঁছে গেছেন। সেদিকে আলো আসে।]

ঘোষক।। জুরিগণ সর্বসম্মতিক্রমে যে সিদ্ধান্তে এসেছেন সেই সিদ্ধান্ত আদালতকে জানাবার জন্য তাঁদের আমন্ত্রণ করা হচ্ছে। [জুরিরা আসে। পেয়াদার হাতে সিদ্ধান্ত দেয়। সে বিচারককে দেয়। বিচারক সেই সিদ্ধান্ত হাতে নেবেন। জুরিদের মুখপাত্রকে বলবেন,]

কাটো।। এ সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত?

মুখপাত্র।। হ্যাঁ মাননীয়!

কাটো।। একজন মানুষ খুন হয়েছেন। প্রশ্নটা ছিল ধৃত ব্যক্তি খুন করেছে? না করেনি? জুরিগণের মুখপাত্র এখন আমাদের জানাবেন তাঁরা কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন এবং কেমনভাবে তাঁরা সিদ্ধান্তে এসেছেন!

মুখপাত্র।। বাদী এবং বিবাদী দুই পক্ষের উকিল তাঁদের যুক্তিজাল বিস্তার করেছেন। আমরা শুনেছি। হত্যার একজন প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া গিয়েছিল বলে দাবি ছিল। কিন্তু সে সাক্ষীর সঙ্গে প্রশ্নোত্তরে জানা গেল তিনি দেখতে এবং শুনতে দুইয়েই বেশ অপারগ। এবং হাঁটতেও। এই আদালতেই আমরা তা দেখেছি। কাজেই তাঁর পক্ষে খুনের প্রত্যক্ষদর্শী হওয়া সম্ভব বলে মনে হয়নি আমাদের। [গুঞ্জন] মাননীয় ক্রাসাস এই বন্দীকে হাতেনাতে ধরেছেন। দেখা গেল তিনি ধরেছেন, কিন্তু খুনের পরে। এবং ছুরি তিনি ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করেন। অর্থাৎ প্রত্যক্ষদর্শী তিনিও না। সেই সময় এই বন্দী ঐ অঞ্চলে রক্তমাখা জামাকাপড়ে ও খালি পায়ে ছিল বলে তিনি ধরেছেন। তার থেকে প্রত্যক্ষত খুন প্রমাণিত হয় না। বাকী সাক্ষীদেরও নানা স্বার্থ এবং উদ্দেশ্যে বেরিয়ে এসেছে জেরায়। তাদের স্বাক্ষ্যকেও অপক্ষপাতি ভাবার উপায় নেই। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে খুন তো হয়েইছে! জলাশয় নিয়ে কাহিনী, সে কাহিনীকে নিয়ে জলাশয় বন্ধ করা, সোনার খনি – এই সব কোনোকিছুই খুনটা যে হয়েছে তাকে খারিজ করতে পারে না। খুন কি এই বন্দীই করেছে? অথবা বিবাদী পক্ষের উকিল যেমন নানা ভাবে ইঙ্গিত করেছেন যে অন্য লোকদেরও নিকাটোরকে হত্যা করার কারণ ছিল, তেমন কোনো অন্য লোক করেছে খুন? [গুঞ্জন বাড়ে] না, সে বিষয় আমরা নিঃসংশয় হতে পারিনি। সুতরাং বুঝতেই পারছেন সিদ্ধান্ত নেওয়াটা খুব মুশকিলের হয়ে গেছে আমাদের পক্ষে। [নীরবতা একটু] তবু আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। [একটু চুপ থাকেন] সে সিদ্ধান্ত হল বন্দী পিহাজিটি যথাযথ প্রমাণাভাবে নির্দোষ। [প্রবল হৈ হৈ পক্ষে-বিপক্ষে]

কাটো।। শান্ত হোন সকলে। কোনো হৈ চৈ এখানে আমি বরদাস্ত করব না। —হৈ চৈ করলে বের করে দেব আদালত থেকে। [থামে] শুনলেন সকলে জুরির সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে আমি, বন্দীকে এই মূহুর্তে মুক্তি দেবার আদেশ দিচ্ছি। [গুঞ্জন] শান্ত হোন। শান্ত হোন।

কাটো।। [সিন্না কয়েকজনকে নিয়ে প্রবেশ করে।] এই যে মাননীয় সিন্না, একেবারে সঠিক সময়েই এসেছেন। সবে আমাদের বিচার প্রক্রিয়া সমাপ্ত হয়েছে।

সিন্না।। এই বন্দীকে আমাদের হাতে তুলে দিতে হবে।

কাটো।। এর মুক্তির আদেশ হয়েছে।

সিন্না।। সে তো এই মামলায়! কিন্তু এর আগের অপরাধ আছে।

কাটো।। কী অপরাধ?

সিন্না।। লেক্সাসের মেয়ে সাসালডাকে অপহরণের অভিযোগে একে বন্দী করা হয়েছিল! কারাগারে নিয়ে যাবার পথে এ পালায়।

কাটো।। হুম! ভারী অন্যায় কাজ!

সিন্না।। মাননীয় আদালত একে আমাদের হাতে সমর্পণ করলে—

কাটো।। করেই দিতাম। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে আজ-ই লেক্সাস এসেছিল। এই আদালত শুরু হবার আগে সে তার সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এখন অভিযোগই যদি না থাকে—

সিন্না।। লেক্সাস অভিযোগ প্রত্যাহার করতে পারে, কিন্তু রোমান প্রশাসন করেনি। তার বন্দীত্ব থেকে পালাবার অভিযোগে আমি প্রিয়েটর হিসেবে—

কাটো।। আমি যে একে মুক্তি দিয়েছি সব অভিযোগ থেকে!

সিন্না।। আমরা দিইনি। এবং আপনিও পারেন না মুক্তি দিতে যতক্ষণ না বন্দীত্ব থেকে পালাবার ফয়সালা হচ্ছে।

কাটো।। আপনি প্রিয়েটর ঠিকই। কিন্তু আমি যে এখন প্রোকনসাল। আমাকে ভেটো দেবার ক্ষমতা আপনাকে রোমান আইন দেয় না।

সিন্না।। আমি—

কাটো।। আমার কাজে আমাকে বাধা দেবেন না। দিলে আমার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে আমি বাধ্য হব।

[সিন্না তার লোকজন নিয়ে বেরিয়ে যায়]

ইম্ব্রা।। তাহলে?

কাটো।। বন্দী মুক্ত। [একাংশ জয়ধ্বনি করে ওঠে। অন্য অংশ নিশ্চুপ। আলো নেভে।]

*

ষোড়শ দৃশ্য

[থুরানের প্রাঙ্গন। ইউমেনেস বসে।]

ইউমেনেস।। তারপর? সিন্না ছেড়ে দিল এত সহজে?

থুরান।। না দেয়নি। কেউ দেয় না।

ইউমেনেস।। তাহলে?

থুরান।। সেই রাত্রে পিহাজিটি আর সাসালডা আবার পালালো। এবারে পালালো দক্ষিণ সমুদ্রের দিকে। কিন্তু সে সমুদ্র অবধি তারা পৌঁছতে পারেনি।

ইউ।। সিন্না আটকাল?

থুরান।। সিন্না এবং ক্রাসাস, দুজনেই। ক্রাসাসের বাহিনী মাঝপথে তাদের ধরে ফেলে। পিহাজিটিকে ক্রুশে ঝুলিয়ে দেয়।

ইউ।। সাসালডা?

থুরান।। তার খোঁজ আর পাওয়া যায়নি কখনো!

ইউ।। কাটো জেনেছিলেন এই সব?

থুরান।। জেনেছিলেন। ঐ মামলা চলার সময় কিছু লোক অন্তত ভেবেছিল যে সুবিচার হবে। কিন্তু যখন দেখল যে আদালতের বাইরের দুনিয়াটা এতে কিচ্ছু বদলায়নি, বরং বেশী বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে তখন—! কেউ সাক্ষী হতে এগোল না। সমস্তটাই হয়ে গেল ডাকাতির গল্প।

ইউ।। ইম্ব্রাসিস? তিনি রোমে চলে গেছিলেন শুনেছি। সত্যিই? এর পরেও?

থুরান।। হ্যাঁ সত্যি। এর পরেও।

ইউ।। কিন্তু কেন?

থুরান।। রোমকে জানতে।

ইউ।। এই রোমকে জানার কি আছে?

থুরান।। দূর থেকে দেখলে রোমকে একক এবং অবিভাজ্য বলে মনে হয়। কাছে গেলে সে ভুল যায় ভেঙে। এই যে তুমি দাসের মুক্তি নিয়ে চিন্তিত, রোমেও এমন মানুষ আছেন। তাঁরা বহুকাল ধরে লড়ছেন রোমের অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্ধে। কাটোও তেমনই একজন ছিলেন।

ইউ।। হ্যাঁ, কিন্তু—

থুরান।। রোমকে মারতে গেলে ভেতরে বাইরে সব জায়গায় মারতে হবে। সে অসম্ভব যদি না রোমের চেহারা জানা যায়। তখন বোঝা যায় শত্রুই বা কে, মিত্রই বা কে! এখানে বিদ্রোহের হাওয়া যত বাড়বে, ততই রোমেও চেপে ধরতে হবে শত্রুকে। তবে কিছু কাজ হতে পারে। নইলে আদালতে জয় দিয়ে —! আইন হল বড়লোকের বাঁধা রক্ষিতা। তাকে ফুসলোনো যায়, নিজের করে পাওয়া যায় না। বড়লোককে যদি শায়েস্তা করা যায়—!

ইউ।। ইম্ব্রাসিস তাই করেছিলেন? শুনিনি তো?

থুরান।। শোনার কথাও তো না! ইম্ব্রাসিস এখানে ফিরতে পারেনি আর!

ইউ।। লোকে বলে তিনি রোম থেকে কিছু দূরে কাটোর খামারে বসবাস করতেন শেষ জীবন অবধি।

থুরান।। ভুল বলে। টিবেরিয়াস রোমে ক্ষমতায় আসার সময় ইম্ব্রাসিস, তার স্ত্রী ইফিজিয়া এবং কাটো সমেত এ দেশে আসবে বলে জাহাজে চেপেছিল। সে জাহাজ এখান অবধি আর পৌঁছয়নি। কেউ বলে ডুবে যায়, কেউ বলে লুট হয়ে যায়। আমিও জানি না কোনটা সঠিক। শুধু এটুকু জানি, সে এখানে এলে হয়তো— হয়তো নতুন কোনও রাস্তা দেখা দিলেও দিতে পারত। যেমন রোমান ব্লসিয়াস সহায়তা করেছিল এরিস্টোনিকাসের বিদ্রোহে।

ইউ।। রোমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ রোমানেরই সহায়তায়?

থুরান।। হ্যাঁ। ব্লসিয়াস, স্টোইক দার্শনিক ছিলেন। টিবেরিয়াস গ্রাক্কাস ছিলেন সেই পপুলেয়ারস অংশের নেতা যারা রোমান অভিজাতদের থেকে জমি কেড়ে ভূমিহীনদের হাতে দিতে চেয়েছিল। গ্রাক্কাসের প্রধান পরামর্শদাতাও ছিলেন ব্লসিয়াস। অপটিমেটসরা গ্রাক্কাসকে খুন করার পরে এখানে চলে আসেন। এই এশিয়াতে এরিস্টোনিকাসের নেতৃত্বে দাস ও ভূমিহীন বিদ্রোহের সমর্থক এবং পরামর্শদাতা হয়ে ওঠেন। [একটু থামেন] রোমের সাম্রাজ্য ভাঙতে হলে রোমকেও ভাঙতে হবে।

ইউ।। আপনি যখন রোমকে ভাঙার কথা বলছেন তখন কি রোমে বিদ্রোহের কথা বলছেন? সে আমাদের পক্ষে তো—

থুরান।। না, তা বলছি না। রোম একটা ধারণা, একটা ভাবনা বা দর্শন। বহুযুগ আগে শুরু এ দর্শনের। গ্রীকদের নগর-রাষ্ট্রের মতন এও অভিজাতকেন্দ্রিক। কয়েকজনের হাতে সব ক্ষমতা থাকবে। একে ভাঙতে হলে এর বিকল্প দর্শন লাগবে। তার প্রত্যক্ষ ব্যবহার লাগবে।

ইউ।। তাহলে মামলা লড়াটাতে কিছু হবে না বলছেন?

থুরান।। একদিনে কিছুই তৈরী হয় না ইউমেনেস। একটু একটু করেই পাহাড়ও পাহাড় হয়েছে। সুতরাং কোনো প্রচেষ্টাই ফেলনা নয়। শুধু জেনে প্রচেষ্টা করা ভাল, যে এতে পাঁচিল ভাঙবে না। একটা ইঁট টোল খেতে পারে মাত্র। কিন্তু ওভাবেই একে একে অনেকগুলো ইঁট টোল খেলে একদিন পাঁচিল ভাঙে। ধৈর্য্য লাগে, অধ্যবসয় লাগে তার। তোমার এক জন্মে বা আমার এক জন্মে এ যুদ্ধ শেষ হবে না। হবার নয়। মামলা লড়বে লড়ো। বেছে নাও তোমার কাজের ভাগ। তারপরে ধ্যান-জ্ঞান সব ঢেলে দাও। আর মনে রেখো, তোমার জীবন বাকিদের মতন হবে না। হওয়ার রাস্তা থাকবে না।

ইউ।। মনে রাখব! প্রতিটি বাক্য মনে রাখব জ্ঞানী থুরান। আমাকে অনুমতি দিন, প্রস্থান করি। অনেক কাজ এখনো করা বাকী। মামলা সাজাতে—! আবার যদি কিছু জানার প্রয়োজন হয়, পরামর্শ লাগে আপনার কাছে আসতে চাই।

থুরান।। অবশ্যই এসো! [আলিঙ্গণ এবং স্নেহ চুম্বন করেন। বেরিয়ে যায় ইউমেনেস। নিজের জায়গায় গিয়ে বসেন থুরান। চোখ বুঁজে। স্বপ্নের মধ্যে চলে গেছেন যেন। ইফিজিয়া আর ইম্ব্রাসিস প্রবেশ করে স্বপ্নে।]

ইফিজিয়া।। দাদুউউউউউউউ!

থুরান।। বল দিদিভাই!

ইফিজিয়া।। আগুনটা জ্বলছে দাদুভাই! আগুনটা জ্বলছে।

থুরান।। তাই তো দেখছি!

ইম্ব্রাসিস।। এ সব আবর্জনা পুড়িয়ে ছারখার না করা অবধি এ আগুন নিভবে না-আআআআআআ!

থুরান।। তাই দাদুভাই তাই!

ইফিজিয়া।। তুমি জেগে থেক কিন্তু! আমরাও জেগে আছি!

থুরান।। আছি জেগে দিদিভাই! এই বুড়ো বয়সে আর ঘুমই বা আসে কই!

ইম্ব্রা।। একদিন আমরা শান্তিতে ঘুমোবো, যেদিন এ সব থাকবে না আর! সেদিন আমরা শান্তিতে ঘুমোবো। দুটো ঘুমের মধ্যে জেগে থাকি তদ্দিন! জেগে থেকো-ওওওওওওও।

[চলে যায় দুজনে। থুরান ঠেস দিয়ে বসেন হাতের বইটা টেনে। পর্দা পড়ে।]

।। সমাপ্ত।।

চিত্রণ: লেখক
Advertisement
5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »